Sunday

সম্পর্কের অসমতা - নূরনাহার বিনতে নূর

SHARE
                             সম্পর্কের অসমতা - নূরনাহার বিনতে নূর

সম্পর্কের অসমতা - নূরনাহার বিনতে নূর

জীবনের ২৭টি বসন্ত একা পার করে ২৮তম বসন্তে যখন কেউ একাকীত্বের সঙ্গী হয় তখন প্রকৃতির নিয়মেই সেই বসন্তের প্রত্যেকটি দিন বিশেষ স্মৃতিপূর্ণ হয়ে উঠে। সে স্মৃতি নিয়ে অনায়েসে পার করা যায় জীবনের বাকি বসন্ত।
আদির ২৮ তম বসন্তটিও এমন সুখের হতে পারতো যদি না হেমন্তের এক পরন্ত বিকেলে ঐ রকম একটা ঘটনা, না ঘটতো।
ঋতুরাজ হেমন্ত প্রকৃতির মাঝে তার আগমনি বার্তা জানান দিচ্ছে। কৃষকের ঘরে নতুন ধানের সমারহ।
হেমন্তের দুধ ভাই শরৎ যেনো আদির জীবনে আনন্দ ধারা নিয়ে আসে,, কিন্তু শরতের এমন কাজে হেমন্ত একটু কষ্ট পায় কারণ ঋতুরাজ শরৎ এ বিষয়ে হেমন্তের সাথে কোনো পরামর্শ করেনি। তাই ঋতুরাজ হেমন্ত শরতের পরিকল্পনায় পানি ঢালতে আদির জিবনে দুঃখের ধারা নিয়ে আসে।
আজ থেকে ঠিক চল্লিশ দিন আগে শরতের রৌদ্রজ্জ্বল দিনে কাশফুলের চিঠিতে!! নাহ তা বললে ভুল হবে।
ম্যাসেঞ্জারের তরঙ্গায়িত ঢেউয়ের নীল আলোতে মন দেওয়া নেওয়া হয়েছিলো আদি ও ইশিতা নামক দুই মানবের।
আদি!! বুয়েট থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত ভারবাহী কর্মকর্তা
। অন্যদিকে ইশিতা সদ্য মাধ্যমিক পাশ করা ভর্তি যোদ্ধা।
সম্পর্কের দিক থেকে আদির খালাতো বোনের ফুফাতো বোন ইশিতা।
সম্পর্কের সম্বোধন ভাই বোন হলেই বোধহয় ঠিক ছিলো কিন্তু বিধিবাম ইশিতার মুখে ভাই ডাক শুনলেই আদির বাঁচার সাধ কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
লাগাম দেওয়া ঘোড়া লাগাম ছাড়া হলে যা হয় আর কি।
প্রতিষ্ঠিত জীবনে বসন্তের দিনগুলো যেনো নিমপাতার রস হয়ে আসে, একাকীত্ব ঘিরে থাকে চারিপাশ।এসময় মন যেনো লাগামহীন হতে চায়। হতে চায় চড়ুই পাখির মতো দুরন্ত। লেকের ধারে প্রেমিক যুগলদের দেখে মন যেনো কিঞ্চিৎ ঈর্ষান্বীত হয়ে আক্ষেপ করে হায়! এই বসন্তে কোন প্রেয়সী যদি সঙ্গী হতো।
ইশিতাকে দেখে আদির মনেও এমন আক্ষেপের ঝড় উঠেছিল কিনা তা আমার যানা নেই তবে ইশিতার প্রতি অজানা এক টান অনুবভ করতো যার ফলস্বরুপ তৈরি হয় এক কালো অধ্যায়,,,
বিদ্রঃ সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখা। তাই ঠেলা ধাক্কা করার জন্য f, next লেখা থেকে বিরত থাকুন,গল্প আপন গতিতে
ইশিতার সাথে আদির প্রথম দেখা হয়েছিলো আদির সাজেদা খালার বাসায়।
আদির বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবি, সেই সুত্রে আদির শৈশব, কৈশোর কেটেছে ভিন্ন ভিন্ন জেলায়। মাধ্যমিক শেষ করে বুয়েটে চান্স পাওয়ার পর থেকে ঢাকাতেই থাকতে শুরু করে আদি।
