Thursday

বাংলা ছোট গল্প - চাঁদের কপালে টিপ

SHARE

                                বাংলা ছোট গল্প - চাঁদের কপালে টিপ 

                                                     রিয়াদ আলম
bangla golpo

,
চৈত্রের দুপুর ঝিমমেরে আছে।চারদিকে আগুন ছড়ানো রোদ।কোথাও একফোটা বাতাস নেই,ভ্যাপসা গরম।আকাশের খুব উচুতে কয়েক খন্ড সাদা মেঘ স্থির ভেসে আছে।ঋতু , সীমাকে নিয়ে কলা ভবনের গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে।ঋতুর মাথা ব্যথা করছে, সীমার কাছে ডিসপিরিন আছে প্রায় সময়ই সীমার মাথা ব্যথা থাকে তাই সবসময়ই তার ব্যাগে কয়েকটা টেবলেট থাকে।তাকে বললেই ব্যাগ থেকে বের করে দিবে, কিন্তু এখন সীমাকে বলতে ইচ্ছে করছে না।
- চলরে ঋতু ক্লাসে যায়।(সীমা)
-উহু, তুই যা।আমি আজ আর ক্লাস করব না।
- কেন?ঋতুর কথায় সীমা অবাক হয়ে বলে।
-আমার ভাল্লাগছে না।ঋতু মাথা ব্যথার কথাটা চেপে যায়।
-তুই যখন যাবি না,আমি একা গিয়ে কি করবো আমি ও যাচ্ছি না।
ঋতু অন্য সময় হলে বলত 'তুই যাবি না কেন?যা।কিন্তু এখন তার কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা।
-ও..ভালো কথা!চল মাসুকাকে দেখে আসি।মাসুকার শরীর খুব খারাপ।
কয়েকদিন হল ঋতুর মাুসকার সাথে দেখা হয় না।মাসুকার শরীর খারাপ,রোকেয়া হলে থাকে। যাবে যাবে করে ঋতুর যাওয়া হয় নি।
এসময়ে বাসায় গিয়ে কি করবে তারচেয়ে বরং মাসুকার ওখানে যাওয়া যাক।
হলে গিয়ে দেখে মাসুকা দিব্যি অন্য একটা মেয়ের সাথে ক্যারাম খেলছে।
- মাই গড।মাসু,তোর না শরীর খারাপ, আমরা এসেছি তোকে দেখতে আর তুই এখানে ক্যারাম খেলছিস?(সীমা)
-আরে তোরা!আয়,এতদিনে তোদের আসার সময় হল।(মাসুকা)
- আসবো আসবো করে সময় হয় নি।(ঋতু)
- এখন কেমন আছিস?(সীমা)
- এই কিছুটা ভালো।সারাদিন শুয়ে থাকতে ভালো লাগে না।আজ একটু ভালো তাই ভাবলাম কিছুটা সময় কাটিয়ে যাই।
- অনেক শুকিয়ে গেছিস।(ঋতু)
- হু,কিছুইতো খেতে পারি না । চল ক্যারাম খেলি।
- আমি খেলবনা তোরা খেল।(ঋতু)
- ঠিক আছে ঋতু।তুই একটু বস আমি একটা গেম খেলে আসি।(সীমা)
ঋতু বসে থাকে,তার ব্যথা বাড়ছে।সীমাকে কি বলবে একটি টেবলেট দিতে!
ঋতু ওরকম কিছু বলল না।ঋতু মনে মনে ভাবে সে এরকম কেন?
তার ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।অথচ সে কাউকে বলতে পারছে না।তার এই ব্যথার কথাটা সীমাকে বললে কি হত।
তার রোগ খু্ব একটা হয় না।কিন্তু যখন হয় দীর্ঘদিন ভোগায়।তার মনে পড়ে একদিন রাতে তার জ্বর হয় কিন্তু সে কাউকে বলে নি-
মা এসময় ঋতুর বিছানায় বসেন একটা হাত রাখেন ঋতুর কপালে।তিনি ভীষন চমকে উঠেন।কপাল যেন পুড়ে যাচ্ছে।ঠিক এই সময় ঋতু বমি করে ফেলে।ঋতুর মা খুব সেনসেটিভ মহিলা,অল্পতেই তিনি কাতর হয়ে পড়েন।তিনি কেঁদে কেটে, ডাক্তার এনে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা।সেই রোগ সারতে ঋতুর মাস খানেক সময় লেগেছিল।
মাসুকাকে মাত্র বারোতে রেখেই গেম দিয়ে দিলাম,সীমার উৎফুল্ল গলা।সীমা আর মাসুকার খেলা শেষ হয়েছে।ওরা এসে ঋতুর পাশে বসে।ঋতু কিছু বলে না আগের মতোই বসে থাকে।
- ঋতু রুমে চল।(মাসুকা)
-নারে এখন আর রুমে যাব না।
-তাহলে তোরা বস, পাঁচ মিনিটের ভিতর আসছি।
-এখন আর বসার দরকার নেই, চলে যাই।
-না না,তোরা বস অনেক কথা আছে।
মাসুকা দ্রুত চলে যায়।
-তোর ব্যাপার টা কি!সীমা অনেকটা ঝুকে এসে বলে।
ঋতু সীমার দিকে চোখ তুলে বলল,
-কোনটা?
-এই যে অফ হয়ে বসে আছিস।
-কিছু না।(ঋতু মুখে হাসি ফোটাতে চেস্টা করে)
-ইয়ে ঋতু, রিয়াদের ব্যাপরটা কি হলো রে?
-রিয়াদের ব্যাপার মানে? (ঋতু ভ্রু কোঁচকায়।)
-সেদিন তোকে বললাম না ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের রিয়াদ,আমার ফ্রেন্ড সে তোর ব্যাপারে ইন্টারেস্ট ফিল করে।তোর সাথে কথা বলতে চায়।
সাথে সাথে ঋতু অফ হয়ে যায়। নির্বিকার গলায় বলে,
-ওসব নিয়ে এখন ভাবতে চাইনা।
- ঋতু, রিয়াদ তোকে খুব লাইক করে।
-করুক গে। এতে আমার কিছু যায় আসে না।(ঋতুর গলায় কিছুটা ঝাঁঝ)
এতে সীমার দমে যাবার কথা।কিন্তু সীমা আরো আগ্রহী হয়ে বলে,
-আহা, বেচারা তোকে এত লাইক করে।প্রেম-ট্রেম না করিস,অন্তত তার সাথে কথা বল।তাছাড়া রিয়াদ ছেলে হিসেবে খুবই ভাল,ব্রিলিয়ান্ট এন্ড স্মার্ট।

 Bangla Books

  • bangla book
  • bangla ebook
  • bengali story books
  • bengali books pdf
  • bangla book pdf
  • bangla story book
  • bangla books
  • bengali ebook
  • bangla e book
  • bengali books online
  • bangla novel
  • bangla boi pdf
  • bangla islamic book
  • bangla golpo pdf
  • bangla book download
  • bangla ebook pdf
  • bangla book online
  • bengali ebook collection


-তাহলে তুই-ই ওর সাথে প্রেম কর।(ঋতুর রুক্ষ গলা।)
ঋতুর কথায় সীমা হো হো করে হেসে উঠে।
-আরে পাগলী সে ভালবাসে তোকে তাহলে আমি প্রেম করব কিভাবে।
ঋতু হঠাৎ করেই কঠিন কথাটা বলে,
-সীমা! তুই এতো ব্রোকরী করছিস কেন।
কথাটায় সীমা থতমত খেয়ে যায়।প্রথমে সে বুঝে উঠতে পারে না।তারপর ফিস ফিস গলায় বলে,
-ব্রোকারী !
-হ্যা,ব্রোকারী -ইতো।
সীমার মাথাটা ঘুরে উঠে।ঋতু তাকে এত কড়া কথা বলতে পারে এ তার ধারনা ছিল না।সীমার বুক ফেটে কান্না আসে,চোখে জলটলমল।সীমা ধরা গলায় বলে,
-ঋতু তুই যেমন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড,রিয়াদও তেমনি। রিয়াদ দীর্ঘদিন যাবৎ তোর ব্যপারে আমাকে বলে আসছে।আমি তার অনুরোধে কথাটা বলেছি মাত্র।এতে যদি এতটা অন্যায় হবে জানতাম,তাহলে কখনোই বলতাম না,কখনই না।
সীমা ব্যাগ কাধে নিয়ে উঠতে যাবে হঠাৎ ঋতুর চোখে তার চোখ পড়ে।সীমা হতচকিয়ে যায়।ঋতুর চোখ দুটি লালে লাল,চেহারাটা কেমন নার্ভাস,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।সীমা তা দেখে মুহুর্তে কেমন হয়ে যায়।সে ঋতুর প্রতি যাবতীয় রাগ ভুলে একটা হাত রাখে ঋতুর কপালে।কান্না ভেজা চোখে তাকিয়ে বলে
-ঋতু বাড়ি যাবি চল।
সীমার কথায় ঋতু সুবোধ বালিকার মতো উঠে আসে।
,
সীমাদের বাসার গেটের সামনে রিয়াদ বাইক থামায়।বাইক থেকে নেমে এসে মাথায় আঙ্গুল চালিয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে। চোখ থেকে কালো সানগ্লাস নামায়।
চাবির রিংটা ঘুরাতে ঘুরাতে বাসায় ঢোকে।
সীমার ছোট বোন সোমা বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলো,রিয়াদকে আসতে দেখে তার দুস্টুমী পেয়ে বসে।
-আহ...মিস করলেন আপাতো বাসায় নেই।একটু আগে বাহিরে গেছে।
সোমার এই দুস্টুমির সাথে রিয়াদের দীর্ঘদিনের পরিচয়।রিয়াদ সোমার এই দুস্টুমি বুঝতে পেরে সে ও দুস্টুমি করে,
-আজতো আমি সীমার কাছে আসি নি,আজ এসেছি তোমার কাছে।আজ সারাক্ষন তোমার সাথে গল্প করব।
-হায় হায় সমস্যায় পড়ে গেলাম।আমার যে সে সময় নেই,একটু পর বান্ধবীর বাসায় যেতে হবে?(সোমার মুখে মুচকি হাসি।)
-তাইলে তো সমস্যার কথা,কি আর করা যাবে।ঠিক আছে খালাম্মার সাথেই একটু গল্প করে আসি।
রিয়াদের কথায় সোমা হাসিতে ফেটে পড়ে।রিয়াদও হেসে ফেলে ভেতরে ঢোকতে যাবে এমন সময় সোমা বলে,
-রিয়াদ ভাই,শোনেন।
-কি?
-একটা খবর আছে, গরম খবর।(সোমার মুখে রহস্য খেলা করে)
-কি রকম?
সোমা ফিসফিস করে বলে,
-সীমা আপাকে আজ দেখতে এসেছিল!
-দেখতে এসেছিল মানে?
-মানে,পাত্রপক্ষ এসেছিল বউ দেখতে।
-সত্যি?
-সত্যি
-সীমা কোথায়?
-ডাইনিং রুমে।
সীমাদের বাসায় রিয়াদের অবাধ যাতায়াত।প্রতিটি রুমেই সে অনায়াসে আসা-যাওয়া করে।ডাইনিং রুমে ঢোকে রিয়াদ অবাক।সীমা চমৎকার লাল শাড়ি পড়েছে দেখতে অপূর্ব লাগছে।
-মাইগড! সীমু তোকে যে ঠিক বউ বউ লাগছে।
বিনিময়ে সীমা রিয়াদকে ভেংচি কাটে। রিয়াদ হাসিমুকে বলে,
-কিরে তুই এই অসময়ে খেতে বসলি।
-আর বলিস না,একটা ব্যপার হয়েছে।(সীমা)
-হুঁ সোমা আমাকে বলেছে, তুই যে আমাকে এব্যাপারে কিছু বললি না।
-আরে...আগে আমি জানতাম নাকি।হঠাৎ বড় খালা ফোনে জানায়,খালু কয়েকজন মেহমান নিয়ে আমাদের এখানে আসবেন।বাসা যেন ঠিক ঠাক করে রাখা হয়।বুঝতে পারছিস,তারপর সকালের দিকে বড় খালা এসে খাবার-টাবারের আয়োজন করে একবারে হুলস্থুল ব্যাপার।দেখনা এ নিয়ে রাগ করে সারাদিন কিছু খাইনি,একটু আগে খালা রাগ ভাঙ্গিয়েছেন।
-ছেলেও সাথে এসেছিল নাকি।
-হু।
-ছেলে দেখতে কেমন?
-কবি কবি চেহারা।(হেসে)
-মানে কি,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররে মতো!(ফাজলামি করে)
-কাছাকাছি
-ছেলে কি করে?
-কানাডায় থাকে
-আচ্ছা, তারপর ওরা তোকে এই সাজে দেখেছে।
-হু
-হাত,পা,চুল দেখেছে।
-হু,
-দাঁত
-হু,
-ফজর নামাজ ক'রাকাত জিজ্ঞাস করেছে।
-করেছে,
সীমা আর রিয়াদ দুজন একসাথে হেসে উঠে।কথার মাঝখানে সীমা এসে ঢোকে।
-জানেন রিয়াদ ভাই,লোকটানা এক নম্বর ইবলিশ।আমাকে বল, এই শালী তোমার নাম কি?আর আমিও বলে দিয়েছি খবরদার শালী বলবেন না,আগে বিয়ে হোক তারপর।
সোমার কথায় তারা আবার হাসে।হাসি থামিয়ে সীমা বলে,
-এই রিয়াদ তুই কিছু খা।
-এই অসময়ে খাব কি।
-আরে খা, কিছু হবে না।
-ধ্যাত!অসময়ে খেতে পারি না।
-তাহলে শুধু একটু মাংস খান।(সোমা)
সে একটা খালি প্লেট রিয়াদের সামনে বাড়িয়ে দেয়।প্লেটে তুলে দেয় একটা রোস্ট। সাথে এক চামচ পোলাও।
-রিয়াদ ভাই জানেন ওরা আপাকে দেখে কত টাকা দিয়েছে,পাঁচ হাজার টাকা!
-বলো কি?
-সীমা হাসি মুখে মাথা নাড়ে,হ্যা।
-টাকাটা কার কাছে।
-আপার কাছেই।
-আরে এভাবে দেখলে,তুই যে কয়দিনেই লাখপতি হয়ে যাবি।
-হবোইতো।
সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে।খাবার পর ওরা ড্রইং রুমে আসে।কিছুক্ষন পর কাজের মেয়ে চা দিয়ে যায়।গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রিয়াদের হঠাৎ করই মন খারাপ হয়ে যায়।সীমার যদি সত্যি বিয়ে হয়ে যায়,তাহলে সে কি পারবে সময়ে অসময়ে এসে জ্বালাতন করতে,ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতে।
মাঝেমধ্যে সীমা খুব সকালে ফোন করে ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলে-
এই নবাবজাদা এখন এলে চমৎকার ভাপা পিঠা খেতে পারবি।একেকদিন বলে -রিয়াদ শোন রাজশাহী থেকে বড় মামা খুব ভাল জাতের ফজলি আম পাঠিয়েছেন,খেতে চাইলে চলে আয়।
-কিরে কি ভাবছিস।সীমার কথায় মুন্না বাস্তবে আসে।
-এই....কিছু না।
ঋতুর সাথে তোর কথা হয়েছে।
-হু।(সীমা মাথা নাড়ে)
সে এই ব্যাপারে মোটেও এগ্রি না।শোন রিয়াদ এরপর ঋতুর ব্যাপারে চিন্তা করা তোর উচিৎ হবে না।
ঠিক এমন সময় সোমা,সাপ সাপ বলে চিৎকার করে ভিতরে আসে।তারা দ্রুত বারান্দায় এসে গিয়ে দেখে একটা ডোরাকাটা সাপ তর তর করে বাগানের ভিতরে চলে যাচ্ছে।
রিয়াদ,রিমন,অপু,ইমন অনেক্ষন যাবৎ অপুদের বাসায় বসে ফ্ল্যাশ খেলছে,প্রায় সময়ই ওরা এরকম খেলে থাকে।বেশীর ভাগ সময়ই অপুর রুমে খেলা হয়।প্রথম দিকে ইমনের ওখানে খেলা হত,এখন ভুলেও ওখানে খেলতে বলে না।ইমনের মা খুবই কড়া প্রকৃতির মহিলা, সবাই উনাকে ভয় পায়।বেশ কিছুদিন আগে ইমনের ওখানে বসে সবাই চুপি চুপি কার্ড খেলছে হঠাৎ ঝড়ের বেগে ইমনের মা রুমে ঢুকেন,উনাকে দেখে সবাই একেবারে হতভম্ব, কি করবে বুঝতে পারে না।তিনি সবার মাঝ থেকে ইমনে চুলের মুটি টেনে ধরেন।চিৎকার করে বলেন,খবরদার কেউ নড়বেনা,আজ সবাইকে জুতাপেটা করে ছাড়বো।
সম্বিত ফিরে পেয়ে,যে যেভাবে পারে দৌড়ে পালায়।কি লজ্জার কথা,এত বড় ছেলেকে কেউ এভাবে শাসন করে।এই ঘটনার অনেকদিন পরও কেউ ভুলেও ইমনের বাসার দিকে পা মাড়ায়নি,খেলাতো দূরের কথা।অপুর এখানে এই অসুবিধা নেই,প্রায় খালি বাসা।এতবড় বাসা মানুষ মাত্র চারজন অপু,টিপু ভাই,ভাবী এবং তার মা।টিপু ভাইয়ের মোটামুটি বড় ব্যবসা,ফিরতে ফিরতে প্রায়ই অনেক রাত হয়, আর তার মায়ের কোন দিকে তেমন খেয়াল নেই।
তাছাড়া অপুর ভাবী খুবই ভাল।খুব ফ্রি মাইন্ডের মেয়ে মাঝেমধ্যে অপুদের সাথে আড্ডা দেয়,খেলার সময় নাস্তা পাঠায়।
,
অপু বলে, এবার শো দে।
কার্ড শো করলে দেখা যায়,অপুর হাতে কুইনের জোড়া সাথে স্পেইডের নাইন।রিমনের হাতে টেন এর জোড়া সাথে ডাইজের কিং।রিয়াদ আর ইমন আগেই অফ হয়ে গিয়েছিল,অপু শো মানি উঠিয়ে নেয়।
- আর খেলবনা।(রিয়াদ)
- খেলবিনা কেন?(ইমন)
-অনেক্ষন খেললাম,আর ভাল্লাগেনা।
-তোর স্বভাবটাই এরকম যখন লাভের পজিশানে থাকিস।হেরে যাবার ভয়ে ওঠে যাস,সেয়ানা ঘুঘু।
ইমনের কথায় রিয়াদ হেসে ফেলে,
-তুইতো পাক্কা জুয়াড়ি।খেলতে বসলে তোর দিন দুনিয়ার খবর থাকে না।তাছাড়া এখনতো আমি হারলামই ভালো পজিশনেতো অপু আর রিমন।
- ঠিক আছে বাদদে খেলা।(রিমন)
- তাহলে এখন কি করবি?(অপু)
- এখন কিছুটা মদ খাওয়া যেতে পারে,অপু তর কাছে বিয়ার আছে না,বের কর।(ইমন)
অপু উঠে গিয়ে রুমের এককোনে বুক সেলফ্ এর ভিতর থেকে দুটো বোতল বের করে আনল।
- তোরা খা,আমি খাব না।(রিয়াদ)
রিয়াদের কথা শুনে অপু অবাক হয়ে যায়,
-কেন?
-ওসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি,শুধু শুধু খেয়ে লাভ কি?
-তুই বলিস কি?
-হু
- আরে জানিসনা ও একটা মোটকী মতো মেয়ের প্রেমে পড়েছে,ওসব ছেড়েছুড়ে নায়ক নায়ক একটা ভাব ধরেছে।(ইমন)
- যতদূর জানি, তুইতো একতরফা ভাবে ওর পিছনে লেগেছিল।ঋতুতো তোকে একদম পাত্তা দিচ্ছে না।তবু তুই এমন নায়ক ভাব ধরে আছিস কেন।তারচেয়ে বরং এক কাজ কর,ডাইল-টাইল খেয়ে দাড়ি-টাড়ি রেখে দে একদম দেবদাস হয়ে যা।তখন আমরা গিয়ে তাকে বুঝাবো দেখো তামার জন্য হারামজাদার এই অবস্থা, শিউর মরে টরে যাবে,তখন দেখবি বাংলা মুভির স্টাইলে গদগদিয়ে তোর প্রেমে পড়ে যাবে।(রিমন)
রিমনের কথায় অপু-ইমন একসাথে হাত তালি দিয়ে,-চমৎকার বলেছিস।
-তোরা সব উল্টা-পাল্টা কথা বলছিস।এই বিষয়টার সাথে খাওয়া খাওয়ির সম্পর্ক নেই।তাছাড়া তোরা ভেবে দেখ আমরা তো কেও নেশা করার জন্য এসব খাইনা।(রিয়াদ হেসে)
- তাহলে কেন খেয়েছিস।(ইমন)
- বলতে পারিস অনেকটা ফ্যাশন।
-ফ্যাশন? অপু ভ্রু জোড়া কোচঁকায়।

