Wednesday

বাংলা গল্প বউ নামা || মধুচন্দ্রিমা || Asif Mahmud

SHARE

                                                          বউ নামা || মধুচন্দ্রিমা || Asif Mahmud


মধুচন্দ্রিমা  - Honeymoon



(১)
মা আমাকে আর নীরাকে পাশাপাশি বসিয়ে দোয়াদরূদ পড়ে ফু দিচ্ছেন। নীরা অনুগত মেয়ের মত মাথা নিচু করে বসে আছে। আর আমি অবাধ্য ছেলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। ফু দেয়া শেষ হলে মা উপদেশ বাক্য শোনালেন। 
-কক্সবাজার যাচ্ছিস, ওখানে গিয়ে কিন্তু স্পীডবোটে উঠবি না। স্পীডবোটে উঠে গতবার…
“মা! মৃত্যুর খবর নাইবা বলো” 
আমি মা কে মাঝপথে থামিয়ে দিলাম। মা আবার শুরু করলেন,
-ঠাণ্ডা লাগাবি না একদম। আর টাকা পয়সা সাবধানে রাখিস, চুরি ডাকাতি হয় প্রচুর। বউ, তোমার গয়নাগাটি রেখে যাও, নেয়ার দরকার নাই কিছু। গয়নার জন্য মানুষ খুন করে ফেলে।
আমার বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও মা খুনের কথাটি বললেন ই। নীরা বাধ্য মেয়ের মত মেয়ের উপদেশ গিলছে আর আমি নীরা কে দেখছি। মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী, আমি যত প্রশংসা করি, একটু যেন কম পড়ে যায়। ওর মত চোখদুটো স্রষ্টা এ পৃথিবীতে কাউকে দেন নি। সে চোখের মায়ায় বড় বড় পালোয়ান লুটিয়ে পড়বে, সেখানে আমি তো ক্ষীণকায় এক প্রেমিক। লুটিয়েই পড়তাম, বাবার ডাকে হুঁশ ফিরল। বাবা তাড়া দিচ্ছেন, কোথাও যাওয়ার জন্য বের হতে নাকি দেরি করতে নেই। আমি আর নীরা বাবাকে সালাম করলাম, মা কে সালাম করার পর আমি ভয় পাচ্ছিলাম মা আবার না কেঁদে দেন, যেটা ভাবলাম সেটাই হল, মা আবারো কান্না জুড়ে দিলেন। কান্না তো কান্না, একেবারে মরা কান্না, মনে হল সদ্য তার পুত্রবিয়োগ ঘটেছে। তবে আজ কান্না টা স্থায়ী হল না, বাবার চোখরাঙানীতে মা থেমে গেলেন। আমি বাবা থেকে এক্সপ্রেশন টা শিখে নিলাম, ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। নীরাও খুব আবেগী কিনা!
(২)
বাসের টিকিট কেটে আমি দৌড়ে গিয়ে জানালার সিটে বসে পড়লাম। মনে পড়ে কলেজ যাওয়ার সময় বন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা করতাম জানালার সিট ধরার জন্য, সে প্রতিযোগিতার রেশ এখনো কাটেনি। তবে তখন প্রতিযোগিতা জমত, কারণ তখন অপর প্রতিযোগী ও আমার মত সমান শক্তি দিয়ে সিট তখল করতে চাইত, কিন্তু নীরা কোন চেষ্টাই করল না, বলা যায় ফাঁকা মাঠে গোল দিলাম। কিন্তু নীরার চোখের দৃষ্টিতে আগুন দেখে নিজের সাফাই নিজেই গাইলাম।
-জানালার পাশে না বসলে আমার অস্বস্তি হয়।
-নেকাব করা আমার, অস্বস্তি হবে তোমার?
নীরা কথায় যুক্তি আছে, আবার কণ্ঠে অভিমান। তাই সিট দখল করে যে বীরের ভাবটা নিয়েছিলাম সেটা মূহুর্তে বিলীন হয়ে গেল। এরপর নীরা কে জানালার পাশে দিলাম। মনে মনে বললাম, “রাতে ফ্যানের বাতাস ও তোমার, এখানে জানালার বাইরের আকাশ ও তোমার। আমার কি?” কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। পাছে মধুচন্দ্রিমার পরিবেশ টাই না নষ্ট হয়ে যায়। নীরা পুরো রাস্তা জুড়ে বাইরের গাছপালা, মাঠ আর আকাশ দেখে কাটাল আর আমি পাশের সিটে বসে থাকা আমারই মত আরেক হতভাগার বাংলা পাঁচের মত মুখ। বাস থেকে যখন নামি তখন প্রায় দুপুর হয় হয়। আমি নেমেই বললাম,
-আরে! সমুদ্র কই? সৈকত কই? রাস্তা, দোকানপাট কেন?
-এটা কক্সবাজার শহর, সমুদ্র সৈকত না। বাস তোমাকে সোজা সমুদ্র সৈকতে নামাবে?
নীরার উত্তরে আমি নিজেকে খুবই নির্বোধ হিসেবে আবিষ্কার করলাম। আসলেই তো, শহর দেখলেই আজকাল কেমন যেন ঢাকা ঢাকা মনে হয়। কক্সবাজার বললেই শুধু সমুদ্র মাথায় আসে, সেন্টমার্টিন বললে নারিকেল গাছ মাথায় আসে, সিলেট বললে জাফলং এর পাথর মাথায় আসে কিংবা সাতরঙের চা, আর বরিশাল বললে শুধু লঞ্চ মাথায় আসে। মস্তিষ্কের মধ্যে এসব ডিফল্ট ভাবে সেট করা আছে। তাই হয়ত এমন।
-নীরা, চল সৈকতে যাই।
-হোটেলে যাব না আগে?
