Wednesday

কষ্টের ভালবাসা | ভালোবাসার রোমান্টিক মেসেজ

SHARE

কষ্টের ভালবাসা | ভালোবাসার রোমান্টিক মেসেজ


কষ্টের ভালবাসা









কষ্টের ভালবাসা





অভিমান
বিক্রমজিৎ মিশ্র
(সুপর্ণ গরাইয়ের ডায়েরি থেকে নেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনাটি লেখার চেষ্টা করেছি)।
******
(১৪১৮ সাল,৮ই মাঘ।)
পাপিয়ার যে এমন একটা বিদঘুটে রোগ আছে তা সুপর্ণ কোনদিন জানতে পারেনি।বরাবর দেখে এসেছে পাপিয়া জেদি চঞ্চল প্রকৃতির একটা মেয়ে।বড্ড বেশিই ছটফটে,কথায় কথায় হি হি করে হাসা আর অকারন রাগ করে কথা বন্ধ করে দেওয়া প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস ছিল পাপিয়ার।প্রেমের নেশায় সুপর্ণ এইসব ছোটখাটো ব্যাপার কখনো তলিয়ে দেখেনি।কেউ ই দেখেনা হয়তো,প্রেমিকা কে কি গম্ভীর হলে মানায়।
গ্রামের মধ্যে বাস করে প্রেম করা বড় কঠিন।তবু এতোদিন ধরে প্রেমটাকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল দুজনে। আর তাদের গোপন অভিসারের সাক্ষী হল হারু ঘোষের বাঁসবাগান।প্রথম চুমু খাওয়া থেকে শুরু করে যৌবনের আহ্বানে একে অপরের শরীরে হারিয়ে যাওয়া সব হয়েছিল ওই বাঁসবাগানেই।সত্যিই পাপিয়াকে বড় ভালোবাসতো সুপর্ণ।
আজ ওই বাঁসবাগানের এক কোনে পাপিয়ার নশ্বর দেহ টা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।চিতার আগুন যখন পাপিয়ার শরীর টা গ্রাস করে নিচ্ছিল,তখন সেই আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে তৈরি হওয়া হাজার নক্সার মধ্যে নিজের জীবনের সেই রঙিন দিন গুলো যেন দেখতে পাচ্ছিল সুপর্ণ।দেখতে দেখতে দুচোখ ভিজে উঠছিল তার।তীব্র অপরাধবোধ তার অন্তরাত্মাকে আঘাত করছিল বারবার।অনুশোচনার আগুনে ভিতরে ভিতরে সে নিজেও পুড়ছিল পাপিয়ার সাথে।


