Monday

বাংলা উপন্যাস বিধান ডোমের মৃত্যু | Bangla Golpo Books

SHARE

বাংলা উপন্যাস বিধান ডোমের মৃত্যু | Bangla Golpo Books


BAngla Golpo


              
সুধা! এ্যাই সুধা ! কই গেলি রে ! সারা দুপুর বিকেল সন্ধা চলে গেলো, রাত এসে যাচ্ছে আর তোর খবর নেই! এ্যাই ছোড়ি! তোকে না কত করে বলে দিলাম সন্ধা নামার সাথেই সাথেই সদর দরজায় আলো জ্বালবি ৷ কথা কানে যায় না বুঝি? এ্যা! 
-
সুধা আশেপাশেই কোথাও ছিল ৷ বধিনাথের চেঁচামেচিতে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলো ৷ বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললো , বাবু নমস্কার ৷ বলে মাথায় ঘোমটা দিলো ৷ ছুটে আসার কারণে সুধার বুক উঠছে আর নামছে ৷
বধিনাথের দৃষ্টি প্রথমেই চলে গেলো সেদিকে ৷ তার বয়স ষাটের কাছে ৷ এ বয়সেও মেয়েদের শরীরের দিকে চোখ পিছলে চলে যায় ৷ বধিনাথ নিজেকে সংযত করতে চেষ্টা করেও পারে না ৷ নিজের কাছেই কেমন সংকোচ বোধ হয় ৷ 
বাংলা উপন্যাস
সুধা নিজেকে যথেষ্ট ঢেকেঢুকে রাখে বধিনাথের সামনে ৷ তবুও লোকটার চোখ এদিক ওদিক চলে যায় ৷ সুধা নিজেকে আরো বেশী করে ঢাকবার চেষ্টা করে ৷ বধিনাথ গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলে, তোকে না এত করে বলি, রোজ সন্ধায় বাতি দিবি সদর দরজায় ৷ কথা শুনিস না কেনো? এ বাংলোয় চাকরী করার ইচ্ছে আছে কি? 
সুধা ঠোঁট কামড়ে ধরে দাড়িয়ে ছিলো মাথা নিচু করে৷ পা দিয়ে মাটিতে আঁকিবুকি করতে করতে বলে, জ্বি বাবু, ইচ্ছে আছে ৷
বধিনাথ বলে, এত অনিয়ম করলে তো চাকরী টিকবে না ৷ এতদিন নাহয় কোনো সাহেব ছিলো না বাংলো তে ৷ খালি বাংলো তে ইচ্ছে মত ছিলি ৷ যখন যা মন চায় করতে পারতি ৷ এখন তো আর সে সুযোগ নেই বাপু ৷ হাতে আছে মোটে চারদিন ৷ এরপরই কিন্তু সাহেব এসে পড়বে পঞ্চম দিনের মাথায় ৷ তখন বুঝবি ঠ্যালা ৷ 
সুধা মাথা নিচু করেই থাকে ৷ কিছু বলে না ৷
বধিনাথ পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলে, হিসেবে তো এ বাংলোর কেয়ারটেকার এর চাকরী টা তোর না ৷ তোকে দয়া করে তোর মৃত স্বামীর পদে বহাল রাখা হয়েছে, যেন দু বেলা দুটো খেয়ে পরে রাতে মাথা গুঁজে একটু শুতে পারিস ৷ আমি কি ভুল কিছু বলেছি? 
সুধা মাথা না তুলেই বলে, না বাবু, ঠিক বলেছেন ৷
বধিনাথ বলে, আর মাত্র চার দিন আছে, নিজেকে একটু সাবধানে রাখ ৷ চারদিকে তো যুবক ছেলে ছোকড়া রা ওত পেতে আছে ৷ বুঝিস ই তো, সদ্য বিধবা হওয়া কুড়ি পঁচিশ বছরের যুবতী কন্যা তুই ৷ এ কটা দিন কোনও অঘটন না ঘটলে পরে আর কিছু সমস্যা হবে না ৷ নতুন বড় সাহেব এসে পড়বে তার স্ত্রী নিয়া ৷ তখন গেইটে বসবে নতুন পাহারাদার ৷ তুই করবি ভেতরে সব কাজ কাম ৷ কেউ তোর দিকে তাকানোর সাহসই পাবে না ৷ 
সুধা বললো, হুম বাবু, ঠিক বলেছেন ৷
বধিনাথ বললো,ঠিক আছে বাতি দে সারা বাংলো তে ৷ আমি তাহলে এখন যাই ৷
-

Bangla Golpo Books


বধিনাথ চলে গেলে সুধা বাংলোর ভেতর ঢুকে পড়ে ৷ একের পর এক বাতি জ্বেলে দিতে থাকে নিচ তলায়, দু তলায় ৷ হলুদ বাতি ৷ জ্বাললেও কেমন গা ছমছমে একটা ব্যাপার থেকে যায় পুরো বাংলো জুড়ে ৷ পুরোনো ধাচের বাংলো ৷ ব্রিটিশ আমলে করা ৷ জেলার কালেক্টরের জন্য তৈরী এ বাংলো তে এর আগে থেকে গেছেন অমল ঘোষ নামের এক সরকারি পদস্থ কর্মকতা ৷ সে চলে গেছে বছর খানেক আগে ৷ তারপর থেকে নতুন কাউকে বাংলো টা দেয়া হয়নি, কারণ বহুত পুরোনো বাংলো, জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা উঠে গেছে ৷ রেখে দেয়া হয় সংস্কার কাজের জন্য ৷
সংস্কার কাজ শেষ হয় দু মাস আগে ৷ পলেস্তারা লাগানো হয়, রঙ করা হয় ৷
সবকিছু ঠিকই ছিল ৷ বিধান ডোম নামের এক নিম্ম জাতের হিন্দু ছিলো এ বাংলোর দারোয়ান ৷ বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি ৷ অনেক বছর ধরে এখানে কাজ করতো সে, থাকতো বাংলোর নিচ তলার একটা আলাদা ছোট ঘরে , বউ নিয়ে থাকতো সে, নিঃসন্তান ছিলো৷ বিধান ডোমের বউ হলো সুধা ৷ আগের বউ মারা যাওয়ায় বছর দুই আগে একই গ্রামের হতদরিদ্র জেলে দিবাকর পালের কনিষ্ঠা সুধাকে বিয়ে করে সে ৷ দুজনে মিলে দিব্যি কেটে যাচ্ছিলো তাদের দিন ৷ বিপত্তি বাধে কিছুদিন আগে ৷ বাংলোর সংস্কার কাজ শেষ হবার দিন পনেরো পরই এক রাতে নিজের ঘরে মারা যায় বিধান ডোম ৷ সুধা তখন রান্না করছিলো ৷ সে বিধানের একটা চিৎকার শুনতে পেয়ে ছুটে যায় ঘরে, আর যেয়ে দেখে বিধান ডোম পড়ে আছে বিছানায়, তার ঘাড় টা যেন কেউ মটকে দিয়েছে, এমন ভাবে ঝুলে আছে একপাশে ৷ সুধার চিৎকার চেচামেচি তে ছুটে আসে বধিনাথ সহ আশেপাশের কয়েকজন ৷ বাংলোর আশেপাশে মানুষের স্থায়ী বসতি প্রায় নেই ৷ যে কজন উপস্থিতি ছিলো, যারা বিধান ডোমের ডেডবডি দেখেছে প্রায় তারা কেউ কেউ বলছিলো এটা খুন, কেউ ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছে, আবার বধিনাথ সহ অন্য অনেকের ধারণা ,এটা কোনো মানুষের কাজ নয়, অশুভ কোনো শক্তি বিধান ডোমের মৃত্যুর সাথে জড়িত.....
বিধান ডোম যে রাতে মারা যায়, মৃত স্বামীর লাশের পাশে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে বিলাপ করতে থাকে সুধা ৷ শান্ত ঠান্ডা মেজাজের মেয়ে সুধাকে সে রাতে খুব অচেনা লাগে ৷ এত বড় একটা শক সে বোধহয় সহজ ভাবে মেনে নিতে পারছিল না ৷ একটা কথাই সে প্রলাপের মত বার বার বলতে থাকে, " আমারে আগেই বলছিলো, তার ভয় লাগে , খালি ঘরে একা একা থাকতে চাইতো না , আমি মানুষটারে একলা রাইখা কেন রাধনা করতে গেলাম , তাহইলে তো আজ আমার স্বামীর এমনে করে মরতে হয় না, আগেই কইছিলো, কিছু একটা হইতাছে তার সাথে, সে ভয় পাইতেছিলো ....... "
-
কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে ৷ ঘুরে ফিরে দেখে এদিক ওদিক, এটা ওটা জিজ্ঞেস করে আশে পাশের মানুষজন কে ৷ শুরুতে দশ বারো জনের মত লোক জমে গিয়েছিল লাশ দেখতে ৷ গ্রাম্য লোকজন যখন শুনে অশরীরী জাতীয় কিছু একটা মৃত্যুর কারণ, সে মৃত্যু যদি হয় ঘাড় মটকে ফেলা , তাহলে ডেডবডি দেখতে ভীড় লেগে যায় ৷ সবার মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা , অশরীরী! বাড়ি ফিরে বৌ আর বাচ্চা দের কাছে বেশ আয়োজন করে বলার মত একটা গল্পের উপসর্গ তৈরী হয় ৷
বিধানের বেলায়ও তা ই হয়েছিলো ৷ বাংলোর সদর দরজার আশেপাশে ভীড় লেগে গিয়েছিল ৷ সরকারি বাংলো, আশেপাশে তেমন বাড়ি ঘর নেই ৷ যা লোকজন জমেছিলো সবই পথচারী ৷ বাংলোর সামনে দিয়ে ইটের রাস্তা চলে গেছে বাজার পর্যন্ত ৷ এদিক দিয়ে তাই বেশ একটা যাতায়ত লেগেই থাকতো লোকজনের ৷
বধিনাথ বাবুও কাকতালীয় ভাবে ঠিক ওই সময়টাতেই পোষ্ট অফিসে যাচ্ছিলেন কি এক কাজে ৷ মাঝপথে সুধার গগনবিদারী বিলাপে সাইকেল থামিয়ে নেমে এসে দেখে কল্পনাতীত কান্ড ৷ দুপুরেরও বিধানের সাথে তার কথা হয়েছে, বিধান টুল পেতে বাংলোর সদর দরজায় বসা, বধিনাথ কে জিজ্ঞেস করলো, বাংলোর মেরামত কাজ তো শেষ , নতুন সাহেব কবে আসবে টাসবে কিছু জানে কিনা ৷ বধিনাথ বলেছিলো আসবে আসবে ,শীঘ্রই আসবে ....
তরতাজা লোকটা কিনা রাতেই মরে গেলো? তাও আবার ভূতে ঘাড় মটকে মেরে ফেললো! বধিনাথ বাবু অবশ্য আগে থেকেই এই সাহেব পাড়ার বাংলো সম্পর্কে নানা কথা শুনতেন ৷ অদ্ভুত সব কথা ৷ রাতের বেলা ঝড় নেই বাদল নেই কড়ই গাছে পাতা ঝিরঝির করে পড়া, ডাল ভেঙে বাংলোর ছাদে ফেলে দেয় কেউ, নুপুর পায়ে হাটার শব্দ, তাও আবার নিশুতি রাতে, এসব কথা কোনোদিনই বধিনাথ বিশ্বাস করতো না ৷
তবে সেদিন সুধার বিলাপ রত অবস্থায় কথাগুলো শুনে বধিনাথেরও মনের মধ্যে এ ধারণাই পোক্ত হলো, বাংলো টা আসলেই ভালো না ৷
-
পুলিশ এসে পৌছুবার পর উৎসুক কয়েকজনের ভীড় হঠাত কমে গেলো ৷ কে ই বা চায় এসব মামলায় ফাঁসতে, খুন বা ভূত সে যা ই হোত ৷
থেকে গেলো কেবল হাতে গোনা কয়েকজন, যারা এলাকায় প্রভাবশালী, মাথা, সরকারি কিছু চাকুরে যেমন বধিনাথ, আরো কয়েকজন ৷
পুলিশের বড় কর্তা লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্য নিয়ে যেতে চাইলেও শেষটায় আর নিয়ে যাওয়া হলো না, বধিনাথ, সুধা, আর অন্য সবাই মোটামুটি নিশ্চিত ই ছিলো, কেউ এসে বিধান কে বাংলোর ভেতর নিজের ঘরে ঢুকে খুন করে যাবে তা একেবারেই অসম্ভব ৷ কারো সাথে বিধান জোনের কোনো শত্রুতা ছিল না, আর বয়স পঞ্চাশোর্ধ হলেও বিধান ছিলো বলশালী ৷ কারুর পক্ষে বিধান কে ঘাড় মটকে খুন করা সহজ কথা নয় ৷ সারা অঞ্চলে এই সংবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো যে বিধান ডোম কে অশুভ আত্না ঘাড় মটকে মেরেছে.......

এর পর থেকে বাংলোর সারা বাংলো তে আপাতত একজন মানুষের বসবাস, সুধা ৷ বিশাল বাংলো তে দিনের বেলা পাড়ার বৌ ঝি রা আসে , কেই শাক কুড়াতে , কেই তুলসী পাতা নিয়ে যেতে , কেই নিতান্তই সুধার সাথে গল্প করতে ৷ তবে সন্ধা নামার সাথে সাথেই সারা বাংলো জুড়ে নেমে আসে গা ছমছমে নিরবতা ৷ সদ্য বিধবা হয়েছে সুধা, সারা বাংলো তে একাই থাকে , তাও মূল বাংলোর সাথে লাগোয়া ছোট একটা ঘরে ৷ আগে যখন বিধান জীবিত ছিলো, তখন সুধার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেতো না কেউই, কারণ সবাই বিধান ডোম কে ভয় পেতো ৷ কেউ তার বউয়ের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিলে বিধান তার চোখ উপড়ে নিতেও হয়তো দ্বিধা বোধ করতো না ৷
তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন ৷ একা এত বড় একটা বাংলো তে থাকা সুধার মত যুবতী সুঠাম দেহী একটা মেয়ের জন্য দুঃশ্চিন্তার কারণ বটে ৷
এজন্যই আজকে বধিনাথ বাংলোর সামনের পথ দিয়ে যাবার সময় সুধা কে একচোট ভরে গেলো ৷ সন্ধা হয়ে যাবার পরও কেনো সদর দরজায় বাতি জ্বালানো হয়নি ? উদ্ভূত পরিস্থিতি তে এটা একটা ঘোরতর অন্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে বধিনাথের কাছে ৷ সুধা তাই উনার ধমকি ধামকি তে খুব একটা কষ্ট পায়নি ৷

