Sunday

এক সোনালী চুলের মেয়ে - আহমেদ সীমান্ত | বাংলা গল্পের বই

SHARE

 এক সোনালী চুলের মেয়ে  -  আহমেদ সীমান্ত 

 বাংলা গল্পের বই "এক সোনালী চুলের মেয়ে"

    - আহমেদ সীমান্ত

bangla golpo ebook


Bangla Golper Boi
বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত রোমানিয়া এক রং বৈচিত্রের দেশ। সোভিয়েত ইউনয়নের আওতাধীন ছিল দেশটি এক সময়। এই দেশটা পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত। আমার জীবনে এমন মায়াবী সুন্দর দেশ খুব কমেই দেখা হয়েছে। নিজের সখে এবং কর্মের তাগিদে অনেক দেশেই ঘুরা হয়েছে আমার। কিন্তু কোনো দেশেই আমাকে এতটা মায়ার জালে ঝড়াতে পারেনি।
এটার হয়তো মূল কারন ক্যাথরিন নামের সোনালী চুলের মেয়েটা। রোমানিয়ার দানিউব ডেল্টা
ইউরোপের ২য় দীর্ঘতম নদী। ডেল্টা বয়ে চলেছে রোমানিয়ার মধ্য দিয়ে। এটি মূলত ব্ল্যাক সি এর অংশ। প্রকৃতিকে দেখার জন্য চমৎকার একটি জায়গা দানিউব ডেল্টা। ইউরোপের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ আর প্রাণীর বাস এখানে। ২৩ টি ভিন্ন ইকোসিস্টেমের সাথে নিজে পরিচিত হবার জন্য একদিন আমার দানিউব ডেল্টায় আসা। এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলাভূমিটি। অপূর্ব সূর্যাস্তের দৃশ্য মুগ্ধ করেছে আমাকে।
এর চেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি আমি সোনালী কেশের একটা রোমানিয়ান মেয়ে মুখে এত সুন্দর বাংলায় কথা বলা দেখে। আমার মাতৃভাষা বাংলা কোনো ভিনদেশি ইউরোপের মেয়ে এতটা নিখুত ভাবে বলতে পারে এটা আমার কাছে ছিল পৃথিবীর আশ্চার্য সকল ঘটনার মাঝে একটা।
ক্যাথরিনের সাথে আমার প্রথম কথা হয়েছিল
তারপক্ষ থেকে। আমি তখন অবাক বিস্ময়ে দানিউব ডেল্টার এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলাভূমিটি দেখছিলাম। একটু একটু করে সূর্যাস্ত যেতে শুরু করেছে। আমার মত আরো শত শত পর্যটক সেদিকেই তাকিয়ে আছে। এই দৃশ্যটা যে কতটা সুন্দর ছিল তা আমি হয়তো কোনো দিন প্রকাশ করতে পারবো না। আমার নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে একটা কথা বের হয়ে আসলো "কি অসাধারন দৃশ্য"।
খেয়াল করলাম আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আমার কথা শোনে একবার আমার দিকে তাকালো। তারপর বলল, আপনি বাংলাদেশী?
এক ভিনদেশী সোনালী চুলের মেয়ের মুখে এত সুন্দর বাংলা শোনে আমি ভেবাচেকা খেয়ে গেলাম। তার প্রশ্নের কি উওর দিবো বুঝে উঠতে পারলাম না। শুধু মাথাটাকে একবার উপর নিচ করে হ্যাঁ বললাম। মেয়েটা আবার বলল, সত্যি অসাধারন দৃশ্য এই সূর্যাস্তের সময়টা। সে আবার সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বলল, আপনি মনে হয় খুব আনইজি ফিল করছেন?
-আসলে মানে ইয়ে... আপনাকে দেখে তো বাঙ্গালি বা বাংলাদেশের মনে হচ্ছে না।
-হুম, আমি বাঙ্গালি না। আমি হলাম রোমানিয়ান মেয়ে।
আমি আরো অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু এত নিখুত ভাবে কি করে বাংলা বলছেন?
-৫ মিনিট পরে বলি? সূর্য প্রায় ডুবে যাচ্ছে। সূর্যাস্তের শেষ দৃশ্যটা দেখা শেষ করি?
-হুম, ঠিক আছে।

Related Bangla Short Story




গত ছয় মাস হলো আমি রোমানিয়া এসেছি। এর আগে ২ মাস ছিলাম হাঙ্গেরিতে। বড় বোন দুলাভাই এবং দুই ভাগিনা অনেক বছর থেকেই রোমানিয়া বসবাস করছে। হাঙ্গেরিতে কাজের তেমন একটা সুবিদে করতে না পারায় দুলাভাই বললেন রোমানিয়া চলে আসতে। চেষ্টা ভালো ভাবে করলে হাঙ্গেরিতে ভালো কিছু করা যেত, কিন্তু ছোট কাল থেকেই এক অস্তির প্রকৃতির মানুষ আমি । কোথাও ঠিক ভাবে স্থির হতে পারি না। ৫-৬ মাস একটা কিছু করলে দেখা যাচ্ছে আমার আর ভালো লাগে না সে কাজ। আবার নতুন কিছুর পিছনে দৌড়াই। এই ভাবে করতে করতে জীবনে কিছুই করা হয়ে উঠেনি আমার।
রোমানিয়া আসার পর দুলাভাই এবং আপা বললেন, এই সব দেশে কিছু করতে হলে আগে তাদের ভাষা শিখতে হবে। এরা ইংরেজি খুবেই কাঁচা। এরা এদের ভাষাটাকে খুব গুরুত্ব দেয়। যারা তাদের ভাষায় কথা বলে এরা ওদের সাথে বেশি মেশে এবং অনেক সাহায্য করে।
তোর প্রথম কাজ আগে রোমানিয়ান ভাষা শেখা। আপা-দুলা ভাইয়ের কথা শুনে আমিও রোমানিয়ান ভাষা শেখায় নেমে পড়লাম।
ভাষা তো শিখছি না, মনে হচ্ছে আমি যুদ্ধ করছি। মানুষের ভাষা এত কঠিন হয় কি করে! আমার রোমানিয়ান ভাষার কথা শুনে আমার দুই ভাগিনা হাসতে হাসতে অস্থির। তারা আমাকে বলে, মামা কোনো রোমানিয়ান লোক যদি তোমার রোমানিয়ান কথা শুনে তবে বলবে, সারা পৃথিবীতে এই রকম কোনো ভাষা আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। আর যদি শোনে এটা তাদের ভাষা, তবে ভাষা বিকৃতি করার কারনে তোমাকে গুলি করবে।
আপা দুই ভাগিনাকে ধমক দিয়ে বলল, এই তোরা ওকে ভয় দেখাচ্ছিস কেন? আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আর ওতো এখন বাহিরের কারো সাথে কথা বলছে না। ও আমাদের সাথে কথা বলছে, শেখার চেষ্টা করছে।
তো গত ছয় মাসে কিছুটা শিখতে পেরিছি বলে আমার মনে হচ্ছে। বাট এখনো উচ্চারণে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে।
সূর্যাস্তের পর আমি আবার সোনালী চুলের মেয়েটাকে প্রশ্ন করলাম কি করে এত সুন্দর বাংলা শিখলেন বলবেন কি?
