Friday

বাংলা উপন্যাস অদূরে ভবিষ্যত | Bangla Golper Boi

SHARE

                                          "অদূরে ভবিষ্য"                                                                    - লেখা: ফারজানা আক্তার




bangla ebook

-

হেমা পালিয়েছে,খবরটা এক কান দুই কান করে পুরো মহল্লায় ছড়িয়ে যেতে পুরো চব্বিশ ঘন্টা সময় লাগেনি।সকাল থেকে বিকেলের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেছে।হবেই না বা কেন?বাসায় সুফলা মাসির মতো কথা চালাচালি করার এমন একজন কাজের বুয়া থাকলেই তো হয়,আর কি লাগে?হেমা বাসা থেকে বের হয়েছে সকাল প্রায় ৮টার সময়।কাউকে কিছু জানিয়ে যায়নি।সময়টা কেবল অনুমান করা।তারপর থেকে হেমার ফোনের সুইচস্টপ।বিকেল গড়াতেই হেমার পালিয়ে যাওয়ার খবর পুরো মহল্লায় হয়ে গেলো।

                               Bangla Golper Boi

হেমার ছোট বোন শ্যামার এই বিষয়ে কোনো ভাবান্তর নেই।ওর কাজ হলো কেবল কলেজে যাওয়া,পড়া,খাওয়া,ঘুমানো আর নিয়ম করে সিরিয়াল দেখা।বড় বোন পালিয়েছে এটা নিয়ে শ্যামার ভাবার মতো কিছু আছে বলেও মনে হয় না তার।হেমার বাবা তারাশঙ্কর ব্যানার্জী ধাক্কাটা ঠিক সামলাবেন কি করে বুঝতে পারছেনা।হেমার পালানোর খবরটা জানার পর থেকে ঘোমট মেরে নিজের ঘরে শুয়ে আছেন তিনি।হেমার মা মহুয়া ব্যানার্জী সকাল থেকে কাঁদছেন।আর বারবার হেমাকে ফোনে ট্রাই করে যাচ্ছেন।মেয়ের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে যতটা না তিনি আফসেট,তার চেয়ে বেশি শংকিত তিনি স্বামীর ভয়ে।মেয়েরা একটু দোষ করলেই তারাশঙ্কর ব্যানার্জী আঙুল তুলেন মহুয়ার দিকে।সেই ভয়ে স্বামীর কাছ ঘেষতেও আজ ভয় পাচ্ছে মহুয়া ব্যানার্জী।স্বামীর অজান্তে আত্মীয়স্বজনের বাসায় বাসায়ও ফোন করলেন মহুয়া।কিন্তু না,হেমা সেসব কোথাও যায়নি।মায়ের বোকামি দেখে শ্যামা বিরক্ত হয়ে বললো,মা তোমার মেয়ে পালিয়েছে কি তোমার চেনাজানা লোকেদের বাসায় গিয়ে ওঠার জন্য?তোমার মেয়ে যার সঙ্গে পালিয়েছে তার সঙ্গে অন্যকোথাও গেছে।দয়া করে এসব বন্ধ করো।মহুয়া অবাক হয়ে তাকালেন ছোট মেয়ের দিকে।এতোবড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো,অথচ এই মেয়ের চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই।দিব্বি আমোদ-প্রমোদ করে সিরিয়াল দেখছে। Bangla Uponnash 
-
ডোরবেলে কয়েকবার আওয়াজ হলো।শ্যামা বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকালো।মহুয়া সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ভেতরের ঘরে চলে গেলেন।কারো মুখোমুখি তিনি হতে চান না।কাজের বোয়াটাও নেই।মুখে পানের খিলি দিয়ে সেই কখন বেরিয়ে গেছে সারা মহল্লা উদ্ধার করার জন্য,ফেরার খবরই নেই আর।অগত্যা শ্যামাকেই উঠতেই হলো।বিরক্তি মাখা চেহারা নিয়ে দরজাটা খুলতেই দেখতে পেলো নিচের ফ্ল্যাটের চিত্রা বৌদি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।
এই মহিলাকে হেমা এবং শ্যামা দু'জনেই এড়িয়ে চলে।কারণ সুযোগ পেলেই এই মহিলা তাদের মায়ের সামনে নিজের মেয়ে আর বোনের সাফারি গাইয়ে হেমা আর শ্যামাকে কোনঠাসা করে।এর ওর কথা চালাচালিতে শ্যামাদে কাজের বোয়া সুফলা মাসির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
শ্যামা ভ্রুজোড়া বাঁকা করে বললো,এই সময় তুমি?
-তোমাদের দেখতে এলাম শ্যামা।
-আমাদের?কই আমাদের বাসায় তো কারো অসুখ করেনি।তাহলে কাকে দেখতে এলে?
-ওমা অসুখ করলেই বুঝি দেখতে আসতে হয়।এমনি বুঝি আসা যায়না?
-নাহ আসা যায় না।আমাদের ফ্ল্যাটে তোমার এমনি এমনি আসা বন্ধ।
মহিলা থমথম খেয়ে বললো,
-শুনলাম হেমা নাকি পালিয়েছে??
-হ্যাঁ,পালিয়েছে।তো?
-না খবর নিতে এলাম আর কি।
-খবর নিয়ে তুমি কি করবে শুনি?সারা পাড়াতো অনেক আগেই সুফলা মাসি করে ফেলেছে।তোমার মুখে ভাসি খবরটা শুনে মহল্লার আর কেউ মজা পাবে বলেতো মনে হয়না।বলেই ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিলো শ্যামা।দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে চিত্রা নামের মহিলাটি শ্যামাকে কয়েকটা গালমন্দ করে চলে গেলেন।
-
মেজাজটাই বিগড়ে গেলো শ্যামার।কত্ত দারুন একটা এপিসোড চলছিলো।দিলো সব পন্ড করে।আজ আসুক সুফলা মাসি,হয় কাজে থাকবে,না হয়তো চলে যাবে।একটা কথাও যেন পেটে ভাসি হয়না তার।আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে আমাকে!!
এমন সময় ডাক পড়লো তারাশঙ্কর ব্যার্জীর ঘর থেকে।শ্যামা এবারও একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাবার করে গেলো সুফলা মাসির গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে।
তারাশঙ্কর ব্যানার্জী ছোট মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-তোমার দিদি কোথায় গেছে তুমি কি জানো?
-না বাবা।
-সত্যিই জানোনা?
-সত্যিই জানিনা বাবা।আমার এতোকিছু জানার দরকার কি বলো?দিদি আমার সঙ্গে এসব নিয়ে কিছু কি কখনো শেয়ার করে?
তারাশঙ্কর ব্যানার্জী এবার কঠিন হলেন।
-মিথ্যা বলছোনা তো তুমি???

বাবার চিৎকারে শ্যামা কেঁপে উঠলো।পাশের ঘর থেকে শ্যামার মাও দৌড়ে আসলেন স্বামীর উচ্চগলার আওয়াজ পেয়ে।
ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বললো শ্যামা,
-আমি কিছুই জানিনা বাবা।প্লিজ বিশ্বাস করো।
মেয়ের করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে হতাশ হলেন তারাশঙ্কর ব্যানার্জী।
দরজায় দাঁড়ানো স্ত্রীর দিকে চেয়ে তিনি বললেন,
-তোমাকে আর কি জিজ্ঞেস করবো।আমড়াকাঠের ঢেঁকি একটা!!মাত্র দু'টো মেয়েকে ঠিকমত চোখে চোখে রাখতে পারোনা!!
স্বামীর ধমক খেয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেলেন মহুয়া ব্যানার্জী।
-
তারাশঙ্কর ব্যানার্জীকে পাড়ার সকলে সম্মান করে।এলাকায় তার অনেক নাম ডাক।লোকে তারাশঙ্কর বাবু বলেই চিনে তাকে।বিচার সালিশ সব কিছুতে তার ডাক পড়ে।পূজা পার্বণে তিনি দুইহাতে দান করেন।তারই মেয়ে হেমা একটা ছেলের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়েছে এটা তারাশঙ্কর বাবুর জন্য লজ্জাজনক। লজ্জায় তিনি ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।বড় আশা করে নিজের পছন্দ করা উপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছিলেন তারাশঙ্কর বাবু।আর মাত্র চারদিন বাকি বিয়ের।এরই মাঝে মেয়ে উধাও।লজ্জায় অপমানে তারাশঙ্কর বাবুর ইচ্ছে করছে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে।মেয়েরা যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছেন তিনি।কখনো কোনো মেয়েকে নাখোশ করেননি।উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন।অথচ সেই মেয়ে আজ বাবার মুখে চুনকালি লাগাতে এতটুকু ভাবেনি।দীর্ঘশ্ব
াস ছাড়লেন তারাশঙ্কর বাবু।
-
ট্রেনে পাশাপাশি সিটে বসে আছে দু'জন সদ্য বিবাহিত স্বামী স্ত্রী।নাম হেমা আর চয়ন।চয়নের কাঁধে হেলান দিয়ে হেমা ঘুমুচ্ছে।চাঁদের আলো উজ্জ্বল বর্ণের হেমার মুখায়বে এসে শ্রী আরো বাড়িয়ে তুলেছে।সেদিকে চয়ন অপলক চেয়ে আছে।হেমার উড়ন্ত চুল গুলো বারবার চয়নের মুখে এসে ভালোলাগার পরশ বুলাচ্ছে।চয়ন আপন মনে হেমার বাঁধাহীন চুলের ঘ্রান নিচ্ছে।
এমন সুন্দরী মেয়েটাকে সে কখনো কাছছাড়া করে থাকতে পারবেনা বলেই এতোদূর নিয়ে আসা।চয়ন জানেনা হেমাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর মায়ের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে,বাবার শাসনের কঠোরতা আরো কতটা কঠিন হবে।শুধু জানে হেমাকে সে হারাতে পারবেনা।কক্ষনো না।
হেমাকে চয়ন ভালোবাসে,অনেক বেশি ভালোবাসে।
শ্যামা চোখ রাঙিয়ে তাকালো কাজের বুয়া সুফলা মাসির দিকে।সুফলা মাসি সবে ভেজানো দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে ডুকলো।শ্যামার এমন অগ্নীজ্বলা চাহনি দেখে থমকে দাঁড়ালো সে।শ্যামা রাগি গলায় বললো,
-কি মাসি পাড়া উদ্ধার হলো তোমার?তা আর কেউ কি বাকি আছে খবরটা জানার?থাকলে তাদেরও জানিয়ে আসো।
সুফলা মাসি আমতা আমতা করে বললো,
-কোন খবরের কথা কন আপনে?
-ওমা তুমি বুঝি জানোনা?দিদির পালিয়ে যাওয়ার খবর নিচের ফ্ল্যাটের চিত্রা বৌদি জানলো কেমন করে?
সুফলা মাসি জিবে কামড় দিয়ে বললো,
-ছি ছি ছি,কি কইতাছেন আপনে।আমিতো কাউরে কিছু কইনাই।
-দেখো মাসি,তুমি আমাদের পুরনো কাজের বুয়া বলে তোমাকে আমরা সবাই সম্মান করি।দোষ করলেও বারবার বাবা তোমাকে ক্ষমা করে দেয়।তারপরও তুমি এমন করো কেন বলতো?আমাদের বাসার পার্মানেন্ট কাজের বুয়া হয়েও তুমি কেবল একগাল পান খাওয়ার জন্য চিত্রা বৌদির রাজ্যের কাজ করে দিয়ে আসো।আর এই বাসায় কি হচ্ছে না হচ্ছে সব সারা পাড়ায় সাপ্লাই দাও।
-মিছা কথা,আমি কাউরে কিছু কইনাই।
-কতোটা সত্য বলছো তুমি তা আমি ভালো করেই জানি মাসি।বাবা তোমাকে অনেকবার সাবধান করেছে।এবার কিন্তু কুরুক্ষেত্র বাধাবে বাবা।এখন কিন্তু দিদিও নেই যে বাবাকে বলে কয়ে তোমার চাকরি আটকাবে।দয়া করে সাবধান হও।
শ্যামার এতোগুলো কথা শুনে বুয়ার ধৈর্য এবং বিরক্তি দু'টোই শেষ সীমানায় পৌঁছলো গিয়ে।মুখটা ঈষৎ বাঁকা করে বললো,
-আপনেরে কফি দিমু?
-ঘুষের প্রয়োজন নেই আমার।এইযাত্রায় বাবাকে কিছু বলবোনা।নিজের কাজ করোগে।
বিড়বিড় করে শ্যামাকে কি সব বলতে বলতে বুয়া সুফলা মাসি রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
-
হেমার মুখের উপরকার বারণ না মানা চুলগুলোকে চয়ন আলতো হাতে সরিয়ে দিতে চাইলে হেমা চোখ মেলে তাকালো।চয়নের চোখাচোখি হতেই লজ্জায় রক্তাভ আভরণ সৃষ্টি হলো হেমার দুই গালে।কিছুটা লজ্জা আর কিছুটা ভয় নিয়ে চয়নকে প্রশ্ন করলো সে,আর কতদূর?
চয়ন মৌনতা ভেঙে বললো,
-আরো একঘন্টা লাগবে। ভীতু হরিণীর মতো এতোটুকু হয়ে গেলো হেমার মুখটা।চয়নের কাঁধে আবারো মাথা রেখে বললো,
-ভীষণ ভয় করছে আমার।তোমার বাবা মা এভাবে আমাকে মেনে নেবে তো?
-এতো ভয় পেওনা।সব ঠিক হয়ে যাবে।মা তোমাকে নিশ্চয়ই মেনে নেবে।
-আর তোমার বাবা?জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো হেমা।
-মেনে নেবে,চিন্তা করোনা।
যদিও চয়ন জানে বাবা সহজে টলে যাওয়ার মতো লোক নয়।কুরুক্ষেত্র যে একটা বাধাবে তার পূর্বাভাস চয়ন মনে মনে টের পাচ্ছে।কিন্তু চয়ন মনের ভয়টা হেমার সামনে প্রকাশ করতে চায় না।তাহলে হেমা সাহস হারিয়ে ফেলবে।এমনিতেই মেয়েটা আমার জন্য বাবা মা পরিবার সব ছেড়ে আমার হাত ধরে এতোদূর এসেছে।কেবল আমার জন্য।কারণ যাকে ভালোবেসেছি তাকে ভালোবাসেই যেতে চাই আমি।অন্যকারো চোখে হেমার জন্য লালসা আমি সহ্য করতে পারবোনা।মনে মনে বললো চয়ন।তারপর শক্ত করে হেমার হাতটা চেপে ধরলো সে।চোখে চোখ পড়লো দু'জনের।চয়নের স্নিগ্ধ চাহনির দিকে তাকিয়ে হেমা যেন আড়ষ্ট হলো।
-
তারাশঙ্কর বাবু জায়গায় জায়গায় খোঁজ লাগিয়েছেন।কিন্তু না,কোথাও হেমাকে পাওয়া গেলোনা।পাওয়ার মতো আশা আর করতেও চান না তিনি।যে মেয়ে বাঁধন ছেড়ে পালিয়েছে তাকে আর সহজে পাওয়ার নয়।কিন্তু এই মুহূর্তে প্রাণপ্রিয় বন্ধু সুদ্বীপকে কি করে চোখ দেখাবেন তিনি তা নিয়ে শংকিত।বড় স্বাদ করে বন্ধুর ছেলের সঙ্গে হেমার বিয়ে ঠিক করেছেন তিনি।বিয়ের সব আয়োজন প্রায় শেষ।মাঝখানে আর তিনটা দিন বাকি মাত্র।কি করলো মেয়েটা?বলেই মাথায় হাত রাখলেন তারাশঙ্কর বাবু।সুদ্বীপকে খবরটা দিতে হবে।যা হবার হয়ে তো গেছে।এখনই যদি খবরটা সুদ্বীপকে না জানায় তাহলে আরো বিরাট কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।প্রাণের বন্ধুকে তিনি আর মুখ দেখাতে পারবেননা।এখনই জানালে হয়তো সুদ্বীপ তারাশঙ্কর বাবুর পরিস্থিতিটা বুঝার চেষ্টা করবে।মেয়ের বাবা হয়ে কতোবড় ঝামেলার মুখোমুখি হতে হলো তা হয়তো এই মুহূর্তে বন্ধু সুদ্বীপই অনুভব করতে পারবে।
তারাশঙ্কর বাবু ফোন করে বন্ধু সুদ্বীপ চন্দ্র আর তা ছেলে বিজয়কে এখনই আসতে বললেন।যাতে তারা আসতে বিন্দু মাত্র বিলম্ব না করে তাও মনে করিয়ে দিলেন।
শ্যামা একবার এসে উঁকি দিয়ে গেলো বাবার ঘরে।বাবা ফোনে কার সঙ্গে কথা বললো তাও কানখাড়া করে শুনে গেলো সে।তারপর দৌড়ে নিজের পড়ার ঘরে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে হেমার গোপন নাম্বারে কল দিলো।
-হেলো দিদি,কোথার তোরা?
-এখনো ট্রেনে।
-সেকি!এখনো ট্রেনে?এভাবে হলেতো পুরো বাসর রাতটাই ট্রেনে কাভার হয়ে যাবে।রোমান্স কখন করবি শুনি?
-একদম পাকনামি করবিনা শ্যামা!!বাবা মা কেমন আছেরে?
-আর বাবা মা!মা কেঁদে কেঁদে চোখমুখ ফুলিয়ে রেখেছে।জানিসই তো কিছু হলেই বাবা মাকে বকাবকি করে মায়ের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে।
-বাবা এখন কোথায়?
-নিজের করে চুপচাপ শুয়ে আছে।অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েছে তোর।শেষে হতাশ হয়ে সুদ্বীপ আঙ্কেলকে আসতে বলেছে।এখনই বোধহয় এসে পড়বে তারা।
-তুই অনেক খুশি,তাইনারে শ্যামা?
বোনের কথা শুনে শ্যামা মৃদু হাসলো।তারপর বললো,
-খুশি হওয়ারতো সবটা এখনো বাকি দিদি।দোয়া কর,দেখি সুদ্বীপ আঙ্কেল আসার পর কি হয়।
-হুম,ভালো থাকিস বোন।
-তুইও ভালো থাকিস দিদি।চয়নদ্যাকে আমার ভালোবাসা দিস।আর হ্যাঁ,শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ভুলে যাসনা যেন,পৌঁছেই ফোন করবি কিন্তু।রাখছি,বাই।
শ্যামা ফোনটা রেখে মনের সুখে গুণগুণ করে গান গাইতে লাগলো।হঠাৎ মনে হলো এখন একটা দারুন এপিসোড আছে স্টারজলসায়।পরিস্থিতি যখন অনুকূলে তখন আর বাজে চিন্তা করে এপিসোড মিস করার কি দরকার??

