Friday

বাংলা বই চিলেকোঠার সেপাই । বই রিভিউ ১০১

SHARE

বাংলা বই  চিলেকোঠার সেপাই । বই রিভিউ ১০১



বাংলা বই  চিলেকোঠার সেপাই । বই রিভিউ ১০১

কিছু কিছু উপন্যাস যুগ যুগ ধরে পাঠকের মনের গভীরে দাগ কেটে যাবে। সুলেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত " চিলেকোঠার সেপাই " তেমনই একটি উপন্যাস।


বাংলা বই  চিলেকোঠার সেপাই । বই রিভিউ ১০১ উপন্যাস সংক্ষেপ :


উনিশ শত ষাট সালের দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও আন্দোলনের সাক্ষী চিলেকোঠার সেপাই। প্লট মূলত উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থান। গল্পের প্রধান চরিত্র রঞ্জু ওরফে ওসমান, ওসমানের বন্ধু আনোয়ার আর আলতাফ। আছে রিকশা শ্রমিক বস্তির বাসিন্দা খিজির। আনোয়ার বামপন্থী আর আলতাফ ডানপন্থী। আনোয়ার আর
আলতাফের কথোপকথনের মাধ্যমে লেখক অনেক জটিল রাজনৈতিক জটিলতাকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। গল্পের ফোকাস কখনো ছিল হাড্ডি খিজিরের উপর, কখনো বা আনোয়ারের
উপর। তবে পুরো গল্পে অস্তিত্ব ছিল ওসমানের।
ঢাকার এক ঘিঞ্জি গলির মধ্যে বাস ওসমানের। সে এক অফিসের জুনিয়র কর্মকর্তা। তার বন্ধু আলতাফ, আনোয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে কিন্তু ওসমান কোনকিছুতেই নেই। সে যেন চিলেকোঠাতে বন্দী। লেখক ওসমান চরিত্রটিকে রহস্যময় করে তৈরি করেছেন। ওসমান যে বাসায় ভাড়া থাকে সেটা আবার আইয়ুবপ্রেমী মহাজন রহমতউল্লাহর।
খিজির ছোটবেলা থেকে রহমতউল্লাহর মজুরী খেয়ে দেয়ে মানুষ হয়েছে ।
শ্রমিক হিসেবে থাকে তার গ্যারেজে। কিন্তু এই খিজিরই একসময় হয়ে ওঠে বিপ্লবী। বিভিন্ন প্রকার রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের সাথে সাথে খিজির তার মহাজন
রহমতউল্লাহর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। সৈনিকের গুলিতে মৃত্যু হয় খিজিরের।
আনোয়ার কলেজের শিক্ষক। ঢাকার উত্তাল আন্দোলন ছেড়ে সে চলে যায় গ্রামে। শ্রেণীবৈষম্য ভাঙতে সে বদ্ধ পরিকর।
আফসার গাজী, খয়বার গাজী, হোসেন আলী নামক শোষক মহাজনদের হাতে জিম্মি খেঁটে খাওয়া যমুনা পাড়ের সাধারণ মানুষদেরকে মুক্তি দেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য।
খয়বার গাজী, আফসার গাজী
লতায় পাতায় আনোয়ারের আত্মীয় হলেও সে তাদেরকে ক্ষমা করতে রাজি নয়।
কিন্তু না, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনা। শহরের রাজনৈতিক হাওয়া গ্রামে লাগলে উল্টে যায় সবকিছু। যেই মহাজনদেরকে গ্রামের মানুষ শাস্তি দিতে চেয়েছিলো, আলী বক্স আর আনোয়ারদের দাপটে মহাজনের অবস্থা যখন নড়বড় তখন সেই মহাজনেরাই নতুন রাজনৈতিক হাওয়ায় ফিরে আসে আগের অবস্থানে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়না ।
ওসমান কোন আন্দোলনে তেমন নেই কিন্তু সে দিন-রাত্রি স্বাধীনতা আর মুক্তি নিয়ে ভাবে। আন্দোলনে রাস্তায় বের হওয়া মানুষ দেখলে সে যেন ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে। উনসত্তর যে স্বাধীনতা আন্দোলনকে চূড়ান্ত রুপ দেয় আর এই উনসত্তুরই যে হাজার বছরের বাংলার শোষণ থেকে মুক্তির সুরাহা দিয়েছে লেখক ওসমানের চিন্তার মাধ্যমে তা দেখিয়েছেন।


বাংলা বই  চিলেকোঠার সেপাই পাঠ প্রতিক্রিয়া :

উপন্যাসটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে ১৯৭১ পূর্বকালীন বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও নানা ধাঁচের মানুষের যাপিত জীবন যা এই উপন্যাসের অন্যতম উপজীব্য। উপন্যাসটি শুরু হয় ওসমান গনিকে নিয়ে। একে একে আমরা দেখি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মিছিল, শবযাত্রাতে গুলিতে নিহত মৃতদেহের সঙ্গে শরিক হওয়া, শহীদের পরিবার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের তৎকালীন সাধারণ জীবনযাত্রা, মিছিল, গুলি, এমনকি নিজের অনাগত সন্তানের প্রতি
ভালোবাসাও থাকে উপন্যাসটিতে।
এখানে একদিকে উঠে এসেছে শহুরে ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা, অপরদিকে আছে আন্দোলনের জোয়ার। লেখকের একটি সুন্দর সার্থক উপন্যাস এটি যা আমাদের ১৯৭১ পূর্ববর্তী জীবন সম্পর্কে ভাবনার সেতুবন্ধন
করে। উপন্যাসটির শুরুতে যেমন থাকে ওসমান গনি, তেমনি শেষেও থাকে তাঁর অন্ধকারে মিলিয়ে বিলীন হওয়া। ১৯৭১ সালের আগে ঊনসত্তুররের গণআন্দোলনে তেমনিভাবে বিলীন
হয়েছে অনেক মানুষ, তাঁদেরই কিছু কাহিনী বর্ণিত আছে উপন্যাসটিতে।
আখতারুজ্জামান এর লেখার বৈশিষ্ট্য হল উনার লেখা অনেক বর্ণনাময়। তবে অতিরিক্ত বর্ণনা কখনই তাকে ভাসিয়ে নেয়নি। তার এই আনুপুঙ্খিক বিবরন কখনই বিরক্তিকর হয়ে উঠেনি, একঘেয়ে হয়ে উঠেনি কারন তিনি জানতেন কখন তাকে থামতে হবে।
উনার লেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল স্বপ্নচারিতা যা ঐন্দ্রজালিক এবং কিছুটা অতিপ্রাকৃত ছোঁয়ায় বিকশিত । আখতারুজ্জামান তার বিপ্লব সুট,টাই পড়া রুমে বসে তত্ত্ব দিয়ে এসব করান নি। তার বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছে বস্তির শ্রমিক বা গ্রামের চাষারা। সবশেষে চিলেকোঠার সেপাইকে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ বলা যেতেই পারে।
SHARE

Author: verified_user