Sunday

Bou Dubir Kotha | Bangla Horro Golpo | Bangla Golper Boi Online Reading

SHARE

Bou Dubir Kotha | Bangla Horro Golpo | Bangla Golper Boi Online Reading


Bou Dubir Kotha | Bangla Horro Golpo | Bangla Golper Boi  Online Reading cover

     বৌ ডুবির কথা    - শোভা সরকার


Bangla Golper Boi  Online Reading



নিঝুম রাত । নীলমণি বাঁড়ুজ্যে পালকি তে আধ শোয়া হয়ে চিন্তিত মুখে পর্দা সরিয়ে আকাশ দেখছেন , অবস্থা মোটেও ভালো নয় । ভাদ্রের শেষে এ সময় টায় প্রায়ই প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয় । আরও তিন চার ক্রোশ পথ বাকি । কালো কালো মোষের মতো মেঘ সারাটা আকাশ জুড়ে আছে । সঙ্গে অবশ্য লোকজনের কমতি নেই , দশ জন অতি দক্ষ লেঠেল আছে । আরও পাঁচজন মশাল নিয়ে চলছে , তারাও কম জোয়ান নয় । কিন্তু প্রকৃতির কাছে মানুষ কত টুকু ! ওপরে ঝুলতে থাকা কালো মোষ গুলোকে কে যেন জ্বলন্ত রুপোর তলোয়ার দিয়ে কেটে কেটে ছিন্ন ভিন্ন করছে , আর তাদের সম্মিলিত আর্তনাদে চরাচর কেঁপে উঠছে ।
" ভৈরব ও ভৈরব !"
ভৈরব এগিয়ে এলো , " হ্যাঁ কত্তা , বলুন "
" অন্য কোনও রাস্তা জানিস , আকাশের গতিক তো ভালো ঠেকছে না , গ্রামে পৌঁছুতে পৌছুতে যে ভিজে একসা হয়ে , বুকে সর্দি বসে .... চিনিস অন্য কোনো পথ ?"
" কত্তা ক্ষেতে এখন ভরা ফসল , এই আঁধারে ঠিক ঠাওর করতে পারব না , আল পথে যাওয়াও ঠিক হবে না। কত রকম পোকা মাকড় আছে না ? "
ভৈরব রাতের বেলায় সংস্কার বসত সাপ কে পোকা বলল ।
" মুশকিল হলো রে !"
" কত্তা , আর একটা উপায় আছে , আধ ক্রোশ পর বউ ডুবির শ্মশানে র ধার দিয়ে গেলে কোম্পানির বড় রাস্তায় পড়ব , তারপর ..."
"বউ ডুবির শ্মশান , কী বলছিস কী ভৈরব ? এত রাতে কেউ ওই শ্মশানের ধারে কাছে যায় ? ".........এক জন বল্লম ধারী আতঙ্কিত হয়ে বলল , " বউ ডুবির দুর্নাম কত জানিস না ? "
অত্যন্ত অশ্লীল গালি সামলে নিয়ে সে দাঁত খিঁচিয়ে বলল , " এত জন আমরা লাঠি , বল্লম , মশাল নিয়ে আছি তাও এত জানের ভয় , মা ...ইয়ে মেয়েমানুষের মতো চুড়ি পরে ঘরে বসে থাক ।"
এ অঞ্চলে বাঘের তেমন ভয় নেই , মাঝে মাঝে দু একটা চলে আসে , গোয়াল ঘরে হামলা করে ....কখনো দু চার জন মানুষ ও টেনে নিয়ে যায় । গ্রামের লোক এক কাট্টা হয়ে পিটিয়ে বা বল্লম দিয়ে মেরে দেয় । তবে সাপের কামড়ে অনেক লোক মরে । সাপের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন । এ সব ছাড়াও অন্য ধরনের ভয় আছে । কিন্তু সে ভয় ভৈরবের এর চওড়া পাথরের মত বুকের ছাতি ভেদ করে হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারে না । তার পূর্ব সুরিরা মৃত্যু নিয়েই কারবার করতো , বাংলার কুখ্যাত ঠগী ছিল । লাট সাহেব কড়া হাতে ঠগী দমনের পর এখন পেশা বদলে ... সে যাক । ও দিনে নানা রকম কসরত করে , চাষ বাস দেখে , রাতে প্রভুর পোষা কুকুর । বাঁড়ুজ্যে র আদেশে করতে পারে না এমন কোন কাজ নেই । বরং সে সব কাজেই তার উৎসাহ বেশী ।
পালকির ভেতরে দুটো মোটা মোটা তাকিয়া , নীলমণি হেলান দিয়ে একটা বিদেশি সূরার ছিপি খুললেন , সেই সুবাসে ভৈরব জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিলো ..... অন্য রাও ।
ঠিক যখন ঝিঙে ফুল ফোটে বাড়ির মেয়েরা চুল বাঁধতে বসে । ভাত ঘুম এ কালের মেয়েদের নিষিদ্ধ , সময়ও হয় না । দুবেলা দুই হেঁসেলে গুষ্টির রান্না করতে হিমশিম খায় মেয়েরা । আঁশ হেঁসেলে মাইনে করা দু জন বামুন মেয়ে আর নিরামিষ এ একজন । বাড়ির মেয়ে বউ তাদের যোগান দ্যায় । কর্তা দের পর ছোট রা , আশ্রিত ,ঝি চাকর , মজুর সকলকে খাইয়ে বউ রা যখন খেতে পায় সূর্য দেব তখন পশ্চিম দিকে ঢলতে শুরু করেন । মুখ আঁচিয়ে দাওয়া এ বসতে না বসতেই নাপিত বউ হাজির হয় । এই সময় টুকুই যা একটু গল্প গাছা , নিন্দা চর্চার অবসর । নাপিত বউ , বাড়ির অন্য ঝি, পাড়া বেরুনি আশেপাশের বউ ঝি সবাই মিলে মজলিস বসায় ।
