Thursday

বই-গাভী বিত্তান্ত লেখক-আহমদ ছফা

SHARE

বই-গাভী বিত্তান্ত লেখক-আহমদ ছফা


bengali story books

প্রথম প্রকাশ-বইমেলা ১৯৯৫

দ্বিতীয় মুদ্রণ-সেপ্টেম্বর, ২০০২
প্রচ্ছদ-ধ্রুব এষ
মুদ্রিত মূল্য:১০০ টাকা
পৃষ্ঠা-১২৮
রচনাকাল -ডিসেম্বর ১৯৯৪ থেকে ১০ফেব্রুয়ারী ১৯৯৫




পথের রাজা যেমন রাজপথ তেমনি নীতার রাজা কি তা আর আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু কালেভদ্রে বিভক্তি ঠিক রেখে, নীতি এবং রাজার পরষ্পর স্থান বিনিময়ে, জগৎ জুড়ে এক আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।যেখানে রাজাই সর্বস্ব।
এই রাজার প্রভাবে স্বনামধন্য পরিণত হয় কুনামধন্যে, তবে একটু আলাদা কায়দায়।
এই স্বনামধন্যের অবস্থাকে সেই আমগাছের সাথে তুলনা করা চলে, যত্ন পরিচর্যার অভাবে যার আভ্যন্তরীণ ক্ষতি হয়ে যায়, অথচ সময় হলে আম পেঁকে লাল হয়ে ঝুলে থাকে দেখলে মনে হবে এর চাইতে সুদর্শন আম জগৎ জুড়ে হয়তো আর দ্বীতিয়টি নেই।
স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে যখন ছুরি চালানো হয় অজস্র পোকা গিলগিল করে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে।যিনি এই আম খেয়ে দেখেননি ভেতরের জগৎ তার অজানা।
এই রাজার প্রভাব কাব্যেও বিস্তৃত। কবিদের মাঝে একত্রিশ টি উপদল খুঁজে পাওয়াও দুঃসাধ্য নয়।
একদল বলেন "কবিতা হইবে প্রেমের গান" আরেকদল বলেন -"কবিতায় প্রেমের বচন গাওয়া অশ্লীলতারই নামান্তর, কবিতায় থাকিবে বিদ্রোহের ওঙ্কার, প্রকৃতি বন্দনার জায়গা কবিতা নহে"
আবার তিনি যে মাস্তানদের সর্দার সে তার অজানা।
এই রাজার প্রতাপে কেউ কেউ আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যান আবার কেউ মাটির সাথে মিশে যান।
এমন দলাদলির মাঝখানে আহমদ ছফা আবির্ভাব ঘটিয়েছেন আবু জুনায়দের মত এক নীরিহ প্রাণীর।
যিনি ভাগ্যক্রমে বেনীআসহকলা বাদ দিয়ে এক ডোরাকাটা দলের সাথে যুক্ত হন। bengali pdf 
তাঁর আবির্ভাবের ঘটনাকে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে তারাশঙ্করের "কবি " থেকে কিছু লাইন তুলে দেওয়া যায়
"শুধু দস্তুরমত এক বিস্ময়কর ঘটনাই নয়,রীতিমত এক সংঘটন,চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাৎ কবি হইয়া গেলো।"
তিনি অনেক আত্মবিশ্বাসীও বটে। তিনি বিশ্বাস করেন তাঁর সৌভাগ্যের বদৌলতেই আবু জুনায়দের মত একজন ছোটলোক(নুরুন্নাহার বানুর দৃষ্টিভঙ্গিতে) যে কিনা পড়াশুনা করেছেন শ্বশুরের টাকায়, আজ স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য।
এই একই কথা বারংবার মনে মনে ভেঁজে নেন, তারপর জনে জনে জাহির করে তার পেটের ভাত হজম করেন।
আহমদ ছফা নুরুন্নাহার বানুর যেই চরিত্র গুণ তুলে ধরেছেন তা একটি কেন বহুজীবন অবলীলায় ধ্বংস হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ, কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা আবু জুনায়েদ কিন্তু দৈত্যকুলে প্রল্হাদ।এ কি যেন তেন কথা!
হিরণ্যকশিপু যেমন প্রল্হাদের বিষ্ণুভক্তি দমাতে পারেনি তেমনি আবু জুনায়েদকে নুরুন্নাহার বানু কেন, কিমিয়া শাস্ত্রের গোপন রহস্য জানা অধমরাও দমাতে পারেনি। তাই অন্ততপক্ষে উপাচার্যের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটেনা।আবার সিন্ডিকেট বিহীন একজন উপাচার্য এত দিন ক্ষমতায় টিকে আছেন এটাই তো মহাবিস্ময়।
উপাচার্য হওয়ার পর আবু জুনায়েদের মাঝে বেশ কিছু পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায়।আগে বাজার ছাড়া
তার মুখে বুলি ফুটতো না আর এখন সভায় সভায় বক্তব্য দিতে দিতে আবু জুনায়েদের জিহ্বা শাণিত ।বিনা প্রস্তুতিতেই ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দিতে পারেন।
স্যুট টাই তার গায়ের সাথে এমনভাবে খাপ খেয়ে গিয়েছে গোথিক ধাচে তৈরী নিবাসেও তিনি কোট টাই ছাড়েন না।
নুরুন্নাহার বানুও তাকে আর আগের মত জব্দ করতে পারেন না।
কিছুদিনের মধ্যেই তার এক অমায়িক মানুষের সাথে পরিচয় হলো।
