Monday

একটা চিঠি - ভালবাসার অপর নাম | বাংলা গল্প

SHARE

একটা চিঠি - ভালবাসার অপর নাম | বাংলা গল্প



গল্প্ : একটা চিঠি, ভালবাসার অপর নাম।লেখা: নীল।

.
শীতল পাটি মাটিতে
বিছিয়ে শুয়েছিলাম।
ভালো লাগছিল, বাইরে মুষল
ধারে বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দে।
এপাশ ওপাশ করে সময়
অতিবাহিত করছিলাম। এমন
পরিবেশে কার না ঘুমাতে
ভালো লাগে। কিন্তু আমার
কিছুতেই ঘুম আসতে চাইছে
না। তবুও ঘুমানোর বৃথা
চেষ্টা করে যাচ্ছি
আধঘন্টা ধরে। মনে হয় ঘুম
বাবাজি আমাকে আর ধরা
দিবেনা। একপ্রকার বাধ্য
হয়েই ওঠে পড়লাম বিছানা
ছেড়ে। পায়চারি করতে
করতে ইজি চেয়ারটাতে
বসে কিছু ভাবতে লাগলাম।
ভাবনার বিষয় কি আছে তা
নিয়ে আমি খুব চিন্তিত?
নাহ! কোন কিছুই তো মনে
পড়ছে না।
.
তাকিয়ে আছি, বাইরের
ঠাঁই নিয়ে দাড়ানো
পুরাতন তাল গাছের দিকে।
বাবুই পাখির বাসা গুলোতে
খেয়াল করলাম, কোথাও
কোন পাখি নেই। বৃষ্টি আর
বাতাসের তোড়ে বাবুই
পাখিদের বাসাগুলো
ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল।
আর আমার হৃদপিন্ডের
ভিতরে কে যেন হাতুড়ি
দিয়ে পিটিয়ে দম টা বন্ধ
করার কাজে ব্যাস্থ ছিল।
চেয়ার থেকে ওঠে,
জানালার ধারে দাড়িয়ে
অতীতের কিছু দৃশ্যপট দেখার
চেষ্টা করলাম।
.
এতো ছোট? খড়ের চাল
দেওয়া এক কামরা ঘর। কেউ
কী এখানে থাকতে পারে?
আমি নীলার কথা শুনে তব্ধ
হয়ে গেলাম। তাৎক্ষণিক
আমি নিজেকে সামলে
নিয়ে বললাম:- হ্যা! থাকি
তো। এখানে আমি ও আমার
মা, দু'জনেই থাকি। আমার
এমন কথা তে নীলার চক্ষু
ছানা বড়!
.
দেখো নীল, ঠাট্টা করোনা
আমার সাথে। এসব আমার
একদম সহ্য হয়না, বলে
দিলাম।" নীলার এমন কথা
আমি শুনতে শুনতে অব্যস্ত।
কারন, আমি প্রায় সময় ওর
সাথে ইয়ার্কি করতাম।
তবে আজকে যে ওর সাথে
ঠাট্টা করছি কি না? তা
নিয়ে ওর মনে একটু সন্দেহ
কাজ করছে। তাই বলে উঠল,
চলো তাহলে, তোমার ঐ
বাসাতেই আমি বউ হয়ে
যাব। এখন মহা মুশকিলে পড়ে
গেলাম তো আমি।
ভাবনায় ডুব দিলাম।
আর হঠাৎ করে যে এমন
বায়না ধরবে নীলা, তা
বুঝতে আমার মিনিট দু'এক
সময় ব্যায় হলো। সম্ভীত
ফিরে ফেলাম নীলার ডাক
শুনে। অবশ্য, এতক্ষণে নীলা
ঘরের দরজা নক করছিলো।
আমি নীলার মত বোকা
মেয়ে খুব কম দেখেছি।
কেননা, দরজায় এতবড় তালা
ঝুলছে, তা সে দেখেনি।
আজ্ঞে মশাই! দরজায় তালা
দেওয়া দেখতে পাওনি
নাকী? আমার কথা শুনে
নীলা চুখ রাঙ্গিয়ে বললো,