ছোট বেলা থেকেই আদি ঘরকুনো স্বভাবের। কোনো আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে পুরো একদিন কাটানোর ইতিহাস আদির স্মৃতিপটে নাই।তাই খালা ফুফুদের বাসা থাকা সত্ত্বেও হোস্টেলে উঠে আদি।
তবে সাজেদা খালার বাসা হোস্টেলের কাছাকাছি হওয়ায় প্রতি শুক্র বার একবার করে ঢু মারতো আদি। সেই থেকে সাজেদা খালার পারিবারের সাথে অনেকটা খোলামেলা সম্পর্ক আদির। তাই চাকরিতে জয়েন করার পরও আদি তার সাপ্তাহিক ঢু মারা বহাল রাখে।
সেইদিনও বারে শুক্রবার ছিলো। খালাতো ভাইবোনদের সাথে জমজমাট আড্ডায় মেতে ছিলো আদি। সেইদিন আড্ডার মেইন টপিক ছিলো কে কেমন জীবন সঙ্গী চায় তা নিয়ে।
সবাই মনের মাধুরী মিশিয়ে যে যার যার মতো করে নিজের পছন্দের ফর্দ বলে যাচ্ছিলো। বাকি ছিলো খালাতো ভাই সৈকত আর আদি।
সৈকতের পালা আসতেই, সৈকত শার্টের হাতা গুটিয়ে একটু কাশি দিয়ে গলা পরিস্কার করে তার জারি শুরু করলো ,
—আমি সুবোধ বালক সৈকত, মনেপ্রাণে একজন চাকরিজীবি বউ চাই এবং বৌর কাছে বেশি কিছু চাইবো না, বাসর রাতে শুধু একটা জিনিসই চাইবো, ওগো,, তুমি আমার স্বাধীনতা টুকু কেড়ে নিও না।
মাসের হাতখরচ বাবদ দশ হাজার দিলেই চলবে। এর চাইতে একপাই ও বেশি নিবো না। প্রেয়সী আমার বলো তুমি রাজি!? রাজি! রাজি,,,,
যাত্রাপালার মতো সুরেলা কন্ঠে সৈকতের কথা শুনে সবাই স্বজোরে হেসে উঠে।পাশ থেকে খালাতো বোন সুইটি ফোড়ন কাটে,
—বাহ্ সৈকত ভাই বাহ্! তারিফ করতে হয়, কি শুনাইলা, লাজবাব! লিনা আপু মাথায় ঢুকিয়ে নেও ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে বলেই চোখ মারে সুইটি।
লিনা আর সৈকতের কিশোর প্রেম, যা আজ অব্দি বহাল আছে এবং কিছুদিন পরেই পারিবারিক ভাবে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। তাই মজা নিতে সুযোগ মিস করলো না সুইটি।
সুইটির কথা শুনে লিনা লজ্জায় লাল হয়ে উঠে অন্যদিকে আদি টেনশনে হাশফাশ করে। সবার বলা শেষ এবার তার পালা। সবাইতো যে যার মতো করে বলে দিলো এখন আদি কি বলবে!? এসব রসিকতায় আদি একদম কাঁচা তাই পানি খাওয়ার নাম করে কেটে পড়ার বৃথা চেষ্টা করতেই সবাই বেকে বসলো,
—কোথায় যাও আদি বাবু? এবার তোমার পালা, প্রেয়সীর গুণগান না গেয়ে কোথাও যেতে পারবা না। সো নো হাংকি পাংকি, লেটস গো স্টার্ট।
আদি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে ভাবতে লাগলো কি বলা যায়। ঠিক সেই মূহুর্তেই চোখ গেলো সিড়ির উপর, আদি সেই দিকে তাকিয়ে হা হয়ে গেলো।
আল্লাহ এইটা মানুষ না ঘাসফড়িং!!