-কার হোটেল?
-মানে? রুম বুকিং দাওনি?
-আগে থেকে দিতে হয় নাকি?
নীরার কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। মনে হচ্ছে সদ্য জন্ম নিয়েছি এ পৃথিবীতে।
-ভাল কোন হোটেলে সিট পাব এখন? আগে থেকে বুকিং এর ব্যবস্থা করতে পারলে ভাল হত।
-রাতে করব, এখন চল সৈকতে যাই, গোসল করি।
-মজা করছ আমার সাথে? রুম নিব না আগে?
-আগে রুম নিব কেন? আমরা তো আগে বন্ধুরা মিলে পিকনিকে গেলে আগে গিয়ে সারাদিন ঘুরতাম, এরপর রাতে একটা রুম নিয়ে ঘুমাতাম।
-পাওয়া যেত?
-মানে নরমাল রুম আরকি। কোনরকম থাকতাম।
-তো, আমরা তেমন কোন রুমে থাকব?
-না। মানে….
আমাকে তোতলাতে দেখে নীরা পেয়ে বসল।
-তুমি তোমার বন্ধুর সাথে এসেছো এখন? সারাদিন ঘুরে রাতে কোনরকম একটা রুম নিয়ে থাকবা না?
-ঘুরা ই তো মেইন। কক্সবাজার আসিনাই কখনো। ঘুরব না?
-ঘুরো তুমি। আমি যাচ্ছি।
বলে নীরা সত্যি সত্যি উলটো দিকে হাঁটা ধরল। কোন উপায়ন্তর না দেখে আমি আমার পূর্বের পদ্ধতি ফলো করলাম।
-নীরু! শোনোনা!
বলে ওর পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম।
(৩)
নীরাকে অনেক কষ্টে মানিয়েছি। মানিনীর মান ভাঙানো খুবই কষ্টের। অবশেষে আমরা স্থানীয় এক দোকানদার থেকে ঠিকানা নিয়ে একটা বেশ নামিদামি হোটেলের বুকিং দিতে চললাম। এদিকে রাস্তায় নীরা কোন কথা বলছে না, গাল ফুলিয়ে আছে বোধহয়, মুখ ঢাকা থাকায় বুঝতে পারছিনা। অথচ আমার মনের মধ্যে কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যেগুলো না করলেই নয়।
-আচ্ছা নীরা, আমরা যে বিবাহিত তার প্রমাণ কি?
-মানে?
-মানে হোটেল কতৃপক্ষ যদি জিজ্ঞেস করে আপনারা যে বিবাহিত তার প্রমাণ কি? তখন কি প্রমাণ দেখাব?
-তোমার মাথা দেখাবা।
-আমার মাথা দেখিয়ে কি প্রমাণ হবে?
এবার নীরা আবারো সেই লুক দিল। অর্থাৎ গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেয়া লুক। আমি চুপ করে গেলাম কিন্তু মন থেকে কিছুতেই প্রশ্ন টা সরাতে পারছিলাম না।
হোটেলে পৌঁছেই দেখলাম বুকিং দেয়ার জন্য আলাদা রুম আছে। রুমে ঢুকে দেখি এক মহিলা বসে আছে। মহিলার আচরণ অনেকটা রোবটের মত। ঘাড় সোজা করে রেখেছেন, চশমা পরে আছেন অথচ দেখছেন চশমার উপর দিয়ে। মহিলা আমাদের ভালমত দেখলেন এরপর বললেন,
-স্যার, আপনাদের কিভাবে হেল্প করতে পারি?
-আমাদের একটা রুম লাগবে। ভাল দেখে।
-আপনারা কি আগে থেকে কোন বুকিং দিয়েছেন?
-জ্বি না।
-নিউ বুকিং।
-কত দিনের জন্য?