নিচ তলার বারান্দায় যতগুলো বাতি বসানো আছে সব গুলো জ্বেলে দোতলায় উঠে গেল সুধা ৷ বাংলোর বাতি গুলো খুব চমৎকার ৷ ঝাড় বাতি টাইপ ৷ হলদে আলো দেয় ৷ বারান্দার জায়গায় জায়গায় বিশাল পুরু এক একটা পিলার ৷ নানা কারুকাজ করা ৷ নৃত্যরত তরুনী, ঘোড়া চালিয়ে আসতে থাকা বৃটিশ সৈনিক, খোলা তরবারী হাতে যুদ্ধরত সিপাহী, নানা ধরনের খোদাই চিত্র অংকিত ৷ সুধা প্রথম যখন এ বাংলো তে এলো, মুগ্ধ হয়ে কেবল এসব কারুকার্যমন্ডিত দেয়াল দেখতো ৷ এখনো মাঝে মাঝে দেখে আর অবাক হয় ৷ পিলারে করা এসব খোদাই চিত্র দেখতে দেখতে ধীর পায়ে দোতলায় উঠে সুধা ৷ এক এক করে সব গুলো ঝাড়বাতির সুইচ টিপে জ্বেলে দিলেও একেবারে শেষের দিককার বাতি গুলো জ্বালাতে পারে না ৷ কারণ ও দিককার বাতি গুলো দীর্ঘদিন ধরেই অকেজো ৷ সে বারান্দা ধরে হেঁটে হেঁটে অন্ধকার জায়গাটাতে যায় ৷ স্বামীর মৃত্যুর পর ভূত প্রেতের ভয় তার মন থেকে একেবারেই উবে গেছে ৷ একধরণের বেপরোয়া ভাব চলে এসেছে ৷ দোতলার বারান্দার একেবারে শেষ মাথায় যেয়ে দাড়ায় সুধা ৷ রেলিং ধরে নিচের দিকে তাকায় সে ৷ এটা হলো বাংলোর স্টোর রুম ৷ পুরোনো যত অকাজের জিনিষপত্র সব নাকি এ রুমে জমা করে রাখা হয় ৷ রুমের ভেতর নাকি ইংরেজ সাহেবদের সংগ্রহিত অনেক কিছু রাখা আছে ,ইংরেজ এক সাহেব ছিল যে নাকি সপ্তাহে সপ্তাহে ঘোড়ায় চড়ে পুরো এলাকা ঘুরতে বের হতো , পথে যা কিছু ভালো লাগতো তা সঙ্গে করে নিয়ে আসতো , স্টোর রুমে রেখে দিতো, অনেক সময় নাকি স্থানীয় মানুষদের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র বা তাদের ব্যাক্তিগত জিনিষও পছন্দ হলে নিয়ে আসতো, মুখের কথায় কাজ না হলে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে ৷ তবে দুঃখের বিষয় এই যে গত অনেক বছর ধরে বাংলোর অন্য রুমের মত এ রুমের চাবিটাও বিধান ডোমের কাছেই ছিলো, সে ই দেখাশোনা করতো ৷ তবে শেষ কয়েক দিন ধরে বিধান ডোম বলছিলো , স্টোর রুমের চাবিটা সে খুঁজে পাচ্ছে না ৷ হারিয়ে ফেলেছে ৷ আগের যে সাহেব ছিলো, তার সাথে কথা বার্তার অংশবিশেষ সুধা শুনতে পেতো, এসব বিষয়ে সুধার আগ্রহ কিংবা দায়িত্ববোধ কোনোটাই ছিল না, তার কাজ রান্না বান্না উঠোন ঝাট দেয়া, এগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সে ৷
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ঠিক এই রুমটার নিচেই বিধান ডোমের ঘর ৷
কি মনে হতে, সুধা কোনো কারণ ছাড়াই বদ্ধ স্টোর রুমটার দরজায় কড়া নাড়লো, ঠক ঠক ঠক......

আজ সকাল থেকেই দম ফেলার ফুসরত নেই সুধার ৷ রাজ্যের কাজ করে চলেছে সে , দেয়ালের কোণায় জমা ঝুল, উঠোন ময় জমে দেড় কয়েক মাসের জমে থাকা গাছের ঝরে পড়া পাতা ঝাট দেয়া, কুয়োর জল তোলার বালতি ঘষা মাজা করে পরিস্কার করা, কাজের কি আর শেষ আছে? এত দিন আরাম আয়েশ করে দিন কাটিয়েছে সে, অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠলেও কিছু বলার ছিলো না কারো, নিজের জন্য দু মুঠো চাল চড়িয়ে দিতো, একবেলা রাধা তরকারী, ডাল , কয়েকদিন পর্যন্ত খেতো জ্বাল দিয়ে, নিজের মনে কখনো সাজতো, গানের দু একটা কলি ভাজতে ভাজতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো, সন্ধে নেমে গেলে ফিরে আসতো নিজের কুটিরে ৷ দিব্যি চলে যাচ্ছিলো দিন গুলো ৷ ততদিনে স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর শোকও কাটিয়ে উঠেছিলো সে ৷ 

বিশাল সাহেব বাংলোর পুরোটা জুড়ে সুধাই ছিল মুকুট হীন সম্রাজ্ঞী ৷ বাংলো জুড়ে নানা জাতের ফলের গাছ ৷ জামরুল পেয়ারা আতা, বড়ই, এক এক বেলা একেক গাছে চড়ে বসতো সুধা ৷ তেল চিটচিটে ময়লা পুরোনো হয়ে যাওয়া পরনের শাড়ীর আচলটাই পুটলীর মত বানিয়ে ফল ফলান্তি দিয়ে ভরে নিয়ে নামতো গাছ থেকে ৷ নিজের ঘরে যেয়ে খেতো সব৷ পাড়ার ছোট বাচ্চা রা কেউ দেয়াল টপকে কিংবা গেইট খোলা পেয়ে বাংলোর ভেতরে ঢুকে পড়তো যদি ফল পাড়ার জন্য ,সুধা তেড়ে যেতো তাদের দিকে লাঠি নিয়ে, গলা ছেড়ে বলতো, "এই হতচ্ছাড়ার দল ভাগ বলছি এক্ষুনি ‌‌, এটা সরকারি বাংলো , সব ফলের মালিক সরকার, আর একবার এলে ঠ্যাঙিয়ে তাড়াবো বলে দিলাম......
অথচ নিজের উদর পূর্তিতে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করতো না সে ৷ বাংলোতে বাবু না থাকলে ফল কে খাবে? কাক চিল? ওদের খাওয়ানোর চেয়ে সে নিজে খাবে, তা ই ঢের ভালো.....
-
অনুপ ব্যানার্জি, উপ প্রাণী সম্পদ কর্মকতা, কিছু দিন আগে বদলির চিঠি হাতে পেয়েছেন , সাথে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন ৷ দেশের উত্তরের এক উপজেলায় আগে পোস্টিং ছিল ৷ দুই মেয়ে আর স্ত্রী কে নিয়ে মোটামুটি থিতু হয়ে গিয়েছিলেন সেখানেই ৷ মেয়ে দুটোকে সেখানকার স্কুল আর কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন ৷ ওরাও বেশ মানিয়ে নিয়েছিলো সেখানে ৷ ছেড়ে চলে যেতে হবে এখন ৷ মেয়ে দুটোর মন খুব খারাপ ৷ পরিচিত একটা জায়গা ছেড়ে নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে মানিয়ে নেয়া খুব কঠিন ৷ চেনা বাথরুম, চেনা বারান্দা, চেনা গাছ ,এমনকি ভিক্ষে করতে আসা ফকির গুলোকেও ততদিনে নিজের চারপাশের পরিমন্ডলের একটা অংশ মনে হতে শুরু করে ৷ এগুলো নিয়েই তো জীবন ৷ হঠাৎই এক চিঠি এসে সব ছেড়ে ছুড়ে দিতে বলছে ৷ হোক পদোন্নতি, হোক আগের চেয়ে বেশী সুযোগ সুবিধে, সুবিশাল বাংলো, তাতে কি? মন বসে গেলে পলেস্তারা খসে পড়তে থাকা বিছানার পাশের চেনা দেয়াল টা ই বেশী আপন লাগে ৷
গত কয়েক দিন ধরেই জিনিস পত্র গোছানে শুরু হয়েছে ৷ দু জন পিয়ন সারাক্ষণই এটা ওটা তদারক করছে ৷ এত দূর বয়ে নিয়ে যেতে হবে সব জিনিষপত্র ৷ দেশের উত্তর থেকে একেবারে দক্ষিণ! সহজ কথা নয় ৷ 
-
দেখতে দেখতে চলে এলো বিদায় বেলা ৷ আগামীকালই অনুপ ব্যানার্জি চলে যাবে নতুন এক জায়গায়, লোকমুখে শোনা যায় যেখানে তার পোস্টিং হয়েছে সেটি নাকি দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ৷ উপভোগ করা যাবে জায়গা টা ৷ অনুপ কে ফেয়ারওয়েল দিতে এসে সহকর্মীরা তেমনই বলছিলেন ৷
অনুপের দুই মেয়ে বেলা, ইলিনার মনও এখন অনেকটাই শান্ত ৷ কারণ তারা জেনেছে যে তাদের বাবা সুবিশাল একটা বাংলো পেতে যাচ্ছে, বাংলোর চারপাশ ঘিরে রয়েছে ঘন অরণ্য, তারা দু বোন মিলে ঠিক করেছে, প্রথম দিনই তারা পুরো বাংলো টা ঘুরে দেখবে ৷ উত্তেজনায় তাই সারা ওদের ঘুম এলো না ৷ একই সাথে খারাপ লাগছিলো এতদিনের পুরোনো বাসা টা ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে ৷ বেলা যখন ক্লাস থ্রি তে, তখন ইলিনার জন্ম হয় এ বাসাতেই ৷ আর বেলা এখন কলেজে পড়ে ৷ ইলিনা ক্লাস ফাইভ ৷ ওদের নতুন স্কুল কলেজের বন্ধু রা ই বা কেমন হবে সেটাও ওদের চিন্তার একটা মুখ্য বিষয়! শুনেছে সেদিকে নাকি স্কুল কলেজ তেমন ভালো নেই বললেই চলে ৷ কি যে হবে.....
-
স্থানীয় পোস্ট অফিসে চাকরী করে বধিনাথ ৷ যাতায়াত করে রোজ সাহেব বাংলোর সামনে দিয়েই ৷ নিত্য দিনের যাতায়াতে বিশ বছর ধরে তার সঙ্গী একটা ফনিক্স সাইকেল ৷ কালো রঙের সাইকেল টা বধিনাথের খুব প্রিয় ৷ নিজের সন্তান তে যতটা ভালোবাসে, সাইকেলের প্রতি টানা চার চেয়ে খুব কম নয় ৷ চাকরীর শুরুর দিন থেকেই এটা তাকে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে ৷ তবে পুরোনো হয়েছে, কলকব্জায় জং ধরেছে ৷ যেকোনো দিন দেখা যেতে পারে চলতি পথেই ধরায় করে কোনো পার্টস খুলে গিয়ে বধিনাথ উল্টে পড়েছে রাস্তায় পাশের বিলে কিংবা খাদে! 
যথারিতি সেদিনও বোধিনাথ সন্ধের পর সাইকেল করে বাড়ি ফিরছিলো ৷ সাহেব বাংলোর সামনে এসে সাইকেলে টা হঠাত চালানো থামালো ৷ তারপর বড় গেইটের লোহার শিক গুলোর সাথে সাইকেল টা তালা মেরে ছোট গেইট দিয়ে বাংলোর সীমানার ভেতর প্রবেশ করলো ৷ সন্ধার পর এদিকটায় লোকের যাতায়ত কমে যায় ৷ লোকজন কাজ সেরে বিকেলের আগেই ঘরে ফেরে ৷ প্রত্যন্ত এলাকায় রাত আটটা মানেই অনেক রাত ৷ বধিনাথ গাঢ় অন্ধকার চিড়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ম্যাচ দিয়ে ধরালো , মুহুর্তে একটা আলোর ঝলকানি উঠে আবার নিভে গেলো ৷ তারপর রয়ে গেলো কেবল সিগারেটের মাথায় জ্বলতে থাকা লাল একটা আগুনের কুন্ড ৷ সেটি এগিয়ে চললো সুধার ঘরের দিকে ৷
-
সুধার দরজায় ঠকঠক শব্দ হচ্ছে ৷ কে আসতে পারে রাতের বেলা ? নিশ্চই বধিনাথ ৷ সে ছাড়া অন্য কেউ হুটহাট বাংলোর ভেতর ঢোকার সাহস পায় না ৷ সে সরকারি চাকুরে বলে তার বিশেষ অধিকার বলে সে যখন তখন বাংলোর তদারকি করার ছুতোয় ভেতরে চলে আসে ৷ ব্যাপার টা সুধার একবারেই ভালো লাগে না ৷ মুখের উপর কিছু বলারও নেই ৷ উচু পদস্থ বাবু দের সাথে বধিনাথের খুব খাতির ৷ সুধা ভালো মন্দ কিছু বললে বধিনাথ শেষে কি থেকে কি করে বসে কে জানে ৷ তাই সুধা বেশী ঘাটাঘাটি করে বধিনাথের বিষয়ে ৷ উপর দিয়ে খুব ভক্তি প্রদর্শন করলেও ভেতরে ভেতরে সুধা বধিনাথ কে ঘৃণা করে ৷ লোকটার চোখ এত খারাপ যে বলার না ৷ এ লোক সুধার বুকের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কথা বলতে পারে না ৷ কিছু মানুষ আছে যারা কিনা সামনে দাড়িয়ে থাকা মেয়ে মানুষ টার বুকের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাখতেই পারে না, চাইলেও পারে না, এদিক ওদিক করে আবার চোখ গিয়ে পড়ে ও জায়গাতেই ৷ মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার ক্ষমতা সবার থাকে না ৷ বধিনাথ সে শ্রেনীর ৷ নিজের যুবতী মেয়ের দিকে কিভাবে তাকায় কে জানে ৷ এরা হয়তো তখন সরাসরি নিজের যুবতী মেয়েটার দিকে না তাকিয়ে অন্য দিকে ফিরে কথা বলে, হয়তো দেয়াল ঘড়ির দিকে নয়তো জানলা দিয়ে দূরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করার ছলে বাইরে তাকিয়ে থাকে ৷ হায়! কি অভাগা তারা ....
তার মৃত স্বামী বিধান ডোমের একটা ছ ইঞ্চি মত লম্বা ছুড়ি ছিলো ৷ তোশকের তলায় রাখা থাকতো সবসময় ৷ সুধা সে ছুড়ি টা কোমরে গুজে শাড়ি দিয়ে ঢেকে দরজা না খুলেই বললো, কে?
- আমি রে, তোর বধি দা ৷ দরজা টা খোল ৷
-ও, দাড়ান খুলছি ৷
সুধা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো ৷ দূরে কোথায় ঝি ঝি পোঁকা ডাকছে, নিঝুম রাত, আকাশে ততক্ষণে চাঁদ উঠে গেছে ৷ 
বধিনাথ তেলে হাসি হেসে বললো , এদিক দিয়েই বাড়ী ফিরছিলাম, হঠাত সাইকেলের চেইন টা খসে পড়লো , চেইন তুলতে নেমে যখন দাড়ালামই, ভাবলাম, তোর একটু খোঁজ নিয়ে যাই ৷ হে হে....
সুধা বললো , ভালো করেছেন ৷ আমি সব কাজ গুছিয়ে ফেলেছি ৷ কাল তো নতুন সাহেব আসবে, তাই না?
- হ্যা রে ৷ কালই আসবে ৷ তোর একলা থাকার দিন ঘুচবে ৷ সাহেব এলে তো তোর কপাল খুলবে ৷ ভালো মন্দ রান্না করবি , খাবি , নতুন শাড়ি পাবি উৎসব পার্বনে ৷ টাকা পয়সাও বকশিস পাবি সাহেব পত্নীদের কাছে থেকে ...
সুধা ম্লান হাসি দিলো ৷ বদজাত টা কি এসব বলার জন্যই এত রাতে এসেছে? 
বধিনাথ বললো , হ্যা রে সুধা, এই যে তুই এত বড় বাংলো তে একা একটা মেয়ে আছিস, তোর ভয় করে না? 
বধিনাথের চোখ দুটো বরাবরের মতই তার প্রিয় জায়গায় স্থির হয়ে আছে, চকচক করছে যেন ৷ ঠিকরে বেরিয়ে আসবে কি না কে জানে! 
সুধা বললো, কিসের ভয় দাদা?
- এই ধর ভূত প্রেতের ৷ তাছাড়া মানুষেরও ভয় তো আছে ৷ সময় বিশেষে মানুষই ভূতদের চেয়ে বেশী ভয়ংকর হয়ে উঠে জানিস তো! 
সুধা হাই তুলে ঘুম পাবার মত ভঙ্গি করে বললো , আমার এত ভয় ডর নেই ৷
বধিনাথ বললো, ভয় নেই তা না হয় বুঝলাম, এই যে তুই একটা ভরা যুবতী মেয়ে, এত সুন্দর হইছিস দেখতে ,গায়ে গতরেও ....ইয়ে , একা থাকতে কষ্ট হয় না? 
সুধা স্পষ্টই বুঝতে পারছে, বদ টা কি বলতে চাইছে, তবু সে না বোঝার মত করে বললো, না দাদা , কোনও কষ্ট হয় না ৷ আপনি কি আরো কিছু বলবেন? নয়তো আমি এখন ঘুমুবো ৷ সারাদিন অনেক খাটাখাটনি গেছে ৷
বধিনাথ বললো , তা তোর শরীর দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একেবারে ঘেমে নেয়ে আছিস ৷ আহা রে! আয় তোর শরীর টা একটু টিপে দিই, গা হাত পা মালিশ করে দিই ৷ কত পরিশ্রম করেছিস সারা দিন, আজ তোর স্বামী বেঁচে থাকলে তো .....
বধিনাথ কথা শেষ করার আগেই সুধা কোমরের খাঁজ থেকে ধারালো ছুড়ি টা বের করে ছুড়ির সূচালো ডগায় ফুঁ দিতে দিতে বললো, তার দরকার হবে না বধি বাবু, আপনি এখন যেতে পারেন.....


