Wednesday

Bangla Book Online | Polashir Mor

SHARE

Bangla Book Online  | Polashir Mor


পলাশির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আশেপাশে তাকিয়ে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলাম। অস্বস্তিবোধ কারণ আছে। "কি কারণ থাকা যায়?" ভ্রু কুঁচকে পাঠক মহল ভাবতে পারেন। অস্বস্তিবোধের উত্তর দিবো গল্পের শেষে। মানুষ সাসপেন্স পছন্দ করে। আমার জন্মের সময় আমার ফুপি ছোটখাটো সাসপেন্স রেখেছিলেন বাবার কাছে। Bangla Book Online 
.
ঘটনটা এমন, আমার জন্মের আগের রাতের কথা, আমার বাবা স্বপ্ন দেখলেন তাঁর এক পুত্রসন্তান হবে। সে পুত্র সন্তানের পিছনে পিঠের মাঝখানের অংশে একটা ছোট কালো দাগ থাকবে। বাবা এই কথা আমার মায়ের হাত ধরে হাসিমুখে বললেন, বলার সময় মায়ের পাশে থাকা ফুপিও শুনলেন। মা ফুপি দুজনই বিরক্ত হলেন তার কথায়। মায়ের তখন প্রচন্ড প্রসব বেদনা উঠেছে। বাবার এমন কথা শুনে মা চোখ কটমট করে বাবার দিকে তাকালেন। বাবা মুখ কাচুমুচু করে নিচে নামলেন। আমাদের দোতলা বাড়ি ছিলো। বাবা নামার পর ধাত্রী এলো। বাবা একই কথা ধাত্রীকে বললেন। ধাত্রীর চেহারায় ও বিরক্তির ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠলো। বাবা আশাহত হলেন, আশাহত হয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে রইলেন দুই ঘন্টা। দুই ঘন্টা পর দোতালা থেকে ফুপি নেমে এসে হাসিখুশি মুখে জানালেন , মেয়ে সন্তান হয়েছে। বাবা বার কয়েক জিগেস করলেন , সত্যি কি মেয়ে হয়েছে? ফুপি মুচকি হেসে বললেন , ‘ হ্যাঁ’ তার ক্ষানিক পর আমাকে গোসল করিয়ে নিচে নামানো হলো। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে বাবার চোখে তখন রাজ্যের খুশি। তার ছেলে কি মেয়ে হয়েছে সে বিষয়ে মাথা ব্যাথা নেই। তার সমস্ত খুশির উৎস হলো তিনি "বাবা" হয়েছেন। আমাকে কোলে নেয়ার পর ফুপি আমাকে চিৎ করে শুইয়ে পিঠ দেখালেন। অবাক হয়ে বাবা তাকিয়ে দেখলেন, আমার পিছনে পিঠের মাঝ বরাবর ছোট কালো দাগ। তিনি আমাকে সোজা করে দেখলেন, তিনি স্বপ্নে যে ছেলে হয়েছে দেখেছিলেন তা সত্যিতে রূপ নিলো। আমার কাছে এই সত্য গল্পের কোন ব্যাখ্যা নেই তবে ফুপির মুখ থেকে শোনা তৈরি ক্ষানিক সাসপেন্সের কথা আমি শুনে মাঝে মধ্যে আনমনে হাসি।
bangla golpo

.
পাঠকরা হয়তো কিছুটা বিরক্ত হয়েছেন আমার ছোটবেলার সাসপেন্সের উদাহরণ শুনে। আমার গল্পের সাথে যদিও তার মিল নেই। সাসপেন্স অন্য জায়গায়। বলছি গল্প শেষে।
.
অস্বস্তিবোধটা কিছুটা বাড়লো আশেপাশে কয়েক জোড়া চোখ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। মানুষের মনে বড্ড বেশি কৌতুহলপূর্ণ। আমি সেই কয়েকজোড়া কৌতুহলের দৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘড়ির দিকে তাকালাম। রেণুর আসার কথা বিকেল ৪ টায়। ঘড়িতে ৪টা বেজে ১০ মিনিট। রেণুর এমন দেরী হওয়া স্বাভাবিক। একদিন কার্জন হলের দক্ষিন পাশের মাঠটিতে ৮ টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছিলো। বসিয়ে রাখার পিছনে কারণ ছিলো বাচ্চাসুলভ ঝগড়া। ৮টায় মশার কামড় খেয়ে যখন উঠতে যাবো তখন রেণুর ফোন, "এখনি হলের সামনে আসো", আমি কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। রাগও ঝাড়া গেলো না। যাওয়ার পথে নিউ মার্কেটে গেলাম রেণুর রাগ ভাঙ্গাতে কিছু কিনব বলে। হতাশ হলাম, বই ছাড়া তাকে কিছুই খুশি করতে পারে না। ফেরার পথে নীলক্ষেত হয়ে গেলাম। রেণুর পছন্দের জিনিস হচ্ছে বই। আমি নীলক্ষেত দিয়ে যাওয়ার পথে হুমায়ূন আহমেদ স্যারের "মায়াবতী" বইটি নিলাম। রেণুর হলের পিছন গেইটে দাঁড়িয়ে ছিলো, আমি রেণুর রাগিরাগি চেহারার মাঝেও চোখ দুটিতে গভীর ভালোবাসা দেখতে পেলাম।
.
"এত দেরি হলো কেন?"_ রেণু কন্ঠে যথেষ্ট রাগী স্বর এনে জানতে চাইলো।
.
আমার চেহারা তখন ঘেমে চুপসে গেছে। নিউমার্কেটে মানুষের তাপে সেদ্ধ হয়ে নীলক্ষেত, প্রচন্ড ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও আমি হাসি মুখে তাকালাম রেণুর দিকে। স্টুডেন্ট লাইফে মাস শেষে পকেটে হাহাকার থাকে। আমার ঘার্মাক্ত চেহারা মাঝে সেই হাসি দেখে রেণুর চেহারায় তখন মায়াবতীর "মায়া" আচ্ছন্ন করছে । আমার হাত ধরে নিয়ে গেলো হলের পাশের মাঠে। পেপার বিছিয়ে টিফিন বক্স বের করলো। ল্যাম্প পোষ্টের আলো পড়ছিলো আমাদের উপর। আমরা একেই ক্যান্ডেল লাইট ডিনার বলতাম। রেণু খাবারের প্রথম চামচ আমার মুখে তুলে দিতেই আমরা আমাদের বাচ্চা সূলভ সেই ঝগড়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম!
.
পলাশির মোড়ের সামনে যে পাশে দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষা করছি তার বিপরীত পাশে এক বন্ধুদল। তাদের মাঝ থেকে এক মেয়ে কন্ঠ অদ্ভুত মায়াকাড়া সুরে রবীন্দ্রনাথের "পুরোনো সেই দিনের কথা গাইছে" আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। পুরোনো কিছু স্মৃতি ভাসছে চোখে।
.
আমাকে অবাক করে দিয়ে এক মেয়ে কন্ঠ ডেকে উঠলো ,
"এই যে মিস্টার শুনছেন?