bangla ebook pdf

bangla book online

-হু ফ্যাশনইতো।এক সময় বুঝলাম এই জাতীয় জিনিষ নিয়ে ফ্যাশন করা ঠিক না,স্পর্শ করাও উচিত নয়।সুন্দর একটা জীবন ধ্বংশ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।কথাটা তোদের অনেকবার বলব ভেবেছি,বলা হয়নি।
- আসলে রিয়াদ ঠিকই বলেছে এইযে আমরা এসব খাই, কেন খাই?এর কি কোন উদ্দেশ্য আছে,উদ্দেশ্য ছাড়া কোন কিছু করাতো ঠিকনা,তাছাড়া আমরা সবাই ভদ্র ঘরের ছেলে,ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছি।আমাদের কাছ থেকে সমাজ ভালো কিছুই আশা করে।(রিমন)
রিয়াদ মুখ টিপে হাসে...
- বাহ্ বা,তুই যে শালা রীতিমত একটা লেকচার দিয়ে ফেলেছিস।খাওয়ার সময় তোর এই সুন্দর লেকচার খান কোথায় থাকে।খাবার সময় যে সোনার চান তোমার হিসাব থাকে না।(ইমন)
-হিসাব না থাকলেও সব সময়ই ভেবেছি,এসব খাওয়া ঠিক না,এসব খাওয়া ছেড়ে দিব।রিয়াদের সাথে আমিও আজ থেকে এসব ছোব না।
- আরে রিয়াদ তো একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে মজনু সেজেছে।তোরও এমন কেউ আছে নাকি?(অপু)
-নেশা ছাড়ার জন্য প্রেমে পড়ার দরকার হয় না।(রিমন)
- ঋতু কি এতই সুন্দরী,যে তার জন্য রিয়াদ ভালো হয়ে গেছে সেই সাথে আমাদেরও ভালো করে ফেলছে।(ইমন)
- আমি তা জানি না।আচ্ছা তোরা আজ আমার পিছনে লেগেছিস কেন বলত।(রিয়াদ)
- লাগালাগির কিছু না,তুই কি ঋতুকে সত্যি খুব ভালবাসিস!(রিমন)
- 'ভালবাসি' কথাটিকে আমি কয়েকটা শব্দ দিয়ে শেষ করতে চাইনা,এতে দ্রুত ফুরিয়ে যায় তার আয়ু।ঋতুকে আমি কেমন ভালবাসি তা আমি নিজেও জানি না।শুধু জানি আমার হৃদয়ের অলিন্দে প্রতি মুহুুর্তে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়, ঋতু---ঋতু---ঋতু।
জহির অফিস থেকে বেরুতে বেরুতে ছ'টা বেজে যায়।তার বাসায় পৌছাঁনোর কথা পাঁচটায়,এক ঘন্টা লেট।ঠিক সময় আসার জন্য লুবনা তাকে বার বার বলে দিয়েছে।এজন্য অফিসে একবার ফোনও করেছে।
-হ্যালো,
-হ্যালো, কে লুবনা
-হু
-কি ব্যাপার গো
-পাঁচটার সময় যে বাসায় আসার কথা,এটা কি তোমার মনে আছে।
জহির সত্যি সত্যি ফ্যাসাদে পড়ে যায়।কথাটা তার আসলেই মনে নেই,লুবনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আজ কোন প্রোগ্রাম আছে।কিন্তু সে কিছুই মনে করতে পারছে না,একি জ্বালা।কিছুই মনে থাকে না তার,শুধু মনে না থাকার কারনে এ নিয়ে লুবনার সাথে তার প্রায়ই ঝগড়া হয়।
,
লুবনার ছোট বোন শম্পার বিয়ের আগের দিন চিটাগাং যাবে।ওখানে রাতে খালার বাসায় থেকে পরদিন সকালে কক্সবাজার যাবে।টিকেটও কাটা হয়,কিন্তু সব কিছু ওলটা পালট করে দেয় জহির।এদিন জহির অফিস থেকে বাসায় আসার কথা একটার সময়,অফিস থেকে বেরও হয় ঠিক সময়।সেই সময় জহিরদের গাড়ি কিনা হয়নি।অফিস থেকে বের হয়ে দেখে আশেপাশে কোনন রিকশা নেই।সে রিকশার জন্য অপেক্ষা করে।এসময় সাঁ করে তার সামনে একটা হোন্ডা এসে দাড়ায়।হোন্ডায় বসা মাসুদ,মাসুদের মাথায় চমৎকার লাল কেপ। কেপটা উপর দিকে একটু ঠেলে দিয়ে বলে,
-কিরে কোথায় যাবি
-বাসায়
-ওঠে আয়
জহির মাসুদের পেছনে ওঠে বসে।
-জহির,রিপু যে এসেছে জানিস।
-রিপু...নাতো,জহিরের অবাক গলা কখন এলো।
-এইতো কাল রাতে
-বলিস কি শালা আগেতো কিছুই জানায়নি।
-ওর স্বভাবটাই ওরকম।কাউকে কিছু না জানিয়ে কিছু করা।দেখলি না যাবার আগের দিন আমাদের সবাইকে ডেকে বলে,দোস্তরা কাল আমার ফ্লাইট।তোরা ফেয়ার ওয়েল দিলে দিতে পারিস।নাম্বার ওয়ান হারামী একটা।
জহিরে মনটা আনন্দে ভরে যায়।ইচ্ছে হয় এই মুহুর্তে পাখির মতো উড়াল দিয়ে তার কাছে চলে যায়।তার মাথায় অনবরত ঘুরপাক খায়, রিপু--রিপু---রিপু।
রিপু তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু।বেশীর ভাগ সময় দুজনের একসাথেই কাটতো।রিপুকে ঘিরে রয়েছে কতনা মধুর স্মৃতি,কতনা কথা।
রিপুর ছিলো দুটি হবি-প্রেম করা আর কার্ড খেলা।কার্ড খেলতে বসলে তার কোন সময়জ্ঞান থাকতো না।জীবনে যে কতটা যে প্রেম করেছে তার হিসেব সে নিজেই ভলতে পারবে না।সুন্দরী মেয়ে দেখলেই রিপু পিছনে লেগে যেত আবার কিভাবে যেন ম্যানেজ ও করে ফেলত।এক টাইমে চার চারটা মেয়ের সাথে প্রেম করারও অভ্যাস আছে তার,আছে আপন দু'বোনের সাথে প্রেম করা রেকর্ড। এই জন্য বন্ধুরা রিপুর নাম দিয়ে ছিল 'কন্যারাশি'।
অনার্স ফাইনালের পর কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে রিপু আমেরিকা চলে যায়।চার বছর পর প্রথম তার দেশে আসা।
-যাবি রিপুর ওখানে? (মাসুদ)
কথাটা শোনামাত্র জহির অস্থির হয়ে যায়।মুহুর্তেই ভুলে যায় বাসায় যাবার কথা,চিটাগাং যাবার কথা।জহির মাসুদের সাথে রিপুর ওখানে চলে আসে।পুরানো দিনের মতো সবাই আড্ডায় মেতে যায়।বিকেল ৫টায় হঠাৎ করে তার মনে পড়ে, শরীর ঘেমে উঠে।এখন কি করবে,ট্রেনতো ছেড়ে গেছে তিনটায়।এখন বোধহয় ট্রেন ব্রাক্ষনবাড়িয়ায়।জহির দিশেহারা হয়ে যায়,একটু আগের আনন্দটা মুহুর্তে বাতাসে মিলিয়ে যায়,সেখানে দেখা দেয় অজস্র কালো মেঘের আনাগোনা।বাসার গেটের সামনে এসে জহিরের হৃদকম্প আরো বেড়ে যায়,গলা শুকিয়ে যায়।ভিতরে ডুকে দেখে ঋতু বাগানে হাঁটাহাটি করছে।জহিরকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসে,
-আপনি ভালো আছেন হাদারাম।(জহির বয়সে ঋতু থেকে বড় হলেও সম্পর্কটা ঠিক বন্ধুর মত।)
-ঋতু মা কোথায় রে?
-ভেতরে, পাশের বাসার খালার সাথে কথা বলছেন।
-জহির মাথা চুলকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে,'লুবনা' !
-ভাবী,শুয়ে আছেন।ঋতু হাসে, আহা বেচারী দুপুরেও কিছু খায়নি।
কথাটা শুনে জহিরের মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়।নিজের উপর রাগ হয়,অনুশোচনায় মন ভরে উঠে।লুবনার প্রতি একধরনের মমতায় ছঁয়ে যায়।
-ঋতু, চলনা লুবনার কাছে যাই
-ওহ বাবা আমি না।একটু আগে কত কথা বললাম, একদম পাত্তা দিচ্ছে না।বললাম,ভাবী পৃথিবীতে এত ছেলে থাকতে তুমি কেন যে ওর মত একটা রামছাগলকে প্রেম করে বিয়ে করতে গেলে।
-চুপ করত!সবসময় শুধু ফাজলামি।
-ফাজলামি।যানা,ভাবী তোর নাকটা আজ ভোতা করে দিবে না।তুইতো আস্ত একটা ইডিয়েট,সবার সাথে প্রতারনা করছিস।
কড়া গলায় কথাটি বলে ঋতু অন্যদিকে চলে যায়,তার রাগ উঠে যাচ্ছে।
জহির আনমনে ফিসফিস করে,তোরা যদি আমাকে একটুখানি বুঝতি!
জহির রুমে ঢোকে দেখে,লুবনা দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে।
তার শরীরে পাতলা একটা নক্শী কাথা।অন্ধকার রুম,জহির আলো জ্বেলে দেয়,লুবনা যে ঘুমায়নি এ ব্যাপারে জহির একশো পার্সেন্ট নিশ্চিত।এতবড় রাগ নিয়ে কেউ ঘুমাতে পারে না।লুবনা চোখ বন্ধ করে শুয়ে নিজে নিজে কতভাবে যে সে জহিরের সাথে ঝগড়া করছে।হঠাৎ জহিরের মাথায় বুদ্ধি আসে,সে সোজা বিছানায় ওঠে কাথাটার একটা সাইড তুলে নিজের শরীর উপর দিয়ে লুবনার পাশে শুয়ে পড়ে।কাত হয়ে লুবনাকে জড়িয়ে ধরে।লুবনার শরীরে জহিরের হাত লাগতেই লুবনা হাতটা এক ঝাটকায় ফেলে দেয় গর্জে উঠে,
-খবরদার, আমাকে ছুবে না।
-ঠিক আছে,শুধু আজই একটু ছুব,নতুবা মরে যাব।
জহির লুবনাকে আরো নিভিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে।লুবনা আবারো হাতটা সরিয়ে দেয়,দ্রুত সে উঠে বসে।কড়া গলায় বলে,
-এবার আর তোমার মিষ্টি কথায় মোটেও কাজ হবে না।
জহিরও সাথে সাথে ওঠে বসে।দুহাত দিয়ে লুবনাকে জড়িয়ে ধরে খুব আবেগী গলায় বলে,
-বউ,বউগো!আমার বড় ভুল হয়ে গেছে,মুঝে মাপ করে দাও,লক্ষী।
জহিরের কথায় লুবনা একদম পাত্তা দেয় না,সে ততোধিক কড়া গলায় বলে,
-ছাড়ো বলছি।
-উঁ...হু
-ছাড়ো নতুবা...।(লুবনার তীক্ষ্ণ গলা)
জহির চোখ তুলে চোখে চোখ রাখে
-নতুব কি গো,তুমি মারবে?
লুবনা চোখ নামিয়ে নেয়, কিছু বলে না।তার রাগ ক্রমগত বেড়ে যাচ্ছে।তার দোষ হচ্ছে রাগের সময় তার মাথা ঠিক থাকে না।কি বলতে কি বলে ফেলে,যার পুরো সুযোগটাই জহির গ্রহন করে,বিভিন্ন রকম কান্ড করে। মিষ্টি মধুর কথা বলে তার মনটা দুর্বল করে দেয়।এখনও সে রাগের মাথায় একটা ভুল শব্দ ইউজ করেছে,জহিরও তার সুযোগটা নয়,
-তুমি আমায় একটুু মারো না গো বউ,প্লিজ!আমার এত ভুল হয় কেন?তুমিতো জান আমি কোনদিন তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা।তোমাকে একটু কষ্ট দিলে,আমি হাজার গুন কষ্ট পাই।কোন কিছুতে মনে স্বস্তি আসে না,তোমার বিষন্ন মুখ আমাকে সারাক্ষন ক্ষত বিক্ষত করে।বউ তুমি আমাকে শাস্তি দাও,এই জীবনে যেন আমার আর ভুল না হয়।কিছুতেই তোমার মলিন মুখ দেখতে চাই না,আমার পৃথিবীতে কালো মেঘ ঢেকে যায়।
কথাগুলো বলতে বলতে জহিরের গলা ধরে আসে।তারপর কি আর রাগ করা যায়।জহিরের কথায় আস্তে আস্তে লুবনার রাগ হালকা মেঘের মত উড়ে যায়।জোছনার সোনালী আলোক নিজের অজান্তে মনের গহীনে প্রবেশ করে। জহিরের জন্য কি রকম মায়া জাগে।লুবনা জহিরকে জড়িয়ে ধরে হোঁ হোঁ করে কেঁদে ফেলে।কান্না গলায় ফিসফিস করে বলে,
-আমার একটাই বোন।
-শোন লুবনা,চিন্তার কোন কারন নেই।বিয়েতে আমরা অবশ্যই যাচ্ছি,বেশ ভালভাবেই যাচ্ছি।
ট্রেন মিস হয়েছে তো কি হয়েছে,এখনও অবশ্য তূর্নানীশিথা ট্রনে যাওয়া যায়,কিন্তু যাবো না।তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।কাল সকালের ফ্লাইটে আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি।টিকেটের ব্যবস্থা করতে এক্ষুনি বের হচ্ছি।
বউয়ের অভিমান আর একমাত্র শালিকার জন্য তখন প্লেন ভাড়ার এতগুলো টাকা উদাও।
,
-কি ব্যাপার কথা বলছ না কেন?
জহির কি বলবে ভেবে পায় না।আমতা আমতা করে বলে,
-ইয়ে মানে....
-ইয়ে মানে!বুঝেছি ভুলে বসে আছো,আরে গাধা চাইনিজ প্রোগ্রামটা।
-ইয়েস, ইয়েস, ছ'টার সময়তো।
-হুঁ
আজ কিন্তু জহির ওরকম ভুল করল না।অফিস থেকে বের হয়ে,লেটেষ্ট মডেলের ক্রীম কালারের বি,এম,ডব্লিইউ গাড়ি চালিয়ে সোজ বাসায় চলে আসে।
চুংচাং চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট।মগবাজারের একটা তিনতলা বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরে হোটেলটা।বেশ নিরিবিলি,বাসার পরিবেশ,চারদিকে চমৎকার সব গাছপালা।একপাশে বিস্তৃর্ন এলাকা জুড়ে বাগান।এইসব বৈশিষ্ট্যের কারনে হোটেলটা অনেকেরই প্রিয়,রিয়াদদের নিজস্ব জায়গা।এই জন্যই রিয়াদের বাবা রফিক সাহেব বাগান সহ সবকিছু পছন্দ মাফিক সাজিয়েছেন।রিয়াদের বাবার এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যবসা।ব্যবসার কাজে রফিক সাহেবকে প্রায়ই বাইরে যেতে হয়।
ব্যবসার প্রতি রিয়াদের খুব একটা মনোযোগ নেই।কিন্তু বাবার অনুপস্থিতে মাঝেমধ্যে তাকে ব্যবসায় বসতে হয়।সে অবশ্য রেষ্টুরেন্ট ছাড়া অন্য কোথাও বসে না।বাবা সিংঙ্গাপুর গেছেন,তাই এতদিন যাবত রিয়াদ চাইনিজে বসছে।বেশীর ভাগ সময়ই সে বিকেলের দিকে বসে।আজ একটা পর্যন্ত ক্লাস করে বাসায় এসে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।পাঁচটার দিকে ঘুম থেকে উঠে হোটেলে আসে।ঘুম থেকে উঠার ফলে রিয়াদের মুখ কিছুটা ফোলা ফোলা,বেশ ফ্রেশ।সে চুপচাপ বসে আছে।তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।একটা ম্যাগাজিন জাতীয় কিছু হাতে নিয়ে পড়তে থাকে।
ঠিক এ সময় সুইংডোর ঠেলে ভেতরে ঢোকে দুজন মেয়ে ও এক যুবক।যুবকের পড়নে কালো পেন্ট সাথে দামী ব্লেজার বেশ মানিয়েছে।মেয়েদের একজনের পড়নে নীল শাড়ি। অন্যজনকে দেখেই রিয়াদের আপাদ মস্তক কেঁপে উঠে।মেয়েটি ঋতু, মুহুর্তে ঘুম ঘুম ভাবটা চলে যায়।
সে বেশ ভাবনায় পড়ে যায়।ঋতু রিয়াদের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে,কিন্তু তা মুহুর্ত মাত্র।চারদিকে মিষ্টি পারফিউম এর গন্ধ ছড়িয়ে ভেতরে চলে যায়।ওরা কোনার দিকের একটা টেবিলে বসে।
- ভাইয়া তুই কি এখানে আগেও এসেছিস?(ঋতু)
-হু,কেন?
-না,এমনি। একটু থেমে,তুই কি ওই ছেলেটাকে চিনিস।ঐ যে কাউন্টারে বসে আছে দেখলাম।
-নাতো,কেন?
-তুই এত কেন কেন করবিনাতো,মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।(ধমকে)
তার কথায় ভাই-ভাবী দুজনেই হেসে ফেলে।
বেয়ারা এসে খাবার ম্যানু দেয়।জহির হাতে নিয়ে বলে,
-লুবনা কি খাবে।
লুবনা তার পছন্দমত খাবারের অর্ডার দেয়।
-ঋতু, তুই?
কেন যে ঋতুর মনটা খানিকটা অন্যরকম হয়ে যায়।তার কিছু খেতে ইচ্ছে করে না।সে বলে,
-স্যুপ
-আর কি?
-আর কিছু না,শুধু থাই স্যুপ।
-কেন? (লুবনা এবং জহির একসাথে বলে উঠে)
-এমনি, এটাই আমার কাছে ভালো লাগে।
-শুধু স্যুপ খাবে,অন্য কিছু নাও (লুবনা)
জহিরও খাবারের অর্ডার দেয়।
খেতে খেত জহির বলে,তোর কিন্তু ওরকম করাটা ঠিক হয়নি।
-কেন? কি হয়েছে?
-আমরা এতসব খাচ্ছি,আর তুই শুধু স্যুপ।
-আরে,আমার যা ভালো লাগে তা খাব না।
এমন সময় বেয়ারা হাতে করে তিন তোড়া রজনীগন্ধার ফুল নিয়ে আসে।
-স্যার আপনাদের জন্য।
তারা বেয়ারার দিকে তাকায়।
-কি ব্যাপার (জহির)
-স্যার পাঠিয়েছেন।
-কোন স্যার?
-রিয়াদ স্যার,আমাদের মালিকের ছেলে।
তারপর একটু থেমে ঋতুকে দেখিয়ে বলে,ম্যাডামের অনারে ফুলগুলো পাঠিয়েছেন।
-ও...থ্যাঙ্কস।
বেয়ারা চলে যায়।জহির ও লুবনার মুখে মিটমিট হাসি।
ঋতু মাথা নামিয়ে নেয় তার মন খারাপ হতে শুরু করেছে।কি যে ঝামেলা।
-বাহ চমৎকার তো।এমন উপহার পেলে এখন থেকেতো প্রায়ই আসতে হয়,আবার এলে মনে হয় বিল দিতে হবে না।(লুবনা)
-কি ব্যাপার ঋতু?(জহির)
-জাস্ট একসাথে পড়ি।
-ঋতু! তুমি কিন্তু চেপে গেছো এটা যে তোমার ফ্রেন্ডের হোটেল।(লুবনা)
-ফ্রেন্ড নয় ভাবী,ক্লাসমেট।এটা বলার মতো বিষয় আমার মনে হয় নি।ঋতু কিছুটা কাভার দেয়।
-তা অবশ্য ঠিক (জহির)
-এটা যে ওদের হোটেল আমি তা জানতাম না।আর জানলে কখনোই আসতাম না।
-কেন? (লুবনা)
-আই ডিজলাইক হিম,খুবই অপছন্দ করি।
-কেন? ছেলেটা কি খারাপ! (জহির)
-তা জানি না।
-তোকে কি ডিস্টার্ব করে!
ঋতু কিছুক্ষন কি ভাবে।তারপর আস্তে আস্তে বলে,
-সে বোধহয় আমাকে লাইক করে।ব্যাপারটা আমার মোটেও পছন্দ না।
-দেখ ঋতু,পছন্দ অপছন্দ তোর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সব কিছুটা একটা যুক্তি থাকা দরকার।একজন আমাকে পছন্দ করে বলেই তার হোটেল আসবো না,তাকে দু'চোখে দেখতে পারব না,এটা কোন যুক্তির কথা না।(লুবনা)
