Thursday

বাংলা গল্প স্বপ্ন | Zoufishan Tahfeem Moon

SHARE

                                              বাংলা গল্প স্বপ্ন | Zoufishan Tahfeem Moon ||
বাংলা গল্প স্বপ্ন | Zoufishan Tahfeem Moon







মেয়েটি যেদিন প্রথম আমাদের বাড়িতে আসে আমি খুব অবাক হয়ে ওকে দেখছিলাম।
এতো ছোট মেয়ে শাড়ি পরেছে! হাতে কাচের অল্প কিছু চুড়ি, কপালে টিপ, মোটা করে চোখে কাজল দিয়েছে।
শ্যাম বর্ণের মেয়েটি এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে একটি লোকের সাথে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলো। ওর চোখে মুখে ভয়,লজ্জা, সংকোচ! হাতের পুটলিটা শক্ত করে ধরে রেখেছে।
.
লোকটা আম্মুর সাথে কিছু কথা বলেই চলে গেলো।কিন্তু মেয়েটা গেলো না। ও আমাদের বাসার নতুন কাজের মেয়ে। ওর বয়স ১২। আমার সমবয়সী। আম্মু ওর সাথে কথা বলছে,
আম্মুঃ নাম কি তোর?
মেয়েঃ স্বপ্ন।
আম্মুঃ এইখানে কাজ করতে আসছিস কেন?
স্বপ্ন কিছু বলল না।
আম্মুঃ কাজ পারিস তো?
স্বপ্নঃ জ্বি।
আম্মুঃ রান্না ঘরে যা, হাড়ি পাতিল গুলো ধুয়ে দে। আর খবরদার, একট কিচ্ছু যদি ভাংয়ে তবে পিঠের ছাল তুলে নিবো।
.
স্বপ্ন কিছু না বলেই রান্নাঘরে চলে গেলো।
.
আমি রেডি হচ্ছিলাম, স্কুলে যাবো এমন সময় হঠাৎ চিৎকারের শব্দ পেলাম।
আম্মুঃ বলেছিলাম না, যেনো একটা কিচ্ছু না ভাং্যে
স্বপ্নঃ আমি ইচ্ছা করে ভাংয়ি নাই, আমারে মাফ করে দেন।
(চিকন শব্দে কান্নার আওয়াজ পেলাম)
আমি রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম আম্মুর হাতে হাত পাখা, স্বপ্নের শরীরের যায়গায় যায়গায় লাল হয়ে ফুলে আছে, আম্মু আবার হাত উঠাচ্ছিলো মারার জন্য,কিন্তু আমি ডাক দিলাম,আম্মু থেমে আমার দিকে তাকালেন, সাথে স্বপ্নও। চোখের পানিতে ওর কাজল লেপ্টে গেছে...
আমিঃ আম্মু।
আম্মুঃ কিরে নীল, তুই এখনও স্কুলে যাসনি?
আমিঃ আ-ও- মানে আমার জুতোর ফিতা বাধতে হবে।
আম্মু স্বপ্নের দিকে তাকালো।
আম্মুঃ যাহ ওর জুতোর ফিতাটা বেধে দিয়ে আয়।
স্বপ্ন কিছু না বলে চোখ মুছে আমার রুমে এলো।
ও মাথা নিচু করে আমার জুতো বেধে দিচ্ছে।
আমিঃ তোমার খুব লেগেছে তাইনা?
আমার কথা শুনে ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।
স্বপ্নঃ জ্বি না। ব্যাথা পাই নাই।
ও আবার জুতোর ফিতা বাধায় মনোযোগ দিলো।
আমিঃ মিথ্যা কেনো বলছ? এইযে তোমার হাত ফুলে গেছে।
ও কিছু বললো না। হঠাৎ দাড়িয়ে গেলো।
স্বপ্নঃ জুতা বান্ধা শেষ। আমি যাই।
আমি পেছন থেকে ওর হাত চেপে ধরলাম।ও আবার অবাক হয়ে তাকালো।
আমিঃ এটা নাও।
স্বপ্নঃ এইটা কি?
আমিঃ মলম। যেখানে যেখানে ব্যাথা পেয়েছো, এটা লাগিয়ে নিও। ব্যাথা কমে যাবে।
আমি মলমটা ওর হাতে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। এরপর ও কি ভেবেছিল জানি না কিন্তু এর পর থেকে ও আমার সাথে কিছুটা ফ্রি হয়ে গিয়েছিল। দুপুরে আম্মু ঘুমাতো। আব্বু আর ভাইয়া বাসায় থাকতো না, ওই সময়টা আমি আর স্বপ্ন বসে গল্প করতাম। মনের অজান্তেই আমার ওকে অসম্ভব ভালো লেগে গিয়েছিলো।