.
আমি পিছন ফিরে তাকিয়ে হাসলাম। প্রথম যখন রেণুর সাথে পরিচয় তখন ঠিক এভাবেই টিএসসির সামনে ডেকেছিলো। আমি রেণুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। রেণুকে আজ অপূর্ব লাগছে, তার পরনে নীল শাড়ি। কপালে কালো টিপ। অদ্ভুত মায়াভরা চেহারা। শুধু চুলের দু' পাশের কিছু জায়গায় সাদা হয়ে গিয়েছে। আমি হেসে বললাম, "রেণু , তুমি ঠিক আগের মতোই আছো’।
আমার কথায় মিষ্টি হাসল রেণু। বয়সের সাথে মানুষের রূপ বদলালেও হাসি বদলায় না। রেণু হেসে বলল, "চুল পাকা ছাড়া, হলুদ পাঞ্জবীতে তোমাকে আগের মতোই লাগছে রুদ্র" _ রেণুর কথায় হাসলাম। আমাদের হাসি দেখে কৌতুহলী চোখ জোড়াদের মুখেও হাসি ফুটলো, রেণু লক্ষ না করলেও আমি করেছি।
.
"তো কি করা যায়?_ রেণুকে জিগেস করতেই ঝটপট উত্তর।
.
"শুরুটা মরিচ চা দিয়েই করি?
.
রেণুর কথায় হেসে, তার হাত ধরে সে গান গাওয়া বন্ধু দলটির দিকে এগিয়ে গেলাম। তারা আমাদের আসতে দেখে বসার জায়গা করে দিলো।
.
মরিচ চায়ে প্রথম চুমুক দিয়ে দুজনের দিকে তাকালাম দুজন। পুরোনো কত স্মৃতি ঘিরে রয়েছে এই সকল চত্তর গুলোয়। আমি রেণু দিকে তাকিয়ে জিগেস করলাম,
.
"একটা গান হবে রেণু? _ আমার কথা শুনে গান গাওয়া মেয়েটি রেণুর দিকে তাকালো। রেণু প্রথমেই না করে দিলো। এই বয়সে কন্ঠে কি সেই সুর কি আর আছে?
.
সত্যি বলতে কি রেণু খুব সুন্দর গাইতে পারতো। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত। আজ আকাশে বৃষ্টি নেই। শহীদুল্লাহ হলে, পুকুর পাড়ে বসে একটা সময় কত গান শুনেছি রেণুর মুখে। অদ্ভুত ভালো লাগার আচ্ছন্নতায় হারিয়ে যেতাম দুজন।
"তোমার খোলা হাওয়ায় লাগিয়ে পালে
তোমার খোলা হাওয়ায়, ডুবতে রাজি আছি,
আমি ডুবতে রাজি আছি"
.
সত্যি বলতে গান গুলোর কথা, রেণুর সুর আর দৃশ্যগুলো আমার চোখে ভাসে খুব।
.
বন্ধুদল গুলোর কথায় রেণু রাজি হচ্ছিল না দেখে, গিটার হাতে ছেলেটি থেকে আমি গিটার নিলাম। আমার গিটার নেয়া দেখে হাসলো রেণু।
.
বয়স বেড়েছে, একটা সময়য় গিটারে সুর তুলতে পারতাম। গিটারের তারের কম্পনের সুর তুলতে পারলেও বুড়ো এই কাপা হাতে সেই আগের সুর উঠবে? ভাবতে ভাবতেই সুর তোলার চেষ্টা করি। হুট করে খেয়াল করলাম সেই বহু প্রিয় সুর কানে বাজছে।
.
"আয় আরেকটিবার আয় রে সখা
প্রাণের মাঝে আয়
মোরা সুখের দুঃখের কথা কবো
প্রাণ জুড়াবে তাই ...”
.
আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম রেণুর গান শুনে একটু আগে গাওয়া মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গিটারে সুর তোলা ছেলেটিও। এতক্ষণ আমাদের দিকে যে কয়জন তাকিয়ে ছিলো তাদের চোখে শুধুই বিস্ময়! আচ্ছা , বুড়ো বয়সে কি প্রেম করা যায় না? এইতো যায়...
.
দেখলেন , আমি সাসপেন্স ভেঙ্গে দিলাম। বুড়ো বয়সে হলুদ পান্জাবী পরে পলাশির মোড়ে দাঁড়ানোর পিছনে অস্বস্তিবোধ সাসপেন্স শেষ। আমাকে দিয়ে সাসপেন্স হয় না। আজ বহু পুরোনো দিনের মতো পুরোনো একটি দিন। এই দিনে স্মৃতিকাতর হওয়া যায়। সাসপেন্স রেখে কি লাভ?
.
মরিচ চা খেয়ে, গান পর্ব শেষে আমরা উঠে দাড়ালাম। বন্ধুদলের একজন আমাদের একটা রিক্সা ঠিক করে দিলো। আমি উঠে , পুরোনো দিনের মতো হাত ধরে উঠালাম রেণুকে। তারা আমাদের বিদায় দিলো। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম , একদল তরুণ/তরুণী আমাদের দিকে বিষ্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে আছে।
.
রিক্সা চলছে শহীদ মিনারের দিকে। আমি রেণুর দিকে তাকালাম। বয়সের ছাপ আছে চেহারায় , তবে চেহারার মায়াটা সেই বিয়সের ছাপ ঢেকে দিয়েছে। দুজনের বয়স পঞ্চাশ পার হয়েছে। আচ্ছা আমি যদি রেণুকে মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে চুল খোলা রাখতে বলি সে কি অবাক হবে?
.
আমি অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম, "রেণু খোলা চুলে তোমায় অনেক সুন্দর দেখাতো" _ বলেই ভাবলাম এই বুঝি রেণু রেগে কিছু বলবে। রেণুর দিকে তাকিয়ে অবাক হলাম। রেণু চুল খুলে দিয়েছে। আমি অবাক হয়ে সেই পুরোনো প্রেমিকাকে দেখতে পেলাম যেনো। কি অদ্ভুত সুন্দর!
বাতাস বয়সে, সাথে চলন্ত রিক্সায় রেণুর চুল মুখে এসে পড়ছে আমার।
.
ক্যাম্পাসে থাকা কালিন সময়ে যখন আমি আর রেণু ভবিষ্যতের কথা ভেবে অজানা হারানো ভয়ে আচ্ছন্ন হতাম তখন রেণু আর আমি বেড়িয়ে পড়তাম রিক্সা ভ্রমনে। রিক্সা চলতো , রেণুর চুল উড়ে এসে পড়তো আমার মুখে। কি অদ্ভুত মিষ্টি একটি ঘ্রাণ! আমি তখন রেণুর হাত ধরতাম শক্ত করে। পরম নির্ভরতার সেই হাত আমি ফের ধরলাম।
.
সেই পুরোনো দিনের মতো আমি আর রেণু শক্ত করে ধরে আছি। রিক্সা চলছে, রেণুর চুল উড়ে এসে পড়ছে মুখে। আমাদের দিকে এখানেও কিছু কৌতুহলী চোখ। হলুদ পাঞ্জাবীটা আমি হিমু সেজে পড়িনি। পড়েছি রেণুর আবদারে, আমরা প্রেম বুঝতাম হুমায়ূন স্যারের উপন্যাসে।
.