-চলেন এক সাথে কফি খেতে খেতে বলি, যদি আপনার সময় থাকে।
-না কোনো সমস্যা নেই আমার সময় আছে।
-অনেক দিনপর কোনো বাঙ্গালির সাথে কথা বলতে পেরে বেশ ভালো লাগছে।
আমরা কফি খেতে খেতে কথা বলা শুরু করলাম। আমি চেষ্টা করছি মেয়েটার সাথে রোমানিয়ান ভাষায় কথা বলতে। আমার কথা বলার স্টাইল দেখে সে বলল, আপনি ভালো চেষ্টা করছে রোমানিয়ান ভাষায় কথা বলতে। এটা দারুন একটা চেষ্টা। আমি বিশ্বাস করি আপনি আপনার চেষ্টায় সফল হবেন। তবে আপনি আমার সাথে বাংলায় বলুন, আমি বাংলাটা বেশ ভালো বুঝি।
এটাই আমাদের এশিয়ান আর ইউরোপের মানুষের প্রার্থক্য। এরা কখনো কাউকে ছোট করে কথা বলে না। আমি যে ঠিক ভাবে রোমানিয়ান ভাষা পারছি না সেটা এই মেয়েটা বুঝতে পারছে। কিন্তু সেটা সে একবারও বলেনি। বরং সে আমাকে এমন ভাবে অনুপ্রেরণা দিল যেন আমি আরো ভালো ভাবে শিখতে পারি।
-আপনার নামটা যেন কি?
-আমি ক্যাথরিন টমাস।
-আমি তনময়।
-শুধু তনময়?
-তনময় হায়দার।
-থাকেন কি দানিউবের আশেপাশে।
-না না, আমি এখানে জলাভূমিটি দেখতে এসেছি। আমি থাকি বুখারেস্ট। আসলে ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে।
-বাহ্ আপনি দেখি আমার মত। আমিও ঘুরতে পছন্দ করি। আমি থাকি বুখারেস্টে। একটা সরকারি জব করছি।
-এখন বলবেন কি এত সুন্দর বাংলা কোথায় শিখলেন?
-আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স মাস্টার্স করেছি।
-কি বলেন!!!!!??  Bengali Ebook Collection
-হুম, সত্যি বলছি। তবে আমার বাংলার হাতেখড়ি রোমানিয়ায়।
সেটা আমার ছোট বেলার গল্প। যদি আবার কোনো দিন আপনার সাথে দেখা হয় তবে গল্পটা সেদিন বলবো।
ক্যাথরিনের বাংলা শেখার হাতেখড়ির গল্পটা সে সন্ধ্যায় আমার আর শোনা হলো না। কারন রাত আটার বাসে তাকে বুখারেস্ট ফিরতে হয়েছে। আমি আরো দুটি দিন দানিউব থেকে গিয়েছি। দানিউব এবং এর চারপাশটা আমার আরো একটু ভালো করে দেখা দরকার।
ক্যাথরিন যাবার সময় বলেছে বুখারেস্ট এসে যদি কখনো রোমানিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসি তবে যেন তার সাথে দেখা করি। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম। মেয়েটাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আমি আমার হোটেলে চলে আসলাম।
ইউরোপের বেশির ভাগ দেশেই গড় তাপমাত্রা থাকে ২০-২৫ ডিগ্রী। যেটা বলা যায় আমাদের এশিয়ার শীতের সময়। আর এসব দেশে শীতের সময় তাপমাত্রা সবসময় -২ থেকে - ৪ ডিগ্রী থাকে। কিছু কিছু দেশে আবার তা -১৫ থেকে -১৬ তে নেমে আসে।
রোমানিয়া এখন চলছে শীতের মৌসুম। শীত কাকে বলে যাদের সামর্থ্য আছে তারা এখন এখানে এসে দেখতে পারেন। গত কালকের এখানের তামমাত্রা ছিল -১২ ডিগ্রী। একবার চিন্তা করে দেখুন কি অবস্থা!!
যাই হোক আমি দুদিন পর বুখারেস্ট ফিরে আসলাম। দানিউব থেকে আসার ১০ দিন পর বড় ভাগিনার সাথে এক বিকালে কিছু শপিং করার জন্য মার্কেটে গিয়েছিলাম। সেখানে কাকতলীয় ভাবে ক্যাথরিনের সাথে আমার আবার দেখা। বড় ভাগিনার সাথে ক্যাথরিনকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। ক্যাথরিনের মুখে এত সুন্দর বাংলা শুনে আমার ভাগিনাটাও হা হয়ে তাকিয়ে আছে ক্যাথরিনের দিকে। ভাগিনা আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, মামা এই মেয়ে এত সুন্দর বাংলা শিখলো কোথায়?
-আমি তোমাকে পরে বলবো কোথায় শিখেছে।
-মামা, আমাকে এখন বাসায় ফিরতে হবে। তুমি কি এখন যাবে, নাকি পরে?
-তুমি চলে যাও আমি ওর সাথে একটু কথা বলে পরে আসি।
-ঠিক আছে।
ভাগিনা আমার আর ক্যাথরিনের কাছ থেকে বিদায় নিযে চলে গেল। আমি ক্যাথরিন টমাসকে বললাম, চলেন একটু কফি খাই কোথাও বসে।
-চলেন আমার বাসায় যাই। এখান থেকে ৫ মিনিট লাগবে হেটে যেতে। আমি বাসায় কফি তৈয়ারি করে খাওয়াবো আপনাকে। কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।
আপনার কোনো সমস্যা নেই তো?
