Wednesday

মেয়েটা খুব রোগা ছিলো, কিন্ত মুখটা খুব ঢলোঢলো | রোজ সাতটার বাসে উঠতো৷

SHARE


মেয়েটা খুব রোগা ছিলো৷ কিন্ত মুখটা খুব ঢলোঢলো৷ রোজ সাতটার বাসে উঠতো৷ নিত্যযাত্রী৷ রোজ দেখা হতো কিন্ত কথা হতো না৷ আমি তো নেমে যেতাম নাগের বাজারে৷ কিন্ত মেয়েটা কোথায় নামতো জানা হয়নি৷ মুখে মায়া মাখানো তার থেকে মায়া মাখানো বড় বড় চোখদুটিতে অসীম প্রশ্ন৷ আমি রোজ নামার সময় দেখতাম মেয়েটা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বসে থাকতো৷ চুল গুলো খোলা হাওয়ায় উড়তো৷ মুখটা যেন কত শ্রান্ত কত বিষন্ন৷ কোনদিন জানা হয়নি মেয়েটা কোথায় নামে৷ বাসের মধ্যে হাজার মানসিকতার লোক থাকে৷ কখনও কেউ কোন মেয়ের শরীর চোখ দিয়ে চাটছে কখনও বা হাত চলছে এদিক ওদিক৷