আমি নীরার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি নীরাও আমার দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি আমতা আমতা করতে করতে উত্তর দিলাম।
-আ আ আমরা পরে জানাই দিব কতদিন থাকি।
-সরি স্যার। এমন কোন নিয়ম নেই, আপনাকে আগে থেকেই একটা নির্দিষ্ট সময় বলে তারপর বুকিং দিতে হবে।
আমি কতদিন বলব বুঝতে না পেরে বলে দিলাম দুইদিন। মহিলাটা দু ডে, ওয়ান নাইট হিসেবে এন্ট্রি করল খাতায়। আমি তখনো জানতাম না আমি যে দুইদিন বলেছি এটার অর্থ হচ্ছে আজকের দিন, আজকের রাত এবং কালকের দিন। আমি হাসিহাসি মুখ করে নীরার দিকে তাকিয়ে দেখি ও আবারো আমার দিকে বিধ্বংসী ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। আজকাল নীরা কে কেমন জানি বাবা বাবা মনে হয়। বাবা আমার দিকে কখনো ভালবাসার দৃষ্টিতে তাকান না। নীরাও খানিকটা অমন হয়ে যাচ্ছে। এরপর মহিলা আমাকে বললেন “আপনাদের নাম গুলো বলুন”।
-আসিফ মাহমুদ এবং নীরা।
-পুরো নাম।
হঠাত খেয়াল করলাম আমি নীরার পুরো নাম জানিনা! কিংবা জানলেও সেটা ভুলে গেছি। কিন্তু নীরার বাবার নামটা স্পষ্ট মনে আছে। ধারণা করলাম বাবার শেষ নামের সাথে নীরার শেষ নাম মিলতে পারে। নীরা কিছু বলার আগেই আমি বলে দিলাম,
-নীরা উদ্দিন।
মহিলা আমি বলার পর মূহুর্তকাল ও দেরি করলেন না, খসখস করে লিখে ফেললেন। আমি নামটা কেমন অসংগত বলেছি সেটাও তার খেয়াল করার সময় নেই। এখন মনে হচ্ছে আমি যদি বলতাম আমার নাম “রাবেয়া আক্তার” আর ওর নাম “গিঁয়াস উদ্দিন” তাও তিনি কোন প্রশ্ন ছাড়াই লিখে ফেলতেন। এদিকে রুম বুক করে চাবি নিয়ে রুমে এসে পৌঁছালাম। রুমে এসে নীরা মুখ খুলল, দেখলাম ওর মুখ রক্তলাল হয়ে গেছে, চোখেও কেমন লালচে ভাব, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দেখে আমি নিরাপত্তা বেষ্টনী স্বরূপ চোখ নামিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম।


(৪)
নীরা আমার সাথে কথা ধর্মঘট করেছে। অর্থাৎ আমার সাথে সে কথা বলবে না। তবে এ ধর্মঘট অঘোষিত, আমাকে এ বিষয়ে কোন আগাম সংকেত কিংবা হুঁশিয়ারি দেয়া হয়নি। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে, সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে, আমরা সৈকতে ও বেড়াতে যাইনি, একজন আরেকজনের সাথে সময়ও কাটাইনি। সময় কাটাইনি বললে ভুল হবে, সারাক্ষণ ই এক রুমে আছি, কিন্তু কোন কথা হয়নি।
বাড়িতে হলে নীরা কে পাওয়াই যেত না, সে এদিক ওদিক পালিয়ে যেত, রাগ করলে প্রতিবার এমন করে। কিন্তু এখানে তো একটাই রুম, তাই এভয়েড করতেও অনেক কষ্ট হচ্ছে। তাও খাটে বসে ওপাশ ফিরে আছে, আমার দিকে বোধহয় আর তাকাবেই না এমন পণ করেছে। রাতের খাবার ও খাচ্ছেনা। এ দিকে আমি কয়েকটা পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলাম ওকে খাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করার। প্রথমে খুব শব্দ করে করে খেয়েছি, এবং খাবার খুবই মজাদার হয়েছে বলে জোরে জোরে মন্তব্য করেছি। এতে কোন কাজ না হওয়ায় বয়কে দিয়ে আবারো খাবার আনিয়েছি, যাতে ও বুঝতে পারে খাবার টা আসলেই সুস্বাদু হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু না হওয়ায় আমি হতাশ হয়ে বালিশ কোলে নিয়ে বসে আছি।
বেশিক্ষণ বালিশ কোলে দিয়ে কোমরে ব্যাথা হয়ে যাওয়ায় আর ওভাবে বসে থাকতে পারলাম না। কিন্তু একটু শুলেই যে ঘুম এসে যাবে সেটা ভেবেই শুতে মন চাইল না। কিন্তু কোমরে ব্যাথা আর এসির বাতাস ঘুমের পক্ষে ধনাত্মক প্রভাবক হিসেবে কাজ করল। কখন যে মাথার নিচে বালিশ টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেই বলতে পারলাম না।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে যে জিনিসটা নজরে পড়ল সেটা হল নীরা ব্যাগ গুছাচ্ছে। ব্যাগ গুছাচ্ছে ভাল কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে ব্যাগের কাপড়চোপড় বের করার প্রয়োজন পড়ল কখন আবার!
-কি হল? ব্যাগ গুছাচ্ছো কেন?
-চলে যাব।
-কোথায়?
-বাড়িতে। মানুষ কোথায় যায় আর?
-কেন? বীচে যাবা না?
-তুমি একাই যাও। ঘুরতে এসেছো না? ঘুরে আসো যাও।
-একা ঘুরে মজা নেই। এজন্যই তো তোমাকে নিয়ে এলাম।
-ও আচ্ছা! একা ঘুরতে ভাল্লাগেনা এজন্য নিয়ে এসেছো তুমি আমাকে? আমি তো ভাবলাম আমার সাথে একান্ত সময় কাটানোর, ঘুরার, খুব ইচ্ছে তোমার। তোমাকে চিনতে খুব ভুল হয়ে গেছে আমার।
নীরা প্রফেশনাল দের মত ঝগড়া করছে। কিন্তু ঝগড়া করার বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা খুবই কম। তাই আমি হা করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলাম না।
-আমি চলে যাচ্ছি।
-আরে আজকে দিনটা থেকে রাতের বাসে যাই। হোটেল ভাড়া দিয়েছি না?
-তুমি হোটেল ভাড়া নিয়ে পড়ে আছো? আর এদিকে রাতে আমি খেয়েছি কিনা সে খোঁজ নিয়েছো?