.
আর একদিন হঠাৎ স্বপ্নের ভয়াবহ চিৎকার শুনতে পেলাম। দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে দেখলাম আম্মু স্বপ্নর মাথায় গরম ভাতের পাতিল উপর করে ঢেলে দিয়েছেন। আর স্বপ্ন যন্ত্রণায় চিৎকার করছে।
আমিঃ আম্মু এইটা কি করেছো?
আম্মুঃ ঠিক করেছি। হারামজাদী ছোটলোকের বাচ্চা। চুলায় ভাত বেশী বসিয়েছে।
আমিঃ আম্মু তাই বলে তুমি ওকে....
আম্মুঃ একদম চুপ। যা তোর ঘরে যাহ। আমার কাজে নাক গলাতে আসবি না।
আমি চুপ করে রুমে চলে আসলাম। ওইদিন খুব কেঁদেছিলাম। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না।
.
দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলাম, খাবার মুখে দিতেই বুঝলাম অসম্ভব ঝাল। ওইদিনও আমার স্বপ্নর জন্য কিচ্ছু করার ছিলোনা। আম্মু ঝাল বুঝতে পেরে জোর করে স্বপ্নর মুখে মরিচের গুরো ভরে দিয়েছিলেন।
.
সকাল সকাল আবার স্বপ্নর চিৎকার...
চা দিতে দেরি হওয়ার অপরাধে বাবা ওর মুখে গরম চা ছুড়ে মেরেছেন।
.
ওইদিন ওর মুখে মলম লাগিয়ে দিতে গিয়ে আম্মুর কাছে ধরা খেলাম। আম্মু আমাকে কিছু না বললেও স্বপ্নর পিঠে গরম খুন্তির দাগ বসিয়ে দিয়েছিলেন।
.
আয়রন করতে গিয়ে বাবার নতুন শার্ট পুরিয়ে ফেলেছে স্বপ্ন আর তার পর.....
সেদিন রাতে ওকে সহানুভূতি দেখাতে আমি ওর কাছে যাইনি। ওকে সহানুভূতি দেখেতে নিজের রুমে ডেকে নিয়েছিল আমার বড় ভাই। আমি দেখেছিলাম সেই নির্মমতা। সারারাত স্বপ্নর চিৎকার। কেউ যেনো শুনতেও পায়নি। বড়ভাইএর সহানুভূতির রূপ ফুটে উঠল ৩ মাস পর স্বপ্নর পেটে। আম্মু বুঝল, কি বুঝল জানি না, তবে এর তিন দিনপর আম্মু স্বপ্নকে কোনো এক খোঁড়া অজুহাতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। আম্মুর উদ্দেশ্য ছিলো বাচ্চা নষ্ট করা। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায়। মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এ স্বপ্ন বেহুশ হয়ে যায়। রাত হওয়ায় আব্বু আর ভাইয়া বাসায়ই ছিলো। আম্মু ওদের ডাক দিল।
আব্বুঃ কি হয়েছে?
আম্মুঃ মেয়েটা মনে হয় মরে গেছে।
আম্মুর চোখে ভয়।
ভাইঃ কি বলতেছ? আমি জাস্ট বলছিলাম বাচ্চা নষ্ট করতে।
আম্মুঃ আমি জানি না। পুলিশ, আসলে? তোকে ধরে নিয়ে যাবে। কি করব এখন?
ভাইঃ আমাকে ধরবে মানে? খুন তুমি করছো। তোমাকে ধরবে।
আব্বুঃ এই তোরা থামতো।কিচ্ছু হবে না। এক কাজকর। তুই গিয়ে রান্নাঘর থেকে বটিটা নিয়ে আয়।
এতোক্ষণে আমার সম্মতি ফিরলো। আমি ভাবতেই পারছিলাম না স্বপ্ন মরে গেছে। আমি চিৎকার দিলাম। মা দৌরে এসে আমার মুখ চেপে ধরলো।
