Monday

ভাল ছেলে Vs. খারাপ ছেলের প্রেম | বাংলা প্রেমের গল্প

SHARE

ভাল ছেলে Vs. খারাপ ছেলের প্রেম  |  বাংলা প্রেমের গল্প

ভাল ছেলে Vs. খারাপ ছেলের প্রেম  |  বাংলা প্রেমের গল্প

শুধুমাত্র ক্লাসেরই না, ইমন পুরো ভার্সিটির মধ্যে সবচাইতে ভালো ছেলে। শান্ত শিষ্ট, নম্র ভদ্র। ভোরবেলা গোসল করে বানানো প্যান্ট আর লম্বা চেকের ঝুলওয়ালা শার্ট পরে ক্লাসে আসে। চুপচাপ সবগুলো ক্লাস করে বাসায় চলে যায়। আজেবাজে আড্ডাতে সময় নষ্ট করে না একদমই। শোনা যায় সে প্রতিদিন রাত সাড়ে নয়টা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে। বিশ্বাস করা কঠিন হলেও এটা সত্যি।
যার ফলে এতোগুলো সেমিস্টারেও একটা সাবজেক্টে রিটেক নাই। ঈর্ষনীয় সিজিপিএ। কোনো মেয়েদের দিকে তাকায় না পর্যন্ত, প্রেম ভালোবাসা তো অনেক দূরের টপিক।
এমনকি এই জামানায় এসেও ছেলের একটা ফেসবুক আইডি নাই। বন্ধুরা মজা করে বলে, 'ইমন তুমি একটু সাবধানে থাকবা। জাদুঘর কতৃপক্ষ তোমার সম্পর্কে জানতে পারলে ধরে নিয়ে যাবে। লোকজন টিকিট কেটে তোমাকে দেখতে আসবে।'
ইমন শুধু হাসে। কোনো কথা বলে না।
.
তারপর একদিন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যজনক ঘটনাটা ঘটলো। ইমন নামের অতি নম্র ভদ্র ছেলেটা ফাইনালি প্রেমে পড়ে গেলো। ফার্স্টইয়ারে নতুন ভর্তি হওয়া মেয়েটার নাম তনিমা। ইমন একবার তাকিয়েই স্বভাবসুলভ চোখ ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু মাথা থেকে ঐ চেহারা দূর করতে পারলো না। সারাদিন সারারাত তার কল্পনায় শুধু তনিমার মুখটা রিপিট টেলিকাস্ট হতে লাগলো। জীবনে প্রথমবার নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকালবেলা ইমন আবিষ্কার করলো সে প্রেমে পড়েছে। তবে সেইটা খুব একটা চিন্তার বিষয় না। প্রেম করলেই তো হয়। সুতরাং সেদিন ক্যাম্পাসে ইমনকে দেখা গেলো তনিমার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। তারপর কাচুমাচু গলায় বললো, 'এক্সকিউজ মি, আপনার সাথে দুই মিনিট কথা বলা যাবে?'
তনিমা এগিয়ে আসলো, 'হ্যা বলুন।'
ইমন শান্ত গলায় বললো, 'আপনাকে দেখে আমার হৃদয়ে ভালোবাসা নামক এক আশ্চর্যজনক অনুভূতির জন্ম হয়েছে। আপনি যদি রাজি থাকেন তাহলে আমরা কি প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি?'
- হোয়াট! আপনি আমাকে প্রপোজ করছেন?
- জ্বী হ্যা, আপনি ঠিকই অনুভব করেছেন।
তনিমা অনেক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলো না। সে জীবনে বহু প্রপোজ পেয়েছে, কিন্তু এরকম অদ্ভুত 'ভদ্র' প্রপোজ কখনো পায়নি। এই তাহলে ক্যাম্পাসের বিখ্যাত গুড বয় ইমন। তনিমা শুনেছে এর ব্যাপারে।
- 'হ্যালো, আপনার কি আমার প্রেমের আহবানে সাড়া দিতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে? তনিমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ইমন বললো।'
তনিমা মুচকি হাসলো। বললো, 'চলুন কোথাও বসি। আপনার সাথে আমার কথা আছে।'
.
