Friday

Mosharaf Hossen Antor's Bangla Story Fera | Bengali Story Books

SHARE

Mosharaf Hossen Antor's Bangla Story Fera | Bengali Story Books

Mosharaf Hossen Antor's Bangla Story Fera | Bengali Story Books Cover



ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নিয়েই ফেললাম! এছাড়া কোনো উপায় ও দেখছি না। ভেবে দেখলাম... আরিবার সাথে আমার কোনোদিক থেকেই যায় না। সে অর্ধশিক্ষিত গ্রাম্য একটা মেয়ে। যার মধ্যে আধুনিকতার ছিটেফোঁটাও নেই। শহুরে চাল-চলনের সম্পর্কে শূন্য পরিমাণ জ্ঞান ও তার নেই। তার জ্ঞান কাপড় কাচা, রান্না-বান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কথার ধরণটা পর্যন্ত গাইয়্যা গাইয়্যা। তার সাথে আমার প্রয়োজন ছাড়া একদিনও একটু কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি। সকল মা-বাবা তার সন্তানের ভালো চায়। কিন্তু আমার মা-বাবা কেন ঐ মেয়েকে বিয়ে করিয়ে আমার জীবনটাকে রসকষহীন করে দিল সেটা তারাই জানে। তারা কি আমার ভালো চায় না নাকি?Bengali Story Books
.
আমার বন্ধুরা যখন কোনো পার্টিতে আমায় ইনভাইট করে আমি যাই না। না যাওয়ার কারণটাও ঐ আরিবা। ওকে ছাড়া গেলে বন্ধুরা প্রশ্ন তোলে, ভাবিকে কেন আনিস নি?। আর ওকে সাথে করে নিয়ে গেলে তো আরো সমস্যা। কারণ সে কারো সাথেই খুব বেশি কথা বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এতে করে সবার সামনে আমায় লজ্জায় পড়তে হয়। রেস্টুরেন্টে খেতে যাবো সেখানেও সমস্যা! রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার দিতে বললে সে মিন মিন করে বলবে "আমি ওসব খাবার কখনো খাইনি, আপনিই অর্ডার করুন"। আবার আমি কোনো খাবার অর্ডার করলেও সেটা সে খাবে না! খাবে কি করে? ওসব খাবার কিভাবে খেতে হয় সেটাও সে জানে না। এরকম একটা ক্ষেতমার্কা বউ নিয়ে চলা সম্ভব? কলেজে ড্যাশিং লুকের জন্য কত মেয়েই না আমি 'ফুয়াদের' উপর ক্রাস খেতো। আর সেই আমার মতো শিক্ষিত, সুদর্শন একটা ছেলে কি না শেষমেষ এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করলো? ব্যাপারটা ভাবতেই আমার মেজাজটা বিগড়ে যায়!
.
(২)
অফিস থেকে ফিরে দেখি আরিবা খাবার নিয়ে বসে আছে। এ ঘটনা অবশ্য নতুন না। বিয়ের পর একদিনও সে আমায় ছাড়া খায় নি। সবসময় বাসায় ফিরেই দেখি অপেক্ষার চাদরে মোড়ানো একটা মুখ নিয়ে সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। যাইহোক, খাবার শেষ করার পর বউ কে বললাম:- আরিবা! ডিভোর্সের ব্যাপারটা নিয়ে তুমি কি ভাবলে?
আরিবা মিন মিন করে বললো:- আপনি যা ভালো মনে করেন তাই হবে!
ভনিতা না করে বলেই ফেললাম:- ঠিক আছে, তবে কালই তোমাকে নিয়ে উকিলের কাছে যাবো, ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে!
খেয়াল করলাম আরিবা আর কিছু বলছে না। সে নিরব হয়ে আছে। শুনেছি নিরবতাই নাকি সম্মতির লক্ষণ। তার এই নিরবতা সম্মতির, নাকি অসম্মতির আমি ঠিক বুঝলাম না। পৃথিবীর সবকিছু বোঝার ক্ষমতা খুব সম্ভবত সৃষ্টিকর্তা কাউকেই দেন নি!
(৩)