-আমি টাক মারছিলাম খেয়াল করো নি? ওটা তোমাকে খাওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য। তাহলে খোঁজ নিইনি কি করে বলো।
-ও আচ্ছা! অনেক ধন্যবাদ! এতটা কেয়ার করার জন্য।
নীরার উত্তরের সংলাপ টা নরমালি বললে এটা আমার জন্য পজিটিভ। কিন্তু ও কথাটা বলল মুখকে বিশেষ ভঙ্গিতে বাঁকা করে আর চোখ উলটে। এটা আমার জন্য নেগেটিভ। অর্থাৎ এ কথা দ্বারা সে আমাকে বিদ্রুপ করেছে। এদিকে নীরার সাথে সাথে আমিও রেডি হয়ে গেলাম। হানিমুনের নিকুচি করি। কে বলেছিল এসব হানিমুনের পাল্লায় পড়তে। বস বলেছিল। এখন ইচ্ছে করছে বসের টাকমাথায় দু’দুটো নারকেল ভাঙি, এত বেশী রাগ হচ্ছে। নীরা বোধহয় রাগের সাথে সাথে ক্ষোভ, কষ্ট, কান্না, কয়েক ধরণের অনুভূতির মিশ্রণ মনে নিয়ে বসে আছে। মেয়েটার জন্য মায়া হয়, খুব মায়া হয়!
(৫)
ফেরার বেলা গাড়িতে উঠে জানালার সিটের জন্য আমি কোন প্রতিযোগিতা করলাম না, নীরা বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায়জানালার পাশে বসল। এবারো নীরা যাওয়ার বেলায় গাছপালা, মাঠ, আকাশ, নদী সব দেখল আর আমি দেখলাম নীরা কে। নীরা একবারো আমার দিকে তাকাল না, আমার কাছে পৃথিবী টা কেমন শূন্য মনে হতে লাগল। পাশে বসে থাকা আমার নীরা কে মনে হতে লাগল শত আলোকবর্ষ দূরের কোন তারা, যাকে আমি কেবল দেখতে পারি, যার প্রশংসা করতে পারি, কিন্তু এই দূরত্ব কখনো ঘোচাতে পারিনা।
সময় গড়িয়ে গেল, দেখতে দেখতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এলাম। আমি বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বাসে উঠলেই প্রচুর ঘুম আসে আমার। যখন জাগলাম, তখন বাস থেমে গেছে। বাস থেকে নেমে একটা সিএনজি নিয়ে বাড়ির দিকে চললাম। নীরা এখনো কোন কথা বলছেনা। আজ বাড়ি গিয়ে নামলে চারদিক থেকে সাংবাদিকরা ছুটে আসবে, সবাই মাইক বাড়িয়ে দেবে। “হানিমুন থেকে এসে আপনার অনুভূতি কি?” “এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসার কারণ কি?” “ভাবির সাথে কি ঝগড়া হয়েছে?” আমি বলব, “নো কমেন্টস প্লিজ” বলে মাইক গুলো সরিয়ে দিয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাব। বাড়িতে প্রতিটা ঘরে ঘরে নিউজ হবে। “নবদম্পতির ঝগড়া ও একটি সুখের সংসার তছনছ” শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে। যা ভাবলাম ঠিক তাই ই হল। বাড়িতে ঢুকতেই ছেলেবুড়ো সব এগিয়ে এল। আমি আর নীরা কারো সাথে কোন কথা না বলে সিএনজিওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে সোজা ঘরে ঢুকে গেলাম। ঘরে ঢুকতেই বাবার সামনাসামনি হলাম। নীরা রুমে চলে গেল, বাবা আমার চোখের দিকে তাকালেন। বাবার চোখে একটাই প্রশ্ন, “আবার গণ্ডগোল ঘটিয়েছিস?”
-কি গণ্ডগোল ঘটাবো?
-মানে? আমি তো কিছু বলি ই নি।
বাবার গম্ভীর উত্তর। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমি বাবার চোখের প্রশ্নটি পড়ে বাস্তবে উত্তর দিয়ে দিয়েছি। লজ্জা পেয়ে রুমে চলে গেলাম। আজকের রাত নিয়ে আমি খুবই ভীত সন্ত্রস্ত! দিনটাতো এদিক ওদিক পালিয়ে পার করে দেব কিন্তু রাত ঠিক আদালত বসবে। আজ নির্ঘাত আমার নামে মামলা হবে, বাদী নীরা, আর সবসময়ের মত প্রধান বিচারপতি বাবা। আর অভিযোগ সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হলে যে আমার কি হবে তা ভাবতে পারছিনা। এমনিতেই বাবা শুধু মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় আছেন। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি তিনটা বাজে। আমার বিচার শুরু হতে আর খুববেশি হলে ৪ঘণ্টা আছে।
মধুচন্দ্রিমা থেকে ফেরার পর থেকে আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। রাতে খাওয়ার সময় ও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু ছোটভাই ডেকে নিয়ে এল। বাবা ডেকেছেন, আলাদা আলাদা করে খাওয়া তিনি পছন্দ করেন না, সবাই একসাথে খেলে তৃপ্তি পাওয়া যায়। কিন্তু আজ একসাথে বসে খাওয়া মানে হচ্ছে আমার কনডেম সেল তৈরি করে ফেলা, তাই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম কিন্তু অবশেষে আর বাঁচতে পারলাম না। আজও খাবার টেবিলে বাবা সভাপতিত্ব করছেন, মা আজ প্রতিদিনের মত খাবার পরিবেশন করছেন না। আজ নীরা সে দায়িত্ব নিয়েছে, কারণ সে এখন আমাদের পরিবারেরই অংশ। বাবা গলা খাঁকারি দিলেন, বুঝতে পারলাম তিনি কিছু বলবেন।
-এখন তোর সিদ্ধান্ত কি?