Also Read : Bangla Golper Boi
*****
(১৪১৭ সাল,সম্ভবত আষাঢ় মাস।)
এতোদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল,হঠাৎ করেই যেন সুপর্ণ আর পাপিয়ার ভালোবাসার মাঝে কারো অভিশাপ নেমে এল।কিছুদিন আগে পাপিয়া তার দিদির বাড়িতে বেড়াতে গেছিল,সেখানে নাকি মনসা পূজা উপলক্ষে বিরাট মেলা হয়।দিদি জামাইবাবুর অনুরোধে কটা দিনের জন্য বাধ্য হয়েই যেতে হয়েছিল পাপিয়া কে।দিদির বাড়িতে 
প্রায় সাত আটদিন থেকে যখন ফিরে এলো তখন তার হাবে ভাবে অনেক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।এতো হাসিখুশি ছটফটে মেয়েটা হঠাৎ কি কারনে যেন ভীষণ চুপচাপ আর গম্ভীর হয়ে গেছে।ফেরার পর একবারো বাঁসবাগানে সুপর্ণর সাথে দেখা করতে যায়নি।প্রতিদিন সুপর্ণ একা একা বসে থেকে ফিরে এসেছে,অপেক্ষাই সার।কি হয়েছে কিছু বুঝতে না পেরে একদিন ওদের বাড়িতেও গিয়েছিল সুপর্ণ। কিন্তু পাপিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে আসেনি,কথাও বলেনি।মনে মনে দুঃখ পেলেও চুপচাপ সুপর্ণ কে ফিরে আসতে হয়েছে।একজন সোমত্ত মেয়ের ব্যাপারে বেশি খোঁজখবর নিলে গাঁয়ে ঢিঢি পড়ে যেতে সময় লাগবেনা।আর সুপর্ণর বাবা ভূদেব গরাইয়ের কানে এসব গেলে ওকে জুতোপেটা করে ত্যাজ্যপুত্র করবেন।তবু আড়ালে আবডালে থেকে খবর জোগাড়ের চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি সুপর্ণ।নিজের ছোট বোন মারফৎ খবর যে পেতোনা তা নয় তবে তাতে কাজের খবর প্রায়ই থাকতো না।
সারাদিন পারিবারিক ব্যবসা দোকান পত্র দেখাশুনা করতে হয়।বাজারে সুপর্ণ দের তিন তিনটে দোকান,বাবা এবং ওরা দুই ভাই মিলে দোকান গুলি চালায়।সেসবের ফাঁকেও ওর মন পড়ে থাকে পাপিয়ার কাছে,দুপুরে বাঁসবাগানে গিয়ে অপেক্ষা করে কিন্তু পাপিয়া আর আসেনা।
******
এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর সুপর্ণ একদিন জানতে পারলো পাপিয়ার নাকি মাথার গোলমাল শুরু হয়েছে।ওদের বাড়িতে এতোদিন লুকিয়ে লুকিয়ে ডাক্তার দেখাচ্ছিল।গ্রামেরই একজন মহিলা সদর হাসপাতালে আয়ার কাজ করে,সেই এই গোপন খবর টি গ্রামে চাউর করে দিয়েছে।
পাড়াগাঁয়ে এইসব খবর ছড়াতে দেরি হয়না।ঝড়ের মুখে খড়ের টুকরোর মত খবর টি একবাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে উড়ে গিয়ে গাঁময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে।
সুপর্নের বৌদি সকাল বেলায় কোথার থেকে যেন ঘটনাটি শুনে এসে ওর মাকে রসিয়ে রসিয়ে পরিচয় দিচ্ছিল।দোকানে বেরোনোর সময় সুপর্ণ কথাগুলি শুনতে পায়।পায়ের নিচের মাটি কেঁপে যায় ওর।পাপিয়ার এরকম বিপদের কথা শুনে ও স্থির থাকতে পারেনি।ছুটে গেছিল পাপিয়াদের বাড়িতে।একবার শুধু দেখতে চেয়েছিল সে,কিন্তু পাপিয়ার বাড়িতে গিয়ে জানতে পারে ওকে চিকিৎসার জন্য শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।শহরের বড় ডাক্তারের নিজস্ব মেন্টাল হসপিটালে ওকে ভর্তি করা হয়েছে।
নিরাশ হয়েই ফিরতে হয়েছিল সুপর্ণ কে।কাজে কর্মে মন বসছে না,হিসাব গুলিয়ে ফেলে বাবার কাছে বকুনিও খেতে হচ্ছে প্রতিদিন।পারিপার্শ্বিক এই ঝামেলা গুলো না থাকলে ও একবার শহরে অবশ্যই যেতো।কিন্তু তাতে বাবা ভূদেব গরাইয়ের মান সম্মানে আঁচ লেগে যেতে পারে।অগত্যা মনের যন্ত্রণা মনেই দাবিয়ে রেখে ভবিতব্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দেয় সুপর্ণ।
যতই সে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করুক,বাড়ির সকলেই কদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলো যে সুপর্ণের কিছু একটা হয়েছে।সবাই নানাভাবে জানার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সুপর্ণের কাছ থেকে কোন কথাই বের করা যায়নি।ও জানত যে এদের কে সব খুলে বললে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।বাড়ির কেউ পাপিয়া কে মেনে নেবেনা।তার বাবা ভূদেব বাবু ভীষণ প্রাচীনপন্থী,তার কানে এসব গেলে বাড়িতে খুব অশান্তি হবে। কষ্টের ভালবাসা | ভালোবাসার রোমান্টিক মেসেজ 
চুপচাপই ছিল সুপর্ণ,কিন্তু একদিন এক দুর্বল মুহুর্তে ওর বৌদির কাছে সব কথা বলে ফেলল।বৌদি কথা দিয়েছিল কারোকে বলবেনা,কিন্তু বৌদি কথা রাখলো না।বাড়িতে কদিন খুব ঝামেলা হল এটা নিয়ে।বাবা মা একবাক্যে বলে দিলেন যে ওই পাগলি মেয়েকে তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না।সুপর্ণ যদি তবু জোর করে ওর সাথেই বিয়ে করতে চায় তাহলে ওকে নিজের রাস্তা দেখে নিতে হবে।
সুপর্ণ অনেক চেষ্টা করেও বাবা মাকে বোঝাতে পারলো না যে পাপিয়া পাগল নয়,মানসিক ভাবে অসুস্থ।চিকিৎসা করলে সেরে যাবে,আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।
কিন্তু বাবা ভূদেব গরাইয়ের রক্তচক্ষুর কাছে তাকে একসময় হার মানতেই হল।ঠিক হল এইবছরের মধ্যেই সুপর্ণর বিয়ে দেওয়া হবে।
সুপর্ণ মনে মনে চিন্তা করে দেখল বাবা মার বিরুদ্ধে গিয়ে সে কিছুই করতে পারবেনা।নিজের তেমন কোন যোগ্যতা নেই যে পাপিয়াকে বিয়ে করে আলাদা থাকতে পারবে।বাড়ি থেকে বের করে দিলে যে তার কানাকড়ির ও মুরোদ নেই এটা বুঝে উঠতে তার বেশি সময় লাগলো না।তাছাড়া পাপিয়া যে সুস্থ হবে তার গ্যারান্টিই বা কে দেবে??
কিছুদিন লাগল পুরনো প্রেম টাকে যুক্তির ঘায়ে ভেঙে ফেলতে।কষ্ট হল অবশ্য,কিন্তু নতুন জীবনের স্বপ্ন সেই কষ্টের রেশ মুছে দিল খুব তাড়াতাড়ি।পাপিয়া কাছে থাকলে হয়তো এতোটা সহজ হতো না ব্যাপার টা।কিন্তু সেও তো চিকিৎসার জন্য শহরে মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি।
*****
(১৪১৮ সাল)
ভূদেব গরাই করিতকর্মা লোক,অনেক খোঁজপাত করে সুপর্নের জন্য একটি পাত্রী ঠিক করে ফেললেন।তাঁদেরই পালটিঘর,পাশের গ্রামের দীনেন ভুঁইয়ের বড় মেয়ে রুপালী।রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে তাই লেখাপড়া বেশিদুর করেনি,তবে গৃহকর্মে নাকি নিপুণা।
নিজের দীর্ঘজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে ভূদেব বাবু জানেন যে এইসব প্রেম পিরিতের ব্যাপার গুলোকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া ভালো।তাই সাত তাড়াতাড়ি ঘটক লাগিয়ে পাত্রী খুঁজে বিয়ের দিনক্ষণ পাকা করে ফেললেন।তিনি নিজে ছেলেকে সাথে করে মেয়ে দেখে এলেন।এবং দেখে আশ্বস্ত হলেন যে এই মেয়ের রূপের কাছে পাপিয়া দাঁড়াতেই পারবেনা।সুপর্ণ ও রুপালীকে দেখে মুগ্ধ হল।এখন শুধু চারহাত এক হবার অপেক্ষা।কিন্তু মাঝখানে বাদ সাধল মেয়ের এক মামা।ভদ্রলোক নাকি জ্যোতিষ চর্চা করেন,কোষ্ঠী ঠিকুজী তে কিসব দোষ পাওয়া যাচ্ছে নাকি।বিয়েতে বাধা দেখা যাচ্ছে।ভৌমদোষ না কি যেন বলছিলেন উনি।
কিন্তু মেয়ের বাবার এসবে আবার বিশ্বাস নেই,তাই ব্যাপার টা ধামাচাপা পড়ে গেল।মামাবাবু ভদ্রলোকটি জ্যোতিষের দোহাই দিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু দীনেন ভুঁইয়ের কনুইয়ের খোঁচায় তাকে চুপ করে যেতে হল।যাইহোক শেষপর্যন্ত বিয়েটা সাব্যস্ত হয়েই গেল।ফাল্গুন মাসে একটা ভালো দিন পাওয়া গেল,যদিও ফাল্গুন আসতে এখনো অনেক দেরি এবং ভূদেব গরাই চাইছিলেন আরো তাড়াতাড়ি বিয়েটা দিতে।কিন্তু মেয়ের বাবা দীনেন ভুঁই বেঁকে বসলেন,তার বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা।হাতে সময় নিয়ে সব যোগাড়যন্ত্র করে বেশ ধুমধাম করেই মেয়ের বিয়ে দিতে চান দীনেন বাবু। 
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা
সেইমত দিনক্ষণ পাকা করে ভূদেব গরাই ছেলে কে সাথে করে বাড়ি ফিরলেন।যাক এইবার নিশ্চিন্ত,ছেলেটাও হয়তো আর কোনো গণ্ডগোল পাকাবেনা।ভালোয় ভালোয় এখন বিয়েটা চুকে গেলেই শান্তি।
*******
(১৪১৮ সাল,মাঘ মাস)