রাত দুটোর মতো বাজে। আমার কেন জানি ঘুম আসছে না। বারবার শুধু মনে হচ্ছে আরিবাকে ডিভোর্স দেয়া কি আমার উচিত হচ্ছে? মেয়েটা আনম্মার্ট হলেও খুবই সহজ-সরল। এই আমি.. ওকে অনেকদিন অনেকবার বকাবকি করেছি তবুও সে কিছুই বলেনি। কিন্তু সে তো আমার স্ত্রী তার ও আমাকে কিছু বলার অধিকার আছে, কিন্তু সে কিছুই বলে না কেন? এমনকি সেদিন যখন বললাম:- আরিবা..আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাই। তোমার সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। একথা শুনার পরেও সে একবারের জন্য জিজ্ঞেস করেনি তার দোষটা কি। বিয়ের পর একদিনও তারসাথে আমার মিলন হয়নি। হবেই বা কি করে? খাটের মাঝে ইয়া বড় একটা কোলবালিশ রেখে আমি একপাশে শুই ওকে অন্যপাশে শুতে দেই। এ নিয়েও সে আমায় কোনোদিন কিছু বলেনি।
.
সেদিন মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছি। পায়ে মোটামোটি ব্যথা পেয়েছি। বাসায় ফেরার পর আমার পা দেখে সে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। দ্রুত ব্যাথাযুক্ত সাথে বরফ দিল। মলম লাগিয়ে দিল। বারবার শুধু বলতে লাগলো, বাইকটা তো সাবধানে চালাবেন নাকি? আজ যদি আপনার কিছু একটা হয়ে যেতো তবে? উত্তরে আমিই কিছুই বলিনি, শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আচ্ছা, মেয়েটা আমায় নিয়ে এত্তো টেনশান করে কেন?
.
সেদিন গভীর রাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। জ্বরের তীব্রতা এতোই বেশি ছিল যে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারছিলাম না। আরিবা সারাটা রাত আমার পাশে বসে ছিল। কখনো মাথায় পানি ঢেলেছিল, কখনো জলপট্টি দিয়েছিল। চোখ বন্ধ করে যখন শুয়ে ছিলাম সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। সেদিন রাতে আমার মনে হয়েছিল যেন সে আমার মায়ের হয়ে আমাকে সেবা করছে। গ্রামের বাড়িতে যখন আমার জ্বর আসে ঠিক তখন আমার আম্মা ও আরিবার মতো এসব পাগলামু শুরু করে! জ্বরের তীব্রতায় মুখ তেতো হয়ে গিয়েছিল.. কিছুই খেতে পারছিলাম না। আরিবার আরেকটা সুন্দর গুণ হলো সে প্রায় আমার মায়ের মতোই ভালো রান্না করতে পারে! সেদিন সে আমার পছন্দের গরুর মাংসের ভুনা ঝাল ঝাল করে রান্না করেছিল। কি যে টেস্ট হয়েছিল তা বলে বোঝানো সম্ভব না। ভাগ্যিস সেদিন জ্বর ছিল, তা না হলে যে কতো প্লেট মাংস সাবাড় করতাম সেটা সৃষ্টিকর্তা জানে!
.
Bengali Story Books Pdf
কিন্তু..আমি আরিবাকে ডিভোর্স দিচ্ছি কেন? সে গ্রাম্য মেয়ে বলে? সে আনস্মার্ট বলে? আচ্ছা শর্ট শর্ট কাপড় পরিধান করে পার্টিতে এটেন্ড করাটাই কি স্মার্টনেস? পার্টিতে একজনের বউয়ের সাথে অন্যকেউ গানের তালে তালে নাচতে পারাটাই কি স্মার্টনেস? দামী দামী রেস্টুরেন্টে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করে হাজার হাজার টাকা উড়ানোটাই কি স্মার্টনেস? কালো চুলকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে, বুকের উড়না ছাড়া ফটো তুলে ফেবুতে আপলোড করাটাই কি স্মার্টনেস?