এরপর আমাকে জোর করে রুমে রেখে হাত আর মুখ বেধে দরজা লাগিয়ে দিলো। আমি ভীষন ভয় পেয়েছিলাম। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আব্বু স্বপ্নর গলায় বটি বসিয়ে দিয়েছে।স্বপ্ন নরে চরে উঠল। আমি বুঝলাম স্বপ্ন বেচে আছে। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিলো না। ওরাও বুঝতে পারলো স্বপ্ন বেচে আছে। কিন্তু ওকে এখন বাচিয়ে রাখা বোকামি। স্বপ্ন গোঙিয়ে উঠল। আম্মু আর ভাই ওর হাত পা চেপে ধরলো। আব্বু ওর মুখ চেপে ধরে গলা কাটছে, স্বপ্ন ছটফট করছে।.......
আমি আর এই বিভৎস দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না..ওখানেই ওজ্ঞান হয়ে গেলাম। কতোক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলো জানি না। আবার জানালায় চোখ রাখলাম।
স্বপ্নর মাথাটা একপাশে পড়ে আছে চোখ দুটি খোলা।মোটা করে কাজল দেয়া সেই চোখ যেনো আমার দিকেই চেয়ে আছে। স্বপ্নর পুরো শরীরটা ওরা ছোট ছোট টুকরো করেছে, ভাইয়া উঠে স্বপ্নর নারিভুরি আর শরীরের নরম মাংস গুলো নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো, কমোড ফ্লাশ করার শব্দ পেলাম। ওরা লাশ এর টুকরো গুলো ব্যাগ এ ভর্তি করলো, বাবা আর ভাইয়া কাপর বদলে এলো, ইতিমধ্যে আম্মু স্বপ্নর চোখ দুটো উপরে ফেলেছে। চেহারাটা কেটে এমন বিভৎস করেছে যে চেনা যায় না। মাথাটাও ব্যাগ এ ভরা হল। আব্বু আর ভাই দুজনে মিলে ব্যাগটা ধরে নিয়ে গেলো। ওরা কোথায় গেলো আমি জানি না। আম্মু রক্ত পরিষ্কার করছে। সবার সব কাজ শেষ, ফজরের আজান দিচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে গেছি। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেলাম। আব্বু আম্মু আর ভাই আমার সামনে বসে আছে। আমার ১২ বছরের জীবনে এমন কোনো ঘটনার সাক্ষী হতে হবে ভাবি নি। ওরা আমাকে বিভিন্ন ভাবে ভয় দেখালো এই কথা কাওকে না বলার জন্য।
.
সকাল হলো। বাড়ি ভর্তি পুলিশ। আব্বুই খবর দিয়েছে।
আব্বুঃ কাজের মেয়ে পালিয়েছে। সোনার গহনা আর ১৫ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
হঠাৎ আমার কি হল আমি জানি না... আমি ওদের মাঝখানে গিয়ে পুলিশ আংকেল কে সব বলে দিলাম। বাবা আমাকে থামানোর জন্য বাবা অনেক চেষ্টা করলো, কিন্তু ব্যার্থ। আমি মনে যা ছিলো সব বলে দিলাম।
.
পুলিশের জেরায় ওরা সব বলে দিলো। পাওয়া গেল স্বপ্নর ৩০ টুকরো লাশ। স্বপ্নর মা বাবা এলো। তাদের কান্নায় এলাকা ভারী হয়ে উঠল। মিডিয়া পুলিশ... এলাকা এখন গরম। আব্বু আম্মুর ফাসির রায় হলো আর ভাইয়ার যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
১ মাস, ২মাস, ২বছর, ৫ বছর, ১০ বছর।
সবাই স্বপ্নকে ভুলে গেছে। শুধুই আমি স্বপকে দেখি। স্বপ্নর মৃত্যুর পরও আমি ওকে দেখতে পাই, জানিনা কিভাবে। ডাক্তার বলেছে হ্যালুসিনেশন। কিন্তু আসলেই কি স্বপ্ন মরে গেছে? আজও হাজার ঘরে স্বপ্নর মতো হাজার মেয়ে অসহায় ভাবে বেচে আছে। তাদেরও আছে স্বপ্নর মতো হাজার স্বপ্ন ভরা মোটা করে কাজল দেয়া দুটি চোখ।.....গল্পটাকি এখানেই শেষ?
SHARE

Author: verified_user