বিয়ের আর একমাস বাকি,বাড়িতে বিয়ের যোগাড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে।পাপিয়ার কথা সুপর্ণ ভুলতে বসেছিল প্রায়।এতোদিন ওর কোন খোঁজখবর ও নেয়নি সে।সময় ই বা কোথায়?সারাদিন দোকান সামলানোর ফাঁকে মোবাইলে হবু বউ রুপালীর সাথে কথা বলেই সময় কেটে যাচ্ছিল বেশ।নতুন জীবনের আনন্দে পুরনো ভালোবাসা কে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করতে চায়নি।
কিন্তু এমনই একদিন পাপিয়া আবার গ্রামে ফিরে এলো।শহরের ডাক্তারের চিকিৎসায় এখন সে পুরোপুরি সুস্থ।সকালে দোকানে যাবার সময় সুপর্ণ দেখল পাপিয়া কে।বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাপিয়া আগের মতই অপেক্ষা করছে সুপর্ণের জন্য।বরাবর সকাল বেলায় যখন সুপর্ণ দোকানে যেত তখন পাপিয়া এইভাবেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত।চোখের ইশারায় কথা হত,কখন কিভাবে কোথায় দেখা হবে তাও ইশারায় বলা হয়ে যেত।কিন্তু আজ সুপর্ণ পাপিয়া কে দেখে খুশি হতে পারলো না।যেন পাপিয়া এখন ফিরে না এলেই ভালো হত।চোখাচোখি হয়ে যেতে বড় অপ্রস্তুতে পড়ে গেল সুপর্ণ।
পাপিয়া এতো খবর কিছুই জানেনা,সুপর্ণ কে দেখে ওর চোখে মুখে খুশির ঝলক দেখা গেল।ইশারায় জানাল দুপুরে বাঁসবাগানে অপেক্ষা করবে সে,সুপর্ণ যেন অবশ্যই সেখানে আসে।
সুপর্ণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও জানাল সে যাবে।
সারাটাদিন দোকানে বড় অস্বস্তির সঙ্গে কাটল সুপর্নের।পাপিয়া এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ফিরে গেল।আরো কিছুদিন পরে ফিরলে কোন সমস্যাই থাকতো না।এখন কিভাবে সে সবকিছু ম্যানেজ করবে?
সারাদিন দোকানের কাজে কিছুতেই মন বসলো না ওর।কিভাবে যে পরিস্থিতি টা সামাল দেবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না সুপর্ণ।
********
দুপুরে বাড়িতে ফিরে খাওয়া দাওয়া করে নিতান্ত অনিচ্ছার সাথেই হারু ঘোষের বাঁসবাগানে গেল সুপর্ন।যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না মোটেই,কিন্তু পাপিয়া কে আর অন্ধকারে রাখা ঠিক হবেনা।সব কথা ওকে খুলে বলতেই হবে।বাঁসবাগানের মধ্যে বড় নিমগাছটার তলায় বসে পাপিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল সুপর্ন,পাপিয়া খানিক পরেই লুকিয়ে লুকিয়ে এল।এতোদিন পর সুপর্ণ কে দেখে পাপিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।ছুটে এসে সুপর্ণ কে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।সুপর্ণ কিছুক্ষনের জন্য কাঁদতে দিল ওকে।মনেমনে ঠিক করে নিল কিভাবে কথাটা বলবে পাপিয়াকে।এতোবড় নিষ্ঠুর সত্যটা কিভাবে জানাবে এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে।পাপিয়া একটু ধাতস্থ হতেই সুপর্ণ ওকে সমস্ত ব্যাপার টা খুলে বলল।ওর বিয়ে ঠিক হওয়া থেকে শুরু করে বাড়ির সবার অমতে সে যে পাপিয়া কে কিছুতেই বিয়ে করতে পারবেনা তাও বললো।
পাপিয়া প্রচন্ড আঘাত পেলো সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।কিন্তু ওর মধ্যে সুপর্ণের কথার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলোনা।চুপচাপ জলভরা চোখ নিয়ে সব শুনে গেল পাপিয়া।
সুপর্ণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল,পাপিয়ার চোখে চোখ রাখার হিম্মত ওর ছিলনা।
পাপিয়া অবাক হয়ে কিছুক্ষণ সুপর্ণের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর চোখ মুছে বলল "তোমরা সব ছেলেরা একইরকম,মেয়েদের কি মনে কর তোমরা?খেলার পুতুল?যখন খুশি যেভাবে খুশি আমাদের নিয়ে খেলবে আর খেলা ফুরালে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।"
সুপর্ণ আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিল,কিন্তু পাপিয়া ওকে থামিয়ে দিল।
"থাক,আর কিছু বলতে হবেনা তোমাকে।আজ আমিও এসেছিলাম তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে।কিন্তু তুমি দেখছি তার যোগ্যই নও।আর পাঁচটা ছেলের মত তুমিও মেয়েদের মন নিয়ে খেলে আনন্দ পাও।"
বলে ফিরে যাচ্ছিল পাপিয়া,কিন্তু কি মনে করে আবার ফিরে এল।বলল "তুমি কি জানো আমার সাথে কি হয়েছিল?দিদির বাড়িতে গিয়ে নিজের জামাইবাবুর হাতে ধর্ষিত হয়েছি।দিদির ভবিষ্যতের কথা ভেবে কারোকে সেকথা বলতে পারিনি।ভেবেছিলাম তুমি অন্তত আমার যন্ত্রণা বুঝবে।কিন্তু আমার জামাইবাবুতে আর তোমাতে তফাৎ কোথায়??"
কথাগুলো বলেই আবার ডুকরে কেঁদে উঠল পাপিয়া,তারপর ছুটতে ছুটতে চলে গেল বাড়ির দিকে।অপমানে আর বিস্ময়ে বজ্রাহতের মত দাঁড়িয়ে রইল সুপর্ণ।
*******
(১৪১৮ সাল,৭ই মাঘ)
নাহ পাপিয়া কে বাঁচানো সম্ভব হয়নি,এতোটা বিষ খেলে কেউই বাঁচতে পারেনা।দুপুরবেলা খাওয়া দাওয়ার পর চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে বিষ খেয়েছিল পাপিয়া।কদিন ধরেই বড় চুপচাপ হয়ে গেছিল মেয়েটা।বাড়ির লোক ভয় পাচ্ছিল মাথার গোলমাল টা পাছে আবার শুরু হল।কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটা সবার চোখে ফাঁকি দিয়ে এতোবড় কান্ডটা ঘটিয়ে ফেলল।চাষিবাসি ঘর,ক্ষেতের ফসলের জন্য ওষুধ বিষ এসব বাড়িতেই মজুত থাকে।তারমধ্যে থেকে বিষ নিয়ে ও যে এমন কান্ডটা ঘটাবে কেউ বুঝতেও পারেনি।বিকেলে পাপিয়ার মা পাপিয়া কে ডাকতে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরে ওকে অচৈতন্য অবস্থায় আবিষ্কার করেন।মুখ দিয়ে তখন গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে।লোকজন ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ হয়ে গেল।কেউ জানলো না কত বড় যন্ত্রণা নিয়ে মরলো মেয়েটা।পাড়ার সবাই বলাবলি করতে লাগল মাথার গোলমালের জন্যই পাপিয়া সুইসাইড করেছে।আর এই কথাটি রটানোর পিছনে সবথেকে বড় ভূমিকা ছিল সুপর্ণের বৌদির।কথায় বলেনা 'মেয়েরাই মেয়েদের সবথেকে বড় শত্রু।'
**********
পাপিয়ার মৃত্যু যেমন নিঃশব্দে এসেছিল তেমনি নিঃশব্দে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে গেল।গ্রামের মহিলারা কিছুদিন পাপিয়াকে নিজেদের চর্চার মধ্যে রেখেছিলেন অবশ্য,কিন্তু সেই চর্চাতেও ধীরেধীরে ভাঁটা পড়ে গেল।গ্রামে কেচ্ছা কেলেংকারির তো অভাব নেই,একই বিষয় নিয়ে কতদিন আর জাবর কাটা যায়।
****
সুপর্ণের মনের অবস্থা ভালো ছিলনা।বারবার চেষ্টা করেও পাপিয়া কে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলনা সে।ও যে এইভাবে আত্মহত্যা করবে এটা সুপর্ণের কল্পনাতেও ছিলনা।বাড়ির নিষেধ সত্বেও সে শ্মশানে গিয়েছিল।তার অপরাধবোধ টেনে নিয়ে গিয়েছিল তাকে।নিষ্পাপ মেয়েটিকে সে এতো বড় আঘাত দিয়ে ফেলল।এই মৃত্যুর জন্য সে নিজেও কি দায়ী নয়?যে কঠিন সময়ে পাপিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্তনা দেওয়ার কথা,তখন সুপর্ণ তাকে ছেড়ে অন্য মেয়ের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছিল।দুঃখী মেয়েটা তার সবকিছু উজাড় করে ভালোবেসেছিল সুপর্ণ কে।দিদির বাড়িতে চরম আঘাত আর অপমান পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল,সুস্থ হয়েই তার কাছে ছুটে এসেছিলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।আর সুপর্ণ কিনা তাকে সেই মুহুর্তে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দিল।ও ছিল পাপিয়ার শেষ আশ্রয়,একবুক আশা নিয়ে এসেছিল মেয়েটা।ভেবেছিল আর কেউ না বুঝুক সুপর্ণ অন্তত তার যন্ত্রণা টা বুঝবে।কিন্তু সুপর্ণের কাছ থেকে যে আঘাত টা ও পেল,তা কি কোন অংশে কম ছিল।
