Sunday

এক দিবসের গল্পঃ মা

SHARE

এক দিবসের গল্পঃ মা


এক দিবসের গল্পঃ মা
এক দিবসের গল্পঃ মা

নতুন একটা লাল টকটকে গেঞ্জি, আর এক বাক্স সুগন্ধি ছড়ানো দম পোলাও আমার সামনে। জিনীস দুটো দেখে আমার লোভী চোখ দুটি চকচক করছে।প্যাকেটটা খুলেই টকটকে গেঞ্জিটা পড়ে গোগ্রাসে সুগন্ধী বিরানীর প্যাকেটা শেষ করে ফেললাম। অনেক দিন পর নতুন কাপড় আর পেট ভরে ভাল খাবার, দিন আজকে ভালই শুরু হয়েছে। এত খেদে লেগেছিল বাসায় একা থাকা ছোট্ট বোনটার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
আবার এক দৌঁড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ানো সাহেবদের গাড়ির কাছে ছুটে গেলাম। এক জন বলল ঐ হারামীর বাচ্ছা আবার কি চাছ? কি ভাবছেন গালি শুনে আমি চলে এসেছি? আমি প্রতিদিন এই সব গালি শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি কিন্তু সত্যিই হারামীর বাচ্ছা, কি বিশ্বাস হয়না? আমার কিন্তু বাপের কোন পরিচয় নেই। ঐ যে কাওরান বাজার রেল লাইনের পাশে অনেক গুলো ঝুপড়ি ঘর আছে ঐখানের একটায় আমি থাকি।
খালেক চাচা নামের একজন আমাকে অক্ষর লেখা শিখিয়েছিলেন। সেই থেকে বাংলাটা পড়তে পারি। কিন্ত কিছুদিন আগে খালেক চাচা রেলে কাটা পড়ে। মজার ব্যাপার আমি কোন দিন স্কুলে যাইনি,আমি ভাল ইংরেজিও বলতে পারি। যেমন কেউ কিছু দিলে থ্যাংকইউ, ওয়েল কাম। আ লাভ ইউ আরো অনেক ইংরেজি জানি। কেউ কেউ ইংরেজি শুনে খুশি হয়। আবার অনেকেই আমার ইংরেজী শুনে বত্রিশটা দন্ত্য বের করে হাসি দেয়। আমার কিন্তু দারুণ লাগে। যাক অবশেষে অনেক বুঝিয়ে আর একটা প্যাকেট পেলাম। মা আজ দুমাস হল কোথায় জানি গেছে।
কেউ কেউ বলে তোর মা ট্রাক ড্রাইভার এর সাথে বাইগ্যা গেছে। বাইগ্যা যায়নি হয়ত আবার বিয়ে করেছে। আমার যে বোনটা আছে সে কিন্তু আমার আপন বোন না। মা একদিন কুলে নিয়ে এসে বললেন তোর বইন হইছ্যে। আমি ছোট্ট মানুষ এত কিছু বুঝি না। কিন্তু বোনটাকে আমি অনেক ভালবাসি। সমস্যা হয়েছে সকাল থেকে মা মা করে কেঁদে যাচ্ছে। কি করি একে নিয়ে?
ঐযে সাহেবরা বলল আজ নাকি মা দিবস। আচ্ছা এই দিবসে কি করে? ভাল ভাল খাবার, নতুন নতুন কাপড় দেয়? আমার মা গত চার বছর ধরে একটা শাড়ি পড়ে থাকে। গোসলের সময় শাড়ীটা খুলে শুধুই ব্লাউজ আর পেটিকোর্ট পড়ে বসে থাকে। কয়েকটা লোক মাঝে মঝেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত। মায়ের শাড়িটা অনেকদিন হয়ে গেল, ছিঁড়ে যায় যায় অবস্থা ।
আমি চুপিচুপি টাকা জমাচ্ছি, সামনের ঈদে মায়ের জন্য একটা নতুন কলাপাতা রঙের শাড়ি কিনব। কিন্তু বোনটা যে সকাল থেকে কেঁদেই যাচ্ছে। এই ছোট্ট বাচ্ছাকে আমি পালব কেমন করে? আমার আজ মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগছে। আমি কোন দিবস বুঝিনা, প্রতি দিন মা তোমার জন্য। কিন্তু আজ সাহেবদের মত বলতে ইচ্ছে করছে মাগো আমি তোমায় অনেক ভালবাসি। ইংরেজিটা কি জানি? ও মনে পড়ে পড়েছে আই লাভ ইউ মা। তুমি ফিরে এসো প্রতিদিনই আমদের মাকে প্রয়োজন। আমাদের কে রান্না করে খাওয়াবে। বুড়িকে দুধ খাওয়াবে কে? বুড়ি আমার বোনের নাম।
আহারে মা আর ফিরে আসে না।
বাঁশের চাটাই বাঁধা একটা লাশ তার সামনে। পা'দুটো বেরিয়ে আছে। লাশটার চারদিকে লোকজনের একটা জটলা বেঁধেছে। একজন বলল কীরে দাফন কাফন করবি না? আমি লোকটাকে সকালে আনা বিরিয়ানির প্যাকেটটা দিয় বললাম। ভাই কি করমু কিছুই জানিনা। আপনে একটা ব্যবস্থা করে দেন।
-ট্যাকা দে আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। লোকটা দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলল হারামীর বাচ্ছা সুখেই আছে বিরানী খায়। শড়ি কেনার জমানো টাকাগুলো সব দিয়ে দিলাম লোকটিকে। লোকটি টাকা গুলো নিয়ে চলে গেল। আমি আর আমার বোন লাশটার পাশে বসে আছি। সবাই যার যার মত চলে যাচ্ছে। আকাশ ঝাপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের গুড়ুম গুড়ুম শব্দে বোনটা ভয় পেয়ে আমায় ঝাপটে ধরে রেখেছে। আমরা ভিজে একাকার, আম্মা অনেক দিন পর আমাদের সামনে শুয়ে আছে....তবে মানুষ না লাশ হয়ে। খুব কষ্ট লাগছে আমার। এত কষ্ট কোনদিন লাগেনি। মাকে জড়িয়ে ধরে মা, মাগো বলে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে............বোনটা আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। আমি কাঁদছি আর বৃষ্টির ফোটা আমার চোখের জল মুছে দিয়ে যাচ্ছে, এক দিবসে মায়ের জন্য মা হারানোর আজন্ম কান্না।
এক দিবসের গল্পঃ মা
ম নি র মো হা ম্মদ!
SHARE

Author: verified_user