Sunday

মেঘের আড়ালে চাঁদ - লেখা:ফারজানা আক্তার

SHARE
                              মেঘের আড়ালে চাঁদ - লেখা:ফারজানা আক্তার

megher arale chad



অফিস ব্যাগটা দরজা পর্যন্ত গিয়ে আতিকের হাতে দিয়ে নীরা বললো,আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।মা বাসায় একা,সুমিকে আমি অতটা ভরসা করতে পারিনা।মেয়েটা এমনিতেই কাজে অবহেলা করে,যা আমার একদম পছন্দ না।তুমি বাসায় থাকলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারবো।
কেন,তুমি কি কোথাও যাবে?জিজ্ঞেস করলো আতিক।
নীরা আমতা আমতা করে বললো,ভেবেছিলাম তো মা বাবাকে দেখতে যাবো।
নীরার মুখে কথাটা শুনে আতিক অবাক হলো।সত্যি তুমি মা বাবাকে দেখতে যাবে নীরু?
নীরা অভিমানী গলায় বললো,কোনো সন্দেহ আছে কি তোমার?
ছি!ছি!ছি!তা নয় নীরু।তুমি আজ দুই বছর পর হঠাৎ করে মা বাবাকে দেখতে ওই বাসায় যাবে বলছো,তাই একটু অবাক হলাম।
এবার নীরা কেমন যেন কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,জানো গতরাত থেকে মনটা ভালো নেই।মনটা ভীষণ ছটফট করছে।ইচ্ছে করছে এখনই উড়াল দিই বাবা মায়ের কাছে।
আতিক নীরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,মন খারাপ করোনা।তুমি তৈরি হয়ে টুপটুপকে নিয়ে এক্ষুণই চলে যাও মা বাবাকে দেখতে।এখানকার জন্য একদম চিন্তা করোনা।আমি যত তাড়াতাড়ি পারি চলে আসবো বাসায়।
নীরা মৃদু হাসলো।মনে হলো যেন জোড় করে এই ঈষৎ হাসিটুকু হাসলো সে।আতিককে বললো,তুমি কিন্তু আমাদের আনতে যাবে।
অবশ্যই যাবো পাগলি।আমি এখন যাই,দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আতিক চলে গেল।নীরা তার শাশুড়ি হালিমা বেগমের ঘরে গিয়ে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বললো,মা আমি টুপটুপকে নিয়ে একটু মা বাবাকে দেখতে যাবো।হালিমা বেগম হাদিস বই পড়ছিলেন।চোখ তুলে তাকালেন নীরার দিকে।সত্যি যাবে বউমা?
হ্যাঁ মা,যাবো।ভীষণ খারাপ লাগছে আমার।মন চাইছে পাখি হয়ে উড়াল দিই।প্রথমে ভেবেছিলাম মা বাবাকে আসতে বলবো।কিন্তু পরক্ষণে ভাবলাম,না তা হয়না।এই কয়বছরে মা বাবাই তো আমাকে এসে দেখে যায়।এভাবে আর কত কষ্ট দেবো তাদের।তাই আমিই যাবো আজ তাদের দেখতে।
হালিমা বেগম নীরার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,কেঁদনা বউমা।মা বাবার প্রতি সন্তানের অনেক দায়িত্ব থাকে।তুমি যদি তাদেরকে স্বশরীরে গিয়ে চোখের দেখাটুকুও না দেখ,তাহলে খারাপ দেখাবে।তুমি যাও,বেয়াই বেয়ানকে দেখে আসো।
নীরা চোখের পানি মুছে বললো,মা আমি দুপুরের রান্নাটা করে ফেলেছি।রাতেরটা সুমি করবে।ওকে আমি সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছি।
হালিমা বেগম বললেন,সেটা নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবেনা।আমি আর সুমি দু'জনে মিলে রেঁধে ফেলবো।
মা তা কি করে হয়?আপনি অসুস্থ।সুমিই সব করবে।
হালিমা বেগম হাসতে হাসতে বললেন,বয়স বাড়লে এমন একটু আধটু অসুখ থাকেই।কাজকর্ম না করলে তো শরীরে জং ধরে যাবে।তুমি দেরি না করে তৈরি হও,টুপটুপকে তৈরি করো।যাও যাও।
নীরা মনে অনেক প্রশান্তি পেলো শাশুড়ির কথায়।হালিমা বেগমের মত শাশুড়ি পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।এমন শাশুড়ি সব মেয়ের কপালে জুটেনা।এইদিক থেকে নীরা নিজেকে অনেক বেশি ভাগ্যবতী মনে করে।
-
আধঘন্টার মধ্যে ঝটপট তৈরি হয়ে গেল নীরা।কাজের মেয়ে সুমি নীরার তিন বছর বয়সের মেয়ে ছোট্ট টুপটুপকে পরীর মত করে সাজিয়ে দিলো।শাশুড়ির কাছে গিয়ে সালাম করে বিদায় নিলো নীরা।হালিমা বেগম নাতনী টুপটুপকে আদর করে দিয়ে বললেন,ভালো থেকো দিদিভাই।টুপটুপ দাদীকে বললো,তোমিও বালো তেকো দাদু।
টুপটুপ এখনো ঠিকমত সব কথা উচ্চারণ করতে পারেনা।ওর হ-জ-ব-র-ল কথা শুনলে সবাই ভীষণ হাসে।
-
একহাতে কাপড়ের ছোট্ট একটা ট্রলি ব্যাগ,আরেক হাতে মেয়ে টুপটুপকে নিয়ে বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে চললো নীরা।অবশ্য ওটাকে এখন আর বাবার বাড়ি বলা চলেনা।এখন ওটা ভাইয়ের বাড়ি হয়ে গেছে।যেখানে রয়েছে ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের একচ্ছত্র অধিকার।নীরা সেখানে এখন কেবল দুইদিনের মেহমান।আর নীরার বাবা মা?হুম,তারা বুড়ো-বুড়ি দু'জন বাড়ির এককোণায় কোনোরকমে পড়ে আছে।মন চাইলে কেউ খোঁজ নিচ্ছে,না হয়তো না।অবশ্য নীরার বাবা জহির সাহেব সরকারী চাকুরীজীবী ছিলেন বলে আজো তারা দুই পয়সার জন্য ছেলের কাছে হাত পাততে হয়না।পেনশনের টাকা দিয়ে সারা মাস দিব্বি চলে যায় বুড়ো-বুড়ির।
নীরা একটা সিএনজি ভাড়া করে মেয়েকে নিয়ে উঠে বসলো সেটায়।টুপটুপকে ভীষণ খুশি খুশি লাগছে।এইবার সহ ওর দ্বিতীয়বার যাওয়া হচ্ছে নানার বাড়িতে।প্রথম যখন গিয়েছিল তখন টুপটুপের বয়স ছিল তিন মাস মাত্র।নীরার কোলে বসে দিব্বি সুখে সিএনজি ভ্রমণ উপভোগ করছে টুপটুপ।নীরারও মনটা এখন কিছুটা হালকা লাগছে।অনেকদিন পর বাবা মাকে দেখতে যাচ্ছে।পথে মা বাবার জন্য কিছু খাবার কিনলো সে।বাবা সিঙারা খেতে খুব পছন্দ করে।এক দোকান থেকে গরম গরম সিঙারা কিনে নিয়েছে।মায়ের জন্য হরলিক্স,বাবার জন্য ফলের রসের কৌটা,আরো কয়েকপদের খাবার।নিশ্চয়ই মা খুব খু্শি হবে নীরাকে দেখে।বাবা তার নীরুকে দেখে চশমার ফাঁকে আনন্দ অশ্রু মুছবে।আর ভাবি তুহি?তুহি কি খুশি হবে নীরুকে দেখে?নাকি নীরুর হুট করে চলে আসাতে ভীষণ বিরক্ত হবে।হলেও হতে পারে।অথচ কলেজে পড়ার সময় নীরুর ভাবি তুহি নীরুকে বলতো,নীরু আমার বিয়ের পর কয়েকদিন পরপর কিন্তু আমাকে দেখতে যাবি আমার শ্বশুড় বাড়িতে।কত আপন ছিল তারা তখন।এখন ভাগ্যক্রমে নীরুর নিজের বাবার বাড়ি,নীরুর শৈশব,কৈশোর পেরিয়ে আসা ঘর বাড়িটাই তুহির সংসার।আর এখন সেই তুহি কতটা বদলে গেছে।নীরুকে যেন বিয়ের আগে কখনো দেখেইনি সে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নীরু চিরচেনা সেই বাবার বাড়িটার সামনে চলে এসেছে খেয়ালই করেনি।সিনএনজি ড্রাইভারের ডাকে তার সম্বিত ফিরে আসলো।দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নীরু।নীরুকে দেখে বাড়ির দারোয়ান হাবীব হাসতে হাসতে বললো,আরে নীরু আপা যে।দ্যান,দ্যান,ব্যাগগুলা আমার হাতে দ্যান।টুপুটুপকে গাল টিপে আদর করলো হাবীব।তারপর ট্রলি ব্যাগ আর খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে ভেতরে চলে গেল।নীরু টুপটুপকে হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে ভেতরে প্রবেশ করলো।নীরুর ভাবি তুহি নীরুকে দেখে প্রথমে ভূত দেখার মত চমকালো।মুহূর্তপর কপালের বিরক্ত চেহারাটা বদলিয়ে মুখে কৃত্রিম হাসি হেসে বললো,আরে নীরা যে কেমন আছিস তুই?বলেই নীরাকে জড়িয়ে ধরলো।নীরা ভদ্রতা রক্ষা করলো।তুহি বললো,এতদিনে তবে আমাদের কথা মনে পড়লো?নীরু চট করে বললো,মা বাবার কথা মনে পড়ছিল খুব,তাই দেখতে এলাম তাদের।নীরুর কথায় প্রচন্ড অপমানবোধ করলো তুহি।তবুও মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে বললো,শুধু কি মা বাবা দেখতে?আমাদেরকে দেখতে আসিসনি বুঝি!