নিজের মনের মধ্যে হাজার একটা যুক্তি সাজিয়েও সুপর্ণ নিজেকে ক্ষমা করে উঠতে পারছিল না।জ্বলন্ত চিতার সামনে বসে বারবার তার মনে হচ্ছিল হয়তো পাপিয়ার কথাই ঠিক।ওর জামাইবাবু ওর সতীত্ব নষ্ট করেছে,আর ও নিজে কি করেনি?ভালোবাসার নামে ও নিজেও তো পাপিয়ার শরীর ভোগ করেছে।বাবা মার ভয়ে ভালোবাসাকে ত্যাগ করে যে,সেই বা কোন মহাপুরুষ??মনে মনে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হচ্ছিল সুপর্ণ।
ওদিকে অনেক লোক শ্মশানে জড় হয়েছে,পাপিয়ার সেই জামাইবাবু ও এসেছে।একমুখ পান নিয়ে চিবোতে চিবোতে মড়া পোড়ানোর তদারক করছিল জানোয়ার টা।
কাঁচা বাঁসের লাঠি দিয়ে দমাস করে চিতার উপর একটা ঘা মেরে পাপিয়ার জামাইবাবু উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশ্যে বলল "আত্মহত্যা মহাপাপ,বুঝলেন কিনা,এইযে আমরা এই মড়া পোড়াচ্ছি এতে করে সেই পাপ আমাদের উপরেও বর্তাচ্ছে।"
সুপর্ণ জ্বলন্ত চোখে লোকটার দিকে তাকাল,ইচ্ছে করছে জানোয়ারটাকে ধরে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিতে,কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।মানুষের চোখে ওতো নির্দোষ।আর তাছাড়া যে অন্যায় ও করেছে তার আর প্রমাণ রইলো কই?যে নির্যাতিত সেই এখন চিতায় পুড়ছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চিতার আগুনের দিকে মনোযোগ দিল সুপর্ণ।মহাপাপ ই বটে,একজন নিষ্পাপ মেয়েকে নরকযন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া মহাপাপ তো বটেই।সে নিজেও এই মহাপাপের ভাগী।মনে মনে পাপিয়ার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল সুপর্ণ।তার চোখের জল শ্মশানের হট্টগোলে কেউ লক্ষ্য করলো না।
হাতজোড় করে সবার অলক্ষ্যে সে ভগবানের উদ্দেশ্যে বলল "ভগবান,এই পাপের তুমি সাজা দিও।এই ভয়ংকর অপরাধের যেন ক্ষমা না হয়"
ভগবান সেদিন হয়তো অলক্ষ্যে হেসেছিলেন।
*******
(১৪১৮ সাল,২২ই চৈত্র)
ফাল্গুনের ১০ তারিখে খুব ধুমধাম করেই সুপর্নের সাথে রুপালীর বিয়েটা হয়ে গেল।ভূদেব গরাই তার ছোট ছেলের বিয়েতে কার্পণ্য করেন নি কোনদিকেই।গ্রামের সবাই একবাক্যে স্বীকার করল যে হ্যাঁ একখানা বিয়ে হল বটে,এরকম আয়োজন সচরাচর দেখা যায়না।
বিয়ের গোলমাল মিটে যাবার পর একদিন রাত্রে দোকান বন্ধ করে ফিরছিল সুপর্ণ।ঘরে নতুন বউ অপেক্ষা করছে,তাই বাড়ি ফেরার সময় হাঁটার জোর বেড়ে যাচ্ছিল তার।হরিমন্দিরের কাছে বাঁক টার মুখে ঘুরতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল।সামনেই পাপিয়াদের বাড়ি,ওদের বাড়িটা আগেকার আমলের চুনসুরকির তৈরি।মূল বাড়িটা একটু ভিতর দিকে,বাইরে রাস্তার দিকে একটা বৈঠকখানা।আর সেই বৈঠকখানা বাড়ির রাস্তার দিকের বারান্দায় বাঁসের খুঁটিতে হেলান দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল।পাপিয়া ও এভাবেই বাঁসের খুঁটিটায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত প্রতিদিন।রাস্তায় ইলেকট্রিক পোলে লাইট জ্বলছে,কিন্তু পাপিয়াদের বারান্দার ওখান টা বেশ অন্ধকার।সেই অন্ধকারের মধ্যে আরো খানিক টা জমাট অন্ধকার যেন মানুষের মুর্তি ধরে দাঁড়িয়ে আছে।আতংকে দরদর করে ঘামছিল সুপর্ণ,একপাও এগোনোর ক্ষমতা তখন আর অবশিষ্ট নেই।কিছুক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকার পর পর পিছন থেকে লোকজনের আওয়াজ পাওয়া গেল।গ্রামের কয়েকজন লোক বাজার থেকেই ফিরছিল,সুপর্ণ কে রাস্তায় ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল।সুপর্ণ সবকথা খুলে বলতে তারা টর্চ মেরে দেখল,কিন্তু বারান্দাটাতে কারোকে দেখা গেল না।ওরা হাসাহাসি করল সুপর্ণ কে ভয় পেতে দেখে।তারপর ওকে সাথে করে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল।
বাড়ি ফিরেও সুপর্ণের মন থেকে আতংক টা যাচ্ছিল না।ভাগ্যভালো লোকগুলো বাড়িতে ওর ভয় পাওয়ার কথা টা বলে দেয়নি।নাহলে ওটা নিয়ে আবার ফালতু ঝামেলা হত।কোনরকমে চারটি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল সুপর্ণ।ও যা দেখেছে তা কোনভাবেই চোখের ভুল নয়।ওইভাবে ওই ভঙ্গিতে পাপিয়াই দাঁড়িয়ে থাকত।কিন্তু তাই বা কিভাবে সম্ভব!
বারবার পাপিয়ার মুখ টা সুপর্ণের চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।নতুন বউ ওদিকে ঘুমিয়ে কাদা।সুপর্ণ বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিল।ঘুম আসছেনা কিছুতেই,কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।
প্রায় সারারাত না ঘুমিয়ে ভোরের দিকে চোখটা একটু লেগেছিল।সকালে একটা হই হট্টগোলে ঘুম টা ভেঙে গেল।তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে বেরিয়ে এল সুপর্ণ।ওর বাবা ভূদেব গরাই হন্তদন্ত হয়ে কোথাও বেরুচ্ছিলেন,সুপর্ণ কে দেখে বললেন "তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে দোকানে চলে যাও।কাল রাতে খাঁদু মন্ডল গলায় দড়ি দিয়েছে,আমি সেখানেই যাচ্ছি।"
সুপর্ণ ভীষণ ভাবে চমকে উঠল।খাঁদু মন্ডল তো পাপিয়ার বাবা,সে হঠাৎ গলায় দড়ি নিল কেন?
***********
(১৪১৯ সাল)
সুপর্ণের বিয়ের প্রায় একবছর পূর্ণ হতে চলল।বউটার শরীর টা দিন দিন ভেঙে যাচ্ছে।অনেক ডাক্তার দেখানো হল,কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি।কিছুদিন আগেই ভেলোর থেকে ফিরে এল কিন্তু ওখানের ডাক্তারেরাও কোন রোগ খুঁজে পায়নি।সমস্তরকম টেস্ট করানো হয়েছে,কিন্তু সবকিছু নর্মাল।সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি।
অথচ দিনের পর দিন রুপালীর শরীরটা শুকিয়ে যাচ্ছে,দুর্বল হয়ে পড়ছে।ডাক্তারের কাছে কোন সুবিধা না হওয়ায় কিছুদিন কবিরাজের কাছে আয়ুর্বেদিক ওষুধ খাওয়ানো হল।এলাকার বাঘা বাঘা কবিরাজ তাদের জড়িবুটি পাঁচন সালসা নিয়ে আসরে নেমে পড়লেন।কিন্তু তাতেও কোন কাজের কাজ হলনা।শেষে যা হয়,গ্রামের কিছু বিচক্ষণ মহিলা রায় দিলেন যে এসব ডাক্তার বদ্যির কম্ম নয়।এ নিশ্চয় কেউ তুকতাক করেছে,মারণ বাণ মেরে বউটিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে কেউ।
সুপর্ণের মা আর বৌদি মিলে কিছুদিন অদৃশ্য শত্রু এবং তান্ত্রিকের উদ্দেশ্যে গাল পাড়লেন।তন্ত্রের পালটা হিসাবে আরো অনেক তান্ত্রিক আর ওঝার আমদানি হল।তারা তাদের বিচিত্র কান্ড কারখানা আর অদ্ভুত সব নিদান দিয়ে কিছুদিন অনেক চেষ্টা চালাল।কিন্তু তাতে লাভ কিছুই হলনা।শেষে এক সাধুবাবার মাদুলি ধারণ করে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল।ধীরে ধীরে সবকিছু আবার ছন্দে ফিরছিল,সেইসময় হঠাৎ একদিন জানা গেল সুপর্ণের বউ রুপালি সন্তানসম্ভবা হয়েছে।এতোদিনের নানান কষ্ট যন্ত্রণার স্মৃতি সব মুছে গেল বাড়িতে নতুন অতিথি আসার সুসংবাদে।বাড়িতে আবার উৎসবের পরিবেশ তৈরি হল।নতুন অতিথির আগমন সংবাদ শুনে ভূদেব গরাই বাড়িতে হরিনাম সংকীর্তন করালেন।গ্রামসুদ্ধ লোক কে পাত পেড়ে খাওয়ালেন।কিছু নিন্দুক লোক ছাড়া প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করল এরকম আয়োজন তারা কখনো দেখেনি।
যথাসময়ে সুপর্ণের বউ একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল।সুন্দর ফুটফুটে ছেলে,দুঃখের বিষয় যে ছেলেটির জন্মগত ভাবেই উপরের ঠোট টি কাটা।তবে ডাক্তার বাবু বলেছেন যে ওটা আজকাল কোন সমস্যাই নয়।প্লাস্টিক সার্জারি করে এরকম সমস্যা একশো শতাংশ নির্মূল করা যায়।
ভূদেব গরাই দু ভরির একটা সোনার হার দিয়ে নাতির মুখ দেখলেন।তার বড়ছেলে সৌরভের একটি মাত্র মেয়ে।তাই সুপর্ণের ছেলেই তার একমাত্র বংশধর।তাই নাতির খাতিরে আবার ভোজের আয়োজন শুরু হল।বৌমাকে নার্সিংহোম থেকে বাড়িতে নিয়ে এলেন।বাড়িতেই আয়া রেখে প্রসূতি এবং নবজাতকের পরিচর্যা শুরু হল।
ভূদেব গরাই নাতির আনন্দে যেন নতুন যৌবন ফিরে পেলেন।সারাদিন তার নাতির জন্য এটা সেটা যোগাড় করেই কাটতে লাগল।
কষ্টের কথা গুলো