তারাশঙ্কর বাবুর ঘরে বন্ধু সুদ্বীপ চন্দ্র এবং তার একমাত্র ছেলে বিজয় বসে আছে।তারাশঙ্কর বাবু কথাটা ঠিক কিভাবে শুরু করবে তার হিতাহিত জ্ঞান যেনো হারিয়ে ফেলেছেন।

সুদ্বীপ চন্দ্র বন্ধুর চেহারার হাল দেখে বললেন,
-কোনো সমস্যা তারাশঙ্কর?এভাবে জুরুরি ডাক দিলে যে?
তারাশঙ্কর বাবু হঠাৎ করে বন্ধুর হাত দু'টি ধরে বললেন,আমাকে মাফ করে দাও সুদ্বীপ।
বন্ধুর করুণ চেহারার দিকে তাকিয়ে সুদ্বীপ চন্দ্র বিপাকে পড়ে গেলেন।ঘটনার আকস্মিকতায় হতবম্ব হয়ে গেলেন তিনি।
-আরে আরে করছো কি করছো কি!হয়েছেটা কি বলোতো?কেন মাফ চাইছো তুমি?
তারাশঙ্কর বাবু রুমালে মুখ মুছে বললেন,
-আমার মুখে চুনকালি লেগেছে বন্ধু।হেমা কোনো এক হতচ্ছাড়ার হাত ধরে পালিয়ে গেছে।
কথাটা শুনে সুদ্বীপ চন্দ্রের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেনো।চোখেমুখে অন্ধকার দেখলেন তিনি।বাপ ছেলে চোখাচোখি তাকলো।বিজয়ের ভাবলেশহীন চেহারা।
-কি বলছো তারাশঙ্কর?কখন ঘটলো এমন ঘটনা?
-আজ সকালে।
-খোঁজ নিয়েছো?
-নিয়েছি।খাঁচার পাখি পালালে কি আর ধরা দেয়?আমার মান সম্মান সব শেষ ভাই,সব শেষ।লজ্জায় বের হতে ইচ্ছে করছেনা বাসা থেকে।লোকজন জিজ্ঞেস করলে কি বলবো বলো?
-এতো চিন্তা করোনা।যা হবার হয়ে গেছে।কিন্তু সবাইকে তো বিয়ের কার্ড দেয়া হয়ে গেছে।কি করবো এখন?
-আমিও কিছু ভেবে পাচ্ছিনা বলে বাধ্য হয়ে তোমাকে আসতে বললাম।ক্ষমা করে দাও আমায়।তারাশঙ্কর বাবু হাত জোড় করে দাঁড়ালো বন্ধুর সামনে।সুদ্বীপ চন্দ্র বন্ধুর হাত দু'টি ধরে বললেন,একি করছো তুমি?বারবার ক্ষমা চাওয়া ঠিক হচ্ছেনা তোমার।তোমার সম্মান কি আমার সম্মান নয়?
এমন সময় শ্যামা আসলো চা নিয়ে।বিজয়ের চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলো শ্যামা।সুদ্বীপ চন্দ্রের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে আদাব জানালো তাকে।তারপর আবার চলে গেলো সে।শ্যামার এমন আতিথেয়তা দেখে কাজের বুয়া সুফলা মাসি অবাক।মাথায় যেনো তার ভেমো বেঁধেছে।আজ সূর্য কোন দিক দিয়ে উঠলো আর ডুবলো তা নিয়ে ভাবতে লাগলো সুফলা মাসি।
-
টানা চার ঘন্টা ট্রেন জার্নির পর গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছলো চয়ন আর হেমা।ট্রেন থেকে নেমে শাড়ির কুচিগুলো বারকয়েক ঠিক করে নিলো সে।চয়ন হেমার একহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো।নির্ভরতার দৃষ্টি নিয়ে তাকালো চয়নের মুখপানে হেমা।চয়ন মৃদু হাসলো।এই হাসির অর্থ ভয় পেওনা।হেমা সাহস পেলো মনে।চয়নের হাত ধরে চললো অজানা এক নতুন পরিবেশের দিকে।সেই অচেনা পরিবেশটা কেমন হবে,কি করে হেমা নিজেকে সেখানে খাপ খাওয়াবে,হেমাকেই বা শ্বশুর বাড়ির লোকজন, শ্বশুর শাশুড়ি ঠিক কতোটা আপন করে নেবে তা সে জানেনা।কেবল জানে ওই অজানা পরিবেশটাকে যে করেই হোক জয় করতে হবে তাকে।
-
হেমাকে নিয়ে একটা অটোরিক্সায় চেপে বসলো চয়ন।অটোরিক্সায় চড়তে হেমা অভ্যস্ত নয়।তবুও কিছু করার নেই।এখানকার একমাত্র যান মাধ্যমই হলো রিক্সা বা অটোরিক্সা,আর মাঝে মাঝে গোটা কয়েক সিএনজি।চয়নদের বাড়ি সবুজে ঢাকা গ্রামের এককোণ।চয়নের বাবা গ্রামের এক হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক।নাম বিষ্ণু সাহা।বিষ্ণু বাবু বললে লোকে তাকে একনামে চিনে।এক ছেলে আর এক মেয়ে এবং স্ত্রী উত্তরাকে নিয়ে তার মধ্যবিত্ত পরিবার।চয়নকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি।শহরে ভালো বেতনের চাকরিও পেলো চয়ন বাবার আদর্শের জোরে।আর মেয়ে ছায়াকে লেখাপড়া শিখিয়ে ভালো পাত্রস্থ করেছেন বছর দুয়েক আগে।বর্তমানে বিষ্ণু বাবু স্কুল,ছাত্রছাত্
রী,সমাজ আর স্ত্রী উত্তরাকে নিয়েই নিজের মতো করে বেঁচে আছেন।ছেলে মেয়েদের কঠোর শাসনে রাখতে কখনো কার্পণ্য করেননি বিষ্ণু বাবু।দুই ছেলে মেয়েই তাকে যমের মতো ভয় পায়।বিষ্ণু বাবুর গলাখাকাড়ির চিৎকার শুনলে স্ত্রী উত্তরা থরথর করে কাঁপে,আর ছেলে মেয়েরাতো বটেই। Bangla Golper Boi 2018
-
রাস্তার দুইপাশে রবিশস্যে চেয়ে আছে।রাত বাজে ১০টার উপরে।কুয়াশায় চারপাশ ঢেকে আছে।অন্ধকার রাত।হেমা জড়োসড়ো হয়ে চয়নের কোমর চেপে ধরে বসলো।ভয়ে মুখটা শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে আছে তার।যেনো এক্ষুনই অটোরিক্সা থেকে চিটকে পড়ে যাবে।চয়ন শক্তকরে ধরে আছে হেমাকে,যাতে হেমা ভয় না পায়।কিন্তু চয়নের মনেও যে কঠিন এক ভয় অহরহ যুদ্ধ করে যাচ্ছে,সেটা চয়ন কি করে বলবে এই মেয়েটাকে?তারচেয়ে বরং সহ্য করে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া যাক আগে।
-
চা শেষে করে তারাশঙ্কর বাবু এবং সুদ্বীপ চন্দ্র ঘোমট মেরে বসে আছেন।বিজয় নিরবতা ভেঙে বললো,এবার তবে কি করবে বাবা?আত্মীয়স্বজন সবাইতো জানে আর দুইদিন পর বিয়ে।মেহমানরাতো কাল হতেই আসতে শুরু করবে।
সুদ্বীপ চন্দ্র বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
-সবাইকে ফোন করে মানা করে দেয়া ছাড়াতো উপায় দেখছিনা।কি বলো তারাশঙ্কর?
-বড় আশা করেছিলাম দুই বন্ধু বেয়াই হয়ে সম্পর্কটাকে আরো মজবুত করবো।কিন্তু তাতো হলোনা।এখন তুমি যা বলো তাই হবে।সবাইকে ফোন করে মানা করে দেবো।মেয়েটা আমাকে এভাবে বিপাকে ফেলে দিলো?বলেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তারাশঙ্কর বাবু।
সুদ্বীপ চন্দ্র কিছু একটা বলতে যাবে।ঠিক এমন সময় বিজয় বললো,
-আমার একটা কথা ছিলো।
-কি কথা?ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন সুদ্বীপ চন্দ্র।
-বাবা আমি বলি কি মেহমানদের আসতে মানা করার দরকার নেই।তোমরাতো তোমাদের দুই বন্ধুর মনের আশা চাইলে এখনো পূর্ণ করতে পারো।
দুই বন্ধু বিজয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকালো।
তারাশঙ্কর বাবু বললেন,
-মানে?
-আসলে আঙ্কেল হেমা যা করার তাতো করেই ফেলেছে।মেহমানদের আসতে বারণ করা কি সমীচীন দেখাবে?
-তুমি কি বলতে চাও ক্লিয়ার করে বলবে বিজয়?জিজ্ঞেস করলেন সুদ্বীপ চন্দ্র।
-বাবা শ্যামা তো আছে।ওকেওতো কোনো না কোনো সময় বিয়ে দিতে হবে।হয়ে যাক না দুইদিন পর শ্যামার বিয়ে!তোমরা রাজি থাকলে আমি শ্যামাকে বিয়ে করতে চাই।এতে করে তোমাদের মান সম্মানও বাঁচবে,মেহমানদের আসতে মানা করে লজ্জাও পেতে হবেনা।কেবল পাত্রী বদলাবে।
বিজয়ের কথা শুনে তারাশঙ্কর বাবু আশার আলোর মুখ দেখতে পেলেন।চোখমুখ তার ঝলমল করে উঠলো।
সুদ্বীপ চন্দ্র নিজের ছেলে এবং বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু মুহূর্ত ভাবলেন।তারপর বললেন,প্রস্তাবটা খারাপ না।কিন্তু শ্যামা কি এই বিয়েতে রাজি হবে?ওরতো এখনো পড়ালেখাই শেষ হলোনা।ওর মতামত জানাতো দরকার আগে।
শ্যামা আড়ালে দাঁড়িয়ে এখানকার সব কথাই শুনলো।পর্দাটা হালকা ফাঁক করে বিজয়ের চোখে চোখে তাকালো।ঈষৎ লজ্জা পেয়ে শ্যামা সরে গেলো সেখান থেকে।
তারাশঙ্কর বাবু বললেন,আমি আগে শ্যামার সঙ্গে কথা বলে দেখি সুদ্বীপ।
-আমার মনে হয়,দেরি না করে ওকে এখনই জিজ্ঞেস করা উচিত।বললেন সুদ্বীপ চন্দ্র।