নীরু মৃদু হেসে বললো,এত তাড়া কিসের ভাবি?অপেক্ষা করো,সময়ে সব হবে।তোমারওতো ছেলে মেয়ে আছে,আজ যা তুমি উপভোগ করছোনা তা ভবিষ্যৎ-এ নিশ্চয় উপভোগ করবে।পৃথিবী গোল বলে একটা কথা আছে তো!সবুরে মেওয়া ফলে,অপেক্ষা করো।একটানা কথাগুলো বলে নীরু বাবা মায়ের ঘরের দিকে চলে গেল।তুহি প্রচন্ড ধাক্কা খেলো নীরুর কথায়।কেমন যেন বিষফোঁড়ার মত যন্ত্রণা দিলো কথাগুলো তুহিকে।প্রচন্ড রাগ হলো তার।তবুও কিছু বললোনা।সহ্য তো করতেই হবে তাকে।কিন্তু এতদিন পর হঠাৎ করে কি মনে করে?
বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে নীরা দেখলো তার বাবা জহির সাহেব বিছানায় শুয়ে আছে।মা জোহরা বেগম বাবার পাশের বালিশে আধশোয়া হয়ে আছে।নীরা রীতিমত অবাক।বাবাকে কখনো সে এই সময় অযথা শুয়ে থাকতে দেখেনি।এমনকি এতোটা মলিন চেহারায়ও দেখেনি।বাবা সব সময় তার হাতাওয়ালা কাঠের চেয়ারে বসে নানান ধরণের বই পড়তেন।জীবনী সাহিত্যের উপর বাবার আকর্ষণ ছিলো বেশি।কিন্তু আজ লোকটা এভাবে শুয়ে আছে কেন?
জোহরা বেগম মেয়েকে দেখে শোয়া থেকে উঠে এসে জাপটে ধরলেন।
-কেমন আছিস মা?
-ভালো আছি মা।গতরাত থেকে মনটা কেমন যেন করছিলো।তাই সকাল না হতেই চলে এলাম।
-ভালোই করেছিস এসে।তোর বাবা গতকাল থেকে বলছিলো তোকে ফোন করে আসতে বলতে।তোর সঙ্গে কি একটা বিষয়ে কথা আছে।
নীরা বাবার দিকে তাকালো।যা ভেবেছিলো তাই হলো।বাবার চোখ দু'টি ঝাপসা হয়ে আছে।চোখের কোণায় জল।নীরা বাবার পাশে গিয়ে বসলো।
-কেমন আছো বাবা?
-শরীরটা ভালো নেইরে মা।তুই কেমন আছিস?
-এখানে আসার আগ অবধি ভালো ছিলামনা বাবা।এখন ভালো আছি তোমাদেরকে দেখতে পেয়ে।বলেই নীরা জহির সাহেবের কপালে হাত রাখলো।জ্বরে কপাল পুড়ে যাচ্ছে।
-একি বাবা তোমার তো জ্বর!!
নীরার মা জোহরা বেগম টুপটুপকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বললেন আজ তিনদিন ধরে জ্বর।শোয়া থেকে উঠতে পারছেনা।ঠিকমত খাওয়া দাওয়াটা পর্যন্ত করছেনা তোর বাবা।
-সেকি মা,ডাক্তারের কাছে নাওনি বাবাকে?
-হাবীবকে বলেছিলাম গতকাল তোর বাবার বন্ধু ডাক্তার হারুন চোধুরীকে আনতে!
-এনেছিল?
-হ্যাঁ,ঔষধ লিখে দিয়ে গেছে।হাবীবকে দিয়ে আনিয়েছিলাম।কিন্তু ঔষধ খাওয়ার পরও জ্বর কমছেনা।
-তাহলে তো হাসপাতালে নিতে হবে বাবাকে।
জহির সাহেব বললেন,এত অস্থির হচ্ছিস কেন নীরা?তুই আর নানুভাই এসেছিস না?এখন আমার জ্বর এমনিতেই চলে যাবে।
-বাবা প্লিজ হেয়ালি করোনা তো!মা তুমি ভাইয়াকে বলোনি?
-বলেছিলাম,অফিসে ঝামেলা আছে বললো।হাবীবকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতাল নিতে বললো তোর বাবাকে।
-হাবীব বাবার ছেলে,নাকি ভাইয়া বাবার ছেলে?
কথাটা শেষ না হতেই তুহি শরবত নিয়ে হাজির হলো।নীরার হাতে শরবতের গ্লাসটা দিয়ে বললো,জানো তো নীরা তোমার ভাইয়ের অফিসে অনেক ঝামেলা।এমনিতেই প্রমোশনটা আটকে আছে।এই সময় অফিস কামাই করা কি ঠিক হবে?আমিওতো মাকে বললাম হাবীবকে সঙ্গে নিয়ে বাবাকে হাসপাতালে নিতে।কে শুনে কার কথা।
এখন তুমি এসেছো,দেখ তুমি পারো কিনা।কথাগুলো বলেই নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে চলে গেলো তুহি এই ঘর থেকে।নীরা ভীষণ অবাক হলো।তুহিকে যতবারই দেখে নীরা,ততোবারই অচেনা লাগে।এই কি সেই তুহি?যে কিনা নিত্যান্তই একটা সহজ সরল ভালো মনের মেয়ে ছিল!অবশ্য আরো আগে নীরা তুহির আসল রূপটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলো।

new-bangla-golpo

-
মা তোমাদের জামাইকে ফোন করে বলতে হবে আমি পৌঁছে গেছি।পার্স ব্যাগ থেকে ফোনটা নিতে নিতে নীরা বললো।
জোহরা বেগম বললেন,জামাই এলোনা যে?
-আসবে মা,আমাদের যাওয়ার দিন নিতে আসবে।
পাশ থেকে জহির সাহেব বললেন,জামাইকে নিয়ে এলে ভালো হতো নীরা।আমার জুরুরি কথা আছে তোদের সঙ্গে।
-মাত্র এসেছি বাবা।তোমার সব জুরুরি কথাই শুনবো পরে।
ফোনটা হাতে নিয়ে আতিককে কল দিলো নীরা।
-হ্যালো শুনছো?আমরা পৌঁছে গেছি।
-তাই?কোনো সমস্যা হয়নি তো যেতে?