Bangla Short Story


সুধার হাতের ধারালো ছুড়ি টা দেখে ঘাবড়ে গেলো বধিনাথ ৷ দু পা পেছনে সরে গিয়ে বললো, একি কান্ড! তোর হাতে ছুড়ি কেনো? মাইয়া মানুষের হাতে থাকবে চুড়ি ফিতা নেইলপোলিশ! ছুড়ি চাকু মাইয়া মাইনষের হাতে মানায় না ৷ সরা এসব চোখের সামনে থাইকা ৷ দেখলেও ভয় করে ৷
সুধা ছুড়িটা আগের মতই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো ৷ শাড়ির আচল দিয়ে ছুড়ির ফলা টা মুছতে মুছতে বললো , ছুড়ি দিয়ে ফল সবজি কাটি বধির বাবু ৷ এছাড়াও কখন কি কাটার দরকার পড়ে বলা তো যায় না ৷ তাই সবসময় সাথে রাখি ৷ আপনের ভয় পাবার কারণ নেই ৷ আপনি তো আমার ভক্তির মানুষ, সারাদিন পরিশ্রম করছি দেখে শরীর মালিশ করে দিতে চাইছেন, আহা! কি দরদ আমার জন্য! আপনের বুকে কি আমি কখনো ছুড়ি চালাতে পারি বধিনাথ বাবু?
বধিনাথ বোকা হাসি হেসে বললো, ও ,বুঝছি, আমার কথায় তুই খুব রাগ হইছিস, হে হে , আমি কি তোর সাথে একটু আমোদ রসিক কথাও বলতে পারি না? তোর স্বামী বিধান আমার কত প্রিয় মানুষ ছিলো তা তো তুই জানিস ৷ রাগ করিস না মা ৷ আমি ভাবলাম তুই একা একা সারাদিন থাকিস, মন টন খারাপ থাকে, দুটা কথা বলার লোক নাই, তাই তোর সাথে একটু ইয়ে .....
আমার গা ব্যাথা হইলে শরীর মালিশ করবো না গায়ে আগুন দিয়া মরবো সেই চিন্তা আপনের করতে হবে না ৷ আগামীকাল থেকে বাংলো বাড়ীতে নতুন সাহেব আসবে , আপনে যদি চান সাহেবের কাছে আপনের নামে নালিশ না করি তবে এক্ষুণি বাংলো থাইকা বের হয়ে যান ৷ আর কখনো আইসেন না ৷
এই বলে সুধা সশব্দে ঘরের দরজা লাগিয়ে দিল ৷ বধিনাথ ভয় পেয়েছে ৷ তার পা ঠকঠক করে কাঁপছে ৷ সুধা কে যথেষ্ট নরম শরম মেয়ে মনে হয় দেখে, কিন্তু ওর ভেতর যে সাক্ষাৎ বারুদের গোলা তা তো আগে কখনো বোঝা যায়নি ৷ বদিনাথ মন্ত্র জপতে জপতে বাংলো থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ৷ সাইকেলে উঠে কাঁপা কাঁপা পায় দ্রুত পেডেল মারতে লাগলো .....

এ অঞ্চলের নতুন প্রাণী সম্পদ কর্মকতা অনুপ ব্যানার্জি ৷ স্ত্রী সুরমা আর দুই মেয়ে, বেলা, ইরিনা কে নিয়ে সরকারি একটা লক্কর মার্কা জীপ এ করে এই মাত্র তার জন্য ঠিক করে রাখা পুরোনো ধাচের একটা বাংলোর সামনে নামলেন ৷ ফেয়ারওয়েল এর দিন সহকর্মী রা যেমন বলেছিলো এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে তেমন আহা মরি মরি কিছু তো না ৷ চারপাশে ধুলাবালির ছড়াছড়ি ৷ গাছ পালা কিছু আছে তবে সবই চেনা জানার মধ্যেই ৷ অবাক হয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করার মত কিছু নেই ৷ তবে বাংলোর সামনে থেকে দাড়ালো সবচেয়ে আকর্ষণীয় যা চোখে পড়ে তা এই বাংলোটা ৷ আশেপাশে আর তেমন কোনো বসতি বাড়ি নেই ৷ একটু সামনে দিয়ে লাল ইটের পাকা রাস্তা চলে গেছে বহু দূরে কোথায় যেন, অনুপ ব্যানার্জি এখনো এ অঞ্চলের কিচ্ছু চেনে না ৷
জীপ থেকে নেমেই তার দুই মেয়ে বেলা আর ইরিনা বললো, ওয়াও! কি ন্যাচারাল বিউটি! যেনো সত্যজিৎ রায়ের কোনো ছবির গল্প! Ancient পেরিওডের মত বাংলো , গাছপালা চারদিকে ৷ কি চমৎকার জায়গা রে ইরিনা!
হু দিদি ৷ ঠিক বলেছিস ৷ দেখ বাংলোর প্রাচীরে কি সব নকশা! যেনো কোনো জমিদার বাড়ী! হাতি ঘোড়ার ছবি ৷ তীর ধনুক! অ্যামেজিং ...ওরা হেঁটে হেঁটে সামনে যেতে লাগলো ৷
সুরমা মেয়েদের বললো , মেয়েরা এদিকে এসো, আমার পাশে এসে দাড়াও ৷ এখন ঘুরোঘুরি বন্ধ ৷ এখন আমার পাশে এসে দাড়াও ৷
বধিনাথ আর আরো কয়েকজন পেয়াদা টাইপ লোক মূল গেইটের সামনেই দাড়িয়ে ছিলো তাদের অপেক্ষায় ৷ নামা মাত্রই তারা সাহেবের লাগেজ গুলো নিতে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিলো কে কোনটা কার আগে নেবে ৷ জীপের শব্দ শুনে সুধাও বের হয়ে এসেছে ৷ তার মাথায় বড় করে ঘোমটা দেয়া ৷ সাদার উপর হালকা খয়েরী কাজের শাড়ী পরেছে সে ৷ চুল আঁচড়েছে তেল দিয়ে, চোখে কাজল দিয়েছে হালকা , ঠোঁট ফ্যাকাসে ৷ তাই বলে যে তাকে দেখতে বেমানান লাগছে তা নয় , যেন এতে আরো বেশী স্নিগ্ধ লাগছে ৷ সুধা অনুপ ব্যানার্জির সামনে এসে প্রণাম করলো ৷ পা ছুঁয়ে মাথায় ধূলি নিয়ে বললো, বাবু আমি সুধা ৷ অনুপ বললো, থাক হয়েছে ৷ ভালো আছো তুমি?
- জ্বী ভালো ৷
সুরমা বললো, বাহ কি মিষ্টি দেখতে গো তুমি! রান্নার দায়িত্বে বুঝি তুমি আছো?
- হ্যা ৷ রান্না ,ঘরদোর গোছানে, সব ৷
- বাহ বেশ বেশ ৷
সুধা ছুটে গেলো বেলা আর ইরিনার দিকে ৷ ইরিনা কে গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলো ৷ বেলা অনেকটা বড় হয়ে গেছে ৷ তাকে তো বাচ্চাদের মত আদর করা যায়না ৷ সুধা হেসে বললো, দিদিমণি ভালো আছেন?
বেলা বললো হ্যা ৷ ভালো ৷
তিন জনের কেউই আর কোনো কথা খুঁজে পেলো না ৷

মালপত্র সব গাড়ি থেকে নামিয়ে নিচ তলার বারান্দায় রাখা হলো প্রথমে ৷ তারপর অনুপ আর সুরমা মিলে পেয়াদা দের নির্দেশনা দিলো কোনটা কোথায় রাখবে ৷ দু ঘন্টার মধ্যে মোটামুটিভাবে সব গোছানো হয়ে গেলো ৷ ঠিক হলো নিচ তলার একটা রুমে থাকবে অনুপ আর সুরমা, অন্য একটা ঘর বসার রুম, একটা ঘর তো যথারীতি রান্নাঘর, আর উপরের তলার তিনটে রুমের মধ্যে দুটো রুম আপাতত ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না, কেবল একটা রুম খোলা হলো , নিচ তলা থেকে সিড়ি দিয়া ওঠার পরই যে রুম টা, ওটায় থাকবে বেলা আর ইরিনা ৷

ঘরের জিনিষপত্র গোছানের কাজে সুধাও অনেক সাহায্য করেছে ৷ রান্না চড়াতে তাই খানিকটা দেরী হয়ে গেছে ৷ এদিকে বেলা আর ইরিনা তাদের মা কে বলছে মা ক্ষুধা লেগেছে তো ৷
সুধা বলেছে , দিদিমণি রা, আর মাত্র বিশ মিনিট সময় দেন ৷ মুরগির মাংস রান্না শেষ, ডালও শেষ, ভাত টা শুধু বাকী, বিশ মিনিটের বেশা লাগবে না ৷
সুরমারও খিদে পেয়েছে ৷ সে অবশ্য মুখে কিছু বলছে না ৷ একা মেয়ে কত দিক সামলাবে ৷ করুক ধীরে ধীরে ৷
সুরমা তার মেয়েদের বললো, তোমরা বরং এক কাজ করো, উপরের তলায় যাও, তোমাদের থাকার রুম কেমন হলো তা দেখে আসো ৷আমি একটু পর আসছি ৷
বেলা বললো, বাবা কোথায় মা?
তোমাদের বাবা গেছে তার অফিসে দেখা করতে ৷ এখান থেকে নাকি কাছেই, পনেরো মিনিট লাগে গাড়িতে ৷ এসে পড়বে একটু পরই ৷
বেলা আর ইরিনা দুজন উপর তলায় চলে এলো ৷ অনেক গুলো সিড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয় ৷সাধারণ ভবন গুলোর তুলনায় এটা অনেক বড় ৷ সাধারণ তিন তলার সমান যতটুকু উঁচু এ বাংলোর দুই তলা সমানই যেনো ততটুকু উচু ৷ বেলা আর ইরিনা লম্বা করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো ৷ রুম গুলোর সামনে নম্বর দেয়া ৷ ওদের জন্য একেবারে সবার প্রথম রুমটাই ৷ রুম নম্বর ২০১ ৷ এর পর ২০২, এর পর ২০৩ নম্বর রুম , যা এক সময় স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো ব্রিটিশ পেরিওডে ৷
বেলা প্রথমে নিজেদের রুমে ঢুকলো ৷ রুমে তাদের চেনা খাট টাই বেছানো ৷ তবে যে টেবিল টা আছে, সেটা বোধয় এখানে আগে থেকেই ছিল ৷ বেতের চেয়ার আছে দুটো ৷ একটা ড্রেসিং টেবিল, এতে সব প্রসাধনী রাখা হবে ৷ একটা কাভার্ড আছে ৷ তবে সবগুলো আসবাব কালো রঙের বার্নিশ করা ৷ পুরোনো আমলের জমিদার দের আসবাব যেমন হতো তেমন ৷ টেবিলের ওপর একটা মোমদানীও আছে দেখা যায় ৷ একটু আধপোড়া মোম ওতে গাঁথা ৷ বেলা মোমদানী টা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো ৷ ইরিনা বড্ড বেশী ক্লান্ত হয়ে গেছে বোঝাই যাচ্ছিলো ৷ ছোট মানুষ ৷ সে জামাকাপড় না পাল্টেই ঝপ করে বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়লো ৷ বেলা টেবিলের পাশে রাখা দুটো বেতের চেয়ারের একটায় বসে মোমদানী তে করা কাঠের উপর চমৎকার ডিজাইন টা অভিভূত হয়ে দেখতে লাগলো ৷ একটা নর্তকীর অবয়বে করা হয়েছে এটা ৷ নর্তকীর হাতের তালুতে চোখা কাটা ,ওতে মোম গাঁথা হয় ৷
চমৎকার জিনিষ ৷
হঠাত ইরিনার চিৎকারে চমকে উঠে লাফিয়ে দাড়ালো বেলা ৷ ইরিনা বললো , দিদি, একটু আয় তো, দেখ এটা কি....! 