আজকের মজলিসের আলোচ্য বিষয় এ বাড়ির ই নতুন বউ । সেই দশে বিয়ে হয়ে বাপের বাড়িতেই ছিল । তেরো এ শ্বশুর ঘর করতে এসে পাঁচ মাসেই পোয়াতি । তার দিদি শাশুড়ী যেন মাথায় করে নাচছেন । নতুন বৌ এর নিজের শ্বশুর শাশুড়ি বেঁচে নেই , আছেন শুধু দিদি শাশুড়ি ।অবশ্য ও তরফে প্রায় সকলেই আছেন ।
অনেকটা জমি জুড়ে ভদ্রাসন । আত্মীয় পরিজন - আশ্রিত রা সংখ্যায় অনেক হলেও মূল উত্তরাধিকারী যারা হতে পারেন তাঁরা সংখ্যায় কম । ও তরফের আর এ তরফের দুই পুত্র সন্তান । একজন সদ্য কিশোর আর অন্য জন সদ্য যুবক । সদ্য যুবক রাধকান্ত কিশোর বিষ্ণুচরণের খুড়ো ।নীলমণি বাঁড়ুজ্যে রাধকান্তের সৎ ভাই , পাঁচ কন্যা আর এক পুত্রের পিতা । দু তরফে ই দু জন করে ঘর জামাই স্ত্রী সন্তান সহ শ্বশুর এর ভিটেতে বসবাস করে , কলহ বিবাদ ও করে , অনতিবিলম্বে সেসব মিটেও যায় । বাঁড়ুজ্যে রা জমিদার না হলেও প্রচুর সম্পদের মালিক , নিজস্ব লেঠেল বাহিনী ও আছে ।
মেয়ে দের মজলিসে নাপিত বউ ও তরফের ছোট মেয়ে রতন মনির চুল বাঁধতে বাঁধতে বলল ' তোমাদের নতুন বৌ কোথায় গা ? ' 
রতন মনি মুখ বেঁকিয়ে বলল , ' জনে জনে সবার খবর রাখিনে বাপু , তুই তোর কাজ কর দেখি ! '
' ওমা , ভালো কথাই তো কইলেম বাবা । তো সে মাথা বাঁধবে নে , আলতা পরবে নে ? '
' সে এখন তার দিদি শাউরির পেয়ারের বউ গো , পোয়াতি কিনা , সক্কলের আগে খেয়ে ভাত ঘুম দিচ্ছেন ......কালে কালে কত দেখব ......এ বাড়ির কোন বউ ঝি তো আর বাচ্ছা পেটে ধরে নি । '
' ওমা সে কি কথা গো , বলি কত্তা দের আগে ও খায় নাকি ? চেরটা কাল শুনে এলাম যে আগ বোল ভাত নাকি মেয়ে মানুষ খায় না ......তোমাদের বাড়ির হলটা কি ? ' 
' দিনু কবরেজের বিধান , আমরা মুক্কু শুক্কু মেয়ে মানুষ ....আমাদের আর কি জ্ঞান বল ?' 
মালতি ঝি বসে বসে সলতে পাকাছিলো , গলা নামিয়ে ফিস ফিস করে বলল ' পেটের টা বোধহয় ছেলে গো রতন দিদি , তাই এত তোয়াজ .....দিনু খুড়ো বলেছে , আমি আড়ি পেতে ....। '
বলতে বলতে থেমে গেলো মালতি , নতুন বউ উঠোনে নামছে , পেছনে তার দিদি শাশুড়ি আর সবি ঝি ।
সবি একটা উঁচু জলচৌকি এগিয়ে হাত ধরে নতুন বউকে বসিয়ে দিল । রতন মনির চুল বাঁধা হয়ে গিয়েছে , নাপিত বউ আলতা পরানো শুরু করতে যাবে এমন সময় নিস্তারিণী বললেন "বিমল আগে বউকে আলতা পরা , খোঁপা বাঁধ । Bangla Horro Golpo
রতন মনি কলহ প্রিয়া হলেও মনের উষ্মা চেপে গুম হয়ে থাকল । নিস্তারিণীর আদেশ অমান্য করে এমন সাহস তার নেই । 
" বিমল , তোকে যে বলে ছিলাম ...." 
- '' হ্যাঁ , গিন্নিমা এসেছে ....হুই যে বসে আছে ।"
উঠোনে আর একটা জল চৌকিতে এক বিধবা বসে আছে , ছোট করে ছাঁটা চুল , পরনে ধপধবে সাদা থান ,পাকা গমের মত গায়ের রং , চোখের দৃষ্টি সোজা , গভীর ....গম্ভীর ভাবে নতুন বউকে দেখছে । 
- "সবি , ওকে জল দেওয়া হয়েছে ? "
নাপিত বউ হাঁ হাঁ করে উঠল -" না গো গিন্নিমা , মাসি কোতাও কিচু খায় না ! "
- "এ কেমন কথা , গেরস্তের অকল্যাণ হবে যে ? " 
- " না গো , মাসি যে কারো বাড়ি যায় না , অন্যের হাতে খায় না ।" 
নিস্তারিণী অবাক হলেন । নিচু জাতের ঘরের জন্মানো এই বিধবা উচ্চ বর্ণের মত এতটা আচার নিষ্ঠ ! অবশ্য এই লোক তো অন্য রকম হবেই , কপাল দেখে ভুত ভবিষ্যৎ বলতে পারে। 
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নিস্তারিণী বললেন -" একটু আমার ঘরে এস তো বাপু , কথা আছে ।" 
এবার বিধবা উঠে দাঁড়িয়ে বলল -" কারো ঘরেও আমি যাই নে .....আমার শক্তি নষ্ট হয় , যা বলার এখানেই বলব ..... " তার পর সেখানে যত মেয়ে - বউ ছিল তাদের উদ্দেশে বলল , " তোমরা বাপু নিজের নিজের কাজে যাও দেখি .....গিন্নিমা র সাথে আমার কিছু কথা আছে , সবার সামনে কওয়ার মত নয় । যাও তোমরা নিজের ঘরে 

Bou Dubir Kotha
সবাই বেশ হতভম্ব হয়ে গেলেও নিস্তারিণীর মুখের দিকে চেয়ে আর কিছু না বলে ধীর ধীরে চলে গেল । বিধবা এগিয়ে এসে নাপিত বৌকেও বলল - " তুই ও এখন যা ।"
- "আমি কেন , বা রে , আমি তোমার নিজের নোক না ? "