-না না কি সমস্যা! চলেন।
ক্যাথরিনের ফ্লাটে ঢুকে আমি অবাক হয়ে এদিক সেদিক দেখতে লাগলাম। কি চমৎকার করে সাজানো গোছানো ফ্লাটটা। ক্যাথরিন বলল, আপনি দুই মিনিট বসুন আমি চেঞ্জ হয়ে আসি।
-হুম, ঠিক আছে। Bangla Golper Boi
ও ভিতরে যাবার পর আমি বসার রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। বিশাল এক রুম। রুমের দেয়ালে ঝুলানো নানা রকম চিত্রকর্ম। দেয়ালের বাম পাশটায় মাঝারি সাইজের একটা ছবি ঝুলছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনজন মানুষ। দুজন পুরুষ এবং মহিলা এবং মাঝ খানে একট ফুটফুটে ৫-৬ বছরের মেয়ে। চেহরা দেখে বুঝা যাচ্ছে এটা ছোট বেলার ক্যাথরিন। সাথের দুজন মনে হয় তার মা-বাবা।
আমি রুমটার বাম কোনায় গিয়ে দেখলাম একটা বুকশেলফ। তাকিয়ে দেখি বই আর বই তাতে। রোমানিয়ান, বাংলা আর ইংরেজি লেখকদের বইয়ে ভরে আছে বুকশেলফটি। কাজী নজরুল, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ, জসিম উদ্দিন, সমরেশ মজুমদার এবং বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখা আরো অনেক অনেক লেখক-লেখিকার বইয়ে ঠাসা ক্যাথরিনের বুকশেলফে। এই ইউরোপের দেশে এক ইউরোপিয়ান মেয়ের ফ্লাটে এত গুলো বাংলা লেখক-লেখিকার বই দেখে আমার চোখে প্রায় জল এসে পড়েছে। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের ত্যাগ বৃথা যায়নি। দেশে বিদেশে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে আমার প্রানের প্রিয় বাংলা ভাষা।
ক্যাথরিন কখন আমার পিছনে এসে দাঁড়ালো বলতে পারবো না। সে যখন হঠাৎ বলে উঠল কি দেখছেন?
আমি চমকে উঠে তার দিকে তাকালাম।
-আরে ভয় পেয়েছেন নাকি?
-না ও রকম কিছুনা। দেখছিলাম আপনার বই সংগ্রহশালা। এত বই কখন থেকে সংগ্রহ করলেন?
-বই পড়তে আর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে আমার খুব ভালো লাগে। বুঝ হবার থেকেই বই সংগ্রহ করি আমি।
-কিন্তু এত বাংলা লেখক-লেখিকার বই!!
-বারে আমি ডিগ্রী নিয়েছি বাংলা সাহিত্যে, আমার কাছে বাংলা সাহিত্যের লেখক লেখিকার বই থাকা স্বাভাবিক নয়কি?
-হুম তা ঠিক বলেছেন।
-আসেন কফি হয়ে গেছে।
-হুম চলুন।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমি বললাম, ফ্লাটে আর কেউ থাকে না? মানে আপনার বাবা-মা অথবা আপনার বয়.......
-না অন্য কেউ থাকে না। আমি একাই থাকি। বাবা থাকেন পর্তুগাল তার নতুন সংসার নিয়ে। মা মারা গেছেন ৮ বছর আগে। আর বয়ফ্রেন্ড ছিল একজন, সে এখন অতিত।
-সরি।
-না না সরি বলার কিছু নেই এখানে। এটা বাস্তবতা। আর বাস্তবতাকে আপনাকে মেনে নিতেই হবে।
-দেয়ালের ছবিটা নিশ্চয় আপনি এবং আপনার বাবা-মার।
-হুম। আমার জীবনের সব চেয়ে সুখি দিন গুলোর স্মৃতি।
-বাবার সাথে যোগাযোগ হয় না?
-হয় মাঝে মাঝে। আমার জন্মদিনে শুভেচ্ছা বার্তা এবং গিফট পাঠায়। ২-৩ বছরে একবার দেখা হয়।
-আপনি উনার কাছে গিয়ে থাকতে তো পারেন
-পারি তো। বাবাও বলেছেন একা একা না থেকে তার নতুন সংসারের বাকি সবার সাথে মিলে এক সাথে থাকতে। কিন্তু আমার মায়ের স্থানে অন্য একজন বসে আছে এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়। তাই দূরে থাকাটাকেই ভালো মনে করছি।
-আপনি তো দেখি বেশ আবেগি। আপনারদের সমাজ ব্যবস্থায় আবেগের পরিমান এতটা খুব কমেই দেখা যায়।
-আমি হয়তো আপনাদের বাংলা সাহিত্যে পড়ালেখা করে এই আবেগটা পেয়েছি।
ক্যাথরিনের কথা শুনে আমি এবং সে এক সাথে হেসে উঠলাম।
-তারপর আপনার কথা বলুন।
-কি বলবো?
-আপনার সম্পর্কে বলুন।
-আমার সম্পর্কে তেমন কিছু বলার নেই। অস্থির প্রকৃতির মানুষ আমি, তাই দেশে কিছু করতে পারিনি। ভাবলাম দেশের বাহিরে গিয়ে হয়তো কিছু করতে পারবো। কিন্তু এখানে এসেও ফলাফল শূন্য।
-ধর্য্য ধরেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
-হুম ধর্য্য ধরা ছাড়া আর কোনো পথও খোলা নেই।
-ভাষা কেমন শিখছেন রোমানিয়ান?
-খুবেই কঠিন। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
-খুব ভালো। আপনি চাইলে আমি আপনাকে রোমানিয়ান ভাষা শিখতে সাহায্য করতে পারি।
-এটা তো আমার জন্য বড় আনন্দের ব্যাপার।
-তবে চলে আসুন প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমার বাসায়।
-আচ্ছা ঠিক আছে। আচ্ছা আপনি কি আমাকে রোমানিয়ার পর্যটন এরিয়া গুলোর একটু বিবরন দিতে পারেন? আমার না রোমানিয়া ঘুরে দেখার খুব ইচ্ছে।
-সমস্যা নেই আমি সব জায়গাই ভালো ভাবে চিনি, জানি। দানিউব ডেল্টা তো দেখা হয়েছে। আপনি চাইলে আরো যেতে পারেন- Cluj-Napoca, মামাইয়া, তিমিসোয়ারা, বাচারেস্ট। এই জায়গা গুলোই সব চেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
এগুলো সম্পর্কে কালকে আমি আপনাকে একটা বিবরন দেয়ার চেষ্টা করবো।
গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। ক্যাথরিন আমাকে উঠতে হবে, অনেক রাত হয়ে গেছে।
ক্যাথরিন তার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ওরে বাবা কখন এত সময় পার হয়ে গেল! শোনুন, আজ রাতে আর বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। ঘড়িতে এখন রাত দুইটা বাজে। আপনার কি বৈধ কাগুজ আছে?