~অভিমান~~~~~
(দ্বিতীয় পর্ব)
......বিক্রমজিৎ মিশ্র......
দেখতে দেখতে সুপর্ণের ছেলের বয়স তিনমাস হয়ে গেল।ছেলে হবার পর রুপালী একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিল বটে কিন্তু এখন আবার সব স্বাভাবিক।সারাদিন দোকান সামলে দুপুরে এবং রাত্রে বাড়িতে ফিরে সুপর্ণ ছেলে এবং বউ কে একটু সময় দিতে পারে।এই নিয়ে বউয়ের সাথে মাঝে মাঝে মিষ্টি ঝগড়া ছাড়া আর কোনো অশান্তি নেই ওদের জীবনে।দিনগুলো বেশ হেসেখেলেই কেটে যাচ্ছিল,কিন্তু হঠাৎ একদিন ওদের শান্তিপূর্ণ জীবনেও অশান্তির কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠল।
একদিন সন্ধ্যে বেলায় রুপালি নিজের ঘরে বসে ছেলেকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে টিভি তে একটা বাংলা সিরিয়াল দেখছিল।হঠাৎ একটা তীব্র যন্ত্রনায় ওর পুরো শরীর টা কেঁপে উঠল।বাচ্চাটা দুধ খেতে খেতে ওর স্তনবৃন্তে কামড় বসিয়ে দিয়েছে।বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রুপালী ভয়ে চিৎকার করে উঠল,ছোট্ট দুহাতে ওর বুক খামচে ধরে বাচ্চাটা যেন ভীষণ আক্রোশে কামড় বসিয়েছে!
জোর করে ওকে ছাড়িয়ে দিতেই ওই একরত্তি বাচ্চাটা গর্জন করে উঠল।জ্বলন্ত চোখ মেলে তাকাল রুপালীর দিকে!!
ওই চোখের দৃষ্টি বেশিক্ষন সহ্য করতে পারলো না রুপালী।চিৎকার করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই বাচ্চা টা কেঁদে উঠল।নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিল না রুপালী।একটু আগেই বাচ্চাটার যে রূপ সে দেখেছে তা কি আদৌ সত্যি ছিল নাকি ও ভুল দেখল।কিন্তু ওর ভুল ভেঙে গেল বুকের কাছে চিনচিনে ব্যাথাটার জন্য।বুকের কাপড় সরিয়ে দেখল স্তনবৃন্তের দুপাশে স্পষ্ট দাঁতের দাগ,কয়েক জায়গায় কেটে গিয়ে রক্ত ফুটে বেরিয়েছে।বাচ্চাটা কেমন অদ্ভুত ভাবে জিভ বের করে উপরের ঠোট টা চাটার চেষ্টা করছিল।রুপালি লক্ষ্য করল বাচ্চাটার উপরের ঠোটের কাটা অংশটির ওপরে একফোঁটা রক্ত লেগে আছে।আর বাচ্চাটি কাঁদতে কাঁদতে সেই কাটা ঠোটের মধ্যে দিয়ে জিভটাকে বের করে ওই রক্তের ফোঁটাটিকে চাটার চেষ্টা করছে!!
ভয়ে আতংকে দরদর করে ঘামছিল রুপালী।ওদিকে বাচ্চাটা কেঁদেই চলেছে,ভয়ের চোটে রুপালী বুঝতে পারছিল না কি করবে।বাচ্চাটা সমানে কাঁদছে,ওকে কোলে নিয়ে ভোলাবার সাহসটুকু পর্যন্ত তখন আর অবশিষ্ট নেই।চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শুনে ওর শাশুড়ি আর বড় জা ছুটে এলেন।ওদের সমস্ত কথা খুলে বলতে ওরা হেসে উঠলেন।শাশুড়ি বললেন "একা ঘরে কোনভাবে ভয় পেয়েছ হয়তো।আর বাচ্চারা এরকম করেই।ওইটুকু বাচ্চা দাঁত পাবে কোথায় যে কামড়াবে?মাড়ি দিয়ে চেপে ধরেছিল হয়তো।"
রুপালী বুকের আঁচল সরিয়ে দাঁতের দাগ দেখাতে গিয়ে দেখল সেই দাগ গুলো আর নেই।একটু ফুলে আছে শুধু,তবে কয়েক জায়গায় কেটে রক্ত ফুটে উঠছিল তখনো।শাশুড়ি গম্ভীর মুখে বিষয় টা লক্ষ্য করলেন।দাঁতের দাগ নেই তাহলে রক্ত বেরোল কি করে!!
সমস্যার সমাধান করে দিল বড় বউ,বলল "নোখে করে আঁচড়ে দিয়েছে হয়তো,আমার পুতুল ও কতবার ওরম আঁচড়ে দিয়েছে আমাকে।"
শাশুড়ি গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন "বউমা তুমি কি সন্ধ্যে বেলায় চুল খুলে ছাতে গিয়েছিলে?"
রুপালী জানাল সে সকালের পর আর ছাতে ওঠেই নি।শাশুড়ি বললেন "আচ্ছা তোমার শশুর ফিরুক,গোবিন্দ ওঝাকে ডেকে একবার ঝাড়িয়ে নিতে হবে।"
বড়বউ কে নিয়ে শাশুড়ি তখনকার মত চলে গেলেন।রুপালি ছেলে নিয়ে ঘরের মধ্যে একা বসে রইল।এতোক্ষণে ছেলেটা চুপ করেছে,একটু ভয়ে ভয়েই ছেলেকে কোলে তুলে নিল রুপালি।নাহ ছেলের মধ্যে আর সেই ভয়ংকর ব্যাপার টা নেই।ঠোটের উপরে সেই রক্তের ফোঁটাটিও আর নেই।মনে মনে চিন্তা করল রুপালি,ও নিশ্চয় ভুল দেখেছে।এরকম কি কখনো হতে পারে,এইটুকু শিশু যে মা ছাড়া কিছুই বোঝেনা সে কি কখনো এরকম করতে পারে।নাহ ও নিশ্চই ভুল দেখেছে।কেঁদে কেঁদে একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বাচ্চাটা।কোলে নেওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যে ও ঘুমিয়ে পড়ল।
***************
(১৪২০ সাল)
ওই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে,আর কোন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি রুপালীর।
দেখতে দেখতে বাচ্চাটির বয়েস ছয়মাস হয়ে গেল।অন্নপ্রাশনের দিন ঠিক হল,এবার বাচ্চার মুখে ভাত হবে।ভূদেব বাবু যথারীতি আয়োজনের কোন ত্রুটি রাখলেন না।গোটা গ্রাম কে নিমন্ত্রন করলেন তার একমাত্র নাতির অন্নপ্রাশনে।আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবে আবার বাড়ি ভরে উঠল।
অন্নপ্রাশনের দিন ওদের নিয়ম হল গ্রামের কুলদেবতা মহাকাল ভৈরবের থানে পূজা দিয়ে বাবা ভৈরবের ভোগ মনুই(দুধ এবং গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস) খাইয়ে বাচ্চাদের মুখেভাত দেওয়া হয়।তারপর বাড়িতে এনে ডাল ভাত তরকারি মাছ পায়েস মিষ্টি ইত্যাদি থালায় সাজিয়ে সামনে রাখা হয়।এরপর বাচ্চার মামা বাচ্চাটির মুখে সামান্য ভাত ছুঁইয়ে দেয়।ব্যাস হয়ে গেল মুখে ভাত।
কিন্তু সমস্যা শুরু হল বাচ্চাটাকে মহাকালের থানে নিয়ে যাবার পর।মহাকালের থান গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে নদীর পাড়ে।এক বিরাট বটগাছের নিচে বাবা মহাকালের শায়িত মূর্তি যুগ যুগ ধরে পূজা পেয়ে আসছে।গাছের গোড়াতে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো কিছুটা জায়গায় বাবার থান।গ্রামে জনশ্রুতি আছে যে বাবা মহাকাল খোলা জায়গাতেই থাকতে চান,তাই মন্দির বানানো হয়নি।ছায়ায় ঘেরা চমৎকার জায়গা,গ্রামের যেকোনো শুভকাজে আগে এখানে এসে পূজা দিয়ে বাবার আশীর্বাদ নিয়ে তারপর বাড়িতে যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান করা হয়।