- " যা বলছি ! "
নাপিত বউ বেজার মুখে উঠে গেল ।এতক্ষন কুসুম জল চৌকির ওপর বসে সবারমুখের দিকে চাইছিল , আজ কাল তার কিছুই ভালো লাগে না । বড় লোকের আদরের মেয়ে , বড় লোকের বউ । বউ আবার কবে আদরের হয় ? তবে আদর না থাক যত্ন টা আছে । বিশেষ করে পেটের টা আসার পর থেকেই , দিদি শাউরি সবি দিদিকে যেন গায়ে সেঁটে দিয়েছেন । এদিক যেও নি , ওদিক যেও নি , এলো চুলে মোটে থাকবে নি , সাঁঝ সন্দে কুয়ো তলায় যাবে নি..... ছেঁচ তলায় তোমার গামছাটা কে মেলে দিল , খোঁপায় খোড়কে কাঠি গুঁজেছ না ভুলে গেছো ,কোল আঁচলে গিঁট দিয়েছো......সারা দিন টিক টিক করে বেড়াচ্ছে । কবরেজের কথা মতো সাত সকালে কর্তাদের জলখাবার পর পরই তাকে খেতে হয় , দুপুরে ও তাই ....প্রায় কর্তাদের সঙ্গে সঙ্গেই খেতে বসতে হয় । সারা শরীরে অস্থির অস্থির ভাব , গা বমি বমি.....মাথা ঘোরা , একটুও ভালো লাগে না .....কবে যে এরা বাপের বাড়ি পাঠাবে ! রাত দিন সময় অসময়ে খালি ঘুম ঘুম ভাব । কবরেজের মানা তাই আসন পিঁড়ি করে বসে না , খাওয়া দাওয়া ও ওই জল চৌকি তে বসে । কত দিন হল একটা কাপড়ে ' পতি পরম গুরু ' নকশা খানি সূঁচে তোলার চেষ্টা করছে.....কিন্তু শরীর দিচ্ছে না । এখন আবার কোন মেয়েছেলে গণক্কার দেখতে এসেছে , কবরেজ লক্ষণ দেখে বলেছে যে ব্যাটা হবে ..... বোধ হয় আরো নিশ্চিন্দি হতে চায় দিদি শাউরি ।
- ' দেখি মা তোমার পা ... না ..না পায়ের তলা , মুখ তোল ঘোমটা সরাও ! " মুখ যেন অন্ধকার হয়েগেল গণককারের , "আচ্ছা ঠিক আছে , এবার ঘরে যাও । '
কুসুম ঘোমটা তুলে ধীরে ধীরে চলে যেতে যেতে পেছন ফিরে দেখলো.....বিষণ্ন গম্ভীর মুখে বিধবা তার দিকেই চেয়ে আছে । কে জানে বাবা কপালে কি লেখা আছে .....বোধহয় বেটার জন্ম দেওয়া লেখা নেই , এখন নাই বা হলো পরে হবে , তবে দিদি শাউরির আশা এ ছাই পড়বে , মেলা কথা শুনতে হবে ।
-', কী দেখলে মা , ছেলে না মেয়ে ? '
-'তোমার ঘরে চলো বলছি ।'
-'ঘরে যাবে না বলছিলে যে ?'
- ' না গিয়ে উপায় নেই , কথাটা আড়ালে বলতে হবে ।'
ঘরে ঢুকে নাপিত বউয়ের বিধবা মাসি বলল , 'দোর দিয়ে দাও মা । '
- ' তোমার নাম টা তো জানি নে মেয়ে । '
- ' নাম মোক্ষদা , তা মোক্ষ দেওয়ার ক্ষমতা আমার যেমন নেই তেমনি তোমারও যে বিপদ ঘনিয়ে আসছে তার থেকে নিস্তার পাওয়ার ক্ষমতা নেই । '
- ' কী বলছো মেয়ে ? '
- ' যত গোপনে পারো নাতি আর নাত বৌ কে তার বাপের ঘরে পাঠিয়ে দাও .....তাতে যদি ওদের পরান টা বাঁচে.....খুব তাড়াতাড়ি , সম্ভব হলে কাল কাক ডাকার আগে !'
জানলায় কান লাগিয়ে ও মালতি তেমন কিছু শুনতে পেল না , নতুন বো'র দেখাশোনার ভার কত্তা মা তাকে দেয় নি , বড় দা বাবুর কাজ টা করে উঠতে পারছে না । তা দাদা বাবুর ও তেমন গা নেই । অন্য কোনো মতলব আছে হয়তো । পা টিপে টিপে মালতি চলে গেল , ধারে কাছে কেউ নেই তো ?
নিজের নাম নিস্তারিণী অনেক দিন হোল ভুলেছেন , বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ির গ্রামে সম বয়সি মেয়ে বৌ রা কেউ কেউ ' বকুল ফুল ' কেউ 'আলতা পাতা ' কেউ ' গঙ্গা জল ' পাতিয়ে ছিল । ছেলে হবার পর 'নয়নের মা '। এই মোক্ষদা ইঙ্গিতে তাঁর নাম বললো কি করে ! দোজবরে বিয়ে হয়েছিল । রুগ্ন সতীন দিনরাত গাল পারতো -শাপ শাপান্ত করতো । ও তরফের ছেলের ও তখন বিয়ে হয়ে নাতি নাতনি হয়েগেছে । গঞ্জনা শোনাতে শোনাতে একদিন সতীন সংসার থেকে বিদায় নিলেন । তার পর কর্তা , দুই পক্ষের ই ছেলে , তাঁর নিজের ছেলের বৌ সবাই চলে গেল এক এক করে .....নাতি টাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন এত দিন । বাপের বয়সী সৎ ভাই যে ওকে সুনজরে দেখে না সেটা তিনি ভালোই জানেন । এর আগেও তিন বার ছেলেটা মরতে মরতে বেঁচেছে । সন্দেহের কাল কেউটে কে প্রবোধের দুধ কলা দিয়ে শান্ত রেখেছেন এত দিন । কিন্তু মোক্ষদা পায়ের তলার জমি সরিয়ে এ কি ভয়ঙ্করের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল !
কোন মতে পালংক ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন - ' এমন কথা কেন বলছ মা , কী দেখলে বউয়ের কপালে ?'
- 'কপালে নয় , পায়ের তলায় .....ওর সোয়ামীর চিতে জ্বলছে .....সেই চিতেএ সেও......কিন্তু বড় অসম্মানের.....কাল ভোরে ই পালিয়ে যাক.....কিন্তু খুব গোপনে .....সাবধানের মার নেই ......যদি ফাঁড়া টা কাটে ! কাটবেই তা বলতে পারিনে । '
নীলমনিবাঁড়ুজ্যে বৈঠক খানায় একাই ছিলেন , বিমলের মুখে মোক্ষদার বৃত্তান্ত শুনে আঙ্গুল থেকে একটা আংটি খুলে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলেন
' আংটি টা আঁচলে বেঁধে নে , কেউ দেখতে পেলে বিপদে পড়বি কিন্তু , চোর বলে দূর করে দেব । শোন আজ রাতে জেগে কত্তা মার ঘরের দিকে নজর রাখবি , কোনো খবর যেন হাতছাড়া না হয় । এখন যা ।' - নীলমনি গড়গড়ার নল টা টেনে নিলেন ।
বিমলার পায়ের ওপর দিয়ে একবার সাপ চলে গিয়ে ছিল .... কি শীতল সেই স্পর্শ... বড় বাবুর গলার স্বর ও তেমনি ঠান্ডা , চাহনি ও ।
পা টিপে টিপে বের হয়ে আংটি টা ভালো করে আঁচলে বেঁধে নিলো ,সারা দিন খাটা খাটনির পর আজ রাতে আবার জাগতে হবে , শুধু আজ কেন কত রাত যে জাগতে হবে কে জানে । স্বার্থ বড় বালাই !
শুক্ল পক্ষের একাদশী , চাঁদের আলো ম্লান ... বাড়ির সবচেয়ে বৃদ্ধা মানুষ টি র চোখে ঘুম নেই , ঘরে প্রদীপ নেভেনি , অসীম উৎকন্ঠায় প্রহর গুনছেন..... কখন পরিবারের সবাই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে । দূরে গ্রামের প্রান্তে শিয়াল দের সমবেত স্বরে মধ্য রাত্রির আগমন ঘোষনা শোনা গেল । নিস্তারিণী প্রদীপ নিভিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে পা টিপে নাতির ঘরের দরজায় মৃদু আঘাত করলেন ......এক বার....দু বার ...বার বার 


Bangla Horro Golpo 3rd Part


দু দুটো গ্রাম পার হয়ে বেহারারা জঙ্গলের পথ ধরেছে । কুসুম বুঝেই উঠতে পারছে না ব্যাপারটা কি হলো , পালকির মধ্যে মুখোমুখি তার বর বসে ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবছে । অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়েছে বাসি ঘর , বাসি উঠোন দিয়ে হেঁটে খিড়কির দোর খুলে ...... অন্ধকারে চৌকাঠে এমন হোঁচট খেলো যে পরতে পরতে বেঁচে গেছে । এমনতর কান্ড এর আগে বাপের জন্মে দেখেও নি , শোনেও নি । দিব্বি ঘুমিয়েছিল বরের গায়ে পা টা তুলে দিয়ে , এটা ওর খুব খারাপ অভ্যেস , শ্বশুর ঘর করতে আসার আগে মা জেঠাইমা রা কত করে বলে দিয়েছেন , কিন্তু কি করবে ঘুমিয়ে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে বুঝি ! তা ছাড়া ও মানুষ টাও যে খুব ভালোবাসে । রাত ছাড়া তো মানুষটার কাছে যাওয়ার জো নেই । দিনের বেলা কথা কওয়ার কোন প্রশ্নই নেই , ওই ঘোমটার ফাঁক দিয়ে যত টুকু চোখা চোখি । রাত টুকু ওর নিজস্ব । এটুকু সময়ে ই এই দুদিন আগেও ফিসফিস করে কত গল্প করতো । পেটেরটা আসার পর শরীর যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে , দু চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে । ভোর ভোর উঠে পড়ার আগে বর কে জাগিয়ে তুলে টুক করে পেন্নাম করে বিছানা থেকে নেমে পরে । কাল অত রাতে দিদি শাউরি ঘুম ভাঙিয়ে তুলে ফিসফিস করে কি বলছিলেন ...... কুসুম তখন লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল । কথা শেষ হতে দিদি শাউরি চলে যাওয়ার পর দোর বন্ধ করে পিদিম টা জ্বালিয়ে তেমনি ফিসফিস করে ওর বর তৈরি হতে বলল, বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এটুকুই জেনেছে যে বাপের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে । কিন্তু এ কেমন যাওয়া , আচার মানা নেই , সঙ্গে তোরঙ্গ নেই ,ভালো ভালো শাড়ি গুলো সব পরে রইলো, সধবা পোয়াতি যাচ্ছে ..... মাছ , মিষ্টি নেই .... এক কাপড়ে চোরের মতো কাক পক্ষী ডাকার আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া .....কিছুই মাথায় ঢুকছে না । বেহারারা মুখে শব্দ পর্যন্ত করছে না । উৎকণ্ঠা কুসুমের গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে । হঠাৎ পালকি দাঁড়িয়ে গেল ।