-কোন বিষয়ে?
-ঢাকায় কোথায় উঠবি, কি করবি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?
-জ্বি। বাসা ঠিক করেছি একটা দু’রুমের। আমার অফিসের পাশেই। ভাল বাসা।
শেষের কথাটা বলে আমি নিজেই থ মেরে গেলাম। ছোটভাই মাথা নামিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। এখনকার মডার্ণ ছেলেমেয়েরাও যদি এসব সস্তা বিষয়ে হাসে তাহলে একেবারেই অড লাগে। এখনকার ছেলেমেয়েদের সেন্স অফ হিউমার হবে অনেক উঁচু। তারা গম্ভীর থাকবে, খুবই উঁচুমানের কোন কৌতুক না হলে হাসবেনা। আর এরকম কথায় হাসবে বাচ্চারা, তাই ছোটভাইকে বেশ করে চোখ রাঙিয়ে দিলাম। মা অবাক বিষ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁর ধারণা ছিলনা যে আমি এর মধ্যে একটা বাসাও ঠিক করে ফেলতে পারি।
-এখন জিনিসপত্র কেনাকাটা, ঘর-দুয়ার রেডি করা এসব কাজকর্ম ও তো আছে। কবে যাবি ভাবছিস?
-আমি ভাবছিলাম কাল বা পরশু চলে যাই। জিনিসপত্র কিছু তো আগের বাসাটায় আছে, আর কিছু নতুন কিনতে হবে।
মাঝখান থেকে মা বললেন, “তো বউ যেয়ে কি করবে এখন? তুই সব রেডি টেডি করে আয়, তারপর নাহয় বউ যাবে”।
-রেডি করা আর বিশেষ কি? দুটো লোক হলেই হয়ে যাবে।
আমরা এতসব আলোচনা করছি এর মধ্যে নীরা একটি শব্দও করছে না। চুপচাপ সবকিছু শুনে যাচ্ছে। আমার মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছে হয় জানতে, ঠিক এই মূহুর্তে ও কি ভাবছে? অনেকেই নাকি চেহারা দেখে ভাবনা পড়তে পারে, আমি কেন পারিনা? পারলে খুব ভাল হত, এখন নীরার মতামত টা ওর চেহারা দেখেই জেনে নিতাম।
সভা শেষে সিদ্ধান্ত হল, আমরা পরশু সকালে ভোরে ভোরে রওয়ানা হচ্ছি। আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম, বিয়ের ঝামেলা বোধহয় এবার সম্পূর্ণরূপে শেষ হতে যাচ্ছে। সভাশেষে লক্ষ্য করলাম, আমাকে কোন বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। অর্থাৎ নীরা কোন মামলা দায়ের করেনি, নিজের মনের মধ্যে জমিয়ে রেখেছে বোধহয় সব। আমার খুব ভয় হয়, মনের মধ্যে জমানো এ ক্ষোভগুলোর একদিন খুব বড় বিস্ফোরণ ঘটবে না তো?
(২)
খাওয়া শেষে রুমে গিয়েই খাটের বাম পাশে শুতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। নীরা এসে খাটে বসল। ওকে দেখে মনে হল, ও কিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই। তাই ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম।
-আসিফ!
নীরার কোমল কণ্ঠ। এমনিতেই এই কণ্ঠটা একটা মায়া, তার উপর অধিক কোমলত্ব আনায় সেটা আরো বেশি বিশেষ শোনাচ্ছে। আমি সস্নেহে বলে উঠলাম, “জ্বি”
মাথা ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখি নীরার চোখভর্তি পানি। আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমার এই মূহুর্তে ঠিক কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিকে নীরা কেঁদেই চলেছে। আমি ওর হাত চেপে ধরলাম।
-নীরা! কি হয়েছে? কেন কাঁদছো। বলোনা।
-আসিফ! আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি খুব বেশী বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি।
এই কথাটি বলতে গিয়ে নীরার নিঃশ্বাস আটকে আটকে যাচ্ছিল। মনের মধ্যে জমে থাকা কষ্ট গুলো হঠাত বের হতে থাকলে বোধহয় এমন হয়। অথচ আমি ভেবেছিলাম ওর মনে ক্ষোভ জমে আছে, কতটা বোকা আমি! ও বোধহয় ধরে নিয়েছে ওর আচরণে আমি কষ্ট পেয়েছি, তাই আজকে ওভাবে চলে এলাম, আবার আজকে পুরোদিন পালিয়ে বেড়ালাম। আমি অবাক হয়ে দেখলাম মেয়েটার প্রেম, নিজেকে তুচ্ছ লাগল ওর সামনে। আমি ভাবতাম আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রেমিক যে তার প্রেয়সীকে সর্বস্ব দিয়ে ভালবেসেছে। কিন্তু চারদিক থেকে হিসেব মিলিয়ে নিজের ভালবাসা পরিমাপ করতে গিয়ে দেখি ফলাফল শূন্য। বিয়ের পর থেকে শুধু কষ্টই দিয়ে এসেছি ওকে। প্রতিটা মূহুর্তে আঘাত দিয়েছি, ফেলেছি কতশত বিপদে, লজ্জায়। ভাবতেই আমার চোখও কান্নায় ভরে এল।
-তুমি কেন ক্ষমা চাইছো? ক্ষমা তো আমি চাইব। আমি প্রত্যেকবার কোন না কোন গণ্ডগোল পাকিয়েছি, তোমাকে শুধু কাঁদিয়েছি।
আমার কান্না দেখে নীরার কান্না থেমে গেল। হঠাৎ হঠাৎ প্রয়োজনবোধে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলার অসীম এক ক্ষমতা আছে মেয়েটার। ও আমাকে শান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল।