খোলা এলোকেশে, দোহারা গরনের ছিপছিপে দেহ যেনো কচি কলাপাতার আবরণে আবৃত করা। প্রথম দেখাতেই বাকরূদ্ধ করার মতো চোখ ধাঁধানো রূপ।
মনের সুখে গুণ গুণিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছে ইশিতা।
ওর চঞ্চলতা আর পোশাকের রং যেনো ঘাসফরিঙের বহিঃপ্রকাশ। তাই সকল লাল পরী, নীল পরী বাদ পড়ে ঘাসফড়িং উপমাই মনে ধরেছে আদির।।
এই মুহূর্তে আদি যদি কোনো ম্যাজিক্যাল পাওয়ার পেতো তাহলে নিঃসন্দেহে কোলরিজের মতো ছয়শ লাইনের কবিতা লিখতে পারতো।
আদির ভ্যাবলাকান্ত চাহনি দেখে ইশিতা কিছুটা লজ্জা পেলো। তাই আদির হুশ ফেরাতে গল্পের আসরে এসেই কোনো রকম ভণিতা না করে ইশিতা বলা শুরু করলো,
—সরি গাইস! আগামীকাল আমার কোচিং এ মডেল টেস্ট পরীক্ষা। তার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আজকের আড্ডা মিস হয়ে গেলো। আই ব্যাডলি মিস ইট। তাই আর টিকতে না পেরে চলে আসলাম। তা কি নিয়ে গল্প হচ্ছিলো??
একদমে কথাগুলো বলে একটু দম নিলো ইশিতা।
ইশিতার প্রতিত্তুরে সৈকত বললো,
—রিয়েলি ইউ হ্যাভ মিসড্ এ্যা লট অফ ফান। ইটস ইউর আনফরচুনেট। বাট ইউ নো হোয়াট? তোমার অপেক্ষার প্রহর হুণে আদি এখনো তার প্রেয়সীর গুণগান গায়নি। তুমি এসেছো ভালোই হয়েছে, আদির অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। নে আদি এবার শুরু কর ভাই।
সৈকতের এমন হালকা রসিকতার সাথে সবাই পরিচিত তাই কেউ কিছু না বলে মুখ টিপে হাসতে লাগলো। এইদিকে একের পর এক চমক দেখে শ্বাস রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম আদির। প্রথম চমক ছিলো ইশিতা, যাকে সে এই প্রথম ঘাসফড়িঙের মতো লাফাতে দেখলো।
প্রথম চমক কাটিয়ে না উঠতেই সৈকতের রসিকতাও আদির কাছে আলাদীনের ধুয়া মনে হলো। যার ফলে আদির কাছে সব কিছু ধুয়ার কুন্ডলী মনে হতে লাগলো।
আদি মনে মনে সৈকতের পিন্ডি চটকাতে শুরু করলো, কি সাংঘাতিক রসিকতা!! এই মেয়েকে জীবনে এই প্রথম দেখলাম, নাম ধাম কিছুই জানিনা। আর সৈকত ভাই বলে কিনা আমি এই মেয়ের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছি!!
আস্তো বিটলা একটা, দিলো আমার প্রেস্টিজের পানচার করে। উফফ নো!! প্রথম দেখাতেই পানচার হয়ে গেলে বাকি জীবন কিভাবে কাটবে!!
এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মুখ ফসকে আদি বলেই ফেললো,
—কি বলেন সৈকত ভাই! আমি এই মেয়েকে চিনি না জানি না, আজই প্রথম দেখলাম। তাহলে প্রহর গুণার সময় এই মেয়ে আসে কিভাবে!?.
শত হোক নিজের প্রেস্টিজ রক্ষা বলে কথা, তাই একটু ভাব নিয়েই কথাগুলো বললো আদি।
আদির এমন আচরণে কারো মাঝে কোনো ভাবান্তর না হলেও একজনের মনে মেঘ নেমে এলো,
আদির বলা কথাগুলো তীক্ষ্ণ কাটা হয়ে বিধলো ইশিতার মনে। হওয়ারি কথা, যে মেয়ে সাবার কাছে রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ । যার পিছনে মহল্লার সকল ছেলে মরিয়া হয়ে আছে সেই মেয়ের সম্পর্কে আদি যা বললো তা শুনে ইশিতার মুখ বাংলার পাঁচ হওয়ারি কথা। মনে মনে তেলে বেগুনে জ্বললেও বাহিরে স্বাভাবিক রইলো ইশিতা। নিজের আসন গ্রহণ করে উৎসুক নয়নে আদির দিকে তাকাতেই আদি চোখ নামিয়ে নিলো।
সুইটি আদি ও ইশিতার মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিলো।
ওদের পরিচয় পর্ব শেষ হলে সৈকত বলে উঠলো,
—সীতার সাথে রামের পরিচয় পর্ব শেষ হলে আমারা পুনরায় আমাদের আড্ডায় ফিরে আসি। অন্তিম পর্বে সীতার আগমনে আড্ডার আয়ু দীর্ঘায়িত করা হলো, সবাই বলুন মঞ্জুর??