-আরে রাখোতো তোমার যুক্তি-টুক্তি।ওসব বাদ দাও,অন্য কিছু বলো।
-যায় বলো,ঋতু ছেলেটি কিন্তু দারুন হ্যান্ডসাম।(লুবনা)
-এই মেয়ে তুমি আবার তারে প্রেমে পড়লে নাকি?সাবধান শেষে কিন্তু ঠ্যাংঙ্গাবো(জহির দুষ্টুমি করে)
-......লুবনা ভেংচি কাটে।
খাবার শেষ হলে বেয়ারা এসে বিল দিয়ে যায়।
-এবার কি উঠা যায়,নাকি আরো বসবে।(জহির)
-না চলো কি বলো ঋতু।
-হু ওঠা যাক।
তারপর ঋতু কি চিন্তা করে বলে,ভাইয়া বিলের টাকাটা আমার কাছে দেতো টাকাটা আমি দিয়ে আসি।
-হঠাৎ আবার এই শখ কেন?
-এমনি কোন কারন-টারন নাই।
জহির মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করে।তবে এক শর্তে, লুবনা তোর সাথে থাকবে।আমি চাইনা তুই কোন বাজে সিনক্রিয়েট কর।
-ডু নট টক নন্সেন্স।
-অলরাইট,এমনটা না হলেই খুশি হই।তবু লুবনা তোর সাথে থাকুক।
-ওকে।
,
রিয়াদ তাদের আসতে দেখে তার অস্থিরতা বেড়ে যায়।এতক্ষন মনে একটুও স্বস্তি পায়নি।সর্বক্ষন তার মাথায় ঘুরপাক খায়, ঋতু---ঋতু।এলোমেলো ভাবনা তাকে ভরিয়ে রেখেছে এই সময়।রিয়াদের খুব ইচ্ছে হয়েছিল তাদের সামনে গিয়ে দাড়ায়,কিছু জিজ্ঞেস করে।কিন্তু ঋতুর রাগী চেহারাটা মনে হতেই,নিজেকে কেমন অসহায় ঠেকে।সাথে সাথেই এই চিন্তাটা বাতিল করে দেয়।তার বদলে খুব তারাহুরো করে ফুল পাঠায়।এছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
ঋতু রিয়াদের সামনে এসে দাড়ায়। রিয়াদ খুব ভড়কে যায়,তার মুখ দিয়ে কোন কথা আসে না।
-এটা বোধহয় আমাদের বিল।ঋতু রিয়াদের দিকে বিলের কাগজটা বাড়িয়ে দেয়।
-হু! (রিয়াদ)
-ফুলের বিলটাও কি সাথে এড করেছেন।
-মানে?(চমকে)
তার মাথাটা সাঁ করে ঘুরে ওঠে।অজস্র লজ্জা এসে তারপাশে ভিড় করে।বলে কি এই মেয়ে,সে থতমত খেয়ে যায়।
-এই ঋতু? এসব হচ্ছে কি। (লুবনা চাঁপা গলায়)
-তুমি একটু চুপ করতো ভাবী,এভাবে কাউকে ফুল দেওয়া, এটা কোন ধরনের ভদ্রতা।
-ফুল দেওয়াতে তুমি দুঃখ পাবে জানলে আমি কখনই দিতাম না।এটা যে অন্যায় আমি তাও জানতাম না।
-এনাফ ঋতু,এসব খু্বই সিলি বিষয়,প্লিজ আসোত। (লুবনা)
-দাড়াও,অপরিচিত কাউকে হঠাৎ করে ফুল দেওয়া এটা কেমন কথা,এটা অবশ্যই অন্যায়।
রিয়াদ সপ্নেও ভাবেনী ঋতু সামান্য একটা বিষয় নিয়ে একজনের সামনে এভাবে তাকে অপদস্থ করবে।
সে ফিস ফিস করে বলে,
-তোমার নাম অবন্তীকা চৌধুরী ঋতু।অনার্স ফাস্ট ইয়ারে পড়ো,সাবজেক্ট ইকোনোমিক্স।বাসা ২৪/৪ ধানমন্ডি,বাবার নাম ইমতিয়াজ চৌধুরী,সাংবাদিক ছিলেন।তোমার ভাইয়ের নাম নাইমুর চৌধুরী জহির।একটা প্রাইভেট ব্যাংকের রিজিওনাল অফিসার,ভাবীর নাম লুবনা চৌধুরী।এর চেয়ে বড় পরিচয় জানা নেই আমার।
রিয়াদ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মাথা নুয়ায়।রাগে তার সারা শরীর জ্বলে যায়।বলতে ইচ্ছে করে, কেন ঋতু কেন?কেন আমাকে এভাবে অপমান করছো।আমিতো কোন অন্যায় করিনি।রিয়াদের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস আসে কিন্তু তা তাদের বুঝতে দেয় না।
লুবনা হতভম্ব হয়ে যায়। মাই গড! ছেলেটি বলে কি!
লুবনা ফ্যাল ফ্যাল করে রিয়াদের দিকে তাকায়।ছেলেটি যে অতিশয় ভদ্র এতে কোন সন্দেহ নেই।লুবনার খুব খারাপ লাগে,রিয়াদের জন্য মায়া লাগে।ঋতু শুধু শুধু এতটা রূঢ় ব্যবহার না করলেও পারত।লুবনা একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে, ঋতুর প্রতি অসম্ভব রকম ভালবাসার জন্য মুখ বুজে সব সহ্য করেছে এবং একটা ব্যাপারর লুবনাকে আরো অবাক করছে,সে একবারও আমরা একসাথে পড়ি কথাটা বলেনি,ঋতু যে দুরত্ব তৈরী করেছে,সেই দুরত্বে থেকেই রিয়াদ কথা বলেছে।ঋতু,লুবনাকে কিছু না বলে গট গট করে চলে যায়।
লুবনা আন্তরিক গলায় বলে,
-প্লিজ তুমি কিছু মনে করনা ভাই।ঋতু বড্ড ছেলেমানুষ।আচ্ছা তুমিই বলো,ফুল দেওয়াতে কেউ কি কখনো রাগ করে?তোমার ব্যবহারে আমরা সত্যি খুব খুশি হয়েছি।ও ভাল কথা তোমার নাম কি ভাই?
-রিয়াদ!
-রিয়াদ,আজ আসি ভাই।আবারো দেখা হবে।
রিয়াদের মনটা অসম্ভব খারাপ হয়ে যায়।তার বড় ইচ্ছে হয় এই মুহুর্তে দূরে,বহু দূরে চলে যায়।সেখানে কেউ তাকে চিনবেনা।সেও চিনবেনা কাউকে।যেখানে সে সমস্ত জীবনেই রয়ে যাবে বন্ধু-বান্ধবহীন একা
রিয়াদের ভিতরে রাগ,তার সমস্ত শরীরে শাখা প্রশাখা ছড়ায়।সে মনে মনে ভাবে,এ ব্যবহার আমজর প্রাপ্য ছিল না ঋতু।তোমাকে আমি ভালোবাসি,এতে কোন খাদ নেই।ষোল আনাই খাটি।তোমাকে ভালবাসি বলেই ফুল দিয়েছিলাম।তুমি আমাকে ভালোবাসো, আর নাই বাসো,আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে ভালোবেসে যাবো।এই পথে যত কঠিনই হউক আমি এর শেষ দেখব।
-হ্যালো (অপু)
-হ্যা, বল (রিয়াদ)
-তুই কি করছিস?
-কিছুনা,একটু পর বেরুবো।
-কোথায় যাবি?
-একটু এলিফিন্ট রোডে।
-রিয়াদ শোন,আমি না আসা পর্যন্ত তুই বাসায় থাকিস।আমার আসতে দেরী হবে না।
-ঠিক আছে,কিন্তু ঘটনা কি?
-আছে একটা!
-একটু বলনা!
-না, এখন বলা যাবে না।আমি এসেই বলব।
রিয়াদ ভ্রু-কুচকে ফোন রাখে,একটা বই হাতে বিছানায় শুয়ে পড়ে,তাহসান আর কনার 'তোমার আলো' গানটা ছেড়ে দিল।অপু এসে বিছানার এককোনে পায়ের উপর পা তুলে বসে বলে,
-মাসুম কে তোর মনে আছে!
-কোন মাসুম?
-আরে তোর ফেভারিট বন্ধু, বর্তমানে ক্যাডার মাসুম।
,
রিয়াদ আর মাসুম স্কুল জীবনে একসাথে পড়েছিল।স্কুল জীবনে মাসুমকে ঘিরে কতনা স্মৃতি জড়িয়ে আছে।মাসুম ছিলো রিয়াদের দৃষ্টিতে হিরো।চমৎকার সব কথা বলতো,রিয়াদ মুগ্ধ হয়ে শুনতো।মাসুমের বেশীর ভাগ গল্পই ছিলো মাস্তানি এবং মেয়েদের নিয়ে।
একদিনের ঘটনা, ওরা তখন ক্লাস টেনে পড়ে।রিয়াদ ও মাসুম ক্লাসে বই রেখে বাইরে গেছে।কিছুপর ঘন্টা পড়লে ক্লাসে এসে দেখে যে ব্যাঞ্চে ওরা বই রেখে ছিলো ওখানের রিয়াদের বই নেই,পেছনের ব্যাঞ্চে রাখা।তার জায়গায় বসে আছে অারেকটি ছেলে।
-কি ব্যাপার তুমি আমার জায়গায় বসে আছো কেন?(রিয়াদ)
-তোমার জায়গায় বসবো কেন?
-এখানে আমার বই রাখা ছিলো।
-তাতে আমার কি!জায়গাটা নিশ্চয় তোমার কেনা নয়।
-তুমি আমার বই গুলো সরিয়ে এখানে বসেছো।
-তুমি ভুল বলেছো
-রিয়াদ ভুল বলেনি,ওর বইগুলো আমার বইয়ের সাথে ছিলো।তুমি পরে এসে এখানে বসেছো।এখন ওঠে গিয়ে ওকে জায়গা দাও।(মাসুমের কড়া গলা)
-ওঠার তো প্রশ্নই আসে না,পেছনে অনেক জায়গা আছে।(ছেলেটির তেড়া গলা)
-কিন্তু তোমাকে তো উঠতেই হবে।
-না উঠলে।
-না উঠলে তোমাকে আমি জোর করে উঠাব।
-আরে রাখ,এমন মাস্তানি বহু দত দেখেছি।
রিয়াদ দেখল ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে সে কাতর গলায় বলে,
-প্লিজ মাসুম বাদ দেতো,আমি পেছনেই বসছি।
এমন সময় স্যার ক্লাসে ঢুকেন, যে যার জায়গায় বসে পড়ে।রিয়াদ হাফ ছেড়ে বাঁচে,একটা ঝগড়া থেকে বোধহয় বাঁচা গেল।কিন্তু ঘটনা আসলে শুরু হয়নি।স্যার ক্লাস থেকে বেরুবার পর,মাসুম ব্যাঞ্চ থেকে বেড়িয়ে ছেলেটির সামনে দাড়ায়,সে দড়াম করে ছেলেটির মুখে ঘুসি বসিয়ে দেয়।চিৎকার করে বলে,
-শালা মাস্তানির কিছুই দেখিসনি।
ছেলেটি ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যায়,কিন্তু তা মুহুর্ত মাত্র।পাল্টা ঘুসি বসিয়ে দেয় কাজলেরর মুখে।কাজল ছিটকে পড়ে।ক্লাসের কেউ তাদের থামাতে আসে না,সবাই দাড়িয়ে মজা দেখে হাত তালি দেয়।রিয়াদ ভয়ে কেপে উঠে চিৎকার করে বলে,প্লিজ মাসুম থাম।মাসুম পকেট থেকে কলম নিয়ে মুখ খোলে ছেলেটির উপর ঝাপিয় পড়ে।পর পর কয়েকবার ছেলেটির শরীরে ছুড়ির মত চালিয়ে দেয়।ছেলেটির মাথা, কাধ,পিঠ কেটে দর দরিযে রক্ত বেড়িয়ে আসে, সারা শরীরর রক্তে লাল হয়ে যায়।মাসুম খুবই স্বাভাবিক ভাবে ক্লাস ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।তার পিছু পিছু রিয়াদ,তার শরীর থর থর করে কাপে।সে খুবই ভীত এবং কান্না গলায় বলে,
-তুই এমন করলি কেন মাসুম!এখন কি হবে?
-এই চুপ, একদম চুপ।শালা একটা এক নম্বর গাধাই।
মাসুম রিয়াদকে ধমক দেয়,সেদিন রিয়াদ বাসায় দেরী করে ফিরে।
কলেজে যাবার পর মাসুমের মাস্তানি বাড়তে থাকে।রাজনীতিতে যোগ দেয়,ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক পার্টি
।তখন থেকেই তাদের দুজনার একটা দূরত্ব তৈরী হতে থাকে।ভার্সিটিতে যাবার পর মাসুমের কোন কিছুরই সীমা-পরিসীমা থাকে না।তখন থেকেই তার নাম হয়ে যায় ক্যাডার মাসুম।
,
-হু, মনে থাকবে না কেন?সে তো এখনও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড যদিও যোগাযোগ খুব একটা হয় না।(রিয়াদ)
-মাসুমের একটি মটর সাইকেল আছেনা,সবুজ কালার ফ্রিডম এর।
-থাকতে পারে।প্রাইভেট কার থাকাও তো বিচিত্র না।টাকাতো ভালই কামায়।
-মাসখানিক আগে টি,এস,সিতে তোর সাথে কথা বলার সময় ওর বাইকটা দেখেছিলাম।
-এখন কি হয়েছে সেটা বল।
-গতকাল বিকালের দিকে ভাবীকে নিয়ে নিউ মার্কেট যাচ্ছিলাম।নীল ক্ষেতের কাছাকাছি যেতেই,একটা হোন্ডা আমাদের রিকশার সামনে এসে দাড়ায়।একজন হোন্ডা ষ্ট্রাট দিয়ে বসে থাকে দুজন নেমে আসে।একজন আমার পেটে রিভলবার চেপে ধরে, অন্যজন ছুড়ি হাতে ভাবীর লেদার ব্যাগ উঠিয়ে নেয়।কড়া গলায় বলে অলংকার গুলো সব খুলে দিতে।কিছু বুঝতে পারো না।দিনে দুপুরে এমন একটা ঘটছে অথছ কিছুই করতে পারছি না।আশ-পাশ দিয়ে কত মানুষ চলাচল করছে,কেও সাহায্য করতে আসছে না।সব কিছু নিয়ে ওরা দ্রুত চলে যায়।
-তৃতীয় ছেলেটি কি মাসুম?
-না
-তাহলে,
-মাসুমের সাথে একটা ব্যাপার মিল আছে।
-কি রকম?
-মাসুমের বাইক কালার এবং বাইক নাম্বার একই।
-মাসুমের বাইক নাম্বার তুই কিভাবে জানিস?
-মাস খানিক আগে তুই যখন মাসুমের সাথে কথা বলছিলি তখন আমি সাথে ছিলাম,তোদের কথা শুনছিলাম।হঠাৎ মাসুমের বাইকের নেম প্লেটে আমার চোখ যায়,নেম প্লেটে লিখাছিল ঢাকা-ক.....।তারপর নাম্বারগুলো কিন্তু লেখাটার উপর একটা রঙের দাগ উপর থেকে নীচে নেমে এসেছে।ভালো করে নজর দেওয়ার পর দেখি অন্তত দুটো সংখ্যা নেই,নেমপ্লেট থেকে কৌশলে কেটে বাদ দেয়া হয়েছে।
-তুই কি শিওর যে গাড়িটা মাসুমের ছিল।
-অফকোর্স।বাইকটা আমি আরো কয়েকবার মাসুমকে চালাতে দেখেছি।
-ঠিক আছে আমি খোজ নিচ্ছি,কি পরিমান জিনিস নিয়েছে।
-পনের হাজার ছয়শো কিছু খুচরো টাকা,ভরি পাঁচেক গোল্ড এবং হীরের পাথর বসানো একটা দামী আংটি। আংটিটা ভাবীর বড় ভাই সুইডেন থেকে পাঠিয়েছেন,ভাবী এটার জন্য খুব আপসেট।
-ভাবী কোন ভয় পায়নি তো।
-আরে না,বরং আমাকে জিজ্ঞাস করে,আমার কোথাও লেগেছে কিনা,আশ্চর্য!
- তুই বাসায় যা।আমি মাসুমের সাথে যোগাযোগ করি,দেখি কি করা যায়।
আকাশের দিকে তাকিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠে ঋতু।ভাবী দেখো দেখো, কি চমৎকার আকাশ।সমস্ত আকাশ জুড়ে কার্পাস তুলোর মতো ধবল মেঘের পাহাড়।
এক দৃষ্টিতে তাকালে ভিন্ন ভিন্ন রকম মনে হয়।কোনটা দেখতে ঘোড়ার মতো,আবার কোনটা মরুভূমি,কোনটা সমুদ্র সৈকত,কোনটা আবার দৈত্য-দানবদের মতো দেখতে।একটু আগে ঋতু এবং লুবনা বাসার ছাদে উঠেছে।দুজনের পড়নেই শাড়ি,ঋতুকে এতে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে।ঋতু সচরাচর শাড়ি পড়ে না,ভাবীর দেখাদেখি পড়েছে।তার আনন্দে লুবনা একদম পাত্তা দেয় না,সে ফুল দেখায় ব্যস্ত।ঋতুদের ছাদে অনেক গুলো ফুলের টব।তাতে গোলাপ ও ভিন্নরকম ফুল ফুটে রয়েছে।লুবনা কয়েকটি করবীফুল তুলে খোঁপায় গুজে,কি মনে করে একাকি খিল খিল হেসে উঠে।জোড় গলায় ডাকে,
- এই ঋতু শোনে যাও।
- কি ব্যাপার এত হাসছো কেন?
-তোমাকে একটা মজার কথা বলি শোন।
-ঠিক আছে,বলো।
-একদিন বিকেলে জহির ও আমি ছাদে হাটাহাটি করছি,এমন সময় জহির দুটো করবী ফুল নিয়ে বলে,দেখ লুবনা ঠিক তোমার পিঠের মত সুন্দর। লুবনা নিজেই হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে, দেখ কেমন গাধা জীবনে তো কবিতা পারেনা শুধু বোকার মত কথা।আরো শুনবে!
ঋতু হাসতে হাসতে বলে,'মাপ চাই ভাবী,আমার শোনার দরকার নেই'।
ঋতু রেলিং ঘেষে দাড়িয়ে লুবনার দিকে তাকায়,তার মুখ হাসিতে ভরা।লুবনা হাসতে হাসতেই ঋতুর দিকে এগিয়ে যায়।
ঋতুর কাছাকাছি আসতেই লুবনার দৃষ্টি ঋতুকে ছাড়িয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ে।রাস্তার উত্তর পাশে একটা অর্ধেক কাজ করা বিল্ডিং,ওটার ঠিক পূর্ব পাশের বাসার গেটের সামনে এই মাত্র একটা বাইক এসে দাড়ায়।বাইকে এক যুবক পড়নে জিন্সের পেন্ট,শার্টের হাতা গুটানো,পায়ে দামী কেড্স।
-ঋতু! ওই দেখ।
ঋতু সাথে সাথে ঘুরে দাড়ায়।রিয়াদকে দেখামাত্র চিনতে পারে। ঋতু ঠোঁট বাকায়।
-তোমার মজনু
-কচু
রিয়াদ কোন দিকে না তাকিয়ে মাসুমের বাড়ির গেট ঠেলে ভিতরে ঢোকে।তাদের এল ফ্যাশন বাসা।বাসার উত্তর দিকে বাগান।
মাসুম রুমেই আছে,রিয়াদ অবশ্য ফোন করেই এসেছে।মাসুম রিয়াদকে দেখে,
-আরে তুই কি মনে করে।
-হেসে, 'এইতো'।
-তোকে দেখেতো আমি অবাক।কি যে ভালো লাগছে।
-অবাক হবারতে কিছু নয়।
-কত দিন পরে এলি বলতো,আমার কথা যে মনে আছে সেটাই আশ্চর্য।
-তোর কথা মনে থাকবেনা মানে?তুই এখন পাবলিক ফিগার।
-বলিস কি!(হেসে)
-প্রায়ই তোর নাম শুনি,এতেই বুঝি তুই আছিস,বেশ ভালো ভাবেই আছিস।
-চুপ করতো,তের শিকে ঢুকাতে পুলিশ এক পায়ে খাড়া,তারপর আছে অপজিট গ্রুপ।
-তুই এসব ছেড়ে দিতে পারিস না?
-না পারি না,আমি ছেড়ে দিলে কি হবে আমাকে তো ছাড়বে না,বেঁচে থাকতে হলে আমাকে এগুলো করতে হবে।অনেক দূরে চলে এসেছি রিয়াদ,ওখান থেকে ফেরার কোন পথ নাই।
-তুই কি বুঝতে পারছিস না মাসুম,তোদেরকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।নেতাদের স্বার্থ উদ্ধারে,ক্ষমতায় যাবার হাতিয়ার হিসাবে।
-সবই বুঝি রে,কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে,বাদদে আমার কথা।
-আমার একটা প্রবলেম হয়েছে,মাসুম।(কথাটা কিভাবে বলবে রিয়াদ বুঝতে পারে না)
-কি রকম,খুলে বল।
-তুই অপুকে চিনিসনা?আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড অপু।
-হুম চিনি।
-কাল বিকালে অপু তার ভাবীকে নিয়ে নিউমার্কেটে যাওয়ার পথে ওদের রিকশা থামিয়ে কিছু ছেলে তাদের সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।ওদের সাথে একটা মটর সাইকেল ছিলো।
-আচ্ছা,অপু কি কাউকে চিনেছে।