মাথা নিচু করে শ্যামা বাবার সামনে আসলো।তারাশঙ্কর বাবু মেয়েকে পাশে বসালেন।তারপর শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

-শ্যামা তুমি তোমার বাবাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসো?
শ্যামা অবাক চোখে বাবার মুখের দিকে তাকালো।এভাবে বাবা তাকে প্রশ্ন করবে তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি।এই প্রথম বাবাকে অনেক বেশি অসহায় দেখালো।শ্যামা বললো,
-কতোটুকু ভালোবাসি সেটা ওজন করে বলতে গেলে তো লোকদেখানো হয়ে যায় বাবা।আমি কেবল জানি,আমি আমার বাবাকে অনেক ভালোবাসি।যতটুকু ভালোবাসলে নিজের মনেও শান্তি পাওয়া যায়।
তারাশঙ্কর বাবু মেয়ের কথায় সন্তুষ্ট হলেন এবং এই প্রথম উপলব্ধি করলেন যে, দেখতে দেখতে তার ছোট মেয়েটিও অনেক বড় হয়ে গেছে।সুদ্বীপ চন্দ্র তারাশঙ্কর বাবুকে তাড়া দিলেন।বললেন,
-তারাশঙ্কর আসল কথাটা ওকে বলো।
তারাশঙ্কর বাবু আবারো শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-তুমি তো জানো মা,তোমার দিদির জন্য আজ আমার মান সম্মান শেষ।দেখোনা তোমার সুদ্বীপ আঙ্কেলকে পর্যন্ত আমি মুখ দেখাতে লজ্জা পাচ্ছি।তুমি কি তোমার বাবার হারানো মান সম্মান ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করবে?
-বাবা আমাকে কি করতে হবে?জানতে চাইলো শ্যামা।যদিও শ্যামা জানে বাবা এখন কি বলবে।
-আমরা চাইছি বিজয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে দিতে।
শ্যামা আড়চোখে বিজয়ের দিকে তাকালো।বিজয় মিটিমিটি হাসছে।মাথা নিচু করে ফেললো শ্যামা।তারাশঙ্কর বাবু সুধালেন,
-তুমি রাজি আছো তো এতে?
-তোমরা যা বলবে আমি তাই করবো বাবা।বলেই দৌড়ে চলে গেলো শ্যামা।
উপস্থিত তিনজন ব্যক্তি সহসা বুঝতে পারলেন শ্যামা লজ্জা পেয়েছে।এতোক্ষণ যে পরিবেশটা ঘোমট মেরে ছিলো সেই পরিবেশে এখন আনন্দের ছোঁয়া লাগলো।তারাশঙ্কর বাবুর চোখে আনন্দ অশ্রু।এই মুহূর্তে তিনি যেনো ভুলেই গেলেন হেমা নামেও তার একটি মেয়ে রয়েছে।যার জন্য সকাল থেকে তিনি মনে আঘাত পেয়েই চলছিলেন।বন্ধু সুদ্বীপ চন্দ্রকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললেন,তোমরা বাপ বেটা আমার মান নয় কেবল,প্রাণটাও বাঁচালে।সুদ্বীপ চন্দ্র বললেন,বন্ধুর প্রতি এই আমার দায়িত্ব। বিজয়ের মুখে জয়ের হাসি।কারো মুখে হাসি উদ্ভাসিত করতে পারার আত্মতৃপ্তি।অন্যঘরে হয়তো শ্যামাও হাসছে।বিজয়কে নিজের করে পাওয়ার গভীর আনন্দ এতোক্ষণে হয়তো শ্যামার ঘরের বইখাতা,চেয়ার,টেবিল,বারান্দায় লাগানো বেলিদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে।
-
প্রায় ২০মিনিট পর চয়ন বাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছলো।অটোরিক্সা থেকে নেমে সোজা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দরজায় কড়া নাড়লো।বুকটা ঢিপঢিপ করছে তার।ভয়ে ঠান্ডা স্রোত বেয়ে গেলো তার শিরদাঁড়া হয়ে।হেমা চয়নের গায়ের সঙ্গে ষেটে দাঁড়িয়ে আছে।দরজাটা খুলে যেতেই সরে দাঁড়ালো সে।বিষ্ণু বাবু দরজা খুলেছেন।ছেলেকে এতোরাতে দেখে তিনি অবাক হলেন।চোখেমুখে অস্থির ভাব এনে বললেন,
-চয়ন তুই?
-বাবা আসলে,
চয়নকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হেমার দিকে চোখ পড়তেই বিষ্ণু বাবু প্রশ্ন করলেন,
-মেয়েটা কে চয়ন?
চয়ন মাথা নিচু করে ফেললো।বিষ্ণু বাবু জিজ্ঞাসু চোখে একবার ছেলেকে আরেকবার হেমাকে পরখ করতে লাগলেন।হেমা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছে।গলাটা শুকিয়ে গেছে তার।বিষ্ণু বাবু অগ্নীচোখ ধারণ করলেও শান্ত গলায় আবার প্রশ্ন করলেন,
-মেয়েটা কে চয়ন?
-বাবা ওর নাম হেমা।
-ওর নাম যাই হোক,কে ও,তোমার সঙ্গে কেন এখানে?
এতোক্ষণে চয়নের মা উত্তরা দেবীও এসে গেলেন।ছেলেকে দেখে তার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক।চয়নের কপালে চুমু খেলেন তিনি।কৌতুহলী হয়ে বললেন,
-বাবা তুই এতোরাতে কোত্থেকে এলি?চল চল ভেতরে চল।
বিষ্ণু বাবু গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন,
-ছেলেকে দেখে এতো আহ্লাদের কি আছে বুঝলাম না তো!!ছেলে কি রাজ্য শুদ্ধ জয় করে এনেছে তোমার জন্য?
স্বামীর এমন আকস্মিক রাগের কারণ উত্তরা দেবী বুঝতে পারলেন না।খানিক দূরে দাঁড়ানো হেমাকে তিনি খেয়ালই করেননি ছেলে ফেরার আনন্দে।
কপালের চামড়া ভাজ করে বললেন,
-তোমার আবার কি হলো?
বিষ্ণু বাবু হেমাকে দেখিয়ে বললেন,
-তোমার ছেলের সঙ্গে একটি মেয়েও এসেছে।
উত্তরা দেবী এবার হেমাকে দেখলেন।
-ওমা,সেকি!এই মেয়ে আবার কেরে বাবা?
চয়ন আর কোনো ভণিতা করতে চায় না।সোজা বলে দিলো,মা আমি বিয়ে করেছি।ও তোমাদের বউমা।
কথাটা বলতে দেরি হলো,চয়নের গালে ঠাশ করে বিষ্ণু বাবুর কাঠের মতো শক্ত হাতের কঠিন ছোঁয়াটা লাগতে দেরি হয়নি।চয়ন গালে হাত দিয়ে বাবার দিকে তাকালো।ঘটনার আকস্মিকতায় হেমা হতবম্ব।চোখেমুখে একরাশ ভয় গ্রাস করলো তার।চোখ দু'টি জলে টলমল করছে।যেনো এখনি শ্রাবণের মেঘ থরথর করে নামবে হেমার দুই গন্ড বেয়ে।বিষ্ণু বাবু চিৎকার করে বললেন,
-লজ্জা করছেনা এই কথাটা বলতে???আমি কি অবুঝ???একটা মেয়ে কি এমনি এমনি তোর সঙ্গে এসেছে??আমিতো দেখেই বুঝেছি আমার গুণধর ছেলে বিয়ে করে একেবারে বউ নিয়ে হাজির।কেবল ছেলের সাহসটা আরেকবার তারিফ করার জন্যে জানতে চাইলাম মেয়েটা কে!
স্বামীর আচরণ দেখে উত্তরা দেবী ভরকে গেলেন।ছেলে যে মস্তবড় অন্যায় করে ফেলেছে তার তো কোনো সন্দেহ রইলোনা।তাই আর ছেলের পক্ষ নিয়ে কথা বলে অশান্তি বাড়াতে চান না তিনি।কেবল অসহায় জননীর রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে রইলেন উত্তরা দেবী।
বিষ্ণু বাবু বললেন,
-এই বাড়ির দরজা তোর জন্য বন্ধ চয়ন!!তুই আমার আদর্শে আঘাত করেছিস!!
-বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও।কাঁদো কাঁদো হয়ে হাত জোড় করলো চয়ন।
-ক্ষমা??ক্ষমা যার তার জন্য নয় চয়ন।এক্ষুণই তুই বেরিয়ে যাবি!!
তারপর স্ত্রীর দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন,মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে এসো।আর তোমার ছেলেকে বলো বের হয়ে যেতে!!
উত্তরা দেবী অবাক হলেন।অচেনা মেয়েটাকে ঘরে আনতে বলছে আর নিজের ছেলেকে বেরিয়ে যেতে বলছে।এই লোক কি আজীবন এমন পরোপকারীই থাকবে??হেমা ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।চয়ন মনে মনে প্রশান্তি পেলো এই ভেবে যে,অন্তত হেমাকে বাবা ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে।নিজের কথা পরেও ভাবা যাবে।উত্তরা দেবী হেমার থুতনি ধরে বললেন,ভয় পেওনা।লোকটা এমনই।এই নরম তো এই গরম।বলেই হেমার একটা হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন।যাওয়ার সময় লালচোখ করে একবার ছেলেকেও ঈশারায় শাসালেন।হেমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন উত্তরা দেবী।চয়ন অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে কোথায় যেনো চলে গেলো।

হেমাকে ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলেন উত্তরা দেবী।চোখেমুখে তার প্রশান্তির ছায়া।ছেলের বউয়ের রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন তিনি।মনে মনে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে বললেন,তুমি আমার মনের আশা পূরণ করেছো ঠাকুর।এমন সুন্দরী বউ পাওয়া কি আর যার তার কপালে আছে?তুমি আমার ছেলে আর বউকে সুখী করো।তারপর হেমার দিকে তাকিয়ে কপাল ভাজ করে বললেন,

-চয়নের জন্য মন খারাপ হলো তোমার তাইনা মা?চিন্তা করোনা ও সকাল হলেই ফিরে আসবে।তোমার শ্বশুর এমনই।রেগে গেলে আর তাকে কোনো কথা দিয়েই ভোলোনো যায় না।চয়ন যদি এখন তার কথামতো বেরিয়ে না যায় তাহলে সারা রাত কুরুক্ষেত্র চলবে এই বাড়িতে।তোমার শ্বশুরের রাগ কমে গেলেই ওকে ফোন করে বলবো বাড়ি ফিরতে।তুমি একদম চিন্তা করোনা।হেমা কেবল জোর করে মৃদু হাসলো।
উত্তরা দেবী হেমার থুতনি ধরে বললেন,
-মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে তোমার।নিশ্চয়ই সারাদিন কিছু খাওনি,তাইনা?
হেমা কিছু বললোনা।লজ্জায় তাকাতে পারছেনা সে।
উত্তরা দেবী হেমাকে একটা কাপড় এনে দিয়ে বললেন,
-তুমি বাথরুমে গিয়ে স্নান টা সেরে নাও।আমি তোমার খাবার নিয়ে আসছি।
হেমা বাধ্য মেয়ের মত কাপড়টা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে চললো।সবকিছু যেনো তার স্বপ্নের মতো লাগছে।চয়নের মা এতো সহজে তাকে মেনে নেবে ভাবতেই পারেনি সে।হেমাকে যেভাবে আদর আহ্লাদ করছে,যেনো মহিলা তাকে অনেক আগ থেকেই চিনে।সবকিছু কেমন যেনো বেশি বেশি লাগছে হেমার কাছে। তৎক্ষণাত চয়নের বাবার মূর্তিটি মনে হতেই বুক কেঁপে উঠলো তার।কোনো মানুষ এতো কঠিন হতে পারে?হেমা নিজের বাবাকেও দেখেছে।সেও হেমাদের দুই বোনকে শাসন করে।কিন্তু চয়নের বাবার মতো এতোটা কঠিন মনে হয়নি তাকে।এতো রাতে চয়নকে লোকটা বের করে দিতে পারলো?কোথায় যাবে এখন চয়ন?ভাবতে ভাবতে কোনোরকমে স্নানটা করে নিলো হেমা।বাথরুম থেকে বের হয়ে চুলগুলো মুছতে যাবে এমন সময় দেখলো ফোনস্ক্রিনে আলো জ্বলছে।হাতে নিতেই দেখতে পেলো ৬টা কল।দুইটা চয়নের আর বাকিগুলো শ্যামার।আগে শ্যামার সঙ্গে কথা বলা দরকার।ওখানকার অবস্থাটা ঠিক কেমন চলছে তা জানাটা হেমার দায়িত্ব।চয়নকে এরপরই ব্যাক করবে।
শ্যামাকে কল দিতেই রিসিভ করলো,
-হ্যালো দিদি,বাজিমাৎ হয়ে গেছে!!শ্যামার কন্ঠে উল্লাস ফেটে পড়ছে।হেমা জানতে চাইলো,
-কি বাজিমাৎ হলো?
-বিজয়দার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে দিদি!
-সত্যি বলছিস??
-হ্যা দিদি,এতো সহজে সব হয়ে যাবে আমি ভাবতেই পারিনিরে দিদি।সব তোর জন্য হলো।থ্যাঙ্কউ সো মাচ দিদি।আমি তোর কাছে ঋণী হয়ে গেলাম।
হেমা মৃদু হেসে বললো,
-এভাবে বলিসনা বোন।বরং আমি তোর কাছে ঋণী।আমি কি চয়নকে ছাড়া থাকতে পারতাম বল?তুই বিজয়কে ভালোবাসিস বলেইতো আমি সাহস পেলাম।চয়নের সঙ্গে নিজের জীবনটাকে চিরস্থায়ী করতে পারার সাহসতো কেবল তোর কাছ থেকেই পেলাম আমি।তুই আর বিজয় যদি হেল্প না করতি তাহলে কি হতো বলতো?
-দিদি বিজয়দা খুব ভালো মানুষরে।কতো সহজে তোকে হেল্প করতে রাজি হয়ে গেলো।
-হুম,কখনো কষ্ট দিসনা বিজয়কে।এমন ভালোমানুষ সবার কপালে জোটেনা।
-এই দিদি,আমিতো ভুলেই গেছি!!তুই কি পৌঁছে গেছিস!!
-হুমরে,অনেক আগে।
-সব ঠিকঠাক আছে তো?
-হ্যা,সব ঠিকঠাক।
-তোকে মেনে নিলো তো তারা?
-ওহ শ্যামা তুই একটু বেশি প্রশ্ন করিস।সব ঠিক হতে সময় লাগে বুঝলি?তুই এখন রাখ।আমি তোকে পরে ফোন করবো,কেমন?
বলেই লাইন কেটে দিলো হেমা।শ্যামাকে এখন সবকিছু বলতে গেলে মন খারাপ হবে শ্যামার।তাই হেমা এখন সব ভেঙে বলতে চায় না।বোনটার বিয়ে।ও কষ্টে থাক হেমা তা চায় না।
-
বিষ্ণু বাবু ঘরে পায়চারি করছেন।উত্তরা দেবী পানের খিলিটা স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।কিছু বলতে চান তিনি স্বামীকে।কিন্তু বলার সাহস পাচ্ছেন না।হয়তো তিনি চয়নের ব্যাপারে কিছু বলতে চান।বিষ্ণু বাবু পান মুখে দিয়ে বললেন,
-মেয়েটাকে কিছু খেতে দিয়েছো?
-এখনো দিইনি।একটু পর দেবো।
-হুম,ভালোভাবে যত্নআত্তি করবে।মেয়েটার তো আর দোষ নেই।আমাদের ছেলে নিয়ে এসেছে বলেই এখানে এসেছে।কি জানি মেয়েটার বাবা মায়ের মনে কি চলছে।আমাদের তো ছেলে।আর তাদের তো মেয়ে।
হঠাৎ করে রেগে গেলেন বিষ্ণু বাবু।
-তোমার ছেলে এটা কি করে করলো বলতো উত্তরা???আমি এই শিক্ষা দিলাম ওকে??কাল যখন লোকে জানবে বিষ্ণু বাবুর ছেলে শহর থেকে একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে তখন আমার মান সম্মান কোথায় যাবে বলতো??যেখানে নিজের ছেলেই আমাকে মানেনা সেখানে লোকে কি করে মানবে??
উত্তরা দেবী আকস্মিক প্রতিবাদ করে বললেন,
-আমার ছেলে বিয়ে করে বউ এনেছে।কারো মেয়েকে জোর করে তুলে আনেনি তো!
বলেই চলে গেলেন তিনি।বিষ্ণু বাবু সরু চোখে স্ত্রীর চলে যাওয়া দেখলেন।
-
উত্তরা দেবী গরম গরম ডিম ভেজে হেমার জন্য ভাত নিয়ে এলেন।সাথে ডাল।হেমার সামনে দিয়ে তিনি বললেন,প্রথম এসেছো এবাড়িতে।তাও মাঝ রাতে।তাই বেশি কিছু করতে পারলাম না।কাল সকালেই তোমার জন্য সব রকম রান্না হবে।হেমা বললো,
-মা আপনি এতো বেশি ব্যস্ত হবেন না।এইটুকু খাবারও আমি এখন খেতে পারবোনা।
-জানি মা।বাড়ির জন্য মন খারাপ তোমার।মনে দুশ্চিন্তা থাকলে পেটে কি আর খাবার সয়?কিন্তু তবুও এখন খেতে হবে তোমায়।না খেলে যে ঘুম হবেনা ভালো।
হেমা অল্প একটু ভাত গরম গরম ডিম ভাজি দিয়ে খেয়ে নিলো।সামনে উত্তরা দেবী বসে ছিলেন বলে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল খাওয়ার সময় সে।উত্তরা দেবী চলে যেতেই হেমা শুয়ে পড়লো।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে চয়নকে একটা মেসেজ দিলো,
-কিগো কোথায় তুমি?
অমনি চয়ন কল ব্যাক করলো।