চাবি দাও নীল?
**
আমি জানতাম, এমন কিছু
একটা হবে। তাই আগে
থেকেই পকেট হাতড়াতে
থাকলাম। "নীলা চাবি
বোধহয় হারিয়ে ফেলেছি"।
আমার এমন কথা শুনে সে
বললো, আমাকে বোকা
বলার আগে তোমার নিজের
দিকে একটু দেখবা। নইলে,
আমার মত খারাপ কেউ
হবেনা! হুম। যাও কিছু একটা
তো কর এখন? বাইরে একটা
পাথর দেখতে পেলাম,
তালা ভাঙ্গার কাজে বেশ
কাজে দেবে মনে হচ্ছে।
সফল হলাম প্রায় দশ মিনিট
চেষ্টার পর। অবশেষে
তালাটা ভাঙ্গতে
পারলাম।
.
দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ
করে চার পাশে ভাল করে
দেখতে লাগলাম। পশ্চিমের
দেয়ালে এক বৃদ্ধ মহিলার
ছবি টাঙ্গানো। উত্তর মুখো
একটা জানালা আর
জানালার পাশে একটা ইজি
চেয়ার। জানালা দিয়ে
বাইরের রাস্তার পাশে
তাল গাছটা খুব ভাল করে
দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য বাবুই
পাখি বাসা বেঁধেছে সেই
গাছে। এই জানালা দিয়ে
এতো অপরুপ দৃশ্য দেখার
সৌভগ্য আমার এই প্রথম।
নীলা তো খুব খুশী, যদিও
তার এই রকম ঘরে থাকার
অভিজ্ঞতা নেই বললেই
চলে। তবু ও আমার মনে হচ্ছে
কোথাও একটা গন্ডগোল
আছে। আর এই বৃদ্ধ মহিলাকে
আমি কোথাও যেন
দেখেছি। তবে মনে করতে
পারছি না এখন।
.
সাত পাঁচ ভাবনার মধ্যে
আটকে থাকলাম দু'দিন
যাবত। কিছুই মাথায় আসছে
না। এরকমটা কীভাবে হতে
পারে। তবে, কেন হলো
আমার সাথে এমনটা? মনে
হচ্ছে আমি এখানে আগেও
এসেছি, আর জায়গাটা খুব
পরিচিত।
.
মায়ের কথা খুব মনে হচ্ছিল।
আজ 'মা ' দিবস। বিশেষ করে
এই দিনটা আমি মায়ের জন্য
স্পেশাল রিজার্ভ দিন করে
রাখি। জানি, মায়ের জন্য
কোন দিবসের প্রয়োজন হয়
না। আমার কাছে
প্রতিদিনই মা দিবস। তবে
আজকের টা ভিন্ন বিষয়।
.*
ইজি চেয়ারটাতে শরীর
এলিয়ে দিয়েছি। চুখ বুজলাম
উত্তরের হাওয়ার পরশে।
গতকাল নীলা একটা চিঠি
পেয়েছিল বৃদ্ধ মহিলার
ছবির পিছনে। যদিও নীলার
কাছে ওই মহিলাকে আমার
মা হিসেবে পরিচয়
দিয়েছি। তাই ছবিটা
পরিষ্কার করছিল নীলা।
মোটা ফ্রেমের পিছনে পিন
দিয়ে আটকানো চিঠি টা
নীলার হাতে আসে। আর
রাতে বলে রাখে যে, আজকে
একটা সারপ্রাইজ আছে।
বরাবর ই সারপ্রাইজ নামক
শব্দটার আমার কাছে প্রবল
আকর্ষনীয় ব্যাপার। আর
আমার কৌতুহল দিগুন বেড়ে
গেল চিঠির কথা শুনে। কেন
না, আমি অনেক প্রশ্নের
সম্মুখীন হয়েছি এই দু'দিনে।
তবে এই মাত্র নীলা
চিঠিটা আমার হাতে
দিয়েছে। আর আমি চেয়ারে বসেই পড়তে শুরু করলাম।