-তুমি তো একটা বোকা ছেলে। এতটা সরল, পুরাই বাচ্চা। আমার বোঝা উচিত ছিল, এই বাচ্চাটাকে সামলে রাখা উচিত ছিল।
ছোটবেলায় একটা নিয়ম ছিল আমাদের কে কেউ আদর করে কান্না থামানোর চেষ্টা করলে আমাদের কান্না দ্বিগুণ হয়ে যেত। হয়ত কোনদিন মা মেরেছে। সেদিন বাবা আসার সাথে সাথে কান্না জুড়ে দিতাম। বাবা যখন আদর করে জিজ্ঞেস করতো, “কি হয়েছে মনা?” তখন সাথে সাথে কান্না দ্বিগুন হয়ে যেত। এখন নীরার আদরে আমার কান্না দ্বিগুন হয়ে যেতে চাইল। কিন্তু নীরা একটা সতর্কবার্তা দিয়ে আমার কান্না থামিয়ে দিল। “কেউ শুনে ফেললে কি ভাববে পাগল টা?”
এই কথার সাথে সাথে আমার কান্না এমন ভাবে থেমে গেল যেন একশো কিলোমিটার স্পিডে আসা একটা গাড়ি, সামনে একটা খোঁড়া লোককে পার হতে দেখে হার্ড ব্রেক কষল। যেকোন ধরণের হার্ডব্রেক ই ইঞ্জিনের জন্য ক্ষতিকর। আমি নিজেও আমার বুকের মধ্যে একটা কেমন ব্যাথা অনুভব করলাম অর্থাৎ এই হার্ডব্রেক ইঞ্জিন নিতে পারেনি।
এদিকে নীরা শাড়ির আচল দিয়ে আমার চোখ মুছে দিল, আমি ওর কোলে মাথা রাখলাম। নীরা আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। এ প্রথম আমি নীরার হাতের স্পর্শ পেলাম। এটা আমাদের প্রেমের প্রথম স্পর্শ বোধহয়। প্রথম স্পর্শ অন্যরকম, আপনি এই অনুভূতি টাকে কোন শব্দে ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। অবশ্য এর আগে একবার আবেগে চুমু দিয়ে ফেয়েছিলাম ওর কপালে। ফুপি দেখে যাওয়ায় নার্ভাসনেসে রোমান্সের বারোটা বেজে গিয়েছিল। আজ সম্পূর্ণ বাধাহীন। আমি প্রায় হারিয়েই গেছিলাম স্পর্শের অনুভূতিতে, সম্বিত ফিরল দরজায় করাঘাতের শব্দে। এবারো পণ্ড করার জন্য কেউ না কেউ এসে হাজির হয়েছে। নীরা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল, মা কয়েল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা দেখেই আমার মেজাজ তিরিক্ষ্মি হয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে বললাম,
-আমাদের এখানে মশারি আছে মা। আবার কয়েল কেন আমি এটাই বুঝিনা।
-মশারির ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে যায় মশা, কয়েল দিচ্ছি, মরে পড়ে থাকবে।
-কয়েলে আমার দমবন্ধ হয়ে যায়।
-তাইলে তুই দশ মিনিট রুমের বাইরে যা। মশা সব আগে মরুক, তারপর আসিস।
এবং সত্যি সত্যিই তাই হল। আমাকে রুমের বাইরে গিয়ে দশমিনিট অপেক্ষা করতে হল মশা দমন কর্মসূচি শেষ হওয়া পর্যন্ত। যতক্ষণ ভেতরে মশা দমন কর্মসূচি চলল, ততক্ষণ আমি বাইরে দাঁড়িয়ে বহিরাগত মশাদের আন্দোলনের সম্মুখীন হলাম। ভেতরে তাদের সজাতিদের কয়েলের ধোঁয়ায় হত্যা করা হচ্ছে এটা তারা কিছুতেই বরদাশত করতে পারছেনা। এজন্য তারা আমি, যে কিনা এই কর্মকাণ্ডের সাথে বিন্দুমাত্র ও জড়িত নই, সেই নিরীহ লোককে আক্রমণ করছে। এদিকে আমিও নিরাপত্তার জন্য হাত চালালাম এদিক ওদিক, এতে কেবল ঠাস ঠাস করে নিজের গায়েই আঘাত লাগল, মশাদের একটা লোম ও বাঁকা করতে পারলাম না। এবং তারই সাথে সাথে এই দশমিনিটে আমার রোমান্টিক মুড বদলে গেল চরম বিরক্তিতে।
সেই বিরক্তি চড়ানো মুখ নিয়েই ফিরলাম রুমে, মা বোধহয় খেয়াল করলেন না, তবে নীরা খেয়াল করল। খাটে উঠেই অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়লাম সোজা হয়ে, যদিও প্রতিদিন আমি পা দুটো ভাজ করে ডানকাত হয়ে ঘুমাই। আজ একেবারে টানটান সোজা হয়ে বামপাশ ফিরে শুয়ে আছি। নীরা আস্তে আস্তে শব্দ করে হাসতে লাগল, আর আমার চুল টানতে লাগল। এতে আমার রাগরাগ ভাবটা কিছুটা কমল। রাতে প্রথমবারের মত কোলবালিশের বদলে বউকে জড়িয়ে ঘুমালাম। বউকে জড়িয়ে ঘুমানো আর কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমানোয় আকাশ পাতাল তফাত। এতদিন ভাবতাম, দুটোই বুঝি সমান। কিন্তু আজ সে ধারণা বদলে গেল। বউকে জড়িয়ে ঘুমানোয় একটা আলাদা এডভেঞ্চার আছে। এডভেঞ্চার তো পেলাম ই, পাশাপাশি ফ্যানের বাতাস ও পেলাম।
(৩)
সকাল সকাল ঘুম ভাঙল নীরার ডাকে। মনে মনে ভাবলাম, যাক কিছু অন্তত পরিবর্তন এসেছে। আগে মায়ের চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙত, আজকে নীরার ডাকে ভাঙল।
-আসিফ! ওঠো। ঝামেলা হয়ে গেছে!