Bangla Books Free Download
আতংকে নীল হয়ে উঠা ইলিনা বেলা কে জড়িয়ে ধরে বললো, দিদি, এই যে, খাটের পাশে, দেয়ালের কোণায় তাকিয়ে দেখ ..
বেলা তাকালো ৷ তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো কিছুক্ষণ সেদিকে ৷ তারপর ইলিনা কে বললো, ধুর বোকা, এটা তো একটা মানুষের মুখের ছবি, কেউ আঁকতে চেষ্টা করেছিলো বোধহয় দেয়ালের মধ্যে ৷ ঠিকমত আঁকতে পারেনি ৷ এটা দেখে ভয় পাবার কি আছে?
ইলিনা ততক্ষণে অনেকটাই শান্ত হয়েছে ৷ সে বেলার দু বাহুর বেষ্টনী থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বললো, হুম , হঠাত দেখে এত ভয় লাগলো, চমকে উঠেছিলাম ৷ ও কিছু না ৷ স্যরি, তোকেও চমকে দেবার জন্য ৷
বেলা খুব অবাক হলো ইলিনার এমন গুরুগম্ভীর ব্যবহার দেখে ৷ যেন তার বয়স ১৩ নয়, হঠাত যেন ৪৩ হয়ে গেছে ৷ এমন ছোটো একটা বিষয়ে ভয় পেয়েছে বলে যেন সে খুব বিরক্ত নিজের উপর ৷ ইলিনা বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাড়াল ৷ দোতলা ঘর থেকে জানাল দিয়ে বাইরে তাকালে আদিগন্ত খোলা প্রান্তর ৷ হেমন্তের শেষ, তাই যেন একটু শীতের ছোয়া লাগতে শুরু করেছে চারপাশে সন্ধার পরপরই ৷
বেলা নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করলো , ধুর! শুধু শুধু মেয়েটাকে মন খারাপ করিয়ে দেবার জন্য নিজেকেই দায়ী মনে হতে লাগলো ৷ এভাবে না বললেই পারতো সে ৷ ভয় পাবার কিছু নেই কে বলেছে? অতটুকু মেয়ে আচমকা নতুন একটা রুমে এসে যদি দেখে বিছানার কোণায় দেয়ালের একদম নিচের দিকে একটা কুৎসিত করে আঁকা মুখের ছবি, তা আবার লাল আর কালো রঙের কালি দিয়ে , চোখ দুটো কেমন টলটল করে তাকিয়ে আছে যেন নিজের দিকে , মুখটা কেমন বিদঘুটে রকম হাসি হাসি, দেখে গা হিম হয়ে যায় ৷ ইলিনা ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক ৷ তার নিজের আরো নমনীয় হওয়া দরকার ছিল বোনের সাথে ৷
বেলাও উঠে গিয়ে ইলিনার পেছনে যেয়ে দাড়াল ৷ মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে বুঝি ৷ এত অভিমানী হয়েছে বোনটা, একটু কড়া গলায় কিছু বললেই হলো, থম মেরে বসে থাকে ৷
বেলা ইলিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো , রাগ করেছিস ইলু?
ইলিনা অস্বাভাবিক রকম শান্ত গলায় বললো , রাগ করি নি ৷ বলে একটু হাসলো ৷ দায়সারা হাসি ৷
বেলা বললো, তবে যে হঠাত গম্ভীর হয়ে গেলি ৷ বড় দিদির কথায় এত রাগ করতে আছে? ৷ আর আমি কি ই বা খারাপ বলেছি তোকে?
সুধা এসে দরজায় আঘাত করতে লাগলো , ' দিদিমনি রা, খাবার তৈরি, জলদি খেতে আসেন ' ৷
বেলা বললো, ঐ যে খাবার রেডী, চল চল, তোর না খুব খিদে পেয়েছে ৷ আমার নিজেরও বড্ড খিদে পেয়েছে ৷ যা লম্বা জার্নি করেছি আজ ৷ নে আয়..
ইলিনা কথা না বাড়িয়ে এক কথায় নিচে নেমে এলো ৷ বেলা মনে মনে শুকরিয়া কামনা করলো, যাক বাবা, মেয়ে যা নমুনা দেখাচ্ছিলো, এক কথায় খেতে এসে পড়বে ভাবাই যায়নি ৷ হয়তো গুরুগম্ভীর ভাবে বলে বসতো ' এখন খিদে নেই, পড়ে খাবো......

খাবার টেবিল টা ডিমের মত ৷ চারদিকে চেয়ার পাতা ৷ টেবিলটা আগে থেকেই ছিলো ৷ যাক আগে যে অফিসার থাকতো সে সব জিনিষ সাথে করে নিয়ে যায়নি ৷ এদিক থেকে অনুপ ব্যানার্জির বেশ সুবিধাই হলো ৷ নতুন কিছু আসবাব ব্যবহার করা যাবে ৷
খাবার টেবিলে বসেছে অনুপ, সুরমা, বেলা, ইলিনা ৷ সুধা সবাইকে প্লেটে খাবার তুলে তুলে দিচ্ছে ৷ সবাই কে দু চামচ করে ভাত প্লেটে তুলে দিতে দিতে সুরমা ইলিনার কাছে গেলো ৷ সাহেব দের প্লেটে অল্প করে ভাত দিতে হয় প্রথমে, এটা আগের বারের যে সাহেব ছিল তার কাছ থেকে শিখেছে সুধা ৷ সাহেব দের প্লেটে প্রথমেই এক গামলা ভাত বেড়ে দিলে তারা বেজায় বিরক্ত হন, দেখতেও খারাপ দেখা যায়, সাহেব রা কুলি মজুর কিংবা খেতের কামলা না যে লুঙ্গি কাছা মেরে কব্জি ডুবিয়ে পালং শাক আর মলা মাছের ঝোলের তরকারি লবণ দিয়ে ডলে ঘপ ঘপ করে গিলবে হাতের কব্জি পর্যন্ত ডুবিয়ে ৷
ইলিনার প্লেটে দু চামচ ভাত তুলে দিলো সুধা ৷ ইলিনা হঠাৎই বিষ্ফোরিত চোখে তাকালো সুধার দিকে ৷ থমথমে গলায় বললো, আরো ভাত দাও .....
বেলা ফস করে হেসে ফেললো বোনের কথা শুনে ৷ যে মেয়ে দু চামচ ভাতই কোনোদিন ঠিকমতো খেয়ে শেষ করতে পারেনা সে কিনা বলছে আরো ভাত দিতে....
বোঝাই যাচ্ছে ইলিনা এখনো ক্ষ্যাপে আছে ৷ তাই রাগের চোটে এমন করছে ৷
সুরমা বললো, ইলু, আহারে মা আমার , খুব খিদে পেয়েছে তাই না, সারাদিন কত ধকল গেছে,
সুধা আরো দু চামচ ধোয়া ওঠা গরম ভাত তুলে দিলো ইলিনার প্লেটে ৷
মুরগির মাংস আর ঘন মুগ ডাল খাবারের আইটেম ৷ আজ তাড়াহুড়োয় খুব বেশী কিছু করতে পারেনি সুধা ৷ তবে সারাদিন পর পেট পুরে এই দিয়েই খুব তৃপ্তি করে খেতে লাগলো সবাই ৷ ইলিনা আর সুরমা যথারিতি এক প্লেট ভাত শেষ করে আরো আধা চামচ ভাত বেশী নিলো ৷ অনুপ ব্যানার্জি সুধার রান্নার খুব প্রসংশা করলো ৷ এভাবেই চলতে লাগলো খাওয়ার পর্ব ৷ খেতে খেতেই বেলা আর সুরমা সুধার সাথে গল্প জুড়ে দিলো এখানকার মার্কেট প্রসাধনী সামগ্রী শাড়ি জামা কাপড়ের দোকান কোথায় ভালো বিশেষত্ব কি এসব নিয়ে...
কারো চোখে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ল না ৷ শুধু অনুপ ব্যানার্জি খাবার সেরে উঠে হাত ধুয়ে আসার পরও দেখলো তার ছোটো মেয়ে ইলিনা তখনো খেয়েই যাচ্ছে, দ্রুত গতিতে ভাত মাখাচ্ছে আর তুলনামূলক বড় নলা বানিয়ে মুখে দিচ্ছে ৷ আহা, মেয়েটার আজ বড্ড খিদে পেয়েছে, খাক.......

বেলা আজ সারাদিন একবারো রাজুর সাথে শান্তি করে দুটো মিনিট সময় নিয়ে কথা বলতে পারেনি ৷ রাজু তার বয়ফ্রেন্ড ৷ আগে যে কলেজে বেলা পড়তো ওখানেই রাজুর সাথে ওর পরিচয় ৷ অসম্ভব মেধাবী আর হ্যান্ডসাম ৷ বেলার খুব পছন্দ ছিলো রাজু কে শুরু থেকেই, তবে মুখ ফুটে কিছু বলতো না ৷ বন্ধুত্ব হলো , বন্ধুত্ব টা কে রাজুই একদিন প্রেমে প্রমোটেড করলো ....
বেলা সারাদিন ছিলো শিফটিং এর ঝামেলায়, আর বাবা মায়ের সামনে গাড়িতে বসে তো আর সব কথা প্রফুল্ল ভাবে বলা যায় না ৷
রাতের খাবার খেয়ে তাই সে দু তলায় উঠে গেলো ৷ লম্বা বারান্দা জুড়ে সুনসান নীরবতা ৷ তাদের রুমের সামনে কেবল লাইট জ্বলছে,বাকী দুটো সামনে অন্ধকার ৷ বেলা মোবাইলে রাজুর নম্বর ডায়াল করতে করতে বারান্দার অন্ধকার দিকটায় এগিয়ে গেলো ৷ চমৎকার লাগছে বেলার ৷ কি সুন্দর পরিবেশ ৷ নিঝুম রাত, চারপাশে কোনো গাড়ির হর্ণ নেই, কোলাহল নেই, প্রতিবেশীর চেচামেচি নেই, মনে হয় চিন চেনা নগর জীবন থেকে এই দূর অরণ্যর অপরিচিত অচেনা জীবন ঢের বেশী সুন্দর, মোহনীয় ......
: হ্যালো , রাজু, কেমন আছো সোনা, এই না না, একদম রাগ করে না, আগে শোনো না, কত ব্যস্ত ছিলাম সারাদিন, কত কথা জমে আছে........

ফোনে কথা বলা শেষে বেলা তাদের নতুন ঘরটিতে এসে দারুণ একটা শক খেলো ৷ এমন দৃশ্য তার জন্য অপেক্ষা করছে তা কোনোদিন কল্পনাই করেনি ও ৷
ইলিনা মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, মনে হয় জ্ঞান হারিয়েছে, বমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলেছে, একটু আগে যা খেয়েছে সব বের করে দিয়েছে, বমির সাথে লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, সর্বনাশ!
বেলা চিৎকার করে তার বাবা মা কে ডাকতে ডাকতে সিড়ি দিয়ে নিচতলায় নামতে লাগলো

আকস্মিক বেলার চিৎকার শুনতে পেয়ে দ্রুত বাইরে বের হলো বেলার বাবা অনুপ ব্যানার্জি আর সুরমা ৷ তারা দেখলো তাদের মেয়ে বেলা দৌড়ে সিড়ি দিয়ে নামছে আর বলছে বাবা, মা তোমরা কোথায়! এক্ষুনি উপরে আসো,,
অনুপ বাবু মেয়ের এমন আচরণের কারণ বুঝতে পারলেন না ৷ মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? এমন করছো কেন তুমি?
বেলা বললো , ইলিনা অজ্ঞান হয়ে গেছে ৷ বমি করে ঘর ভাসিয়ে ফেলেছে ৷ সাথে রক্ত ...
সুরমা আর অনুপ রীতিমত লাফিয়ে লাফিয়ে সিড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে লাগলো বড় মেয়ে বেলার মুখে ছোটো মেয়ের এমন আকস্মিক বিপর্যয়ের কথা শুনে ৷

ইলিনার চোখে মুখে পানির ছাট দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হয়েছে ৷ মেয়ের মাথার কাছে বসে আছে সুরমা ৷ বেলা আর বাবা দু জন দু পাশে ৷ ইলিনা পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে ৷ সুরমা মেয়ের হাতটা ধরে বললো , কি হয়েছিলো মা তোমার? অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেনো ?
ইলিনা বললো , আমি কি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম?
:হ্যা, তুমি বমি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে ৷ বেলা বললো ৷
: ও ৷ কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম?
: প্রায় পাঁচ মিনিট ৷
অনুপ বেলা কে ধমকে বললো এই তুমি চুপ করো তো ৷
তারপর ছোটো মেয়ের গালে হাত দিয়ে বললো , এখন কেমন লাগছে ?
: ভালো ৷ তবে মাথা টা খুব হালকা লাগছে ৷ শরীর টাও ৷
অনুপ বললো , এবার বলো তো মা কি হয়েছিলো তখন?
ইলিনা বললো, পানি খাবো ৷
তাকে পানি এনে দিলো সুধা ৷ সে এতক্ষণ পাশেই দাড়িয়ে ছিল ৷ পানি খাবার পর ইলিনা বলল‌, ভাত খেয়ে উপরে আসলাম ৷ জানালা টা বন্ধ ছিল, ভাবলাম খুলে দিই, বাতাস আসবে ...
হু, তারপর ..
জানালা খুলতেই একটা গরম বাতাস গায়ে লাগলো, পেট টা গুলিয়ে উঠলো ,আর প্রচন্ড বমি পেলো, বমি করে দিলাম.......
অনুপ বাবু বললো, আহা, খুব কষ্ট পেয়েছো বুঝি? খাবার টা বোধহয় হজম হয়নি ৷
অনুপ তাকালো সুধার দিকে ৷ সে ই রান্না করেছে ৷ সুধা চোখ ফিরিয়ে নিলো, নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো ৷
বেলা বললো , খাবার হজম হবে কি করে? পেটে জায়গা দু চামচের, খেয়েছে দশ চামচ! হা হা হা ৷
বোনের জ্ঞান ফিরে আসায় বেলা অনেক খুশি ৷ সুরমা দিলো এক ধমক! বোন অসুস্থ আর তুমি রসিকতা করছো? ছিঃ
বেলা চুপ করে গেলো ৷
অনুপ বললো , সারাদিন জার্নি করে এসেছে তো, সহ্য হয়নি ৷
সুরমা বললো , কিছু খাবে মা? কি খাবে?
অনুপ বললো ,আমি দেখি কোথাও দই টই পাওয়া যায় কিনা ৷ দই খেলে ভাল্লাগবে ৷
অনুপ সুধা কে বললো , আচ্ছা সুধা , আমি তো এদিকের কিছু চিনি না, পথ ঘাট , আজই প্রথম এলাম, মেয়ের শরীরটা খারাপ ,তুমি কি জানো কোথায় দই মিষ্টি পাওয়া যায়?
জ্বি বাবু , জানি ৷ সুধীর গোয়ালার বাড়ী ৷
ও ৷ তা কত দূর সেটা?
দূর বেশী না ৷ মাইল দুই হবে ৷ আমি যাবো আনতে?
অনুপ ঘড়ি দেখলো ৷ রাত সাড়ে দশটা বাজে ৷ শহরে এটা খুব বেশী রাত না হলেও ওখানে এটা অনেক রাত ৷ পুরুষ মানুষই এত রাতে ঘর ছেড়ে বের হয় না ৷ চোর ডাকাত তো আছেই, বিধান ডোমের মৃত্যুর পর ভূত প্রেতের ভয়ও মানুষের মনে জেঁকে বসেছে ৷
তবে অনুপ সেসব সম্বন্ধে কিছুই জানে না ৷ সে বললো, তুমি একা যেতে পারবে তো?
সুধা একটু দোলাচলে পড়ে শেষে বললো হ্যা বাবু পারবো ৷
অনুপ সুধা কে দু কেজি দই আনতে পাঠিয়ে দিল ৷ যাবার আগে অনুপ বাবু দেখছিলো সুধা গলায় কিসের একটা চিহ্ন দেয়া তাবিজ গলায় পড়ে নিলো, তারপর ওটায় চুমু খেয়ে বললো, আসি বাবু ৷
অনুপ বললো, এটা কি?
এটা শরীর বাঁধার তাবিজ ৷ বাবা শংকরাচার্যের মন্ত্র এতে লেখা আছে ৷ এটা থাকলে কোনো ভূত প্রেত ধারে কাছে আসার সাহস পায় না ৷
অনুপ মনে মনে হাসলেও, মুখে বললো, তুমি কি ভয় পাচ্ছো ? দেখো ভূত যেনো আবার দইয়ের হাড়ি না খেয়ে সাবাড় করে ফেলে ...
সুধার পা দুটো একটু একটু কাঁপছিলো, এটা কি ঠান্ডার কারণে না ভূতের ভয়ে কে জানে ৷
সুধা বললো, আচ্ছা বাবু, আসি ৷
রাত এগারোটা নাগাদ সুধা বেরিয়ে পড়লো বাংলো থেকে, গন্তব্য দু মাইল দূরের পথ , সুধীর গোয়ালার বাড়ী .