-না কোনো সমস্যা হয়নি।তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যেও।
-জোহুকুম মহারাণী।মনটা ভালো তো এখন?
-হুম অনেক ভালো।মৃদু হাসলো নীরা।তারপর আবার বলতে লাগলো,
-আমি এখন রাখছি,ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করবা কিন্তু।
-ঠিক আছে,সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো।আমার টুপটুপ সোনা কি করছে?
-মায়ের কোলে বসে আছে।রাখছি, কেমন?
-ঠিক আছে রাখো।
ফোনটা রেখে নীরা ব্যাগপত্র নিয়ে বিয়ের আগে যে ঘরে থাকতো সেই ঘরে চলে গেলো।
-
মেয়েরা বিয়ের পর যখন বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে তখন বিয়ের আগের যে জায়গাগুলো মেয়েদের সবচেয়ে পছন্দের,বাড়ির আনাচ-কানাচে যে স্থান গুলোতে একাকী সময় কাটাতো,সে জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখে,কিছুক্ষণ বসে সময় কাটায়,স্মৃতিচারণ করে।বাবার বাড়িতে বিয়ের আগে নীরারও একটা পছন্দের জায়গা ছিলো।সেখানে নীরা তার সময় কাটাতো।বই পড়তো সেখানে বসে।ছোট্ট একটা বাগানও করেছিলো নীরা।বাগানে গোলাপ,টগর,নয়নতারা,জুঁই ফুলের গাছ লাগিয়েছিলো সে।জায়গাটা হলো এই বাড়ির ছাদ।আজ হঠাৎ অনেক কথাই নীরার মনে হতে লাগলো।সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে নীরা টুপটুপকে নিয়ে ছাদে এলো।বাগানে ফুল ফুটেছে।দেখে মনে হচ্ছে কেউ নিয়ম করে যত্ন নেয়।ভাড়াটে কেউনা তো?নাকি মা যত্ন নেয়?
মা-ই হবে হয়তো।আনমনে কথাগুলো বললো নীরা।তারপর চোখ পড়লো চিলেকোঠার ঘরটার দিকে।চিলেকোঠার ঘরটার দিকে চোখ পড়তেই নীরার বুকের বামপাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো।কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই চিলেকোঠার ঘরে।যখন নীরার মন খারাপ হতো তখন সে ছাদে চলে আসতো।সময় কাটাতো এখানে বসে,কখনো বা বাগানের গাছগুলোতে পানি দিতো,যত্ন করে পোকা খাওয়া পাতাগুলো কাচি দিয়ে কেটে ফেলতো।ব্যাস,অজান্তে সময়টা কেটে যেতো।মাঝে মাঝে নীরাকে সঙ্গ দিতো তৌফিক।তৌফিক নীরাকে বাগানের গাছে পানি দিতে সাহায্য করতো,দুই একটা কথা বলে নীরাকে হাসিয়ে মন ভালো করে দিতো।এই মাঝে মাঝেটা এক সময় নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে গেলো।রোজ বিকেলে দু'জনে ছাদে বসে গল্প করতো। মাগরিবের আযান হলে তবেই নীরা নিচে নামতো,আর তৌফিক চিলেকোঠার ঘরে চলে যেতো।আবার কখনো কখনো নিঝুম,নিস্তব্ধ রাতে দু'জনে ছাদের কার্নিশে বসে জ্যোৎস্নার আলো গায়ে মাখতো,মজা করে নীরা তৌফিককে ছাদ থেকে ফেলে দেয়ার ভয় দেখাতো।কতইনা মধুর ছিল সেই মুহূর্তগুলো।
-
তৌফিক ছিলো কেমিস্ট্রির ছাত্র।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পড়ছিলো তখন সে।তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়।একবার রোড এক্সিডেন্টে তৌফিকের বাবা মা দু'জনই মারা যায়।তখন তৌফিক মেসে থাকতো কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে।বাবা মা মারা যাওয়াতে তৌফিকের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো।নীরার মা জোহরা বেগমের চাচাতো বোনের ছেলে তৌফিক।জোহরা বেগমই তৌফিককে এই চিলেকোঠার ঘরে থাকতে দিয়েছিলো,যাতে তৌফিকের খরচ কিছুটা কমে।বিনা টাকায় কারো বাসায় থাকতে তৌফিকের আত্মসম্মানে লাগছিলো।তবুও নীরার মা বাবার কথাকে অগ্রাহ্য করতে পারলোনা।তাছাড়া অভাবের সময় মানুষকে এতকিছু ভাবলে হয়না।লাজলজ্জা একপাশে ফেলে রাখাই তখন শ্রেয়।তখন থেকেই নীরাদের বাসার একজন সদস্য হয়ে গেলো তৌফিক।
প্রথম প্রথম নীরা-তৌফিক দু'জন দু'জনকে এড়িয়ে চলতো।কিন্তু ছাদে দুই একটা আলাপ-সালাপের মাঝে কি করে যেনো হঠাৎ করে মনের সখ্যতা গড়ে উঠলো তাদের।দু'জন-দু'জনের মনের কথাগুলো ভাগাভাগি করতে থাকে রোজ,স্বপ্ন বুনতে থাকে ভালোবাসার ছোট্ট একটা কুঁড়েঘরের।যেখানে নীরা আর তৌফিক সুখে-দুঃখে একে অপরের সঙ্গী হয়ে থাকবে।
-
নীরা আর তৌফিকের সম্পর্কের কথাটা কেবল নীরার প্রিয় বান্ধবী তুহি জানতো।নীরার মনের সব কথাই তুহিকে বলতো।তুহিও নীরাকে নিজের মনের সব কথা বলতো।কিন্তু সব কথার মাঝেও যে একটা কথা তুহি কখনই নীরাকে বলেনি সেটা নীরা পরে জানতে পেরেছিলো।যেদিন নীরার বড় ভাই আসফাক বাবা মাকে বলেছিলো সে বিয়ে করবে এবং নীরার বান্ধবী তুহিকেই করবে বিয়ে।সেদিন নীরা বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলো।যখন আসফাকের সঙ্গে তুহির দুই বছরের সম্পর্কের কথা জানলো তখন নীরা আরো বেশি কষ্ট পেলো।নাহ,নিজের ভাইয়ের সঙ্গে তুহির প্রেমের সম্পর্কের জন্য সে কষ্ট পায়নি,কষ্ট পেলো তুহির আচরণে,গোপনীতায়।তুহি একটিবারও বলতে পারলোনা নীরাকে?এটা যেনো কিছুতেই মানতে পারছিলোনা নীরা।পরদিন কলেজে গিয়ে নীরা তুহির সঙ্গে একটা কথাও বললোনা।যতোবারই তুহি নীরার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলো ততোবারই নীরা অভিমান করে তুহিকে এড়িয়ে চললো।শেষে তুহি নীরার হাত চেপে ধরে বললো,কি হয়েছে তোর বলতো নীরা?আমার সঙ্গে কথা বলছিসনা কেন তুই?
নীরা তখন কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,কি করে এটা করতে পারলি তুহি?
তুহি অবাক হয়ে বললো,
-কি করলাম আমি?
-জানি এখন না জানার অভিনয় করবি,এটা তোর কাছে কোনো ব্যাপারইনা।আচ্ছা,তোর কাছে কখনো আমি আমার মনের কোনো কথা কি লুকিয়েছিলাম তুহি?আমার সব কথাই তো তোর কাছে বলতাম।তৌফিকের সঙ্গে সম্পর্কের কথাওতো তোকে বললাম।আর তুই কিনা নীরবে আমার কাছ থেকে এতবড় একটা সত্যি লুকিয়ে গেলি?
-কোন সত্যির কথা বলছিস তুই?জানতে চাইলো তুহি।
নীরা তখন বললো,
-আমার ভাইয়ার সঙ্গে তোর কিসের সম্পর্ক?