ক্যান্টিনে কফি হাতে মুখোমুখি বসে তনিমা বললো, 'আপনি অনেক ভালো ছেলে আমি জানি। কিন্তু আপনাকে আমার পছন্দ না।'
'আচ্ছা ঠিক আছে, ইমন উঠে দাঁড়ালো। আপনার মূল্যবান সময় দিয়ে আমাকে পর্যালোচনা পূর্বক বাতিল করার জন্য আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।'
'ওয়েট, ওয়েট, আচ্ছা ছেলে তো আপনি। আমি কি বলেছি আপনাকে রিজেক্ট করেছি?'
'বললেন তো যে অপছন্দ।'
'আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আপনি বসুন।'
ইমন আবার বসে পড়লো।
তনিমা বলতে লাগলো, 'মানুষ হিসাবে আপনাকে আমার অপছন্দ না। আমার অপছন্দ আপনার এই ভালো ছেলে চরিত্রটা। আমার ছোটবেলা থেকেই শখ আমার বয়ফ্রেন্ড হবে স্টাইলিশ, বেয়াদব, বাজে স্টুডেন্ট টাইপ। যে জিন্স- টিশার্ট পরবে, আমার সাথে ক্লাস ফাকি দিয়ে ঘুরাঘুরি করবে, রাত বারোটায় আমার বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে, আমার জন্য অন্য ছেলেদের সাথে মারামারি করবে, ফেসবুকে আমাকে ট্যাগ করে রোমান্টিক স্ট্যাটাস দিবে, কবিতা শুনাবে আমাকে, বাপের পকেট থেকে টাকা চুরি করে সারপ্রাইজ গিফট দেবে, আমরা দুইজন বিন্দাস লাইফ কাটাবো। দুইজন একসাথে প্রতি সেমিস্টারে আট দশটা করে রিটেক খাবো। অথচ আপনি? আয়নায় আপনার চেহারা দেখেছেন? নার্সারির বাচ্চাদের মত চুলে ডানপাশে সিথী করা, পরনে পঁয়ষট্টি বছরের রিটায়ার্ড করা আঙ্কেলের মত সাদা চেক শার্ট। কোনো কবিতা জানেন আপনি?'
ইমন আমতা আমতা করে বললো, 'দুইটা জানি। তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে আর আমাদের ছোট নদী।'
'খুব ভালো। প্রেমিকাকে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে টাইপ ছড়া শুনাবেন। রাতেও তো নাকি নয়টা বাজতেই ঘুমিয়ে যান। প্রেম করতে হলে সারারাত চ্যাটিং আর ফোনে কথা বলতে হয়, জানেন? আমার খুব শখ আমার বয়ফ্রেন্ডকে অনেক বলে বলে সিগারেট ছাড়াবো, অথচ আপনি তো সিগারেট খান ই না। আচ্ছা বাদ দেন, জীবনে কখনো কারো সাথে মারামারি করেছেন? ক্লাস পালাইলে কেমন লাগে জানেন? শুনেন আপনাকে দিয়ে প্রেম হবে না। তার মানে এই না যে আপনাকে আমার অপছন্দ। বুঝতেই তো পারছেন। এবার আসুন।'
.
ইমন বাসায় এসে গোসল করে চুলে ঠান্ডা কদুর তেল দিয়ে তনিমাকে ভুলে গেলো। তারপর দুপুরে খেতে বসে মনে হলো এইসব ভাত তরকারি খেয়ে বেঁচে থাকা শুধু শুধু। যে জীবনে তনিমা নেই, সেই জীবনের আসলে কোনো দামই নেই। একগাদা ভাতের মধ্যে হাত ধুয়ে উঠে পড়লো ইমন। মন বসলো না দেয়ালে টাঙানো রুটিন অনুযায়ী দুপুরের কেমিস্ট্রি বইএর পাতাতেও। পুরো বই জুড়ে শুধু একটাই মুখ। তনিমা। ইমন কেমিস্ট্রির বিক্রিয়ার বদলে খাতায় দুই লাইন কবিতা লিখলো, '
'তোমার কাছে পানসে ভীষন, ক্যাটরিনা আর সোনম;
তোমায় ভেবে কাটিয়ে দিবো একুশখানা জনম।'
.
ইমনের আব্বু আম্মু প্রচন্ড অবাক হয়ে দেখলো তাদের ছেলে প্রথমবারের মতো বিনা কারনে অনুমতি ছাড়াই ভর দুপুরে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে।
.