দু দুটো গ্রাম পার হয়ে বেহারারা জঙ্গলের পথ ধরেছে । কুসুম বুঝেই উঠতে পারছে না ব্যাপারটা কি হলো , পালকির মধ্যে মুখোমুখি তার বর বসে ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভাবছে । অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়েছে বাসি ঘর , বাসি উঠোন দিয়ে হেঁটে খিড়কির দোর খুলে ...... অন্ধকারে চৌকাঠে এমন হোঁচট খেলো যে পরতে পরতে বেঁচে গেছে । এমনতর কান্ড এর আগে বাপের জন্মে দেখেও নি , শোনেও নি । দিব্বি ঘুমিয়েছিল বরের গায়ে পা টা তুলে দিয়ে , এটা ওর খুব খারাপ অভ্যেস , শ্বশুর ঘর করতে আসার আগে মা জেঠাইমা রা কত করে বলে দিয়েছেন , কিন্তু কি করবে ঘুমিয়ে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে বুঝি ! তা ছাড়া ও মানুষ টাও যে খুব ভালোবাসে । রাত ছাড়া তো মানুষটার কাছে যাওয়ার জো নেই । দিনের বেলা কথা কওয়ার কোন প্রশ্নই নেই , ওই ঘোমটার ফাঁক দিয়ে যত টুকু চোখা চোখি । রাত টুকু ওর নিজস্ব । এটুকু সময়ে ই এই দুদিন আগেও ফিসফিস করে কত গল্প করতো । পেটেরটা আসার পর শরীর যেন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে , দু চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে । ভোর ভোর উঠে পড়ার আগে বর কে জাগিয়ে তুলে টুক করে পেন্নাম করে বিছানা থেকে নেমে পরে । কাল অত রাতে দিদি শাউরি ঘুম ভাঙিয়ে তুলে ফিসফিস করে কি বলছিলেন ...... কুসুম তখন লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল । কথা শেষ হতে দিদি শাউরি চলে যাওয়ার পর দোর বন্ধ করে পিদিম টা জ্বালিয়ে তেমনি ফিসফিস করে ওর বর তৈরি হতে বলল, বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এটুকুই জেনেছে যে বাপের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে । কিন্তু এ কেমন যাওয়া , আচার মানা নেই , সঙ্গে তোরঙ্গ নেই ,ভালো ভালো শাড়ি গুলো সব পরে রইলো, সধবা পোয়াতি যাচ্ছে ..... মাছ , মিষ্টি নেই .... এক কাপড়ে চোরের মতো কাক পক্ষী ডাকার আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া .....কিছুই মাথায় ঢুকছে না । বেহারারা মুখে শব্দ পর্যন্ত করছে না । উৎকণ্ঠা কুসুমের গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে । হঠাৎ পালকি দাঁড়িয়ে গেল ।
রাধাকান্ত মুখ বের করে বলল , ' কি রে দাঁড়ালি কেন , এখনো যে অনেকটা পথ বাকি , পা চালা তাড়াতাড়ি , নইলে সন্ধের আগে পৌঁছাতে পারবো না ! '
ভৈরবের হিমশীতল গলায় স্পষ্ট আদেশ শোনা গেল , ' আর কোথাও যেতে হবে না ছোট কত্তা , নেমে আসুন । '
রাধকান্তের মুখ টা ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল , পালকি থেকে নেমে এসে চার দিকে তাকালো ....না ভয় পেলে চলবে না , সন্দেহটা ওর মনেও অনেক আগেই হয়েছিল । দাদা কে ছোট থেকেই প্রচন্ড ভয় পায় ।কই জমের এখনো এসে পৌঁছায় নি .....ছোট বেলার বন্ধু .... সেও বেইমানি করলো ?
দাঁত বের করে হাসছে ভৈরব । 
Bangla Golpo Online Reading
রাধকান্ত বলল , ' পথ আটকালে কেন ভৈরব ? ' 
- 'বড় কত্তা কইলেন যে .....এই তোরা পালকি নিয়ে বড় বাবুর বাগান বাড়ি যা , ছোট কত্তা র সাথে আমার দুটো কথা আছে ।'
দিনের আলো অনেক্ষন ফুটেছে , প্রানপনে দৌড়াচ্ছে জমের ...জমিরউদ্দিন ... কাল গভীর রাতে রাধা নিজে এসে গোপনে তাকে ওর সঙ্গে যেতে বলেছিল । কাল রাতে অবশ্য ও জেগেই ছিল , ক্ষয় কাশের রুগী তার বাপ ....এখন তখন অবস্থা ! বাপ কে সামলে বেরহতে দেরি হয়ে গেল , আর সত্যি বলতে কি রাধার এই ভয় টাকে সে তেমন আমল দেয় নি । গ্রামের কোন বুড়ি হাত গুনে কি বলেছ আর অমনি লেজ তুলে রাধা শ্বশুর বাড়ি দৌড় দিলো এই ব্যাপার টা বেশ কৌতুকের মনে হয়েছিল । অবশ্য ওর সৎ দাদা লোক ভালো নয় , এর আগেও রাধা কয়েকবার মরতে মরতে বেঁচেছে .....কে জানে ওর দাদার হাত ছিল কিনা । একটানা দৌড়ে বুক টা হাপরের মতো ওঠা নামা করছে .....ওই তো পালকি .... জমের একটু দাঁড়িয়ে দম ফেলল , তার পর জোরে জোরে পা চালালো ।
আরে এ তো নীলমনি র লেঠেল , সবাই মিলে পালকির সঙ্গে চলেছে , অবাক হয়ে জমের জিগ্যেস করলো , ' রাধা কই ? '
এক লেঠেল উত্তর দিলো ,' আজ্ঞে , তিনি একটু ঝোপে গিয়েছেন । '
- ' তা তোমরা ওর জন্য অপেক্ষা না করে কোথায় যাচ্ছ ? '
উত্তরে বেঁটে মোটা একটা লাঠি মাটির সমান্তরালে ঘুরতে ঘুরতে এসে পেছন থেকে জমেরের পায়ের গোছায় প্রচন্ড আঘাত করলো , কাটা কলাগাছের মতো জোয়ান ছেলেটা পরে গেল । সামলানোর সময় টুকু পর্যন্ত পেলো না, নিমেষে ভৈরব ছুটে এসে ওর কোমর থেকে হেঁসো টা বের করে নিলো .....পালকি তখন আরও এগিয়ে গিয়েছে ।অনেক দিন পর ফাবরা টা ব্যবহার হলো , সস্নেহে সেটার গায়ে হাত বুলিয়ে ধুলো টুকু মুছে ভৈরব কোমরে গুঁজে নিলো , এবার বাকি কাজ টুকু শেষ করতে হবে ।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল তার পর সন্ধে নেমে এলো.....একই গ্রামের দুই প্রান্তে দুটি বয়স্ক মানুষ অপেক্ষা করছে , নিস্তারিণী ভাবছেন কাল পালকি বেহারারা ফিরে এসে কুশল সংবাদ দেবে। ওদিকে সাধারণ একটা কুটিরের দাওয়ায় বসে গামছা দিয়ে কাশির সঙ্গে উঠে আসা রক্ত ঠোঁটের পাশ থেকে মুছে নিয়ে আব্দুল সপ্রশ্ন দৃষ্টি তে স্ত্রী দিকে চেয়ে দেখলো .....সেই কোন ভোরে ছেলেটা বের হলো এখনো ফিরলো না কেন?
দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছোটে । একেই আগের দিন ভোর ভোর কাউকে না জানিয়ে বাড়ির ছোট ছেলে - বউ কেন বেরিয়ে গেল তার কোন সদুত্তর কেউ দিতে পারে নি । নিস্তারিণী নীরব ছিলেন , সবাই বুঝেছিল তিনি সব জানেন কিন্তু মুখে কুলুপ এঁটেছেন তাই নিজেরাই রান্না ঘর পুকুর ঘাট তোলপাড় করে তুলল । পরদিন সকালে বেহারা রা কেঁদে আছড়ে পড়ল , পালকি তে বাড়ির ছোটছেলের রক্তাক্ত দেহ । ডাকাত পড়েছিল । ছোট বউ রানীর কোন খোঁজ নেই । নীলমণি লোকদেখিয়ে ভাইয়ের বউয়ের খোঁজে আসে পাশের দশ খানা গ্রাম , সংলগ্ন জঙ্গল তোলপাড় করে ফেললো ...... নাঃ কোথাও কুসুমের চিহ্ন টুকুও পাওয়া গেলো না । ছোট ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি লোক পাঠিয়ে খবর দিলো । বাড়ির আদরের এক মাত্র মেয়ের জন্য শোক করবে কি ......লজ্জা , ঘেন্না আর অপমানে তারা গুটিয়ে গেল ।
বাঁড়ুজ্যে বাড়িতে গোটা গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়েছে । কান্নার রোল বহুদূর থেকে শোনা যাচ্ছে
। এরই মধ্যে নীলমণি হাত জোড় করে গ্রামের মাথা দের বললো , ' আমার ভাইকে ডাকাত তে খুন করেছে ...এখুনি হয়তো কোম্পানির দারোগা আসবে ...... দয়া করে যদি একটু পাশে থাকেন ....' সবাই মুখ চাওয়া চায়ই করতে লাগলো । মদন চাটুজ্জে গ্রামের মোড়ল , এগিয়ে এসে বললেন , ' বুঝলে না ভায়া .....আরে আমরা তো তোমার সঙ্গেই আছি .....নাতি টার আবার কদিন ধরে ...... আবার ওদিকে তোমাদের বৌঠাকুরণের ও ....আরে আমরা তো ....বুঝলে কিনা ! '
ভিড় টা পাতলা হতে শুরু করলো ।
চার জন গরিব বামুনের কাঁধে চড়ে বাঁড়ুজ্যে বাড়ির ছোট ছেলে নিজের নিরুদ্দিষ্ট স্ত্রী আর শোকস্তব্ধ পিতামহী কে রেখে অনন্ত যাত্রা শুরু করলো । এবারেও সঙ্গে কয়েক জন লেঠেল ।



চতুর্থ পর্ব
নদী টা এক সময় গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে যেত । হঠাৎ নিজের খেয়ালে গতি বদলে দূরে আরও দূরে চলে যায় , রেখে যায় ছোট্ট একটু স্মৃতি বৌ ডুবির দহ , পাশেই বৌ ডুবির শ্মশান । কথিত আছে কোন এক বৌ সহ মরণে গিয়ে চিতায় আগুনের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এই দহ এ ডুবে মরে । দিনের বেলায়ও এই ধু ধু প্রান্তর যথেষ্ট ভীতিপ্রদ , কোনো সাধু সন্ন্যাসী বা তান্ত্রিকের ও দেখা মেলে না । এক সময়ে নিকটবর্তী গ্রামের মানুষ একটা কালী মন্দির তৈরির চেষ্টা করেছিল , কিন্তু সফল হয় নি । কোনো দুর্ঘটনায় সেই মন্দির অর্ধ সমাপ্ত থেকে গিয়েছিল । বিগ্রহ হীন ভগ্ন প্রায় সেই মন্দিরকে ঘিরে যে জঙ্গল সৃষ্টি হয়েছে তা এই শ্মশানের ভয়াবহতা আরো বাড়িয়ে তুলেছে ।দিনের আলোয় কিছু কিছু শব দাহ হলেও রাতে কেউই এই শ্মশানে পা দেয় না । চার দিকে ধু ধু বালি আর তাকে ঘিরে এই ভরা ভাদ্রে কাশের ঝোপ , দূর থেকে কিছুই দেখা যায় না । যেখানে বালির শেষ সেখানেই সরস মাটি পেয়ে প্রকৃতি সবুজের মেলা বসিয়েছেন ।