নীরার মুখে এই কথা শুনে তুহির চেহারাটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে গেলো।নীরাকে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলোনা তুহি।কোনোরকমে বললো,
-তোর ভাইয়ের সঙ্গে আবার কি সম্পর্ক থাকবে আমার?
-নেকামু করিস না তুহি,প্লিজ।ভাইয়া তোকে বিয়ে করতে চায়।তোদের দুই বছরের সম্পর্ক।এটা কি মিথ্যা?
তুহি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
-জেনে যখন গেলি তখন তো আর লুকানোর অপশন নেই।
-এতদিন বলিসনি কেন আমাকে?
-আসফাক তোর বড় ভাই,বড় ভাইয়ের গোপন কথা ছোট বোনকে বলা কি ঠিক হতো?
-মানলাম তোর কথা,কিন্তু কারো সঙ্গে তোর সম্পর্ক আছে এটাওতো বলতে পারতি।আমি তো কখনো কিছু লুকাইনি তোর কাছ থেকে!
তুহি শান্ত গলায় নীরাকে বুঝাতে লাগলো,
-দেখ নীরা,আমি যদি বলতাম আমার কারো সঙ্গে সম্পর্ক আছে,তখন তুই জানতে চাইতি কার সঙ্গে আমার সম্পর্ক চলছে,একসময় আমার মুখ ফসকে আসফাকের নামটা এসে যেতো।
তুহির কথার পর নীরা আর কিছু বলার মত ভাষা পেলো না।শুধু চোখের জল মুছে বললো,তোদের পাশে আমি আছি।বাবা মাকে আমি বুঝাবো।তবে ভীষণ কষ্ট পেলামরে তুহি।
কথাগুলে অনর্গল বলে নীরা সেদিন তুহির সামনে থেকে চলে এলো।আর একটা কথাও বলতে দিলোনা তুহিকে সে।
-
তুহির আচরণে নীরা কষ্ট পেয়েছে ঠিকই,কিন্তু তুহির প্রতি বন্ধুত্বটা এতটুকুও কমেনি নীরার। মা বাবাকে বুঝালো সে,যাতে তুহির সঙ্গে আসফাকের বিয়েতে রাজি হয় মা বাবা।নীরার কথামত রাজি হয়েছিলো তারা।কিন্তু নতুন করে আরেকটা সমস্যা হাজির হলো।আসফাক বাবা মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে,আগে নীরার বিয়ে দিতে হবে।ঘরে ছোটবোনকে রেখে আসফাক বিয়ে করবেনা।তাছাড়া আসফাক বিয়ে করে ঘরে বউ আনলে নীরা আর তুহির মাঝে ঝগড়া হবে।
নিজের মায়ের পেটের ভাইয়ের মুখে এইকথা কোনো মেয়েই আশা করেনা,কষ্ট পায় শুনলে।নীরা কষ্ট পেলো।ফ্যালফ্যালকরে চেয়ে থাকলো ভাইয়ের মুখের দিকে।বাবা মা আসফাককে বুঝালো,
-তুই কথাটা একদমই ভুল বলেছিস আসফাক।নীরা কি ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার মত মেয়ে?এই কথাটা তোর মুখে এলো কি করে?
আসফাক তখন বললো,
-এসব আমাকে বুঝাতে এসোনা তো তোমরা!নীরা কতটা রাগী স্বভাবের তোমরা তা ভালো করেই জানো।আমি পরে সহ্য করতে পারবো না।তাই ঝামেলা আগেই শেষ করতে চাই।আমার এক কলিগ তার কাজিনের জন্য নীরার বিয়ের কথা বললো।ছেলেটাও ভালো,উচ্চ শিক্ষিত,ভালো বেতনের চাকরি।আমি ওদেরকে আসতে বলতে চাই।প্লিজ তোমরা ওকে বুঝাও।
ভাইকে এই মুহূর্তে নীরার অচেনা লাগছে।আসফাক কি করে নীরাকে ঝামেলা মনে করছে?বুকটা ফেটে যাচ্ছে নীরার।একটা কথাও বললো না সে।দৌড়ে ছাদে চলে গেলো চিলেকোঠার ঘরে তৌফিকের কাছে।তৌফিককে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো নীরা।আচমকা নীরার এমন অবস্থা দেখে তৌফিক বিষম খেলো।
-কি হয়েছে নীরু?কাঁদছো কেন তুমি?কেউ কিছু বলেছে?
-আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা তৌফিক ভাই।তোমাকে ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটানো সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
নীরার কথাগুলো তৌফিকের বুকের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় তুলে দিলো।মনে হলো কেউ একশো একটা হাতুরি পেটাচ্ছে তৌফিকের বুকে।কোনোরকমে স্বাভাবিক হয়ে নীরাকে বললো,
-কি হয়েছে আমাকে বলতে হবে তো। এভাবে কাঁদলে কি তোমার সমস্যাটা আমি বুঝবো?
নীরা কান্না থামিয়ে বললো,
-ভাইয়া আমার বিয়ে দিতে চায়।কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।আর কাউকে না।
তৌফিকের পেটে মোচড় দিলো।
-কি বলছো এসব নীরু?
-আমি সত্যি বলছি তৌফিক ভাই।ভাইয়ার কোন এক কলিগের কাজিনের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চায়।ওরা আমাকে দেখতে আসবে কয়েকদিনের মধ্যে।তুমি কিছু একটা করো তৌফিক ভাই।
নীরার কথার কি জবাব দেবে তৌফিক বুঝে উঠতে পারছেনা।সামনে মাস্টার্স ফাইনাল।টিউশনি করে পড়ার খরচ চালায়।এর মাঝে নীরাকে কি বুঝ দেবে সে?
-কি হলো তৌফিক ভাই?তুমি তো আমাকে ভালোবাসো,তাহলে কিছু বলছোনা কেন??
-কি বলবো বলো?আমার তো হাত পা বাঁধা।টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাই,এই অবস্থায় কি করে খালুজানকে বলবো তোমাকে বিয়ে করতে চাই আমি।তাদের একমাত্র মেয়ে তুমি।আমার মত বেকার ছেলের কাছে কি তাদের রাজকন্যাকে বিয়ে দেবে?