-না।
-তবে তো আরো যাওয়া যাবে না। পুলিশ ধরলে আপনাকে দেশে পাঠাবে না ঠিক, তবে হয়রানির শিকার হতে হবে অনেক। আর বাহিরে প্রচন্ড ঠান্ড পড়ছে এখন। আপনি আজ রাত আমার এখানেই থেকে যান।
আমি ভাবছি এত কম সময়ের পরিচয়ে একটা ভিনদেশী মেয়ের বাসায় থাকা কি ঠিক হবে?
-কি ভাবছেন?
-ভাবছি আমার বড় বোনকে একটা ফোন দিয়ে জানানো দরকার আমি আজ বাসায় আসছি না।
-তবে একটা কল করে জানিয়ে দিন।
রাতের ডিনার শেষে ক্যাথরিন আমার জন্য তার পাশের রুমে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিল। আমাকে রুমে সব ঠিক করে দিয়ে সে তার রুমে চলে গেল। ১০ মিনিট পর আবার ফিরে আসলো। এবার আর আমি লজ্জায় তার দিকে তাকাতেই পারছি না। তার জন্য ব্যাপারটা খুবেই ইজি বাট আমার জন্য এটা হজম করা খুবেই কঠিন। এটাই ইউরোপ এবং এশিয়ানদের মাঝে সব চেয়ে বড় প্রার্থক্য
ক্যাথরিনের এই রকম খোলামেলা নাইট ড্রেসে আমার রুমে আসায় সত্যি আমি খুব বেশি লজ্জায় পড়ে গেলাম। কোনো ভাবেই লজ্জায় মাথা তুলে তার দিকে তাকাতেই পারছি না।
আমি লজ্জায় মরছি আর ঐ দিকে ক্যাথরিন পুরাই স্বাভাবিক। তার কথা এবং আচারণে ঐ রকম কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। সে আমাকে বলল,
-আপনার একটা ব্লাংকেটে চলবে, নাকি আরেকটা দিতে হবে।
-না একটাই ঠিক আছে।
-ওকে আমি যাচ্ছি আপনি ঘুমান। Good Night.
-Good Night.
ভোর রাতে দরজা খোলার শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। রুমের ডিম লাইটের আলোয় সব পরিস্কার দেখছি আমি। তাকিয়ে দেখি ক্যাথরিন রুমে প্রবেশ করেছে। আমি কোনো শব্দ না করে শোয়ে রইলাম। বুঝার চেষ্টা করছি এই সোনালী চুলের রোমানিয়ান মেয়েটা কি করতে চাইছে।
সে আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো নিশ্চুপে। কিছু সময় এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি মনে মনে ভাবছি ৩২ বছরের ইজ্জত আজ যাবে মনে হচ্ছে। আমার উল্টাপাল্টা সব ধারনাকে পাল্টে দিয়ে ক্যাথরিন আমার শরীরের উপর ব্লাংকেটটা ভালো ভাবে জড়িয়ে দিল এবং যাবার সময় আমার মাথার চুলে বিলিকেটে দিল।
ঠিক যে ভাবে সে নিশ্চুপে এসেছে ঠিক সে ভাবেই চলে গেল।
ক্যাথরিন যাবার পর আমার নিজের উপর নিজের খুব রাগ হতে লাগল। কেন না বুঝে না জেনে একটা মানুষকে নিয়ে এই ভাবে বাজে চিন্তা করলাম। রাতের এই ঘটনার পর ক্যাথরিনের প্রতি এক অসম্ভব ভালো লাগা এবং শ্রদ্ধাবোধে আমার মনটা ভরে গেল।
ভোর রাতে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল ৮টায় ক্যাথরিনের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গল।
-তনময় উঠে আসোন ব্রেকফাস্ট রেডি।
আমি ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে দেখি ক্যাথরিন কফি তৈয়ারি করছে। একটা ব্লু কালারের উলের সোয়াটারের সাথে কালো লম্বা সুতির প্লাজোতে তাকে দারুন লাগছে দেখতে। বিশেষ করে সে তার সোনালী চুল গুলোকে একটা প্যাঁচ দিয়ে একটা কালো ক্লিপ দিয়ে আটকিয়ে রাখায় তার ফর্সা লাম্বা ঘাড়টা যে কোনে পুরুষের জন্য ভয়ংকর আকর্ষণের হয়ে ফুটে উঠেছে এখন। আমি দূর থেকে কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
-আরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আসেন। আমাকে আবার অফিসে যাবার জন্য রেডি হতে হবে।
-হুম আসছি।
এভাবেই শুরু আমার আর ক্যাথরিনের বন্ধুত্বের পথ চলা। আমরা কবে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি দুজনের কেউই জানি না। প্রতিদিন সন্ধ্যা সে আমাকে রোমানিয়ান ভাষা শিখাতো। তার চেষ্টায় আমি তা ভালো ভাবে রপ্ত করতে শিখেছি গত তিন মাসে।
আমরা এক সাথে প্রচুর আড্ডা মারতাম, গল্প করতাম। সিনেমা দেখা, থিয়েটারে গিয়ে নাটক দেখা ছিল প্রতি সপ্তাহের রুটিন মাফিক কাজ।
-তনময় তোমাকে তো পর্যটন এলাকা গুলো বিবরন দেয়া হয়নি। শোনবে এখন?
-শোনবো তো নিশ্চয় তবে আগে তোমার ছোট বেলার গল্প বল। কি করে প্রথম তুমি বাংলা শিখলে তা জানাও।
আমি বাবা-মা তখন থাকতাম গালাতি শহরে। আমার বয়স তখন ৬ কি ৭ বছর হবে। আমাদের পাশের বাড়িতেই এক বাংলাদেশি দম্পতি থাকতেন। ঐ আঙ্কেল-আন্টির আমার সমবয়সি একটা মেয়ে ছিল। নাম তার রাইমা। রাইমা আর আমার মাঝে খুব ভাব হয়ে যায়। ছোট বেলায় সমবয়সি ছেলে-মেয়েদের যা হয় আরকি। যদিও আমি রাইমার বাংলা বুঝতাম না এবং সে আমার রুমানিয়ান ভাষা। আমরা তখন একে অন্যের সাথে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি এবং হাত মুখের অঙ্গভঙ্গি করে ভাষা আদান প্রদান করতাম।
আস্তে আস্তে আমাদের বাসায় রাইমার আর রাইমাদের বাসায় আমার যাতায়ত বাড়তে লাগল। শিল্পা আন্টি, রাহিমার মা বাসায় বাংলায় কথা বলতেন। একদিন আমি আন্টিকে ইংরেজিতে বললাম, I want to Learn Bangla. Will you teach me?
এরপর থেকে আন্টি আমাকে আর রাইমাকে হাতে ধরে ধরে বাংলা লেখা এবং পড়া শিখালেন।
সেদিন থেকে যে আমি বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গেলাম এখন পর্যন্ত তা ছাড়তে পারিনি।
-ইন্টারেস্টিং তো!