ঘুটঘুটে অন্ধকার এতটাই জীবন্ত হয়ে আছে চারদিকে, যেন অন্ধকারেরাও ফিসফিস করে কথা বলছে নিজেদের সাথে , সুধা এর মধ্য দিয়েই হেঁটে চললো সুধীর গোয়ালার বাড়ী ৷ বড় বাবু ,যিনি আজই এসছেন বাংলো তে , অসুস্থ মেয়ের জন্য দই কিনে আনতে বললেন, সুধা ই বা না করে কিভাবে , রাত যতই হোক , সে ও বাংলোর দাসী এক রকম, কর্তার অনুরোধ তাকে মানতেই হবে ৷ সুধা অন্ধকার কেটে এগুতে লাগলো ৷ অন্ধকারে পথ চেনা তার জন্য কোনো কঠিন কাজ না ৷ এ পাড়ার অলিগলি তার খুব ভালো করে চেনা ৷ চোখ বেঁধে দিলেও সে ঠিক চিনে নিতে পারবে ৷ ভয় টা তার অন্য জায়গায় ৷ ছোটো বেলা থেকেই বাবা ঠাকুরদা দের মুখে শুনে এসেছে এক চোখ কানা, খোঁড়া ভয়ংকর সব পিশাচের গল্প ৷ যারা কিনা অপঘাতে মারা যায় তাদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায় নিজের বাড়ীর আশে পাশে ৷ সুযোগ পেলেই ঘাড় মটকে দেয় , পুতে রাখে বিলের হাঁটু জলে ৷ সে যাই হোক,
সুধার সবচেয়ে বেশী ভয় লাগে আজকাল তার মৃত স্বামী বিধান ডোমের মরা আত্নার কথা ভেবে ৷ শত হলেও তো অপঘাতে মৃত্যু , স্বামী হোক আর যে ই হোক ৷ যদি পূর্বেকার কোনো ক্ষোভ থাকে তার উপর , বাংলো বাড়ীতে ঝি গিরি করে আর খেতে হবে না, সোজা শ্মশানঘাট যেতে হবে ৷
সুধা সুষম ছন্দের তালে হাঁটতে থাকে ৷ সরু হয়ে আসা পেট টা কোমর থেকে তুলির আঁচড়ে আঁকা শিল্পির নিখুত ছবির মত সুঢৌল হয়ে নেমে এসেছে ৷ টান হয়ে এঁটে থাকা শাড়িতে শরীর ঠিকরে বেরুচ্ছে ৷ তবে অন্ধকারে সুধার চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, অবয়ব টা বোঝা যাচ্ছে ...

অনুপ বাবু ইলিনার মাথার কাছে বসে আছে ৷ মেয়ের শরীর এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো ৷ অনুপ বললো, যা খেয়েছো সব তো বের হয়ে গেছে, পেট টা তো এখন একবারে খালি ৷ ভাত খাবে অল্প? দিতে বলি ?
ইলিনা মাথা নাড়িয়ে জবাব দে, খাবে না ৷ খিদে নেই ৷
অনুপ বলে আচ্ছা আজ আর ভাত খেতে হবে না, তোমার জন্য সুধীর গোয়ালার দই আনতে পাঠিয়েছি ৷ খুব নাকি বিখ্যাত ৷ দই খেলে ভাল্লাগবে ৷
সুধীর গোয়ালা কে?
এখানকার নামকরা গোয়ালা, দুধ থেকে দই মিষ্টি মন্ডা মিঠাই বানায় ৷
ও ৷ কাকে আনতে পাঠিয়েছো?
তোমার সুধা দিদিমণি কে ৷
ইলিনার মুখে বিষাদ নামে ৷ ভ্রুঁ কুচকে উঠে ৷ বিরক্ত লাগতে থাকে ৷ সুধা কে ইলিনার খুব একটা পছন্দ হয়নি ৷ আসতেই কেমন গাল টেনে আদর করে দিলো ৷ গাল টানার সময় ইলিনা গালে ব্যাথা পেয়েছে ৷ আর ভাত খাবার সময়ও মেয়েটা কেমন করে যেন হাসছিল ইলিনা কে দেখে ৷ যেন সে খুব মজার কোনো কিছু দেখছে ৷ এসব অতিরিক্ত আদিখ্যেতা ইলিনার কোনো কালেই পছন্দ না ৷
ইলিনার ধারণা, সে যখন ভাত খাচ্ছিলো তখন সুধা মেয়েটাই কু নজর দিয়েছে ৷ এজন্যই সে বমি করেছে ৷ শরীর খারাপ হয়েছে তার ৷
অনুপ বললো, কি মা, কোনো সমস্যা? আবার শরীর খারাপ লাগছে?
না ৷ আমি ঠিক আছি ৷ আচ্ছা বাবা, একটা কথা বলি ?
হ্যা, নিশ্চই ৷ বলো ৷
বাবা, সুধা মেয়েটাকে আমার ভালো লাগেনি ৷
ওমা কেনো, ভালো লাগেনি কেনো? তোমাকে কত আদর করলো!
বাবা, জানো ও কি বলেছে?
কি বলেছে?
যখন বললাম, হিসু চেপেছে, বাথরুম টা দেখিয়ে দাও ,সে বললো, চলেন নিয়ে যাই আপনেরে ৷ তারপর বাথরুমের সামনে যেয়ে বললো, এ বাংলো তে নাকি খারাপ আত্মা আছে ৷ সাবধানে চলাফেরা করতে ৷ সন্ধার পর না বের হতে ৷ কেমন লাগে বলো তো!
অনুপ এতক্ষণ হাসছিলো ৷ এবার ইলিনার কথা টা গুরুত্ব সহকারে ভাবলো ৷ মেয়েটা কে যতটা কাজের মনে করেছিলো অনুপ, আস্থাশীল মনে করেছিলো আসলে তো দেখা যাচ্ছে তা না, ফাজিল একটা মেয়ে ৷ আসতে না আসতেই তার ছোট্ট বারো বছরের মেয়েটাকে ভুতের ভয় দেখানো শুরু করেছে? অনুপ মনে মনে প্রচন্ড বিরক্ত হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে রেখে ইলিনা কে বললো, তোমার সাথে দুষ্টুমি করেছে ৷ তুমি কিছু মনে করো না ৷ আমি ওকে ধমকে দেবো, কেমন?
আচ্ছা .....
ইলিনা চোখ বন্ধ করে বাবার পাশে শুয়ে রইলো ৷ অনুপ মেয়ের কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো ৷

সুধীর গোয়ালার বাড়ী টা দোতলা টিনের ৷ নিচ তলায় তার তিন ছেলে বউ নিয়ে থাকে ৷ দোতলায় সুধীর ৷ মূল বাড়ী থেকে দক্ষিণ দিকে বিশাল গোয়ালঘর ৷ সেখানে সারা বছর আট দশটা গরু রাখা থাকে ৷ গরুর দুধ দিয়ে দই বানানো, মন্ডা মিঠাই,ছানা এসব বানানো তাদের আদিপুরুষদের পেশা ৷ বংশপরম্পরায় চলে আসছে ৷ ছেলে তিনজনের নাম গনেশ, নগেন, আর যদু গোয়ালা ৷
সুধা যখন গোয়ালার বাড়ী পৌছুলো তখন রাত প্রায় এগারটা বাজে ৷ দরজায় এত রাতে করাঘাত শুনে ঘুম ঘুম চোখে বেরিয়ে এলো সুধীর গোয়ালার সর্ব কনিষ্ঠ ছেলে যদু গোয়ালা ৷ চোখ লাল ৷ পরনে হাতা কাটা গেঞ্জি ৷ সে ঢুলু ঢুলু চোখে সুধার দিকে তাকালো ৷ পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে নিলো সুধার ৷ তারপর বললো, এতো রাতে কি চাই?
যদু গোয়ালার মুখ দিয়ে উৎকট একটা গন্ধ বেরিয়ে এলো ৷ এটা মদের গন্ধ, সুধা এ গন্ধ চেনে, তার স্বামী বিধান ডোমের মুখেও এরকম গন্ধ সে পেতো ৷ যে রাতে এসব খেয়ে আসতো বিধান সে রাতে সুধা খুব ভয়ে থাকতো , বিধান জোর করে সুধার শরীর থেকে শাড়ি ব্লাউজ টেনে খুলতে থাকতো ,সুধা না করলে গায়ে হাত পর্যন্ত তুলতো ...
সুধা যদু কে বললো , আমার দুই হাড়ি দই লাগবে ৷ সাহেব এসেছে নতুন ৷ তার মেয়ের জন্য ৷ তাই এত রাতে আসতে হলো ৷ আপনাদের বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত ৷
যদু দরজার হুড়কো ধরে দাড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ৷ তারপর বললো, অ, দই ,,, মিলেগা, আইয়ে মেরে সাথ......
ওরা মাঝে মাঝে এরকম বলে ৷ পুর্বপুরুষ অবাঙালী ছিলো মনে হয় ৷ মাড়োয়ারি জাতীয় কিছু ৷
সুধা যদুর পেছন পেছন যেতে লাগলো ৷ যদু মূল বাড়ী থেকে একটু দুরে, একটা ঘরের দরজা খুললো ৷ তারপর সুধাকে হাত দিয়ে ইশারা করে ভেতরে ঢুকতে বললো ৷
ঘরের ভেতর গরুর গোবর আর শরীরের বিকট গন্ধ ৷ দই কি গোয়াল ঘরে বানায় নাকি? সুধা বুঝতে পারলো না যদু এখানে কোথা থেকে দই নিয়ে আসবে ৷ অন্ধকার ঘরের ভেতর ঢুকে যদু দরজা টা আটকে দিলো ....
কিছুক্ষণ পর রাতের নিস্তব্ধতাকে চিড়ে অনেক দূর থেকে শোনা যেতে লাগলো , কয়েকটা গরুর ডাক, সুধীর গোয়ালার গোয়ালের গরু এরা ৷ গরু গুলো আজ হঠাত এমন চেঁচাচ্ছে কেনো কে জানে.



অবেলায় গরু গুলোর বিলাপে সুধীর গোয়ালা টর্চ হাতে বেরিয়ে এলো ৷ গোয়াল ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় টর্চের আলো ফেলে দেখতে পেলো দরজার খিড়কী খোলা ৷ তালা নেই ৷ কেউ ভেতরে গেছে নিশ্চিত ৷ তবে কি চোর ঢুকেছে? সুধীর গোয়ালা দরজায় ধরাম করে এক ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে কোনো রকমে ভেজানো দরজা খুল গেলো ৷
সুধীর চেচিয়ে বলতে লাগলো কে রে! কে এসেছিস আমার গোয়ালের গরু চুরি করতে! বের হয়ে আয় শালা আজ তোর একদিন কি আমার .....
সুধীর ঢুকতেই গরু গুলোর ডাক থেমে গেছে ৷ ধুড়মুড় করে মাটি থেকে উঠে দাড়ালো দুটো ছায়ামূর্তি , গোয়ালের এক কোণায় ৷ যেদিক থেকে শব্দ এলো সেদিকে টর্চের আলো ফেলতেই সুধীর দেখতে পেলো তার ছোট ছেলে কে , আর তার পেছনেই নিজেকে লুকোচ্ছে এক অপরিচিতা যুবতী , দুজনেই নিজেদের শরীর ঢাকতে ব্যস্ত যার যার বস্ত্র দিয়ে ৷ কে এই যুবতী এত রাতে এই গোয়াল ঘরে কোত্থেকে এলো তার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না সুধীর ৷ মেয়েটার মুখে ভাল করে আলো ফেলতেই মেয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললো, তারপর অকস্মাত লুটিয়ে পড়লো সুধীর গোয়ালার দুই পায়ে ৷ হু হু করে কেঁদে উঠে বললো , আমার কোনো দোষ নেই, আমি দধি কিনতে এসেছিলাম , বাংলোয় নতুন সাহেব আসছে, তার মেয়ের পেটের পীড়া, আমাকে পাঠাইলো দধি কিনে নিয়া যেতে , আর আপনার ছেলে আমাকে একা পেয়ে.....
সুধীর অগ্নিশর্মা দৃষ্টি তে ছেলের দিকে তাকালো ৷ ছেলে এক দলা থুথু ফেলে বললো , আপনে আসছেন কেন এখানে, এত রাতে ?
সুধীর বললো, ওরে হারামজাদা, তুই মাইয়া মানুষ একলা পাইয়ে নটঘট করবি আর আমার ব্যবসার বারোটা বাজাইবি! আমি আসবো না তো কি তোর .......
একটা বাজে গালি দিয়ে সুধীর তেড়ে গেলো ছেলের দিকে ৷ ছেলে বাপকে ধাক্কা দিয়ে এক পাশে সরিয়ে চলে গেলো গোয়াল ছেড়ে ৷
সুধীর উঠে গিয়ে নিজের চাদর টা সুধার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললো, মা রে , জোয়ান ছেলে, রক্তে বড় ত্যাজ ৷ যুবতী মাইয়ের গন্ধ পাইলে হুশ থাকে না, তুই কিছু মনে করিস না,ক্ষমা করি দে ...
সুধা বললো , হের বউ নাই ঘরে?
আছে, বউ আছে ৷ কিন্তু মতির দোষ থাকলে কি আর বউয়ে মন মানে......
সুধীর গোয়ালা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো ৷
সুধা বললো , আমারে দই দেন ৷ দুই কেজি পাতিলে দই ৷
সুধীর গোয়ালা বললো আয় আমার সাথে ৷
দইয়ের ছাকনি থেকে দুটো দইয়ের পাতিল পেরে সুধার হাতে দিলো সুধীর ৷ টাকা নিয়ে বললো, একটু দাড়া, যাইস নে,
সুধা বললো আবার কি?
সুধীর আরেকটা আধা কেজি দইয়ের পাতিল পেরে বললো, এটা তোর, দাম লাগবে না ৷
সুধা কিছু বললো না, একটু হাসলো ৷
সুধীর বললো নে ধর, বাপ মনে করে নিয়ে যা ৷
সুধা বললো , এক কেজি দইয়ের পাতিলে ইজ্জতের দাম দিলেন? হে হে হে....
সুধীর অসহায় মুখে চেয়ে রইলো ৷ তার খুব লজ্জা লাগছে মেয়েটির কথায় ৷ আহারে ....কুপুত্র জন্ম দেবার যাতনায় তার লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে ....
ইলিনার শরীর এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো ৷ সুধীর গোয়ালার দধি খেয়ে পেটের ভেতরের জ্বালা ভাব, বদহজম, সব দূর হয়ে গেছে, ঠান্ডা হয়ে পেটটা একেবারে ৷ সারাদিনের জার্নির ধকলে ঘুমে তার চোখ বুজে আসছে ৷
বিনয় বাবু, ইলিনার বাবা, মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল কতক্ষণ ৷ তারপর চলে গেলো নিচে ৷ যাবার আগে বড় মেয়ে বেলা কে বললো বোন কে দেখে রাখতে ৷ রাতে যদি আবার শরীর খারাপ করে তবে সাথে সাথেই ডাকতে ৷ সুরমা, ইলিনার সাথেই থাকতে চেয়েছিল আজ ৷ তবে বড় মেয়ে বেলা বললো সে ই বোন কে দেখে রাখবে ৷ বাবা মা কারো থাকতে হবে না ৷ শেষে ক্লান্ত সুরমা আর জোর করেনি ৷ ঘুমে তার নিজের চোখও বন্ধ হয়ে আসছিলো ৷ বাংলা উপন্যাস
সবাই চলে যাবার পর বেলা তার পোশাক পাল্টালো ৷ একটা পাতলা গাউন পরে নিলো ৷ সারা দিন ধরে জিনস আর টপস পরে থাকায় ওগুলো ঘামে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে ৷ বারান্দায় নেড়ে দিলো কাপড় গুলো ৷ বোন ইলিনা তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে ৷ সে বোনের কপালে ছোট চুমু খেলো ৷ বোনকে সে ভীষণ ভালোবাসে ৷
ঘড়ির দিকে তাকালো বেলা ৷ রাত প্রায় দুটো ৷ সুধা বাংলোয় ফিরেছে একটার দিকে ৷ বের হয়েছিলো সাড়ে দশটায় ৷ বলেছিলো যেতে আসতে এক ঘন্টা লাগবে ৷ লাগিয়েছে পৌনে আড়াই ঘন্টা ৷ এত দেরী হলো কেন কে জানে ৷ যাবার আগে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত দেখাচ্ছিলো, ফিরে আসার পর মুখে আগের সে দ্যুতি নেই ৷ কথা বার্তাও বেশী বলেনি কারো সাথে ৷ দইয়ের পাতিল টেবিলে রেখে বললো, আসি বাবু, কোনো দরকার হলে ডাকবেন ৷
বিনয় বাবু সুধা কে জিজ্ঞেস করেছিল পথে কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা, সুধা অদ্ভুত ভাবে হেসে বলেছিলো, না, পথে কোনো সমস্যা হয়নি ৷ আসি!
সমস্যা কিছু সত্যি হয়েছে কিনা তা কে বলবে ৷ সুধা কে বুঝা মুশকিল ৷
বেলা কানে হেডফোন গুজে গান শুনতে লাগলো বারান্দার রেলিং ধরে ৷ ঝিরঝিরে বাতাস দিচ্ছে ৷ গা জুড়িয়া গেল ওর ৷ সে বারান্দার এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হাঁটতে লাগলো ৷ কানে বাঁজছে এমিনেম এর গান লাভ দ্যা ওয়ে ইয়ু লাই ৷ গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে সে ৷ হঠাত মনে হলো যেন তার মাথা টা দুলে উঠলো ৷ ঝিমঝিম করে উঠলো ৷ আর মনে হতে লাগলো কানে লাগানো হেডফোন থেকে গানের কথা গুলো কেমন পাল্টে যাচ্ছে ৷ এমিনেমের গানের বদলে ঘ্যাড়ঘ্যাড় বাঁজছে অন্য কোনো গান , অন্য সুরে, অন্য ভাষায় ....যার সাথে বেলা একটুও পরিচিত না ....
বেলা হাঁটু গেড়ে বারান্দায় বসে পড়লো .....কান থেকে এক ঝটকায় খুলে ফেললো হেডফোন