শহীদ মিনারের বেদির পাশে দেয়াল। একটা সময় বিকাল বেলায় এদিকটায় বসে বাদাম খেতাম দুজন। বয়স হয়েছে এখন, সাথে দেয়ালে উঠার শক্তি কি হবে? দেয়ালের পাশেই ছোট্ট একটা দেয়ালে বসে পড়লাম । রেণু বসতে কষ্ট হয়েছে , হেসে বলল,
"বুঝলে রুদ্র , তোমার তুলনায় আমি বুড়িয়ে গেছি"
.
রেণুর কথায় হাসলাম । আমাদের হাসি ছড়িয়ে পড়ছে যেন চারদিকে। দুই একজন প্রেমিক/প্রেমিকা যুগল তাকিয়ে হাসলো। রেণু দেয়ালে পা ছাড়িয়ে বসে আছে , আমরা দু’জন পা ঝুলিয়ে বসে বাদাম খাচ্ছি। আমাদের দিকে কৌতুহলী চোখ গুলোতে এখন মিষ্টি একটা দৃষ্টি। আচ্ছা দু’জন বুড়ো বুড়ি সেজে দেয়ালে পা ঝুলিয়ে বাদাম খেয়ে প্রেম করছে, দৃশ্যটা মিষ্টি না?
.
আমরা কিছুক্ষণ সেখানে থেকে নিচে নামলাম। রেণুকে দেয়াল থেকে নআমাতে গিয়ে বুঝলাম কোমড়ে জোড় নেই। বয়স অনেক হয়েছে। আমার কোমড় ধরা দেখে হাসল রেণু, মায়াবী একটা হাসি। ভার্সিটির পথ ধরে দুজন হাতে হাত রেখে হাটছি। আমাদের দিকে কে কিভাবে তাকাচ্ছে তা ভেবে আর কিছু যায় আসছে না। অস্বস্তিবোধটা কেটে গেছে। ভার্সিটির মাঠ পেরিয়ে সুইমিংপুল হয়ে দোয়েল চত্বর এলাম। রেণুর হঠাৎ শখ হলো টিএসসি যাবে। জিগেস করলাম ,
"অনেক সময় তো হলো , টিএসসি কেনো?”
.
রেণু মুচকি হেসে বলল , " চুড়ি নিবো , হরেক রকমের রেশমি চুড়ি"
.
আমি হাসলাম , রেণুর রেশমি চুড়ির শখ এখনো আছে দেখে । চামড়া বদলায় , বয়সের সাথে চাওয়ার মাত্রাও ক্ষীণ হয় কিন্তু ভালোবাসার ক্ষেত্রে চাওয়াটুকু আগের মতোই থাকে।
.
টিএসসি পার হয়ে চারুকলার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এক মহিলা চুড়ি বিক্রি করছেন । সে বুড়োবুড়ির চুড়ি নেয়ার দৃশ্যটি হয়তো প্রথম দেখছে। প্রথমে ইতস্তত করলেও একটু ক্ষানিক বাদে স্বাভাবিক হলো। আমি রেণুর জন্য নীল আর বেগুনী রঙের চুড়ি নিলাম।
.
রেণুর হাতে চুড়ি পড়িয়ে দেয়ার সময় আমার হাত কাঁপছিল দেখে টিপ্পনি কাটল রেণু। আমরা দুজনই হাসলাম। এই হাসি ছড়িয়ে পড়ল চুড়ি নিতে আসা কিছু তরুণীর মুখে। আমাদের হাসির সাথে যোগ দিলো তারাও।
.
ঘড়ির দিকে তাকালাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। রেণুকে বললাম,
"বুড়ো বয়সে প্রেম তাহলে শেষ হলো। বাড়ি যাওয়া যাক?"
.
রেণু উত্তরে মাথা ডানবাম ঘুরিয়ে বলল , "না, আমি কার্জন হল যাবো। শহীদুল্লাহ হলের পুকুর পাড়?”
.
বয়স বাড়ছে শেষ কবে আবার আসা হবে? এমনটা ভাবতেই ছোট একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেললাম। রেণুর হাত ধরে বললাম , যাওয়া যায়।
.
কার্জন হল আগের মতো সুন্দর। সবুজে ঘেরা মাঠে রেণু বসে চারপাশ দেখছে। অনেক প্রেম যুগল বসে আছে। আমার চোখ তাদের দিকে না গিয়ে , গেলো ছোট এক খুকির দিকে। যার হাতে বকুল ফুলের মালা। আমি সেদিকে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। মালা নিতে গিয়ে দূর থেকে দেখলাম , রেণু তার ব্যাগ থেকে পেপার বের করে ঘাসে রাখলো। সেখানে টিফিন বক্স। আমি মালা নিয়ে সামনে আসতেই হেসে দিলো। সে যে হটপটে পুরোনো দিনের মতো, টিউশনী শেষে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত যুবকের জন্য যেমন করে হল থেকে খিচুড়ি রেঁধে খাওয়াতো তেমন কিছু ভেবে রেখেছে তা আমার ভাবনায় ছিলো না।
.
রেণু হটপট থেকে খিচুড়ি নিজ হাতে নিয়ে মুখে তুলে দিলো। আমার মাথায় পুরোনো অজস্র স্মৃতির ফোয়ারায় চোখ ছলছল করে উঠেছে। রেণুর মাথায় তখন বকুল ফুলের মালা। সন্ধ্যা ততক্ষণে নেমে গেছে, লালচে হলুদের অবয়বে আকাশে আমাদের দু’জন বুড়োবুড়ির ভালোবাসা দেখে আশপাশে প্রেমিক- প্রেমিকা যুগল আড়চোখে তাকাচ্ছে। কারো চেহারায় বিষ্ময় , কারো চেহারায় মিষ্টি হাসি। আমি রেণুর দিকে তাকিয়ে আছি একদৃষ্টিতে। এই যেন বহু বছরের পুরোনো তরুণী রেণু !
.
কার্জন হলের সামনে শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে আমরা প্রায় সন্ধ্যায় বসতাম। আজও বসে আছি। বহু বছর পরে দৃশ্যটা একই। ক্যাম্পাসের শেষদিনটিতে ঠিক একই ভাবে রেণু নীল শাড়ি, খোপায় ফুল আর কপালে কালো টিপ দিয়ে বসেছিলো। আমি রেণুকে বললাম , "রেণু , একটা গান গাও"
.
রেণু আমার দিকে কিছুক্ষণ ঠায় তাকিয়ে রইলো। আমাদের দৃষ্টি তখন পুকুর পাড়ের দিকে। হঠাৎ মিষ্টি সুরে আমার কানে একটা খুব প্রিয় গান ভেসে আসছে ...
.