-আমি এতোকথা মানতে চাইনা।তুমি আমাকে আজই বিয়ে করবে।
-পাগল হয়েছো তুমি?আজ কি করে বিয়ে করবো?তাছাড়া বিয়ের জন্য আসলেই কি বিয়ে হয়ে যায়?তুমি বরং সময় চাও ভাইয়ার কাছে,খালা,খালুজানের কাছে।তুমি অন্তত অনার্স শেষ হওয়া অবধি সময় চাও নীরু।এর মাঝে নিশ্চয়ই আমার চাকরি হয়ে যাবে।
-মা বাবাকে বলে লাভ নেই।ভাইয়া যা বলবে তাই হবে।চলোনা তৌফিক ভাই,আমরা দূরে কোথাও চলে যাই প্লিজ।
নীরার কথায় তৌফিক আঁতকে উঠে বললো,
-কক্ষনো না নীরু,এই কাজ আমি স্বজ্ঞানে কখনোই করতে পারবো না।তোমাকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করা আর মুনিবের পাতে ছাঁই ঢেলে দেয়া একই কথা।আমাকে মাফ করে দাও নীরু।আর যদি পারো তোমার অনার্স শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় চাও।
সেদিন তৌফিকের ঘর থেকে নীরা মনমরা হয়ে চলে এলো।সমস্ত পৃথিবীটা অচেনা লাগতে শুরু করলো তার।পৃথিবীর সবগুলো মানুষকে কঠিন আর পাষন্ড মনে হতে লাগলো,এমনকি তৌফিককেও।চাইলেই তো নীরাকে নিয়ে তৌফিক পালাতে পারে।এতো ভালোমানুষি দেখানোর কি দরকার??ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেক্ষণ কাঁদলো নীরা সেদিন।মা এসে কতোবার খাবার খেতে ডাকলো,কিন্তু নীরা পাত্তা দিলোনা।বাবা মায়ের প্রতিও আজ নীরার অনেক অভিমান,যদিও সে জানে মা বাবার কথায় কিছুই হবেনা।
-
পরদিন থেকে তৌফিককে আর চিলেকোঠার ঘরে দেখা গেলোনা।নীরা কয়েকবার করে গিয়ে ছাদে উঁকিঝুঁকি মেরে আসলো।কিন্তু না তৌফিক নেই।দিন পেরিয়ে রাত আসলো,তবুও তৌফিক ফিরলো না।তবে কি তৌফিক নীরাকে ঠকালো?নীরাকে সর্বস্বান্ত করে দিয়ে চলে গেলো তৌফিক??নাহ আর ভাবতে পারছেনা নীরা।বাবা মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করেও তৌফিকের হঠাৎ করে উধাও হওয়ার ব্যাপারে আশানুরূপ উত্তর পেলোনা নীরা।আসফাককে একবার জিজ্ঞেস করেছিলো নীরা সে কিছু জানে কিনা।আসফাক নীরাকে ধমক দিয়ে বললো,তৌফিক কি চিরদিনের জন্য আমাদের বাড়িতে থাকতে এসেছে??এবাড়িতে ওর প্রয়োজন শেষ তাই হয়তো ও চলে গেছে।এতো তৌফিক ভাই তৌফিক ভাই না করে নিজের কথা ভাব।পরশু তোকে দেখতে আসবে ছেলেপক্ষ।পছন্দ হলে পরশুই তোর বিয়ে।
বিয়ের কথা শুনে নীরার বুকে ব্যথা শুরু হলো।একদিকে তৌফিকের দেয়া যন্ত্রণা,আরেকদিকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া বিয়ের ঝামেলা।কি করবে নীরা ঠিক করতে পারছেনা।তুহির সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বললো নীরা।
তুহি পরিষ্কারভাবে বললো,
-দেখ নীরা,তৌফিক তোকে ধোঁকা দিয়েছে এটা তুই নিজেই বুঝতে পারছিস
তাই বলছি বিয়ে করে ফেল।আসফাক বললো,ছেলেটা অনেক ভালো।উচ্চ শিক্ষিত,ভালো চাকরিও করে।বাসায় আমার বিয়ের জন্যে বাবা চাপ দিচ্ছে।কিন্তু আসফাক তোর বিয়ে হওয়া অবধি নিজে বিয়ে করবেনা।তাই বলছি তুই বিয়েটা করে ফেল নীরা,প্লিজ।
তুহির কথা শুনে নীরা আর দ্বিতীয়বার অবাক হলোনা।তুহি আসলে কি চায় নীরা বুঝে গেছে।তুহির জন্যই হয়তো আজ নিজের মায়ের পেটের ভাই নীরাকে ঝামেলা মনে করছে।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নীরা।কলেজ থেকে বাসায় এসে বাবা মাকে জানালো সে ভাইয়ের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করবে।ব্যাস!আসফাকের ষোলকলা পূর্ণ হলো।একসপ্তাহের মধ্যে আতিকের সঙ্গে নীরার বিয়ে হয়ে গেলো।প্রথমে নীরা আতিককে ঠিকমত মানতে পারেনি।কিন্তু আতিক এতোটাই বুদ্ধিমান যে,নিজের ভালোবাসা দিয়ে নীরাকে কাবু করে ফেললো।বিয়ে হয়ে গেছে,তাই আর নিজেকে আতিকের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারলোনা নীরা।মেনে নিলো নিজের ভাগ্যকে।মনের একপাশে আতিকে জন্য ভালোবাসা,আরেক পাশে তৌফিকের জন্য ঘৃণা নিয়ে এতোবছর ধরে নীরা ঘর-সংসার করছে।আতিকের মনে নীরার জন্য ভালোবাসার এতটুকু কমতি নেই।বরং নীরার আশার চেয়ে বেশিই ভালোবাসে আতিক তাকে।নীরাকে আতিক নীরু বলে ডাকে।তৌফিকও আতিককে এই নামে তাকতো।হয়তো এই নীরু ডাকটার জন্যই আতিককে ভালোবাসতে নীরা জোর পায়।
-
এতক্ষণ নীরা ছাদে দাঁড়িয়ে আপনমনে স্মৃতিচারণ করছিলো।ফুলের গাছগুলোর কাছে টুপটুপ খেলছে।দেখে মনে হচ্ছে প্রজাপতি ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করছে ছোট্ট মেয়েটা।
হঠাৎ হাবীব এসে নীরাকে ডাকলো।
একটা পার্সেল নীরার হাতে দিয়ে হাবীব বললো,আপা এটা কিছুদিন আগে এক লোক আমাকে দিয়ে গেলো।বললো আপনি বেড়াতে আসলে যেনো আপনাকেই দিই।আর কারো হাতে যেনো না দিই।নীরা অবাক হলো।পার্সেলটা কে পাঠাতে পারে?এমন কেউ কি নীরার আছে?
-লোকটার নাম জানতে চাওনি হাবীব?
-জানতে চাইছিলাম,কিন্তু বললোনা।কেবল বললো নীরাকে ছাড়া আর কারো হাতে এটা দেবেনা।আমাকে দুইশ টাকাও দিয়ে গেলো।হাবীব নীরাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ছাদ থেকে চলে গেলো।নীরা পার্সেল হাতে নিয়ে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো।চারদিক থেকে মাগরিবের আযানের সুর ভেসে আসছে।মেয়েকে নিয়ে নীরা ছাদ থেকে নেমে গেলো।পার্সেলটা শোবার ঘরে রেখে বাবা মায়ের ঘরে চলে গেলো নীরা।
রাতে খাবার টেবিলে আসফাকের সঙ্গে নীরার দেখা হলো।এই ছাড়া সারাদিনে দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।কারণ,সারাদিন আসফাক অফিসেই ছিলো।আসফাক খাবার টেবিলে বসে নীরা আর তার সংসারের ভালোমন্দ জানতে চাইলো,আতিকের সঙ্গে নীরা কেমন আছে জিজ্ঞেস করলো।
নীরাও ভাইয়ের কথার প্রত্যেকটা উত্তর দিয়ে গেলো।ভাইয়ের এসব প্রশ্নের উত্তর নীরার কাছে বরাবরই পজিটিভ। এইদিক থেকে নীরা কখনোই আসফাকের দোষ দিতে পারবেনা।আসফাক নীরাকে ভালো ছেলে আর ভালো পরিবারেই বিয়ে দিলো।কিন্তু তবুও ভাইয়ের প্রতি পুরনো ক্ষোভ গুলো নীরা মন থেকে চাইলেও মুছে ফেলতে পারবেনা।তুহিকে বিয়ে করা,নীরার বিয়ে নিয়ে যা যা আসফাক বলেছিলো,তার প্রত্যেকটা কথা এতোবছর পরও নীরাকে যন্ত্রণা দেয়।নীরা কোনোভাবেই সেসব ক্ষত ভুলতে পারবেনা।
নীরাও ভাইয়ের ভালোমন্দ জানতে চাইলো।অফিস কেমন চলছে,প্রমোশনের কি হলো এসব।প্রমোশনের কথা জানতে চাওয়াতে আসফাক বললো,প্রমোশন তো কতো আগেই হয়ে গেছে।নীরা অবাক হলো ভাইয়ের কথা শুনে।সকালে তুহি বললো এখনো প্রমোশন হয়নি,ভাইয়া বলছে কতো আগেই হয়ে গেছে।তুহির দিকে তাকালো নীরা।তুহি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত।
আসফাক টুপটুপকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো।বাধ্য মেয়ের মতো টুপটুপ মামার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
আসফাক আদর করে টুপটুপের গাল টেনে বললো,কেমন আছো মা'মণি?
-বালো আতি।তুমি কেমন আতো?
-এই তো ভালো আছি।মামাকে চিনো তুমি?