-ঠিক চেনা বলা যায়না,একটা ছেলেকে অপু নাকি একদিন তোর সাথে কথা বলতে দেখেছে।তাছাড়া তোর বাইকের সাথে নাকি ওটার অনেকটা মিল আছে।তোর বাইকটা-আই মিন, বাইকটা কাউকে কি ধার দিয়েছিস?
মাসুমের মাথাটা সাঁ করে ওঠে।জীবনে কত ঘটনা সে ঘটিয়েছে,কিন্তু এরকম লজ্জাজনক পরিস্থতিতে সে খুব কমই পড়েছে।তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড রিয়াদেরর কাছ থেকে এটা শুনে আসলেই সে খুব লজ্জিত হয়ে পড়ে।
মাসুমের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।কপাল কাটা বল্টু, তার সাথে মন্টু,ঝন্টু।কয়েকদিন আগে বল্টু এসে বলে, মাসুম ভাই আপনার হোন্ডাটা একটু দেন,কয়েকদিন চালাবো।তার হোন্ডাটা এমনিতেই পড়ে ছিল,সে হোন্ডা চালানো প্রায় ছেড়ে দিয়েছে।পড়ে থাকলে জ্যাম হয়ে যাবে তাছাড়া বল্টু পার্টির ছেলে। তার যেকোনো কাজ চোখের পলকে করে দেয়।তবে মাসুম বলে দেয়,
-নিতে পারো, কিন্ত কোন প্রকার জামেলা করলে বারোটা বাজাবো কথাটা মনে রেখো।
-কি যে বলেন ভাই, আপনার অবাধ্য হয়েছি কখনো।
এই বল্টুই শেষ পর্যন্ত রিয়াদের কাছে ডুবাল।মাই গড,মাসুম তার মাথার চুলে হাত ডুবায়।তার অসম্ভব রাগ বেড়ে যাচ্ছে।
রিয়াদকে নিয়ে কফি খায়।কফি খাওয়া শেষ হলে বলে,চল।
-তুই কি বাইক নিয়ে এসেছিস।
-হু
-চাবিটা আমার কাছে দে।
রিয়াদ মাসুমের দিকে চাবি বাড়িয়ে দেয়।রিয়াদ উঠে বসলে ফুল স্পীডে ছেড়ে দেয়।
ছাদের উপর থেকে ঋতু,লুবনা তাদের চলে যাওয়া দেখে।
-আরে আরে,তোমার নায়ক যে চলে যাচ্ছে।(লুবনা)
মাসুমের সাথে রিয়াদকে দেখে ঋতুর মনে প্রশ্ন জাগে রিয়াদ, মাসুমের সাথে কেন?ঋতুর মন হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়।অসম্ভব খারাপ।
সে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে আসে।লুবনা কিছু বুঝতে পারে না পিছু পিছু ডাকে, এই ঋতু! এই?
ঋতু,লুবনার কথার একদম পাত্তা দেয় না।সে তরতর করে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতে থাকে।
,
মাসুম রিয়াদকে নিয়ে মগবাজার আসে।মেইন রোডের একটু ভেতরে একটা চায়ের ষ্টল।এখানে পরিচিত কাষ্টমার খুব একটা আসে না।কারন এখানে যত বখাটে ছেলেদের আড্ডা।মাসুম ভিতরে ঢোকে, পেছনে আসে রিয়াদ।
মাসুমকে দেখতে পেয়ে ক্যাশে বসা ছেলেটি দ্রুত ওঠে আসে।খুবই বিনীত গলায় বলে, মাসুম ভাই আপনি?
ছেলেটি বেশ ভাল করেই জানে বিশেষ কারন ছাড়া মাসুম এখানে আসে না।আজও কি তেমনি কারনেই এসেছে!
-বল্টুকে একটু দরকার।(মাসুম)
-ভেতরে আছে,আপনি একটু বসুন আমি ডেকে দিচ্ছি।
-থ্যাংঙ্কস, দরকার হবে না।
মাসুম ভেতরে দিকে যেতে যেতে বলে,মাসুম পেছনের দরজা ঠেলে ভেতরে আসে।
রিয়াদ নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করে।কয়েকটা চেয়ার পাতা,তাতে কয়েকজন ছেলে বসে আছে।
প্রত্যেকের হাতেই সিগারেট।গাঁজার কড়া গন্ধ ওখানে থেকে ভেসে আসছে।মাসুম বেশ ভাল করেই জানে যে এ সিগারেট গাঁজা ভর্তি।মাসুম যাদের খুঁজছিল সবাই এখানে আছে।তাকে আসতে দেখে সবাই দ্রুত ওঠে দাড়ায়,হাতের সিগারেট লুকিয়ে ফেলে দেয়।মাসুম বল্টুর দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকায়,রক্তহীম করা গলায় বলে,
-বল্টু,এদিকে আয়।
মাসুম এ দৃষ্টি দেখে ভয়ে বল্টুর মেরুদন্ড কেঁপে ওঠে।
মাসুম আগের মতোই ঠান্ডা গলায় বলে,
-আমাকে চিনিস?
- চিনবোনা কেন!মাসুম ভাই (ঢোক গিলে)
মাসুম জোরে ধমক দিয়ে ওঠে,
-না! আই এ্যাম রুট অব ইভিল।বল্টুর শার্টের কলার ধরে, ইউ ব্লাডি!কাল বিকালে অপারেশনটা কে করেছে?
-বিশ্বাস করেন মাসুম ভাই,আমি না,আমি কিচ্ছু জানি না।
মাসুম সাঁ করে বল্টুর চোয়ালে ঘুসি দেয়।বল্টু ছিটকে পড়ে,তার সঙ্গীরা পাশের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়।রিয়াদ হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে থাকে।মাসুম কোমর থেকে রিভলবার খুলে আনে,রিয়াদ তারাতারি মাসুমকে জাপ্টে ধরে,একি করছিস মাসুম।
-আই টিচ এ গুড লেসন হিম।(মাসুম)
মাসুমের এ মুর্তি দেখে বল্টু ভয়ে দ্রুত এসে তার পা ঝাপটে ধরে।
-মাপ করেন মাসুম ভাই,আমার একটা কথা শুনেন একটা কথা।
মাসুম বল্টুর শার্টের কলার ধরে টেনে ওঠায় সামনে একটু দূরে নিয়ে যায়।বল্টু কাপতে কাপতে ফিসফিস করে কি বলে।রিয়াদ তা শুনতে পায় না।মাসুম তাকে ছেড়ে দিয়ে রিভলবার টা কোমরে গুজে, রিয়াদের কাছে এসে স্বাভাবিক গলায় বলে,
-আয় রিয়াদ,টাকা গুলো পাবি না।জিনিসগুলো সকালে এসে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাস
রাত ন'টার মতো বাজে।একটু আগে কারেন্ট চলে গেছে বেশ গরম পড়ছে।সীমা ও সোমা বাইরে এসে দাড়িয়েছে।
-আপু, চলো হাটি।
সীমা, সোমার কথার জবাব না দিয়ে বারান্দা থেকে নেমে আসে।বাগানের দিকে হাটে।সোমা সাথে সাথে আসে,ওরা বাগানের মাঝে এসে দাড়ায়।বাগানে হাস্নাহেনা ফুল ফুটেছে,ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।হাস্নাহেনার কথা মনে হতেই সীমার সাপের কথা মনে পড়ে ভয় পেয়ে যায়।সে শুনেছে হাস্নাহেনার মিষ্টি গন্ধে নাকি বাগানে বিষাক্ত সাপ আসে।যদিও আজ পর্যন্ত তেমন সাপ চোখে পড়েনি,সেদিনের ঘটনা ছাড়া।
যদিও রিয়াদ বলেছে,ওটা ফুলের গন্ধে আসেনি এবং ওটা বিষাক্ত সাপ ছিল না।কতদিন সীমা সাপের কথা ভেবে হাস্নাহনার ঝাড়টা কেটে ফেলবে ভেবেছে কিন্তু ফুলের এই মাতাল গন্ধের জন্য পারে নি।সীমা লক্ষ্য করেছে তার যখন মন খারাপ থাকে তখন ফুলের এই মাতাল ঘ্রানটা পেলে তার মন ভাল হয়ে যায়।সীমা আকাশের দিকে তাকায়, আকাশে কয়েকদিনের চাঁদ, কিছুদিন পর পূর্নিমা,পরিষ্কার আকাশ।বাগানে কিছু আলো কিছু অন্ধকার।
ঝলমলে নক্ষত্র আকাশ জুড়ে সীমা ক্যাসিও পয়া নক্ষত্র খুঁজে।তার অপুর কথা মনে পড়ে।অপুকে তার ভালো লাগে,হয়তো শুধু ভালো লাগে না, ভালবাসে।কখনো বলা হয় নি।
সে এমনিতে অপুর সাথে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলে তবুও তার মনে হয় অপুর সাথে কথা বলার সময় তার অনুভূতিটা অন্যরকম মনে হয়।
,
-আপা চলো ভেতরে যাই(সোমা)
-তুই যা আমি একটু পরে আসছি।
-না,পরে না।এক্ষুনি আসো তোমার সাথে আমার কথা আছে।
-কথা থাকলে এখানেই বল।
-না,এখানে বলা যাবে না।
-কেন? (অবাক হয়ে)
সোমা আমতা আমতা করে বলে,
-এখানে আমার ভয় করছে।
-আরে এখানে ভয়ের কি আছে।(হেসে)
-আহ্,তুমি বুঝতে পারছো না।সোমা সীমার একটা হাত তার দ'হাত দিয়ে চেপে ধরে,বারান্দায় চলোত।
সীমা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারান্দায় উঠে আসে, বারান্দায় রাখা বেতের চেয়ারে বসে বলে,
-তুই সব সময় বড় বাড়াবাড়ি করিস,এখন বল কি বলবি?
-দাঁড়াওনা বলছি।আপা রাতের বেলায় যুবতী মেয়েরা যদি বাগানে হাটাহাটি করে, কিংবা ফুল ছিড়ে তাহলে নাকি দুষ্টু জিনেরা তাদের উপর ভর করে।
-তোকে একথা কে বলেছে (বিস্মিত হেসে)
-নীপার ভাবী।
-তুই জিজ্ঞেস করলিনা উনাকে কোনোদিন জিনে ধরেছে কিনা।
-নাতো জিজ্ঞেস করিনি,আরেকদিন করব।
হঠাৎ করেই সীমা দুষ্টুমী করে বলে,
-আমাকে যদি কোনোদিন জিনে ধরে, তাহলে আমি জিনকে বলব,ওহে প্রিয়তম আমাকে চাঁদের দেশে নিয়ে চলো।আরেকদিন বলবো আমাকে নিয়ে যাও সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে পরীস্থানে।ইস্ কি মজা হবে চন্দ্রালয় মেঘের শরীর ছুয়ে উড়ে উড়ে যাবো।
-আপা জিনেরা নাকি ছেলে আর পরীরা নাকি মেয়ে।(হেসে)
-হয়তো বা আমি না দেখে কনফার্ম কিছু বলতে পারব না।আমি দেখে তোকে জানাবো,তবে তোর আপাতত চিন্তার কারন নেই,কারন তুই এখনো কিশোরী।
-ধ্যাত,তুমি শুধু ফাজলামো করো।
হঠাৎ করেই সোমার ভয় ভয় লাগে,শরীর কেঁপে উঠে।তার মনে হয় একটা দুষ্ট জিন যেন তার খুব ঠান্ডা হাত ছুয়ে দিয়েছে তার ঘাড়ে।ফিসফিস করে যেন বলছে, ইয়ার্কি মারা হচ্ছে না?দাড়াও মজা দেখাচ্ছি!
সীমার ফোন বেজে উঠে সে রিসিব করে,
-হ্যালো
-হ্যালো, সীমা(ঋতু)
-কিরে,কি ব্যাপার।
-ভালো লাগছেনা,ভাবলাম তোকে একটু জ্বালাতন করি।
-ওহ্,আমাদের এখানে কারেন্ট নেই,তোদের এখানে আছে।
-হু, আছে।সীমা তুই আজ ক্লাস করিস নি কেন,আমি তোর জন্য কত ওয়েট করলাম।
-আর বলিসনা,বাসা থেকে বের হব এমন সময় খবর আসে বড় খালার অবস্থা যায় যায়।
যায় যায় কথাটা শুনে ঋতু হেসে ফেলে,
-কি হয়েছিলো!
-ব্লাড পেশার হাই।খালার বাসা থেকে বিকেলে ফিরেছি।
-এখন অবস্থা কেমন।
-কিছুটা ভালো।
-ওহ্ আচ্ছা, তারপর সীমা, তোর বন্ধুর খবর কি।
-কোন বন্ধু।
-রিয়াদ-না কি নাম যেন!
-ও....কেন ভালইতো।হঠাৎ বন্ধুর কথা কেন।
-না এমনি।
-ঋতু আমি নিশ্চিত আর যাই হোক তুই এমনিতে রিয়াদের কথা বলবি না।কিছু একটা অবশ্যই আছে।
-আরে না,তুইতো আর এই ব্যাপারে কিছু বলিস না তাই জিজ্ঞাস করলাম।
একথায় সীমার অভিমান ঠেলে ওঠে সে বলে,
-আমি আরো বলব!সেদিন তুই আমাকে শিক্ষা দিয়ছিস তারপরও?
-.......।(চুপ করে থাকে)
-আসল ব্যাপারটা বল।
-সে বোধহয় অন্য লাইনে চিন্তা ভাবনা করছে(গম্ভির ভাবে)
-অন্য লাইনে মানে।
-সে বোধহয় আমার পেছনে গুন্ডা লাগাচ্ছে।
-কি বলছিস তুই (আশ্চর্য হয়ে)
তোর একথা মনে হবার কারন।
-আজ বিকালে রিয়াদকে দেখেছি আমাদের পাশের বাসার একটা ছেলের সাথে,ছেলেটার নাম মাসুম, নামকরা ক্যাডার।ঋতু একটু থেমে কড়া হলায় বলল,সীমা তুই তোর ফ্রেন্ডকে বলিস, গুন্ডা লাগাক কিংবা গোয়েন্দা লাগাক। I shall stick my decision. পৃথিবীর কোন শক্তিই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু বলতে পারবে না।
সীমা হতভম্ব হয়ে বলে,
-তুই ভুল বলছিস,মহাভুল।
-আমি সাধারনত ওরকম ভুল করি না।
-তোর এই কথাটাই ঠিক না।শোন ঋতু, মাসুমের সাথে রিয়াদ যে তোকে নিয়েই আলাপ করেছে তুই কি এই ব্যাপরে নিশ্চিত?
-না মানে,আমার মনে হচ্ছে।
-তাহলে তোর একথা বলার মানে কি?আসলে তোর মনটা খুব ছোট,এখন কি কেও গুন্ডা লাগিয়ে প্রেম করে।
সীমার কথায় ঋতু খুব বেকায়দায় পড়ে।সে কি বলবে ভেবে পায় না।
-মাসুমের সাথে রিয়াদ আলাপ করলে তোর প্রসঙ্গেই আলাপ করবে,এরকম মনে করার কোন কারন নেই।একজন লোকের সাথে কথা বলার মতো অসংখ্য বিষয় পৃথিবীতে আছে।তাছারা আমি যতটুকু জানি মাসুম রিয়াদের ফ্রেন্ড আর ফ্রেন্ডের বাসায় যেতেই পারে।যে জিনিস নিজ যোগ্যতায় পাওয়া যায় না তা শক্তি দিয়ে অর্জন করার মত ছেলে রিয়াদ নয়।(রেগে)
-এ পাড়ায় তো তাকে কখনো দেখিনি।
-হয়তোবা যাবার প্রয়োজন পড়েনি।নাকি ওখানে তোদের বাসা বলে রিয়াদের যাওয়া যাবে না, ওরকম কথা থাকলে বল আমি রিয়াদকে নিষেধ করে দিব।
-তুই আমার সাথে এমন রাগি গলায় কথা বলছিস কেন? (নরম গলায়)
-আমার রাগের কিছু নাই,যা যুক্তি সংঙ্গত তাই বলছি।তুই সেদিন রেষ্টুরেন্টে যা করেছিস,তা সাধারন ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করেছে কিনা ভেবে দেখেছিস।
,
সীমার সাথে কথা বলার পর ঋতুর মন অসম্ভব খারাপ হয়ে যায়।তার নিজের উপর রাগ উঠে।ঋতুর মনে হয় সীমার সাথে তার কথা না বললেই ভালো হত।এতদিন ঋতু ভেবে এসেছে সীমা বুদ্ধি-সুদ্ধি খুব একটা নেই,এখন দেখছে সম্পূর্ন উল্টো।সীমা রেগে গেলে তার বুদ্ধির দুয়ার খোলে যায়,সে খুবই বুদ্ধি দীপ্ত কথা বলে।আর সে নিচে রাগের সময় ঠিকমত কথা গুছিয়ে বলতে পারে না।সবকিছু তাল গোল পাকিয়ে ফেলে ভুল করে, মহাভুল।
অনেকদিন পর ওরা খেলতে বসেছে।ওরা মানে রিমন,অপু,ইমন রিয়াদ।বাইরে মুশুলধারে বৃষ্টি যাকে বলে,'কেডস্ এন্ড ডগ'।মাঝে মধ্যে একটু আধটু কমছে আবার একটু পরেই নতুন উদ্দ্যোমে বৃষ্টি শুরু হচ্ছে।
,
একটু আগে রিয়াদ অপুর কল পায়,রিয়াদ তখন খেয়ে সবে মাত্র শুয়েছে।এই সময়টা একা একা কি করা যায় ভাবছিল আর টিভিতে 'passengers' ছবিটা চলছিল এই মুহুর্তে তার গোয়েন্দা ছবি দেখার ইচ্ছে করছে তাই মোবাইলটা নিয়ে ইউটিউবে জেমস্ বন্ডের পুরানো ছবি 'License to Kill' দেখা শুরু করে। মাঝে মধ্যে গোয়েন্দা একশন ছবি দেখতে তার ভালো লাগে,কি চমৎকার টান টান উত্তেজনা,গতিময় কাহিনীর বিস্তার।
এমন সময় কলটা আসে,
-হ্যালো, কই বাবু । (অপু)
-বাসায়,ঘুমানোর চেষ্টা করছি। (রসিকতার সুরে)
-চেস্টাটা আপাতত বাদদে।
-ঠিক আছে বাদ দিলাম, এবার বল কেন?
-ভুনা খিচুড়ি খেতে তোর কেমন লাগে?
-খুব ভালো লাগে।
-খাবি।
-এখনতো খেতে পারবো না,একটু আগে ভাত খেলাম।
-এখন তোকে খেতে হবে না।
-তাহলে?
-তুই এখনই চলে আয়।ভাবী তোকে আসতে বলেছে,বিকেলে নাকি ভুনা খিচুড়ি খাওয়াবে।আমি রিমন,ইমনকে খবর দিয়ে এনেছি তুই এলে কার্ড খেলা আরম্ভ করব।
-এই ব্যাপার, এত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছিস।কিন্তু এখন এই অবস্থায় বের হবো কি করে,রিক্সা তো পাওয়া যাবে না।তোরা বরং আজ চালিয়ে দে,আরেকদিন হবে।
-আরে তোরে ছাড়াতো কিছুই হবে না,ভাবী মাইন্ড করবে।জিনিসগুলো উদ্ধার করার পর তুইতো ভাবীর খুবই ফেভারিট হয়ে গেছিস,প্রায়ই তোর কথা বলে।আমাকে ক্ষেপায়, আমি নাকি রামছাগল।আমার সামনে এতকিছু হয়ে গেল আমি কিছুই করতে পারলাম না,আর তুই শুনেই সব উদ্ধার করে ফেললি,বুঝ অামার অবস্থাটা।
রিয়াদ হেসে ফেলে,
-তাই নাকি,দারুন ব্যাপারতো।তুই একটু ভাবীকে ডাকতো, কথা বলি।
-ডাকতে পারি কিন্তু কাজ হবে না।তাছাড়া আমাদের ব্যাপারটা তো একটু বুঝদে হবে।আমরা তোর জন্য বসে আছি,তুই গাড়ি নিয়ে চলে আয়।
-এই বৃষ্টিতে!
-দূর বেটা,বৃষ্টিতে গাড়ি চালাতে কিযে মজা তুইতো বলতি।তাছাড়া বৃষ্টি এখন কম বেড়িয়ে পর এখনই।
,
রিয়াদ আসার পর বেশ কিছুক্ষন খেলা হয়েছে।আজ বেশীর ভাগ লিড-ই জিতছে ইমন,খুব বড় ষ্টিকে তারা খেলে না।
রিয়াদের হাতে কুইনের কার্ড,এই লিডে রিয়াদ আর রিমন খেলছে।ইমন, অপু হেরে গেছে।রিয়াদের ধারনা এই লিডটা সে জিতবে,কুইনের টাই নিয়ে সে অনেকগুলো ষ্টিক দিয়েছে।কিন্তু রিমন নির্ভিকার তার মনোভাব বুঝা যাচ্ছে না সে বোধহয় আরো এগুবে।ঠিক এই সময় কারেন্ট চলে যায়,সন্ধ্যে হয়ে আসছে ঘর অন্ধকার।
-ধ্যাৎ শালা একটুর জন্য রিয়াদকে আজ হারাতামই (রিমন)
-তোরা বস, আমি ভেতর থেকে আসছি(অপু)
রিয়াদ একটা বালিস টেনে নেয়,দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিয়ে আরাম করে বসে।
রিয়াদ একটা সুর তোলে, "চাঁদের হাসি বাধঁ ভেঙ্গেছে,উছলে পড়ে আলো।
তারটা শেষ হলে এবার রিমন গায়,"আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সনে কইবো কথা"