সকাল হয়ে গেছে ৷ কানে আসছে চেনা আর অচেনা পাখিদের ডাক ৷ জানলা গলে মেঝেময় ছড়িয়ে পড়েছে ভোরের সূর্যের আলো ৷ হেমন্তের শেষ, তাই গায়ে একটু শীত শীত লাগছে ৷ শহর নয়, এখন সুরমা রা এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৷ শীত এদিকে খুব বেশী পড়ে ৷ গায়ে পাতলা চাদর টা জড়িয়ে নিলো সুরমা ৷ বালিশের নিচ থেকে মোবাইল টা বের করে সময় দেখে নিলো, সাতটা তেরো ৷ দেয়ালে এখনো ঘড়ি লাগানো হয়নি ৷
এখনি বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না ৷ কাজ তো তেমন কিছু নেই ৷ সরকারী বড় কর্মকর্তার বউ হবার এই এক সুবিধা সে ভোগ করে আসছে অনুপের সাথে বিয়ের পর থেকেই ৷ সরকারী কোয়ার্টারে চাকর বাকরের অভাব হয়না ৷ পারলে ঝি রা সুরমার মাথায় তেলটাও মেখে দেয় ৷
তবে গতকাল যে নতুন বাংলো টিতে ওরা এসে উঠেছে , এখানকার বিষয় টা একটু অন্য রকম ৷ সুধা ছাড়া অন্য কোনো কাজের লোক চোখে পরেনি সুরমার ৷ বধিনাথ নামের যে লোকটা জিনিষ পত্র গোছগাছ করতে সাহায্য করছিলো সে যে এখানের পারমানেন্ট কাজের লোক নয় তা সুরমা বুঝতে পেরেছিলো শুরুতেই, রাতে যখন সে চলে গেলো, সুরমা নিশ্চিত হলো ৷

অনুপ ঘুম থেকে উঠে কই গো সুরমা, এক কাপ চা ...
সুরমা বললো, এ হে, চা তো করতে বলিনি সুধা কে ৷ দাড়াও আমি উঠে বলে আসি ৷
সুরমা বিছানা ছেড়ে উঠবে এমন সময়ই সুধা ধোয়া উঠা দু কাপ গরম চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো ৷
অনুপ বললো, বাহ! বলতে না বলতেই চা হাজির! তুমি বেশ চটপটে আছো হে সুধা, হা হা হা....
সুধা লজ্জা পেলো ৷ বললো, আগে যে সাহেব থাকতো, তার সকালে চা খাবার অভ্যাস ছিল, তাছাড়া আজকাল তো কুলীন শূদ্র কম বেশী সবাই চা খায় ৷ তাই ভাবলাম চা করে ফেলি, বড়দিদি ডাকতে এসেও ঘুরে গেছি, দেখি দরজা বন্ধ ৷
সুরমা বললো, এখন থেকে সকাল আটটায় ডেকে দেবে ৷ দরজা বন্ধ থাকলে নক করবে, কেমন?
আচ্ছা ৷
সুধা বেড সাইড টেবিলে চা রেখে চলে গেলো ৷ অনুপ আর সুরমা চা এ চুমুক দিয়ে একসাথে বলে উঠলো , এ্যাঁ ! এ কেমন চা? চিনির বদলে লবণ দিয়েছে নাকি! কেমন তিতকুটে লাগছে ৷
সুরমা বললো , আজ খেয়ে নাও কষ্ট করে ৷ আমি পরের বার শিখিয়ে দেবো ৷
অনুপ চোখ বড় বড় করে বললো, এ জিনিষ খেতে বলছো? তুমি পারবে তো পুরোটা শেষ করতে!
সুরমা বললো, মনে আছে,আগে তুমি যখন চা খেতে আনার হাতে, বলতে চিনি কম দিতে , কারণ আমি ওতে আঙ্গুল ডুবিয়ে দিলেই নাকি মিষ্টি হয়ে যাবে, তুমি কতদিন ধরে এমন করে বলো না অনুপ....
অনুপ বললো, আজ তোমার কি হলো বলবে? হা হা হা, আচ্ছা দাও দাও, দেখি তোমার আঙ্গুল টা ডুবিয়ে দাও দেখি,,,
সুরমার মুখে গোলাপী আভা খেলে, একটু করে আঙ্গুল ডুবিয়ে দিয়ে বলে এই নাও দিলাম....
অনুপ হাসতে থাকে ৷

ইলিনার ঘুম ভেঙে গেছে ৷ ঝকঝকে একটা সকাল দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে ৷ সকালের রোদ মনকে চাঙ্গা করে দিয়েছে ওর ৷ গতকাল রাতের সব কথা ভুলে গেছে সে ৷সে দারুণ সুখী সুখী লাগছে নিজেকে ৷ খুব কষ্টে থাকা মানুষগুলোও কি একেকটা নতুন সকাল দেখে একটা অলস সুখ অনুভব করে , সারা রাত ধরে নিজের শরীরের উষ্ণতায় তুলতুলে গরম হয়ে থাকা বিছানায় শুয়ে শুয়ে, সে মানুষটিও, যার মা মারা গেছে দু সপ্তা আগে, বা ডিভোর্স হয়েছে প্রেমিক স্বামীর সাথে! তারাও কি নতুন একটা ঝকঝকে হেমন্তের সকালের সুখ অনুভব করে? ইলিনা ছোট মানুষ, এত কিছুর উত্তর জানে না ৷
সে দেখলো তার পাশে বেলা শুয়ে নেই ৷ নিশ্চই ঘুম ভেঙে গেছে তার আগেই ৷ ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছে হয়তো নতুন বাংলোর চারপাশে ৷ তাকে ছাড়া একা একাই বেরিয়ে পড়বে তাই বলে? ইলিনা মন খারাপ করে বিছানা ছেড়ে উঠলো ৷ এটাচ বাথরুম আছে তাদের রুমে ৷ সে বাথরুমে গেলো ৷ চোখে মুখে পানি ছিটা দিল ৷ দাঁত ব্রাশ করতে নিবে এমন সময় দেখলো ব্রাশ পেস্ট কিচ্ছু নেই ৷ নিচের তলায় লাগেজের ভেতর রয়ে গেছে হয়তো ৷ আনা হয়নি ৷ ইলিনা বাথরুম থেকে বের হয়ে নিচের তলায় যেতে লাগলো ৷ দোতলার বারান্দায় এসে দেখলো কেউ একজন গুটিশুটি মেরে বারান্দায় পড়ে আছে ৷ সে দৌড়ে গেলো সেদিকে ৷ কাছে যেয়েই আবিষ্কার করলো এটা তার বোন , বেলা ৷ সে বোনকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেলো ৷ জোরে জোরে ধাক্কা দিতে লাগলো আর ডাকতে লাগলো ৷
বেলা চোখ পিট পিট করে তাকাতে তাকাতে বললো, আমি কিছু জানি না, কিছু দেখিনি, কিছু করিনি আপনাকে , আমাকে ক্ষমা করে দিন প্লিজ......
ইলিনা ধমকে উঠে বললো কি বলছিস আপু এসব? তুই এখানে কেনো শুয়ে ছিলি?
বেলার ঘোর তখনো কাটেনি ৷ সে ইলিনা কে বললো, আমার বাবা মা কে ডেকে আনুন প্লিজ , আমার বড় বিপদ...
ইলিনা বললো আপু আমি, তোর বোন, ইলিনা, এদিকে আমার দিকে তাকা, কি হয়েছে বল ৷
বেলা এবার ইলিনা কে চিনতে পারলো ৷ বোনকে জড়িয়ে ধরে বললো, আমি কি সারারাত এখানেই ছিলাম?
ইলিনা বললো, তা তো বলতে পারবো না, আমি ঘুম থেকে উঠে এসে দেখি তুই বারান্দায় পড়ে আছিস ৷
বেলা মনে করতে চেষ্টা করলো রাতে তার সাথে কি হয়েছিলো, হ্যা, সে গান শুনতে শুনতে বারান্দা দিয়ে হাঁটছিলো ৷ হঠাত মাথা টা ঝিমঝিম করে উঠলো, আর গানের কথা গুলো কেমন যেন বিকৃত হয়ে যেতে লাগলো, কেউ যেন হ্যাসহ্যাস করে কিছু বলছে কানের কাছে, বেলা জ্ঞান হারালো ....
ইলিনা কে যদিও বেলা সেসব কিছু না বলে চুপ করে রইলো কতক্ষণ ৷ তারপর বললো, শোন, বাবা মা কে কিছু বলিস না, দুঃশ্চিন্তা করবে ,,,
ইলিনা বেশ অবাক হয়, কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলে আচ্ছা ৷

খাবার টেবিলে একসাথে নাশতা করতে বসেছে অনুপ ব্যানার্জি, সুরমা, বেলা, ইলিনা ৷ পাশে দাড়িয়ে সুধা ৷ নাশতার আইটেম তেলে ভাজা পরটা, ডিম সেদ্ধ, গতকাল রাতের কেনা দই ৷
ইলিনা আর বেলা চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে ৷ দুজনেরই মুখ গম্ভীর ৷ অনুপ বললো, মেয়েরা, ঘুম কেমন হলো ৷
বেলা বললো ,ভালো ৷ বলে ফিকে হাসি দিল ৷
ইলিশা বললো আমারো ভালো ৷
অনুপ বললো , একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম, আমাদের তো একজন দারোয়ান দরকার , বাজার টাজার করার লোকও লাগে ৷ গভর্নমেন্ট দিয়ে দেবে বোধহয় কদিনের মধ্যে ৷ তবে এ কদিন কিভাবে চলবে সে ই ভাবছি ৷
সুধা হঠাত বললো, বাবুসাব, কিছু না মনে করলে একটা আর্জি ছিলো ৷
অনুপ মুখে পরটো ডিম পুরে দিয়ে বললো , কি আর্জি?
বাবু, আমার একটা মাসীর ছেলে আছে, নাম বরুন, কাজ খুজছে ৷ ওকে যদি কদিন এনে রাখা যায়.... পরে নাহয় ...
অনুপ বললো, বাহ, তাহলে তো চুকেই গেলো ৷ তা বলে দাও আজই এসে পড়তে ৷
সুধা ঝলমলে মুখে বললো, আচ্ছা বাবু, অাপনার অনেক মহানুভবতা ৷
সুরমা বললো, ভারী কাজ কাম করতে পারে তো তোমার মাসতুতো ভাই?
হ্যা ৷ পারে , জোয়ান ব্যাটাছেলে , বলে সুধা লাজুক হাসি দিলো ৷ সে হাসির কিছু ভাষা আছে , সবার চোখ এড়িয়ে গেলেও সুরমার চোখ তা এড়িয়ে গেলো না ৷ সুরমা সরু চোখে সুধার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে বললো, বেশ , তাকে আসতে বলো

পাহাড়ী ঢাল কেঁটে তৈরী আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছে অনুপ ব্যানার্জির জিপ ৷ গায়ে মোটা শাল জড়ানো, গালে সপ্তাহ খানেকের না কাটা দাড়ি, লালচে ঢুলুঢুলু চোখে গাড়়ি চালাচ্ছে ড্রাইভার ৷ দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে সারা রাত নেশা ভাঙ খেয়েছে ৷ অনুপ দু পাশে তাকিয়ে দেখলো দু দিকেই গভীর খাদ ৷ একবার খেই হারিয়ে ডানে বামে করলেই হলো, মৃত্যু নিশ্চিত ৷ এমন একজন লোককে কেন অফিস তার পার্সোনাল ড্রাইভার পদে নিয়োগ দিয়েছে কে জানে!
অনুপ কোটের ভেতর দিকের বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালো ৷ গাড়ি চলতে থাকা অবস্থায় সিগারেট ধরানো কঠিন ৷ তবে এ কঠিন কাজটা সে আয়ত্ত করেছে , ধীরে ধীরে ৷
ড্রাইভার নিরস মুখে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে ৷ তার মুখের নিষ্প্রভ অবয়ব বলে দিচ্ছে, জগৎ সংসারের উপর তার তেমন কোনো আকর্ষণ নেই ৷ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ঢাল কেটে গাড়ি চালানোতেই তার জীবন আবদ্ধ ৷
অনুপ লোকটার প্রকৃতি জানতে চায়, তাই ওর সাথে কথা বলা দরকার ৷ সে গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বললো, আপনার নাম কি ?
ড্রাইভার অনুুপের দিকে না তাকিয়েই বললো, তারাপদ ৷ তার মুখে কোনো হাসির রেখা নেই, একরাশ বিষাদ ছেয়ে আছে ৷
অনুপ একটু বিরক্ত হলো ৷ তার আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে ৷ চতুর্থ শ্রেনীর একজন কর্মচারী কে সে নাম জিজ্ঞেস করেছে, কোথায় সে মুখে তেলতেলে একটা ভাব ফুটিয়ে বিনয়ে গলে যেয়ে বলবে, আমার নাম .....
অনুপ বললো , আপনার কি শরীর খারাপ?
না ৷
ওহ ৷ দেখে মনে হচ্ছে শরীর খারাপ ৷ চোখ টোখ লাল ৷ রাতে বোধহয় ভালো ঘুম হয়নি ৷
তারাপদ কিছু বললো না ৷ স্থির চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো ৷
অনুপ আর কিছু বললো ৷ শুধু শুধু তাকে ঘাটিয়ে লাভ নেই ৷ শেষে রাগের চোটে গাড়ি নিয়ে না উল্টে পড়ে কোনো খাদে ......