-কিগো কোথায় তুমি?

-আমি আছি বন্ধুর বাড়িতে।
-বন্ধু?
-হুম,আমরা একসঙ্গে স্কুল কলেজ পড়েছি।ওর নাম অঞ্জন।তুমি কোনো চিন্তা করোনা।বাবার রাগ কমলেই আমি ফিরে আসবো।
-কখন বাবার রাগ কমবে আর কখন বাড়িতে ঢুকতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা আছে?
-চিন্তা করোনা লক্ষ্মীটি।বাবা তোমাকে যখন ঢুকতে দিয়েছে তখন নিশ্চয়ই আমার উপর থেকে বাবার রাগও কমে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।
-কিছু খেয়েছো?
-হ্যাঁ,তুমি খেয়েছো?
-হুম,গরম গরম ডিম ভাজি দিয়ে ভাত।
-তাই?
-হুম,তোমার মা'টা না অনেক মিষ্টি আর এত্তগুলো ভালো।
-মা তোমাকে খুব আদর করছে তাইনা হেমা?
-হুম।
-একাই সব আদর নিয়ে নিচ্ছো তাহলে আমার মায়ের কাছ থেকে!
-হিংসা হচ্ছে?
-খানিক তো বটে।
-বাহ!বউকে হিংসা করা হচ্ছে।এমন বর কয়জন মেয়ের ভাগ্যেই বা জোটে?ভীষণভাবে প্রাউড ফিল
করছি জনাব!
-হা হা হা।হিংসা,প্রেম,ভালোবাসা।সব মিলিয়ে পারফেক্ট বর পেয়েছো,বুঝলে?
-জানো আমার ভয় করছে,আবার কেমন যেনো খটকাও লাগছে।
-কেন?
-তোমার বাবা তোমাকে বাড়ি ঢুকতে দেয়নি।এদিকে তোমার মা আমাকে এতো সহজে মেনে নিলো।আমার কেমন যেনো লাগছে।
-আরে ধুর!আমার মা অনেক ভালো মনের একটা মানুষ।আর বাবা তোমায় ঢুকতে দিয়েছে বলেই মা এতো সাহস পেলো।এসব আজেবাজে চিন্তা না করে ঘুমাও।সকালে বাবা বাড়ি থেকে বের হলে একবার আসবো আমি।
-ঠিক আছে।
-গুড নাইট লক্ষ্মী বউ।
-গুড নাইট হিংসুটে বর!
চয়ন মৃদু হেসে ফোন রাখলো।হেমা ভাবছে নিজের পরিবারের কথা।কাল শ্যামার হলুদ হবে।কত্ত আনন্দ হবে বাড়িতে।আত্মীয়স্বজন সবাই থাকবে।কেবল একমাত্র বোনের বিয়েতে হেমা থাকবেনা।ভাবতেই চোখ দু'টি ঝাপসা হয়ে এলো হেমার।আচ্ছা আত্মীয়স্বজনরা যখন হেমার কথা জিজ্ঞেস করবে তখন বাবা,মা আর শ্যামা কি উত্তর দেবে?হেমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।বালিশে কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো
-
সকাল থেকেই বাসার সবাই অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।আজ শ্যামার হলুদ হবে।ডেকোরেশন থেকে শুরু করে খরচাপাতি সব কিছু তারাশঙ্কর বাবু একহাতে সামলাচ্ছেন।ঘরের সব বুয়া সুফলাকে নিয়ে মহুয়া সামলাচ্ছেন।কিন্তু সবই মনের বিরুদ্ধে গিয়ে।মনটা তার পরে আছে বড় মেয়ে হেমার কাছে।মেয়েটা কোথায় আছে,কি করছে কে জানে?কথাটা বলতেই কাজের বুয়া সুফলা মাসি বললো,হেমা দিদিমণি কোথায় আছে তা মনে হয় একজনই বলতে পারবেগো।
-কার কথা বলছো বুয়া?ভ্রু-কুচকে জানতে চাইলেন মহুয়া।
-কে আবার?তোমার গুণবতী ছোট মেয়ে!শ্যামা দিদিমণি!
মহুয়া কোনো উত্তর করলোনা।শ্যামা বাবার সামনে কিছু জানেনা বলে অস্বীকার করলো,এখন কি আর মায়ের কাছে স্বীকার করবে?কক্ষণোনা।বুয়া সুফলা মাসি মহুয়ার নীরবতা দেখে চুপ করে গেলো।
এদিকে শ্যামা এক এক করে বান্ধবীদের দাওয়াত দিয়েই চলছে।সবাই যেনো বিকেলের মধ্যে উপস্থিত হয় তা বারবার করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।হঠাৎ করে শ্যামার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে তার বান্ধবীরা হতবাক।তারা শুনেছিল শ্যামার বড় বোনের বিয়ে,এখন শুনছে শ্যামার বিয়ে।সবার মনে কেমন যেনো খটকা লাগলো।শ্যামা সেসবে কান না দিয়ে নিজের কাজ সারাচ্ছে,আর একেরপর এক কল করে দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে বান্ধবীদের।কিন্তু কোথাও যেনো একটা শূন্যতা কাজ করছে শ্যামার মনে।দিদি বলতো শ্যামা তোর বিয়ের সময় আমি তোকে নিজ হাতে সাজাবো।তোর বরকে বরণ করবো।কিন্তু আজ সেই দিদিই নেই। Bangla Golper Boi
-
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে হেমার অনেক দেরি হয়ে গেলো।আগের দিন অনেকটা পথ জার্নি করাতে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছিলো বলেই ঘুমটা বেশি হলো।নিজের বাসায় হলে এতোক্ষণ কোনোভাবেই ঘুমানো যেতোনা।বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা বাবা একদম পছন্দ করেননা।ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসলো হেমা।মাটির চুলায় আগুন জ্বালিয়ে পিঠা বানাচ্ছে উত্তরা দেবী।কি পিঠা সেটা দূর থেকে ঠিক খেয়াল কতে পারলোনা হেমা।ভাবলো শাশুড়িকে কাজে একটু সাহায্য করবে।যেইনা পা বাড়ালো অমনি দেখতে পেলো উত্তরা দেবীর পাশ থেকে একটু দূরে বসে বিষ্ণু বাবু আরাম করে চা-পিটা খাচ্ছেন।হেমা পিছিয়ে যেতেই বিষ্ণু বাবু কঠিন গলায় বললেন,এই মেয়ে এদিকে আসো!
হেমা ভয়ে ভয়ে শাশুড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।বিষ্ণু বাবু ভ্রু কুচকে স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন,আরেকবার হেমার দিকে তাকালেন।তারপর বললেন,
-বাব্বাহ!একেবারে জড়োসড়ো হয়ে শাশুড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়ালে।একরাতেই এতো কিছু?দু'জনের এতো মিল হয়ে গেলো?কি উত্তরা মনে পড়ে?আমাদের বিয়ের পর তুমি আমাকে দেখলেই ভয় পেতে।মায়ের পাশে এভাবেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াতে,বসতে।
উত্তরা দেবী লজ্জা পেয়ে মুখে আঁচল দিয়ে বললেন,
-আহ!কি হচ্ছে এসব ছেলের বউয়ের সামনে?
হেমা মিটিমিটি হাসতে লাগলো।বিষ্ণু বাবু কঠিন চোখে হেমার দিকে তাকিয়ে বললেন,তোমার শাশুড়ি চিতই পিঠা বানিয়েছে।খেয়ে দেখো কেমন হয়েছে।তারপর উত্তরা দেবীর দিকে তকিয়ে বললেন,আর শুনো তোমাকে বলছি!তোমার গুণধর ছেলে যেনো ভুলেও এই বাড়ির ত্রিসীমানায় পা না রাখে!বলেই চলে গেলেন বিষ্ণু বাবু।
হেমার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।এ কেমন লোক?যেখানে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার কথা,সেটা না করে ছেলেকে বাড়ি ঢুকতে দিচ্ছেনা।আমাকে আর জায়গা দিলো কেন?ছেলের সঙ্গে আমাকেও বের করে দিলেইতো পারতো।
পিঠা খাও।শাশুড়ির কথায় হেমার সম্বিত ফিরলো।পিঠা মুখে দিয়ে হেমা বললো,বাহ!আপনি তো ভালোই মজার পিঠা বানান মা।
উত্তরা দেবী হাসতে হাসতে বললেন,শুধু এই পিঠা?মাত্র তো এসেছো।দেখো কত্ত রকমের পিঠা বানিয়ে খাওয়াই তোমাকে।
হেমা মনে মনে বললো,তোমার হিটলার স্বামী ততোদিন আমায় থাকতে দিলেইতো হয়।কে জানে,কখন আবার আমাকেও বের করে দেয়।

হেমা ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখছে।পুরনো ধাচের একটা বাড়ি।তুলসিতলাটা বেশ সৌখিন করে পাকা করা।বাড়িতে কয়েক ধরণের ফুল গাছ রয়েছে।দেখে মনে হয় বেশ যত্ন করা হয় গাছগুলোর।বাড়ির আশপাশটাও বেশ পরিপাটি।উত্তরা দেবী একা মানুষ হলেও বাড়িঘরের প্রতি যে বেশ যত্নবান এবং বেশ সৌখিন মনের মহিলা তা হেমা বুঝলো।বাড়িতে এখন উত্তরা দেবী এবং হেমা ছাড়া আর কেউ নেই।বিষ্ণু বাবু স্কুলে চলে গেছেন সেই কখন।আর চয়ন তো বন্ধুর বাড়িতে।হেমা মনে মনে বললো,এখন তো হিটলার টাইপ লোকটা বাড়িতে নেই।চয়ন তো এই সুযোগে বাড়ি আসতে পারে।একবার ফোন করে বলে দেখি।