নীলমণি ইচ্ছে করে দুপুর গড়িয়ে যাবার পর যাত্রা শুরু করলেন । শ্মশানে পৌঁছতে প্রায় সন্ধে নেমে এলো , পুরোহিত আর বাকি চার জন বামুন যারা শব বহন করে নিয়ে গিয়েছিল তারা উসখুস করতে শুরু করে দিলো । চিতায় আগুন দেবার পর নীলমণি প্রস্তাব দিলেন তারা এক জন লেঠেল কে সঙ্গে নিয়ে যেন গ্রামে ফিরে যায় , বাদ বাকি কাজ টুকু তিনি নিজেই করে নিতে পারবেন । তাড়া হুড়ো করে দহের জলে ডুব দিয়েই ওরা যেন পালিয়ে বাঁচলো । নীলমনির সঙ্গে রইল তাঁর কু কর্মের সঙ্গী কয়েকজন লেঠেল । এমন সময়ে দূরে দেখা গেল একটা পালকি আসছে , সঙ্গে ভৈরব । বেহারারা ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে , ভৈরব নিচু হয়ে পালকির ভেতর থেকে নিষ্প্রাণ কুসুম কে পাঁজা কোলা করে বের করে আনলো । দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে চিতা , খেলনা পুতুল ছুঁড়ে দেবার মত করে সেই চিতায় হতভাগী কে ছুঁড়ে দিলো ......দাউ দাউ আগুন বউ ডুবির ভয়াল রূপ যেন আরও বাড়িয়ে তুলল । কেউ লক্ষ্য করেনি ঈশান কোনে এক টুকরো ছোট কালো মেঘ ভাদ্রের আকাশ খানা ছেয়ে ফেলছে ।
নীলমণির বাগান বাড়িতে বিমলার খুব যাতায়াত আছে । শব যাত্রীরা রওনা দেবার পর চুপি চুপি সেখানে গিয়ে ছিল , নিজে কে নিজে ধিক্কার দিচ্ছিল .....বুকটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে ! যদি নতুন বউ রানী কে এখানে পাওয়া যায় তবে সে নিজের হাতে বিষ এনে দেবে ....কিন্তু সে তো আবার পোয়াতি .....হা ভগবান .....কী পাপ করালে ঠাকুর ! দরজায় লোক পাহারায় আছে , বিমলা বাড়ির পেছন দিকে জানলা গলিয়ে কোন ক্রমে বাড়ির ভেতরে ঢুকে এ ঘর ওঘর খুঁজতে লাগলো ...…বড় বাবুর শোবার ঘরের দোর দেওয়া , হাতের হালকা চাপে দরজা খুলে গেল ....অন্ধকার ঘরে কিছুই চোখে পড়ে না......চোখ সয়ে গেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে একটা জানলা একটু খানি খুলে আলো আস্তে দিলো .....ঘরখানা যেন তছ নছ হয়ে রয়েছে ....পায়ের তলায় কী যেন চটচট করছে ....নিচু হয়ে দেখল .....রক্ত ! চাপ চাপ রক্ত ! নিজের মুখে নিজের আঁচল গুঁজে হু হু করে কেঁদে ফেললো বিমলা .....নতুন বৌ রানী ...তবে তুমি মরে বেঁচেছো !
দিনকে দিন ছেলেটা শুকিয়ে যাচ্ছে , ভয়ের কালো পাথর টা নীলমনির বউ এর বুকে আরও ভারী হয়ে চেপে বসছে । লক্ষন ভালো লাগছে না , সারা দিন গায়ে ঘুষঘুষে জ্বর ...... কাশতে কাশতে দম ফেলতে পারে না এক এক সময় । দিনু কবরেজ খল নুড়ি তে ওষুধ আর জরি বুটি মেড়ে খাওয়ায় আর মাথা নাড়ে , ওদিকে সৎ দিদি শাশুড়ি পক্ষাঘাত এ শয্যাশায়ী ......ভগবান জানেন একটা মানুষের লোভ আর অনাচার কোন দুর্যোগ ডেকে আনবে ! সন্ধে বেলায় তুলসী তলায় প্রদীপ খানি জ্বালিয়ে , গলায় আঁচল জড়িয়ে একমনে মা বিশালাক্ষীর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছিলো সৌদামিনী ,নীলমণি বাড়ি নেই , জমিদার বাড়িতে বাই নাচের আসর বসেছে.....পশ্চিমের কোন নাম করা বাই এসেছে ..