সুরমা মেয়েদের নিয়ে ছাদে উঠেছে ৷ বাংলোর ছাদ নিয়ে মা মেয়ে সবারই অনেক জল্পনা কল্পনা ছিল ৷ ছোট বেলা থেকেই বনবিভাগের বাংলো, ছাদ, এসব নিয়ে নানা গল্প পড়েছে, তাই মনের মধ্যে একটা ছবি আঁকা হয়ে গেছে ছোট থেকেই৷ খুব পুরোনো ধরণের বাংলো, দেয়ালে রেলিং এ শ্যাওলা জমে কালচে হয়ে গেছে শুকিয়ে ৷ পলেস্তারা খসে পড়েছে, নাম না জানা গাছে ভরা ফুলের টব চারদিকে, একটা জং ধরা দোলনা থাকবে , এসব ৷
তবে এ বাংলোর ছাদ বেশ ঝকঝকে ৷ দেখেই বোঝা যাচ্ছে কদিন আগেই সংস্কার করা হয়েছে ৷ কোথাও কোনো ত্রুটি নেই ৷ দোলনাও নেই ৷
তবে চারদিকে তাকালো চোখ জুড়িয়ে যায়, আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়, ধূসর পাহাড়৷ লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন এ বাংলো তে কোথায় যেন একটা হাহাকার ৷ ইট কাঠ গুলোও যেন পুরোনো হতে হতে জীবিত হয়ে উঠেছে, তাদের নিঃশ্বাস টের পাওয়া যায়, এমন নীরবতা চারদিকে ৷
বেলা আর ইরিনা ছাদের এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটতে থাকে ৷ সুরমা দাড়িয়ে থাকে রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে ৷ খা খা শূন্যতা ভর করে তার সারা শরীরে ৷ এ কেমন প্রাকৃতিক নৈসর্গ ! বুকের ভেতর শূন্যতার ঝড় উঠে ৷ মেয়েদুটো বুড়ো মানুষের মত হেঁটে বেড়ায় ৷ কেউ কোনো কথা বলে না ৷
নতুন জায়গায় থাকতে আসার আগে যে একটা উত্তেজনা ছিল সব কেমন ম্লান হয়ে যায় ৷ পুরোনো বাসার কথা মনে পড়ে ৷
সুরমা মেয়েদের ডেকে বলে, বেলা, ইলিনা, কেমন লাগছে তোমাদের নতুন জায়গা?
ভালো ৷
ওদের দুজনেরই সহজ উত্তর ৷ দুজনই এখানে আসার পর পরই দুটো বাজে ঘটনার শিকার হয়েছে ৷ শুরুটাই যদি এমন অপ্রত্যাশিত খারাপ হয় তবে আর কি? এ ভালো বলার মধ্যে কোথাও যে সূক্ষ্ম একটা খারাপ লাগার কথা অস্ফুট ভাবে ব্যক্ত হচ্ছে তা স্পষ্টতই টের পেলো সুরমা ৷ মেয়েদের মত তার মনটাও যে বড় বিষন্ন ৷
কিছুক্ষণ পর ইলিনা আর বেলা কে সুরমা বললো চলো এবার নিচে নামা যাক ৷
বেলা বললো তোমরা নেমে যাও মা ৷ আমি একটু পর নামবো ৷
সুরমা বললো , কেন? একা থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি?
হু ৷
সুরমা বাঁকা হাসি দিল ৷ বেলার এখন ভালনারেবল এজ ৷ এই বয়সে মেয়েদের মন বড় বিচিত্র হয় ৷ এই অকারনে সব ভালো লাগে, এই একটুতেই রাগ উঠে যায় ৷ একা থাকতে ইচ্ছা করে ৷ কল্পনার জগতে বিচরণ করতে ইচ্ছা করে ৷
সুরমা বললো, চলো ইলিনা , আমরা চলে যাই ৷ ও থাকুক ৷
ইলিনা ভাবলো একবার মা কে বলে দেয় আজ সকালে সে দেখেছে আপু অজ্ঞান হয়ে দোতলার বারান্দা পড়ে ছিল ৷ রাতে নাকি হাঁটছিলেন বারান্দায় , আর গান শুনছিলো, হঠাত কি হলো, জ্ঞান হারালো ৷ এখন আপুকে একা ছাদে ঘুরতে দেয়া কি ঠিক হবে? তবে শেষ পর্যন্ত কিছু বললো না ৷ আপু না করে দিয়েছে মা কে কিছু বলতে ...
ওরা দুজন ছাদ থেকে নেমে গেলো ৷ বেলা একা একা ছাদে দাড়িয়ে ভাবতে লাগলো গত কাল রাতে আসলে কি হতে পারে ওর সাথে? কেন এভাবে হঠাত জ্ঞান হারালো! আর গানের লাইন গুলো চেইঞ্জ হয়ে যাবারই বা রহস্য টা কি? গান তো বাঁজছিলো মোবাইলে, কোনো যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে? নাকি অন্য কিছু?
এসব ভাবতে ভাবতে বেলা কখন যে ছাদের একেবারে কিনারায় চলে এসেছে টের পায়নি! আর দু পা এগুলেই পড়ে যেতো নিচে ৷ এ বাংলোর রেলিং টা বেশ ছোট ৷ হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ৷ শরীর ভারসাম্য হারালে নিচে পড়ে যাওয়া ছাড়া গতি নেই ৷
সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল দ্রুত ৷ বেলা এখন যেখানে দাড়িয়ে সেখান থেকে মূল গেইট দেখা যায় ৷ বেলা দেখলো একজন লোক দাড়িয়ে আছে গেইটের শিক ধরে, ধুতি পরা, আর রঙ জ্বলে যাওয়া ফতোয়া , হাতে পুটলি , কে হতে পারে ? সুধার খালার ছেলে নাকি, যাকে দারোয়ান হিসেবে রাখার কথা ৷ ভেতরে ঢুকছে না কেন? গেইট কি তালা দেয়া নাকি ? বেলা লোকটাকে হাত দিয়ে ইশারা করতে লাগলো, লোকটা একবারো তাকাচ্ছে না ৷ শেষে বেলা ডাক দিলো, এই যে ভাই 


বরুণ বসে আছে মেঝেতে ৷ সোফায় বসার স্পর্ধা নেই তার ৷ বাবু সাহেবের বউ কন্যারা তার সামনে, সোফার ধার ঘিরে বসে আছে তারা ৷ তাকে দেখছে ৷ বরুণ এই মুহুর্তে নিজেকে চিড়িয়াখানার কোনো অদ্ভুত বিরল জন্তু ভাবছে , শুধু হাতে বা পায়ে একটা লোহার শিকল বাঁধা থাকলে পারফেক্ট হতো , ষোলোটি কলা পূর্ণ হতো ৷ কিন্তু না, তার হাত পা মুক্ত ৷ মুক্ত হাত পায়ের শেকলে আঁটা কোনো চার পেয়ে জন্তু মনে হচ্ছে নিজেকে ৷
কথা বার্তা শুনে সে যা বুঝলো তা হচ্ছে বড় বাবুর দুই মেয়ে ৷ এরা খুব আদরে বড় হচ্ছে ৷ মামনি মামনি বলে ডাকছে ৷ ভাবটা এমন যেন মেয়ে দুটো চিড়িয়া দেখতে বসেছে, দুটো কেউ একজন যদি বরুণ কে বলে নাচতে, তবে মা ও সাথে সাথে বলবে , ঠিক আছে বাবা বরুণ একটু নেচে দেখাও তো আমার বাচ্চা দুটিকে!
বরুণ ভাবতে লাগলো, এমন কি অস্বাভাবিকতা তার মধ্যে আছে যে মেয়ে দুটো অমন করে তাকাচ্ছে! চুল গুলো কোকড়ানো বরুনের, গলায় গুঞ্জা বিচির মালা, দুই বাহুতে দুটো বালার মতন কিছু পরা ৷ ধুতিটা একটু ছোট, হাঁটু অবধি উঠে গেছে প্রায় , এ এমন আর কি? তাকে নিশ্চই খুব অদ্ভুত কোনো জন্তুর মত লাগছে না ৷ যে গোত্রে তার জন্ম সে গোত্রের ছেলেদের পোশাক এমনই হয় ৷ তবে সমস্যা টা কোথায়?
সুরমা বরুন কে বললো, তোমাকে তুমি করেই বলছি, বয়সে ছোট হবে ৷
বরুন বললো , জ্বী সাহেবা ৷
তোমার বোন সুধা আমাদের কে তোমার কথা বলেছে ৷ তুমি নাকি একটা কাজ খুব খুঁজছো ৷ তাই আমার স্বামী অনুপ,এ উপজেলার প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা, উপর মহলে সুপারিশ করবে তোমার জন্য , যেনো তুমি এ বাংলোর দারোয়ান , মানে নৈশ প্রহরীর চাকরী টা পাও ...
জ্বী সাহেবা ৷ আপনার করুণা ...
না না , করুনার কিছু নেই, শুনেছি তুমি অনেক কর্মঠ, দায়িত্ববান, সুধা তোমার অনেক প্রশংসা করলো , যদি সত্যিই তাই হয় তবে তুমি নিজ যোগ্যতার জন্যেই চাকরী পেয়েছ ৷
বরুন মাথা চুলকালো ৷ নিজের এত প্রশংসা অন্যের মুখ থেকে জীবনে খুব কম শুনেছে বরুন ৷
সুরমা ডাকলো, সুধা ,এই সুধা....
সুধা পাশের ঘরেই ছিল ৷ কিছু করছিলো বোধহয় কাজ টাজ ৷ সারাক্ষণই সে কিছু না কিছু করে, গোছানো আলনার কাপড় আবার গোছায়, চকচকে ফার্নিচার আবার মুছে তেলতেলে করে ৷ এমনই কিছু করছিল হয়তো ৷
সুধা এসে মাথা ঝুকালো সুরমার দিকে অনেকটা কুর্ণিশের ভঙ্গিতে ৷ যেন সুরমা মহারাণী ৷ পদস্থ কর্মকর্তার বউ হবার অনেক প্রাপ্তির মধ্যে এটা একটা ৷ এগুলো সুরমা বেশ উপভোগ করে ৷ সে সুুধা কে বললো , বরুন কে গোসল করার জায়গা টা দেখিয়ে দাও, গোসল করে খেয়ে নিক ৷ কাপড় চোপড় কিছু এনেছো তো সাথে বরুন ?
জ্বী সাহেবা ....

বেলা আর ইলিনা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে একজন আরেক জনের উপর ৷ কারণ হলো তাদের বাংলোতে এমন একজন লোক এসেছে যে কিনা মেয়েদের বাহুতে বালা পরে ৷ চুল গুলোও বেশ বড় ,আর চোখ দেখে মনে হয় চোখে যেন কাজলও দেয় ৷ কি ষন্ডামার্কা দেখতে, অথচ কি নিচু গলায় কথা বলে, বিনয়ে গলে যেতে থাকে , অদ্ভুত লাগে লোকটার সবই বেলা আর ইলিনার ৷ তারা মা কে জিজ্ঞেস করে মা, লোকটা কি চোখে কাজল দিয়েছে?
মা বলে, কি জানি, দিতেও পারে আবার চোখ হয়তো এমনই ......

সুধা কুয়ো তলায় নিয়ে যায় বরুনকে ৷ বালতি দিয়ে কুয়ো থেকে কিভাবে পানি তুলতে হবে তা দেখিয়ে দিতে নিলে বরুন বলে, আমি জানি কিভাবে পানি তুলতে হয় ৷ সুধা দু পা পিছিয়ে দাড়ায় , একটুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে চলে যায় দূরে ৷ বরুন গা থেকে ময়লা হতে হতে সাদা থেকে হলদে হয়ে যাওয়া গেঞ্জি টা খুলে দড়িতে টানিয়ে দেয় ৷ বালতি কুয়োর জলে ফেলে টেনে টেনে পানি তুলে ঢালে গায়ে ৷ হাতুড়ি দিয়ে যেন পেটা বরুনের শরীরের বুকের পেটের পেশী গুলো তামাটে গায়ের রঙের সাথে মেশে বিকালের রোদে চিক চিক করে ৷ উঠোন ঝাট দেবার ফাঁকে কখন চোখ চলে যায় সেদিকে সুধার, দূর থেকে একটা ভাঙা দেয়ালের পেছনে দাড়িয়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে সুধা , বরুনের দিকে , কেমন যেন লাগে তার 


গাড়ি করে ফেরার পথে বাংলোর গেইটে প্রবেশের সময় অনুপ ব্যানার্জি দেখলো একটা পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের যুবক ছেলে , টুল পেতে বসে আছে ৷ পরনে হাটু অবধি উঠে যাওয়া বিবর্ণ ধুতি, সাদা রঙ মরে গিয়ে হলদে হয়ে গেছে, মুখে কয়েক সপ্তাহ ধরে না কামানো দাড়ি ৷ মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল নেমে গেছে ঘাড় অবধি ৷ অনুপ কে দেখে উঠে দাড়িয়ে সালাম দিল ৷
অনুপ বুঝতে পারলো, এটাই সুধার পিশতুতো ভাই ৷ সুধা এর কথাই নিশ্চই বলছিল ৷ এত তাড়াতারি চলে আসবে, আজকেই চলে আসবে তা অবশ্য অনুপ ভাবতে পারেনি ৷
গাড়ি থামলো বারান্দার সামনে ৷ অনুপ গাড়ি থেকে নেমে দাড়াতেই তার দুই মেয়ে দৌড়ে এসে তাকে জাপটে ধরলো ৷ অনুপ ইলিনার কপালে চুমু খেয়ে বললো, কেমন আছো মামনি? আজ শরীর খারাপ লাগে নি তো?
না, আজ ভালো ৷
গুড ৷ তোমাদের মা কোথায়? বেলার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল অনুপ ৷
বেলা উত্তরে বললো, মা ভেতরে , সুধা দিদির সাথে গল্প করে ৷
অনুপ বললো, তোমাদের খেলা ধূলো শেষ?
হু ৷ দুজনই একসাথে বললো ৷
অনুপ বললো, তবে এসো এবার ভেতরে চলে যাই, সন্ধা হয়ে গেছে ৷
বাবার দুই হাত দুই মেয়ে জড়িয়ে ধরে বাংলোর ভেতর চলে গেলো ৷
দূর থেকে তাদের দেখছিল বরুন ৷ তার চোখ সব সময়ই অস্বাভাবিক রকম স্থির থাকে ৷ যেন কোনো অনুভূতি নেই, আবেদ নেই, অন্তঃসার শূন্য সে ৷ মনের ভেতর অনুভূতি থাকলে তা চোখে ফুটে উঠে মানুষের ৷ তবে বরুনের বেলায় সে হিসেব খাটে না ৷ বরুনের চোখ দুটোর কোনো ভাষা নেই .. বোবা চোখ বলে কি আসলে কিছু আছে? আছে নিশ্চই, সেটা বরুনের.....