"ঐ ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায় আমার ইচ্ছা করে
আমি মন ভেজাবো ঢেউয়ের মেলায় তোমার হাতটি ধরে
আকাশ থেকে ফেলবে ছায়া মেঘের ভেসে যাওয়া
শোনবো দুজন কি বলে যায় উদাস দখিন হাওয়া
দূরের ঐ গাংচিলেরা নামবে জলের পরে....
.
আমি অবাক হয়ে রেণুর দিকে চেয়ে থাকি। কি মিষ্টি কণ্ঠ তার। এই মায়াভরা কন্ঠ , এই ভালোবাসাটা আজন্মের। আমি খেয়াল করলাম রেণুর চোখে জল ছলছল করছে। আমি শক্ত করে হাতটা ধরি। সন্ধ্যা নেমে উজ্জল আকাশে সূর্য ঢেকে অন্ধকার ঘনিয়ে গেছে। জীবনটা হয়তো হারিয়ে যাবে কোন একদিন। হয়তো আকাশের তারা হয়ে হারিয়ে যাবো। হারাবে না ভালোবাসার ছাপ গুলো। আমরা জীবনের দিন গুলো এইভাবেই শেষ হয়। ভালোবাসার মানুষ দুটো বুড়িয়ে যায়, ভালোবাসাটা বুড়িয়ে যায় না। আজন্ম থেকে যায় হাজারো স্মৃতি হয়ে পলাশির মোড় থেকে শহিদুল্লাহ হল। হাজারো অজস্র জায়গায় ভালোবাসা গুলো দুটো মানুষের টুকরো স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়...
.
.
.
লিখাঃ আশরাফ মামুন

----

[১]
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কলাবাগানের এই পাশটায় দুই রুমের যে বাসাটিতে ব্যাচেলর জীবনের লেজ টানার সৌভাগ্য হয়েছে, আমি তার একটা নাম দিয়েছি। সীমান্ত। সীমান্ত নাম দেয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথম ও প্রধাণ কারণ, এই বাসাটা কলাবাগানের শেষ বাসা। পেছনেই গ্রীণরোডে হরেক রঙা বাতি জ্বলজ্বল করে। আরেকটা কারণ, বাসার ঠিক পেছনের বাসাটাতেই কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করা। কি আশ্চর্য! কোটি কোটি মানুষে পরিপূর্ণ এই ঢাকা শহরে সীমান্তের রূপরেখা কেন আঁকবে? এখানে কি কোনো নো ম্যান্স ল্যান্ড আছে?
আরও সমস্যা আছে। রোজ একটা মহিলা পুলিশ টহল দিয়ে বেড়ায়, যেন সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী। সমস্যার এখানেই শেষ নয়, শীতের শুরুতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় মানুষ যেমন সুদুর তেতুলিয়া চলে যায়, এখানেও এমন কিছু আছে। দূর থেকে সূর্যের প্রতিফলিত আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে মানুষ ভীষণ খুশি। ধরা যাবেনা, ছোঁয়া যাবেনা, কাছেও যাওয়া যাবেনা, শুধু দূর থেকে দেখেই ভীষণ খুশি হয়। জাতি হিসেবে আমরা এমনই, অল্পতেই খুশি। এখানে আমিও তেমন কিছুর অপেক্ষায় থাকি।
যে বাসাটার কথা বলছিলাম, আমার জানালার দিকে মুখ করে তার একটা বেলকুনিও আছে। এত রুক্ষ পরিবেশেও আমি তার নাম দিয়েছি চড়ুই বেলকুনি। নামটাকে বাজারি করার উদ্দেশ্যে না হলেও, আমার সৃজনশীলতা বাসার অন্য সদস্যদের কাছে তুলে ধরতেই আমি অ্যারো চিহ্ন এঁকে বড় করে দেয়ালে সেঁটে দিয়েছি। নিচে পার্মানেন্ট মার্কারে নামটাও দিয়েছি, ‘ চড়ুই বেলকুনি’। শুধু তাই নয়, সতর্কতা জুড়ে দিতেও আমি ভুলিনি! ‘ অনুমতি ছাড়া তাকানো নিষেধ’।
এবার একে একে সমস্যাগুলোর জট খুলে দিই। যে বাসাটা কাঁটাতারে ঘের দেওয়া, সেই বাসারই একটা বেলকুনি আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। চোখকে বানিয়ে ফেলেছি প্রাকৃতিক বাইনোকুলার। রোজ সকালে আমি কোনো কারণ ছাড়া নিচে যাই। গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকি। ওইযে চড়ুই ব্যালকুনির কথা বললাম, সেই বাসাটা থেকে রোজ সকাল সাতটায় চড়ুইটা নেমে আসে। অনুনোমোদিত মহিলা পুলিশটি তারই মা। তার মায়ের ধারণা, দেশের সব ছেলেরা তার অর্থ, সম্পত্তি এসব নিয়ে পালিয়ে যাবে। সতর্কতার সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছে গেছেন তিনি।
আমাকে আরও অবাক করে দিয়েছে যেদিন জানতে পারলাম, এটা কলেজ পড়ুয়া চড়ুই। সামনেই তার এইচ. এস. সি পরীক্ষা। এছাড়া যেটা জানতে পেরেছি, সেটা আমার প্রয়োজন পড়েনা। কলেজের ব্যাচে দিশা লেখা থাকলেই কি? আমি নাম দিয়েছি চড়ুই।
কলাবাগানের এ পাশটার নাম সীমান্ত দেয়াটা স্বার্থক হয়েছে, যেদিন চড়ুই একা গলিতে দাঁড়িয়েছিলো। লম্বা ভ্রমণের পর তেতুলিয়া যেয়ে অনেকেই কাংখিত সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পান না আবহাওয়ার কারণে। যারা দেখতে পায়, কেবল তারাই পৃথিবীর অন্যতম সৌভাগ্যবান। আমিও অনেক অধ্যবসায়ের পর আজ যাকে একা দেখছি, সে আমার বহুদিনের সাধনার ছিলো। তবে কথা দিচ্ছি, আমি কখনোই আর ওকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করবোনা! পৃথিবীর সপ্তমাশ্চার্যের তালিকা যারা করেছে তারা কোনোদিন এই চড়ুইকে দেখেনি। দেখলে বর্তমানে সাত নাম্বারে থাকা জায়গাটা এই তালিকায় থাকতে পারতো না। এই চড়ুই তালিকার এক নাম্বারে থাকলে সাত নাম্বারে থাকবে বর্তমানের ছয়, বুঝলেন?
জ্যামিতি কম বোঝায় যে স্যার আমাকে মেরেছিলেন, তিনি যদি দিশাকে সামনে নিয়ে দাঁড় করাতেন, নিশ্চিত আমি দিশার নাক দেখেই নব্বই ডিগ্রী কোণ বুঝে যেতাম। অথচ, এই সমকোণী কোণ বোঝাতে চাঁদা ব্যবহার করে! চারু ও কারুকলায় তুলির সাইজ নিয়ে যখন দ্বিধায় ভুগতাম, দিশার আঙুলগুলো দেখা হয়নি। দেখলেই মুখস্থ করে ফেলতাম, সবচেয়ে ছোটো তুলি, দিশার কনিষ্ঠ আঙুল...