bangla golpo


আমরা যারা নিত্যযাত্রী তাদের মধ্যে একটা পরিবার পরিবার ব্যপার চলে আসে৷ রোজ যাচ্ছি রোজ দেখা৷ কেউ ঐ মেয়েটার সাথে খারাপ ব্যবহার করলে আমরা প্রতিবাদ করেছি৷ অনেক সময় বসার জায়গা দিয়ে হেল্প৷ মাঝে মাঝে তো ভিড়ের মধ্যে কিছুই করার থাকতো না৷ দুজনেই হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে আছি৷ ব্যাস এটুকু৷
বেশী কিছু না৷
দিনে হাজার কাজের মাঝে আর ফেসবুক , হোয়াটএ্যাপ , বন্ধু , বস সব মিলিয়ে মুহুর্তের বিরাম নেই৷
আর বাড়িতে মা আর বাবা তাই ভুলেও গেছি৷
তারপর কেটেছে অনেক বছর৷ ঐ সবুজ শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পরা মেয়েটাকে দেখা কমন হয়ে গিয়েছিলো৷ মাঝে মাঝে মানুষের কত রকম খেয়াল হয়৷ সত্যিই মনে হয় বাড়ি ঢুকেই মা কে জরিয়ে ধরবো৷ আর বলবো মা আজকের মাংসটা যা হয়েছে না? আর বাবার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা৷ পথের কোন শিশুকে কিছু খাবার কিনে দিতে , বা বন্ধুদের সব খুঁজে বের করতে৷ আর ইচ্ছা হতো ঐ মেয়েটিকে একটি লাল শাড়ি দিতে, না একটি নয় একজোড়া শাড়ি৷
কিন্ত এসব মধ্যবিত্তের মনে থাকে করা আর হয়ে ওঠে না৷ উৎসাহ আর সময়ের অভাব৷ তারপর বাবা অকালে চলে গেলেন৷ মায়ের আর রেখার পীড়াপীড়ি তে বিয়েটা সেরে ফেললাম৷
তারপর সেই দূর্ঘটনা....
বিয়েতে রেখার বাবা গাড়ি দিয়েছিলেন৷ প্রেমবিবাহ হলেও বেশ মোটা পণ আর যৌতুক পেয়েছিলাম আমি৷ লম্বা চওড়া, ভালো চাকরী, একটাই ছেলে, বাবার মোটা পেনশান, এমন ছেলেকে রেখার বাবা হাতছাড়া করতে চাননি৷ বিয়ের পর বছর খানিক তো রেখার রুপের স্রোতে ভেসেছি৷ মা হয়ে গিয়েছিলো একদম একা৷ শেষে মা ই একদিন বললো মা বৃদ্ধাশ্রমে যেতে চায়৷ আমি বারন করেছি কিন্ত থেকে যেতেও বলিনি৷
রেখা খুব করে বলেছিলো মায়ের যাওয়াটা ঠিক না৷ লোকে কি বলবে৷ কিন্ত আমার মাথায় তখন পুরো বাড়িতে ফাঁকা পরিবেশে রেখাকে আরও নিবিড় করে পাওয়ার উন্মাদনা৷
মায়ের চোখের শূন্যতা আমি দেখতে পাইনি বা দেখতে চাইনি৷ তবে মা মনেহয় বৃদ্ধাশ্রমে ভালোই ছিলেন৷
একদিন রাতে, আমি আর রেখা দুজনে ফিরছিলাম বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে৷ হঠাৎ করে বিকট আওয়াজে গাড়িটা যেন উড়ে গেলো৷ রেখা ছিটকে পড়েছিলো আর আমার তো কিছুই মনে নেই৷ জ্ঞান আসলে নিজেকে অসহ্য ব্যাথার মধ্যে পেয়েছি৷ কত মাস ছিলাম হাসপাতালে মনে নেই৷ রেখার সামান্য চোট ছিলো ৷ রোজ আসতো সে৷ আস্তে আস্তে রেখার আসা কমতে থাকে ৷ আসলে আসলে তো গলা পেতাম, গন্ধ পেতাম৷ আমি তো আজ অন্ধ৷
কিন্ত মা চলে এসেছিলো৷ আর এসেছিলো রেখার সই করা ডিভোর্স পেপার৷ আমি সই করে দিয়েছিলাম৷ সত্যিই তো রেখার জীবনটা নষ্ট করার অধিকার আমার নেই৷
শুনেছি তার বাবা আবার অনেক পণ দিয়ে জামাই পেয়ে গেছেন৷
আমি আর মা ফিরেছি বাড়িতে৷ সামনের দুনিয়াটা কালো হয়ে গেছে আমার৷ কিন্ত মায়ের কাছে সন্তান যত র্দূবল হয় তত হয়ত মায়া বাড়ে৷ কিছুদিন পর মা কাকে নিয়ে এসেছে৷ মেয়েটা আমার সারাদিন যত্ন করে৷ মেয়েটা খুব দেখভাল করে আমার৷ রত্না রোজ আসে৷ হয়ত আয়া৷ মায়ের বয়স হয়েছে পারেনা সব করতে৷ আর আমি তো জন্মান্ধ নই ভীষন অসুবিধা হয়েছে প্রথম প্রথম৷ আস্তে আস্তে শিশুর মত হাটা শিখেছি৷ ভারতবর্ষে কোটী কোটী অন্ধ মানুষ আছে কোনদিন ভাবিনি তারা কি ভাবে জীবন কাটায়৷ আসলে নিজের উপর দিয়ে না গেলে আমরা কোনকিছুই বুঝিনা৷ মায়ের চিন্তায় ঘুম হতোনা৷ আমাদের বাড়িটা বিক্রি করে দিলো মা৷ অনেক জায়গা নিয়ে মা আর বাবার সাধের বাড়ি৷ যে মহিলা কোনদিন ফ্ল্যাট বাড়ি পছন্দ করতো না আমাকে নিয়ে চলে আসলো ফ্ল্যাটে৷ দুই কামরার ফ্ল্যাট কিনে বাকি টাকা আমার নামে ফিক্সড করে দিলো মা৷ রত্না ও আসলো৷
তিন বছর পর মায়ের ক্যান্সার ছিলো জানতে পারলাম৷ তখন শেষ অবস্থা৷ মা ইচ্ছা করলে বাড়ি বিক্রির টাকায় নিজের জীবন বাচাতে পারতো কিন্ত মা তো শুধুই মা৷ মায়ের জন্য কিছু করতে পারলাম না কিন্তু মা আমাকে চোখদুটো দিয়ে গেলো৷
আজ প্রায় পাঁচবছর পর৷ আমি জব করছি৷ সমস্ত ফিক্সড টাকা দিয়ে দিয়েছি মা যেই বৃদ্ধাশ্রমে ছিলো সেখানে৷
সব পাল্টে গেছে৷ আবার জীবনের মূল স্রোতে চলে এসেছি৷
পাল্টাই নি মায়ের কেনা ফ্লাট আর মায়ের আদরের রত্না৷ বাসের কোনে বসা মেয়েটার নাম যে রত্না ছিলো সেটা জানতাম না৷ আমার এ্যাকসিডেন্টের পর খোঁজ নিতে এসেছিলো বাড়িতে৷ আসলে আমি বিশেষ ভাবে না খেয়াল করলেও রত্না আমাকে খেয়াল করতো৷ হয়ত ভালোলাগা ছিলো, বা ভালোবাসা৷
এক বাড়িতে দুটি বাচ্চার দেখাশুনা করতো রত্না৷ বাড়িতে শুধু মা৷ রত্নার হাতে মা আমাকে দিয়ে যান৷ আমি জীবনে, মা বেচে থাকতে অনেক নিজের মত চলেছি৷ আজ মা নেই কিন্তু আমি মায়ের কথা মত চলছি৷ রত্না কে বিয়ে করেছি৷ আর সুখের সংজ্ঞা জানিনা তবে আমি ভালো আছি৷ মা সবসময় বলতো তোর কিসে ভালো সেটা আমি ভালো জানি৷ আজ রত্নার মা আমাদের অভিভাবক৷ চাকচিক্য ময় জীবন নয় সহজ সরল জীবন আর রত্নার ভালোবাসা নিয়ে বেচে আছি৷
মাঝে মাঝেই রেখার সাথে দেখা হয় রেখার সন্তান হয়নি তাই নাকি অশান্তি৷ আর আমার ঘরে আজ কন্যাসন্তান জন্ম নিয়েছে৷ আমি জানি আমার মা ফিরে এসেছে মরে গিয়েও যে শান্তি পাবেনা মহিলা জানতাম৷ আর আমি যাচ্ছি রত্না আর আমার ছোট্ট মা কে আনতে৷
শেষ৷
নবনীতা কুণ্ডু
SHARE

Author: verified_user