আমার কাছে তো... রাতে না খেয়ে ক্ষুদার্থ পেট আর অপেক্ষা ভরা চোখ নিয়ে আমার জন্য আরিবার অপেক্ষা করাটাকে স্মার্টনেস বলে মনে হয়। প্রবল জ্বরে যখন আরিবা আমার পাশে বসে অঘুমে রাতটা কাটিয়ে দেয়.. আমার মাথায় জলপট্টি দিয়ে দেয় সেটা আমার কাছে স্মার্টনেস বলে মনে হয়। অরুচির কারণে কিছু খেতে পারি না বলে, যখন আরিবা আমার জন্য আমার পছন্দের খাবারগুলো রান্না করে সেটাকে আমার স্মার্টনেস বলে মনে হয়। সামান্য ব্যাথা পেলে সে যখন আমার ক্ষতস্থানে বরফ বা মলম লাগিয়ে দেয় সেটাকে আমার স্মার্টনেস বলে মনে হয়। স্বামীর অফিসে পরে যাওয়ার ব্লেজার, টাই, থেকে শুরু করে মোজা বা জুতাটা পর্যন্ত গুছিয়ে রাখাটাকে আমার স্মার্টনেস বলে মনে হয়!
কিন্তু... এত্তোকিছু জানা- বোঝার পরও আমি থাকে ডিভোর্স দিচ্ছি কেন? সমাজের উচ্চস্থরের ব্যক্তিত্বের মর্যাদায় নিজেকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য? কিন্তু এই কাজ করে আমি কি সত্যিই নিজেকে উচ্চস্থরের ব্যাক্তিত্বে আসীন রাখতে পারবো? নাকি উল্টো নিজের বিবেকের কাছে সবচেয়ে নিচুস্তরের ব্যক্তিত্বে পরিণত হবো?
.
.
(৪)
রিক্সায় করে আরিবা আর আমি উকিলের ওখানে যাচ্ছি ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা বলতে! আরিবা কোনো কথা বলছে না; কথা বলছিনা আমিও। দুজনেই বরাবরের মতো চুপ হয়ে বসে আছি। অথচ দুজনেই বুঝতে পারছি যে, আমরা কতবড় একটা ভয়ংকর কাজ করতে যাচ্ছি। হঠাৎ করেই আমি রিক্সাওয়ালাকে বললাম:- চাচা.. আমাদের চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে নিয়ে চলুন! অনেকদিন বাইরে কোথাও ঘুরোঘুরি করি না।
.
আমার কথাশুনে আরিবা অবাক হয়ে গেল।সে মিনমিন করে বললো:- কিন্তু আমাদের তো ডিভোর্সের বোঝাপড়া করার জন্য উকিলের কাছে যাওয়ার কথা ছিল!
.
আমি মুচকি হেসে বললাম:- তুমি কি জানো আরিবা? আমি একটা ব......ড় মাপের শিক্ষিত ও মার্জিত গাধা!
.
আমার কথার আগামাথা যেন আরিবা কিছুই বুঝতে পারছে না। সে অসম্ভব রকমের অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে আবারো বললো:- ইয়ে..মানে আপনি গাধা হতে যাবেন কেন?
.
উত্তরে আমি বললাম:- গাধা না হলে কি আর... এত্তো লক্ষ্যি, গুণবতী, মিষ্টি একটা বউকে কেউ ডিভোর্স দেয়ার কথা ভাবে? ডিভোর্স -টিভোর্স সব চুলোক যাক! আর শোন.. আজ থেকে আমরা একটা সুখি প্রাণচঞ্চল সংসার করবো। আমরা অনেকগুলো বাচ্চা নেবো! ইয়ে.. মানে আচ্ছা, অনেকগুলো না, দুটো হলেই হবে! ছেলে হলে নাম দেবো শুভ্র, আর মেয়ে হলে নাম দেবো শুভ্রা। ও হ্যাঁ, আজ থেকে আমাদের মধ্যে কেউ ভুলেও যদি "ডিভোর্স" শব্দটা উচ্চারণ করে তবে তার খবর আছে বলে রাখলাম....
.
আমি আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলাম, ঠিক তখনি আরিবা আমার জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলো। আমি তাকে থামালাম না! কাঁদুক মেয়েটা.. আজ তার কান্না করার খুব দরকার। কান্নার শ্রোতে যদি তার মনের অতৃপ্তির কষ্টগুলোর ওজনটা একটু হালকা হয়। সেদিন রাতে আমিও কেঁদেছিলাম যখন আরিবার লেখা ডাইরিটা পড়েছিলাম। তার লেখা ডাইরিটার শেষ লাইন ছিল:- "আমি আমার স্বামীর সুখের জন্য হাসিমুখে জীবনটাও দিতে পারি। আর ডিভোর্স তো একটা সাধারণ ব্যাপার!
.
গল্প:- ফেরা
লিখেছেন:- Mosharaf Hossen Antor
SHARE

Author: verified_user