যা ঘটার তাই ঘটলো। আমি ভীতুর মতো দিশার আশপাশে ঘোরাঘুরি করলাম আর দিশা চোখের পলকেই রিকশা ডেকে চলে গেলো। হুঁশ ফেরার পর দেখি দিশার রিকশা কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে। উসাইন বোল্টের সমস্ত শক্তি নিজের ভেতর সঞ্চার করে দৌড়াচ্ছি। পেছন থেকে ডেকে রিকশা থামানোর সাহস বা অধিকার কিছুই আমার নেই।
অনেক দৌড়ালাম, যখন তার রিকশার সামনে যেয়ে দাঁড়াই, আমি তৃষ্ণার্ত কাকের মতো পানি খুঁজছিলাম সেটা বোধহয় সে বুঝেছে। রিক্সা থেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকটা দেখে নিলো। মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়ে জিগেস করলো, '‘ এইটুকুন দৌড়াতেই এত হাঁপাচ্ছেন?'’
আমি ঢক ঢক আওয়াজ তুলে বোতলের সব পানি খেয়ে নিলাম। পানি খেয়ে ঝাড়ি শোনার ইতিহাস আজ অবধি না থাকলে আজই হয়ে যাচ্ছে। জি, আমি সামাণ্য এক বোতল পানি খেয়ে দিশার ঝাড়ি শুনলাম।
‘ আরে করছেন কি? সব পানি খেয়ে নিলে আমি খাবো কি?’ , দিশার কপাল কুঁচকানো। আমি কিছুটা ভয় পেলাম, সাথে লজ্জাও। লজ্জায় মাথা নিচু করে চিকন সুরে বললাম, ‘ সরি’।
‘ হ্যাঁ! আপনার সরিতে আমার বোতল ভরে যাবে তো!’
‘ আসলে তৃষ্ণা পেয়েছিলো খুব’
দিশা আর কিছু বললোনা। রিকশা থেকে নেমে রিকশার ভাড়া চুকিয়ে দিবে ঠিক তখনই কি মনে করে রিকশায় উঠে গেলো। অস্থিরতার কাছে হেরে যাচ্ছি। প্রশ্ন করবো, ‘ এখানে নামছেন যে?’ কিন্তু করার আগেই আবার রিকশায় উঠে গেলো। ডান পাশে চেপে বসে বাম পাশে ইশারায় আমাকে রিকশায় আমন্ত্রণ জানালো। আমার কাছে মুহুর্তের জন্য সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হলো।
‘ ভেবেছিলাম রিকশা থেকে নেমে হেঁটে গিয়ে পানি কিনবো’
‘ তাহলে? আবার উঠলেন যে?’
‘ কিন্তু না! আপনি অনেক বড় অপরাধ করেছেন, তাই শাস্তিও অনেক’
‘ কিরকম শাস্তি?’
‘ অনেক দূর গিয়ে তারপর পানি কিনে দিবেন’
‘ পানি কিনে দিতে আমার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু সমস্যা একটা হয়ে গেছে’
‘ কি সমস্যা আবার?’Bangla Book Online 
‘ আসলে আমি শুধু হাঁটতে বের হয়েছিলাম তো, মানিব্যাগ সঙ্গে আনিনি’
‘ মিথ্যে কথা আমি একদমই পছন্দ করিনা’
‘ বিশ্বাস করুন আমি সত্যি বলছি, আপনি চেক করে দেখতে পারেন’।
‘ আমি দ্বিতীয়বার বললাম। মিথ্যেবাদীদের আমি পছন্দ করিনা’।
এজন্যেই মানুষ বলে রূপ দেখে প্রেমে পড়োনা। যাকে দেখার জন্য জানালার ধারে পূজো করি, সে বিশ্বাস করেনা। আমি চুপসে গেলাম। অন্যদিক ফিরে উদাস মনে রিকশায় বসে আছি। হঠাত দিশা সুরে সুরে জিগেস করলো, ‘ হাঁটতে বেরিয়েছিলেন? সত্যি?’
ঘটনা তাহলে এই! আমি যে সত্যিই মিথ্যে বলছিলাম ব্যাপারটা মাথায় ছিলোনা। থাকলেও দিশাকে বলতাম সেটাও না। ব্যাপার হলো, দিশা আমার ব্যাপারে জানে। আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। রিকশার চেয়ে আমার বুকের ভেতরটা বেশি কাঁপছে।
‘ রোজ হাঁটতে বের হন তাই না? ভালো কথা! তো আজ এখানে দৌড়ে এলেন কেন? হাঁটার গতি বেড়ে গিয়েছিলো?’
‘ আমি জানি আপনি কিছু বলতে পারবেন না। আরে আরে লজ্জা পেতে হবেনা। পুরুষ মানুষের লজ্জা পেতে নেই’।
‘ মামা সামনে রাইখেন তো’।
দিশার টানা বেশ কয়েকটা কথা শেষ হলো। রিকশাও থামলো। আমি থেমে গেছি আরও বেশ কিছুক্ষণ আগেই।
‘ এখানে ৩৬৬ টাকা আছে’
‘ কি করবো?’
‘ আপনাকে লোন দিলাম। পানি কিনে দেন’।
‘ পানি কিনতে কি এত টাকা লাগে? ১৫ টাকাই তো যথেষ্ঠ!’
‘ ভদ্রতাজ্ঞান নাই, সৌজন্যতাবোধ নেই, ছিঃ ছিঃ আপনি একটা মেয়েকে সকাল সকাল শুধু পানি কিনে দিয়েই ছেড়ে দিবেন? ব্রেকফাস্টের দরকার নেই?’
একটা মেয়ে আমাকে এভাবে হাতের তালুতে রেখে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে অনেক্ষণযাবত। আর আমিও পাক্কা নাচিয়ের মতো নেচে যাচ্ছি। আমার ভালো লাগছে, নাচতে নাকি ভাসতে সে জানিনা। তবে ভালো লাগছে।
[২]
জাতের দুপুরবেলা, অর্থাৎ যে দুপুর রোদের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। আমি ঠিক এমনই এক দুপুরে দাঁড়িয়ে আছি একটা মহিলা কলেজের সামনে। নিজেকে বখাটে মনে হচ্ছে। ছোটোবেলায় জানতাম মহিলা কলেজের সামনে বখাটে ছেলেরা দাঁড়িয়ে থাকে। প্রেমে পড়লে সবকিছু করা যায়। বখাটেও হতে হয়। প্রেমই আমাদের বখাটে বানিয়ে দেয় হয়তো।
আমি এসেছি দিশার দেয়া ৩৬৬ টাকা পরিশোধ করতে। প্রথমদিনের আলাপচারিতায় মনের ভেতর যে ফুলের বাগান গড়ে উঠেছিলো, সেটা এ ক’দিনে মরমর অবস্থা। একদিন ওভাবে রিকশা ভ্রমণ, আলাপচারিতা আমার ভেতরে কতখানি আশা জাগিয়েছে আমি নিজেও জানিনা। সেদিনকার দেয়া তারিখমতে দিশার টাকা ফেরত দিতে গেলাম আজ। একে একে মেয়েরা বের হচ্ছে, দিশার দেখা পাইনা। কলেজ প্রাঙ্গন ফাঁকাও হয়ে গেলো। অপেক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছাড়ছি চোরের মতো। দিশা না জানি দেখে ফেলে!