হেমাকে আর ফোন করতে হলোনা।চয়ন বাড়ি এসেছে।ওইতো মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে দোখা যাচ্ছে তাকে।হেমা সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো।চয়নকে দেখতে পেয়ে মন থেকে একটা চাপাকষ্ট দূর হলো।হেমাকে দেখে চয়নের ঠোঁটের কোণে হাসি।উত্তরা দু'জনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,তোরা ঘরে যা চয়ন।আমি তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
চয়ন হেমাকে নিয়ে নিজের ঘরে আসলো।দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে হেমার কাধে হাত রেখে বললো,যাক বাবা!অবশেষে বউকে নির্জনে একাকি কাছে পেলাম।
হেমা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো।চয়নের হাত ছাড়িয়ে বললো,তোমার যত্তসব আহ্লাদ।এতোক্ষণে বাড়ি আসার সময় হলো?তোমার হিটলার টাইপ বাবা তো সেই সকালে বেরিয়েছেন।এতোক্ষণ আসতে পারলে না?
-আসলে ঘুমটা ভাঙতে একটু দেরি হয়ে গেলো।রাগ করোনা লক্ষ্মীটি।
-হুম,জানোই তো কেবল এসবকথা।
লক্ষ্মী বউ না কচু।
চয়ন হঠাৎ শ্যামার কথা তুললো।
-আচ্ছা,শ্যামা তোমায় ফোন করেছিলো?
-রাতে কথা হয়েছিলো।ওদিকে সব ঠিক হয়ে গেছে।শ্যামার সঙ্গে বিজয়ের বিয়েতে সবাই রাজি।
-তোমার বোনটা আমাদের বাঁচিয়ে দিলো।না হয় কি হতো বল তো?আদৌ কি আমরা একে অপরের কাছে আসতে পারতাম?
-হুম ঠিক।আর বিজয়ের কথা ভাবো একবার।ও কতো সহজে আমাদেরকে হেল্প করতে রাজি হয়ে গেলো।এমন উদার মনের মানুষ কি আজকাল হয়?আমাদের ভালোবাসার কথা শুনে হাসিমুখে সবটা মেনে নিলো।আমাদের বিয়েটা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিলো।
-বিজয়ের কাছে চিরঋণী হয়ে গেলাম।
-সুযোগ পেলে শোধ করে দেবো।ঋণ রাখতে নেই।
-কেন?শোধ কি হয়নি?শ্যামার মতো বউ পাচ্ছে বিজয়।সেটাও কি কম?
-জানো শ্যামার জন্য আমার চিন্তা হয়।মাত্র ১২ক্লাসে পড়ছে।ও সংসার সামলাতে পারবে?ওর তো এখনো ছেলে মানুষি গুলোই যায়নি।যে পরিমাণে স্টারজলসা আসক্ত।ও সংসার দেখবে কখন?
চয়ন হেমার চোখে চোখ রেখে বললো
-একদম চিন্তা করোনা তুমি।তোমার বোনটা কিন্তু হেব্বি চালাক।তোমার মতো এমন ভীতু আর বোকা না।
-কি আমি ভীতু আর বোকা??
-তা নয়তো কি!রাতে বাবা ধমকাচ্ছিল আমায়।আর তুমি কিনা ভয়ে কাঁপতে শুরু করলে!হা হা হা...
-আর তুমি??তুমি বুঝি ভয় পাওনি।বাবার ধমক খেয়ে তো ভিজে বিড়াল হয়ে গিয়েছিলে।
এমন সময় উত্তরা দেবী চয়নের জন্য খাবার নিয়ে আসলেন।খাবারটা চয়নের সামনে রেখে বললেন,
-খেয়ে নে।বলেই কেমন যেনো বিষণ্ণ মনে চলে যেতে লাগলেন।মায়ের মুখ মলিন দেখে চয়ন মাকে ডেকে বললো,মা তোমার কি শরীর খারাপ?
-না,আমার শরীর ভালো আছে।তবে চিন্তায় আছি।তোর বাবার রাগ এখনো কমেনি।কমবে বলেওতো মনে হচ্ছেনা।কেন আমাদের না জানিয়ে এমন কাজটা করতে গেলি বলতো বাবা?
-মা তার জন্য আমিও অনেক অনুতপ্ত।কিন্তু এই ছাড়া উপায় ছিলোনা।হেমার বাবা ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলো।
হেমা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
উত্তরা দেবী হেমার মাথায় হাত রেখে বললেন,
-আমরা না হয় ছেলের বাবা মা।কিন্তু ওরা মেয়ের বাবা মা।কি অবস্থা হচ্ছে তাদের,কেমন ঝড় তাদের উপর দিয়ে যাচ্ছে তার কোনো ধারণা আছে তোদের?
চয়ন মাকে বললো,মা ওসব তোমরা ভেবোনা তো।বাবাকে প্লিজ বুঝাও।
-ছায়াকে ফোন করেছিলাম।ও আসুক,ও বললে তোর বাবা হয়তো শান্ত হবে কিছুটা।
উত্তরা দেবী চলে গেলেন।চয়ন খেয়াল করলো হেমার দুই চোখে জল।চয়ন হেমাকে আশ্বস্ত করে বললো,সব ঠিক হয়ে যাবে হেমা।চিন্তা করোনা তুমি।হেমা চোখের জল মুছে বললো,আজ আমার বোনটার হলুদ,কাল বিয়ে।অথচ আমি কতদূরে।বোনটার বিয়েটা পর্যন্ত দেখার ভাগ্য হলোনা আমার।কেমন কপাল আমার দেখলে তো?
চয়ন হেমার থুতনি ধরে বললো,কপালের দোষ দিয়ে নিজেকে অপরাধী ভেবোনা।শ্যামার এই বিয়েটা তোমার ভাগ্যকেও বদলে দিয়েছে।আমরা আজ একসঙ্গে।হেমা চয়নের কথার আর কোনো প্রতিউত্তর করলোনা।
-
বাসায় প্রচুর মেহমান।সকাল থেকেই একজন দু'জন করে আসতে আসতে এখন প্রায় সবাই এসে গেছে।শ্যামার বান্ধবীরাও এসে গেছে।সকলের চোখেই কৌতুহল।শুনেছিলো হেমার বিয়ে।এখন দেখছে শ্যামার বিয়ে।তাহলে হেমা গেলো কই?কারোরই আর বুঝতে বাকি রইলোনা।সকলে কানাকানি করে চলছে।শ্যামার মা মহুয়া সেসব দেখেও না দেখার ভান করে চলছেন।এই ছাড়াতো আর কোনো উপায় নেই।তারাশঙ্কর বাবু সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি করে এখন হাঁপিয়ে উঠেছে।তাই দুপুরের খাবারটা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন।বড় মেয়ের কথা তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন।নাকি ভুলে থাকার অভিনয় করছেন তা বুঝা মুশকিল।
কাজের বুয়া সুফলা মাসিকে শ্যামা কড়া করে বলে দিয়েছে যাতে করে সে যেনো হেমার বিষয়টা নিয়ে কোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ফুসুরফাসুর না করে।যদি কোনোভাবে ফুসুরফাসুর করে এবং তা শ্যামার দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে এই মাসের বেতন থেকে অর্ধেক টাকা কেটে নেবে বলে দিয়েছে।সুফলা মাসি জ্বীব কেটে বলেছে ভুলেও তা করতে যাবেনা সে।কিন্তু সুফলা মাসির পেট এতোটাই পাতলা যে,হেমাকে নিয়ে বাড়িতে আসা উৎসুক যেসকল মেহমান আছে তাদের সঙ্গে হেমার পালিয়ে যাওয়া নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেলেই হয়।কোনোভাবেই সুফলা মাসি সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননা।

শ্যামাকে ঘিরে তার বান্ধবীরা বসে আছে।বিজয়কে নিয়ে শ্যামার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করছে।শ্যামার সেদিকে তেমন একটা ভ্রুক্ষেপ নেই।জোর করে বান্ধবীদের সঙ্গে হাসিতে যোগ দিচ্ছে কেবল।মনটা ভালো নেই তার।হেমার কথা খুব মনে পড়ছে।তার বিয়ে অথচ একমাত্র আপন বড় বোনটাই কাছে নেই।হেমা থাকলে হয়তো এখন শ্যামার পাশে বসে নানা উপদেশ দিতো।শ্যামার স্টারজলসা সিরিয়াল দেখার চ্যাপ্টার নিয়েই বেশি উপদেশ দিতো।রাগি গলায় বলতো এসব আজেবাজে চ্যানেল দেখা শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে বন্ধ করবি কিন্তু!মন দিয়ে সংসার করবি।মনটাকে সিরিয়ালে না রেখে বিজয়ের দিকে রাখবি!শ্যামা তখন ভয়ের অভিনয় করে বলতো তাই হবে দিদি।এসব ভাবতে গিয়ে শ্যামার মনটা আরো বেশি বিষণ্ণতায় গ্রাস করলো।বোনের সঙ্গে কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করে উঠলো তার।সবার চোখ এড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ছাদে চলে গেলো শ্যামা।

-
বিষ্ণু বাবু বাড়িতে আসার পরপরই তার চোখের আড়াল হয়ে গেলো চয়ন।বাড়ির বের হওয়ার আগে মা এবং হেমাকে বলে গেলো বাবাকে যাতে চয়নের বন্ধুর বাড়িতে থাকার কথাটা না জানায়।তাদের জিজ্ঞেস করলে যেনো বলে কিছু জানেনা তারা।এরমাঝে অবশ্য চয়নের একটা কৌশল আছে।বাবার অনুগ্রহ আদায় করা,বাবার মনে চয়নের জন্য চিন্তার জন্ম দেয়া।তাহলেই কেল্লাফতে!
চয়ন চলে যাওয়ার পর হেমা একা একা ঘরে বসে রইলো।চয়নের বুকসেলফের বইগুলো নিয়ে নাড়াছাড়া করছে।এমন সময় শ্যামার কল আসলো।ফোন স্ক্রিনে বোনের নামটা দেখে হার্টবিট বেড়ে গেলো হেমার।তাড়াহুড়া করে কল রিসিভ করলো।
-হ্যা শ্যামা বল,কেমন আছিস তুই?
-ভালো নেইরে দিদি।মনভার করে উত্তর দিলো শ্যামা।
-কেন,ভালো নেই কেন?আজ না আমার লক্ষ্মী বোনটার হলুদ হবে?আজতো আমার লক্ষ্মী বোনটার মন থাকবে একেবারে ফ্রেশ,ফুরফুরে।
শ্যামা কেঁদে ফেললো,
-তুই নেই,আর আমার মন থাকবে ফুরফুরে?কি করে ভাবলি বলতো দিদি?
-তুই কাদছিস কেন পাগলি?চাইলেই কি আর সব হয় বল?আমাদের দুই বোনের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো।তোকে নিজ হাতে সাজাবো বলে কত আশা ছিলো।এখন তা চাইলেও সম্ভব না।তাহলে ভেবে দেখ,ইশ্বর সবার সব স্বপ্ন পূরণ করেন না।আর তুই কিনা সামান্য একটা বিষয় নিয়ে মন খারাপ করে আছিস।
-এটা তোর কাছে সামান্য লাগছে তাইনা দিদি?মোটেও না।মনের মধ্যে কষ্টটা চাপা রেখে আমার কাছে লুকোচ্ছিস।আর আমি তা বুঝবোনা ভেবিছিস?এতোটা অবুঝ ভাবিস না আমাকে।আমি কিন্তু বড় হয়ে গেছি।
হেমার দুই চোখে পানি।ইচ্ছে করছে অনেক কাঁদতে।শ্যামা থাকলে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো।এই মুহূর্তে এটাই ইচ্ছে করছে হেমার।কিন্তু শ্যামাকে তা বুঝতে দিতে চায় না হেমা।তাহলে শ্যামার মনটা আরো বেশি খারাপ হবে।চোখের পানি মুছে হেমা হাসতে হাসতে বললো,
-ধুর পাগলি!বাদ দেতো এসব।তুই এভাবে মন খারাপ করে থাকলে আমি এখানে ভালো থাকতে পারবো বল?আমাকেওতো এখানে মানিয়ে নিতে হবে।তুই এমন করলে আমি তা পারবো কি করে?
-দিদি তুই চলে আয়,প্লিজ।
-পাগলামি করিসনা লক্ষ্মী বোন আমার।এভাবে মন খারাপ করে থাকলে কিন্তু তোকে সুন্দর দেখবেনা।তখন তোর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা কি বলবে ভেবে দেখতো?বলবে বউয়ের মুখটা দেখতে হুতুমপেঁচার মতো।
-এই দিদি ভালো হচ্ছেনা কিন্তু।আমি হুতুমপেঁচা হতে যাবো কেন?
-ঠিকইতো!আমার এমন কমলা সুন্দরী বোনটা হুতুমপেঁচা হতে যাবে কেন?আমার বোনকে দেখতে একদম রাজকন্যার মতো দেখাবে।কিন্তু শ্যামা তার জন্য তো তোকে হাসিখুশি থাকতে হবে।মনটাকে ফুরফুরে রাখতে হবে।ফোনটা রেখে বন্ধবীদের সঙ্গে মজা করগে যা।আমি রাখছি,কেমন?
-ঠিক আছে দিদি।ভালো থাকিস।
-তুইও অনেক ভালো থাকিস।
বলেই কল কেটে দিয়ে হেমা বালিশে মুখ চেপে কাঁদতে লাগলো।এতোক্ষণ ধরে গলা অবদি আটকে রাখা কান্নাগুলো ডুকরে আসলো।জোর করে বেঁধে রাখা চোখের জলগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগলো।কেঁদে হালকা হওয়ার জন্য হেমা সময় নিয়ে কাঁদবে আজ।অনেক কাঁদবে।

রাতে বেশ ঘটা করে শ্যামার গায়ে হলুদ হলো।আগত মেহমানরা সবাই বেশ আনন্দ করলো।শ্যামার অনুভূতি ছিলো দুই ধরণের।একদিকে বিজয়কে আপন করে পাওয়ার আনন্দ,অন্যদিকে নিজের বোনকে এমন আনন্দঘন মুহূর্তে পাশে না পাওয়ার কষ্ট।মহুয়া ব্যানার্জীর মনটা ছিলো সম্পূর্ণ ভার।দুই মেয়ে তার দুই পৃথিবী।দু'টি পৃথিবীকে দুইদিকে চলে যেতে দেখে তার বুকটা শূন্যতায় গ্রাস করলো।তারাশঙ্কর বাবুর চোখে মুখে হাসির লেশ।বন্ধুর ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে বলে যেনো তিনি বিশ্ব জয় করে ফেললেন।বড় মেয়ের কথা যেনো মনেই পড়ছেনা তার।বাবার হাসিখুশি ভরা চেহারার দিকে তাকিয়ে শ্যামা অবাক হলো।চিনতে পারছেনা সে তার এই বাবাকে।দিদির কথা বাবার মনে পড়ছেনা এটা ভাবতেই যেনো তার বুকের ভেতরটা ভেঙে ধুমরে মুচড়ে যাচ্ছে।একটা মানুষ কি করে এমন কঠিন হতে পারে?নাকি বাবা কেবল ভালো থাকার অভিনয় করছে!শ্যামা কিছুটা দ্বন্দ্বের মধ্যেও আটকা পড়লো।হলুদের অনুষ্ঠান শেষে মাঝরাতে একবার লুকিয়ে ছাদে এসে বোনের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলো শ্যামা।