-হুম, অনেক মজার তাইনা?
-হুম।
-আমার অফিস দুইদিন বন্ধ। চল কোথায় থেকে ঘুরে আসি।
-কোথায় যেতে চাও।
-রোমানিয়ার যে সব জায়গায় তোমার ঘুরা হয়নি এই রকম একটায়। চল তিমিসোয়ারা যাই।
-তোমার যেখানটা ভালো মনে হয়।
-তিমিসোয়ারা সম্পর্কে তোমাকে একটু বলে নেই। তিমিসোয়ারার অবস্থান পশ্চিম রোমানিয়ায় । এটি রোমানিয়ার অন্যতম বড় শহর এবং একই সাথে অনেক প্রাচীন, ১৩ শতাব্দীতে এর প্রতিষ্ঠা। অটোম্যান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল এটি একসময়। এটিই প্রথম ইউরোপিয়ান শহর যার রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার হয়েছিল। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময় শহরটির বড় অংশে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এখানে Timișoara Orthodox Cathedral টি নির্মিত হয়েছে বিংশ শতাব্দীতে। এর কেন্দ্রে রয়েছে ১১ টি উল্লেখযোগ্য টাওয়ার। এখানে গচ্ছিত আছে ভিন্টেজ আইকন পেইন্টিং সহ আরও অনেক ঐতিহাসিক ধর্মীয় দর্শনীয় বস্তু।
-বাহ্ তুমি তো দেখি অনেক কিছু জানো।
-জানবো না! এটা আমার জন্মভূমি তো। আমার মতে প্রতিটি মানুষ তার দেশ সম্পর্কে জানা ফরজ কাজ।
-কবে যাবে?
-কালকেই বের হই।
-ওকে। আমি এখন যাই তাহলে।
-যেও না তনময়, তুমি থাকলে ভালো লাগে খুব।
-তুমি না বললে কালকে তিমিসোয়ার যাবে! আমাকে ব্যাগ গোছাতে হবে তো।
-ঠিক আছে যাও। বাসায় গিয়ে ব্যাগ গোছিয়ে আমার বাসায় রাতে চলে এসো। আমি আজ ডিনারে তোমার জন্য সি ফুডের নতুন একটা রেসিপি তৈয়ারি করবো।
-আসতেই হবে রাতে?
-হুম, আসতেই হবে।
-ওকে।
-তনময়?
-হুম।
-তোমার চুলে একটু হাতবুলাই?
-কেন?
-তোমার চুল হাতাতে আমার খুব ভালো লাগে।
আমি একটু হেসে মাথা বাড়িয়ে দিলাম ক্যাথরিনের দিকে।
রাতে ক্যাথরিনের বাসায় ক্যাথরিনের হাতে তৈয়ারি করা অসাধারণ সাদের সি-ফুড খেলাম।
সকালে আমরা তিমিসোয়ারা রওয়ানা দিলাম। আমার এখনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সারা রাস্তায় গাড়ি ক্যাথরিনেই চালিয়েছে। আমি বললাম তুমি একটু রেস্ট নাও আমি কিছু সময় গাড়ি চালাই।
-না না রিক্স নিয়ে কাজ নেই। এমনিতেই কেন যেন তোমার কাগুজপত্র ঠিক হতে দেরি হচ্ছে বুঝি না! তার উপর কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি চালাতে দেখলে পুলিশ আবার নতুন ঝামেলা সৃষ্টি করবে।
আমি আর Argue করলাম না। তিন চার ঘন্টার রাস্তা গাড়ির ভিতর আমি ক্যাথরিনের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। ক্যাথরিনের ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গল।
-তনময় উঠো আমরা চলে এসেছি।
আমি চোখ রগড়াতে রগড়াতে ক্যাথরিনের দিকে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি সে মিষ্টি একটা হাসি দিল।
-ইস্ তোমার খুব কষ্ট হয়েছে তাইনা?
-দূর কি যে বল! বরং আমার ভালোই লেগেছে। কি দারুন মিষ্টি একটা ঘ্রান আসছিল তোমার চুল থেকে।
-কিযে বল না তুমি ক্যাথরিন! বরং তোমার এই সোনালী চুল গুলোই আমাকে খুব অস্থির করে তোলে। তোমার মনে আছে কিনা জানি না, প্রথম যেদিন তোমার সাথে আমার কথা হয় আমি সেদিন তোমার সোনালী চুল গুলোর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।
-মনে নেই আবার! আমি সেদিন ভাবছিলাম, ছেলেরা মেয়েদের কত কিছুর দিকে তাকায় আর এই ছেলে দেখি আমার চুলের দিকে তাকিয়ে আছে।
তোমার আর আমার মাঝে একটা জিনিস খুব ভালো মিল আছে তনময়।
-কি
-তুমি আমার চুল পছন্দ করো আর আমি তোমার।
-ঠিক বলছো।
দুই দিন আমরা তিমিসোয়ারা ঘুরে কাটালাম। দুই দিন পর আবার বুখারেস্ট ফিরে আসলাম। দিনের পর দিন বন্ধুত্বের মায়াজালে আমরা আরো জড়িয়ে পড়তে লাগলাম। মাঝে মাঝে এমন অনেক বার হয়েছে যে আমরা একে অন্যের খুব কাছে চলে আসতে আসতেও পাশকেটে চলে গিয়েছি। দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে আমি, না হয় সে নিজেকে সংযত করে নিয়েছি। আমাদের শরীরের চাহিদা কখনো আমাদের বিবেকের দেয়াল টপকাতে পারেনি। আমরা দুজনেই জানি আমরা একে অন্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
দেখতে দেখতে বছর মাস ঘুরে একটা বছর কেটে গেল আমার রোমানিয়ায়। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আজকের এই দিনটা আমি আর ক্যাথরিন অনেক মজা করে কাটিয়েছি। এক সাথে খেলাম, ঘুরলাম, আড্ডা দিলাম।
সন্ধ্যার পরেই ক্যাথরিন আমাকে গাড়িতে তুলে রওয়ানা দিল।
-কোথায় যাচ্ছি আমরা?
-পরে বলবো।
-এখন বল।
-এখন না, আগে শহরটা পার হয়ে নেই তারপর।
আমি এবার নিশ্চিত হলাম আমরা বুখারেস্ট থেকে বাহিরে কোথাও যাচ্ছি।
বুখারেস্ট শহরটা পার হওয়ার পরেই ক্যাথরিন বলল, আমরা এখন যাচ্ছি Cluj-Napoca.