সুতরাং রাত একটার দিকে ইমনকে তনিমার বাসার সামনে ল্যাম্পোস্টের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ঘুমে ঢুলতে দেখা গেলো। রাত জাগার অভ্যাস না থাকলে ঘুম তো আসবেই, আহারে বেচারা! ভাবলো তনিমা। ইমনের পরনের জিন্স প্যান্ট আর টিশার্ট। গলায় হোয়াইট গোল্ডের চেন। হাতে ব্রেসলেট। ডেভিড বেকহামের মতো চুলের কাটিংএ তাকে যথেষ্ট মদন মদন লাগছে। সেটা দেখে হাসির বদলে কেন জানি, তনিমার চোখে পানি চলে আসলো।
.
পরদিন ক্যাম্পাসের সবাই তাদের জীবনের সবচাইতে আশ্চর্যজনক ঘটনা চোখের সামনে দেখলো। ইমন নামের অতি নম্র ভদ্র, শান্ত শিষ্ট ছেলেটা ক্লাস চলাকালীন ক্যান্টিনে বসে চা আর সিগারেট খাচ্ছে। সামনে নতুন ভর্তি হওয়া অনিন্দ্য সুন্দরী এক মেয়ে। 
ইমন সিগারেটে টান দিয়ে তনিমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, 'কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা, পদনখে পড়ে আছে তার কতগুলা।'
তনিমা অবাক হলো, 'মানে কি এর?'
'এর মানে হলো, 'কে বলেছে তোমার মুখ শরতের চাঁদের মতন? মুখ তো দূর, এরকম কয়েকটা চাঁদ তোমার পায়ের নখের কাছে পড়ে থাকবে।'
তনিমা হাসলো।
ইমন বললো, 'আচ্ছা সবাই যেখানে ভালো ছেলে পছন্দ করে, তোমার সেখানে উলটা কেন? তুমি কেন খারাপ ছেলে পছন্দ কর?'
তনিমা মাথা নাড়লো, 'জানিনা।'
'উহু, তুমি সব জানো।'
'আচ্ছা দেখ, পছন্দ জিনিসটার কোনো ব্যাখ্যা হয় না। তোমার চিংড়ী মাছ পছন্দ, কিন্তু কেন পছন্দ জানো?'
ইমন মাথা নাড়লো।
তনিমা বললো, 'আমার ব্যাপারটাও এরকম।'
.
পরবর্তী দুই বছরে ভার্স্টিটির অন্যতম মাস্তান হিসাবে ইমন বেশ ভালো একটা জায়গা তৈরি করে ফেললো। ততদিনে তার লেখাপড়ার অলমোস্ট বারোটা বেজে চল্লিশ মিনিট। সে আদৌ পাশ করে বের হতে পারবে কিনা, তার কোনো গ্যারান্টি নাই। তবে ক্যাম্পাসে ইমন- তনিমা জুটি বিশাল বিখ্যাত। নতুনদের জন্য একেবারে প্রেমের রোল মডেল।
.
তারপর যা হওয়ার ছিলো ঠিক তাই হলো। এক বিকালে ক্যাফেটেরিয়ায় সামনের চেয়ারে বসে পেস্ট্রি খেতে খেতে তনিমা বলল, 'আব্বু আমার বিয়ে ঠিক করেছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। সামনের সপ্তায় পাকা কথা হবে। তুমি প্লিজ কিছু একটা করো।'
.
তনিমার আব্বু ইমনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, 'তোমাকে আমার পছন্দ না।'
ইমন এখন আর আগের ইমন না যে চুপচাপ মেনে নিবে। সে জানতে চাইলো, 'কেন পছন্দ না?'
ইমনের আব্বু বললো, 'সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো। তুমি একটা বখাটে মাস্তান ছেলে। লেখাপড়া করোনা। রেজাল্টের অবস্থা খারাপ। মারামারি করে বেড়াও। আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছ? চুলের কাটিং দেখলে বমি আসে। আমি আমার মেয়ের জন্য একটা নম্র ভদ্র, শান্ত ছেলে চাই। যে কখনো মারামারি করেনি। ঠিকমতো লেখাপড়া শেষ করে পাশ করে এখন চাকরী করছে। কখনো মেয়েদের সাথে প্রেম ভালোবাসায় জড়ায়নি। সিগারেট খায় না। স্মার্ট, বিনয়ী, সচ্চরিত্রবান। তুমি এগুলোর একটাও না। সুতরাং আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও। আমি আর কখনো তোমাকে এই বাড়ির আশেপাশে দেখলে অবশ্যই পুলিশে দিবো।'
.