-
খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠলো হেমা।শীতের সকাল,কুয়াশায় চারদিক অন্ধকার।হাত বাড়ালে হাত দেখা যাচ্ছেনা।সূর্যের দেখা সহজে মিলবেনা বলে মনে হচ্ছে আজ।তবুও এই ঘোমট মারা সকালটাকে বেশ ভালো লাগছে হেমার।ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে শাশুড়ির কাছে গেলো।উত্তরা দেবী হেমাকে দেখে মিষ্টি হেসে বসতে বললেন।আজ তিনি ভাপা পিঠা বানাচ্ছেন।হেমা বেশ উৎসাহ নিয়ে বললো,মা আমি আপনাকে সাহায্য করবো?
সঙ্গে সঙ্গে উত্তরা দেবী জবাব দিলেন,একদম না!আমাকে সাহায্য করার সময় অনেক পাবে।মাত্র বউ হয়ে এসেছো।কয়দিন না হয় শাশুড়ির হাতের রান্নাবান্না খেয়ে দেখো।
হেমা কেবল মৃদু হাসলো।চুপচাপ উত্তরা দেবীর পিঠা বানানো দেখতে লাগালো পাশে বসে।উত্তরা দেবী হঠাৎ বললেন,তোমার চোখগুলো এমন ফোলা ফোলা কেনরে মা?রাতে কেঁদেছিলে বুঝি।
হেমা কোনো উত্তর দিলোনা।উত্তরা দেবীর স্নেহমাখা কথাটা হেমাকে আরো বেশি আবেগপ্রবণ করে তুললো।বুকের ভেতর থেকে দলাপাকানো কান্নাগুলো উপরে উঠতে চাইছে।কোনোরকমে নিজেকে সামনে নিলো হেমা।উত্তরা দেবী হয়তো তা বুঝেছেন বলে এ নিয়ে আর কোনো কথা বললেননা।হেমাকে গরম গরম ভাপা পিঠা খেতে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর বিষ্ণু বাবু আসলেন।শ্বশুরকে আসতে দেখে হেমা উঠে দাঁড়ালো।বিষ্ণু বাবু বসতে বসতে বললেন,তুমি উঠছো কেন?বসো বসো,তোমার শাশুড়ির হাতের বানানো খেজুরে গুঁড়ের ভাপাপিঠা খাও।অন্যরকম স্বাদ পাবে।উত্তরা দেবী স্বামীর প্রশংসা শুনে মৃদু হাসছেন।হেমা বসে পড়লো।মনে মনে ভয়ও পাচ্ছে।হিটলার টাইপ বিষ্ণু বাবুকে দেখলেই ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় তার।তবে বিষ্ণু বাবুর এখনকার আচরণের মধ্যে কোনো কঠোরতা নেই।বরং স্নেহের সমাবেশ রয়েছে।
বিষ্ণু বাবু স্ত্রীকে সুধালেন,তা তোমার গুণধর ছেলের খবর কি?কোথায় আছে শুনি?
-তা আমি কি করে জানবো?তুমিতো খোঁজ নিতেও মানা করেছিলে আমায়।
বিষ্ণু বাবু হেমাকে সুধালেন,
-বউমা তুমি জানো চয়ন কোথায়?
-বাবা আসলে--
হেমকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উত্তরা দেবী বললেন,
-ও কি করে জানবে,শুনি?তুমিওনা কি একমাত্র ভগবান জানেন।
-তোমার ছেলের আক্কেল কবে হবে,শুনি?নতুন বউ ঘরে রেখে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে?অকালকুষ্মাণ্ড একটা!
উত্তরা দেবী আর হেমা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।উত্তরা দেবী বললেন,
-নিজেই ছেলেকে বাড়ির বের করে দিলে,তা ও থাকবে কি করে বউয়ের পাশে?
বিষ্ণু বাবুর মুখটা কেমন যেনো হয়ে গেলো।স্ত্রীর কথায় তিনি যেনো লজ্জা পেলেন।চুপচাপ পিঠা গলাধঃকরণ করে চললেন তিনি।
উত্তরা দেবী একটা হটপটে কিছু ভাপাপিঠা রেখে হেমার হাতে দিয়ে বললেন,
-এগুলো ঘরে নিয়ে রেখে এসো বউমা।আজ তোমার ননদ ছায়া আসবে।রাতে ফোন করে জানালো আমায়।ওরা দুই ভাইবোন খেজুরে গুঁড়ের ভাপাপিঠা অনেক পছন্দ করে।
হেমা হটপট টা হাতে নিয়ে ঘরে চলে গেলো।
বিষ্ণু বাবুও স্কুলের উদ্দেশ্যে চললেন।উত্তরা দেবী ঘরের কাজে মন দিলেন।
বিষ্ণু বাবু চলে যেতেই চয়ন আসলো বাড়িতে।যেনো সে কোথাও বসে বাবার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলো,আর বাবা চলে যেতেই হুট করে বাড়িতে ঢুকে পড়লো।হেমা ঘরে একা বসে ছিলো।হুট করে ঘরে ঢুকে পেছন থেকে হেমার চোখ চেপে ধরলো।চয়নের স্পর্শ চিনতে হেমার ভুল হলোনা।যেনো কত যুগ যুগ ধরে তারা একে অপরের সঙ্গে এক ছাদের নিচে থেকে আসছে।হয়তো একেই বলে বিবাহ নামক বন্ধনের জোর।হেমা চয়নের হাত সরিয়ে দিয়ে বললো,ঢং করতে হবেনা এতো!সারারাত একটিবারের জন্যেও ফোন করলেনা।
চয়ন কানে ধরে বললো,সরি মহারাণী।ফোনে চার্জ ছিলোনা।অঞ্জনের ফোন চার্জারটা আমার ফোনে এডযাস্ট হয়না।
হেমা মুখ ভার করে বললো,তাড়াতাড়ি ফোন চার্জ দাও।
চয়ন ফোনটা চার্জ দিয়ে বললো,গোসল করতে হবে।তোমার হ্যান্ডসাম স্বামী বউ বিরহে আজ দুইদিন গোসল করেনি।
হেমা চোখ রাঙিয়ে বললো,খাওয়া হয়েছিলো দেবদাসের?
নিজের পেটে হাত বুলাতে বুলাতে চয়ন বললো,
হুম হয়েছে তো!দিব্বি খাওয়া হয়েছে,খাসির মাংস দিয়ে পরোটা,আর...
হেমা মুখ বাঁকা করে বললো,থাক!আর বলতে হবেনা।কেমন বিরহ হলো এটা??
চয়ন বুক চাপড়ে বললো,তুমি বললে এখন থেকেই খাওয়া ছেড়ে দেবো।
এখন আর বিরহে নেই,বউয়ের কাছেই আছো!ন্যাকামু ছেড়ে গোসল করতে যাও।
যথা আজ্ঞা মহারাণী!
গোসল সেরে আসতেই হটপট নিয়ে হাজির হেমা,সঙ্গে উত্তরা দেবী।
চয়নকে পিঠা খেতে দিয়ে উত্তরা দেবী বললেন,একটু পর ছায়া আসবে।তোকে একটু বাজারে যেতে হবে।
চয়ন মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিয়ে বললো,তারপর আবার আমায় সন্ন্যাসী হতে হবে,তাইনা মা?
উত্তরা দেবী মুখ ভার করে বললেন,তোর বাবাকে এতোটাও কঠিন মনের মানুষ ভাবিসনা।সকালে তোর কথা জিজ্ঞেস করেছিলো।বউকে ঘরে একা রেখে বাইরে বাইরে ঘুরছিস বলে বেয়াক্কেলও বললো।
চয়ন অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
-ওমা তাই নাকি মা?নিজেই আমাকে বাড়ির বের করে দিয়ে এখন আবার বেয়াক্কেল বলছে আমাকে?
-হ্যাঁ বলেছে,তো কি হয়েছে?বাজারের ব্যাগ আর ফর্দটা রেখে গেলাম।
উত্তরা দেবী চলে যেতেই চয়ন হেমার নাক টিপে দিয়ে বললো,
কি,বলেছিলাম না সব ঠিক হয়ে যাবে?
-হুম।
শব্দটা উচ্চারণ করেই মুখটাকে কালো করে গম্ভীর হয়ে গেলো হেমা।
হেমার এমন গম্ভীরতা দেখে চয়ন চুপ হয়ে গেলো।হয়তো হেমার মনের অবস্থাটা চয়ন বুঝতে পারলো।

চয়ন বাজারে চলে যেতেই হেমা স্নান সেরে বাইরে এসে চুল শুকাচ্ছিল আর ফুলগাছগুলো দেখছিলো।হঠাৎ পেছন থেকে কে যেনো হেমার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিলো।হেমা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকালো।তিন কি সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট একটা ফুটফুটে মেয়ে হেমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে আছে।