রোমানিয়ার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় এখানে অবস্থিত। Cluj-Napoca কে বলা হয় ট্রানসিল্ভেনিয়ার অপ্রাতিষ্ঠানিক রাজধানী। এক সময় এটি ছিল রোমের কলোনি। বর্তমানে এটি রোমানিয়ার শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশাল হাঙ্গারিয়ান জনগোষ্ঠীর বাসভুমি Cluj-Napoca তে হাঙ্গারিয়ান রাজার বেশ বড় একটি ভাস্কর্য রয়েছে। গথিক সেন্ট মাইকেলের চার্চের চার্চ টাওয়ারটি দেশের সবচেয়ে লম্বা চার্চ টাওয়ার, যা নির্মিত হয়েছে ১৪ শতকে। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ আর্ট এমন একটি যাদুঘর যা না দেখলে তুমি মিস করবে রোমানিয়ার শিল্পীদের চমৎকার কাজগুলো। তাই আজকের চমৎকার এই দিনে তোমাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছি।
-কিন্তু বললে না কেন? আমি তো ব্যাগ জামা কিছুই নিলাম না।
-লাগবে না, সব কিছু ওখানে কিনলে পাওয়া যায়। Bengali Ebook Collection
রাত প্রায় শেষ হতে চলেছে। মায়াবী শীতের রাতের চাঁদটা রোমানিয়ার পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। গাড়ির কাচ ডিঙ্গিয়ে রুপালি চাঁদের আলো এসে পড়ছে ক্যাথরিনের মুখের উপর। পলকহীন চোখে ক্যাথরিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। মনে মনে শুধু বললাম, মানুষ এতটা সুন্দর কি করে হয়!
আমরা ১৫ ফেব্রুয়ারি সারাটা দিন Cluj-Napoca ঘুরে কাটালাম। ১৫ তারিখ রাতেই বুখারেস্টের উদ্দেশ্যে আবার রওয়ানা দিলাম। আসার আগে ক্যাথরিন তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা রোলেক্স ঘড়ি বের করে আমার বাম হাতে পরিয়ে দিল, আর বলল, ভালোবাসা দিবসে আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য।
-thank you very much my dear. But এত দামি ঘড়ি দেয়ার কি দরকার ছিল?
-বন্ধুত্বের মাঝে দামি আর অদামির কোনো স্থান নেই। গিফট শুধুই গিফট।
-কিন্তু আমি তোমাকে কি দেই বলতো?
-তোমার কিছু দিতে হবে না এখন। আগে তোমার বৈধ কাগজপত্র হোক। তারপর ভালো একটা জব পাও, তখন তোমার যা মন চায় দিও।
-কিন্তু তারপরও এখন তো কিছু দেয়া দরকার।
-কিছু লাগবে না আমার তনময়। তুমি শুধু আমার পাশে থেকো সব সময়। আমার কাছে তুমিই একটা বড় গিফট।
-দাঁড়াও দাঁড়াও দেখি তোমাকে কি দেয়া যায়। তুমি একটু চোখ বন্ধ করো।
-কেন তনময়!!!
-আগে তো করো।
-আচ্ছা ঠিক আছে বাবা করলাম।
আমি আমার জামার বুক পকেট থেকে ক্যাথরিনের জন্য বাংলাদেশ থেকে আমার বন্ধু রিফাতের মাধ্যমে নিয়ে আসা পায়েলটা বের করে ক্যাথরিনের বাম পায়ে পরিয়ে দিলাম।
-এবার চোখ খোল।
-ওমা!! কি সুন্দর। কোথায় থেকে নিলে এটা?
-বাংলাদেশ থেকে আনিয়েছি। তোমার পছন্দ হয়েছে?
-খু........ব।
ছোট বাচ্চাদের মত খুশিতে লাফাতে লাগল ক্যাথরিন। দৌড়ে এসে দু হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো সে। আর বলল, আমার জীবনের সব চেয়ে মূল্যবান গিফট এটা তনময়। জীবনের যে কোনো পরিস্থিতিতে আমি এটা আগলে রাগবো।
রোমানিয়ার সব জায়গা আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে ক্যাথরিন গত এক বছর ধরে। তারমত এমন বন্ধু মানুষ ভাগ্য জোরে পায়। সব ঠিক ভাবে চলছে বাট কোনো ভাবে আমি বৈধ হতে পারছি না। আপা-দুলাভাই চেষ্টা করছেন, ক্যাথরিন তো দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে আমাকে বৈধ করা নিয়ে। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না।
এদিকে আমার মন ছটফট করছে দেশে যাবার জন্য। মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। মাও খুব কান্নাকাটি করছে আমাকে দেখার জন্য। এখন একবার যদি দেশে চলে যাই তবে আবার ইউরোপে ঢুকা বলতে গেলে অসম্ভব। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
একদিন ক্যাথরিন তার বাসায় ডাকলো।
-কিছু বলবে? এত জরুরী আসতে বললে যে?
-আসো, এখানে বসো।
আমি গিয়ে ক্যাথরিনের সামনে কার্পেটে বসে পড়লাম। সে দু হাতে আমার চুল নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, তনময় আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমার কাগজপত্র ঠিক করতে। কিন্তু কোনো ভাবেই পারিনি। তোমার ভিসায় সমস্যা আছে। শুধু তা না আরো কিছু বড় মিসটেক আছে। তুমি যে উকিলের মাধ্যমে কেস করেছো সেখানে তোমার জন্ম তারিখ এবং তোমার পাসপোর্টের জন্মতারিখ আলাদা আলাদা। এবং বাংলাদেশ থেকে যে পত্রিকার কাটিং এনে তুমি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছ সে গুলোর মাঝেও অনেক গড়মিল রয়েছে।
-কি করবো এখন তাহলে?
-দুটি রাস্তা আছে আমার কাছে।
-কি, বল তাড়াতাড়ি।
-আমার বন্ধু ডেভিড জার্মান রোমানিয়ান এ্যাম্বাসিতে আছে। আমি তোমার ব্যাপারে তার সাথে কথা বলেছি। তুমি জার্মান চলে যাও। সেখানে ডেভিড তোমাকে সাহায্য করবে এবং বৈধ হতে পারবে খুব তাড়াতাড়ি।
-না না আমি জার্মান যাবো না। তোমাকে ছেড়ে সেখানে থাকতে পারবো না। তুমি বরং ২য় রাস্তাটার কথা বল।
-২য় রাস্তাটা হলো..
-কি হলো থেমে গেলে কেন?