নিতান্ত ভাগ্য সহায়, দিশাও এলো প্রায় আধা ঘন্টা পর আমিও ততক্ষণে সাধু সেজে দাঁড়িয়ে আছি। কপালে হাত রেখে দৌড়ে এসে বললো, ‘ আমি সেদিন ভুলেই গিয়েছিলাম আজ আমাদের ল্যাব আছে। ল্যাব থাকলে আধা ঘন্টা লেট হয়। আপনাকে কষ্ট দিলাম, ধুর!’
‘ ও কিছু না, অপেক্ষা করতে আমার ভালোই লাগে’।
‘ বাহ! আপনি দারুণ ফ্লার্ট পারেন’।
‘ এই নিন টাকাটা, ৩৬৫...’
‘ আরেকটাকা কই? দেখেন আমি হিসাব নিকাশে খুবই সিরিয়াস। আপনি ধার যা নিয়েছেন তাই দিবেন’।
‘ আসলে ভাংতি ছিলো কিন্তু তখন সিগারেট কিনতে যেয়ে আর ভাঙতি না পেয়ে এই এক টাকা দিয়ে ফেলেছি। সমস্যা নেই এই নিন পাঁচ টাকা, বাকি চারটাকা ধার দিলাম আপনাকে’।
দিশার রাগ করা উচিত কিন্তু রাগ করলোনা। ‘ আসেন’ – এক শব্দ বলে এগিয়ে গেলো। ‘ যথা আজ্ঞা’, মনে মনে বলে এগিয়ে গেলাম তার পেছন পেছন।
‘ আম্মু আজ আন্টির বাসায় গেছে। সেদিনই জানতাম আজকে আম্মু আসবেনা, তাই আপনাকে এই তারিখ দেয়া’।
‘ উনি কি খুবই রুক্ষ? আপনাকে একা ছাড়েন না?’
‘ ছাড়বে, বিয়ের পর। মানে আম্মু এটা বলে আর কি’।
‘ বাহ, ভালোতো। একটু টাইটে রাখা ভালো’।
‘ হু! না হলে আপনার মতো আহাম্মক হয়ে যাবে। জানালা দিয়ে মেয়ে দেখবে’।
‘ আমি আকাশ দেখি, মেয়ে টেয়ে দেখিনা তো’
‘ আপনার জানালার পর্দাটা বিচ্ছিরি হয়ে গেছে, লন্ড্রিতে দিতে পারেন না?’
‘ ব্যাচেলর পর্দা তো, তাই’
মনের ভেতর খঞ্জনা বেজে উঠলো। আমার জানালার পর্দার দিকে কিভাবে চোখ যায় দিশার? সেও কি আমায় দেখে? নাহ! আমাকে দেখবেনা। আমার নিজের চিন্তাধারায় সমস্যা আছে। হয়তো কখনো চোখ পড়েছিলো।
‘ আপনাদের বাসার একটা নাম দিয়েছি’, ভেলপুরির ঝালে লাল হয়ে গাল ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বলছিলো দিশা।
অবাক হয়ে জিগেস করি, ‘ কী নাম?’
‘ না না, এটা বললে আপনি আমাকে মেরেই ফেলবেন’, হাত নাড়িয়ে বললো।
‘ আপনি আমাদের বাসা নিয়ে এত গবেষণা করেন কেন?’, হেসে হেসে প্রশ্ন করে ফেললাম আমি। ভেতরে ভয় কাজ করছে।
‘ আপনি করেন কেন?’, পাল্টা প্রশ্ন দিশার।
‘ কই করলাম?’, থতমত খেয়ে গেছি এবার।
‘ মিথ্যা পছন্দ করিনা আমি! যাক এটা বলতে আপনি লজ্জা পাবেন, তাই জোর করবোনা’।
এড়িয়ে যাবার উদ্দেশ্যেই চুপ করে গেলাম। ভেলপুরি শেষে ঝালমুড়ি, সবশেষে কুলফি। গুণে গুণে ৩৫ টাকা খরচ করলো। রিকশা ডাকলো নিউমার্কেট যাবে বলে। নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করছি ততক্ষণ। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে রিকশায় চেপে বসে আছি, খানিকটা বিস্মিত, অনেকটা চিন্তিত। ও কি ভালোবাসে আমাকে?
‘ ভীষণ চাপ আমার, জানেন? আম্মু একা ছাড়তেই চায়না। আপনিই বলেন সেকেন্ড ইয়ারের একটা মেয়ের কি নিজের ভালো মন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই?’
‘ তা তো বটেই। মায়েদের মেয়েদের নিয়ে চিন্তা থাকবেই’।
‘ তাই বলে এত? কই সাফা, সামিয়া ওদের তো নেই। ও আপনাকে বলা হয়নি, ওরা আমার ফ্রেন্ড। পাস্টফ্রেন্ড। পাস্টফ্রেন্ড বোঝেন?’
‘ উঁহু’
‘ পাস্ট ফ্রেন্ড হলো অতীত বন্ধু। ওরা মুভি দেখতে যায়, কলেজ শেষে এখানে ওখানে যায় আর আমি? আমাকে ওরা কেন ফ্রেন্ড বলবে বলেন? আমি ওদের সাথে চলি? এটাতেও সমস্যা আম্মুর!’
‘ মেয়েদের সাথেও চলতে সমস্যা?’
‘ ছিলোনা। সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই ওদের সাথে ঘুরি। কিন্তু যখনই আম্মু দেখলো ওরা প্রেম করে, ওদের সাথে চলাফেরা একদমই নিষেধ করে দিয়েছেন’।
‘ বুঝতে পারছিনা আসলে’।
‘ এত্ত নিরাপত্তা ভাল্লাগেনা। আর এইসব প্রেমটেম? হাহাহা! আমি এসবে মোটেও আগ্রহী নই। আম্মুকে এই ব্যাপারটাই বোঝাতে পারিনা। কিন্তু না! আমার মা বুঝবেনা, আমার মা ভাবে আমি ওদের প্রভাবে প্রভাবিত হতে পারি, প্রেম করে ভেগে যেতে পারি কোনো ছেলের সাথে, যেমনটা করেছে বড় আপু...’
দিশাকে যুগ যুগান্তরের পরিচিতা মনে হচ্ছে। যেভাবে একের পর কথা বলে যাচ্ছে, যেন আমি অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কেউ তার। এতে সুখও পেলাম, কষ্টও পাচ্ছি প্রেমের ব্যাপারে তার আগ্রহ নেই ভেবে। চুপ করে আছি। দিশাও এখন চুপচাপ।
নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ঘন্টাখানেক হেঁটে হেঁটে এটাসেটা কি কি জানি কিনলো। বাসায় ফেরার পালা। বাসায় ফিরতে ফিরতেও দিশার গল্প বলা চলছে। রিকশার চাকাও ঘুরছে আপন গতিতে। কিন্তু মনে হচ্ছে খুব দ্রুত, খুবই! একটা সময় থেমেও গেলো। সময়ের দৌড়ে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হলো। স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসা এতটা বেদনাময় কেন?