ইমনের লাইফটা হয়ে গেছে পুরা প্যারাডক্স। বাপের যেমন ছেলে পছন্দ, ইমন একসময় ঠিক তেমনই ছিলো। সেইভাবে থাকলে এখন নির্ঘাত তনিমার বাবা ওকে পছন্দ করতেন কিন্তু সেক্ষেত্রে তনিমার সাথে ওর প্রেমটাই তো হতো না। প্রেমের জন্য তাই তনিমার পছন্দমত হতে গিয়ে এখন আবার তার বাবার অপছন্দ হতে হচ্ছে। শালা জীবন। রাগে- দুঃখে ইমনের ইচ্ছা হচ্ছে সব ভেঙেচুরে শেষ করে ফেলতে।
.
তনিমার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে আলোকসজ্জায় সাজানো বাড়িটা যতবার দেখে ততবার ইমনের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। একটার পর একটা সিগারেট টানতে থাকে। সিগারেটের হালকা আলোতে ইমনের চোখের পানি জ্বলজ্বল করে জলেলে। হঠ্যাৎ বুদ্ধি আসলো মাথায়। আরেকবার ভালো হয়ে গেলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। সিগারেট ফেলে দিয়ে পাশের সেলুনে গিয়ে ঢুকলো ইমন।
.
তনিমার বাবা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো, 'মজা করো তুমি? চুল কেটে ভদ্র জামাকাপড় পড়লেই মানুষ ভালো হয়ে যায়? জামাকাপড় দেখে আমি তোমাকে পছন্দ করবো? ফান করো আমার সাথে? তোমার রেজাল্ট কই? জব কই? আমি কি পুলিশে ফোন করবো নাকি তুমি নিজেই চলে যাবা এখান থেকে।'
.
.
ইমন গত তিনদিন ধরে বাসাতেই আছে। খাওয়া ঘুম গোসল ছেড়ে দিয়েছে একদম বলা চলে। তার কিচ্ছু ভাল্লাগেনা, কিচ্ছু না। তনিমা অন্য একটা ছেলের হয়ে যাবে সেটা কিভাবে সম্ভব? কিভাবে! ইমনের বুকের মধ্যে সবকিছু ভেঙেচুরে যায়, সবকিছু। সে তনিমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না। সে অবশ্যই সুইসাইড করবে। ফ্যানের সাথে একটা লম্বা দড়ি ঝুলিয়ে ফাস বানায় ইমন।
.
ফাস নিতে যাবে এমন সময় ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় চোখ পড়ে ইমনের। বানানো প্যান্ট আর চেক শার্টে তখনও ভদ্র ছেলে হয়ে আছে সে। চুল সুন্দরভাবে আচড়ানো। ডানপাশে সীথি কাটা। সেটা দেখে কিছু একটা ভাবলো ও।
.
ফ্যান থেকে ফাসটা খুলে ফেললো ইমন। খাট থেকে নেমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। মাথার চুল এলোমেলো করে দিলো। গলায় হোয়াইট গোল্ডের চেনটা পরলো ড্রয়ার থেকে বের করে। শার্ট খুলে ছুড়ে ফেলে একটা টিশার্ট গায়ে চাপালো। বানানো প্যান্ট বদলে জিন্সের প্যান্ট পরলো। সিগারেট ধরিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে হাসলো হাহা করে। তারপর হাসতেই থাকলো, হাসতেই থাকলো।
.
.
পরিশিষ্ট: 
- ভালো ছেলেরা প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলে কি করে?
- খুব কষ্ট পায়। কান্নাকাটি করে। তারপর একসময় ভুলে যায়। কেউ কেউ কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে।
- আর খারাপ ছেলেরা?
- তারা বিয়ের আসর থেকে প্রেমিকাকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়।
- হুম, এজন্যই আমার খারাপ ছেলে পছন্দ। বুঝছো এবার? ইমনের কাধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো তনিমা।
.
ঢাকা টু চট্টগ্রামের ট্রেনটা তখন ছুটে চলেছে ঝিক ঝিক শব্দে।
SHARE

Author: verified_user