-না তনময় ২য় কোনো রাস্তা নেই।
-এই না তুমি বললে ২য় রাস্তার কথা।
-বলেছি বাট এখন মনে হচ্ছে ২য় কোনো রাস্তাই নেই।
-ক্যাথরিন তুমি মনে হয় কিছু লুকাতে চাইছো আমার কাছে।
হঠাৎ আমার মাথায় বিচরণ করা ক্যাথরিনের দু হাত থেমে গেল। কিছু সময় সে চুপ করে রইলো।
-কি হলো কিছু বল।
-কিছু বলার নেই। তুমি জার্মান যাচ্ছো এটাই ফাইনাল।
-কিন্তু..
-কোনো কিন্তু নেই তনময়। তুমি না বললে, তোমার মাকে তোমার দেখতে মন চাইছে।
-হুম বলেছি।
-তবে জার্মান যাও। ডেভিড তোমাকে সাহায্য করবে। খুব তাড়াতাড়ি বৈধ হয়ে দেশে গিয়ে মাকে দেখে এসো।
-না, আমি যাবো না। তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।
হঠাৎ দেখলাম ক্যাথরিন শক্ত হয়ে গেল। চিৎকার করে বলে উঠল ছোট বাচ্চাদের মত কথা বল কেন? আসলে তোমরা এশিয়ার লোক গুলো এই রকমেই, একটু প্রশ্রয় দিলে মাথায় উঠে বসো। উনাদের আবেগ যেন আর ধরে না, যতসব" তোমার সাথে কি এমন সম্পর্ক আমার যার জন্য আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না!! এই নাও জার্মান যাওয়ার সব কাগুজপত্র। মন চাইলে চলে যেও। আর কখনো আমার বাসায় আসবে না।
আমি উঠে অবাক হয়ে ক্যাথরিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে অন্য দিকে মুখ করে বসে আছে। আমি ভাবছি এই কি সেই ক্যাথরিন যাকে আমি গত এক বছর থেকে চিনি জানি!
ক্যাথরিনের এই রকম আচরণে আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি তার চেয়ে হাজার গুন অপমানিত হয়েছি। আমি আমাকে দেয়া ক্যাথরিনের জার্মান যাওয়ার সব কাগজপত্র তার টেবিলের উপর রেখে চুপিসারে বাসায় চলে আসলাম।
গত ১৪ দিন একবারের জন্যেও আমি তার বাসায় যাইনি। কোনো রকম যোগাযোগ সে করেনি, আমিও না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর রোমানিয়াই থেকে কাম নেই। এখানে বৈধ হতে আমি কোনো দিন পারবো না। আর যে সোনালী চুলের মেয়ের জন্য থাকতে চেয়েছি সেই যখন কোনো রকম সম্পর্ক রাখলোনা তবে এখানে আর কেন?
আমি পর্তগালে বসবাস করা বন্ধু কিবরিয়ার সাথে যোগাযোগ করে পর্তগাল চলে আসলাম। আমার ভবঘুরে জীবনের নতুন আরেকটা অধ্যায়ের সূচনা হলো।
পর্তুগাল দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের আরেকটি রাষ্ট্র। এটি আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে, স্পেনের দক্ষিণে ও পশ্চিমে অবস্থিত। আটলান্টিক মহাসাগরে দেশটির দীর্ঘ উপকূল রয়েছে। এছাড়াও দুটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপপুঞ্জ পর্তগালের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই দ্বীপপুঞ্জ হল আসোরেস এবং মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জ। যারা উভয়েই আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। মাদেইরা দ্বীপ আবার খুব জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত। এটার কারন একটাই, আর তা হলো বর্তমান বিশ্বের নাম্বার ওয়ান এবং পর্তগালের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল প্লেয়ার রোনালদো। এই মাদেইরা দ্বীপে এই সর্বকালের সেরা জনপ্রিয় প্লেয়ারের জন্ম। তাঁকে ঘিরেই মাদেইরার জনপ্রিয়তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। লিসবন পর্তুগালের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
এই লিসবন শহরে আমার বেশি দিন থাকা হয়নি। তিন মাসের মাথায় আমি পর্তগাল ছেড়ে ইউরোপের আরেক রাষ্ট্র ফ্রান্সে পাড়ি জমাই।
ফ্রান্স সম্পর্কে কিছু লিখতে মন চাইছে। তবে সেটা আমি পরে লিখবো। ফ্রান্সে আসার ৬ মাসের মাথায় আমি আমার ফ্রান্সে থাকা এবং কাজ করার বৈধ কাগজপত্র পেয়ে যাই। এর ভিতরে আরো দেড় বছর কেটে যায় আমার ইউরোপে। মাঝে একবার দেশে গিয়ে মাকে দেখে আসি।
 Bengali New Ebook Collection
কিছু দিন আগে রোমানিয়া থেকে বড় ভাগিনা ফোন দিয়ে বলল, মামা গতকাল তোমার বান্ধবী ক্যাথরিনের সাথে দেখা হয়েছে। তোমার সম্পর্কে জানতে চেয়েছে, কোথায় আছো? কি করো?
মামা, চুপ করে আছো যে?
-তুমি বল আমি শোনছি।
-তোমার নাম্বার চেয়েছে আমার কাছে। আমি বলেছি মামার সাথে কথা বলে পরে দিব।
-ভালো করেছো। আর শোনো আবার দেখা হলে বলবে, মামা নাম্বার দিতে না করেছে।
-মামা
-বল
-কি হয়েছে তোমাদের মাঝে?