[৩]
দিশার মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, এত কড়া নিরাপত্তার ভিড়ে অন্তত একটা ফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা দিয়েছেন তাই। আর যুগের প্রতিও কৃতজ্ঞতা, ফেসবুক নামক জিনিসটার জন্য। এমন কিছু না থাকলে দিশার সাথে কথা বাড়াতাম কিভাবে? কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। কথা খুঁজে পাওয়া যায়না, বড্ড মুশকিল। কথা খুঁজে না পেলেই আমি দেখতে চাই তাকে। মন খারাপের স্মারক দেখিয়ে মায়ের দোহাই দেয় নিয়ম করে। আজকে দিলোনা। প্রশ্ন করলো, ‘ কাল বিকেলে?’ লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
প্রেমের প্রতি অনাগ্রহ থাকলে থাকুক। মনের কথা লুকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে আমি। আমি বলবো, দিশাকে মনের সব কথা বলবো। চড়ুই কাহিনী বলবো আরও বলবো শালিক হয়ে জানালায় বসে থাকার কথা। হয়তো দিশা উড়ে যাবে, অথবা ডানা মেলে বসবে। সে ডানায় আশ্রয় নিবো, দিশাকে শালিক বানিয়ে নিবো। দুই শালিকে সুখের মাতম তুলবো। আরও... আরও... ভাবছি।
শীতের বিকেল। কুয়াশায় কয়েকটা বিল্ডিং পর আর কিছু দেখা যাচ্ছেনা। আকাশে কিছুক্ষণ পরপর পাখিরা এসে জানান দিয়ে যায়। অনেক পাখি, একটা পাখি, দশটা পাখি... বিশটা... আর গুণতে পারিনা। দিশাও পারেনা।
‘ সহেনা যাতনা দিবস ও গনিয়া গনিয়া বিরলে,
নিশি দিনও বসে আছি শুধু পথ পানে
সখা হে এলেনা...’
খুলে বললাম, ‘ এলাম তো’
ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘ মানে?’
‘ উত্তর, তোমার কথার’
‘ ওটা আমার কথা নয়, গানের। গানটা আমার নয়, রবীন্দ্রনাথের’।
‘ তোমার ব্যালকনিতে আজকাল বুয়া আসেনা?’
‘ ছুটিতে গেছে, পর্দাটা নীল রঙা নিতে পারতে’।
‘ আগে না ডান দিকে একটা স্কেচ বোর্ড ছিলো?’
‘ ভেঙে ফেলেছি রাগ করে।'
' তবে আঁকবে কিসে?'
' তোমার চোখের পাতায়। টেবিলটা আগোছালো রাখো কেন?’
‘ কিভাবে জানলে?’
‘ বারান্দার মাঝে এসে দাঁড়ালে দেখা যায়’।
‘ এত কিছু দেখো?’
‘ চোখ চলে যায়। তুমি দেখোনা? ভাব নিচ্ছো?’
‘ লুকোচ্ছি’
‘ লুকিয়ে লাভ?’
‘ হারাচ্ছি না’
‘ বললে বুঝি হারিয়ে ফেলবে?’
‘ সম্ভাবনা থেকে যায়। হারানোর শক্তি নেই’।
‘ বাসা তো অন্যরকম। মা এক ঘন্টার জন্য বাবার সাথে বেরিয়েছে, তাইতো দেখা...’
‘ সেজন্যেই বলছিনা’।
‘ নাকি বলবে সাহস নেই? মনে তো হচ্ছে তাই’।
‘ প্রতিটি প্রেমিকই সাহসী হয়। একটা সাধারণ ছেলে যখন প্রেমে পড়ে তখন কি হয় জানো?’
‘ কি হয়?’
‘ হিংস্র, অকুতোভয়, নির্লজ্ব, বেহায়া, অধৈর্য্য, সাহসী...’
‘ মিশ্র কেন?’
‘ যখন ভালোবাসে, ভালোবেসে পায়না, তখন পাওয়ার জন্য হিংস্র হয়। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণির চেয়ে প্রখর! কথা না হলে, দেখতে না পেলে ধৈর্য হারা হয়ে যায়। ভাবতে থাকে, ‘ কবে দেখবো?’, সে ভীষণ সাহসী হয়ে পড়ে প্রেমিকাকে বাহুডোরে বেঁধে রাখার জন্য। বেহায়া হয় প্রেমিকা যদি কষ্ট দেয়, আর নির্লজ্ব হয় ভীষণ আবেগে, ঘোর অমানিশায়, আঁধারে কিংবা পূর্ণিমায়, ভালোবাসা কাছে পেলে। সেই চড়ুইটার হাতের তালু ছুঁয়ে অথবা...’
‘ থাক! আর না, চুপচাপ থাকো’।
‘ আবার গাও?’
‘ রবীন্দ্র? লা লা লা... দিন যায় রাত যায়... আমি বসে হায় ... দেহে বল নাই, চোখে ঘুম নাই...’
‘ অনেক পড়ার চাপ?’
‘ হু! প্রেমে পড়ার’।
আশপাশের মসজিদগুলোতে আজান দিচ্ছে। দিশা আর সময় ব্যয় করেনি। আমাকে নিয়েই নেমে গেলো ছাদ থেকে। তার ছাদে কাটানো বিকেলটি জীবনের সেরা কোনো এক বিকেল হয়ে থাকবে ভাবতে ভাবতেই চলে আসলাম। দিশাকে বিব্রত দেখাচ্ছিলো। আমারটা দেখা যাচ্ছেনা। বুকের কাঁপন দেখা যায়না। ধুপধাপ আওয়াজ শোনা যায়, সেটা আমি না জানলেও দিশা জানতো বোধহয়। সিড়িঘরের কোণে ধাক্কা দিয়ে বুকে কান পাতলো দিশা। কতক্ষণ? এক সেকেন্ড? দুই সেকেন্ড? কিন্তু আমার কাছে তখন শতাব্দি পেরুনো অনুভুতি মনে হলো। তবুও অতৃপ্ত আমি, আরো কিছুক্ষণ বুকে কান পেতে থাকো দিশা। ভেতরের শব্দরা ভাঙুক, গল্প বলুক তোমায়। আমাদের কথা বলুক। দিশা সব শুনেছে? উদ্দেশ্যমূলক নয়তো তার এমন কিছু করা? এই সিঁড়ি ঘর এতটা অন্ধকার কেন?