অন্নপ্রাশনের দিন সকাল বেলায় ভূদেব গরাই সপরিবারে এসে উপস্থিত হলেন বাবা মহাকালের থানে।পূজার আয়োজন করছিল সবাই মিলে,কিন্তু তখনি সুপর্ণের ছেলে কাঁদতে শুরু করল।সে এমন কান্না জুড়ল যে কিছুতেই তাকে ভোলানো যায়না।রুপালী বাচ্চাটাকে আঁচলে ঢেকে মহাকালের থানের একদিকে আড়ালে বসে দুধ খাওয়াতে গেল।কিন্তু ওইটুকু বাচ্চা এমন হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে লাগল যে কিছুতেই তাকে কোলে রাখা যায়না।জোর করে চেপে ধরে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতেই বাচ্চাটা খেপে গিয়ে কামড় বসাল রুপালীর স্তনে।অত লোকের সামনে লজ্জায় চিৎকার ও করতে পারলো না বেচারি।দাঁতে দাঁত চেপে সেই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে কোনরকমে বাচ্চাটার মুখ থেকে স্তন ছাড়িয়ে নিয়ে দেখল বাচ্চাটার গোটা মুখ রক্তে ভর্তি হয়ে গেছে।কোনরকমে কাপড় সামলে বাচ্চাটাকে চাতালে শুইয়ে দিয়েই ছুটে গেল থানের সামনে।সেখানে ওর ননদ আর শাশুড়ি পূজার যোগাড় করছিল।ওদের সবকথা বলতে বলতেই অসহ্য যন্ত্রণায় মাটিতে বসে পড়ল রুপালী।ওদিকে বাচ্চাটা ভীষণ চিৎকার করে কেঁদেই চলেছে।আছাড়িপিছাড়ি দিয়ে এমন কাঁদছে যে সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না।ওর শাশুড়ি আর ননদ তখন তাড়াতাড়ি রুপালী কে ঘিরে বসে উপস্থিত পুরুষ মানুষদের একটু দূরে চলে যেতে অনুরোধ করলেন।যারা ছিল তারা ভীষণ অবাক হল,কিন্তু কোন মেয়েলি সমস্যা ভেবে তারা ওখান থেকে দূরে সরেও গেল।
ভূদেব গরাই বাচ্চাটার কান্না শুনে বিরক্ত হয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে দুরের একটা নিম গাছের তলায় গিয়ে বসলেন।বউমার কি হয়েছে তা উনি জানেন না,শুভকাজের মুহুর্তে যত্তসব ঝামেলা।বাচ্চাটা এবার ধীরেধীরে একটু শান্ত হল।দূর থেকে তিনি লক্ষ্য করলেন তার স্ত্রী এবং মেয়েরা বউমাকে আড়াল করে কিছু একটা করছে।কি জানি কি হয়েছে।কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর যখন বাচ্চাটা পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেল তখন তিনি আবার মহাকালের থানের দিকে এগোলেন,কিন্তু বটতলায় পৌঁছানোর আগেই বাচ্চাটা আবার তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে কান্না শুরু করল।কিছুতেই কোলে রাখা যায়না,কোনরকমে বাচ্চাটাকে সামলে যখন বটতলায় পৌঁছালেন তখন ওর কান্না চরমে উঠল।ওদিকে পূজা শুরু হয়ে গেছে,এরকম কান্না চলতে থাকলে পূজার বিঘ্ন হবে।বাচ্চাটাকে অনেক চেষ্টা করেও ভোলানো গেলনা।কাঁদতে কাঁদতে ওর টানখাঁচ শুরু হয়ে গেল,এতো মহা সমস্যা।ভূদেব বাবু বিরক্ত হয়ে স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে ঠিক করলেন এখানে পূজা যেমন হচ্ছে হোক,ওনারা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাড়িতেই ফিরে যাবেন।বাড়িতেই অনুষ্ঠানের বাকি কাজ গুলো হবে।সেইমতো নাতিকে সঙ্গে করে ভূদেব বাবু এবং তার স্ত্রী বাড়ি ফিরে চললেন।বাকিরা সবাই মহাকালের থানেই থেকে গেল পূজা সম্পন্ন করার জন্য।ভূদেব বাবুর স্ত্রী রাস্তায় যেতে যেতে সমস্ত কথা তার স্বামী কে খুলে বললেন।কিন্তু ভূদেব বাবু ব্যাপার টা বিশ্বাস করলেন না।মেয়েদের সব ব্যাপারেই সন্দেহ,একটা ছোট্ট শিশুকে অস্বাভাবিক মনে করে ভয় পাচ্ছে।মহাকালের এলাকা পেরিয়ে কিছুটা এগোতেই বাচ্চাটা আবার কান্না থামিয়ে চুপ হয়ে গেল।দুজনে বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতে লাগলেন,সবাই ফিরলে মুখেভাতের অনুষ্ঠান শুরু হবে।
*******
পূজা নির্বিঘ্নে মিটে যাবার পর সবাই ফিরে এল,বিরাট পিতলের হাঁড়িতে বাবা মহাকাল ভৈরবের পায়েস ভোগ আনা হয়েছে।বাড়ি একেবারে সরগরম হয়ে উঠল।একটু পরেই নিমন্ত্রিতরা আসতে শুরু করবেন।ওদিকে রাঁধুনিদের রান্নাও হয়ে এল প্রায়।মুখেভাতের অনুষ্ঠান মিটে গেলেই নিমন্ত্রিতরা খেতে বসবেন।
ঘরের ভিতর এক জায়গায় আসন পেতে বড় কাঁসার থালায় ভাত ভাজাভুজি তরকারি ইত্যাদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে,কাঁসার বাটিতে মাছের ঝোল আর এই এতোবড় একটা মাছের মুড়ো আর কাঁসার গেলাসে জল ও দেওয়া হয়েছে।সুপর্ণ ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটার ভিডিও তুলে রাখছিল।যথারীতি বাচ্চাটির মামা ভাগ্নে কে কোলে নিয়ে আসনে বসে পড়ল।এইবার ভূদেব বাবুর গুরুদেব ধান দূর্বা দিয়ে বাচ্চাটিকে আশীর্বাদ করে স্বস্তিবাচন পাঠ করলেন।প্রথমে বাবা মহাকাল ভৈরবের প্রসাদ পায়েস খাওয়ানো নিয়ম,ভূদেব বাবু একটা রুপোর বাটিতে করে সেই প্রসাদ নিয়ে এসে সামনে নামিয়ে দিলেন।রুপোর চামচে করে সেই প্রসাদ খাওয়াতে যেতেই বাচ্চাটি চিৎকার করে উঠে এক ধাক্কায় তার মামার হাত থেকে পায়েসের বাটি ছিটকে ফেলে দিল।তারপর ভীষন গর্জন করে মামার কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে সাজানো ভাতের থালার উপর!!
ছোট্ট ছোট্ট দুইহাতে ভাত তরকারি তুলে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল বাচ্চাটা।এরকম অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটতে দেখে উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন কিছুক্ষনের জন্য।
এও কি সম্ভব!!
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
বাচ্চাটির মামা হতভম্ব হয়ে গেছিল এরকম অদ্ভুত কান্ড দেখে,তাড়াতাড়ি বাচ্চাটিকে খাবারের থালা থেকে তুলতে যেতেই বাচ্চাটি প্রচন্ড ঝাপটায় তাকে সরিয়ে দিল।তারপর আবার দুহাতে সব টেনে খেতে শুরু করল।দেখতে দেখতে থালা ভর্তি ভাত তরকারি খেয়ে শেষ করে দিল ওই ছমাসের পুঁচকে টা।বাচ্চাটির মামা ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে গেছিল,দ্বিতীয় বার ভাগ্নে কে ধরে সরিয়ে দেবার সাহস ও তখন আর অবশিষ্ট নেই। 