তিনি হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার শেখ তবারক আলী।
জানতে পারলেন তাঁর শ্বশুর মশাই তবারক আলীর অগ্রজপ্রতিম। সময়ের পালা বদলে শেখ তবারক আলী আবু জুনায়েদর জন্য অছিলা হিসেবে আবির্ভূত হলেন।কিসের অছিলা তাই হলো এখন উপজীব্য বিষয়
bengali ebook collection 
আবু জুনায়েদের অনেক শখ ছিলো একটি গাভী পালবেন।
শেখ তবারক আলীর কৃষি সংসক্রান্ত দর্শন খুব পরিষ্কার আর পাকাপোক্ত। তার সেই চিন্তাধারায় আবু জুনায়েদ যেন বহুদিনের লালিত স্বপ্নকে খুঁজে পেলেন।সাহস করে তবারক সাহেবকে জানিয়েই ফেললেন তিনি একটি গাভী পালতে চান। তবারক আলী ঠিকাদারির স্বার্থে যে পরিমাণ অর্থ মুক্ত হস্তে দান করেন তার কাছে একটি গাভী আর এমন কি?
কিন্তু প্রশ্ন হলো আবু জুনায়েদ এই গাভী নেবেন কিভাবে?লোকে কি বলবে
তাঁর চাচা শ্বশুর।
প্রথম সম্পর্কের ভিত্তিতে কিছু নিলে কাঁদা মাখামাখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশী কিন্তু শ্বশুর হিসেবে মেয়েকে তো কিছু দিতেই পারেন এতে দোষের কি?
হাতে পেলেন সুইডিস আর অস্ট্রিয়ান গরুর ক্রস একটি গাভী।এই গাভীকে কেন্দ্র করে যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তাতেই উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা নিহিত থাকতে পারে।
প্রকৃতির প্রতি আহমদ ছফার ভালোবাসা বারবার তাঁর লেখায় প্রকাশ পায়।এখানেও পেয়েছে।একজন মালির তার বাগানের প্রতি যে ভালোবাসা তিনি তুলে ধরেছেন যেখানে ফুলের মূল্য জীবনের চেয়েও বেশী এটাই তার প্রমাণ।
আবু জুনায়েদের মাধ্যমেও কিছু প্রকৃতি প্রেম তুলে ধরেছেন।গাভী শুধু পেলেই তো হলোনা,থাকার জন্য একটা বন্দোবস্ত করা দরকারও এ নিয়েও আবু জুনায়েদকে ভাবতে হলোনা।তৈরী হলো গোয়ালঘর
গোয়ালঘর তৈরী করতে সাহায্য করেছিলেন তবারক আলীর পুত্র আবেদ হোসেন।শুরুতে তার চরিত্র চিত্রায়ন দেখে মনে হলো, আহা! দেশের কি সুযোগ্য সন্তান, বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে পাচার হননি, দেশেই উদ্যোক্তা হয়েছেন।
শিক্ষার একটা দারুণ ডেফিনেশন আছে
"মানুষের আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তনকেই বলে শিক্ষা"
আবেদ হোসেন তীরে এসে দীলুর সাথে যে কান্ড দেখালেন তাতে কি মনে হয়, শিক্ষা ব্যার্থ?সমস্যা হলো লোকজন সেই কাঙ্খিত শব্দটা নিয়েই মতভেদে পড়বেন।আবেদ হোসেনের কৃত কাজ স্থান,কাল, পাত্র ভেদে কারও জন্য কাঙ্খিত হতেও পারে।
আবার গাভীতে আসি
গাভীর নাম রাখা হয়েছিলো তরণী। এই গাভীকে এক কথায় বলা যায় অনন্যা। তবে
এই গাভীর বর্ণনা করতে গিয়ে মাওলানা তাহের একে তুলনা করেছেন বুররাকের সাথে, দুটো পাখা বাদ পড়ে গিয়েছে আরকি।এইখানেও একটা মতভেদের ফাঁক রয়েছে অনেকে বলেন বুররাকের কোন পাখাই ছিলোনা।
আবার আল-বাকারা(The Cow) সূরাতে যেই গাভীর কথা বলা হয়েছে মাওলানা তাতেও সাদৃশ্য খুঁজে নিয়েছেন। এখান থেকেও একটা উদ্ভট ধারণা করা যায় আহমদ সফার এই উপন্যাসের নামটা
আল-বাকারা নাম দ্বারা বায়াসড, শুধুমাত্র নাম এর চেয়ে বেশী কিছু ভাবার অবকাশ নেই।
ওই প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্য খেলা থেকে যদি বলি
তাদের সেই স্বাধীনতা রয়েছে আমাদের নেই।আমরা তো গড়তে জানিনে।যাই হোক এই গাভী হয়ে দাড়ালো মধ্যমণি।একে পুঁজি করে একদল উপাচার্যের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছেন,
আবার একদল এই গাভী পালনকে বাঙালি ঐতিহ্যপালনে ব্রিটিশ কলোনিয়াল রীতিথেকে বের হয়ে আসার সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছেন।পারিবারিক কলহ ব্যাতিত
আবু জুনায়াদের সব কিছু ঠিকই যাচ্ছিল,অবস্থা আরও উন্নতি হচ্ছিলো কিন্তু একজন মনে করলেন এই গাভীর জন্য আজ আবু জুনায়েদ তার হাত ছাড়া,এই গাভীর জন্যই নুরুন্নাহার বানুর কন্যা দিলু আজ বখে গিয়েছে।তাই তিনি চিন্তা করলেন এই অন্তঃস্বত্বা গাভীটিকে বিষ খাইয়ে মারবেন।মৃত্যু জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।গাভী বিত্তান্ত বারবার রচিত হয় কাগজে নয় কালে।কালের সাধ্য নেই তারে ভোলে