bangla story book
bangla books

bengali ebook


মাঝেমধ্যে তারা পুরানো গান গেয়ে মজা করে।
এই সময়ই ইমন গেয়ে উঠে, "লুঙ্গিকো উঠানে পড়েগা,লুঙ্গিকো নামানে পড়ে গা,হেই লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ডেন্স বলে নেচে উঠে।
রিয়াদ আর রিমন একসাথে,
-শালা তোর গান বন্ধ কর কত সুন্দর মুহুর্তে ছিলাম মনে হচ্ছিল পরানো দিনের মধ্যে চলে গেছি।
-তোদের এসব গান ভাল্লাগেনা।এইসব গান গায় কেও এখন আর রিয়াদ তুইতো শালা লেডিস মার্কা তাহসানের গান সারাদিন শুইনা কি মজা পাস।(ইমন)
- তুই এসব বুঝবি না।তুইতো ছেকা খাইতে শেষ তোর শোনা দরকার সুমনের গান এইরকম ডেন্সের গানে তোরে মানায় না।তুই হলি গাধা ছাত্র,তোর কোনো প্রতিভা নাই।তোর একমাত্র প্রতিভা হলো বাস্ট মারা,তাই নিয়ে সাধনা কর জীবনে উন্নতি করতে পারবি হয়তো নোবেলও পেতে পারিস।শালা বাস্টলাইট।(রিমন)
রিমনের কথায় সবাই হেসে উঠে।
-কিরে অপু আসছে না কেন?
ইমনের কথায় সবার খেয়াল হয়,অনেক্ষন হলো অপু আসছে না।
-নিশ্চয় কিছু খাচ্ছে(রিমন)
-আমাদের ফেলে কি আর খাবে(রিয়াদ)
-তুই জানোস না অপু কত বড় পেটুক।সামনে খাবার পেলেই হলো গপাগপ গিলবে।(ইমন)
তার কথায় আবার সবাই হেসে উঠে।
,
অপু রুম থেকে বেড়িয়ে দেখে বৃষ্টি থেমে গেছে,আকাশ কিছুটা পরিষ্কার।সে সোজা কিচেনে যায়।পুরো বাড়িতে আই,পি,এস লাইন আছে তার ঘরের লাইনটা নষ্ট হয়ে গেছে।তার ভাবী কিযেনো রান্না করছে।
-ভাবী আর কতসময় লাগবে?পেটে টান পড়ে গেছে।(অপু)
-(হেসে)এইতো ভাইজান আর একটু সময় অপেক্ষা করেন (হুসনা)
হুসনা....এই হুসনা, লুবনা ডাকতে ডাকতে একেবারে কিচেনের সামনে চলে আসে।
-তুই এখানে হাসছিস,আর আমরা চুপচাপ বসে আছি।ব্যাপারটা কি বলতো!(লুবনা)
-তুইও আমাদের সাথে হাসতে থাক।(হুসনা)
-ভাবী,আপনি কখন এলেন।(অপু)
-এইতো কিছুক্ষন আগে।কি পাগলামো বলতো, এই ওয়েদারে কেউ কি বাসা থেকে বের হয়।হুসনার চাপাচাপিতে আসতে হলো,অথচ এভাবে বলে এনে সে একা একা বসিয়ে রেখেছে।
-একা কোথায় রে,তোর আদরিনী ননদের সাথেই তো আছিস।তাছাড়া আমি তো তোদের জন্যই খাবার রেডি করছই মটকি কোথাকার।
-এই খবরদার মটকি বলবি না,আমি মোটেও মটকি না।
সবাই হেসে উঠে,
-তারাতারি যদি না আসিস আমরা কিন্তু চলে যাবো।(লুবনা)
-আসছি বাবা আসছি।তোরা একটু বস,আমার দেরী হবে না।
-আসতো অপু,আমরা কিছুক্ষন গল্প করি।
,
ড্রইং রুমে ঢুকে অপু এতটা চমকে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি।
চমকাবার কারন হচ্ছে চুপচাপ বসে একমনে ম্যাগজিন পড়ছে যে মেয়েটি,সে।
-অপু তোমাদের পরিচয় হয়নি নিশ্চয়,এ হচ্ছে ঋতু আমার ননদ।আর ঋতু ও হচ্ছে হুসনার দেবর।
ভাবীর কথায় ঋতু মাথা তুলে তাকায় সুন্দর করে হাসে।
-ভালো আছেন? (ঋতু)
-হ্যা,আপনি? (অপু)
-ভালো।
অপু কি করবে বুঝতে পারে না,তার পালস্ রেট বেড়ে যায়।ঋতুর সাথে তার অানুষ্ঠানিক পরিচয় এই প্রথম,তাদের বাসায় আর কখনো আসতে দেখেনি,হয়ত এসেছে ওর সাথে দেখা হয় নি।
কিন্তু এখন কি করা যায়।অপুর দোষ হচ্ছের উত্তেজনার সময় ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারে না।
-ভাবী আপনারা কথা বলুন,আমি আসছি।
অপু রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে দ্রুত সে চিন্তা হুসনা ভাবীর কাছে যায়।
-কি ব্যাপার তুমি এসে পড়লে যে!
-একটু এদিকে আসতো।
অপু ভাবীকে নিয়ে বারান্দার এক কোনায় নিয়ে আসে।
-কি?
-ভাবী চমৎকার একটা ব্যাপার হয়েছে।
-কি রকম?
-ভাবী,ঋতু কি আগে কখনও আমাদের এখানে এসেছে।
-হু,কয়েকবার কেন?
-ঋতুকে এখানে এই প্রথম দেখলাম।
-ওরা যেই সময় আসে,তখন তুমি বাসায় থাকতে না।বেশীর ভাগ সময়ই এরা সন্ধ্যার দিকে আসে।
-কিন্তু ভাবী, এখন কথা হলো ঋতুকে নিয়ে।ঋতু আমাকে চেনেনা,কিন্তু আমি ঋতুকে অনেক অাগে থেকে চিনি।
-চিনবেইতো,ওতো তোমাদের সাথেই পড়ে।
-আসল ব্যাপার এটা না।তোমাকে তো বলা হয়নি,রিয়াদের এক ক্লোজ বান্ধবী সীমা,এই সীমার বান্ধবী হলো ঋতু।
-হু,এখন কি হয়েছে সেটা বলো।
-এই ঋতুর পেছনেই রিয়াদ আধা জল খেয়ে লেগেছে।অনেকদিন হলো, কিন্তু ঋতু রিয়াদকে একদম পাত্তা দিচ্ছে না।সীমাও কিছু করতে পারছে না।
-ওহ্ মাই গড...!এই ব্যাপার তলে তলে এতদূর।এতোদিন আমায় বলোনি যে।
-ধুর,বলার কি আছে।তাছাড়া আমি জানতাম নাকি,তুমি যে ঋতুকে চেন।ভাবী এখন দু'জনে মুখোমুখি হলে কেমন হবে ভাবতো!
-হাউ ফ্যান্টাষ্টিক!
-ভাবী আমি চাই এখন সুন্দর একটা সিনক্রিয়েট হউক।তোমাকে একটা কাজ করতে হবে,এই কয়েক মিনিট পর ঋতুকে নিয়ে রুমে যাবে।
-ঠিক আছে।(হেসে)
অপু খুব স্বাভাবিক ভাবে রুমে আসে
-কিরে এতক্ষন কি করছিলি।(ইমন)
-আড্ডা দিচ্ছিলাম।
-আড্ডা দিচ্ছিলি,কার সাথে?(রিমন)
-রিয়াদের গার্লফ্রেন্ড, ঋতুর সাথে।
-ঋতু!তুই তাকে পেলি কোথা থেকে!
রিয়াদ ছাড়া সবাই হেসে উঠে।অপুও তাই চাইছিল,এরা বিশ্বাস না করুক।অবশ্য বিশ্বাস না করারই কথা।
ঋতু নামটা শুনা মাত্র রিয়াদ চমকে উঠে।বেশকিছুদিন দেখা, সেই প্রিয়মুখের।কি হয়েছে তার,কি এক অভিমানে সীমাকেও সে কিছু জিজ্ঞাস করেনি।রিয়াদের বুকের ভিতর কি রকম করে উঠে,সে দু'চোখে প্রশ্নদৃষ্টিতে অপুর দিকে তাকায়।অপু তা বুঝতে পারে।
-ড্রইং রুমে, কেন বিশ্বাস হচ্ছে না? (অপু)
-হ্যা,খুব হচ্ছে। (রিমন রসিকতা করে)
রিয়াদের মন খারাপ হয়ে যায়।এক ধরনের উদাসীনতার মধ্যে পড়ে যায়।সে বুঝেনা কেন বন্ধুরা তা সাথে এমন করছে,তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আলতে খোঁচা দিচ্ছে।
-কিরে রিয়াদ,কিছু বলছিসন না যে।(অপু)
-কি বলবো!
-কি বলবি মানে,ঋতু এত কষ্ট করে তোর খোঁজে এখানে এসেছে আর তুই বলছিস কি বলবো!
-অপু ফাজলামি রাখতো, সবসময় ভালো লাগে না(ধমক দিয়ে)
অপু হাসে,মনে মনে বলে এইতো বাছাধন পথে আসছো।তারপর বলে,
-রিয়াদ ধর এই মুহুর্তে ঋতুর সাথে তোর যদি দেখা করার একটা ব্যবস্থা করে দেই তাহলে তুই কি দিবি।
-চুপ কর শালা!
-আহা রাগছিস কেন, বলনা।(রিয়াদের অজান্তে রিমন আর ইমনকে চোখ টিপি দেয়)
-বল কি চাস? (হাসি দিয়ে)
-তুই আমাদের সবাইকে পাঁচশো টাকা খাওয়াবি,রাজি।
-রাজি,কিন্তু যদি না পারিস তুই কিন্তু টাকা দিবি।
-না পারলে! এটাতো বাজি না যে,উল্টো তোকে টাকা দিবো।সফল হলে টাকা পাবো,না পারলে তোর টাকা তোর কাছেই থাকবে।বুঝলিরে রিয়াদ,যাদু খুব কঠিন জিনিস।সফল হতে সাধনা লাগে, আংকারাশা।
সবাই হেসে ফেলে..
-কিরে রিয়াদ তুই রাজি (ইমন)
-চর দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব,যাদুকরগিরী ছুটিয়ে দিব।(রিয়াদ)
-যাদু হোক আর যায় হোক,পারলেতো তুই টাকা দিবি(রিমন)
-ঠিক আছে দিব।
কাজটা ঠিক পরিকল্পনা মতো করা গেছে,অপুর চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠে।
ইমন ব্যাপারটা ঠিকমতো বুঝতে পারছেনা।এই সময় এখানেই বা ঋতু আসবে কোথা থেকে।অপু আবার চোখই মারলো কেন,হয়ত জোক।রিমনও এরকমই ভাবছিল।
,
তাদের ভাবনা শেষ হবার আগেই দরজা ঠেলে ভতেরে ঢুকে হুসনা,লুবনা এবং ঋতু।
অপু বাদে সবাই হতচকিয়ে যায়,নড়েচড়ে বসে।রিয়াদ ভূত দেখার মতো চমকে উঠে।ঋতুর দিকে বোকা বোকা অবিশ্বাসী চোখে তাকায়,কারো মুখে কথা উঠে না।
অপু নির্ভিকার মুখ টিপে হাসে আর ফিসফিস করে বলে, "আংকারাশা"।
ঋতু রিয়াদকে এখানে দেখে চমকে উঠে,থমকে যায়।এটা কিভাবে হলো?
কয়েকদিন আগে ঋতু তার বান্ধবী ফারিয়াকে নিয়ে দু'জনে ইষ্টার্ন প্লাজায় যায়।ঘুরে ফিরে এটা সেটা পছন্দ করার সময় হঠাৎ দেখে সামনের একটা দোকানে রিয়াদ,হাতে টি-শার্ট।তার চোখে পড়ার আগেই ঋতু, ফারিয়াকে নিয়ে দ্রুত অন্যদিকে চলে যায়।
হুসনা একে একে ইমন আর রিমনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
-ওর সাথে পরিচয় আছে।(লুবনা হেস)
-ভাবী কেমন আছন?(রিয়াদ)
-ভাল,তুমি কেমন আছো?
-ভালো।
-এই,তুই রিয়াদকে কিভাবে চিনিস!(হুসনা)
-বলব না!(মুচকি হেসে)
ঋতু কিছু বলে না,রুমের চারপাশে দেখতে থাকে।দেয়ালে টাঙ্গানো খুব সুন্দর একটি তৈলচিত্রে তার চোখ আটকায়।
-রিয়াদ, টাকাটা দিয়ে দেতো।নতু্বা তোর পেস্টিজের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বো,তোর প্রেম এখানেই ডিসমিস।জানিস তো আমার লজ্জা-শরম কোন পর্যায়ের। (রিমনের চাপা কন্ঠ)
,
রিমনের আসলেই ঠোট কাটা,কোনো কথা তার মুখে আটকায় না।কে কি মনে করল তা সে খুব একটা পাত্তা দেয় না,তার যা মনে আসে তাই করে।
একবার ওরা চারজন মিলে ঈদের পরদিন বেড়াতে যাবার প্লান করে, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া।ব্রাক্ষনবাড়ীয়ায় রিয়াদের নানা বাড়ি।ট্রেন তিনটায়,ঠিক সময়ে কমলাপুর রেল ষ্টেশনে গিয়ে জানতে পারে ট্রেন এক ঘন্টা লেট।কি আর করা সবাই ঘুরে ফিরে মেয়ে দেখায় ব্যস্ত হয়।
-আমার খুব ক্ষুদা লেগেছেড়ে।(রিমন)
-ক্ষিধে পেয়েছে!বাসা থেকে খেয়ে আসিস নি।(ইমন)
-হু,খেয়েছিলাম,তোদের তাড়াহুড়ায় ভাল করে খেতে পারি নি।
-এখন তুই কি করতে চাস।
-তরা খাওয়া নতুবা আমি বাসা থেকে খেয়ে আসি।
সবাই বুঝত পারে রিমন বাসায় গেলে আর আসবে না।না যাবার জন্য সে এই ফন্দি এটেছে।রিমনকে ছাড়া যাবারতো প্রশ্নই আসে না।ভ্রমনটাই মাটি।সারাক্ষন আজে-বাজে চমৎকার সব কথা বলে সবাইকে কেমন মাতিয়ে রাখে।
-তোর কাছ টাকা নেই?(রিয়াদ)
-আছে,এখান থেকে খরচ করা যাবে না।
-কন?
-পরে যদি টাকার সমস্যা হয়।পথে কারো কাছে টাকা ধার চাইতে আমার ভালো লাগে না।
-ধান্দাবাজি ঝাড়ি মারা রাখ,তর উদ্দেশ্যটা কি?
-মাত্র একশো টাকা,একশো টাকা খরচ কর(হেসে)
রিয়াদ বুঝত পারে, টাকা না দিয়ে উপায় নেই।পরে অবশ্য উশুল করা যাবে।কিন্তু কিভাবে টাকাটা জায়েজ করক যায় সেই চিন্তা করে।এমনি এমনি দেয়াত রিক্স বেশী,এতে রিমনের সাহস বেড়ে যাবে।
-তুই একটা কাজ করতে পারলে একশো টাকা পাবি।
-কি কাজ?
-ওই যে মহিলা দাড়ানো,তুই ক্ছে গিয়ে উনার শাড়ির দাম জিজ্ঞাস করতে পারবি।
-পারবো!
-তাহলে শুরু কর(অপু)
ইমন,অপুদের কাছ থেকে মাত্র কয়েকগজ দূরে দাড়ানো একটা মোটা লম্বা মহিলা সাথে তাদের বয়সি দুটো মেয়ে।
রিমন কেশে গলা পরিষ্কার করে বুকে ফু দেয়।তারপর মহিলার দিকে এগিয়ে যায়।ইমন মুখে হাত চাচ দেয়,রিয়াদ অন্য দিকে তাকায়,অপু অপলক রিমনের কান্ড দেখে।
-শীলা আপা।(রিমন)
মহিলার সাথে দুটো মেয়ে হতভম্ব হয়ে তাকায়।কিন্তু মহিলাও কম যায় না।
-আমার নাম শীলা আপা না,আমার নাম নাজমা আপা(মহিলা)
-ওহ্ সরি,আচ্ছা নাজমা আপা আপনারা চট্টগ্রাম যাচ্ছেন।
-কুমিল্লা যাচ্ছি।
-ও!আমরা ব্রাক্ষনবাড়িয়া যাচ্ছি।
-তুমি কি বুঝতে পেরেছো,আমি যে তোমাকে চিনতে পারি নি।
-হু,আমার ওতো একি কথা।
-এরকম করলে কেন,এরকম করাতো ঠিক না।
-সরি,আর করবো না আপা।এখন যদি আপনার শাড়িটার দাম জিজ্ঞেস করি, আপনি কি রাগ করবেন!
-দাম বললে কি তোমার সমস্যা মিটে যায়।(হেসে)
-ইয়েস আপা, প্লিজ।
-আমার শাড়ির দাম ছয় হাজার চারশো টাকা।
-আমার ড্রেসটার দাম যদি আপনার জানতে ইচ্ছে হয়,তাহলে বলতে পারি।(পাশের সুন্দরি মেয়েটি রিমনকে খোচা দেয়)
-থ্যাংক্স,তার দরকার হবে না।আসি আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
,
রিয়াদ রিমনকে বলে ,পাবিতো।লুবনা রিয়াদের দিক তাকিয়ে হাসে।সে কিছু বলতে পারে না।কি এক আনন্দে তার মন ভরে যায়।
-চলো ভাবী(ঋতু)
ওরা সবাই চলে যায়।রুমের সবাই জোরে হেসে উঠে।রিমন রিয়াদের পিঠে দমাদম কিল বসিয়ে দেয়।
-হাউ স্ট্রেঞ্জ!আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।(ইমন)
-তোর আর বুঝে কাম নেই,রিয়াদ টাকা বের কর।(রিমন)
-আংকারাশা!(অপু),
ঋতুরা,হুসনার রুমে যায়।হুসনা ভাবী সবার হাতে খিচুরির প্লেট তুলে দেয়।অপুদের ওখানেও খিচুরী পাঠানো হয়েছে।।ঋতু খেতে খেতে রিয়াদের কথা ভাবে,আহ্ বেচারা কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারে নি।রিয়াদকে ওখানে দেখে ঋতুর প্রথমে সন্দেহ হয়েছিল ঘটনাটা হুসনা ভাবীর সাজানো কিনা।কিন্তু পরে বুঝতে পারে তার সন্দেহটা ভুল।
-এখন বলতো লুবনা,তুই রিয়াদকে কিভাবে চিনিস(হুসনা)
-আরে গাধা ওদের চাইনিজ আছে না,একদিন ওখানে গেলে রিয়াদের সাথে পরিচয় হয়।বুঝেছিস!(লুবনা)
,
বৃষ্টির ধারা অনেকটা কমে গেছে,বৃষ্টি নেই বললেই চলে।বাসায় ফেরা দরকার,জহির বোধহয় এতক্ষনে বাসায় এসে গেছে।তাকে না পেয়ে রেগে যেতে পারে।রাগার অবশ্য সম্ভাবনা কম,সে এখান আসার পূ্র্বে জহিরকে ফোন করে জানিয়েছে তা ফিরতে একটু দেরী হবে।তবুও তারাতারি বাসায় ফিরা দরকার।এই আবহাওয়ায় বেশীক্ষন বাইরে থাতা ঠিক না।
-হুসনা,বাসায় ফেরার ব্যবস্থা কি?
-এখনই চলে যাবি।
-হু,ওয়েদার খারাপ সন্ধ্যেও হয়ে গেছে।
-তা অবশ্য ঠিক,রিকসা আনতে লোক পাঠাব।
-হু।
হুসনা তাদের জন্য রিকসা আনতে কাজের ছেলেকে পাঠায়।কিন্তু কিছুক্ষন পরে এসে সে জানায় রিকসা পাওয়া সম্ভব না।কোথাও রিকসা নেই।রাস্তায় অনেক পানি।
-তাহলে এখন কি হবে ভাবী,হেটে যাব নাকি!(ঋতু)
-তোমাকে হেটে যেতে হবে না ননদিনী।প্রয়োজনে হেলিকাপ্টার দিয়ে পাঠাবো,এখন বলো তোমরা যাবে কি না!(হুসনা)
-মানে(ঋতু)
-রিয়াদ গাড়ি নিয়ে এসেছে।তাকে বলে তোমাদের লিফটের ব্যবস্থা করতে পারি।
-অবশ্যই।(লুবনা)
-না...না, তা কি করে হয়!(ঋতু)
-অসুবিধা কি ঋতু?(লুবনা)
-আমার ইচ্ছে করছে না।
-এছাড়াদো উপায় নেই,অনেক্ষন লেট করলে অবশ্য রিকসা পাওয়া যাবে।কিন্তু লেট করা তো সম্ভব না।
-ভাইয়রা খোজ নিবে,ভাইয়া ফিরছে কিনা।
-মনে হয়ে ফিরেছে।এতক্ষনে তার মেজাজ ফোরফোরটি।ড্রাইভার নেই,আমাদের এসে নিয়ে যেতে তাকে বলাটা ঠিক হবে না।
-ধ্যাৎ,তোদের আজে-বাজে চিন্তা রাখতো,আমি রিয়াদকে এক্ষুনি বলছি।(হুসনা)
,
এই প্রথম ঋতু রিয়াদের সামনে বেশ সংকোচে পড়ে।গাড়িতে সে লজ্জায় জড়ো হয়ে বসে।তার এই যাওয়াটা মন থেকে নিতে পারছে না।তার বেশ অস্বস্তি লাগে,এমন দিনে না এলেই ভালো হতো।ঋতুর নিজের উপর রাগ হচ্ছে,কেন সে ভাবীর কথা শুনতে গেল।
-তুমি এমন চুপ মেরে বস আছো কেন?(লুবনা)
ঋতু কিছু বলে না।তার সমস্ত রাগ এসে ভাবীর উপর জমা হয়।সে বাইরে তাকায়,বৃষ্টি যেন এতক্ষন তাদের অপেক্ষায় ছিলো ঝুম করে বৃষ্টি নামে।গাড়ি মেইন রোডে ওঠে আসে।রাস্তার উপর অনেক পানি যেন বন্যা হয়েছে।গাড়ি চলার সাথে ঢেউ ওঠছে পানিতে এত আনন্দের সাথে রিয়াদের পরিচয় ছিল না।সে মনে মনে ভাবে এ সত্যি নয় সপ্ন,বাস্তব এত সুন্দর হয় না।তার ইচ্ছে হয় হাজার কিলোমিটার স্পীডে গাড়ি চালাতে,কিন্তু তা সম্ভব নয়।রাস্তায় জমাট বাধা পানির জন্য গাড়িতে স্পীডও দেয়া যাচ্ছে না।রিয়াদ একটি পুরনো দিনের গান ছাড়ে।
-কি ব্যাপার এত পুরনো গান!(লুবনা)
-কিছু কিছু গান আছে যা কখনোই পুরনো হয় না,মাঝে মাঝে শুনতে ভালো লাগে।(রিয়াদ হেসে)
-ওহ্ মা!তুমি তো পুরা রোমান্টিক কথার মত বলছ!(লুবনা)
ঋতু,লুবনার হাতে চিমটি কাটে। যার অর্থ হল,এতকথা বলার দরকার কি?সে ভাবীর দিকে রাগী চোখে তাকায়।
-কি ব্যাপার জেলাসি ফিল করছো কেন?(লুবনা হেসে ফিসফিস করে বলে)
-আই ডন্ট লাইক দ্যাট!(রেগে)
ঋতু বাইরের দিকে তাকায়,ভাবীকে আর কিছু বলে না।এখন বৃষ্টি কম।গানটা খুব বেশী হৃদয় ছোয়া,রোমান্টিক।
-বাসা চিনবেতো?(লুবনা)
-দেখি চেস্টা করে(রিয়াদ হেসে)
-বেশি চেস্টা করার দরকার নেই,মাসুমদের বাসার সামনে গেলেই হবে।(খোচা দিয়)
ভাবীর কথায় রিয়াদ চমকে উঠে।মাসুম যে রিয়াদের বন্ধু সেটা ভাবী জানে কি করে,তার মাথায় আনে না।
সে কিছু না বলে গাড়ি সেখানে যাওয়ার জন্য ঘুরায়।
রাস্তায় যানবাহন নেই বললেই চলে,মাঝেমধ্যে কয়েকটা গাড়ি চলাচল করছে।রিকসা খুবই কম যে কয়টা আছে,তার সবগুলি রিকসা ড্রাইভার টেনে নিয়ে যাচ্ছে।রাস্তায় অনেক পানি,সে জন্য চালাতে পারছে না।দেখতে দেখতেই গর্তে পড়ে হঠাৎ একটা রিকসা উল্টে যায়।দুজন যাত্রী একজন পরুষ অন্যজন মহিলা।ময়লা পানিতে পড়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলে।ঋতু হঠাৎ মনেমনে হেসে ওঠে,তার মন ভালো হয়ে যায়।
রাতে রিয়াদ অনেক্ষন ঘুমাতে পারে না।বারবার শুধু ঋতুর প্রিয় মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠে।সে ভাবছিল আশ্চর্য সন্ধ্যা এবং প্রিয়সী ঋতুর কথা।
গাড়ি যখন ঋতুদের গেটের সামনে থামে তখনও খুব জোরে বৃষ্টি পড়ছিল।ভাবী রিয়াদকে হর্ন বাজাতে বলে,কেও একজন আসবে ছাতা নিয়ে।কিন্তু ঋতু তখন এক কান্ড করে, সে ছাতার জন্য মোটেও অপেক্ষা করতে রাজি না।প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেই গাড়ি থেকে নেমে খোলা গেট দিয়ে ভেতরে দৌড় দেয় সে।
ভাবী রিয়াদকে বাসায় যেতে বলে সে যায়নি,অন্যদিন আসবে বলে ফিরে আসে।
ঋতুর মোবাইল নাম্বার রিয়াদের কাছে আছে কিন্তু সে ফোন দিতে সাহস পায় না।এমনিতেও সে ফোনে খুব কমই কথা বলে।ফেসবুকে ঢুকে সে ঋতুর অ্যাকাউন্ট খুজে, অনেকদিন ধরেই সে ঋতুর অ্যাকাউন্ট খুজছে কিন্তু পাচ্ছেনা।প্রথম যখন পেত তখন রিকুয়েস্ট পাঠানোর সাহস ছিল না তাই পাঠায় নি কিন্তু এখন অনেক খুজেও পায়না।তার মনে হয় ঋতু নিশ্চয়ই তাকে ব্লক দিয়েছে।পরে সে CoC তে গেম খেলতে থাকে।
,
ঋতুও রিয়াদের কথাই ভাবছিল এই প্রথম,এর আগে সে কখনই রিয়াদের কথা ভাবে নি।বৃষ্টিতে ভিজে বাসায় এসেই গোসল করেছে,শরীরটা বেশ ফুরফরে লাগছে সেই সাথে বেশ শীত।সে একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে,তার হাতে ওয়ান্ডার উমেন এর গল্পের বই।সে ভাবছে-
রিয়াদ, আহ্ বেচারা তার দিকে চোখ তুলে তাকাতেই পারে নি।কি লাজুক লাজুক,শান্ত,গম্ভীর্যে ভরপুর ব্যক্তিত্ববান যুবক।আচ্ছা সে রিয়াদকে ভদ্রতা করেওতো বৃষ্টি সন্ধ্যায় বাসায় আসতে বলতে পারতো।নিশ্চয় পারতো, সে রিয়াদ না হয়ে অন্য কেও হলে পারত।
ঋতুর প্রতি রিয়াদের অসম্ভব রকম দুর্বলতার জন্যই ঋতু তাকে কিছু বলতে পারে নি।এতে শুধু রিয়াদের মনে মিথ্যে আশারই জন্ম হতো।যা হবার নয়,তা নিয়ে মিছিমিছি আশা জাগিয়ে কি লাভ।
রিয়াদকে অপছন্দ করার মতো কোনো কারন নেই।ঋতুর অনীহা রিয়াদের প্রতি নয় ভালবাসার প্রতি।বাহির দিক দিয়ে ঋতুকে কঠিন প্রকৃতির মেয়ে মনে হলেও,আসলে তার ভেতরটা খুবই নরম।বেশীর ভাগ মানুষ তার কঠিনাই দেখেছে,নরম দিকটা নয়।তার দ্বারা কাউকেই প্রতারনা বা ঠকানো কখনোই সম্ভব নয়,কেউ তাকে প্রতারিত করুক তাও সে চায়না।ঋতু প্রতারনার তিব্রতা সহ্য করতে পারবে না,এখানেই তার বড় ভয়।সে জানে নিষ্ঠুরতম ভালবাসার অবহেলা তাকে নিয়ে যাবে নিশ্চিত ধ্বংসের কাছাকাছি।ভালোবাসার সোনালী আলোর দিকে কোমল হাতত বাড়ানোর আগেই,সে উল্টোপিঠ সে দেখেছে।সে দেখেছে ভালবাসার সোনালী আলোয় একজীবন উদ্ভাসিত হবার বদলে,তার বেদনা তীক্ষ্ণ বিশে কি রকম একটা গোটা জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