প্রশ্নটা করতেই পাশ থেকে তুহি বললো,ওর মা চেনালেই তো ও চিনবে।
নীরা প্রতিউত্তর করে বললো,
মামারাও মাঝে মাঝে নিজেদের চেনাতে হয় ভাবি।নীরার কথায় তুহির চোখেমুখে থমথমে ভাব এসে গেলো।
আসফাক সেসব কথায় কান না দিয়ে ভাগ্নিকে কোলে তুলে বসালো।
-বাবা কেমন আছে মা'মণি?
-বালো আতে।চককেট এনেতো?
-ওমা তুমি চকলেট খাও?মামা তো জানতাম না।কাল অফিস থেকে ফেরার সময় তোমার জন্য অনেকগুলো চকলেট নিয়ে আসবো।
এমন সময় নীরার মা জোহরা বেগম এসে বললেন,
-তোদের খাওয়া শেষ হলে একটু আসিস তো।তোদের বাবা ডেকেছে।
-মা আমিও আসবো?বললো তুহি।
-চাইলে আসতে পারো।কথাটা বলে জোহরা বেগম চলে যেতে চাইলে নীরা বললো,
-মা তুমি খাবেনা?
-তোর বাবাকে খাওয়ানোর সময় কয়েক লোকমা খেয়ে নিয়েছি।আর খাবোনা।তোরা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে আয়।
-
পাশের বালিশটা আজ শূন্য পরে রয়েছে।আতিকের মনটা ভালো নেই।পাশের বালিশে শুয়ে রোজ যে মেয়েটা ভলোবাসার রঙ বেরঙের কথা বলে আতিকের সারাদিনের ক্লান্তি,অবসাদ দূরে করে দিতো,সে আজ পাশের বালিশে নেই।আতিকের কলিজার টুকরা মেয়েটাও আজ নেই।প্রতিদিন এই সময় টুপটুপ আতিকের বুকের উপর চড়ে বসে নাকে,মুখে খামচি দিতো,ছোট ছোট আঙুলগুলো দিয়ে আতিকের নাকে,কানে সুরসুরি দিতো।আজ মেয়েটাকেও ভীষণ মিস করছে সে।
মনে পড়ছে সেইদিনের কথা,যেদিন নীরা আতিকের ঘর আলো করে বউ হয়ে এসেছিলো।সেদিন আতিক অনেক খুশি ছিলো নীরার মত চাঁদমুখী মেয়েটাকে নিজের জীবনে চিরস্থায়ী করে পাওয়ার জন্য।বাসর রাতে নীরার লজ্জারাঙা মুখটা চোখের পর্দায় প্রতিয়মান হলে আজো আতিকের মনে শিহরণ জাগায়।কতোইনা নিষ্পাপ ছিলো সেই লজ্জারাঙা মুখখানি।
নীরা এই সংসারে আসার পর সবই নতুন রূপে বদলে গিয়েছিলো।কত কষ্ট করে সে এই সংসারের জন্য।শাশুড়ির যত্ন নেয়া,ঠিকমত খাবার খাচ্ছে কিনা,ঔষধ খাচ্ছে কিনা তার খেয়াল রাখা,ছোট্ট টুপটুপকে আগলে রাখা,আতিকের যত্ন নেয়া,ভোরে ওঠে আতিকের জন্য ব্রেকফাস্ট বানানো,মায়ের অজুর পানি দেয়া,এককথায় সংসারটাকে একাই নীরা সুনিপুণ হাতে গুছিয়ে রাখে।তার দায়িত্বের কোথাও এতোটুকু কমতি নেই।এতো সবের মাঝে আজ একরাত নীরা আতিকের পাশে নেই বলে মনটা কেমন যেনো উদাস হয়ে আছে,শূন্য শূন্য লাগছে তার,কোথায় যেন কিসের একটা কমতি রয়ে গেছে আজ।হ্যাঁ,নীরার ভালোবাসা মাখানো আদর আর যত্নের অভাব বোধ করছে আতিক।আতিক মনে মনে বললো,তবুও মেয়েটা আজ খুশি থাকুক।রাগ করে বিয়ের পর থেকেই বাবার বাড়িমুখো হয়না।দুই বছর ধরে তো একেবারেই বন্ধ।দুই বছর পর আজ বাবা মাকে দেখতে গেলো।এইটুকু সেক্রিফাইস করলে বিশাল অঙ্কের ক্ষতি তো আর হবেনা আমার।না হয় একটু ভালোবাসারই অভাব হলো আজ।
-
খাবার শেষ করে দুই ভাইবোন বাবার ঘরে গেলো।পেছন পেছন তুহিও গেলো।দুই ভাইবোনকে শ্বশুর মশাই একসঙ্গে ডেকেছেন।নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা আছে।তাছাড়া শ্বশুর শাশুড়িকে কয়েকদিন ধরে কিছু একটা নিয়ে ফুসুরফাসুর করতে দেখেছে তুহি।এমন সময় সেখানে তুহি উপস্থিত থাকবেনা, তা কি করে হয়??
বাবা শুয়ে আছে।চেহারাটা আগের চেয়ে আরো খারাপ দেখাচ্ছে,চোখগুলো কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে কোঠরে চলে গেছে।
নীরা জহির সাহেবের পাশে গিয়ে বসলো।আসফাক একটা চেয়ার টেনে বসলো।পেছনে তুহি দাঁড়িয়ে।জোহরা বেগম খাটের একপাশে বসে আছে।নীরা বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
-বাবা ডেকেছো?
জহির সাহেব গলা পরিষ্কার করে বললেন,
-হুম ডেকেছি।তোদের সঙ্গে জুরুরি একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই আমি।
পাশ থেকে আসফাক বললো,
-তো বলো কি কথা?
-তোরা তো দেখতেই পাচ্ছিস আমার শরীরটা ভালো নেই।বয়স তো আর কম হলোনা।কখন কি ঘটে যায় বলা যায় না।তাই ভাবলাম সময় থাকতেই বিষয়টা মীমাংসা করে যাই।
নীরা বললো,
-বাবা প্লিজ আজেবাজে কথা বলোনা তো?তোমার আবার কি হবে?কিচ্ছু হবেনা।আমার বাবা আরো একশো বছর বাঁচবে।
জহির সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
-আল্লাহর উপর কি জোর খাটানো যায়রে মা?তিনি যা করবেন তাই হবে।
তুহি বিরক্তি মাখা চেহারা নিয়ে বললো,
-বাবা এসব কথা এখন বাদ দিয়ে কেন ডেকেছেন তা বলুন।অনেক রাত হয়েছে।আপনার ছেলের তো সকালে অফিস আছে।
আসফাকও তুহির কথায় সায় দিলো।
জহির সাহেব বলতে শুরু করলেন,
-তোদের দুই ভাইবোনকে আমি কোনো অংশে কম ভালোবাসিনা,তা তো তোরা জানিস।তাই আমি কারো উপর অবিচার করতে চাইনা।ব্যাংকে আমার কিছু টাকা জমা আছে।চাকরি শেষ হওয়ার পর টাকাগুলো আমি পেয়েছিলাম।ব্যাংকে এখন দশ লাখ টাকার মতো আছে।আমি টাকাগুলো নীরার নামে দিয়ে দিয়েছি।আর তোর নামে তো বাড়িটা অনেক আগেই লিখে দিলাম।তবে একটা ফ্ল্যাট তোদের মায়ের নামে দিয়েছি।পরে যাকে খুশি তাকে দেবে তোদের মা।আমি চাই তোরা আমার এই সিদ্ধান্তটা সরল মনে মেনে নিবি।নীরা আর আসফাক চুপ করে রইলো।তুহি বললো,
-বাবা আপনি যা করেছেন ভালোই করেছেন।কিন্তু সবগুলো টাকা নীরার নামে দেয়াটা ঠিক হয়নি আপনার।আপনি টাকাগুলো সমানভাগে ভাগ করতে পারতেন।
জহির সাহেব বললেন,
-তাহলে তো বাড়িটাও সমানভাগে ভাগ করতে হয় বউমা!