সবাই হাত তুলে উচ্চ স্বরে সম্মতি জানালো,
—হা, হা, মঞ্জুর।
তাহলে ভাই আদি, শুরু করো। তুমি অনেক ধানাইপানাই দিয়ে ফোলছো এবার আসল কথা বলো।
সৈকতের এমন প্রশ্নের জবাবে আদি একটু ভাবুক হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,
—আমার প্রেয়সী হবে ঘাসফড়িঙের মতো , যে কিনা ইতিং বিতিং লাফ দিয়ে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখবে আর দিনশেষে আমার বুকে মুখ লুকাবে।।
আদির এমন খাপছাড়া কথা শুনে সৈকত কপাল কুচকে ব্যাঙ্গ করে ফোঁড়ন কাটলো,
—আরে রাখ তোর ঘাসফড়িং। সবাই চায় শান্ত শিষ্ট লাজুক বউ আর উনি চায় ঘোড়ার মতো লাফানো বউ। শালা আহাম্মকের বাদশাহ! ইট, সিমেন্টের কংক্রিট দেখতে দেখতে তোর মাথাও কংক্রিট হয়ে গেছে। তবে তোর মাথায় আলকাতরা বেশি পড়ছে তাই আলকাতরার মতো চিন্তাভাবনা তোর, সহজে বের হয় না। ঠেলা ধাক্কার পর যাই বের হয় কোনোটাই ঠিকঠাক হয় না।
সৈকতের এমন রসিকতায় আদির একটু মন খারাপ হলেও সবাই খুব মজা পায়।
সৈকত আদিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইশিতাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো,
—নাউ লেটস্ গো স্টার্ট ইশিতা। এবার তোমার পালা।
ইশিতা ভাবতে একটুও সময় নিলো না। ফটাফট উত্তর দিলো,
—উমম, আমার ব্যাটার হাফ আমার চাইতে বয়সে অনেক বড়ো হবে। আমাকে সে পিচ্চি ভেবে অনেক বেশি ভালোবাসবে।
—আসলে তোর বুইড়া জামাই লাগবে সেটা বললেই পারিস এতো রংচং মেখে বলার কি দরকার।চিন্তা করিস না তোর কপালে বুইড়া জামাই ই জুটবে।
সুইটির কথার সাথে সবাই সায় দিয়ে হাসির রোল তুলে। এইভাবে হাসি, উল্লাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেইদিনের আড্ডা।
আড্ডা শেষ হওয়ার পরও অনেকটা সময় সাজেদা খালার বাসায় ছিলো আদি। তখন টুকটাক কথার ছলে ইশিতার ফেসবুক আইডির নাম জেনে নেয়। ইশিতার প্রতি আদির আজকের এই সখ্যতাই আগামীকাল কাল হয়ে দাঁড়ায়
সেদিনের পর থেকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে প্রতিদিনই টুক টাক কথা চালাচালি হতো আদি ও ইশিতার মাঝে। দিন যায় কথা চালাচালির গতিও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। হুমায়ুন আহমেদ যথার্থই বলে গেছেন, একজন ছেলে আর একজন মেয়ে নাকি কখনো বন্ধু হতে পারেনা। কেউ না কেউ প্রেমে পরবেই। হোক সে দুদিন আগে বা পরে প্রেমে সে পড়বেই।
একথার ভিত্তি সবার জন্য কতটা যুক্তি যুক্ত তা আমার বোধগম্য না হলেও আদি ও ইশিতার মাঝে কতটুকু সত্য তা আমার বোধগম্য।

bangla ebook