ঋতুর জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা তার খালাতো বোন রুমা আপা।অসম্ভব রুপবতী,তার থেকে দুইবছর বড় হলেও তাদের মাঝে সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ।
,
রুমাপু খুবই জলি মাইন্ডের, অনর্গল কথা বলে হাসায়।খুব সুন্দর গল্প বলতে পারে তবে তার বেশীর ভাগ গল্পছিল এডাল্ট শুনার মতো না।লজ্জায় ঋতুর কান গরম হয়ে যেত তুবও মাঝেমধ্যে এসব গল্প তার শুনতে হত।সে শুনে রুমাপু বলে বলেই।কোনো একদিন তারা আড্ডা দিচ্ছে,কথার মাঝ খানেই রুমাপু বলল,
-ও, ভাল কথা ঋতু।তোকে খুব মজার একটা গল্প বলতে ভুলে গেছি।
-তাই নাকি।
-হু,শুনবি নাকি।
-শুনবো,কিন্তু তোমার সব গল্পইতো ভয়ঙ্কর বাজে শুনতে ইচ্ছে করে না।
-আরে না,এই গল্পটা খুবই ভালো।একেবারে ফ্রেশ এন্ড ক্লিন।(মুচকি হেসে)
-ঠিক আছে, এরকম হলে বলতে পারো।(হেসে),
,
বনানীর এক বাসার গৃহিনী তার কাজের ছেলেকে মুরগ কিনে আনতে পাঠায়।মোরগ কিনে আসার পথে প্রচন্ড গরমে তার তেষ্টা পায়।সে পাশের দোকান থেকে একটা পোলার আইসক্রীম কিনে, তার হালকা ঘুম পায়।হাতে সময় আছে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যায়।মোরগটি চলে যেতে পারে ভেবে,সে মোরগটিকে প্যান্টের ভিতর ঢুকিয়ে রাখে।রাস্তার পাশে গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়ে।
সেই রাস্তা দিয়ে মার্কেটিং শেষে রিকসা দিয়ে যাচ্ছিল মিসেস খান এবং মিসেস রহমান।
হঠাৎ মিসেস রহমানের নজরে পড়ে ঘুমন্ত ছেলেটি।তিনি মিসেস খানকে বলেন,
-দেখো ছেলেটির জিপার খোলা।
-কি দেখবো, একজনেরটা দেখলেইতো সব দেখা হয়ে যায়।
-তা অবশ্য ঠিক,কিন্তু ওটাকে কখনো আইসক্রীম খেতে দেখিনি।
,
ঋতু এবং রুমাপু একসাথে হেসে উঠে।
-তুমি এতা কোথা থেকে শুনলে? (ঋতু)
-কোথাও শুনিনি, আজ একটা ম্যাগাজিনে পেলাম।
এই হলো রুমা আপুর "ফ্রেশ এন্ড ক্লীন গল্প"
এই হাসি খুশি, প্রান্তবন্ত রুমাপু প্রেমেমে পড়ে।ছেলটি রুমাপু ক্লাসফ্রেন্ড সাব্বির।তাদের এই সম্পর্কের কথা দুপরিবারের কারো কাছেই গোপন থাকে না।তার সম্পর্কটা সবাই মেনেও নিয়েছে।ফলে তাদের মেলামেশায় কোন প্রকার বাঁধা থাকে না,ভালবাসার স্বপ্ন বুনে ঘর সাজাবার।
একদিন রুমাপু হাসতে হাসতে বলে,
-সাব্বির খুব সমস্যা করছেরে।
-কি রকম?(ঋতু)
-বিদেশে যাবার পোকা তার মাথায় ভর করেছে।
-তাই নাকি
-হু
-তোমার কথা শুনে না।
-উহু
-তাদের পরিবারের অবস্থাতো ভালই,তবে বিদেশ যাবার কারন কি?
-তার নাকি বৃহৎ পরিকল্পনা আছে,সেই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশ যাওয়া।
-বলো কি?
-হু
-সাব্বির ছবি বানাবে,তার জন্য প্রচুর টাকা দরকার।দেশে থাকলে এত টাকা রোজগার করা সম্ভব না।তাই সে সুইজারল্যান্ড যাবার জন্য ওঠে পড়ে লেগেছে।মনে হয় কিছুদিনের ভেতর একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
-রিয়েলী,খুশী খবর।সাব্বির ভাই বিদেশ থেকে এসে ছবি বানাবে।সেই ছবির নায়িকা হবে তুমি আর সাব্বির ভাই হবে নায়ক।ওহ্ মাই গড,আমি ভাবতেই পারছিনা।
-আরে যাহ্!তুই যে কি বলিস। (লজ্জা পায়)
,
এ ঘটনার মাস দুইপর সাব্বির ভাই সুইজারল্যান্ড চলে যান।নিয়মিত যোগাযোগ হয় তাদের মাঝে,দুই বছর এভাবেই চলে।একদিন ফোন করে বলে রুমা আমি একটু ঝামেলায় আছি,সময় করে তোমাকে পরে জানাবো।তারপর হঠাৎ করেই সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ,ফোন আসে না এফবিতেও পাওয়া যায়,কোনো খবর নেই।রুমাপু কি যে অস্থির হয়ে পড়ে।দুঃচিন্তায় ঠিক মতো ঘুমায় না,খাওয়া নেই।
মাস ছয়েক পর হঠাৎ একদিন চিঠি আসে।চিঠিটা ঋতু পরবর্তীতে পড়েছে।চিঠিটা এরকম-
,
প্রিয় রুমা,
আমার ভালবাসা নিয়ো।তুমি নিশ্চয়ই ভালো নেই। অহোরাত্র আমার চিন্তায় তুমি ঠিক মতো ঘুমাওনি।তোমায় সরাসরি বলতে পারবো না বিধায় চিঠি লিখা।তুমিই ঠিক জানো না,আমি অনেকটাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে এদেশে এসেছি।আমি এদেশে এসে রাজনৈতিক আশ্রই নেই।আমি পার্টির কর্মী হিসেবে আশ্রই প্রার্থনা করি।বৎসর খানেক মামলা চলার পর,ঐ পার্টির রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়ে যায়।ফলে আমার রাজনৈতিক প্রার্থনার গুরত্ব হারিয়ে ফেলে,কোর্ট মামলাটি খারিজ করে দেয়।সুইজারল্যান্ড থাকা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে দাড়ায়।আমি তখন দিশেহারা,কি করব বুঝতে পারি না।আমার ভয়ংকর দুর্দিনে আমার অস্থিরতা,বিষন্নতা,করুন অবস্থা দেখে আমার কোম্পানীর পরিচিত কলিগ ক্যাথরিন একদিন তার কারন জানতে চায়।উপায়ন্তর না দেখে তার কাছে সবকিছু সবিস্তারে জানাই।
এভাবেই আমিও ক্যাথরিন ঘনিষ্ট হতে থাকি।আমি জানতাম এদেশে বিয়ে করলে থাকার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।কিন্তু আমার মন এতে সায় দিচ্ছিলনা।তোমাকে ছাড়া অন্য কোন মেয়ের কথা কল্পনাও করিনি।আমার যা কিছু স্বপ্ন কল্পনা সবই তো তোমায় ঘিরে।এদেশে থাকার সময় আছে মাত্র পনের দিনের।আমার স্বপ্ন,এত কষ্ট সব।মিথ্যে হয়ে যাবে।
এই সময় ক্যাথরিন হঠাৎ করে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।আমার কোন বিকল্প পথ ছিল না।কয়েক মাস হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে।
তোমার সব কথাই ক্যাথরিনকে বলেছি।তোমার সাথে দেখা করার ক্যাথরিনের খুব ইচ্ছে।সে কি বলে জানো,যখন তোমার অনেক টাকা হবে তখন তুমি দেশে ফিরে যাবে এবং অবশ্যই রুমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবে।ক্যাথরিন জানেনা তুমি কতটা কঠিন এবং সরল প্রকৃতির মেয়ে।তবে রুমা একদিন ভরা জোছনায় সত্যি তোমার কাছে ফিরে আসবো।
,
চিঠিতে আর কিছু লেখা ছিল না।রুমাপু এ চিঠি পাবার পর একদম ভেঙ্গেপড়ে,সম্পূর্ণ বদলে যায়,চুপচাপ।বাসার সবার সাথে কথাবার্তা প্রায় বন্ধকরে দেন,খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই,শরীর শুকিয়ে কাঠ।কারো কথা শুনে না,নিজের ইচ্ছেমতো চলেন।দুইমাস পর একদিন রুমাপু তাদের বাসায় আসে।রুমাপুর চোখের নিচে কালি বিষন্ন উদাস দৃষ্টি, শরীরের সর্বত্র অযত্ন অবহেলার ছাপ।
ঋতু নিজেকে সামলে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে রুমার হাত ধরে বলে,
-মাই গড,রুমাপু তুমি।বিশ্বাস করো রুমাপু তোমাকে দেখে আমি কিযে খুশি হয়েছি।
-কেন,আমি কি তোদের এখানে আসি না।
-না,তবুও তুমি বিশ্বাস করো।
-হ্যা, আমি জানি তুই আমাকে খুব পছন্দ করিস।তাই যখনই তোকে দেখতে ইচ্ছে করে, চলে আসি।
-আজ কিন্তু তুমি আমাদের এখানে থেকে যাবে।তোমার সাথে অনেক গল্প করব।
-........।
সে কিছু না বলে ভেতরে ঢুকে খালাকে সালাম দেয়।ঋতুর মা রুমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
-কেমন আছিস রে, মা?
-আমি ভালো আছি খালা, আপনি ভালো আছেন?
-কি করে ভালো থাকবো,মা তুই কি তোর জীবনটা এভাবে ধ্বংস করে দিবি।
-ধ্বংস করে দেব মানে!(হঠাৎ রেগে উঠে)
খালা রুমার এ চেহারা দেখে ভয় পেয় যা।এই জেদি মেয়েটাকে তার খুব ভালো চেনা আছে।তিনি আমতা আমতা করে বলেন,
-মানে বলছিলাম কব তুই যদি একটা বিয়ে শাদী...
-মা, তুমি থামোতো।(ঋতু)
-ওহ্....অসহ্য(রুমা চিৎকার করে উঠে)
তোমরা আমাকে পেয়েছো কি,ঘরে বাইরে কোথাও একটু শান্তিতে থাকতে পারিনা।আমি না মরা পর্যন্ত নিস্তার নেই।তোমরা কেন আমাকে এরকম বিরক্ত করো।আমি তোমাদের কি ক্ষতি করেছি।
-আমি আর তোকে কিছুই বলব নারে মা(ঋতুর মা কাঁদো কন্ঠে)
-ওহ্...খালা আমি বুঝিনা তুমি এমন কেন করো।এই ঋতু ওঠতো খালা যত ইচ্ছে কাঁদুক।চল তোর ঘরে যায়।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে ঋতু রুমাপুকে নিয়ে তার রুমে আসে।ঋতুর রুমটা খুবই সুন্দর দামী আসবাবপত্রে সুন্দর করে সাজানো গুছানো।দক্ষিন দিকের দেয়াল ঘেসে ওয়ারড্রোব।রুমের মাঝখানে শাদা বিছনা।দেয়াল জুড়ে কয়েকটা মনোরম তৈলচিত্র।
-তোর রুমটাতো খুব সুন্দর সাজিয়েছিস।
-রুমাপু গান শুনবে।
-তোর ইচ্ছে।
-ঋতু তোকে আমার এক ভালো লাগে কেন জানিস।
-.........
-তুই আমাকে খুব বুঝিস,কারন তুই আমকে কখনো অন্যদের মতো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করিস না।অথচ আমি জানি তুই আমাকে কতটা ফিল করিস।
-রুমাপু তুমি ঘুমাও,আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
-আমিতো ঘুমাতে পারিনা ঋতু।কতদিন, কতরাত আমি ঘুমাইনি।পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ঘুমিয়ে থাকে অথচ আমার চোখে একফোঁটা ঘুম নেই।না ঘুমানোর কষ্টি কি ভয়াবহ তা তুই বুঝবি না।ইচ্ছে হয় চিৎকার করে কাদি।পৃথিবীর মানুষদের জানিয়ে দেই আমার না ঘুমানোর কষ্ট।পারি না ঋতু, বুক ফেটে যায় নিরবে নিঃশব্দে কাদি।
রুমাপুর কষ্টে ঋতুর বুকফেটে যায়,তার চোখে জল ভরে আসে,সেও রুমাপুর সাথে কাদে।
,
রুমাপুর সেই কষ্টের কথা কখনো ভুলতে পারবে না ঋতু।তার জীবনেও এমন কিছু একটা ঘটে যাক তা সে কখনো চায় না।তার এই কষ্ট ধারন করা সম্ভব না।যদিও সবার জীবনে যে এমন ঘটবে তা সে বিশ্বাস করে না।সে বেশ ভালো করে জানে প্রতিটা মানুষ,প্রতিটা মানুষ থেকে ভিন্ন তাই ঘটনার প্রক্রিয়াও ভিন্ন।তুবও ঋতুর ভয়, সেই জন্যই সে কোন বন্ধনে নিজেকে জড়াতে চায় না।
-আজ আর ক্লাস করব না।(সীমা)
-কেন,সবেত মাত্র দুটা ক্লাস করেছিস।(ঋতু)
-হু,ভাল্লাগছে না বলে সীমা উঠে দাড়ায়।
-আরে,সত্যি সত্যি চলে যাবি নাকি।
-হু
-ঠিক আছে চল,আমিও ক্লাস করব না।
-ও...ফাইন!
ঋতুরা কলা ভবনের সামনে থেকে হাটতে হাটতে মেইন রাস্তার কাছে চলে আসে,ফুটপাতে গাছের নীচে দাড়ায়।
-ঋতু,তুই কি এখন বাসায় চলে যাবি।(সীমা)
-বাসায় যাবো নাতো কই যাব।
-এখ কাজ কর,তুই আমাদের বাসায় চল সারাদিন থেকে বিকেলে যাবি।খুব মজা হবে।
-যাওয়া যায় তবে বাসায় জানিয়ে দিতে হবে।
-গুড,ফোন করে জানিয়ে দে।
,
দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিল রিয়াদ অবশ্য ঘুমটা তেমন হয় নি।তবুও অনেক্ষন বিছানায় শুয়ে থাকে।মাঝে মধ্যে এমন হয় ঘুমুতে প্রচন্ড ইচ্ছে হয়,বিছানায় অনেক্ষন শুয়ে থাকে অথচ ঘুম আসে না তখন খুব খারাপ লাগে।বিকেলে সীমার ওখানে যাবার ইচ্ছে আছে।সীমা বোধহয় তার উপর খুব রেগে আছে।গতকাল সীমা অনেকবার কল করেছিলো,সে ধরতে পারে নি।পরে তাকে কল ঘুরালে সীমা তার কল আর ধরেনি।ফেসবুকেও নক করেছিল রেসপন্স করেনি।ভার্সিটিতে ও সীমার সাথে দেখা হয়নি।তাছাড়া অনেকদিন সীমাদের বাসায় যাওয়া হয় নি।
তাই সে বিকালে সীমার বাসায় যাবার ডিসিশান নেয়।সে বিছানা ছেড়ে ওঠে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়।হাল্কা নাস্তা করে কাপড় পাল্টে বাইক নিয়ে বেরিয়ে আসে।
,
-এই সীমা, এবারতো আমার যেতে হয়।(ঋতু বড় একটা হাই তুলতে তুলতে বলে)
-হু,যাবিতো।ফ্রেশ হয়ে চা-নাস্তা করবি তারপর বাগানে কিছক্ষন হাটাহাটি করে যাবি।
-দাড়া,আমি ঝটপট ফ্রেশ হয়ে আসছি।
-ঐ... রুমে চল।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর দুজনে একটানা অনেক্ষন ঘুমিয়েছে।সীমা ঋতুকে নিয়ে ড্রইং রুমে আসে।
-চায়ের কথা বলেছিস(ঋতু)
-হু।
ঠিক এসময়ে কলিংবেল বেজে ওঠে।সীমা দরজা খুলে দেয় তখন হাসিমুখে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে রিয়াদ।ভেতরে ঋতুকে দেখেসে হতচকিয়ে যায়।
-আরে তুই,আজকাল যে তোর কোন খোজই পাওয়া যায় না
-খুব ব্যস্ত ছিলাম।
রিয়াদ ঋতুর উল্টো দিকের সোফায় বসে বলে।রিয়াদকে দেখে ঋতু খানিকটা চমকায়,খুব আনইজি ফিল করে খারাপ লাগে।মনে মনে ভাবে 'যেখানে বাঘের ভয়,সেখানেই রাত হয়' সে উঠে দাড়ায়।
-সীমা,আমি একটু বাগানে যাচ্ছি।
-চা টা খেয়ে যা।
-এসে খাব।
-ঠিক আছে,দেরী করিস না।
ঋতু বাাগনে চলে যায়।
-কিরে ব্যাপার কি?(রিয়াদ)
-ব্যাপার আবার কি হবে,ঋতু কি নতুন আসে।
-তা নয়,ঋতুকে এসময় এখানে কল্পনাও করিনি।
-ক্লাস করতে ভালো-লাগছিল না।দুটো ক্লাস শেষে চলে আসি ঋতুও আমার সাথে চলে আসে।
-তার মানে সারাদিন ঋতু তোর এখানে?(অবাক হয়ে)
-হু (হেসে)
-ইশ,তুই আমাকে এখবর জানালিনা।
-জানালে কি হতো?
-আমিও চলে আসতাম।
-জ্বী না,আমি কখনোই তোকে এখবর জানাতাম না।
-আসলে তুই একটা হারামী।
-তুই একটু বস,ভেতর থেকে আসছি।(হেসে)
সীমা ভিতরে যেতেই রিয়াদ উঠে দাড়ায় জানালার পাশে এসে পর্দা সরিয়ে দেয়।এখান থেকে বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়।ঋতু বাগানের মাঝখানে ইউক্যালিপ্টাস গাছটান নীচে দাড়িয়ে আছে, তখনই ঋতু গাছটা হেলান দিয়ে দাড়ায়।
তার উদাস দৃষ্টি রিয়াদের বুকে মোচড় দিয়ে উঠে।অজস্র না বলা কথা এসে ভীড় করে,স্বপ্ন বলাকারা চোখের সামনে উড়াউড়ি করে।এমন দিনে তারে বলা যায়,যে কথা আজো বলা হয়নি।যে কথা রিয়াদকে স্বপ্ন ও জাগরনে ভালবাসার পরশ বুলিয়ে দেয়।
রিয়াদ বাগানের দিকে যেতে থাকে,তার হার্টিবিট দ্রুত বেড়ে যায়।সে মনে মনে ভাবে ঋতুকে আজ সব কিছু জানাবেই।
ঋতু হাটতে হাটতে বাগানের একবারে শেষ প্রান্তে চলে আসে।বেশ বড়পর্যায়ের একটা গোলাপী জবা ফুলের গাছের সামনে এসে দাড়ায় তার পাশেই খুব সুন্দর কালো গোলাপের ঝাড়।ঋতু মুগ্ধতায় ফুল দেখে হাত বাড়িয়ে একটা অাধফোটা গোলাপ তুলে নেয়।কারো আসার শব্দে ঋতু পিছনে ফিরে তাকায়।রিয়াদ সামনে এসে দাড়ায় উদাসীন চেহারা,মায়া ভরা চোখ।ঋতু ভিতরে চমকে যায়।রিয়াদ এখানে কেন?
-ঋতু! (রিয়াদ)
-........।   bangla book
bangla ebook
bengali story books
bengali books pdf
bangla book pdf
-ঋতু,তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
-না।(ঋতু নির্লিপ্ত গলায়)
-ঋতু!তোমাকে নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখেছি,এই পৃথিবীর সমস্ত গোলাপ আমি তোমার হাতে তোলে দিব,জনম জনম ভালবাসবো তোমাকে,বুকের মাঝে সারাজীবন আগলে রাখবো।
-দেখুন আপনি আমাকে বেশী বিরক্ত করছেন,আমি আপনাকে ভালবাসি না।
রিয়াদ উদভ্রানতের মতো হয়ে যায়,আচমকা ঋতুর দুহাত চেপে ধরে,
-তাহলে.....তাহলে আমি মরে যাবো ঋতু।
ঋতু আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না।তার মেজাজ অসম্ভব খারাপ হয়ে যায়,রাগে সমস্ত শরীর থরথর করে কাপতে থাকে।সে প্রচন্ড জোরে রিয়াদের গালে ঠাস করে চর বসিয়ে দেয়।চিৎকার করে বলে,
- মরগে গিয়ে!
ঋতু কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা দেয়।রিয়াদের সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠে,পায়ের নীচে মাটি সরে যায়।শরীর ঘামে ভিজে জবজব।বাগান,ঋতু,গাছপালা সবকিছু কেমন ঝাপ্সা লাগে।সে একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়।এমন একটা ভয়ংকর কান্ড সে স্বপ্নেও ভাবে নি।নিজেকে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মনে হয়।নিজের উপর রাগে,ঘৃনায় লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হয়,মনে হয় সে একটা ব্ল্যাকহোলের ভিতর তলিয়ে যাচ্ছে।পরাজিত সৈনিকের মতো রিয়াদ দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।
সীমা ভিতরে এসে দেখে ঋতু মাথায় হাত চেপে বসে আছে।মুখ থমথম,রিয়াদ নেই।
-কি ব্যাপার ঋতু,বসিয়ে গেলাম রিয়াদকে এখন দেখছি তুই বসে আছিস,রিয়াদ কোথায়?
-আই ডোন্ট নো!এখন আমি যাবো সীমা।
-যাবি মানে?আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না ঋতু।
-আপা!আপা.....(সোমা)
ছাদের উপর দাড়িয়ে ছিলো সোমা,ওখান থেকে সমস্ত ঘটনাই সে দেখেছে।সে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে আসে,দরজার সামনে এসে সীমাকে ডাকে।কিন্তু সীমা, সোমার কথা শুনে না।সে ঋতুর হাত চেপে ধরে,
-ঋতু,আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।
-প্লিজ সীমা,আমি তোর সাথে পরে আলাপ করবো।ঋতু তার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে হাটা দেয়।
-দেখ, ঋতু ভাল হচ্ছে না কিন্তু।
সীমা ঋতুর পিছন পিছন আসে।ঋতুর কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই সে সোজা বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।
,
রিয়াদ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।রিয়াদের কেবলই মনে হচ্ছে মানুস এতটা নির্মম,নিষ্ঠুর,পাষন্ড হয় কি করে।কি করে ঋতু তাকে এমন অপমানটা করতে পারলো।ঘুরেফিরে বারবার শুধু সেই সবই মনে আসছে।নিজেকে এতটা অসহায় আর কখনো লাগে নি।সে বাইক চালাচ্ছিল,হাই স্পীডে।মাথায় এলোমেলো হাজারো চিন্তা মিটার কাটার দিকে খেয়াল নেই,খেয়াল অন্যকোন দিকে।গতি ক্রমাগত বাড়ছে হঠাৎ সামনে একটা রিকসা আচমকা এসে পড়ে,সে হার্ড ব্রেক করে।তারপর আর কিছু মনে নেই কার।শুধু রিকসাটার কথাই তার মনে থাকে,রিকসাটা তার খুব সামনে এসে পড়েছিল।
জহির অফিস থেকে ফিরছিলো, আজ একটু তারাতারিই অবশ্য অফিসে আজ তেমন একটা কাজ নেই।অনেকদিন লুবনাকে নিয়ে ঘোরা হয়নি,আজ লুরাকে নিয়ে ঘুরতে খুব ইচ্ছে করছে লুবনা যে কি খুশি হবে।কাজ আর কাজ কত কাজ করা যায়?কোথাও বেরুবার একটু ফুসরত নেই, মাঝে মাঝে খুব বোর লাগে।ইচ্ছে করে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দুরে কোথাও চলে যায়।মনে মরে ঠিক করে আজ লুবনাকে অনেককিছু কিনে দিবে।
হঠাৎ দূর থেকেই জহির সামনে একা জটলা দেখতে পায়।অনেক মানুষের ছোটাছুটি চিৎকার, হৈ চৈ।সামনের গাড়িগুলো পাশ কেটে চলে যাচ্ছে,আজকাল কেও আর ঝামেলায় যেতে চায় না সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যাস্ত।জহিরের গাড়ি কাছাকাছি যেতেই,কয়েকজন খুব তড়িগড়ি হাত উঠায়।জহির অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি থামিয়ে নেমে আসে।রাস্তার পাশে অচেতন,রক্তাক্ত অবস্থায় পরে আছে একজন।অদূরে বাইক উল্টে পড়ে আছে এখনো চাকা ঘুরছে।যুবকের চেহারা দেখে সাৎকরে ওঠে বুকের ভিতর।কেমন চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছে।হঠাৎ করেই মরে পড়ে, চাইনিজ রেষ্টুরেন্টের সেই ছেলেটা।সবাই হাসপাতালে নিয়ে যেতে অনুরোধ করছে।জহির দ্রুত পেছনের দরজা খুলে দেয়,কয়েকজন ধরাধরি করে গাড়িতে ওঠায়।পাজামা-পাঞ্জাবি পড়া একলোক যার কাপড়ের বেশীর ভাগই রক্তে ভিজা জহির তাকে সাথে নিয়ে দ্রুত গাড়ি ছেড়ে দেয়।