আমি শুরুতে শুধু আসিফ শুনেছিলাম। এখন দেখি শেষে ‘ঝামেলা হয়ে গেছে’ কথাটাও আছে। ক্লাসে ঘুমুতে গিয়ে ধরা খেয়ে শিক্ষকের কান মলা খেয়ে যেমন ঘুম থেকে উঠতাম তেমন ধড়ফড় করে উঠে বসে গেলাম।
-কি হয়েছে?
-আমি নুডুলসে লবণের বদলে চিনি দিয়ে দিয়েছি।
-তুমি নুডুলস বানাচ্ছো? মা কোথায়?
-আজ মা কে বলেছি নাস্তা আমি বানাব। মা ও রাজি হয়ে আমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। আর আমি গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছি।
-কিভাবে হল এটা? চিনি তো দানা দানা, লবণ তো একদম গুড়ো, তাও বুঝোনি?
-আমি চামচ দিয়ে দিয়েছি, খেয়াল করিনি।
-ওগুলো ফেলে দাও। নতুন করে বানাও।
-মা রান্না হয়েছে দেখেই সাথে সাথে বাটিতে ঢেলে বাবার জন্য নিয়ে গেছেন, নাফিসকেও দিয়ে এসেছে।
-তুমি তখন জানতা না? বলোনি মা কে?
-জানতাম না তো। আমি আর টেস্ট করেও দেখিনি। এখন টেস্ট করে দেখি একদম মিষ্টি।
-বেশি মিষ্টি হয়ে গেছে?
-হুম।
নীরার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ভ্রু কুঁচকে আছে, কাঁদো কাঁদো চেহারা। বেচারি আজ প্রথমবার কিছু একটা করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। বাবা-মা কে ইম্প্রেস করার প্রথম চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। আমি তাড়াহুড়া করে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম।
-তুমি আমার নুডুলসের প্লেট টা তাড়াতাড়ি দাও।
-কেন?
-দিতে বললাম দাও না।
আমি নীরা থেকে প্লেট নিয়ে তাড়াতাড়ি বাবার রুমে গেলাম। বাবা মাত্র নুডুলসের বাটি হাতে নিয়েছেন। এদিকে আমার ব্রাশ করাও হয়নি, তাও মুখের মধ্যে এক চামচ পুরে দিয়ে বললাম,
-উমম, মিষ্টি নুডুলস, নতুন আইটেম। আজকাল খুব চলে ঢাকায়।
বাবা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন। আমার কথার আগা মাথা বুঝতে পারছেন না। বাবা বোধহয় আজকাল ভাবছেন আমার মেন্টাল প্রব্লেম দেখা দিয়েছে। এরপর এক চামচ মুখে দিয়েই ঘটনা বুঝে গেলেন। চিবুতে চিবুতে আমার দিকে তাকালেন।
-বলেছিলাম না? মিষ্টি নুডুলস। টেস্টি না বাবা? ঢাকাতে খুব চলে।
আমি মিথ্যে হাসিহাসি মুখ বজায় রাখতে রাখতে বাবাকে বললাম। আমি বারবার ‘ঢাকাতে খুব চলে’ কথাটা বলছি কারণ ঢাকা সম্পর্কে বাবার ধারণা খুব কম। তাই আমি তাকে ভুংভাং বুঝিয়ে দিতে চাইলাম। বাবাকে দেখলাম বিষয়টাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিলেন। মুখে আরেক চামচ দিতে দেখেই আমি কেটে পড়লাম। তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে গিয়ে দেখি নীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে। এদিকে ছোটভায়ের টেবিলে নুডুলস পড়ে আছে, সে বোধহয় ফ্রেশ হতে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি টেবিলের উপর থেকে নুডুলসের বাটিটা নিয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকে গেলাম। কেমন একটা চোর চোর মনে হল নিজেকে। তাও নিজেকে শান্ত্বনা দিলাম, যাই করছি ভালবাসার মানুষের জন্য করছি।
-এখানে তাড়াতাড়ি লবণ দাও।
-মিষ্টি আর কড়া মিলে বিচ্ছিরি হয়ে যাবে। একেবারে খাওয়ার অযোগ্য। আসিফ! আমি আসলেই একটা অকর্মা মেয়ে। আমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা। জানিনা বাবা কি ভাবছেন।