ইশিতার ম্যাসেজের আশায় চাতক পাখির মতো অপেক্ষার প্রহর গুণে আদি।ম্যাসেঞ্জারের টুং টাং শব্দ শুনলেই আদির বুকে কাপন উঠে এই বুঝি ইশিতা ম্যাসেজ দিলো। মনের অস্থিরতা কমাতে সাজেদা খালার বাসায় ঢু মারা বাড়িয়ে দিলো। তবু আদির শান্তি হয় না। মনের মধ্যে আকুম বাকুম করে সব সময়। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেনা পাছে বন্ধুত্ব নষ্ট হবে বলে।
অন্যদিকে ইশিতা এইসবের ধার ধারে না, সে চলছে তার মতো। পড়াশুনা, কোচিং এসব করে তার দিন পার। রাতে পড়ার ফাকে এফবিতে ঢু মারে, প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আবার লগআউট করে।
কিন্তু বিধীবাম দিনদিন আদির অস্থিরতা বাড়তে থাকে, নাওয়া খাওয়া সব লাটে চড়েছে।নেহাত আদির বাবা মা ঢাকার বাইরে নইলে আদির ভ্যাগাবন্ড অবস্থা দেখে তারা যেকোন সময় হার্ট ফেইল করতো।
নিজের প্রতি নিজেই অবাক হয় আদি! কি ছেলে ছিলো আর কি ছেলে হচ্ছে! এতোদিন একা সে দিব্যি ছিলো, হঠাৎ করে কোথাকার কোন ইশিতা এসে সব ভ্যানিস করে দিলো। নাহ! এভাবে আর কয়দিন চলবে! এভাবে চলতে দিলে অচিরেই হেমায়েতপুর তার ঠিকানা হবে। আজকে যেভাবেই হোক বলবোই।
বলাবাহুল্য আজ পর্যন্ত আদির স্টাইলে প্রপোজ করার পাতিহাঁস ইতিহাসের পাতায় আর দুইটা খুজে পাওয়া ভার। সারাদিন অসংখ্যবার বলে বলে প্রেকটিস করলেও কাজের সময় ঠিকই তালগোল পাকিয়ে গেলো।
রাতের খাওয়া আগেভাগেই সেরে নিলো আদি। বেশি দেরি করলে টেনশনে খেতে পারবে না এই ভয়ে।সব কাজ শেষ করে আটঘাট বেধে ল্যাপটপটা অন করলো আদি। কাপা কাপা হাতে ফেসবুক লগইন করলো।
এই মুহূর্তে আদির নিজের প্রতি চরম বিরক্তি হলো, এখনি যদি কাপাকাপি শুরু হয় তাহলে যুদ্ধে জয়ী হবে কিভাবে!
ইশিতাকে প্রেম নিবেদন করা আদির কাছে বিশ্ব যুদ্ধের মতোই মনে হচ্ছে। যুদ্ধে তবুও রিস্ক কম, হয় ধন নয় প্রাণ রীতি কিন্তু এখানে ইশিতা কিভাবে রিএ্যাক্ট করবে তা ভাবতেই বার বার ঢোক গিলছে আদি।
ফেসবুক লগইন করতেই ইশিতা খানম নামের পাশে সবুজ বাতি দেখা গেলো। আদি কোনকিছু না ভেবেই ইনবক্স ওপেন করলো।অতিরিক্ত উত্তেজনায় হার্টবিট মিস করলো আদি।
ম্যাসেঞ্জারের টুং টাং শব্দে আদির ভাবনায় ছেদ পড়ে। ইশিতার ম্যাসেজ,
—হায়,, কি খবর??
—এইতো আছি আরকি, গরিবের আবার খবর😒।তোমার কি খবর??
—আপনি যেমন দোআ করছেন
—দোআ তো সবসময় ভালোই করি,, আমাদেরই কেউ দেখে না😞😒
—কি হইছে বলেন তো? এতো মনমরা হয়ে আছেন কেনো??
—হাহ্! আমার আবার মন আছে নাকি!?হাসাইলা।
—এইবার কিন্তু বেশি বেশি হইতেছে😠
—কি বেশি বেশি হইতেছে!? আমিতো কিছুই দেখতে পারছিনা😉
—খাঁটি বাংলা ভাষায় কুয়ারা করতেছেন আবার বলেন দেখতেছি না😏😏
—হাহাহা,,, 😃😜😁,,,, কুয়ারা খায় না মাথায় দেয়!?