,
শুক্রবার,অফিস বন্ধ।তাই সকালের নাস্তাটা একসাথে করতে বসেছে।অবশ্য মা আসেন নি, তিনি পরে নাস্তা করবেন।এই দুদিন জহির রিয়াদের কোন খবর নিতে পারে নি, অবশ্য মেডিকেলে ভর্তি করানোর পর এক্র দেখে এসেছে।খোজ খবর নিয়ে এসেছে এবং তখন গিয়েই জানতে পেরেছে ওখান থেকে রিয়াদকে ঐদিন-ই একটা প্রাইভেট মেডেকেলে নেয়া হবে।ঠিকানা জানা আছ কিন্তু যাওয়া হয়নি।এক্সিডেন্টের দিন জহিরকে অনেক ছুটাছুটি করতে হয়েছে।সেই হসপিটালকে ফোন করে রিয়াদের বাসায় খবরটা জানায়,সেদিন বাসায় ফিরতে তার অনেক রাত হয়েছিলো।
নাস্তার টেবিলে হঠাৎ করেই জহিরের রিয়াদের কথা মনে পড়ে।ঋতুদের এ খবরটা জানানো হয়নি।ভুলে গিয়েছিল এতক্ষনে জানানো দরকার,জহির বসেছে সবার মধ্যখানে একপাশে ঋতু অন্যপাশে লুবনা।
-ঋতু,রিয়াদের এক্সিডেন্টের খবরটা জানিস নাকি।(জহির)
-কি! (ঋতু চমকে গিয়ে)
-রিয়াদ যে বাইক এক্সিডেন্ট করেছে।
-কখন?
-গত পরশুদিন বিকালে।
ঋতু খাবার কথা ভুলে যায়।তার মনে রিয়াদের এক্সিডেন্টের কথা ঘুরতে থাকে।পরশুদিন বিকেলে, তার মানে সীমাদের বাসা থেকে বেরুবার পর।ঋতুর কেন যেন মনে হয়,ঐদিন বিকালের ঘটনার সাথে এই এক্সিডেন্টের কোথাও যোগসূত্র আছে।ঋতুর হিসাব মিলে যায়,কেননা সে রিয়াদকে মরতে বলেছিল।
-তুমি আমাদের আগে জানাওনি কেন?(লুবনা)
-এত ব্যস্ত ছিলাম যে, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
-এই খবর তুমি জানো কি করে!(ঋতু ফ্যাকাশে গলায়)
-আরে আমিইতো সবকিছু করলাম।অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় দেখি এক্সিডেন্ট।ওখান থেকে তুলে হসপিটাল নিয়ে যাই,মানিব্যাগ থেকে ঠিকানা নিয়ে বাসায় খবর দেই।
-তার অবস্থা এখন কেমন? (লুবনা হাসি মুখে)
-ওই সময় খারাপ ছিলো।মাথায়,হাতে অনেকগুলো ষ্টিচ লেগেছে।
ঋতু প্রায় কিছুই না খেয়ে ওঠে আসে।তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।ঋতুর খারাপ লাগছে খুব খারাপ, কি করবে সে বুঝতে পারে না।অপরাধবোধ তার চারপাশে ছেয়ে আসে,রিয়াদ কি ইচ্ছাকৃত এক্সিডেন্ট করেছে।চড়টা মারার পর তার চেহারাটা কিযে অসহায়, করুন লাগছিলো।ঋতু তা কখনোই ভুলতে পারবে না কিন্তু এমনটা সে চায়নি।রিয়াদ তার হাত ধরার পর ঋতুর মাথা ঠিক রাখতে পারে নি,রাগে কি থেকে যে কি হয়ে যায়।ঋতু একটু পর সীমাকে ফোন করে।
-হ্যালো।(ঋতু)
-হু,বল।(সীমা)
-কি করছিস?
-কিছুই না।
-ইয়ে সীমা,রিয়াদ নাকি এক্সিডেন্ট করেছে(আমতা আমতা করে)
-তুই নিশ্চয় খুশি হয়েছিস!
-কেন?আমি খুশি হবো কেন?
-ন্যাকা সাজতে হবে না,তোর খুশি হবার অনেক কারন আছে।
-কি রকম?
-আমি সে দিনের ঘটনা সব শুনেছি।
-কি শুনেছিস?
-তুই রিয়াদকে চড় মেরেছিস।
-চড় মারার সাথে এক্সিডেন্টের সম্পর্ক কি?
-আছে হয়তো কিংবা নেই,কিন্তু চড়তো মেরছিস?
-সে আমার হাত ধরেছিল।
-নিশ্চয় তোকে রেপ্ করতে নয়।(সীমা কঠিন গলায়)
-সীমা!তুই আমার সাথে এতখারাপ ব্যবহার করতে পারলই?(চিৎকার করে)
-হু পারলাম, আমি চেস্টা করছি তোকে আরো কঠিন ভাষা শোনাতে।কিন্তু পারছি না,কারন আমার খারাপ ভাষার ষ্টক খুব সীমিত।
-তোর সাথে আরে আমি কোনদিন কথা বলব না,কোনদিন না(কেদে ফেলে)
-নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারনা থাকা ভাল।কিন্তু সেই রকম উচ্চ না,যাতে বাতাস লেগে ভেঙ্গে গুড়িয়ে যায়।নিজেকে তুই কি মনে করিস,তুই নিশ্চয়ই প্রিন্সেস অব ওয়েলস্ না।এরকম ভেবে থাকলে সেটা তোর নিজের কাছে,আমাদের কাছে তুই একজন ঋতু।সীমা ফোন কেটে দেয়।
,
ঋতু শুয়ে আছে।রাত এগার'টার মত বাজে।তার মাথায় রিয়াদের এক্সিডেন্ট আর সীমার অসম্ভব দু্র্ব্যবহারেরর কথা ভাবছে।সবকিছু মিলিয়ে তার অসম্ভব মন খারাপ।কিছু ভালো লাগছেনা,আজ সে অনেক্ষন কেঁদেছে।তার রুমের দরজা খোলা,পর্দা সরিয়ে লুবনা আসে।
-ঋতু,ঘুমিয়ে পড়েছো।
-না ভাবী,এসো।কিছু বলবে?
-একটু আগে সীমার সাথে কথা হয়েছে,সীমা ফোন করছিল।
-...........।
-আমি সীমার কাছ থেকে সব শুনেছি।তোমার বাড়াবাড়ি হয়েছে ঠিকই। যাই হোক,তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য সীমা লজ্জিত।
ও..ভালো কথা,আজ রিয়াদকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে।আমি তার মোবাইল নাম্বার সীমার কাছ থেকে এনেছি এটা রাখলাম।
ভাবী নাম্বার লেখা কাগজ ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে বেরিয়ে যায়।
,
মায়াবী চাঁদ,চাঁদের রুপালী আলোয় ডুবে আছে সমস্ত ঝাউবন।আলো লেগে চিকচিক করছে বালি,দূরে সমুদ্র।সমুদ্রের বুকে ছুয়ে হিমেল বাতাস এসে লুটিয়ে পড়ে।হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে ঋতুর রেশমি খোলা চুল। লুটুপটি খায় তার শাড়ির আঁচল তার পড়নে খুব সুন্দর শাড়ি, খালি পা। তাকে খুব সুন্দর লাগে এই অসম্ভব রুপবতী মেয়েটিকে রিয়াদের মানুষ বলে বিশ্বাস হয় না।তনে হয় সে এই পৃথিবীর কেও না, মনে হঢ সে পরী।তার হাত ছেড়ে দিলেই সে হাওয়ায় পাখনা মেলে উড়ে চলে যাবে দূর আকাশে অনেক দূরে।রিয়াদ ঋতুর একটি হাত ধরে আছে।
-ইশ, আর হাটতে পারছি না।(ঋতু)
-কি হয়েছে ঋতু!(রিয়াদ)
-আমার পা খুব ব্যাথা করছে।
-তাই নাকি
-হু
-তাহলে এসো তোমাকে কোলে নেই।
-যাহ্,আমার লজ্জা করবে।(হেসে)
-আসলে তুমি আমাকে ভালবাস না।(অভিমানি কন্ঠে)
-কেন?একথা বললে কেন?(বিস্মিত হয়ে)
-আমি জানি না ঋতু।মাঝে মাঝে মনে হয় তখন আমার খুব কষ্ট হয়, ইচ্ছে হয় তোমার কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যাই।
-আমাকে ছেড়ে কোথায় যাবে শুনি!
-তুমি দেখো, যদি আমাকে কষ্ট দাও তাহলে সত্যি সত্যি আমি দূরে কোথাও চলে যাব,আর কখনো আসবো না।
-আহা,যাবেটা কোথায়? (মুচকি হেসে)
-ওই যে অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখছো ওই খানে।
-ওই খানে?
-হু,
-কিভাবে যাবে?
-উড়ে উড়ে।
-ওমা,তুমি উড়তে জানো নাকি!
-হু,
-সত্যি বলছো?
-সত্যি!
-ওখানে কি আছে?
-কিছুই নেই।শুধু একটা নদী আছে স্বচ্ছ নীল পানি আর সুনীল আকাশ।
-ওখানে তুমি কি করো?
-কখনো পাখি হয়ে উড়ি,কখনো মেঘ হয়ে ভাসি।মন ভালো না থাকলে নদীর সাথে কথা বলি।
-আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাবে,পূর্ণিমারাতে দুজনে ঐ চিরল নদীতে সাতার কাটবো।
-সত্যি, তুমি যাবে?
-হু।
ঠিক তখনই রিয়াদের চোখে পড়ে তাদের কাছথেকে কিছু দূরে কয়েকজন অশ্বরোহী।কালো আলখেল্লায় তাদের শরীর ঢাকা,হাতে চাবুক।রিয়াদ ভয়ংকরভাবে ভয় পেয়ে যায়,সে ঋতুর হাত ধরে টেনেনে দ্রুত ছুটতে থাকে।ঋতু রিয়াদের একরমটা দেখে অবাক হয়ে বলে,
-কি ব্যাপার!তুমি এমন করছ কেন?
রিয়াদ একটা হাত তুলে ঋতুকে দেখিয়ে বলে,
-ওই দেখো ঋতু,ওরা আমাকে মারতে আসছে।
-ওরা তোমাকে মারতে আসছে কেন?(ভয় পাওয়া গলায়)
-আমি কিছু জানি না।আমি লক্ষ করেছি যখনই তোমার সাথে কথা বলি তখনই ওরা আসে,একদিন ওরা আমাকে মেরে কি অবস্থা করেছে দেখো।রিয়াদ তার শার্ট খুলে ঋতুকে দেখায়,তার ফর্সা পিঠে চাবুকের কালোদাগ দেখে ঋতু আৎকে উঠে।
-ঋতু তুমি তাদেরকে নিয়ে আসো কেন?
-বিশ্বাস করো রিয়াদ, আমি তাদেরকে নিয়ে আসিনি আমি তাদেরকে চিনি না।
-তুমি মিথ্যেবাদী, তোমার কথা আমি বিশ্বাস করি না।
-প্লিজ রিয়াদ প্লিজ!আমি মিথ্যা বলছি না,আমি কখনই মিথ্যা বলি না।(কাতর কন্ঠে)
-তোমার কথা বিশ্বাস করি না,আমি আর কখনো তোমার কাছে আসবো না।রিয়াদ ঋতুকে ছেড়ে দৌড়াতে থাকে।
-না...রিয়াদ..না(চিৎকার করে)
অশ্বরোহীরা রিয়াদের কাছে চলে আসে।রিয়াদ উড়ার চেস্টা করে কিন্তু সে পারে না তার রিয়াদকে ধরে ফেলে।
চিৎকার করে উঠে ঋতু,তার ঘুমটা ভেঙ্গে যায় সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে।কি এক কষ্টে বুক ফেটে যায়,সে হো হো করে কাঁদতে থাকে।
,
রাত দু,টা,
রিয়াদের ঘুম আসছেনা,অবশ্য কিছুক্ষন আগে তার ঘুম ভেঙ্গেছে।রাত একটার দিকে রিয়াদকে ঘুম থেকে তুলে ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়,ঔষধ খায়ানো হয়।তারপর থেকেই তার ঘুম আসছে না।পাশের রুমে একজন নার্স আছে,ফ্রিজিয়াম খাওয়া যেতে পারে সে টেপ টিপলেই নার্স এ রুমে আসবে।কিন্তু নার্সকে ডাকতে তার ইচ্ছে করছে না অথচ ঘুমটা তার জন্য জরুরী।ডাক্তার বলেছেন,রেষ্ট এবং ঘুম তাকে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করবে।
হসপিটাল থেকে সে আজই বাসায় এসেছে,একে আসা বলা যায় না নিয়ে এসেছে।রিয়াদের মা হাফিজা খাতুন হসপিটালের পরিবেশ,গন্ধ একদম সহ্য করতে পারেন না তাই তিনি রিয়াদের অবস্থা একটু উন্নতি হদেই বাসায় নিয় এসেছেন।রিয়াদের রুমটা চমৎকার ফুলে ফুলে সাজানো।মিনি হসপিটাল বলা যেতে পারে তার জন্য সার্বক্ষনিক নার্স,ডাক্তার।রিয়াদের হাতে মাথায় কয়েকটা ষ্টিচ, এছাড়া শরীরের অন্য কোথাও তেমন কোন কাটা ছেড়া নেই।প্রচুর রক্তক্ষরন হয়েছে তবে ভয়ের কোন কারন নেই।সে মনে মনে একপাল মেষ গুনে ঘুমুতে চেস্টা করে।ঠিক এ সময়ে ফোন বেজে উঠে।সে চিন্তা করে এতরাতে কার ফোন।বাবাতো দুপুরের দিকে সিঙ্গাপুর থেকে কল করেছেন।তাহলে, মোবাইল উঠিয়ে দেখে অপরিচি নাম্বার ধরবে না ভেবেও ধরে ফেলে।
-হ্যালো,রিয়াদ বলছি।
-আপনি...আপনি কেমন আছেন?(নারী কন্ঠ)
-আপনি কে?
-আমি... কেউনা,কেউনা।
-খেয়ালী করছেন কেন!রাত-দুপুরে কল করেছেন অথচ বলছেন কেউনা।
-মানে আমি....
-দেখুন আমি খুব অসুস্থ।
-আমি তা জানি,
-তাহলে ভনিতা করছেন কেন,পরিচয় দিন নতুবা আমি কিন্তু রেখে দিবো।
-রাখবেন না,প্লিজ!
-আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
-আমার সমস্যা...
-দেখুন রাত জেগে অপরিচিত কারো সমস্যা শুনতে মোটেও আমি ইচ্ছুক নই।
-একবার শুনুন প্লিজ(কাতর কন্ঠে)
-আপনার কি খুব সমস্যা(নরম গলায়)
-হু,
-তাহলে এক কাজ করতে পারেন।আমার এক বন্ধু আছে মাসুম,ঠিকানা দিচ্ছি।আমার রেফারেন্সে তাকে আপনার সব কথা বলতে পারেন।সে আপনাকে হেল্প করতে পারবে।
-না..না...তা নয়,আমার সমস্যা হচ্ছে আমি ঋতু।
রিয়াদের আপাদ মস্তক কেপে উঠে।কিছুক্ষন স্তব্দ হয়ে থাকে মুখ দিয়ে কথা বের হয় না,তারর পার্লস রেট বেড়ে যায়।ঋতুর গলার স্বরটা প্রথম থেকেই চেনা চেনা লাগছিলো কিন্তু কিছুতেই মিলাতে পারছিল না,ঋতুর কথাতো সে কল্পনাও করতে পারে নি।
রিয়াদ মনে মনে বলে, ওহে ঋতু আমাকে আর কত কষ্ট দিবে।আমিতো আমার মন থেকে তোমার ছবি মুছে ফেলতে চাই,মরতে চেয়েছিলাম।তবে আর কেন তুমি আমার সামনে আস।এখনতো তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই,এই মুহুর্তে তোমার সাথে আমি কথা বলতে প্রস্তুতও নই।
-রিয়াদ..শোন!
-কি বলতে চাও।
-আমি খুব আপসেট।রিয়েলী,বুঝতে চেস্টা করো।(নরম গলায়)
-ও...বুঝেছি।
-কি?
-আমাকে করুনা দেখাতে চাও?তুমি জেনে রাখো ঋতু, আমি কারো করুনা চাই না কারো দয়া বা করুনা আমি আজন্ম ঘৃনা করি।
-না রিয়াদ,আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই।
-তুমি ক্ষমা চাইবার মতো কিছু করনি,তুমি যা করেছ ঠিকই করেছো।আমমিই সীমালংঘন করেছিলাম।
-প্লিজ রিয়াদ!নিজেকে আমার খুব অপরাধী ঠেকছে,তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারো না।
-তোমার অপরাধ বোধের কারনতো দেখছিনা।
-এই বাজে ব্যাপারটার জন্য আমি খুব লজ্জিত,আমি তা ভুলে যেতে চাই।
-তোমার জন্য প্লাস পয়েন্ট আছে।তোমার বড় ভাই জহির,জহির ভাই আমার জন্য অনেক করেছেন আমি কার কাছে কৃতজ্ঞ।
-প্লিজ..প্লিজ,আমি ওভাবে ভাবতে চাইনা।(ঋতু কেদে দেয়)
-তোমার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই,এই পৃথিবীর কারো প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই।দুঃখিত,আমি আর কথা বলতে পারছি না।
রিয়াদ ফোন রেখে দেয়।সাথে সাথেই রিয়াদের বুকের ভিতর কষ্টের দলা পাকিয়ে যায়।অসম্ভব মন খারাপ হয়ে যায়।সে সব সময় চেয়েছে ঋতু তার প্রতি কিছটা সহৃদয় হোক,ঋতু তা হয়নি।বরং বিনিময়ে ঋতুর কাছ থেকে সে পেয়েছে প্রচন্ড অবজ্ঞা আর দীর্ঘ অবহেলা।আর যখন ঋতু তার দিকে আদ্রতার হাত বাড়ালো, তখন রিয়াদ অনেক অনেক দূরের মানুষ।ঋতুর অসম্ভব দুর্ব্যবহার ও দীর্ঘ অবহেলা রিয়াদের ভেতর তৈরী করেছে প্রচন্ড ঘৃনা ও অভিমানের সুকঠিন দেয়াল।যে ছিল তার ধ্যান,জ্ঞান,স্বপ্ন,সাধনা তাকেই সে কি চরমভাবে অবজ্ঞা করলো।তার চিৎকার করে কাদঁতে ইচ্ছে হয়,চোখ ভরে জল আসে।নার্স মেয়েটি রুমে পমঢুকে কিছু বলতে গিয়ে লক্ষ্য করে রিয়াদের চোখে জল, সে কিছু না বলে ফিরে আসে।
কয়েকমাস পরের কথা,
শীতের সময় যায় যায় করেও যাচ্ছে না।আকাশ ঝক ঝকে তক তকে পরিষ্কার কয়েকখন্ড তুলোতে মেঘ টুপ করে ঝুলে আছে।সোনালী রৌদ্র চারপাশে ছড়িয়ে আছে।এক ঝাক সাদা বক মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় দূরে - বহুদূরে।বারোটার মত।বাজে, সাগরের জল অনেকটাই শান্ত অর্থাৎ তেমন ঢেউ নেই।
ডিঙি নৌকায় ওরা সাতজন তরুন-তরুনী মানে রিয়াদ, অপু,সীমা,রিমন,ইমন,শাম্মী এবং ঋতু।
নৌকা থেকে পঁচিশ-ত্রিশ গজ দূরে সুন্দর একটা দ্বীপ। জায়গাটা সিলেক্ট করেছে রিমন এবং সে এই ভ্রমনের নাম দিয়েছে, 'জার্নি টু দ্যা গ্রীন আইল্যান্ড'।জায়গাটা বঙ্গোপসাগরেরর কিছুটা গভীরে সুন্দর ডিম্বাকৃতির চারপাশে সাগরের পানি।অজস্র নারকেল গাছ মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে মাঝে মধ্যে অন্যসব গাছগাছালী।মূল আকর্ষন চারপাশে ঘেরা সবুজ গাছ মাঝেমধ্যে নীল সচ্ছ পানির ডুবা।
জায়গাটার প্রথমেই পড়ে জেলে পাড়া সব মিলে বিশ-পঁচিশটা ঘর।সমুদ্রের তীর ঘেসে বাঁশ দিয়ে তৈরী কয়েকটা শুটকির মাচা।রোদে শুকাতে দেওয়া শুটকি, ওহ্ ফাইন।
-একেবারে যে মালদ্বীপ নিয়ে এলিরে।(শাম্মী উৎফুল্ল গলায়)
-আমিতো তোকে স্বর্গে নিয়ে যেতে চাই,তুই তো বুঝিস না।(রিমন)
রিমনের কথায় শাম্মী কৃত্রিম রাগের ভান করে মারতে আসে,সবাই হেসে ওঠে।
-সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে,
দারুচিনি দ্বীপের ভেতর......(সীমা সুর করে কবিতা পড়ে)
-আরে সবুজ ঘাস কোথায় পেলি,বল 'যখন সে চোখে দেখে শুটকির মাচা'(অপু হেসে)
-মাঝি ভাই,আপনি আমাদের সামনে নামিয়ে দেন।তারপর নৌকা নিয়ে চলে যান একেবারে শেষ মাথায়।আমাদের মালপত্র ও সব নৌকাতেই থাকবে।(রিয়াদ)
নৌকা থেকে নামতেই একদল ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে তাদের দিকে দৌড়ে আসে।কি এক অপার বিস্ময়ে এই পৃথিবীর সুখী মানুষদের দেখে।এরকম সুখী মানুষদের বছরে দু'তিনবার তাদের দেখা মিলে,এটা তাদের মনে থাকে।চোখে মুখে মুগ্ধতা নিয়ে তাদের দিকে তাকায়,মনে আনন্দ।কারন এসবদিনে সাহেবদের অনেক বেঁচে যাওয়া খাবার তাদের অভাবী আগ্যে মিলে।বিনিময়ে অনেকসময় এটা সেটা করে দিতে হয়।নৌকা থেকে একটু দূর যেতেই মাচা থেকে শুটকির পচা গন্ধ আসে।
-মাই গড!এ কিসের গন্ধ (সীমা)
-আহ্ কি মধুর গন্ধ ভুলা যায় না।(শাম্মী)
সবাই হেসে ফেলে,ওরা বাড়ি ঘরের কাছে এসে পড়ে।অতি উৎসাহী মেয়েরা আড়াল থেকে তাদের দেখে,বৌয়েরা লম্বা ঘোমটা টেনে দেয়।তরুনী মেয়েরা বেড়ার ফাকে চোখ রেখে তাদের দেখে।বৃদ্ধ কয়েকজন ছাড়া পুরুষদের চোখে পড়ে না।কেউ কেউ তারা জাল ঠিক করছে তাদের হাতে হুক্কা, যুবক পুরুষরা সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছে তাই তাদের দেখা নেই।
রিয়াদরা দক্ষিন দিকে হাটতে থাকে।বাড়ি ঘর শেষ হয়ে গেছে,গাছ গাছালীর মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা।সবার আগের রিমন পিছনে অন্যরা।তাদের পিছনে আসে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের দলটা সাত-আটজন হবে।
-কিরে এই পিচ্ছিরা আসছে কেন?ওদের ভাগা তো।(অপু)
-এই যে খোকা-খুকুরা তোমরা আমাদের সাথে আসবে না।আমরা কিন্তু লোক সুবিধারনা,আমরা বাচ্চাদের ধরে নিয়ে শহরে বিক্রি করে দেই।(ইমন)
দলটা দাড়িয়ে পড়ে।কয়েকজন যারা বিশ্বাস করে বিস্মিত চোখে তাকয়,কয়েকজন যারা বিশ্বাস করে না তারা দাঁত বের করে হেসে ফেলে।ইমনরা হাটতে শুরু করলে আবার তাদের পিছু নেয়।
-আরে এ যে দেখছি আরেক সমস্যা কি করা যায় বলতো?(ইমন)
-এমনিতে হবে না ধমক-ধামক দিতে হবে।(অপু)
ইমন তাই করে হঠাৎ ঘুরে লাফ দিয়ে, সামনের রোগামত ছেলের হাত ধরে ফেলে ঠাস করে ছেলেটির গালে চড় বসিয়ে দেয়।ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে সে যতটা না পেয়েছে কষ্ট,তার চেয়ে বেশী পেয়েছে ভয়।সঙ্গীরা ভয়ে আতঙ্কে দৌড় দেয়।রিয়াদ চিৎকার শুনে ঘুরে দাড়ায়।এই দৃশ্য দেখে সে হতবাক,এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির হাত ধরে ভয়ে ছেলেটি থরথর করে কাপছে,চোখ ভরা জল রিমনদের দলটা দাড়িয়ে পড়ে, কি হয়েছে বুঝতে চেষ্টা করে।
-একি করছিস ইমন!কাজটা তুই ভাল করিস নি। (রিয়াদ)
-এত করে বলছি তবুও কথা শুনছেনা,পিছু পিছু আসে।
-পিছু আসলে ক্ষতিটা কি?
-........!
ছেলেটির সঙ্গীরা কিছুদূর গিয়ে দাড়িয়ে পড়ে ভয় মেশানো চোখে তার সঙ্গীর অবস্থা দেখে।রিয়াদ তাদের উদ্দেশ্য করে ডাকে কিন্তু ওরা আসে না।ওরা রিয়াদদের বিশ্বাস করবে কিনা দ্বিধায় পড়ে যায়।
-তোমরা কতজন?(রিয়াদ)
ছেলেটি কথা বলে না, অপু গুনে বলে আটজন।রিয়াদ পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে ছেলেটির হাতে দিয়ে বলে, সবাইকে দশ টাকা করে দিয়ে বাকি টাকাটা তুমি নিয়ে যেও।ছেলেটি টাকা পাবার আনন্দে সব ভুলে টাকা নিয়ে সঙ্গীদের দিকে দৌড় দেয়।
,
গাছ গাছালী যেখানটায় শেষ হয়েছে শেষ প্রান্তে এসে ওরা থামে।তারপর আর কোনো গাছপালা নেই।ওখান থেকে সমুদ্র শুরু হয়েছে অনেকটাই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মত দেখতে।রিয়াদরা একটা বড় গাছের নিচে দাড়ায়।ওদের ওখানে রেখে অপু আর রিমন নৌকা থেকে মালামাল গুলো নিয়ে আসে,হাছের ছায়ায় দুটো পাটি বিছিয়ে দেয়।জুতো খুলে সবাই গোল হয়ে বসে। শাম্মী,সীমার মাঝখানে ঋতু বসেছে, রিয়াদ উল্টো দিকে।রিয়াদ,অপু,রিমন,ইমনের পড়নে পাজামা-পাঞ্জাবী আর সীমা,শাম্মী এবং ঋতুর পড়নে শাড়ী।তারা আগে থেকেই ঠিক করে এসেছে ছেলেরা পড়বে পাঞ্জবী আর মেয়েরা শাড়ী।
-রিমন,আমাকে এক্ষুনি চা খেতে হবে।(সীমা)