.
.স্নেহের পুত্র।
.
জানতাম চিঠিটা একদিন তোর হাতে শোভা পাবে। তোর বয়স যখন ৪ বছর, সবে মাত্র মোটামুটি হাটতে ও বলতে শিখেছিস।তখন তোর মুখ থেকে মা শব্দটা পরিষ্কার ভাবে শোনতে পেতাম আমি। কত খুশি হয়েছিলাম? কারন সন্তানের মুখের প্রথম বুলি হয় মা নামের শব্দটা। আর সেটা শুনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তবে আমি তখন নির্মম পরিস্থিতির শিকার। 
.
রহিম ভাই খুব ভাল মানুষ ছিলেন, হাজারে একজন। তবে রহিম ভাইয়ের কোন উত্তরাধিকারী ছিলোনা। কারন রহিম ভাইয়ের কোন সন্তানাদি নেই। ওনার কথা অনুসারে আমাদের জমি জমা বন্ধক রেখে তোর বাবা বিদেশে যায়। তোর বাবা ছিলেন কৃষক। আয় রোজগার করে যা পেত, তা নিয়ে সংসারের হাল ধরা খুব একটা কঠিন কাজ ছিল। বিদেশে যাওয়ার পর তোর বাবার কোন খোজখবর পাইনি। হঠাৎ একদিন রহিম ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তোর বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছেন বিদেশে। আমি খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলাম তোর বাবার মৃত্যুতে। যখন জানতে পারলাম, আমার হাতে তোর ভবিষ্যত অনিশ্চিত। তখন রহিম ভাই এসে তোকে দত্তক নিতে চাইলেন। আমি আনন্দে রাজি হয়ে গেলাম। আর তোকে তুলে দিলাম রহিম ভাইয়ের কোলে। তুই খুব কেঁদেছিলি মা মা বলে। তোর কান্না দেখে আমিও আঁচলে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছিলাম। 
.
কষ্টে আমার বুকটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। তুই জানিস, তোর বাবার মৃত্যুশোকে দুই বার হার্ট এটাক হয়েছিল আমার। ডাক্তার বলেছিল আমি নাকী খুব বেশী দিন বাঁচবোনা। একদিকে তুই থেকেও নেই অন্য দিকে তোর বাবা। একূল ওকূল হারিয়ে আমি খুব একা হয়ে গেলাম রে। বাড়িতে বসে থাকতাম সারা দিন। চেয়ারে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতাম, বাবুই পাখির সংসার। ওফ! ওদের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, ওরা কতো সুখি? আমিও তো ওদের মত সুখী সংসার করতে চেয়েছিলাম। বিধাতা আমার কপালে সুখ দেন নি হয়তো।
.
শর্তানুসারে, তোর সঙ্গে দেখা করার কোন ক্ষমতা ছিলনা আমার পাঁচ বছর ধরে। পাঁচ বছর পর, যখন তোর স্কুলের যাওয়া আসার সময় হতো । তখন, আমি তোর সামনে যেতাম। কখনো পাগল সেজে, আবার কখনো ভিখারী। আর আমি তোকে প্রায় সময় বলতাম আমাকে মা বলে ডাকতো খোকা। আর তুই কি না আমাকে বলতি, আপনাকে মা ডাকবো কেন? আমার মা তো বাসায়। আর আমাকে ২ টাকা ভিক্ষা দিয়ে চলে যেতি। আমি সেই টাকা জমিয়ে রাখতাম। কোথায় জানিস, এখন যেই চেয়ারে বসে আছিস? ওই চেয়ারের নিচে মাটির ব্যাংকে। তোর আর আমার মধ্যে বাঁধা ছিল স্টাম্প নামক কাগজটা। ছিড়ে ফেলেছিলাম আমি সেই কাগজটা। যেই কাগজ মায়ের কাছ থেকে সন্তানের ভালোবাসাটা আদায় করতে দেয়নি। জানিস খোকা? কাগজ ছিড়ার অপরাধে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল পাগলাগারদে। উপাধি দেওয়া হয়েছিল পাগলি নামটা। অবাক হয়েছিলাম রহিম ভাইকে দেখে! পাগলাগারদ থেকে আমাকে নিতে এসেছিল।.