😫😏😕😕😕😠
😍😍😘😘
লাভ ইমোজ দিয়েই আদি ডাটা অফ করে দেয়। ইশিতাকে এভাবে রাগিয়ে দারুণ মজা পায় আদি। মেয়েটা রাগলে অসম্ভব সুন্দরি লাগে। ওর রাগি রাগি মুখটা কল্পনা করে এক অজানা ভালো লাগা দোল খেলে আদির মনে।
আদি জানে ইশিতার মনে এখন কি চলছে? আদির পেটের কথা না জানা পর্যন্ত ইশিতা শান্ত হবে না।আর কারণ জানার পর পরই ইশিতা মড়িয়া হয়ে উঠবে আদির মন ভালো করার জন্য। ইশিতার এই এক্সট্রা কেয়ারিংটাকেই মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করলো আদি।।
হাত কাপাকাপি, হার্টবীট সব কিছুই নরমালে চলে আসছে তাই আদি একটু পরে আবার ডাটা অন করে ম্যাসেঞ্জার অন করলো।
আদিকে অনলাইনে দেখা মাত্রই ইশিতা সাথে সাথে ম্যাসেজ দিলো,
—কি ব্যাপার? কথার উত্তর না দিয়েই চলে গেলেন যে!
—দুঃখ কমিয়ে আসলাম, এই জীবনে দুঃখ বেশি হয়ে গেছে 😖😭😪
আদির ভনিতা দেখে ইশিতার পিত্তি পর্যন্ত জ্বলে যাচ্ছে, তবু নিজেকে সংবরণ করে টাইপ করলো,
—আহারে! সো স্যাড আমাকে বলেন কি হইছে?
—কি আর বলমু,, 😒 আমি এতোটাই খারাপ!! কারো চোখেই পরিনা,,😖এসব বলতে গেলে আমার চোখে পানি চলে আসে😪,, আ আ আ😭😭
ইশিতার বিরক্তি চরম শিখরে পৌছে গেছে, তাই কিছু না বলে চুপ করে রইলো। ইশিতাও খুব ভালো করে জানে ইশিতার নিরবতা আদি সহজে হজম করবেনা। ধুররর, এই কথাটা আগে মাথায় আসেনি কেন?
ইশিতার নিরবতা টের পেয়ে আদির হুশ ফিরলো, হায় আল্লাহ ইশু কই গেলো!! ইশু,,!!? পড়িমড়ি করে ব্যাস্ত ভঙিতে টাইপ করে আদি,
—ওগো, কই গেলা??
😕😕
—সরি,,, ভুলে টাইপ হয়ে গেছে।
—এই রকম ভুল করে আর কাকে কাকে ওগো ডাকেন?
😖কাউকে না তোমাকেই এই প্রথম ডাকলাম, সরি বলছি তো😖
—হুমম।
আদির হাত পা কাপাকাপি শুরু হয়ে গেছে, বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনা যাচ্ছে। মনে মনে দোয়াদরুদ পাঠ করা শুরু করে দিছে। আল্লাহর নাম নিয়ে কিবোর্ডে হাত দিলো আদি,
—ইশিতা আমারতো জিএফ নাই তুমি আমার জিএফ হবা? আমার বসন্তের সঙ্গী হবা?
আর কিছু লিখার মতো সাহস, শক্তি কোনোটাই আদির নাই। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে তাই চোখ বুজে সেন্ড বাটনে ক্লিক করেই ডাইনিং রুমের দিকে দৌড় দিলো আদি। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে সস্তির নিশ্বাস ফেললো । আহ্ শান্তি! বুকের উপর থেকে পাহাড় নামলো মনে হচ্ছে। নিজেকে ধাতস্থ হওয়ার একমিনিট টাইম দিলো আদি।পরক্ষণেই ছুটলো রুমের দিকে।
আদির ম্যাসেজ পড়ে ইশিতা হতবম্ব হয়েছিলো কিনা তা আমার জানা নেই তবে প্রিয়জনের কাছ থেকে ভালোবাসার কথা শুনতে কার না ভালোলাগে?