ভালবাসার কষ্টের ছবি
ভাত তরকারি শেষ করে মাছের বাটির দিকে হাত বাড়াতেই রুপালী ছুটে এসে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিল।রীতিমত শোরগোল পড়ে গেল বাড়িতে
এরকম তো কখনো শোনা যায়নি,ছমাসের ছেলে কিভাবে এই কান্ড ঘটাতে পারে।
ভূদেব বাবুও এবার চিন্তায় পড়ে গেলেন,স্ত্রীর কথাটা কথা তখন তিনি বিশ্বাস করেন নি।কিন্তু এখন নিজের চোখে যা দেখলেন তা অবিশ্বাস করেন কি করে।তারা এতোগুলো মানুষ তো আর একসাথে ভুল দেখতে পারেন না।বাচ্চাটির মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু কি সত্যিই আছে!!
যাকে নিয়ে এতো শোরগোল সে তখন রুপালীর কোলে বসে জিভ বের করে ঠোট চাটতে চাটতে সবার দিকে কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছিল।ঘরের ভিতর আর তিল ধারনের জায়গা নেই,এরকম অদ্ভুত ঘটনার খবর পেয়ে নিমন্ত্রিতরা সবাই এসে ভীড় জমিয়েছে ঘরের ভিতর।কারোকে কিছু বলাও যাচ্ছেনা।সবাই ঘটনাটি নিজের চোখে দেখতে চায়।
****
ভূদেব বাবু ধীরেধীরে ভীড় সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন,দেখাদেখি ওনার স্ত্রী ও স্বামীর পিছন পিছন বেরিয়ে এলেন।বাইরে একটা চেয়ারে উদ্বিগ্ন মুখে বসেছিলেন কুলগুরু গোপাল অধিকারী।উনিও ঘটনাটি নিজের চোখে দেখেছেন,ঘরের মধ্যে ভীড় বাড়তে শুরু করায় বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন।ভূদেব বাবুর স্ত্রী গুরুদেবের পা ধরে কাঁদতে শুরু করলেন।এরকম অনাসৃষ্টি কান্ড ঘটতে দেখে গুরুদেব ও যথেষ্ট আতংকিত হয়েছিলেন।ওদের সান্তনা দেবার ভাষা তার ও জানা নেই।
কোনরকমে তাকে সামলে গুরুদেব বললেন
"বাবা ভূদেব,বহু বহু অদ্ভুত ব্যাপার দেখেছি কিন্তু এরকম কখনো দেখিনি।বাচ্চাটির উপর নিশ্চয় কারোর নজর লেগেছে।তোমরা শীঘ্র এর প্রতিকার করাও।"
ভূদেব বাবুর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে প্রথম থেকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন।সবশুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন গুরুদেব।বললেন "এসব কথা এতোদিন জানাওনি কেন?এতো সাংঘাতিক ব্যাপার!"
ভূদেব বাবু হাতজোড় করে বললেন "গুরুদেব সব দোষ আমার,আমিই এসবে বিশ্বাস করিনি।ভেবেছিলাম মেয়েরা কি দেখতে কি দেখেছে,শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছে হয়তো।"
গুরুদেব সবশুনে রায় দিলেন হাটজোড় গ্রামের কালীসাধক তান্ত্রিক বিরিঞ্চি মুখুটির সাথে যোগাযোগ করতে।এইসব সমস্যায় একমাত্র বিরিঞ্চি মুখুটিই নাকি সাহায্য করতে পারেন।আশেপাশের এলাকায় তান্ত্রিক হিসাবে তার নাম ডাক খুব,ভুত প্রেত নিয়েই তার কারবার।
ভূদেব বাবু ঠিক করলেন মুখেভাতের অনুষ্ঠান মিটে গেলেই সপরিবারে হাটজোড় গ্রামে যাবেন।
******
হাটজোড় গ্রামের শ্মশানকালীর মন্দিরে বিরিঞ্চি মুখুটির সাধনপীঠ।জটাজুটধারী রক্তাম্বর পরিহিত বিরিঞ্চি তান্ত্রিকের চেহারা দেখলে ভয় ভক্তি দুটোই হয়।শনিবার সকালের দিকে তিনি সাধনপীঠে বসে ভক্তদের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনে প্রয়োজনমত মারণ উচাটন বশীকরণ ইত্যাদি করে থাকেন।
এরকমই এক শনিবারে ভূদেব বাবু সস্ত্রীক বিরিঞ্চি বাবার থানে এসে উপস্থিত হলেন।
সব শুনে টুনে বিরিঞ্চি বাবা নিদান দিলেন যে নিশ্চই ওই বাচ্চাটির চন্ডাল যোগে জন্ম হয়েছে।তাই মা চণ্ডালী কে সন্তুষ্ট করার জন্য চন্ডাল যজ্ঞ করতে হবে।নধর দুটি পাঁঠা বলি দিতে হবে এবং মন্দিরের দেবীমূর্তির জন্য সোনার চোখ দান করতে হবে।ভূদেব গরাইয়ের টাকার অভাব নেই,তিনি চন্ডাল যজ্ঞের জন্য রাজি হয়ে গেলেন।যজ্ঞের দিনক্ষণ ঠিক করে বিরিঞ্চি বাবাকে প্রণাম করে তারা বাড়ি ফিরলেন।
**
যথাসময়ে ভূদেব গরাইয়ের বাড়িতে চন্ডাল যজ্ঞ সম্পন্ন হয়ে গেল,বিরিঞ্চিবাবা যজ্ঞ শেষে ইয়া বড় এক মাদুলি বাচ্চাটার গলায় পরিয়ে দিলেন।বললেন
"এই মাদুলি গলায় থাকতে আর কোন অপশক্তির ক্ষমতা নেই বাচ্চাটির কেশাগ্র স্পর্শ করে।"
ভূদেব বাবু খুশি হয়ে অনেক টাকাকড়ি কাঁসার বাসন ধুতি চাদর ইত্যাদি বাবাকে প্রণামি দিলেন।মায়ের মূর্তির জন্য সোনার চোখ গড়িয়েই রেখেছিলেন তাও বাবার হাতে তুলে দিলেন।এবং কথা দিলেন সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে মায়ের মন্দির তিনি মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে দেবেন।মাদুলির গুণে কিনা কে জানে,বেশ কয়েকমাস বাচ্চাটার মধ্যে আর কোন অস্বাভাবিকতা দেখা গেলনা।
***
এই ঘটনার বেশ কয়েকমাস পরে একদিন রাত্রে হঠাৎ একটা ভীষণ অস্বস্তি তে রুপালীর ঘুম ভেঙে যায়।ঘরের মধ্যে অল্প পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছিল,সেই আলোয় রুপালী দেখল ছেলেটা বিছানায় নেই!
ঘুমের মধ্যে বিছানা থেকে পড়ে গেল নাকি!
কিন্তু তাহলে তো কেঁদে উঠত।
ধড়মড় করে বিছানা থেকে নেমে ঘরের মেঝেয় খুঁজল রুপালী কিন্তু বাচ্চাটা মেঝেতেও নেই।লাইট জ্বালাতেই দেখতে পেল,ঘরের দক্ষিন দিকের জানালার কাছে রাখা চেয়ারটার উপরে উঠে বাচ্চাটা জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে দেখছে।রুপালী আলো জ্বালিয়ে দিতেই বাচ্চাটা জ্বলন্ত চোখে তার দিকে ফিরে তাকাল।সেই ভীষণ দৃষ্টি দেখে ভয় পেল রুপালী।উঁচু সেগুন কাঠের পালঙ্ক থেকে বাচ্চাটা মাটিতে নামলো ই বা কি করে আর ওই চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়ালো ই বা কি করে!!
আজ সুপর্ণ ও বাড়িতে নেই,ব্যবসার কাজে কোলকাতায় গেছে।ছেলেকে নিয়ে একাই শুয়েছিল রুপালী।এখন এ কি রকম সমস্যা শুরু হল।