এই রাজার প্রভাবে শিক্ষক হয়ে যান মাস্তান। 
আবু জুনায়দের উপাচার্যের আসনে আসীন হওয়ার ঘটনায় অনেকের অভিব্যাক্তি অনেকটা এমনই ছিলো।তবে কিছু জন দৈত্যকুলে প্রল্হাদের ন্যায় এই ঘটনাকেও সত্য বলে মেনে নিয়েছেন।
উপাচার্যের আসনে আসীন হওয়াতে আবু জুনায়েদের সম্মান,দম্ভ যতটা না বাড়ার কথা ছিলো তার চেও বহুগুণ দম্ভ বেড়ে গেলো তাঁর সহধর্মিণী নুরুন্নাহার বানুর।
নুরুন্নাহার বানুকে বর্তমান স্টার জলসার কুচক্রী নেপথ্য নায়িকাদের সাথে তুলনা করা চলে।পুরো উপন্যাস জুড়ে তিনি মনে মনে অনেক খই ফুটিয়েছেন।
তবারক আলীর সাথে আবু জুনায়াদের দুটি সম্পর্ক। এক হলো তবারক আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার, আর দুই হলো 
আবু জুনায়েদের ইচ্ছা অপূর্ণ রইলো না।
সংস্কৃতির ব্রাহ্মণ শিক্ষক আবার এই গাভীকে তুলনা করেছেন মৃগের ন্যায়।গাভীর সম্পূর্ণ গাঠনিক বিবরণের সাথে সাথে আহমদ ছফা একটা নির্দিষ্ট অঙ্গের কথা বারবার তুলে এনেছেন।যার প্রতি আবু জুনায়েদের তীব্র আকর্ষণ ছিলো।যেই অঙ্গ থেকে এমন এক স্মৃতি আবু জুনায়েদ রোমন্থন করলেন যা জনপ্রিয় লেখক ব্যাতিত অন্যকেও বললে অশ্লীল হয়ে যায়।
"যিনি গড়তে জানেন শিবও গড়তে পারেন,বাদরও গড়তে পারেন"
SHARE

Author: verified_user