ইশিতার মনে এক অজানা অনুভুতি দোল খেলে গেলো। সদ্য ফুটন্ত ফুলে ভোমর বসে মধু খেতে চাইলে যা হয় আরকি।
মধু আহরণের সময় ফুলের অনুভূতি যেমন চির অজানা তেমনি এক অব্যক্ত অনুভুতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইশিতা।
ইশিতার হার্টবিট বেড়ে চলছে, লিখতে গিয়ে টের পেলো হাত কাঁপছে।কি লিখবে ইশিতা!?
ইশিতারতো সবসময় ইচ্ছে ছিলো বয়সে কিছুটা বড়ো হবে এমন ছেলেকে তার জীবন সঙ্গী করবে।যে তাকে পুচকি ভেবে ভালোবাসা দিয়ে সবসময় আগলে রাখবে। সেইদিক থেকে আদি সব দিক দিয়ে পারফেক্ট। দোটানায় পড়ে যায় ইশিতা।উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ম্যাচিউরিটি অর্জন করলেও যৌবনের ঔদ্ধত্যতার কাছে ততোটা শক্ত সামর্থ্য নয় ইশিতা। তাই কাঁপা কাঁপা হাতে কোন কিছু না ভেবেই হুমমমম লিখে স্যান্ড বাটনে ক্লিক করে।
ঐদিকে আদি তড়িঘড়ি করে ম্যাসেজ বক্স ওপেন করে।
ইশিতার হুমম লিখার অর্থ খুজতে গিয়ে পাগলপ্রায় আদি।
ও আল্লাহ এই মাইয়া হুমম লিখে কি বুঝাতে চাইলো হ্যা নাকি না!? আল্লাহ না হইলে আমি শেষ। আমারে তুমি তুইলা নেও আল্লাহ্।এই অশান্তি আর ভালো লাগেনা।
ইশু যেনো হ্যা বলে আল্লাহ্, তুমি একটু দয়া করো মাবুদ ।
অস্থির হয়ে উপরে দুই হাত তুলে মোনাজাত করার ভঙ্গিতে এসব বলে কিবোর্ডে হাত রাখলো আদি,
—এই মেয়ে হুমমমম মানে কি😖😔?
ইশিতা লাজুক হাসি হাসে😌
—জানিনা🙈🙈
😭😭জানোনা মানে কি? 😭😪
—জানিনা মানে জানিনা
—আমার এতো আবেগ কেরে!? আমার এতো কষ্ট লাগে কেন? তুমি আমাকে তুইলা নেও আল্লাহ😭😪😪
—ছিঃ কি বলেন এগুলা😥
😭😭
—আচ্ছা আমিকি আপনাকে না করছি? এতো কান্নাকাটির কি হলো😠
—হ্যা ওতো বলো নাই😪
—সব কথা মুখে বলতে হবে কেন 😌🙈আপনি বুঝেন না। 
— আল্লাহ সত্যিই😳
😌😌😌🙈
—ইয়েসস,,,, আই রিয়েলি লাভ ইউ ইশু, লাভ ইউ সো মাচ, 💑💏😘😘। তুমি কল্পনা করতে পারবা না আমি কতটা সুখি আজকে।
.
—মি টু,,, 😌
—উহুঃ নো টু,,, ভালোবাসি বলো😍😍
—যাহ্! আমার লজ্জা লাগেনা বুছি!!