-কিছু না। আমার কাজ আছে এখন আমি রাখছি।
মোবাইলের লাইন কেটে ভাবনার রাজ্য হারিয়ে গেলাম আমি। আহারে কত দিন দেখি না সেই সোনালী চুলের মেয়েটাকে। কত সুন্দর, কত মিষ্টি সময় কাটিয়েছি তার সাথে। সে সব স্মৃতিরা মনের দরজায় এখন দোলা দিয়ে যাচ্ছে। আমি একটু একটু করে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তে লাগলাম।
পরক্ষণে এক ভয়াবহ অভিমান আমাকে আকঁড়ে ধরলো। সেদিনের ক্যাথরিনের অবহেলা, অপমান আমার প্রতি, এশিয়ার জনগণের প্রতি আমাকে আরো বেশি কঠিন এবং অভিমানি করে তুললো।
ফ্রান্সে আমি গার্মেন্টসের এক্সপোর্ট ইমপোর্টের বিজনেস শুরু করলাম। এক বছরের মাথায় নিজের অবস্থান শক্ত করে নিলাম এই লাইনে। বিজনেসের পাশাপাশি আমি ফ্রান্সের অলিতে গলিতে সুযোগ ফেলেই ঘুরে বেড়াতাম। ঘুরতে আমার সব সময় ভালো লাগে।
যদিও ফ্রান্স মদ এবং পনিরের জন্য বিখ্যাত তবে বছর জুরে দেশটিতে ৮২ মিলিওনেরও বেশি দর্শনার্থী আসে বিভিন্ন দেশ থেকে এই দেশের দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থান গুলো দেখতে। দেশটিতে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এর সংখ্যা ৩৯ টি।
প্যারিস, তুলাউস, লিওন, বারডোও শহর গুলোতেই সব চেয়ে বেশি পর্যটকরা আসে।
ফ্রান্সের দর্শনীয় এবং আকর্ষণী স্থান গুলো হল,
১) আইফেল টাওয়ার
২) ভার্সাইল
৩) ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা/ কোট ডা'জিউর
৪)মন্ট সেন্ট-মিচেল
৫) লুভ্যর মিউজিয়াম।
এই পাঁচ স্থানেই মূলত সকল পর্যটকদের মূল আকর্ষণ। এর বাহিরে আরো অনেক গুলো জায়গা আছে ফ্রান্সে যা সত্যি অসাধারন সুন্দর।
আসলে উপরের স্থান গুলোর বিবরন দিতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু এতে করে মূল লেখাটা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি আর বিবরনের দিকে নাইবা যাই।
রোমানিয়ে ছেড়ে আসলাম আজ ৫ বছর। এই পাঁচ বছর একবারের জন্যও আমার রোমানিয়া যাওয়া হয়নি। অথচ গত ৫ বছরে আমি ইউরোপের সব দেশেই ঘুরে ফিরেছি। কত রংগের, কত ঢংয়ের, কত বর্নের মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে তার কোনে হিসাব নেই। কিন্তু এর পরেও বুকের ভিতর কেমন যেন নেই নেই সুর বাজছে প্রতিনিয়ত। কিছু মিস করছি, কেউ একজনকে মিস করছি। চোখ বন্ধ করলে সেই সোনালী চুলের কেউ একজন চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। অথচ আমি তাবৎ পৃথিবী ঘুরে বহু বর্ণের নারীর মাঝে সেই সোনালী চুলের মেয়েকে খুঁজেছি। কিন্তু আমি পাইনি, তার মত কাউকে পাইনি। তার চলায়-বলায় সে সবার থেকে আলাদা। আমি বুঝে গিয়েছি এই জন্মে তাকে ভুলে থাকা আমার সম্ভব না। তাই আমি ভুলে থাকার মত জটিল কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখলাম।
এই যে বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে কত রকম মাধ্যম, ইমেইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, হাজার হাজার ব্লগ আরো কত কি! চাইলেই যে কোনো মাধ্যামে আমি ক্যাথরিনের সাথে যোগাযোগ করতে পারি। কিন্তু আমি করিনি। পারিনি আমার মিছে অভিমানকে দূরে সরিয়ে রাখতে। তাই প্রতিদিন তার সাথে কাটানো স্মৃতিকে আকঁড়ে ধরে বেঁচে আছি।
এই পাঁচটা বছরে কত কি বদলে গেল! ৩২ ছেড়ে আমি এখন ৩৭ পা দিলাম। মাথার কিছু চুলে পাক ধরেছে। বুঝতে পারছি সময় ছুটছে পাগলা ঘোড়ার মত।
আমরা ছুটছি তো মানুষ সীমাহীন গতিতে তবে সময়ের আগে না।
মনটা খুব অস্থির হয়ে আছে গত দুই দিন থেকে। চিন্তা করলাম ফ্রান্সের ভার্সাইল একটু ঘুরে আসলে হয়তো ভালো লাগবে। এই স্থানটা সব সময় আমার খুব পছন্দের। যেই ভাবনা সেই কাজ। চলে গেলাম ভার্সাইল।
ভার্সাইল(Versaille) যা হলো ফ্রান্সের একটি ছোট গ্রাম। আর এই ভার্সাইল গ্রাম তার বৃহৎ এবং অত্যাশ্চর্য প্রাসাদ(চাতেউ) এর জন্য বিখ্যাত। এই স্থানটি হল ফরাসি শিল্পের এক অন্যতম সৌন্দর্যের নিদর্শন। ফরাসি বিপ্লবের সময় রানি মারি এন্তনের জন্য ভার্সাইল প্রায়ই খবরের শিরোনাম হতো। ভার্সাইলের মূল বাসভবন শুধুমাত্র এয়োদশ লুই এবং তাঁর পরিবারের জন্য একটি শিকার লজ হিসাবে ব্যবহূত হলেও পরবর্তীকালে একে বিভিন্ন ভাবে অলংকৃত করে একটি অপরিমেয় রাজকীয় ভবনে রুপ দেওয়া হয়। রাজকীয় এই প্রাসাদটি তার সুন্দর বাগান এবং "হল অফ মিরর" এর জন্য খুবই পরিচিত। ফ্রান্সের পর্যটকরা সাধারণত বিখ্যাত এবং রাজকীয় এই প্রাসাদটির পরিদর্শন করতেই ভার্সাইল আসে।
বিকালের কোমল শান্ত পরিবেশে আমি ঘুরে ঘুরে প্রাসাদটি দেখতে লাগলাম। যদিও আমি চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারবো এই বিশাল প্রাসাদের কোথায় কি আছে। আসলে গত পাঁচ বছর এই জায়গায় আমি কত বার এসেছি যে তার হিসাব নেই।
প্রাসাদের দক্ষিণ পাশে এসে দেখি অনেক পর্যটক সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাসাদটা দেখছে। আমিও তাদের পিছনে এসে দাঁড়ালাম। একজন টুরিস্ট গাইড ইংরাজিতে প্রাসাদের বিবরন দিচ্ছেন। হঠাৎ একদম সামনে দাঁড়ানো একটা মেয়ের দিকে আমার চোখ পড়ল। আমি মেয়েটার মুখ দেখতে পাচ্ছিন না, শুধু তার পিছনের সাইড দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার সোনালী চুল বাঁধার ইস্টাল দেখে আমার খুব করে এখন ক্যাথরিনের কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক এই ভাবেই চুল গুলো একটা প্যাচ দিয়ে ক্লিপের মাধ্যমে বেঁধে রাখতো সে।
আমার মনের ভিতর কেমন যেন খসখস করছে। আমার চোখ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালী চুলের মেয়েটার দিকেই বার বার চলে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার চোখ মেয়েটার বাম পায়ের গোড়ালিতে গিয়ে আটকে গেল। আমি বিস্ময়ে চমকে উঠে পিছনে দুই পা সরে আসলাম। আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম, আমি যা দেখছি তা কি সত্যি দেখছি!!? কেন জানি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই।

Bangla Golper Boi
SHARE

Author: verified_user