-বাবা বাড়ি ভাগের কথা আসছে কেন?বাড়ি তো ছেলেরাই পায়।টাকা আর বাড়ির হিসাব তো এক নয়।
-বউমা আমি আমার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলছি।তোমার সঙ্গে নয়।আশা করি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাটাই তোমার জন্য ভালো হবে।
তুহি কপালের চামড়া ভাজ করে বললো,
-বাবা আমি কি এবাড়ির কেউ নয়??
জহির সাহেব জবাব দেয়ার আগেই নীরা জবাব দিলো,
-ভাবি প্লিজ উল্টাদিকে নিওনা সব।বাবা কিন্তু সেটা বলেনি।আলাপটা আমাদের দুই ভাইবোনের সঙ্গে করছেন বাবা।তাছাড়া টাকা বাবা দিয়েছে আমার নামে ঠিকই।কিন্তু আমি এখনো সেই টাকা নেবো বলে তো জানাইনি!
তুহি রাগে গজগজ করে বললো,
-টাকা নেবেনা?হাসালে নীরা।এসব চান্সও কেউ হারায়?
নীরা বিরক্তি মাখা স্বরে আসফাককে বললো,
-ভাইয়া তুমি ওকে চুপ থাকতে বলবে?
আসফাক নড়েচড়ে বসলো।
জহির সাহেব আসফাকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-আসফাক তুই কি আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিস?
-বাবা তুহি কিন্তু ভুল কিছু বলেনি।টাকাগুলো তো তুমি সমান ভাগ করতে পারতে।তা না করে একাই নীরার নামে দিয়ে দিলে?
জহির সাহেব অবাক হলেন ছেলের কথায়।জোহরা বেগম এতোক্ষণ চুপ ছিলেন।এবার তিনি মুখ খুললেন,
-তাহলে বাড়িটাও সমান ভাগ হবে আসফাক।
আসফাক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো।
-মা এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে।নীরাকে বড় করেছো,লেখাপড়া শিখিয়েছো।আমি নিজে দেখেশুনে ভালো বিয়ে দিয়েছি।
আর কি চাই ওর?এটা তোমাদের বড় অন্যায় হচ্ছে।
জহির সাহেব এবার উত্তিজিত হয়ে বললেন,
-ন্যায়-অন্যায় কি তোর কাছ থেকে শিখতে হবে আমাকে?
-মাঝে মাঝে সন্তানের কাছ থেকেও শিখতে হয় বাবা।
জোহরা বেগম বললেন,
-আসফাক তুই তোর বাবার সঙ্গে কথা বলছিস এটা কি ভুলে গেলি?
-নাহ মা ভুলিনি।বাবা ভুলে গেছে আমি তোমাদের দেখেশুনে রাখছি।নীরা নয়।
জহির সাহেব আঁতকে উঠলেন ছেলের কথায়।জোহরা বেগমের চোখ দু'টি ঝাপসা হয়ে এলো।
নীরা কি বলবে বুঝতে পারছেনা।তবুও অন্তত কিছু একটা না বলে থাকতে পারছেনা।
-ভাইয়া প্লিজ তোমার এসব আচরণ বন্ধ করবে??আমার কোনো টাকাপয়সা চাইনা।কিচ্ছু চাইনা আমি।প্লিজ এসব বলা বন্ধ করো তুমি।বাবা মা কষ্ট পাচ্ছে।
তুহি চট করে বললো,
-বাবা মায়ের অন্যায়ের জন্য তো তোর ভাইও কষ্ট পাচ্ছে নীরা!
জহির সাহেবকে কেমন যেন উদাস উদাস লাগছে।
-তুই কি আমার সিদ্ধান্ত মানবিনা আসফাক?
-সরি বাবা।মানতে পারলাম না।তোমরা অন্যায় করছো আমার সঙ্গে।বলেই চেয়ার থেকে উঠে চেয়ারটাকে লাত্থি মেরে এই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।তুহিও হনহন করে স্বামীর সঙ্গে চলে গেলো।
জহির সাহেব সেদিকে তাকিয়ে নির্বিকার শুয়ে রইলেন।এতোটুকু নড়াচড়া পর্যন্ত করছেন না তিনি।ছেলের আচার-ব্যবহারে আজ তিনি অনেক বড় আঘাত পেলেন মনে।এমনটা তিনি ছেলের কাছ থেকে কখনো আশা করেননি।যে ছেলেকে জন্মের পর থেকে প্রায় নরম তুলোয় করে মানুষ করেছেন,চাওয়া পাওয়ার এতোটুকু কমতি রাখেননি,সেই ছেলের মুখে বাবা মাকে দেখাশুনার খোটা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন জহির সাহেব।সামান্য ক'টা টাকার উপর ছেলে আর ছেলের বউয়ের লোভ দেখে তিনি সপ্তমাশ্চর্য হলেন।জহির সাহেবের মনে হলো যেনো অতিরিক্ত আঘাত সইতে না পেরে তার শরীরের সব শিরা- উপশিরা,রক্ত চলাচল নিষ্প্রভ হয়ে গেছে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে।
জোহরা বেগমের দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন তিনি।নীরা বললো,
-কি দরকার ছিলো এসব করার?আমি কি তোমাদের কাছে টাকাপয়সা চেয়েছিলাম?তোমাদের দোয়া আর ভালোবাসাই তো আমার জন্য বড় পাওয়া।কি করবো আমি টাকা দিয়ে?যে টাকার জন্য তোমাদের নিজের সন্তানের মুখে খোটা শুনতে হলো,সেই টাকা আমি চাইনা মা,চাইনা সেই টাকা।কোনো প্রয়োজন নেই আমার টাকাপয়সা।বলেই দৌড়ে চলে গেলো নীরা
টুপটুপ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নীরা মেয়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছে।মনটা ভালো নেই তার।কিছুতেই দু'চোখের পাতা এক করতে পারছেনা।ভাবলো আতিককে কল দিয়ে কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলে হালকা হয়ে নেবে।যেইনা ফোনটা হাতে নিতে যাবে অমনি চোখ পড়লো হাবীবের দিয়ে যাওয়া পার্সেলটার উপর।এটার কথা এতোক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল নীরা।আতিককে আর কল দিলোনা।তাড়াতাড়ি পার্সেলটা খুললো সে।ছোট্ট বাক্সটার ভেতরে শুকিয়ে যাওয়া একটা লাল গোলাপ,অনেকগুলো চকলেট আর ছোট্ট একটা চিরকুট।নীরা অবাক হলো।কাঁপাকাঁপা হাতে চিরকুটটা খু্ললো।
চিরকুট বললে কিঞ্চিত ভুল হয়ে যায় ।বেশ লম্বা গোছের একটা চিঠি।পুরো চিঠি পড়ার আগে শেষে প্রেরকের নামটা দেখে নিলো নীরা।সঙ্গে সঙ্গে কলিজাটা মোচড় দিলো তার।তৌফিক!!তৌফিক লিখেছে চিঠি।এতোবছর পর কি মনে করে?তবে কি তৌফিক ফিরে এলো?চিঠিটা পড়তে শুরু করলো নীরা।
প্রিয় নীরা,
লেখনির প্রথমে তোমার প্রিয় একগুচ্ছ লাল গোলাপের শুভেচ্ছা জানাই।কেমন আছো তুমি?মনে হচ্ছে ভালোই আছো।কারণ আমি জানি,আসফাক ভাই তোমাকে ভালো পাত্রের হাতেই তুলে দিয়েছে।আমিও খবর নিয়েছিলাম আতিক সম্পর্কে।শেষে মনে প্রশান্তি পেলাম এই ভেবে যে,আমার নীরু ভালোই থাকবে,এবং ভালো আছো।আমিও ভালো আছি নীরু।অনেক ভালো আছি।কেবল অপরাধবোধে ভুগছি আমি।আমার এই অপরাধবোধ থেকে একমাত্র তুমিই আমাকে মুক্তি দিতে পারো।
নিশ্চয় অবাক হচ্ছো তুমি এই ভেবে যে,যে লোকটা তোমাকে ঠকিয়ে আত্মগোপন করলো সে এতোবছর পর কি চায়?ক্ষমা চাই নীরু,কেবল ক্ষমা চাই।