-এটা কোন সমস্যাই না।
রিমন মাঝি ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলে,
এই তুমি,এ ব্যাগটা এখানে রেখে নৌকায় যাও।একটা চায়ের ফ্লাস্ক আছে আর চায়ের কাপ আছে নিয়ে আসে।ছেলটি চলে যায়।
-মেয়েরা তোমাদের জন্য উন্নত কোন বাথরুমের ব্যবস্থা করা গেল না।তোমাদের যদি বাথরুম পায় তাহলে ঐ জংলার দিকে যেতে পারো।(রিমন)
-দেখ রিমন আজে বাজে কথা বললে একদম ভালো হবে না।(শাম্মী হেসে)
-রিমন তুই ঠিক বলেছিস,সীমা তোর যদি বাথরুম সমস্যা হয় আমাকে বলিস।আমি তোকে কোলে করে গাছে তুলে দেব।(অপু)
সবাই হেসে ওঠে,ঋতু লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।সীমার কাছে রাখা একটা পলিথিন ব্যাগ ভর্তি ফল।সে একটা আপেল তুলে নিয়ে অপুর উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারে,অপু তা শুন্যে ধরে ফেলে নির্ভিকার মনে খেতে থাকে। তা দেখে সবাই আরো জোরে হচসতে থাকে,ঋতুও মুখটিপে হাসে।সীমা আর অপুর চোখাচোখি হয় বুঝাই যায় তাদের ভিতরে অস্তিত্বটা সম্ভবত খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
-সীমার জন্য তুমি এত কিছু করবে!সীমা তোমার কে হয় অপু?
-কে আবার,স্বপ্নকুমার দেখলে না সীমা কাউকে না দিয়ে আমাকে আপেল দিল।সে সুর তুলে গান গায়,
সীমা যে কে আমার,
তুমি তা বুঝে নাও.....!
সবাই হাসতে হাসতে হাত তালি দেয়।
-ঠিখ আছে,সময় আসুক আমি তখন বুঝাবো মজা।(সীমা)
-কি ব্যাপার ঋতু,তুমি কথা বলছো না যে আনইজি ফিল করছো নাকি।(রিমন)
-না...না, আমি ঠিক আছি তোমরা কথা বলো(ঋতু)
-হ্যা,আমরা তো কথা বলছি। তুমিও বলো।
-ইয়ে ঋতু,আমরা কিন্তু সবাই বন্ধু।অনেক সময় ফান করে অনেক কিছু বলে ফেলি,তুমি কিন্তু কিছু মনে করো না(অপু)
-না,আমি কিছু মনে করি না(লজ্জা রাঙা হয়ে)
-তোরা কি শুরু করলি বলতো!ঋতু কিছু মনে করবে কেন।শুধু ঋতুকে উদ্দেশ্য করেই তো কেউ টিজ করছে না আর কেও ফান করলেও ঋতু কিছু মনে করবে না।সবাই আমরা এখানে এসেছি আন্দের জন্য।(সীমা)
-অবশ্যই,আরে ইমন তুমি এমন অফ হয়ে আছো যে।(শাম্মী)
-শুধুই অফ না।সীমা নিজের গাল ফুলিয়ে বলে,গাল ফুলিয়ে যে বসে আছিস।
-ধ্যাৎ, গাল ফুলাবো কেন(ইমন হেসে)
-এখন কথা হলো আমরা এখানে কি করবো, ঘুরাফেরা করবো নাকি এভাবেই সময় নষ্ট করব (শাম্মী)
-তার আগে আমাকে কিছু খেতে হবে,হালকা কিছু খাওয়া যাক।(ইমন)
একটু আগে ওরা হাটতে বের হয়েছে,সবাই নয়।শাম্মী,ঋতু,সীমা,রিমন আর ইমন।রিয়াদ অপু থেকে গেছে।ইমন,ঋতু,সীমা ওরা সামনে পিছনে রিমন, শাম্মী।ঋতুর হাতে আপেল সে খেতে খেতে কথা বলছে।
-জায়গাটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে,সত্যি এক্সিলেন্ট।(ঋতু)
-তাই, (সীমা)
-হু,একবারে ছবির মতো স্বপ্ন দ্বীপ।
-আমারও খুব পছন্দ হয়েছে।
-আমার কিন্তু মনেই হয়নি বাংলাদেশে এত সুন্দর একটা আইল্যান্ড আছে।(ইমন)
-আমারও, এটার সম্পর্কে আগে জানতাম নাতো।
-আরে তেমন কেউই জানে না।আমরা তো এডভ্যাঞ্চার প্রিয় তাই আগে একবার এসেছিলাম আর একারনেইতো আমরা তোদের নিয়ে আসলাম।(ইমন)
আস্তে আস্তে শাম্মী, রিমন দল থেকে পিছিয়ে পড়ে ওরা পথ বদলায়।ঋতুদের সাথে না গিয়ে পশ্চিমে একটু দূরে যেতেই পথ শেষ হয়ে যায়,সামনে ফাকা।রিমন গাছের নিচে দাড়ায়,শাম্মী একটা বুনোগাছের হেলান দিয়ে দাড়ায়।তাদের ঠিক সামনে থেকে জায়গাটা ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে।নিচে একটা সচ্ছপানির ডোবা,কয়েকটা বক দাড়িয়ে আছে।শাম্মীর খুব ভাল লাগছে,রিমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে শাম্মীর দিকে তাকিয়ে আছে।
-কিরে রিমন,তোর কেমন লাগছে?
-ভালো লাগছে না!
-কেন? (অবাক হয়ে)
-আমার অন্যরকম ইচ্ছে করছে,
-কি রকম?
-তোকে কিস করতে খুব ইচ্ছে করছে।
-সে সাহস তোর হবে না(হেসে)
রিমন একমুহুর্ত দেরী না করে খুব দ্রুত শাম্মী কিছু বুঝার আগেই শাম্মীর গালে চুমু খায়।শাম্মী চমকে ফ্যালফ্যাল চোখে রিমনের দিকে তাকিয় থাকে,ঘটনার আকস্মিকতায় শাম্মী হতবাক মুখ দিয়ে কথা বের হয় না।একটু পর বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সে বলে
-আরে..সত্যি সত্যি তুই...(আর কিছু বলতে পারে না)
-না মানে ইয়ে শাম্মী,আমি তোকে ভালবাসি তোকে আমি আমার প্রেয়সী হিসেবে ভেবে ফেলেছি।তুই কি আমাকে ভালবাসি না?
-না,আমি ঠিক..
শাম্মী কথা শেষ করে না মাটির দিকে চোখ নামিয়ে নেয়।রিমন শাম্মীর একটা হাত নিজের হাতে তুলে নেয়,শাম্মী কিছু বলে না।রিমন শাম্মীকে কাছে টেনে বলে,
-ভালবাসি তোকে শাম্মী,খুব বেশীই!তুই ভালবাসিস না?
শাম্মী কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,
-আমিও ভালবাসি তোকে গাধা,তুই এতদিনে এই কথা বলছিস আমি কতদিন ধরে অপেক্ষা করছি।গাধাটার এমনিতে সাহসে ভরপুর আর এই কথাটা বলতে এতদিন লাগিয়ে দিল।
বলে শাম্মী রিমনকে জড়িয়ে ধরে।
,
-ও...মা (সীমা চিৎকার করে উঠে)
-কিরে কি হয়েছে?(ইমন)
-মাই গড,বিরাট বড় এক সাপ,ডোরা কাটা।
-বলিস কি?(ঋতু)
-হু একটা গাছের নিচ দিয়র গেল।
-চল ফিরে যাই।
-নিশ্চয়ই ডোরা সাপ,এ সাপ কামড়ায় না।আর কামড় দিলেও কিছু হয় না,বিষ নেই।(ইমন)
-তুই জানিলি কি করে?তুইতো সাপটা দেখিস নি!(সীমা)
-তোর বর্ননা শুনে বুঝেছি ওটা ডোরা সাপ।
-তবুও ওদিকে যাবার প্রয়োজন নেই,অন্যদিকে চল।(সীমা)
-তাই চল!(ঋতু)
-তোমরা যদি সাপটা দেখতে চাও আমি তাহলে ওটা ধরে নিয়ে আসততে পারি।(ইমন)
-হয়েছে হয়েছে তোকে বাহাদুরী দেখাতে হবে না স্বর্প স্পেশালিস্ট।(সীমা)
তারা হাসতে হাসতে অন্য দিকে যেতে থাকে।
,
-তুই কি ঋতুর সাথে একেবারেই কথা বলবি না?(অপু)
রিয়াদ কিছু বলে না মুচকি হাসে।যার অর্থ "হ্যা অথবা না" দুটোই হদে পারে।
-কিরে কথা বলছিস না কেন?
-তোকে কি এমন কথা বলেছি যে কখনোই কথা বলব না।তাছাড়া এটাতো আমার একার ইচ্ছে না যে আমি ইচ্ছে করলেই কথা বলতে পারবো,তারও তো ইচ্ছো থাকতে হবে।
-ঋতুে ইচ্ছে আমার জানা আছে,বল তর ইচ্ছে নেই।
-তুই এখন যাতো ঘুরে আস আমি একটু একা থাকব।
টিটুর হাতে ক্যামেরা।সে ছবি তুলছে গ্রুপ ছবি, সিঙ্গেল,ডাবল,দাড়িয়ে বসে আর সাথে মোবাইল দিয়ে সেলফিতো আছেই।
-অপু আর রিয়াদকে নিয়ে এলে ভালো হত।(সীমা)
-সমস্যা কি!ওদের নিয়ে এসে আবার তুলবো। (ইমন)
ছবি তোলা হলে ওরা ফিরতি পথে হাটতে থাকে।ঠিক এসময় দূর থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর।খুবই হৃদয় তোলপার করা একটা ক্লাসিক্যাল সুর।ঋতু চমকে ওঠে, এখানে এই বর্তমানেও বাঁশির সুর কোথা থেকে।
-সীমা...সীমা এটা বাঁশির সুর না।(ঋতু)
-হু,
-এখানে কে বাজায়!চল দেখে আসিতো।
-রিয়াদ,
-রিয়াদ?(অবাক হয়ে)
-হু,আশ্চর্য হচ্ছিস না!ওতো সবসময়ই বাজায়,খুব সুন্দর বাজায়।
-জানতাম নাতো।
-আমরা কেওইতো জানতাম না! এযুগে কেও বাঁশি বাজায় তাও আবার আমাদের বয়সের?
-খুব সুন্দর বাজায়তো,এটা নিশ্চয় ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক।
-হু,
ঋতুর ভিতর কি এক আবেগ এসে বাসা বাধে,সে আনমনে হতে দল থেকে পিছিয়ে পড়ে।
দুপুরে খাবার কিছু পর ওরা সবাই দল বেধে বেরিয়েছে।হাটতে হাটতে একেবারে শেষ প্রান্তে এসে থামে, দূরে শুধু সাগরের অথৈই জল।ওখানেই দাড়িয়ে কয়েকটা গ্রুপ ছবি তোলা হয়।
-ইশ,কি সুন্দর পানি!আমার গোসল করতে ইচ্ছে করছে।(শাম্মী)
-তাই নাকি,তাহলে তুই গোসল কর আর আমি তোকে নিয়ে একটা কবিতা আবৃত্তি করি।(রিমন)
-কোন কবিতারে?(অপু)
-উহু,এখন বললেতো হবে না।শাম্মীর গোসলের সাথে বলতে হবে।শাম্মী গোসল শুরু কর,আমি কবিতা শুরু করছি।
-হয়েছে হয়েছে আমার গোসল করতে হবে না,তোরও আবৃত্তি করতে হবে না।(শাম্মী)
,
বিকালের শান্ত রোদের তেজ অনেকটাই কমে এসেছে,এবার তাদের হোটেলে ফেরার পালা।চারদিকে পাখিদের ব্যস্ততা,মাথার উপর দিয়ে ঝাকে ঝাকে পাখী দল বেধে উড়ে যাচ্ছে।
মুগ্ধতায় ঋতু অভিভূত হয়ে যায়।জীবনে এই প্রথম সে এই সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হয়েঝে।সমস্ত সৌন্দের্যের চেয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য সেরা এবং মহান,ঋতু এই প্রথম উপলব্ধি করে।
ঋতু এবং শাম্মী পাশাপাশি পেছনে নৌকার পাটাতনে বসে আছে।আশে পাশে অন্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে।শুধু রিয়াদ আর সীমা নৌকার উপর গলুইয়ে বসে আছে।তাদের নৌকা অনেকটা দূরে চলে এসেছে।
-এটা কি পাখি রে?(ঋতু)
-বালি হাঁস।(শাম্মী)
নৌকার উপর থেকে সীমা আর রিয়াদের হাসির শব্দ ভেসে আসে, কি এক কথায় দুজনে বেশ হাসছে।
হঠাৎ ঋতুর মনটা কেমন করে উঠে বুকের ভিতর একধরনের নিঃসঙ্গতা সে অনুভব করছে।কিছু ভালো লাগছে না,কি এক উদাসীনতা তাকে পেয়ে বসে।সীমাটা এমন কেন,তাকে ডেকে তাদের সাথে নিলে কি হতো?সীমা কি বলতে পারে না, এই ঋতু তুই ওখানে বসে আছিস কেন?আমাদের সাথে এসে বসতো।একটা বিষয় ভেবে ঋতুর খুব ভালো লাগছে,রিয়াদের বন্ধুরা তাকে খুব সহজভাবে নিয়েছে।তাকে নিয়ে কোন প্রকার টিজ বা কটুক্তি করেনি কেউ।কোন প্রকার বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়নি।তার নিজেকে নিয়েই বড় সমস্যা মন খুলে সবার সাথে কথা বলতে পারে না।রিয়াদের চোখে চোখে তাকাতে পারে না লজ্জায়, অবশ্য রিয়াদও সে চেস্টা করে নি।তার রাগ,অভিমান কি এখনো কমেনি।সে আর কি করতে পারে সবইতো সে করছে।ঋতুর সব কিছু ভেবে কষ্ট হতে থাকে,তার কান্না পায়।
ইমন নৌকার বাইরে এসে চারপাশ ভালো করে দেখে মাঝি ছেলেটা যেখানে বসে আছে,ঠিক তার সামনে এসে নৌকার কার্নিশে বসে।ইমনের পায়ের ধাক্কাতে তার পায়ের নিচ থেকে একটা কাঠের তক্তা সরে গিয়ে তার একটা পা ভিতরে ঢুকে যায়।সে মাথা নামিয়ে পা তুলতে যায় তখনই তার চোখে পড়ে নৌকার নিচে একসাইটে একটা ছিদ্রে পুরনো কাপড় গুজানো।সে ওটা ধরে টান দেয়,ছিদ্র দিয়ে পানি চলে আসে,দ্রুত সে বন্ধ করে দেয়।তারপরই ইমনের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়।সে আশেপাশে তাকায় কেও তাকে লক্ষ করছে না,সে একটানে কাপড়টা ছিদ্র থেকে উঠিয়ে নৌকার নিচে ছুড়ে দেয়।ছিদ্র দিয়ে পানি উঠা শুরু করে,কাঠের তক্তাটা যথাস্থানে রেখে উঠে দাড়ায়।
,
সীমা আর অপু অনেক বুদ্ধি করে এই ভ্রমনের প্ল্যানটা করেছে।উদ্দেশ্য ঋতু এবং রিয়াদের শীতল সম্পর্কটা সহজ করা।তাদের এই প্ল্যানের কথা অন্যকেউ জানে না।প্রথমে ভেবেছিল রিয়াদ এই ভ্রমনে থাকার কথা শুনে ঋতু বোধহয় আসতে চাইবে না কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা।রিয়াদই ঋতুর আসার কথা শুনে বেকে বসেছিল।অনেক বুঝিয়ে তারা রিয়াদকে রাজি করিয়েছে।কিন্তু এখনও তাদের আসল উদ্দেশ্যই বাকি রয়ে গেছে,খুবই চিন্তার কথা।
-রিয়াদ তুই কিন্তু ঋতুর ব্যাপারে খুবই বাড়াবাড়ি করছিস।(সীমা)
-কি রকম?
-ঋতুর সাথে সম্পর্কটা সহজ করছিস না কন?
-তার সাথে তো আমার কোন কালেই স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল না!
-ঋতুতো তার ভুল বুঝতে পেরেছে তাছাড়া ঋতু তোকে ভালবাসতে শুরু করেছে,তো তুই এখন এইরকম করছিস কেন?
-আমিও বুঝতে পারছি না!(মুচকি হেসে)
-আসলে তোর স্বভাবটাই এরকমর,দীর্ঘদিন মনে রাগ পুষে রাখিস এটা ঠিক না।
-........।
নীচ থেকে অপু তাদের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
-রিয়াদ কাজটা কিন্তু তুই ঠিক করছিস না,আমার প্রেমিকার সাথে তোর এত কথা কিসের।
আসলে সে ঋতুকে জানানোর জন্য তার উদ্দেশ্যে বলে উঠে।
-চুপ করতো!(সীমা)
রিয়াদ তুই বুঝতে পারছিস না, আমি ঋতুর দিকে তাকাতে পারছি না।তোর জন্য। তোর জন্য মেয়েটা কত কষ্টে আছে বুঝতে পারছিস।
-তোকে তো আমি আগেই বলেছিলাম,আমাদের সাথে ঋতুর আসাটা ঠিক হবে না।
-রিয়াদ!আমি এক্ষুনি ঋতুকে এখানে ডাকছি।
-প্লিজ সীমা,আমাকে সময় দে।কারন আমি ভেবে রেখেছি,কোন এক ভর পূর্ণিমায় গভীর রাত্রে ঋতুকে ফোন করে ঘুম ভাঙ্গিয়ে বলবো,ঋতু আমার খুব ইচ্ছে করছে তোমাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যেতে।তুমি কি যাবে আমার সাথে?যদি যেতে চাও বল,আমি এক্ষুনি তোমাকে নিতে আসছি।
-মাই গড!সত্যি বলছিস।
-হু,তবে এত তারাতারি নয় তাকে আরো কিছুদিন আমাকে কষ্ট দেয়ার মানেটা বুঝিয়ে নেই।
-ইটস্ টু মাচ রোমান্টিক!
তারা হেসে উঠে সাথে অপুও, নিচ থেকে সবই শুনছিল সে,রিয়াদের কথা শুনে সে কিছুটা অবাকই হয়।
,
তখনই নৌকা থেকে চিৎকার আসে 'পানি পানি' বলে সবাই দাড়িয়ে যায়।ছোট মাঝি ছেলেটা প্রাণপনে একটা টিনের কৌটা নিয়ে সেচে চলছে,কিন্তু এই পানি সেচা কোনো মতেই সম্ভব নয়।
নৌকা বেশ দুলছে সবাই এপাশ-ওপাশ করছে।শাম্মী,ঋতু,সীমা তাদের চোখে মুখে ভয়-আতঙ্ক।সীমা নীচে নেমে যায়।
-রিয়াদ নেমে আয়।(অপু)
-মাই গড!নৌকা ডুবে যাচ্ছে। (শাম্মী চিৎকার করে)
-তোর ভয়ের কিছু নেই আমি আছি না,ঠিকই বাচিয়ে দেবো।(রিমন হেসে)
শাম্মী কিছু না বুঝে তৎক্ষনাত রিমনের একটা হাত ধরে ফেলে।নৌকা তীর থেকে পঁচিশ-ত্রিশ গজ দূরে।
-আপনারা চুপচাপ বইসা থাকেন,নড়াচড়া কইরেন না।কিচ্ছু আইবোনা,তীরে পৌইচ্ছা যামু।(মাঝি)
কিন্তু কে শুনে কার কথা,সবাই একসাথে জড়ো হওয়ায় নৌকা একদিকে কাত হয়ে নৌকায় পানি এসে পড়ে।তা দেখে সবাই দ্রুত অন্যপাশে সরে আসে ফলে নৌকা আরো কাত হয়ে পড়ে,নৌকা পানিতে ভারে যায়।হৈ চৈ চিৎকার ইমন চিৎকার করে মেয়েদের আরো বেশী ভয় পাইয়ে দেয়।
রিয়াদ এখনো নৌকার উপরে সবার কান্ড কারখানা দেখে।অপু ক্যামেরা মাথার উপর তুলে পানিতে লাফিয়ে পড়ে।তা দেখাদেখি অন্যরা যেভাবে পারে জুতো,টুতো ফেলেই লাফিয়ে পড়ে,রিয়াদের তা দেখে ভীষন হাসি পায়।
ঋতু অবাক চোখে দেখে সবাই নেমে যাচ্ছে,তারদিকে কারো নজর নেই।সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত,ঋতু নৌকার ছই ধরে দাড়িয়ে আছে
,রিয়াদ তার পাশে নেমে আসে।নৌকায় হাটু পানি, ঋতু ছাড়া কেও নৌকায় নেই।রিয়াদ নৌকা থেকে নামেত গিয়ে কি মনে করে দাড়ায়,ঋতুকে পর্যবেক্ষন করে তার কাছে আসে।সমস্ত সংকোচ ভেঙ্গে প্রশ্ন করে।
-তুমি নামছো না কেনো?
-.........।
ঋতু কিছু বলে না,তার নির্বাক দৃষ্টি দূরে কোথাও।রিয়াদের কথায় ঋতুর সারা শরীর কেঁপে ওঠে,বুক ফেটে কান্না আসে।লজ্জা-অভিমানে তার চেহারা লাল হয়ে যায়।
রিয়াদ খুব সমস্যায় পড়ে,পানিতে কোমর পর্যন্ত ডুবে গেছে।ঋতুকে ফেলে সে নামতেও পারবে না,যত যাইহোক সে তাকে ভালবাসে।
-এই তুমি নামছো না কেন?
-..............।
-ঋতু বুঝতে পারছো না নৌকা ডুবে গেছে।
-........।(ঋতু কথা বলে না তার দৃষ্টি নামিয়ে আনে)
-তুমি কি সাঁতার জানো?
ঋতু আর পারে না সে মাথা নীচু করে মাথা নাড়ে যার অর্থ 'না'।রিয়াদ একমুহুর্ত দেরী করে না ঋতুর একটা হাত ধরে টান দেয় তাকে নিয়ে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তীরে পৌছো রিমনরা সবাই ঘাসের উপর বসেছে।যে যেভাবে পারছে শরীর থেকে পানি ঝারছে।
-এখন হোটেলে যাবো কিভাবে?(শাম্মী)
-কেন আমি তোকে কোলে করে নিয়ে যাব।(রিমন)
,
সীমা দেখে রিয়াদ এবং ঋতুর মাথা একবার পানির উপর ওঠে এবং পরমুহুর্তেই পানির নীচে ডুবে যায়।তার হঠাৎই মন পড়ে ঋতু সাতার জানে না।রিয়াদ ঋতুকে সাথে নিয়ে আসছে কিন্তু দেখেই বুঝা যায় রিয়াদের খুব কষ্ট হচ্ছে।
-অপু এই অপু, দেখ ওরা আসতে পারছে না।তুই তারাতারি যাতো।(সীমা)
অপু দেখে ঠিকই রিয়াদ আসতে পারছে না সে দ্রুত ওঠে দাড়ায়।রিমন তাকে থামিয়ে দেয়।
-তোর যাবার দরকার নেই,নায়ক ঠিকই বঙ্গোপসাগর থেকে নায়িকাকে উদ্ধার করবে।দুজনের জন্যই এটা ভালবাসার গভীরে যাওয়ার চমৎকার সুযোগ,বসে বসে দেখ।
ইমন দ্রুত হাতে ঋতু আর রিয়াদের পানিবন্ধী ছবি তোলে।
-দেখ দেখ ওদের খুব কষ্ট হচ্ছে,প্লিজ রিমন যানা।(শাম্মী রিমনকে কিল দিয়ে)
,
রিয়াদের আসলেই খুব কষ্ট হচ্ছে।ঋদুর শাড়িতে তার একপা জড়িয়ে গেছে এগুতে পারছে না।ঋতু তার শরীরের সাথে সেটে আছে।রিয়াদ ডুব দিয়ে একটু একটু করে এগুচ্ছে, ঋতুকে আনার কারনে তার বেশীর ভাগ সময়ই পানির নিচে থাকতে হচ্ছে ফলে দ্রুত দম ফুরিয়ে আসে।মনে হচ্ছে এই অল্প পানিতে সে মরে যাবে,ওরা আসছে না কেন?
তখনই সে একপলকের জন্য ফ্ল্যাস জ্বলতে দেখে,তার মানে ছবি তোলা হচ্ছে রিয়াদের রাগ ওঠে যায়।রিয়াদের কানে,মুখে পানি ঢুকে গেছে।ঋতু যেন অনুভূতিহীন তার শরীরের সাথে সেটে আছে,রিয়াদের পাঞ্জাবির এক প্রান্ত হাত দিয়ে ধরে আছে,যেন ঋতু তার বাচা মরাতে কিছু যায় আসে না।
রিয়াদ আর পারে না তলিয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারে তার পায়ের নিচে মাটি।গলা সমান পানিতে ঋতুক নিয়ে দাড়িয়ে পড়ে,পানি ভেঙ্গে ঋতুকে নিয়ে তীরে যেতে থাকে।
তারপরই অপু,রিমন,শাম্মী,সীমা হৈচৈ করতে করতে তাদের দিকে আসে।
তীরে পৌছে ঋতুকে নিয়ে ওরা বসে।ঋতু দু'হাটুর ভেতর মুখ গুজে, তার শরীর কাঁপতে থাকে নিরবে কাঁদছে।
রিয়াদ খানিকটা জিরিয়ে নেয়,শরীরটা একটু সুস্থ লাগে।এখন তার প্রথম কাজ হচ্ছে ইমনকে খুব জোরে কয়েকটা চড় দেয়া।ইমনের কাছে যেতে হলে ঋতুকে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে।রিয়াদ উঠে দাড়ায়,শব্দ পেয়ে ঋতু মুখ তুলে তাকায় তার চোখমুখ পানিতে আর চোখের জলে একাকার।ঋতু দ্রুত উঠে দাড়ায়,সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছুটে এসে রিয়াদের বুকে আচঁড়ে পড়ে।জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে।ঘটনার আকস্মিতায় রিয়াদ হতভম্ব হয়ে পড়ে,মুহুর্তের জন্য সবকিছু ভুলে যায়।হতভম্ব কাটিয়ে সেও ঋতুকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরে।
,
পরিশিষ্ট:
অপু আর সীমা এবং রিমন আর শাম্মীর পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়ে যায়।
রিয়াদ আর ঋতুর বিয়ে নিয়ে এখন সবাই ব্যস্ত,খুব শীঘ্রই তাদের বিয়ে হয়ে যাবে।
,
আপনাদের নিশ্চয়ই রুমাপু কথা মনে আছে,
একদিন সত্যি সত্যিই হঠাৎ করে সাব্বির ভাই গভীর জোছনা ভরা রাতে রুমাপুর ঘুম ভাঙ্গিয়ে দড়জার সামনে দাড়ায়।রুমাপু প্রথমে রাজি না হলেও তার ভালবাসার কাছে হেরে সাব্বির ভাইয়ের সাথে সুইজারল্যান্ড চলে যায়।
আর হ্যা, সাব্বির ভাইয়ের স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশে না পারলেও সুইজারল্যান্ডে 'অতিমানব' দের কে নিয়ে দুটো খুব ভালো মুভি তৈরী করে সাফল্য লাভ করেন।
,
(সমাপ্ত)
SHARE

Author: verified_user