—ওরে আমার লজ্জাবতীরে!! আসো কুলে নিয়ে আদর করি!,,,
—————
এরকম খুনশুটির মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিলো আদি ও ইশিতার মন দেওয়া নেওয়া। শুরু হয়েছিলো এক মিষ্টি ভালোবাসার গল্পো,,,।
পর্ব—৮
সম্পর্কের শুরুতে দিনগুলি কাটে ফ্রেমে বাধানোর মতো । প্রতিদিনই এক অজানা অনুভূতি স্মৃতিপটে জমা হয় । আদি ও ইশিতার দিনগুলিও তেমনি কাটছিলো। তবে আদির জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই ইতিহাসের পাতায় বিরল।
একদিকে আবাসিক দূরত্ব, অফিসে কাজের চাপ অন্যদিকে ইশিতার পড়াশুনার চাপ, সব মিলিয়ে একসাথে ফুচকা, চটপটি, আইসক্রিম খাওয়ার সময় হয় না কারোরই। তবে আদি যখনই সাজেদা খালার বাসায় যেতো তখনই ইশিতার জন্য ক্যাডবেরি নিয়ে যেতো।
শত ব্যাস্ততার মাঝে আদির ভালোবাসার মোড়কে মোড়ানো ক্যাডবেরি পেয়ে ইশিতা সন্তুষ্টির হাসি হাসতো। সেই হাসির মায়ার জালে সহস্র জনম পার করতে পারবে বলে মনে হতো আদির।
রাতে যমপেশ আড্ডা দিয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছিলো আদি। ঠোঁটে উষ্ণ ছোয়া পেয়ে একটু নড়ে চড়ে উঠলো।
চোখ না খুললেও আদি ঠিক বুঝতে পারছিলো কেউ একজন ওর ঠোঁট দুটো পরম যত্নে শুষে নিতে চাচ্ছে।
সাতসকালে কার মাথায় ভূত চাপলো,!! খালাতো ছোটনকে নিয়ে স্কুলে গেছে, সুইটি কোচিং করতে গেছে।
নাউযুবিল্লাহ কিসব ভাবতেছি!!!নাহ! এবার চোখ খুলতেই হয়। আমাকে পাগল করে দিচ্ছে একেবারে। আদি চোখ খুলতেই সাতসকালে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো।
ইশিতা!!! ইশিতা ওর মুখের উপর ঝুকে আছে। আদির বুঝতে কিছু বাকি রইলো না। আদি হতবম্ব হয়ে ভাবতে লাগলো,
ইশিতা এটা কি করলো!!সাতসকালে বাসি মুখে চুমু খেলো,, ইয়াক!!! আমিতো রাতে ব্রাশও করি নাই। ইহহি! গন্ধ লাগে নাই!!পাগল নাকি মেয়েটা!?
আদির হতবিহ্বল চাহনি দেখে ইশিতা মুচকি হেসে ওর গাল টেনে দিলো।আহ্লাদি গলায় বলতে লাগলো,
—কি হলো?আর কতো ঘুমাবা? এইবার ওঠো, সেই কখন থেকে তোমার জন্য ওয়েট করছি, একসাথে নাস্তা করবো বলে।
ইশিতার স্বাভাবিক কন্ঠে বলা কথাগুলো শুনে আরো অবাক হয় আদি। ইশিতার কথা শুনে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগে কিছুই হয়নি। তাই বিস্ময় ভরা কন্ঠে আদি বলতে লাগলো,
—ইশু তুমি!!! একা আমার রুমে, কেউ যদি দেখে ফেলে!!
আদির কথা শুনে ইশিতা মুচকি হাসলো, জানালার পাশে গিয়ে পর্দা সড়াতে সড়াতে বললো,
—বাসায় কেউ নেই শুধু তুমি আর আমি ছাড়া। সবাই যার যার কাজে বাইরে গেছে ফিরতে সবার দেরি হবে
। সো নো টেনশন ডু ফুর্তি।
সবাই বাইরে গেছে শুনে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো আদি।
পরক্ষণেই সচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—এই আজাকে তোমার কোচিং নাই??
—নাহ্, আজকে নেই। তার জন্যই তো ডিসাইড করলাম আজকে তোমাকে টাইম দিবো।
প্রেয়সীর মুখে গ্রিন সিগনাল পেয়ে দুষ্টু মিষ্টি ভাবনা দোল খেলে যায় আদির মনে। তাই দুষ্টু হাসি মুখে নিয়ে আদি বলে,
—আচ্ছা!! তা মহারাণী টাইম যখন দিবেন দূরে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো কাছে আসেন।
ইশিতা খিলখিল করে হেসে উঠে।
—উহুঃ নো হাংকি পাংকি। ফ্রেশ হও তাড়াতাড়ি আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি । আর যেনো ডাকতে না হয়।
আদি মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানায়,
—যথা আজ্ঞা মহারাণী!!
ওরা নাস্তা করুক আমরা বরং ডিনার করে আসি😊
SHARE

Author: verified_user