সেদিন আমি অনেক ভেবে দেখলাম,তোমাকে আমি সুখে রাখতে পারবোনা।কি করে পারতাম বলো?আমি নিজেকেই তো নিজে ঠিকমত ভালো রাখতে পারতাম না।কি সিদ্ধান্ত নেবো ভাবছিলাম বসে।এমন সময় আসফাক ভাই আসলেন চিলেকোঠার ঘরে।রক্তাভ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,তৌফিক তুমি এবাড়ি ছেড়ে এক্ষুনই চলে যাও।আমি যেনো সকালে আর তোমাকে না দেখি।নীরার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা মেনে নেয়ার কথা নয় তা তুমি বুঝতেই পারছো নিশ্চয়।বলেই তিনি চলে গেলেন।আমিও একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম নীরু।গোপনে রাতের অন্ধকারে চলে এলাম তোমাদের বাড়ি ছেড়ে,তোমাকে ছেড়ে।আর অপরাধী হলাম তোমার চোখে।তোমার জীবনে চাঁদের আলো হয়ে এসেছিলাম যেভাবে,ঠিক সেভাবেই আবার মেঘের আড়াল হয়ে গেলাম।যাতে তুমি আর আমাকে দেখতে না পাও,কোনো পিছুটান না থাকে তোমার।
কিন্তু নীরু,আমি তো শান্তি পাচ্ছিনা।আমাকে কি ক্ষমা করা যায় না?প্লিজ একটিবার ক্ষমা করে দিও আমাকে।শুধু এইটুকু আরাধনা করছি।আর লিখতে পারছিনা কিছু।হাতখানা অসাড় হয়ে আসছে।চকলেটগুলো তোমার মেয়ের জন্য।
ভালো আছো,দোয়া করি চিরদিন এভাবেই ভালো থাকো।এতোকিছুর পরও একটা নিখুঁত সত্য আছে,আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি নীরু।
লেখনির শেষপ্রান্তে,
মেঘের আড়ালে লুকায়িত আমি তৌফিক।
নীরার গাল বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।বুকটা ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম।নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে চলছে ক্রমশ।চিঠিটাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরলো নীরা।মুখ থেকে অস্পষ্ট একটা কথা বের হলো,তবুও আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো আতিক,অনেক ভালোবাসো।কান্নারা মিলিয়ে যাচ্ছে নীরার মুখাবয়বে।
হঠাৎ বাবার ঘর থেকে মায়ের চিৎকার শোনা গেলো।জোহরা বেগম চিৎকার দিয়ে বললেন,ওগো কথা বলো,কি হয়েছে তোমার?
নীরা দৌড় দিলো।জহির সাহেব নিথর হয়ে শুয়ে আছেন।জোহরা বেগম কেবল ওই একটা চিৎকারই দিয়েছেন।তারপর কেমন যেনো নিষ্প্রভ হয়ে জহির সাহেবের নিথর দেহের দিকে চেয়ে রইলেন।নীরা কিছু বলতে পারছেনা।একবার মা আরেকবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে।তুহি আর আসফাকও দৌড়ে এলো।
-কি হয়েছে মা?
জানতে চাইলো আসফাক।
জোহরা বেগম শান্তগলায় উত্তর দিলেন,
-তোর বাবার মুক্তি হয়েছে তোর অট্টালিকা থেকে।
আসফাক বাবা বলে চিৎকার দিয়ে জহির সাহেবের গায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো।
তুহির দুই চোখে জল টলমল করছে।কে জানে,তুহির চোখের এই জলের অর্থ কি!
জহির সাহেবের মুখের উপর কাপড়টা টেনে দিতে গেলে তুহির হাতটা চেপে ধরে ঝাটকি মেরে সরিয়ে দিলেন জোহরা বেগম।অগ্নিময় চোখে তুহির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,তোমরা স্বামী স্ত্রী আমার স্বামীকে একদম ছুঁবেনা!!তোমাদের জন্য আজ আমার স্বামী প্রচন্ড কষ্ট পেয়ে চলে গেলেন।কেবল আমি জানি সারারাত লোকটা যন্ত্রণায় কতটা ছটফট করে তারপর চোখ বুজে ফেললেন।আজ তোমরা মুক্ত।
তুহি কিছু বলতে পারছেনা।বলার মত ভাষা হয়তো তুহির জানা নেই।কেবল শ্বাশুড়ির অগ্নিময় চোখের দিকে অপলক চেয়ে থাকলো।
নীরা এতোক্ষণ বুদ্ধিহীন মানুষদের মত দাঁড়িয়ে রইলো।আচমকা এমন একটা ঘটনা নীরার সারা শরীর অসাড় করে দিলো।হঠাৎ বাবা বলে চিৎকার দিয়ে নীরা অজ্ঞান হয়ে গেলো।
-
অজ্ঞান অবস্থায় নীরা কতোক্ষণ ছিল সে জানেনা।জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পেলো সারা বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা গিজগিজ করছে।এদের মধ্যে কাউকে নীরা চিনে,কাউকে চিনেনা।অদূরে আতিককে দেখতে পেলো কোনো একটা বিষয় নিয়ে আসফাকের সঙ্গে কথা বলছে।হয়তো বাবার দাফন-কাফন নিয়ে কথা হচ্ছে।মায়ের পাশে নীরার শ্বাশুড়ি হালিমা বেগম বসে বসে তজবি পড়ছেন।টুপটুপ নীরার গা ঘেষে বসে আছে।আর জহির সাহেবকে খাট থেকে নামিয়ে ফ্লোরে শুয়ে রাখা হয়েছে।
নীরা কেবল ফ্যালফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।চোখের জলগুলো শুকিয়ে মুখে আস্তরণ লেগেছে তার।
-
হঠাৎ করে বাবার মৃত্যু,তৌফিকের চিঠি সব শোক নীরাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে একরকম বাকশক্তিহীন করে দিলো।জহির সাহেব মারা গেলেন আজ তিনদিন হলো।নীরা আজই চলে যাবে।আতিক অপেক্ষা করছে নীরাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।জোহরা বেগম তিনদিন ধরে ঠিকমত খাবার খাচ্ছেন না।তুহি হাজারবার চেষ্টা করেছে শাশুড়িকে নিজ হাতে খাওয়ানোর জন্য।কিন্তু জোহরা বেগম তুহির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না।তুহি কয়েকবার ক্ষমাও চেয়েছে শাশুড়ির কাছে।জোহরা বেগম বলেছেন আল্লাহ ক্ষমা করলেই হয় বউমা।
নীরা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে আসলো।
-মা আমি চলে যাচ্ছি।
-যাবিই তো,থাকার জন্য তো তোকে পরের বাড়ি পাঠিয়ে দিইনিরে মা।
নীরা মাকে জড়িয়ে ধরলো।
-মাগো তুমি আমার জন্য কেবল দোয়া করিও।আমি আর কিছু চাইনা।টাকাগুলো তুমি ভাইয়ার নামে দিয়ে দিও।
জোহরা বেগম আর কোনো কথা বললেন না।দূরে আসফাক আর তুহি দাঁড়িয়ে।নীরার সঙ্গে চোখে চোখ মেলাতে পারছেনা ওরা।নীরা আসফাকের কাছে গিয়ে বললো,
-ভাইয়া আমি চললাম।
তুহির হাত ধরে বললো,
-মায়ের খেয়াল রেখো ভাবি।
তুহি কোনো কথা বললোনা।কেবল কয়েকফোঁটা জল পড়তে লাগলো তার দুইগন্ড বেয়ে।
নীরা চললো আতিকের সঙ্গে।তৌফিকের চিঠিটা সে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে।প্রয়োজন নেই ওই চিঠিটার।কি হবে নিজের কাছে চিঠিটা রেখে?ক্ষমা চেয়েছে তৌফিক।মন থেকে ক্ষমা করে দিয়েছে নীরা তাকে।চিঠি রেখে কি হবে?যে আড়াল হওয়ার,সে তো আড়ালেই রবে।
SHARE

Author: verified_user