তাড়াতাড়ি ছেলেকে টেনে চেয়ার থেকে নামাতে যেতেই ও গর্জন করে উঠল।কিছুতেই চেয়ার থেকে নামতে চায়না,ছোট্ট ছোট্ট দুহাতে জানলার রড আঁকড়ে ধরে রইল।ওইটুকু ছেলের সেকি জোর!!
রুপালী অনেক কষ্টে ছেলেকে ছড়িয়ে আবার বিছানায় এনে শোয়াল।ছেলে কেঁদেই অস্থির,কিছুতেই শুয়ে থাকতে চায়না।জোর করে চেপেচুপে কোনরকমে ঘুম পাড়াল বাচ্চাটাকে।
সারাটা রাত তার না ঘুমিয়েই কাটল।কি জানি কোন পাপে ভগবান তাকে এমন শাস্তি দিচ্ছেন।
অন্য কারোর বাচ্চাকে নিয়ে তো এতো অশান্তি পোয়াতে হয়না,তার বাচ্চার সাথেই কেন এরকম
হচ্ছে??
****
পরদিন সকালে বাড়ির সবাইকে রাতের ঘটনা খুলে বলতে আবার বাড়িতে আতংকের পরিবেশ তৈরি হল।অনেক আলোচনার পর ঠিক হল যে ওই ভন্ড তান্ত্রিকের দ্বারা আর একাজ সম্ভব নয়,বাবা মহাকাল ই হয়তো এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবেন।
সেইমতো আবার মহাকালের থানে পূজা দেবার আয়োজন শুরু হল।ভূদেব বাবুর স্ত্রী সকালে স্নান সেরে মহাকালের থানে গিয়ে মানসিক করে এলেন।
সামনের সোমবারে ধুমধাম করে পূজা দেওয়া হবে।
পূজার দিন পুরুতমশাই বিধিসম্মতভাবে পূজা করে বাবার প্রসাদী ফুল একটি মাদুলি তে ভরে বাচ্চাটির গলায় পরিয়ে দিলেন।বলাই বাহুল্য যে বাচ্চাটি ভীষণ কান্নাকাটি করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।কিন্তু সবাই মিলে জোর করে চেপে ধরে মাদুলি টি পরিয়ে দেয়।আশ্চর্যের ব্যাপার যে মাদুলি টি পরার পর বাচ্চাটি একদম শান্ত হয়ে যায়।সবাই মনেমনে ভাবল নিশ্চই বাবার অশেষ কৃপায় বাচ্চাটির সমস্ত দোষ কেটে গেছে।
এভাবে আরো একবছর কেটে গেল,বর্তমানে বাচ্চাটির বয়েস আড়াইবছর।এমনিতে কোন সমস্যা নেই,কিন্তু ছেলেটা বয়েসের তুলনায় বেশিই গম্ভীর।খেলাধুলা করেনা,হাসে না,সারাদিন কেমন গম্ভীর হয়ে বসে থাকে।খেতে দিলে দুহাতে তুলে কিম্বা থালায় মুখ দিয়ে অদ্ভুত জান্তব আওয়াজ করে খাবার খায়।বয়েসের তুলনায় খাওয়ার পরিমাণ অনেক বেশি।কিন্তু তবুও ছেলেটা দিনের পর দিন শুকিয়ে যাচ্ছে।অনেক ডাক্তার দেখানো হল,কিন্তু কেউ ই কিছু খুঁজে পেলনা।কোন রোগ জ্বালা নেই,কিছু নেই তবু যেন বাচ্চাটা অপুষ্টি তে ভুগছে।সুপর্ণ বা রুপালী প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে উঠে দেখে ওদের ছেলে বিছানার উপর বসে আছে,জ্বলজ্বলে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে।জোর করে ঘুম পাড়াতে চাইলে কেমন জান্তব আর্তনাদ করে কাঁদে।মাঝে মাঝে লুকিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়,খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় পুকুরপাড়ে কিম্বা হারু ঘোষের বাঁসবাগানে গিয়ে বসে আছে।ছেলেটাকে নিয়ে বাড়িসুদ্ধ সবার দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
ভুদেব গরাই অনেক টাকা খরচা করে বড় বড় ডাক্তার দেখাতে লাগলেন।তাদের কেউ ই কোন আশার আলো দেখাতে পারলো না।শুধু এই হাসপাতাল থেকে ওই নার্সিংহোম আর এই চেম্বার থেকে ওই চেম্বারে ঘুরে বেড়ানোই সার হল।বিভিন্ন রকম টেস্ট,রক্ত,মল,মূত্র পরীক্ষা,বুকের ছবি পেটের ছবি মাথার স্ক্যান সমস্ত রকম করা হল।কোথাও কোন সমস্যা নেই,তবু ছেলেটা দিনের পর দিন ধুঁকতে লাগল।
বাচ্চাটির চারবছর বয়স পূর্ণ হতে যখন ভূদেব বাবু দেখলেন অবস্থার কোন উন্নতি হলনা,তখন তিনি ঠিক করলেন একবার ভেলোর নিয়ে যাবেন।ওখানে অনেক ভালো ভালো ডাক্তার আছেন,নিশ্চই তাঁরা বাচ্চাটিকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেবেন।
ভেলোর ও যাওয়া হল,কিন্তু সেখানেও সেই একই অবস্থা।ডাক্তার রোগই ধরতে পারলেন না,চিকিৎসা হবে কিভাবে?এরকম ভাবে চেন্নাই,বেঙ্গালোর সমস্ত জায়গা ঘুরে এলেন কিন্তু কোথাও কিছু হলনা।
********
(১৪২৪ সাল,১৩ই চৈত্র)~~আমার কথা~~
এরকম সময় একদিন ওনাদের কুলপুরোহিত মিহির চ্যাটার্জীর কাছে ভূদেব বাবু আমাদের খোঁজ পেলেন।মিহির বাবু সম্পর্কে আমার মামা হন,উনি ভূদেব গরাইয়ের এই সমস্যার কথা জানতে পেরে ওনাকে আমাদের ফোন নম্বর এবং ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন।ভূদেব বাবুর তখন আর কোন জ্যোতিষী বা তান্ত্রিকের উপর ভরসা করার মতো মনের জোর ছিল না।এলাকার মধ্যে বা বাইরের কোন তান্ত্রিকের সাথে যোগাযোগ করতে বাকি রাখেন নি তিনি।কেউ ই কিছু করতে পারেনি সেখানে আমরাই বা কি করতে পারবো।কিন্তু তবু শেষ চেষ্টা হিসাবে উনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করলেন।চৈত্র মাসের একটা দিন ও বাবার ফাঁকা ছিল না,মধ্যপ্রদেশের ভোপালে গেছিলেন পনেরো দিনের জন্য।বাড়িতে আমি একাই ছিলাম,ভূদেব বাবুর কাছে ওনাদের ফোন নম্বর নিয়ে পরে যোগাযোগ করবো বলে দিলাম।বাবা বাড়ি ফিরলে দুজনে আলোচনায় বসলাম ব্যাপার টা নিয়ে।সিদ্ধান্ত নিলাম যে কেস টা আমরা নেবো।সেইমত ফোন করে ভূদেব বাবু কে আমাদের বাড়িতে আসতে বললাম।উনি ওনার ছেলে সুপর্ণের সাথে আমাদের বাড়ি এলেন।বাবা এবং আমি ওদের দুজনের সাথে আলাদা আলাদা বসে সমস্ত ব্যাপার টা শুনলাম।কথা হল বৈশাখ মাসে একদিন ওনার বাড়ি যাবো।ততোদিন ওনাদের ধৈর্য ধরতে হবে।
ভূদেব বাবু বাবার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন,বললেন "আপনারাই আমার শেষ ভরসা,চোখের সামনে নাতিটা মরে যাচ্ছে।এর থেকে আমার মৃত্যু হলেও ভালো ছিল।"
ওনাকে বুঝিয়ে শান্ত করলাম,আশ্বাস দিলাম ঈশ্বরের ইচ্ছায় সব ঠিক হয়ে যাবে।তবে ওনাদের আমি যখন তখন ফোন করে প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য নেবো,আর ওনারা কিছু গোপন করতে পারবেন না।ভূদেব বাবু রাজি হলেন।কথা হল আমরা বৈশাখ মাসের প্রথম দিকেই একদিন ওনাদের বাড়ি যাবো||

ভালবাসার pic

ভালবাসার pic



কষ্টের ভালবাসা  photo


ভালোবাসার রোমান্টিক মেসেজ


কষ্টের  Photo


কষ্টের  photo

Loading...
SHARE

Author: verified_user