..কত দিন হল বাড়ি ফেরে নি ....এদিকে ছেলেটা ...'.রক্ষে কর মা , রক্ষে কর ! '
সৌদামিনী পেছন ফিরতেই দমকা বাতাসে প্রদীপের শিখা টা কেঁপে কেঁপে নিভে গেল ।
দেবীপুর থেকে সকাল সকাল রওনা দিয়েও এতটা পথ আসতে বেশ দেরি হয়ে গেল । ভাদ্রের তাল পাকা পচা গরম বেহারারা ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ।গতি শ্লথ হয়ে গিয়ে ছিল । দুপুরে পালকি নামিয়ে খেতেও হয়েছে , সন্ধে নাগাদ গ্রামে পৌঁছানোর আশা ছিল কিন্তু সে আর হয়ে উঠলো না । এদিকে আকাশ ধীরে ধীরে ঘন মেঘে ঢেকে গেল .....হু হু করে জোলো বাতাস বইছে , মশাল কতক্ষন জ্বলবে কে জানে ! রাজ্যের কাঠ কুটো হওয়ায় উড়ে এসে চোখে মুখে ঝাপটা মারছে । মধ্য রাতে ...এখনো এতটা পথ বাকি....ভৈরবের পরামর্শে নীলমণি বৌ ডুবির পথ টাই ধরলো ।Ghost Bangla
জলা ভূমি , জঙ্গলে সবুজ উদ্ভিদ পচে একরকম অস্বাস্থ্যকর বাতাস তৈরী হয় ......অন্ধকার রাতে দপ দপ করে জ্বলে ওঠে .....আলেয়া , নির্জন প্রান্তরে আলেয়া দেখলে অতি বড় সাহসী র ও রক্ত জল হয়ে যায় .....আর এই ভয় কে কাজে লাগিয়ে কিছু অভাগী পালিয়ে যায় , যারা শ্বশুর বাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে পারে না । মাথায় কাপড় দিয়ে একটা বিড়ে তৈরি করে মালসা তে তুষ বা ঘুঁটে জ্বালিয়ে বাপের বাড়ি পালিয়ে যায় , কোঁচড়ে থাকে গুঁড়ো ধুনো ......মাঝে মাঝে সেই ধুনো মালসাতে ছড়িয়ে দেয়......দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন .....লোকে ভাবে অশরীরী , আলেয়া ! কিন্তু সবাই কি বোকা হয় ! যারা ধরা পরে তারা আরও গভীর তর অন্ধকারে হারিয়ে যায় । নীলমণি সারা দিন পালকিতে বসে পান করেছেন , খাস লোক ভৈরব ও একেবারে বঞ্চিত হয় নি । তার পা একটু একটু টলছে , মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে কিছু বলছে ...... চলতে চলতে শ্মশান এসে গেল । শ্মশানের পাশ দিয়ে রাস্তা টা সোজা কোম্পানির বড় রাস্তায় মিলেছে .......সেখান থেকে নীলকান্তর গ্রাম একটু খানি পথ । গভীর রাত ....ঝিঁ ঝিঁ আর ব্যাঙের কলতানে মুখর .......মাত্র কটা মশালের আলো অন্ধকার কে আরো ঘন করে তুলছে । প্রবল বাতাসে মশাল ও নিভু নিভু ......বাঁ দিকে ভয়াল ভয়ংকর বৌ ডুবি ! সবাই গায়ে গা ঠেকিয়ে ঘন হয়ে ইষ্ট নাম জপতে জপতে হাঁটছে । কিন্তু এই শ্মশানের বিস্তার ও তো কম নয় । 
ভয়ঙ্করের আকর্ষণ সাংঘাতিক , না চাইতেও সবারই চোখ চলে যাচ্ছিল শ্মশানের দিকে ..... আশ্চর্য একটা চিতা জ্বলছে ! বেশ দূরে কিন্তু কোন লোক দেখা যাচ্ছে না । বোধহয় কোন নিভন্ত চিতা প্রবল বাতাসে নতুন করে জ্বলে উঠেছে ......সবাই ভয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলো ! হঠাৎ ভৈরব উল্লাসে চিৎকার করে বলল , 'বড় কত্তা আলেয়া ! ধরবো না কি ? '
--' বলিস কি , কই দেখি ? '
হ্যাঁ আলেয়াই বটে , জ্বলন্ত চিতার একটু দূরে দপ দপ করে জ্বলছে .... কিন্তু ভৈরব ধরবে কাকে ?
কোন মানুষ তো দেখা যাচ্ছে না ।
---' নামা , পালকি নামা ....'....নীলমনির আদেশ করলেন , বেহারা গুলো ভয়ে আতঙ্কে বোবা হয়ে গেছে । নীলমণি পালকি থেকে বেরোলেন , ' চল আমিও যাবো ! '
এক জন বলল , ' কাকে ধরবি ভৈরব , ওখানে কেউ তো নেই , তোর মাথা খারাপ হলো নাকি , শিগগির চল ...... এখানে থাকতে নেই , বাঘ ভালুক ও আসতে পারে । ' 
ভৈরবের বেশ নেশা হয়ে গেছে , অথচ খানিক আগেও সাপের ভয়ে আল পথ দিয়ে যেতে চায় নি । যে নেশা শুধু সূরার নয় ....অপরাধের ও ।এবার আর মুখের কোনো আগল রাখলো না , অশ্রাব্য ভাষায় গালি গালাজ করে বললো , ' থাক তোরা এখানে , আমি আর বড় কত্তা গিয়ে মাগী কে ধরে আনছি , তোদের কাজ বাড়লো, আজ আর তোদের বাড়ি যাওয়া হবে না ....বাগান বাড়ি চল ! '  Bangla Golper Boi  Online Reading
নীলমণি ততক্ষনে শ্মশানে নেমে পড়েছে । ভৈরব আগে আগে ছুটে যেতে চাইছে ..... একে গভীর অন্ধকার তার ওপর চার দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আধ পোড়া কাঠ , অর্ধ দগ্ধ দেহাংশ ... খুলি দুজনেই হোঁচট খেতে খেতে এগোতে লাগলো । দুজনেই দেখছে অস্পষ্ট নারী অবয়ব ... মাথায় আগুন ....জ্বলন্ত চিতার আলোতে যে টুকু দেখা যায় । কিন্তু কোথায় , চিতাটা এসে পরলো কিন্তু আলেয়া সেই একই দূরত্বে , রোখ চেপে গেল দুজনেরই .......' যাবি কোথায় শালী ধরবই আজ তোকে ! ', ভৈরব দৌড়ালো .... নীলমণি হোঁচট খেয়ে পড়ল চিতার কাছে ....জ্বলন্ত একটা কাঠ হাওয়াতেইই যেন খসে পড়লো তাঁর ওপর । সহজ দাহ্য সুরা সিক্ত পরিধান দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো , ' ভৈরব ' বলে আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি ...... কিন্তু ভৈরবের কানে সে ডাক গেল না ....বাতাস লেগে আলেয়া ভেসে ভেসে এগিয়ে চলছে .... সেও দৌড়াচ্ছে ....এবার হোঁচট খেয়ে সেও পড়লো .... বৌ ডুবির দহের কাদায় মাথাটা পুঁতে গেল , ভারী শরীর টা উল্টে পরে ঘাড় টা ভেঙে দিলো । 
এই বিশ্বের কোথাও বসে বিধাতা পুরুষ তাঁর না মেলা হিসেব টা যেন মিলিয়ে নিলেন ।
(সমাপ্ত )
SHARE

Author: verified_user