এখানে পত্রিকা আসে একদিন পর ৷ মানে হলো চব্বিশ তারিখের পত্রিকা এসে পৌছায় পঁচিশ তারিখ ৷ অনুপ একদিন আগের পত্রিকা পড়ছিল ৷ সে সাধারন পুরো পত্রিকা কখনো পড়ে না, সম্পাদকীয় কলাম আর আন্তর্জাতিক, ব্যস ৷ সবচেয়ে বেশী অপছন্দ বিনোদন পাতা ৷ কোন নায়িকার খাবারে লবণ কম পছন্দ, গরমে কি কালারের ড্রেস পরতে সে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে তা জেনে অনুপের কোনো কাজ নেই ,বরঞ্চ বিরক্ত ৷ শুধু শুধু পেইজ নষ্ট ৷ তারচেয়ে সাহিত্য নিয়ে দুটো পেইজ বাড়ালে বরং জাতির উপর হতো, নতুন নতুন প্রতিভাধর লেখক কবি সমালোচক বেরিয়ে আসতো ৷ তা না করে কোনো এক সেলিব্রেটি নামক ব্যাক্তির সংগ্রহে কয় হাজার বিদেশী সানগ্লাস কালেকশানে আছে তা ইতং বিতং করে ছাপে পত্রিকাগুলো , ভাবতেই বিরক্ত লাগে অনুপের ৷
সুরমা ঢুকলো ঘরে ৷ হাতে ট্রে ৷ চা বানিয়ে এনেছে সে, নিজের হাতে ৷ অনুপ কে এক কাপ দিয়ে বললো, সাথে কিছু দেব?
না ৷ এখন কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না ৷ একটু পর একবারে ভাত খেয়ে ফেলব ৷ ওহ হ্যা, ভালো কথা, সুধা কে দিয়ে খবর পাঠাও তো ওই ছেলে টা কে ৷ বরুন না কি যেন নাম বলছিল ৷ ওর দূর সম্পর্কের ভাই ৷
সুরমা বললো , আমাদের নতুন দারোয়ান ছেলেটার কথা বলছো?
হ্যা ৷ তো আর কার কথা বলব ৷ ওর সাথে কথা বলে দেখি ছেলে কেমন ৷
আমি কথা বলেছি, ছেলে খুবই ভাল ৷ লাজুক ভীষণ ৷ যা জিজ্ঞেস করবে তা এক কথায় উত্তর দেবে ৷ এর বাইরে একটা কথা বলবে না ৷ হা হা হা ,
না ঠিক আছে, তা বুঝলাম, তবু আমি একবার কথা বলে দেখি....
আচ্ছা ঠিক আছে, পাঠাচ্ছি ৷

বরুন দরজার সামনে এসে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললো, সাহেব, আসবো? তার বলায় কোনো ঔদ্ধত্য নেই, তবে আছে দৃঢ়তা ৷ এমন দৃঢ়তা নিয়ে একটা চাকর অনুপের সাথে কথা বলতে পারে তা জানা ছিল না তার ৷ কথাগুলো কেন যেন বুকে বিঁধলো ৷ তবে অনুপ হাসি মুখে বললো ,
:আরে এসো এসো ৷ বসো ৷
বরুন বসলো মেঝেতে ৷ অনুপ ইচ্ছা করলে পারতো তাকে বলতে, সেকি, মেঝেতে কেন বসেছো, চেয়ারে বসো, কিন্তু সে তা করেনি ৷ সিভিল সার্ভিসে জয়েন করার পর অনুপ একটা জিনিস শিখেছে, অধঃস্তন কে কখনো তার নূন্যতম প্রাপ্য সম্মানের চেয়ে বেশী সম্মান দেখাতে নেই, দেখালে অধঃস্তন নিজের আসল পরিচয় ভুলে যায়, তখন দেখা দেয় নানা জটিলতা ৷
বরুন মাথা নিচু করে বসে আছে ৷ অনুপ বললো,
:তোমার নাম কি ?
:বরুন ৷
: লেখা পড়া কিছু করেছো?
মনে মনে হাসলো অনুপ এ প্রশ্ন টা করে ৷ বরুনের চোখে মুখে যে প্রচ্ছন্ন দম্ভের ছায়া, তার মধ্যে লজ্জার প্রলেপ লেপে দেবে যেন এ প্রশ্ন টা ৷
: জ্বী, তারকনাথ কলেজ থেকে বি. এ ৷
অনুপ হতভম্ব হয়ে গেলো উত্তর শুনে ৷ তারকনাথ কলেজ খুব নামকরা ৷ সেখান থেকে বি এ পাশ করা ছেলে কেনো দারোয়ানের চাকরি করতে আসবে?
অনুপ জিজ্ঞেস করলো, কি সর্বনাশ! তুমি তবে এ চাকরী করতে এলে যে ?জ
বরুন মুখে কিছু বললো না ৷ একটা হাসি দিল ৷ সে হাসিতে সব প্রশ্নের উত্তর আছে কি না অনুপের জানা নেই তবে এতটুকু বুঝতে পারলো যে , যে ডিগ্রী টা বরুন নিয়েছে তার কোনো মূল্য আপাত দৃষ্টিতে ওর কাছে নেই, ওটার জন্য কেবল একটা তাচ্ছিল্যের হাসি বরাদ্দ আছে , এতটুকুই ...

শহরের রাতের সাথে গ্রামের রাতের বিস্তর পার্থক্য ৷ শহরের রাত জেগে থাকে ল্যাম্পপোস্ট আর গাড়ির হেডলাইটে ৷ গ্রামের রাত ঘুমিয়ে যায় চাষাদের নৈশভোজের সাথে সাথে ৷ বেলা আর ইলিনা যখন শহরে থাকতো , হোমওয়ার্ক, টিভি সিরিয়াল , ডিনার করে শোবার প্রস্তুতি নিতে নিতে রাত বারোটা বেজে যেতো ৷ লাইট অফ করে দু বোন শুয়ে শুয়ে গল্প করত ৷ স্কুলে কি কি হলো, বাংলা টিচার কেমন ঠোঁট গোল করে হাসের মত কথা বলে, টুম্পা নামের একটা মেয়ে আছে, সে এই বয়সেই প্রেম করে, বেলাদের ক্লাস রুমে রটে গেছে সাহারা নামের মেয়েটার বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে, তবে সাহারা তা স্বীকার করে না, এ নিয়ে কত কাহিনী ৷ গল্প করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়তো ওরা!
বাবার ট্রান্সফারের পর থেকে জীবনের গতি শ্লথ হয়ে গেছে , নতুন জায়গা, স্কুল নেই, পড়া নেই, টিচারের বকা নেই, মায়ের তাড়া নেই, অদ্ভুত এক স্থবিরতা নেমে এসেছে বেলা আর ইলিনার প্রতিদিনকার জীবনে ৷
তাই অনেক রাত পর্যন্ত চোখে ঘুম আসে না ওদের ৷ এপাশ থেকে অপাশ করে করে গভীর রাত হয়ে যায় ৷
প্রতিদিনের মত সেদিনও বেলা আর ইলিশা শুয়ে পড়ে বিছানায় ,একটু আগেই ৷
ইলিনা বেলা কে জিজ্ঞেস করে, আপু, স্কুলে কবে ভর্তি হবো?
: হবি, দু এক দিনের মধ্যেই বাবা ঠিক করে দেবে স্কুল ৷
: নতুন নতুন ছেলেমেয়ে, অপরিচিত, ওরা কি আমাকে দেখে হাসবে ?
: হাসবে কেনো? তুই কি বোকা মেয়ে? বোকামি করবি ক্লাসে ঢুকে?
: না, তারপরও ৷ নতুন দের দেখে সবাই যেন কিভাবে তাকায় ৷ আমার ভালো লাগে না ...
বেলা হঠাত বললো, চুপ করে ঘুমা তো ৷ আমার মাথা ব্যথা করছে ৷ কথা বলিস না ৷
ইলিনা বুঝতে পারল না হঠাত রেগে উঠার কি হলো বেলার ৷ ভালোই তো বোনের সাথে গল্প করছিলো ৷ কি হয়ে গেলো!
ইলিনা কিছু বুঝে উঠার আগেই বেলা বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেয়ালের সাথে নিজের মাথা ঠুঁকতে লাগলো আর বলতে লাগলো , খবরদার ইলিনা, মা বাবা কে কিছু বলবি না, বললে তোকে খুন করে ফেলবো.


বেলা নিজের মাথা টা ক্রমাগত দেয়ালে ঠুকছে, আর কিছুক্ষণ এই ঠুকোঠুকি চললে কপাল কেটে রক্তারক্তি কান্ড হবে, ইলিনা বয়সে বেলার চেয়ে ছোটো হলেও বোনের প্রতি দায়িত্ববোধ আছে প্রবল, সে বোনকে দু হাতে জাপটে ধরে দেয়ালে মাথা ঠোকা থেকে নিবৃত্ত করতে সমর্থ হলো ৷ বেলা কে বিছানায় বসিয়ে বললো, দিদি , তোর কি হলো বলতো হঠাত করে?
বেলা দু হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলো ৷ বললো, জানি না রে , হঠাত মাথাটা খুব ব্যথা করতে লাগলো, এত তীব্র ব্যথা, মনে হলে যদি মাথাটায় জোরে আঘাত করি , তবেই ব্যথা টা কমবে,তাই......
ইলিনা বেলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো, বললো, এখন ঠিক আছিস তো?
বেলা বললো, হ্যা ৷
দিদি, আমি কি বাবা মা কে বলবো, তোর কথা? সেদিন রাতে বারান্দায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলি, আজ আবার ...
বেলা ইলিনার মুখ চেপে ধরে বললো, খবরদার, কাউকে কিচ্ছু বলবি না, আমি ঠিক আছি ৷ কিচ্ছু হয়নি আমার ৷
ইলিনা কিছু বললো না ৷ তার চোখে বিষ্ময় ৷ নতুন বাংলো তে উঠার পর থেকেই বেলার কি যেন হয়েছে ৷ চোখ গুলো কোটরের ভেতরে চলে যাচ্ছে ৷ চুল রুক্ষ্ম, চেহারায় প্রাণ নেই, নির্জীব হয়ে যাচ্ছে ৷
বেলা উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাড়াল ৷ তারপর হঠাৎই ইলিনার দুই বাহু তে চেপে ধরে বললো ,আচ্ছা ইলু, তোর কি কখনো মনে হয়নি, এ বাংলোটা আর সব সাধারণ বাংলোর মত না, বাংলোটা, বাংলো টা খারাপ ,অশুভ ....
ইলিনা হেসে উঠল ফিক করে ৷ বললো , না তো, আমার তো অমন কিছু মনে হয়নি ৷ তোমার এমন লাগে বুঝি?
বেলা কোনো উত্তর দিল না ...জানালার ধারে গিয়ে দাড়াল ৷ দখিনমুখী জানাল, হু হু করে বাতাস আসে এ জানালা টা দিয়ে ৷ বেলার চুল গুলো বাতাসের ঝাপটায় ছুটে যেতে চায় বহুদূরে কোথাও ....
বেলা কতক্ষণ এভাবে দাড়িয়ে থাকে ঠিক জানে না যে নিজেও ৷ একসময় অস্ফুট স্বরে বলে, ইলু, চল না আমরা অন্য কোথাও চলে যাই এ বাংলো টা ছেড়ে... ইলিনার কাছ থেকে কোনো উত্তর আসে না , আসবে কি করে, ইলিনা তো ঘরে নেই , চলে গেছে নিচ তলায় ....
//
বধিনাথ বসে আছে অনুপ ব্যানার্জির সামনে পাতা একটা কাঠের চেয়ারে ৷ মুখে পান ৷ পিক ফেলার কোনো পিকদানী নেই এ রুমে, উঠে জানাল দিয়ে বাইরে পিক ফেলতে বোধহয় বধিনাথের খুব একটা ইচ্ছে করছে, না, উঠে যেতে আসতে পরিশ্রম হবে, তারচেয়ে পিক কোৎ করে গিলে ফেলাই বেশি ভালো হবে, বধিনাথ কোৎ করে পানের পিক গিলে ফেলে বললো, স্যার, কেমন লাগছে নতুন বাংলো?
অনুপ ব্যানার্জি পত্রিকা পড়ছিল ৷ চোখ না তুলেই বললো, ভালো লাগছে বধিবাবু ৷
: এই কদিন আগেও ভুতুড়ে বাংলো ছিল, রাজ্যে ঝোপ ঝাড় ৷ দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়ে ৷ সন্ধ্যেয় শিয়াল ডাকে ...
: ওহ ৷ তাই নাকি, কিন্তু আমরা এসে তো তেমন কোনো চিহ্ন দেখতে পেলাম না ৷ ঝকঝকে দেয়াল, ছেটে রাখা বুনো ঝাড় ৷
: কি করে যে বলি মশাই , হে হে, আমি বলে কয়ে দপ্তর থেকে টাকা তুলিয়ে বাংলোটার সংস্কার করালুম, আপনি পরিবার নিয়ে থাকতে আসবেন, একটা দায়িত্ববোধ আছে না?
অনুপ ব্যানার্জি পত্রিকা থেকে চোখ তুলে শীতল দৃষ্টিতে বধিনাথের দিকে তাকালো ৷ লোকটা কে শুরুতে সাধারণ মনে হলেও একে এখন বেশ বিরক্তিকর আর গোলমেলে মনে হচ্ছে ৷ চাটুকার টাইপ লোকেরা নানা ফ্যাঁকরা বাধায় ৷ টাকা পয়সা ঘুষ চায় ৷ স্থানীয় মোড়ল টাইপ লোকেদের নানা তদবির নিয়ে এসে তেলতেলে মুখে বলে, একটু যদি দেখে দেন, করে দেন ৷ অনুপ প্রানী সম্পদ কর্মকতা, দেখা যাবে বন জঙ্গল থেকে মূল্যবান জীব জন্তু মেরে চামড়া চালান করবে ভারতে , অনুপ কে বলবে একটু দেখে রাখতে ৷
অনুপ ঠান্ডা গলায় বললো, মশাই কে ? হু ইজ ইউর মশাই? আমি ?
বধিনাথ খুব অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগলো ৷ সে এ এলাকার স্থানীয় ৷ এলাকায় তার প্রতাপ আছে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ৷ যদিও অফিশিয়াল পদবী তে সে অনুপ ব্যানার্জী থেকে অনেক নিচে ৷ সে ভেবেছিল অনুপ ব্যানার্জি তার মশাই সম্বোধন সহজ ভাবেই নিবে ৷ তবে অনুপের আত্মমর্যাদা বোধ প্রবল , তা বুঝতে পারে নি বধিনাথ ৷ সে বললো, আজ্ঞে, দুঃখিত স্যার ৷ মুখ ফসকে বলে ফেলেছি ....
অনুপ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো, আপনি এখন আসুন.....
বধিনাথ বললো, জ্বি নিশ্চই, তবে স্যার, একটা কথা, যা বলতে এসেছিলাম, বাংলোর সব ঠিক থাকলেও একটা ব্যাপারে আপনাকে অবগত করা নিজ দায়িত্ব বলে মনে করলাম,
: কি?
: শুনলাম নতুন এক দারোয়ান নিয়োগ দিয়েছেন বাংলোর পাহাড়ায় ৷
: হু ঠিক শুনেছেন ৷
: বেশ বেশ, তা আগের যে দারোয়ান ছিল, আমাদের সুধার স্বামী, বিধান ডোম....
: তাই নাকি? তা সে কোথায়, কি হয়েছে ওর?
: স্যার, ও বেচারা কে ভূতে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছে, বাংলো টা অশুভ তো .... তাই বলি যদি একটু সাবধানে থাকতেন, মেয়ে ছেলেরা আছে....আপনি বললে তাবিজ কবজ ,,,
: আরে ধুর মিয়া,যান তো আপনি এখান থেকে, নেশা টেশা করেন নাকি আপনি? যত্তসব! 

"বিধান ডোমের মৃত্যু" 
- Redwan Eshad


SHARE

Author: verified_user