.
রহিম ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন ওনার বাড়িতে। আমার কতো খাতির করলেন? হরেক রকম ফলমূল খেতে দিলেন। আমি সব গো গ্রাসে গিলতে লাগলাম। রহিম ভাই আমার খাওয়া দেখে মুচকি হেঁসে বলেছিলেন, তুই সত্যিই একটা আস্ত পাগল। রহিম ভাইয়ের এমন কথা শুনে আমি ভাবলাম, সত্যিই কী আমি পাগল হয়ে গেলাম নাকী?আচ্ছা রহিম ভাই, নীল কোথায়? আমার প্রশ্ন শোনে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন ওনি। বুঝলাম না কিছুই? বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলাম।
.
মাথাটা ঝিমাচ্ছে, নীলা নামের মেয়েটা কে দেখেছিলাম পথিমধ্যে। যে তোর সাথে প্রায় সময় স্কুলে যেত। মেয়েটা খুব ভাল। তুই যে আমার ছেলে, এই কথাটা নীলা আর রহিম ভাই ছাড়া কেউ জানে না। আরে, আমি কেন রহিম রহিম বলছি? ও তো একটা শয়তান। ঐ শয়তানের হাসির কারনটা এখন বুঝতে পারছি। ফলমূল খাওয়ার পরে যেই দুধ টা খেতে দিয়েছিল? ওটাতে বিষ মেশানো ছিল। শেষ বারের মত তোর মুখটাও দেখতে পারলাম না। ভালো থাকিস। সময় বেশী নেই। আমি চলে যাচ্ছি না ফেরার দেশে।
.
ইতি
তোর মা।
.
আমার চুখ দিয়ে অশ্রু পড়ে চিঠিটা ভিজে যাচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কাঁদি। কিন্তু যখন দেখলাম নীলাও কাঁদছে। তখন আমি নিজেকে সামলে নিলাম।কারন নীলার চোখের পানি আমি একদম সহ্য করে পারিনা। পরে বুঝলাম, আমাকে এখানে আনার প্ল্যান ছিল নীলার।
.
তাকিয়ে আছি, বাইরের
ঠাঁই নিয়ে দাড়ানো
পুরাতন তাল গাছের দিকে।
বাবুই পাখির বাসা গুলোতে
খেয়াল করলাম, কোথাও
কোন পাখি নেই। বৃষ্টি আর
বাতাসের তোড়ে বাবুই
পাখিদের বাসাগুলো
ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল।
আর আমার হৃদপিন্ডের
ভিতরে কে যেন হাতুড়ি
দিয়ে পিটিয়ে দম টা বন্ধ
করার কাজে ব্যাস্থ ছিল।
চেয়ার থেকে ওঠে,
জানালার ধারে দাড়িয়ে আছি। নিশ্চয় আমার পালক বাবা নীলার সম্পর্ক মেনে নিবেন না। এতক্ষনে হয়তো আমাদের খোজা শুরু করে দিয়েছে।
.
ইজি চেয়ারটা সরিয়ে মাটি খুড়তে লাগলাম। মাটির ব্যাংটা হাতে আসলো। ভাংলাম, দুইশ টাকার মত আছে। একটা ধারালো রাম দা কেনার জন্য এই টাকাগুলো যথেষ্ট। রহিম নামের পশুটার মাথাটা যে ঘাড় থেকে আলাদা করতে হবে।
SHARE

Author: verified_user