হেমা বাচ্চাটিকে গাল টেনে আদর করে বললো,
-কেগো তুমি?
বাচ্চাটা কোনো কথা না বলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো।ফর্সা সুন্দরী একটা একটা মেয়ে এসে হেমাকে জড়িয়ে ধরলো।অপ্রস্তুত হয়ে গেলো হেমা।
মেয়েটি হেমাকে বললো,
-কেমন আছো বৌদি?তোমাকে দেখবো বলে ভোরে ভোরে বের হয়ে গেলাম।
হেমা বুঝতে পারলো এটাই ছায়া।
-ভালো আছি।তুমি কেমন আছো?
ছায়া হেমাকে আগাগোড়া অবদি দেখতে দেখতে বললো,
-তোমাকে দেখার অস্থিরতায় ভালো ছিলাম না।এখন ভালো আছি।এটা আমার মেয়ে,হিয়া।
-ও তাই?ভীষণ মিষ্টি হয়েছে দেখতে।
হিয়াকে কোলে তুলে নিলো হেমা।ছায়া বললো,
-তাহলে হুট করে ভাইয়া বিয়েটা করেই ফেললো তোমাকে।আমাদের জানানোর প্রয়োজনও মনে করলোনা।
ছায়ার কথায় কেমন যেনো আক্রোশের আভাষ পেলো হেমা।চুপচাপ শুনে গেলো,কোনো কথা বললোনা সে।মেয়েকে হেমার কাছ থেকে নিয়ে মৃদু হেসে মায়ের কাছে চলে গেলো ছায়া।হেমা খোলা চুলগুলো খোপা করতে করতে ঘরের দিকে গেলো।
-
উত্তরা দেবী মেয়ে ছায়াকে বললেন,দেখলি তো চয়নের বউটা কেমন মিষ্টি!
ছায়া মুখ বাঁকা করে বললো,
-মিষ্টি না ছাঁই!
উত্তরা দেবী অগ্নীচোখ করে মেয়ের দিকে তকালেন।
ছায়া বলেই চললো,সবই ঠিক ছিলো মা।কেবল নাকটা একটু মোটা।
-মানুষের খুঁত ধরা তোর বংশগত অভ্যাস,বুঝলি?তোর ঠাম্মাও এমন ছিলেন।যেকোনো মানুষের একটা না একটা খুঁত তিনি বের করেই ছাড়তেন তবে।তুইও হয়েছিস তেমন।
মায়ের কথা শুনে ছায়া চুপসে গেলো।উত্তরা দেবী রান্নায় মন দিলেন।চয়ন ঘরে শুয়ে আছে।অঞ্জনের বাড়িতে গত দুইটা রাত কাটালেও ঠিকমত তার ঘুম হয়নি।তাই বাজার থেকে এসেই সটান হয়ে শুয়ে পড়লো।কিছুক্ষণ পর রান্না ঘরে হেমাও আসলো।শাশুড়িকে এটা ওটা এগিয়ে দিয়ে রান্নায় সাহায্য করছে সে।হেমার ধারণা নিজেকে কাজের মধ্যে মগ্ন রাখলে জাগতিক কোনো দুঃখ কষ্টই মানুষকে ছুঁতে পারেনা।আজ শ্যামার বিয়ে।বিষয়টা আনন্দের হলেও হেমার জন্যে অনেক কষ্টের।একমাত্র ছোটবোনের বিয়েতে সে থাকতে পারছেনা।এই কষ্টটাকে মনের মধ্যে কিছুতেই জায়গা দিতে চাইছেনা হেমা।তাই আজ সারাটাদিন সে নিজেকে কাজের মধ্যে রাখবে,কাজ না থাকলে ছায়া কিংবা শাশুড়ির সঙ্গে বসে গল্প করে সময় কাটাবে।কিছুতেই নিজেকে একা করবেনা সে,একা হলেই যে কষ্ট লাগতে শুরু করবে।
-
বউ সাজে শ্যামাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।মহুয়া ব্যানার্জী চোখ থেকে কাজল নিয়ে মেয়ের কানের পাশে লাগিয়ে দিলেন যাতে কারো নজর না লাগে।এই একটা কাজ তিনি দুই মেয়ের ক্ষেত্রেই করে আসছেন মেয়েদের সেই ছোট্টবেলা থেকে।মেয়েরা বড় হলেও তার কছে এখনো সেই ছোট্টই রয়ে গেছে।দুই চোখে জল টলমল করছে মহুয়া ব্যানার্জীর।এক মেয়ে কোথায় আছে,কেমন আছে তিনি জানেন না।আরেক মেয়েও কিছুক্ষণ পর অন্যের বাড়ির বউ হয়ে যাবে।বুকটা যেনো তার ফেঁটে চৌচির হয়ে যাওয়ার উপক্রম।শ্যামা মাকে গলা জড়িয়ে ধরে বললো,মা তুমি একদম কাঁদবেনা বলে দিলাম!তুমি কাঁদলে আমিও কাঁদবো।তখন কিন্তু আমার সাজ নষ্ট হয়ে যাবে।
মহুয়া ব্যানার্জী চোখের জল মুছে মিষ্টি করে হাসলেন।শ্যামার বান্ধবীদে উদ্দেশ্য করে বললেন,তোমরা একটু বাইরে যাও কিছুক্ষণের জন্য।শ্যামার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।শ্যামার বুকটা কেঁপে উঠলো।মা কি তবে দিদির ব্যাপারে কিছু জানতে চাইবে?যা ভাবলো তাই হলো।মহুয়া ব্যানার্জী শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,সত্যি করে বলতো মা হেমা কোথায় গেছে?
শ্যামা কি বলবে ভেবে পাচ্ছেনা।চুপ করে রইলো।
-তুই কিন্তু সব জানিস শ্যামা।আজ এমন দিনে অন্তত মায়ের কাছে মিথ্যে বলিসনা।
মায়ের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে শ্যামা আর কিছু লুকিয়ে রাখতে পারলোনা।সব বলে দিলো।
-মা দিদি একটা ছেলেকে ভালোবাসতো।তার সঙ্গে দিনাজপুর চলে গেছে।
-দিনাজপুর!এতোদূর??
-হ্যা মা।
-ওরা কি বিয়ে করেছে?
-হুম,এখন তোমার মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে আছে।
মহুয়া ব্যানার্জী গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
-হ্যারে শ্যামা,ছেলেটা দেখতে শুনতে কেমন?তুই কিছু জানিস?
-মা তোমার বড় মেয়ে ভালো ছেলেকেই ভালোবেসেছে।ভালো একটা কোম্পানিতে বড় এক পোস্টে জব করে।এক বাবার এক ছেলে।ফ্যামিলি স্ট্যাটাস থেকে শুরু করে সবই ভালো মা।দিদি সুখেই থাকবে ওখানে।
মহুয়া ব্যানার্জী আফসোসের স্বরে বললেন,
-তোদের দুই বোনকে আমরা এতোটাই কঠোর শাসনে বড় করেলাম যে নিজেদের পছন্দের কথাটা বাবা মাকে বলতে পর্যন্ত সাহস পেলোনা হেমা।
শ্যামা মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,মা এখন আর এসব ভেবোনা প্লিজ।দিদি নিজেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
ওদিকে কে যেনো ডাকছে বিয়ের লগ্ন শুরু হয়ে গেছে বলে।
বিজয়ের সঙ্গে শ্যামার বিয়ে হয়ে গেলো।এখন শ্যামাকে বিদায় দেয়ার পালা।মহুয়া ব্যানার্জী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন।অদূরে দাঁড়িয়ে তারাশঙ্কর বাবুও কাঁদছেন।বাবাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখলো শ্যামা।বাবার চেহারার দিকে তাকিয়ে শ্যামার অনুশোচনা হতে লাগলো।হেমার ব্যাপারে তারাশঙ্কর বাবুকে শ্যামা মিথ্যা বলেছে।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যাওয়ার বেলায় বাবাকে অন্তত এইটুকু বলা উচিত দিদি ভালো আছে।শ্যামা বাবাকে জড়িয়ে ধরলো।তারাশঙ্কর বাবু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,আশীর্বাদ করি তুই অনেক সুখি হবি মা।বিজয় তোকে অনেক সুখে রাখবে।পাশে বিজয় দাঁড়িয়ে।সকলের সঙ্গে হাসছে,আনন্দ করছে।কারো বুঝার জো নেই কোনো এক কারণে বিজয়ের মনে কোণে একটা চাপাকষ্ট বাস করছে।যা চেপে রেখে সকলের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে সে।শ্যামা বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে বললো,বাবা দিদির জন্য ভেবোনা,
দিদি অনেক ভালো আছে শ্বশুর বাড়িতে।আকস্মাৎ মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে তারাশঙ্কর বাবু যেনো বিদ্যুৎ'র শক খেলেন।তারমানে তার ছোট মেয়ে সব জানে?তারাশঙ্কর বাবু নিজেকে কন্ট্রোল করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন,যে চলে গেছে তাকে নিয়ে আমি ভাবতেও চাইনা।তুই সুখি হলেই আমার সুখ।তারপর মেয়ের সামনে থেকে সরে গেলেন তিনি।শ্যামাকে বিদায় দিয়ে মহুয়া ব্যানার্জী বড় মেয়ে হেমার রুমে গিয়ে দরজায় খিল দিলেন।এখন তিনি একা থাকতে চান।কাঁদতে চান নিজের মন যত চায়।কেঁদে তিনি হালকা হতে চান।
-
হেমা চুপচাপ শুয়ে আছে।শরীরটা ভালো নেই তার।দুপুরে খাওয়ার পর থেকেই গা'টা গরম হয়ে আছে,জ্বর জ্বর অনুভব করছে হেমা।চয়ন ঘরে নেই।উত্তরা দেবী কি যেনো এক দরকারে ছেলেকে বাজারে পাঠালেন।ছায়া মেয়েকে খাওয়াচ্ছে।বিষ্ণু বাবু ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা বই পড়ছেন।মাত্র সন্ধ্যা ৭টা।এমন অসময়ে হেমাকে শুয়ে থাকতে দেখে উত্তরা দেবী এসে সুধালেন,এই অসময়ে কেউ শুয়ে থাকে?উঠে ছায়ার সঙ্গে গিয়ে গল্প করলেইতো পারল মা।বলতে বলতে হেমার কপালে হাত রাখতেই বুঝতে পারলেন হেমার গায়ে জ্বর।উত্তরা দেবী প্রায় আঁতকে উঠে বললেন,একি তোমার গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে!
-তেমন কিছুনা মা।দুপুর থেকে যা একটু জ্বর জ্বর লাগছে।সেরে যাবে।
-চয়ন জানে তোমার যে জ্বর?
-না মা।
-কেমন মেয়ে তুমি বলতো মা?গায়ে জ্বর,অথচ আমাদের কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে আছো।
আমি তোমার শ্বশুরকে বলছি ঔষধ নিয়ে আসতে।
শ্বশুর নাম শুনে হেমার হৃদকম্পন বেড়ে গেলো।এবাড়িতে উড়ে এসে জুড়ে বসে আবার জ্বর বাধিয়ে সবাইকে বিপদে ফেলার জন্য না জানি লোকটা উল্টাপাল্টা কি তুলকালাম করে বসে!
হেমা শাশুড়িকে বললো,মা থাকনা,বাবাকে বলবেননা প্লিজ।
উত্তরা দেবী হেমাকে ধমকের স্বরে বললেন,চুপ করে শুয়ে থাকো তো মেয়ে!!একদম কোনো কথা নয়!
বলেই দ্রুত পায়ে স্বামীর ঘরে গেলেন।
-শুনছো চয়নের বউটার প্রচন্ড জ্বর!জ্বর একেবারে মেয়েটার গা পুড়ে যাচ্ছে।
বিষ্ণু বাবু বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে বললেন,কি বলো,জ্বর হলো কি করে?
-নতুন জায়গায় এসেছে,এখানকার পানির কারণেই হয়তো মেয়েটার জ্বর হয়ে বসলো।
-ঔষধ খেয়েছে?
-কোত্থেকে খাবে?ঘরেতো জ্বরের ঔষধ নেই!
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বিষ্ণু বাবু বললেন,চলতো দেখি।
হেমা শ্বশুরকে দেখে শোয়া থেকে উঠে বসলো।বিষ্ণু বাবু হেমার কপালে হাত ছুঁয়ে বললেন,তোমার তো ভীষণ জ্বর।কাউকে বলোনি কেন??
হেমা কোনো কথা বললোনা।
চুপ করে নিচের দিকে চেয়ে রইলো।বিষ্ণু বাবু যখন তার কপালে হাত রাখলো তখন পরম স্নেহমাখা ভালোবাসা অনুভব করলো।হেমার মনে হলো যেনো তার নিজের বাবা তার কপালে হাত রাখলো।বাবার জন্য প্রচন্ড কষ্ট হতে লাগলো।কে জানে বাবা কেমন আছে,শ্যামা চলে গেলো আজ শ্বশুর বাড়ি।আজ বাবা মা একা হয়ে গেলো।তাড়াহুড়ো করে চোখের জলটা মুছে ফেললো হেমা।
বিষ্ণু বাবু স্ত্রীকে আদেশ দিলেন হেমার কপালে জলপট্টি দিতে এবং তিনি বাজারে যাচ্ছেন ঔষধ আনতে।হেমা শ্বশুরকে বললো,বাবা এই ঠান্ডার মধ্যে আপনি বাজারে যাবেননা প্লিজ।আপনার ঠান্ডা লেগে যাবে।
-আর তুমি যে জ্বর লাগিয়ে রেখেছো?ঔষধ পথ্য খেতে হবেনা?
-বাবা আপনি ব্যস্ত হবেননা।জ্বর এমনিতেই চলে যাবে।
-এমনিতে জ্বর যায়?
উত্তরা দেবী পানি আর পাতলা কাপড়ের ন্যাকড়া নিয়ে আসলেন।
স্বামীকে বললেন,আচ্ছা ও যখন মানা করছে তুমি যেওনা।ওতো ঠিকই বলছে,তোমারওতো ঠান্ডা লাগার সমস্যা আছে।
-তাই বলে মেয়েটার জ্বর দেখেও আমরা এভাবে বসে থাকবো?
হেমা বললো,বাবা আমি আপনার ছেলেকে ফোন করে বলছি ঔষধ আনতে।
-তোমার বলায় হবেনা।আমাকেই বলতে হবে।
বিষ্ণু বাবু ছেলেকে ফোন করে হেমার জ্বরের কথা বললেন এবং কি কি ঔষধ আনতে হবে তাও বললেন।ডাক্তারির খুটিনাটি বিষয়ে বিষ্ণু বাবুর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
 -                                                                Bangla Ebook