বলেই নীরা মুখ টা বিষন্ন করে বসে রইল। বাস্তব জীবনে চন্দ্রগ্রহণ বোধহয় এটাই। আস্তে আস্তে আমার চাঁদের মুখ টা অন্ধকারে ছেয়ে গেল। কিন্তু অমাবস্যা এসেছে বলে কি পূর্ণিমার আশা করা ভুলে যাব। আমি নীরাকে অভয় দিলাম।
-আরে বাবাকে আমি বুঝিয়ে দিয়েছি। বলেছি এটা মিষ্টি নুডুলস, ঢাকায় খুব চলে, বাবা খাচ্ছে ও দেখলাম।
আমি নীরা কে শান্ত্বনা বাক্য শোনাচ্ছি, এমন সময় বাবা জোরে চিৎকার করে মা কে ডাক দিলেন। আমি ঢোক গিললাম। বোধহয় মা কে জেরা করছেন এই নুডুলস কে রেঁধেছে, কেন এভাবে রেঁধেছে এসব বিষয়ে। নীরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না, কেঁদেই দিল। আমি ঠিক কিভাবে ওকে শান্ত্বনা দিব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আর এক্ষেত্রে শান্ত্বনায় চিড়ে ভিজবে না, তাই পদক্ষেপ নিলাম।
-চলো, আবার রান্না করি। কতক্ষণ ই বা লাগবে।
বলেই দুজনে মিলে আবার রান্না চড়ালাম, এবার খুব সূক্ষ্মভাবে মনোযোগ দিয়ে রান্না করলাম। লবণের বয়ামে যেটা আছে সেটা লবণ কিনা তা তিনবার পরীক্ষা করলাম। আশেপাশে রসায়নের ল্যাব থাকলে সোডিয়াম ক্লোরাইডের রাসায়নিক পরীক্ষাও করে ফেলতাম। যাহোক রান্না শেষে আবার সবাইকে ডেকে বেশ খাতিরযত্ন করে পরিবেশন করলাম। সবাই এবার নীরার রান্নার খুব প্রশংসা করল। সেটা ফর্মালিটি হিসেবেই হোক, আর সত্যি করেই হোক। সবার প্রশংসার পরও নীরার মুখে পূর্ণ হাসি ফুটল না। বোধহয় ওর একজনের কমপ্লিমেন্টের অপেক্ষা ছিল। তাই তাড়াহুড়ো করে কলে গিয়ে দুটো কুলি করে এসে এক চামচ নুডুলস মুখে দিয়েই তৃপ্তি সহকারে টাক দিলাম। হাত দিয়ে দারুণ দেখালাম, মুখে বললাম “বেস্ট!” এবার নীরা পূর্ণ হাসি দিল। আহা, কেমন মুক্তোঝরা হাসি। এ হাসির জন্য তো আমি ঐ অখাদ্য মিষ্টি নুডুলস ও পুরো পাতিল এক নিমিষে খেয়ে ফেলতে পারি।
খাওয়া পর্ব শেষ করে আমি রুমে বসে আছি। কাল কিভাবে কিভাবে সব সামলাবো সেটাই ভাবছি। হুট করে ঢাকায় গিয়ে নতুন বাসা, সব গোছগাছ, অনেক বেশী ঝামেলা অপেক্ষা করছে কাল। এসব ভাবছি এর মধ্যে নীরা এসে দরজা বন্ধ করে দিল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। নীরা মুচকি মুচকি হাসছে। ঐ হাসির অর্থ বুঝতে পারলাম না আমি। আমি ক্যাবলাকান্তের মত চেয়ে রইলাম। নীরা আমার কাছে এসে দাঁড়াল। কতটা কাছে ঠিক বলতে পারব না, তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম আমাদের মাঝে সব দূরত্ব ঘুচে গেছে। নীরা আমাকে প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরল। আমাকে ঠিক কি করতে হত জানিনা, সম্মোহিত হয়ে গেছিলাম! আমিও ওকে ঠিক তেমনি আবেগে জড়িয়ে ধরলাম। নীরা আমার কানে কানে বলল, “অনেক ভালবাসি আসিফ!” আমার চোখ দিয়ে একফোটা আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, প্রথমবারের মত এই বোকা ছেলেটাকে কেউ ভালবেসেছে! আমি আজীবন অকূল সমুদ্রে সাতরে বেড়িয়েছি, আজ মনে হল একটা কূল পেলাম। আজীবন যেই নামটি হৃদয়ের ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে লিখে বেড়িয়েছি, আজ সে নাম বুকে ধারণ করেছি। যে সুরে আজীবন মাতাল হয়েছি, সে সুরে আজ আমায় নিয়ে গান হয়েছে। যে ভালবাসা ছিল একতরফা, আজ সেটা পূর্ণতা পেয়েছে। বহুবছর পর আজ অনুপম যেন বলতে পারল, “এইতো জায়গা পেয়েছি!”
SHARE

Author: verified_user