শ্বশুর বাড়িতে যত্নআত্তির কোনো অভাব নেই শ্যামার।শ্যামার শ্বশুর অনেক ভালো মানুষ।শাশুড়িও ভালো মনের মহিলা।কিন্তু তিনি বউ হিসেবে চেয়েছিলেন হেমাকে।এভাবে বউ বদল বিষয়টা তিনি মন থেকে মানতে পারছেন না সহজে।কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করছেন না।অনেকদিনের সম্পর্ক তারাশঙ্কর বাবু এবং তার পরিবারের সঙ্গে।তাছাড়া মহুয়া ব্যানার্জীর মতো অমায়িক একজন মহিলার কথা মনে হতেই তিনি শ্যামাকে মেনে না নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছেননা।মনের কথা মনে চেপে রেখেই নতুন বউকে বরণ থেকে শুরু করে সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন তিনি।
শ্যামাকে ঘিরে ননদ দেবররা বসে আছে।আজ সিরিয়াল দেখার জন্য শ্যামার তাড়াহুড়ো নেই।শ্যামাকে নিয়ে ননদ দেবররা মজা করছে।শ্যামা হাশপাশ করছে কখন এরা যাবে,আর কখন সে একা হবে।দিদির সঙ্গে কথা বলা দরকার।মনটা ছটফট করছে তার।এইসময় বিজয়টা পাশে থাকলে কত্ত ভালো হতো।কিন্তু আজ কালরাত্রি।চাইলেও বিজয়ের দেখা পাওয়া সম্ভব নয়।ফোনটা পার্স থেকে বের করে হেমাকে ফোন করলো।
-
হেমা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলো।বোনের কল পেয়ে শোয়া অবস্থাতেই কল রিসিভ করলো।
-দিদি কেমন আছিস?বলতে বলতে শ্যামা কেঁদেই ফেললো।
-হ্যাঁ ভালো আছি আমি।তুই কেমন আছিস?
-ভালো আছি দিদি।
-তাহলে কাঁদছিস কেন?
-তোর কথা খুব মনে পড়ছে।
-তাই জন্য কাঁদতে হয়?দেখ শ্যামা এটা কিন্তু তোর একদম উচিত হচ্ছেনা।শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে এভাবে কাঁদলে তোকে ওরা কেউই লক্ষ্মী মেয়ে ভাববেনা।
শ্যামা দিদির গলার আওয়াজটা এতক্ষণ ঠিকভাবে খেয়াল করেনি।এখন মনে হচ্ছে দিদির গলার আওয়াজটা কেমন যেনো নিস্তেজ মনে হচ্ছে,স্বাভাবিক লাগছেনা।
-দিদি তুই কি সত্যিই ভালো আছিস?গলার আওয়াজটা এমন মনে হচ্ছে কেন?
-একটু জ্বর আসলোরে গায়ে।
-জ্বর হলো কি করে আবার?রোমান্স বুঝি বেশি হয়ে গেলো দিদি!
-একদম ফাজলামি করবিনা শ্যামা।মা বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে তোর?কেমন আছে তারা?
-এবাড়িতে আসার পরপরই ফোন করেছিলাম।মা খুব কাঁদছেরে দিদি।
শ্যামার কথা শুনে হেমা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।শ্যামা বললো,
-জানিস দিদি,মা আর বাবা সব জানে।
-মানে?
-আমি আর চেপে রাখতে পারিনিরে দিদি।সবকথা বলে দিয়েছি তোর ব্যাপারে।
-কি বললো মা বাবা?
শ্যামা বাবার প্রতিক্রিয়াটা হেমার কাছ থেকে লুকালো।কারণ হেমা তা শুনলে খুব কষ্ট পাবে।মায়ের বলা কথাগুলো বললো।সব শুনে হেমা চুপ করে থাকলে।শ্যামা ওপাশ থেকে বললো,
-দিদি তুই একবার মাকে ফোন করে কথা বলে নিস।ক্ষমা চাইলে মা বাবা তোকে ঠিক ক্ষমা করে দেবে।
-হুম,আচ্ছা শ্যামা শ্বশুর বাড়িতে কেমন লাগছেরে তোর?
-ভালোই লাগছে দিদি।
-বিজয় কোথায়?
-জানিনা।এবাড়িতে আসার পর আর দেখিনি ওকে।
-দেখবি,দেখবি।আগামীকাল রাতে ভালো করে দেখবি।
শ্যামা লজ্জ পেলো দিদির কথায়।তাই বললো,
-এখন রাখবো দিদি।
-ঠিক আছে রাখ।আর লজ্জা পেতে হবেনা।
ফোনটা পাশে রেখে দিয়ে হেমা ভাবছে কি করে মাকে ফোন করবে।বাবার ফোনে করবে নাকি মায়ের ফোনে?।ফোন করেই বা কি বলবে সে?এমন আরো সাত পাঁচ ভাবতে লাগলো হেমা।
চয়ন,ছায়া,বিষ্ণু বাবু সবাই টেবিলে বসেছে ডিনার করতে।উত্তরা দেবী হেমাকে ডেকে নিলেন।ছয়ার পাশে গিয়ে বসলো হেমা।
খেতে খেতে বিষ্ণু বাবু চয়নকে বললেন,
-তুই কি ছুটি নিয়েছিস অফিস থেকে?
-হ্যাঁ বাবা,
-কতদিনের ছুটি?
-দশদিনের?
-বিয়েটা কি খুব জুরুরি ছিল?
বিষ্ণু বাবুর এমন প্রশ্নটা শুনে সবাই ফিরে তাকালো তার দিকে।হেমা খাওয়া বন্ধ করে চয়নের দিকে তাকালো।বাবার এমন প্রশ্নের জন্য চয়ন মোটেও প্রস্তুত ছিলনা।
বিষ্ণু বাবু আবারো সুধালেন,
-কি হলো চুপ কেন?
-আসলে বাবা হেমাকে ওর বাবা বিয়ের জন্য জোর করছিল তাই।
-তাই বলে এভাবে বিয়ে করতে হবে?চাইলেতো আমাদের বলতে পারতি।আমরা কথা বলতাম হেমার বাবা মায়ের সঙ্গে।এভাবে মেয়েটাকে নিয়ে পালিয়ে এসে তাদের মনে কতবড় আঘাত দিয়েছিস তা কি ভেবে দেখেছিস?
চয়ন মাথা নিচু করে জবাব দিলো,বাবা হেমার বাবা চায় তার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে হেমার বিয়ে দিতে।
-ও আচ্ছা,এই ঘটনা।কিন্তু তারপরও অন্যায় করেছিস তোরা।তোদের অন্যায়ের ফল আমরা চারটি মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে।লোকজন বাঁকা চোখে তাকায়,নানা রকম প্রশ্ন করে বসে।আমাদের কথা বাদই দিলাম,যারা মেয়ের বাবা তারা কি পাড়াপড়শিকে মুখ দেখাতে পারছে?এই শিক্ষা দিয়েছিলাম তোকে?
চয়নের খেতে মন চাইছেনা।কিন্তু এখন উঠে যেতেও পারবেনা।বাবা তুলকালাম করে বসবে।অগত্যা মাথা নিচু করে জোর করে ভাত গিলতে লাগলো।হেমা ভাত নিয়ে নাড়াছাড়া করছে।গলা দিয়ে কোনোভাবেই খাবার নামছেনা তার।চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।সেদিকে চোখ পড়তেই উত্তরা দেবী স্বামীকে সুধালেন,এসব বলার সময় এখনই পেলে তুমি?বুঝি সময় পালিয়ে যাচ্ছে!দেখতো মেয়েটা কাঁদছে।
বিষ্ণু বাবুর খাওয়া শেষ।তিনি রাতে ভাত কম খান।হাত ধুতে ধুতে বললেন,কাঁন্নার মতো কাজ করলেতো কাঁদতেই হবে।তবে এখন আর কেঁদে লাভ নেই।সংসারে মন দিতে বলো তোমার ছেলের বউকে।আর যদি পারে বাবা মায়ের কাছে ফোন করে মাফ চেয়ে নিতে বলো।তারা যদি মাফ করে তো ভালো কথা।কথাগুলো বলেই তিনি চলে গেলেন।
বাবার চলে যাওয়াতে চয়ন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো।ছায়া এতোক্ষণ ধম মেরে ছিলো।এবার মুখ খুললো সে,
-দাদা আমি কিন্তু আজ বৌদির সঙ্গে ঘুমাবো!!
কথাটা এমনভাবে বললো যেনো পেট ফেটে বেরিয়ে আসলো।এতোক্ষণ অনেক কষ্টে চেপে রেখেছিলো।
চয়ন চোখ কপালে তুলে বললো,
-মানে কি?বৌদির সঙ্গে থাকতে হবে কেন তোকে?
-বেশি কথা বলবিনা দাদা!আমি যা বলেছি তাই হবে।তুই কাল থেকে বৌদির সঙ্গে একঘরে থাকবি।সবতো একাই করে ফেললি।এইটুকু অন্তত এই অধম বোনটাকে করতে দে।
-মানে কি?কি করবি তুই?
-আগামীকাল তোর ফুলসজ্জার ঘর সাজাবো।বলেই হি হি হি করে হাসলো।পাশ থেকে উত্তরা দেবীও মিটমিট করে হাসছেন।হেমা লজ্জায় জমে যাচ্ছে।
চয়ন বললো,
-একদম পাঁকামি করবিনা তো ছায়া!
উত্তরা দেবী পাশ থেকে বললেন,ও যখন চাইছে ওকে ওর কাজটা করতে দেনা বাবা।একটিমাত্র বোন তোর।
চয়ন আর কোনো কথা বললোন।
নীরবতা সম্মতির লক্ষণ।এটা ভেবেই ছায়া ভীষণ খুশি হলো।বোনকে খুশি করতে পারলে চয়নেরও ভালো লাগে।ছোটবেলা থেকেই বোনকে ভীষণ ভালোবাসে সে।সব সময় বোনের খেয়াল রাখতো।ছোটখাট আবদার গুলো পূরণ করতো।
রাতে ঘুমের মধ্যে হেমা একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলো।স্বপ্নটা এতোটাই খারাপ ছিল যে সে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠলো।হেমার চিৎকারে পাশে ঘুমিয়ে থাকা ছায়ার ঘুম ভেঙে গেলো।ছায়া দেখেছে হেমা কেমন কুকরে কুকরে উঠছিল ঘুমের মাঝে,ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।সমস্ত কপালে আর মুখে ঘাম দিয়েছিল হেমার।সকালে ছায়া সেটা বললো চয়নকে।হেমা সকাল থেকেই কেমন যেনো গম্ভীর হয়ে আছে।কারো সঙ্গে ঠিকমত কথা বলছেনা,এমনকি চয়নের সঙ্গেও না।নাশতাটাও ঠিকমত করেনি।তারপর ছায়ার কাছ থেকে এই কথাটা শোনার পর চয়নের আর বুঝতে বাকি রইলোনা কেন হেমা এমন আচরণ করছে।নিশ্চয়ই খুব খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছে।হেমা ঘরে বসে ছিল খাটের এক কোণায়।বসে বসে কিছু একটা ভাবছে।চয়ন হেমার কপালে হাত রেখে জ্বর আছে কিনা দেখলো।তারপর বললো,
-যাক,জ্বরটা তাহলে গেলো।ঔষধে কাজ করেছে।
হেমা আগের মতোই চুপ করে থাকলো।
-তোমার কি মন খারাপ?
-না।
-শরীর দুর্বল লাগছে?
-কিছুটা।
-জ্বরের পর এমন শরীর দুর্বল হবেই।ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করলে,নিজের যত্ন নিলে আবার ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু তুমি তো তা করছোনা।সকালে নাশতাটাও খেলেনা পেটপুরে।
-এমনিতেই ভালো লাগছিলনা তাই।
-ছায়া বললো তুমি নাকি রাতে ঘুমের মাঝে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলে,ফুঁপিয়ে কেঁদেছিলে।
-ও,
-খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখেছো?
হেমা এবার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলোনা।চয়নের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করলো।চয়ন হেমাকে শান্ত করার চেষ্টা করলো।
-কি হলো কাঁদছো কেন?এভাবে কাঁদলে হবে?কি স্বপ্ন দেখেছো আমাকে বলো।দেখবে হালকা লাগবে তোমার।
-জানো আমি রাতে বিভৎস একটা স্বপ্ন দেখেছি।দেখেছি বাবা লজ্জায় গলায় দঁড়ি দিয়েছে।মা বাবার লাশের পাশে বসে কাঁদছে।
হেমার এমন কথা শুনে চয়নের বুকটা কেঁপে উঠলো।হেমার অবস্থাটা বুঝলো সে।এমন একটা স্বপ্ন দেখার পর কোনো মানুষই আর ঠিক থাকতে পারেনা।তার উপর হেমা নিজের বাবা মাকে নিয়ে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখলো।চয়ন,হেমা যে ভুলটা করেছে তারপর এমন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলা অস্বাভাবিক কিছুনা।গতকাল শ্যামার বিয়ে ছিলো।কি জানি শ্যামার চলে যাওয়ার পর কি ঘটছে সেখানে।ওই দু'টি মানুষ কি করছে।একবার অন্তত খোঁজ নেয়া দরকার।
হেমাকে বুক থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চয়ন বললো,তুমি এক্ষুনই একবার বাড়িতে ফোন করো হেমা।
-আমি?কিন্তু কি বলবো ফোন করে?কোন অধিকারে আমি ওই বাড়িতে ফোন করবো বলো?আমি যে তাদের কষ্ট দিয়েছি।
-এসব একদম মাথায় এনোনা লক্ষ্মীটি।কোনো বাবা মা-ই সন্তানের উপর রাগ করে থাকতে পারেনা।তুমি ফোন করে তাদের সঙ্গে কথা বলো,যা করেছো তার জন্য ক্ষমা চাও।দেখবে তারা ক্ষমা করে দেবে।তাছাড়া গতরাতে তো বাবাও তোমাকে এটা বললো,বুঝালো।
হেমা এরপর আর কোনো প্রতিউত্তর করলোনা।ফোনটা হাতে নিয়ে মায়ের নাম্বারে ডায়াল করলো।চয়ন সেখান থেকে চলে গেলো।ও থাকলে হেমা হয়তো মন খুলে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারবেনা।মন খুলে কেঁদে হালকা হতে পারবেনা।
কয়েকবার রিং হতেই কাজের বুয়া সুফলা মাসি ফোন রিসিভ করলো,
-হ্যালো কে কইতেছেন?
-মাসি আমি হেমা।
নামটা শুনে সুফলা মাসির চোখ চড়কগাছ।
-দিদিমণি আপনে??আপনে কই আছেন?গেছেন কই আপনে?আপনে জানেন বাড়িতে কত কিছু হইতাছে??
বুয়ার এতো প্রশ্ন শুনে হেমার কান গরম হয়ে গেলো।
-ওহ!মাসি একটু চুপ করবে???বলছি মা কোথায়?
-আছে তো,বারান্দায় বইসা কাঁনতেছে বেচারি।
-মাকে ফোনটা দাও।
সুফলা মাসি চিৎকার করে দৌড়ে বারান্দায় আসলো।হেমা দিদিমণি ফোন করছে,কইগো গিন্নী মা।হেমা দিদিমণি ফোন করছে।সুফলা মাসির চিৎকারটা তারাশঙ্কর বাবুর কান অবধি পৌঁছে গেলো।মহুয়া ব্যানার্জী মেয়ের ফোন করার কথা শুনে অস্থির হয়ে গেলেন।অস্থিরতায় তার হাত পা কাঁপতে শুরু করলো।ফোনটা হাতে নিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে বললেন,
-হেমা,
-মা,
আর কোনো কথাই বলতে পারছেনা মা মেয়ে দু'জনে।কেবল দুই প্রান্ত থেকে কান্নার শব্দ আসছে দু'জনের কানে।
মহুয়া ব্যানার্জীর অবস্থা দেখে সুফলা মাসি বিরক্ত হয়ে বললো,ধুর!!কান্না থামাইয়া মাইয়াটা কেমন আছে,কোথায় আছে তা জিজ্ঞাস করেন তো!!মহুয়া ব্যানার্জী কোনো মতেই কান্না থামাতে পারছেনা।হেমা নিজেকে বহুকষ্টে স্বাভাবিক করে বললো,মা কেমন আছো তুমি?
-তোকে ছাড়া আমি কখনো ভালো থাকতে পারি বল?কেন এমন করলি বল?কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলি এভাবে?
হেমা কি বলবে বুঝতে পারছেনা।মায়ের প্রশ্নের কি উত্তর দেবে এখন সে?
তারাশঙ্কর বাবু একবার উঁকি দিয়ে দেখলেন স্ত্রীকে।স্ত্রীর চোখে জল দেখে তারও চোখে জল এসে গেলো।সরে গেলেন তিনি।হেমা বললো,
-মা আমাকে ক্ষমা করে দাও তুমি।আমার ভুল হয়ে গেছে।আমাকে প্লিজ ক্ষমা করে দাও।তোমাদের কষ্ট দিয়ে আমিও ভালো থাকতে পারছিনা।
-ধুর পাগলি মেয়ে।তোর উপর আমার কোনো রাগ অভিমান নেই।ক্ষমা করবো কি আর বল?
-আমি যে তোমাদের কষ্ট দিয়েছি।
-বাদ দেনা মা।তুই ফোন করেছিস,এখন আমার কোনো কষ্ট নেই।জামাই কেমন আছেরে মা।তোর শ্বশুর শাশুড়ি তোকে ভালোবাসে?আমি শ্যামার কাছে সব শুনেছি।ওরা নাকি অনেক ভালো বংশের লোক।
-হ্যাঁ মা।এবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ অনেক ভালো।আমাকে অনেক ভালোবাসে তারা।
-সুখি হও মা,তুই অনেক সুখি হও।
-মা বাবা কেমন আছে?
-মানুষটা ভালো নেইরে মা।অনেক বড় আঘাত পেয়েছে।তুই চলে যাওয়ার পর থেকেই নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখেছিল।মাঝখানে শ্যামার বিয়ে অবধি একটু ভালো ছিল মন মেজাজ।কিন্তু শ্যামার চলে যাওয়ার পর থেকে আবার নিজেকে ঘরবন্ধি করে রেখেছে।
-মা বাবা আমার উপর খুব রেগে আছে, তাইনা?
-অন্যায় করেছিস,কষ্ট পেয়েছে।রাগতো একটু করবেই।
-বাবাকে একটু দাওনা ফোনটা মা।আমি কথা বলবো।বাবার কাছে ক্ষমা চাইবো।
-দিচ্ছি।
ফোনটা হাতে নিয়ে তারাশঙ্কর বাবুর ঘরে গেলেন মহুয়া ব্যানার্জী।তারাশঙ্ক বাবু খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন।ভয়ে ভয়ে ফোনটা স্বামীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মহুয়া ব্যানার্জী বললেন,হেমা তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।
চোখ মেলে গম্ভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন তারাশঙ্কর বাবু।তারপর জিজ্ঞেস করলেন,কে কথা বলতে চাইছে?
-হেমা।
-কেন?
-ক্ষমা চাইতে তোমার কাছে।বলোনা একটু কথা।
-বলে দাও গাছের গোড়া দিয়ে কেটে আগায় পানি ঢাললে গাছটা আর জীবিত হয়না।
Bangla Golper Boi
ওই প্রান্ত থেকে হেমা সব শুনছে।বাবার কথা শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে হেমা।মুখ টিপে কাঁদছে সে।
মহুয়া ব্যানার্জী বললেন,
-আর রাগ করে থেকোনা।মেয়েটা তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে বলছে।
-বলে দাও তোমার মেয়েকে,আমি মন থেকে আমার সন্তানদের দোয়া করি,সব সময় তাদের ভালো চাই।কিন্তু তোমার মেয়ে এতোটাই পর ভাবলো যে আমায় নিজের মনের কথাটা নিজের বাবাকে বলতে পারলোনা।নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়ে নিলো।আদিখ্যেতা করে এখন আর ক্ষমা চাইতে হবেনা।দোয়া করি আমি তোমার মেয়েকে,যেনো সুখী হয়।
তুমি এখন যাও,আমাকে একা থাকতে দাও।
মহুয়া ব্যানার্জী হেমাকে বললেন,
-তোর বাবা কথা বলবেনারে মা।
-আমি সব শুনেছি মা।
-তুই কষ্ট পাস না মা।
হেমা কষ্ট এতোক্ষণ পেলেও এখন পাচ্ছেনা।বাবা তার সঙ্গে কথা না বললেনও তাকে যে ক্ষমা করে দিয়েছি তা বাবার কথায় স্পষ্ট হয়ে গেছে।
হেমা মাকে বললো,
-মা আমি এখন রাখছি।কেমন?
-রেখে দিবি?আচ্ছা রাখ।আমারো একটু কাজ আছে।আজ তো শ্যামার বউভাত।ওখানে যেতে হবে।তুই থাকলে কত ভালো হতো।
-মা এসব বলোনা।চাইলে সব হয়না।ভালো থেকো তোমরা।
-তুইও ভালো থাকিস মা।
হেমা ফোনটা রেখে বড় করে শ্বাস ফেললো।প্রাণ খুলে নিশ্বাস নিলো সে।নিজেকে অনেক হালকা লাগছে এখন তার।
SHARE

Author: verified_user