বুকের ভেতর ঝড় বেড়ে গেলো মুহূর্তে। কপাল ছুঁয়ে দিলো কিছু একটা, দিশার ঠোঁট। ভীষণ করে কেঁপে উঠলাম। আরও ঝড়! ঠোঁটে কেন ঝড় বইছে? আমি সইতে পারবোনা দিশা। আমি পারছিনা। দিশা চলে গেলো। আমাকে একা অজ্ঞান রেখেই চলে গেলো। দৌড়ে পালালো, যাবার আগে ভীষণ উত্তপ্ত নিঃশ্বাস। ঠোঁট ছুঁয়ে শুধু একটা বাক্য, ‘ ছেড়োনা আমায়...’ আর কিছু মনে নেই আমার। ঝড় থামছেনা।
[৪]
বছর কেটে গেলো। বুকের কাঁপনে যে প্রেম শুরু হয়েছিলো, আমাকে সে প্রেম নিয়ে যাচ্ছিলো কোনো নতুন জগতে। হারিয়ে যাচ্ছিলাম। এক বছরে কতশত ঝগড়া হয়েও হয়নি! হবে কিভাবে? যে ঝগড়ায় হুমকি আসে, কথা বলা যাবেনা, সে ঝগড়া করার সাহস আমার নেই। ওর সাথে কথা না বলে থাকা সম্ভব?
এক বছরে চলে গেছে দিশার লুকিয়ে দেখা করার সময়গুলো। এখন সে ফাঁকি দিতেই পটু। বাসায় ঠিক ঠাক রেখে আমাকেও ধরে রাখছে। শুধু ধরেই রাখছেই না, আঁটকে রাখছে। এক বছরের আনন্দ ভাসছে তার চোখে মুখে। এই এক বছরে কত কত স্মৃতি জমেছে! সেসবের সাক্ষী কেবল শহুরে রাস্তা, ল্যাম্পপোষ্টগুলো। স্বভাবতই আমার প্রথম কথা থাকে, ‘ কিভাবে এসেছো? বাসায় কি বলেছো?’ হাসি দেয় দিশা। ‘ তোমার জন্য পৃথিবী পালানোর সাহস রাখি আমি, আর আমার চালাক মাকে ফাঁকি দেয়া ব্যাপার?’
প্রেমে পড়লে প্রেমিক সাহসী হয় বলেছি। রূপবতী প্রেমিকাও বুকে সাহসের খনি রাখে, দিশাকে দেখেই শিখছি। জাঁকজমক রেস্টুরেন্টের কোণায় দিশা আইস্ক্রিম খাচ্ছে নিশ্চিন্তে। কিন্তু আমি জানি, তার মনে অনেক ভয়। বাসায় জেনে যাওয়ার ভয়, আমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। লুকাতে গিয়েও পারেনা। যেমনটা এখন পারছেনা। ‘ কোনদিন বাসায় ঝামেলা হয়, আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাও’, আমার উদাসি বাক্য শুনে শুনে চোখ টলমল করে উঠলো তার। আবার লুকিয়েও নিলো।
‘ কতক্ষণ?’ জিগেস করলাম দিশাকে।
‘ আড়াই ঘন্টা, কোচিং এ এক্সাম বলেছি’।
‘ আসতে চাননি?’
‘ অবশ্যই! ম্যানেজ করেছি। সে তোমার না জানলেও চলবে’।
‘ চলো, হাঁটি’।
‘ কোথায়?’
‘ শহরে’
‘ ফ্লাইওভারে’
‘ আচ্ছা’
মৌচাক ফ্লাইওভার পেরিয়ে মালিবাগের দিকে। হাঁটছি। হলুদ বাতি নেই এখন শহরে, সবই ফ্লুরোসেন্ট। দিশাও হাঁটছে। একটু পরপর গাড়ি যাচ্ছে, দিশা ভয়ে আমার বাহু ধরে রাখে। অনেকগুলো ভয় দিশার। সবগুলোকে ভেতরে রেখে আমাকে ধরে আছে।
‘ পাখি হলে ভালো হতো’
‘ চড়ুই?’
‘ উঁহু, শালিক’
‘ তোমাকে তো চড়ুই বলি’
‘ তাতে কি? ওটা আগে। ভালোবাসায় শালিক হয়ে গেছি। আর আমি শালিক না হলে তুমি একলা শালিক হয়ে থাকবে, এক শালিকে দুঃখ আসে’।
‘ জোড়া শালিকে সুখ?’
‘ হু। জোড়া শালিক হয়ে উড়ে বেড়াতাম। জানালায় বসতাম, তোমার সেই জানালায়’।
‘ বেলকুনিতে?’
‘ আম্মু দেখবে’
‘ খুব ভয়?’
‘ একদমই না! উড়ে পালিয়ে আসতাম’।
‘ কিন্তু আমরা তো পাখিনা, ডানা নেই আমাদের’
‘ বাহু তো আছে, হাত আছে। নির্ভরতা’।
উদ্দেশ্যহীন এই হেঁটে চলা দু’টো মানুষরূপী ডানা ঝাপটানো নিজেদের না চেনা আনকোরা পাখিজোড়ার ভেতর অদলবদল হয়েছে। সৃষ্টির রহস্যে তাদের হৃদপিন্ড বদলে গেছে। মনের ভাষা বুঝতে পারে একে অন্যের। পথের ভাষা বুঝতে বুঝতে বন্ধুর পথগুলোকে সরলরেখায় মিলিয়ে নিতে পারলেই কেবল তারা সুখের ডানা ঝাপটে বেড়াবে। এখনো অনেক দূর বাকি... অনেকদূর। ট্র্যাজেডির গল্পে মানুষ আঁটকে থাকে, সুখের গল্পে মন থাকেনা। তবুও, এক বছরের চলাচলে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়িয়ে শহর জুড়ে প্রেম দাপিয়ে রাত জুড়ে আবেগের উল্কা আকাশ থেকে নামিয়ে এক সকালে হয়তো কোনো রক্তিম সূর্য উঠবে, সে সূর্য দু’জনেই একই বেলকনি অথবা একই জানালায় উপভোগ করবে। অথবা, অনেক বছর পরে দু’টো পাখি আলাদা খাঁচায় থাকবে। আলাদা দু’টো বেলকুনি আর জানালা। সূর্য কিংবা পূর্ণ চন্দ্র দেখা যাবে দু’টো জানালা, বেলকনি থেকেই। কিন্তু সে দু’টো ঘরে কখনোই জানালা ভেদ করে আলো প্রবেশ করবেনা। সম্ভাবনা দু’টোই। আপাতত আমরা প্রথমটাকেই স্বপ্ন দেখি। ভালোবেসে হেঁটে যাই মাইলের পর মাইল। স্বপ্ন দেখার শর্ত থাকে। ভালোবাসতে হয়, ভালোবেসে পাহাড়সম দেয়াল হয়ে রক্ষা করতে হয় পাশে থাকা মানুষটাকে, সমুদ্রসম আবেগের জোয়ারে ভেসে বেড়াতে হয় দু'জন মিলে। বিশ্বাসের গাছ রোপণ করে নির্ভরতার ফুল ফুটিয়ে সে ফুলের গন্ধে চারপাশ ম ম করবে, মৌমাছিরা রেনুর খোঁজে দিগ্বিদিক ছুঁটোছুঁটি করবে, তবেই স্বপ্ন দেখা যায়। আমাদের তো রোজই এসব হয়, তাইনা দিশা? চলো হাঁটি, সরলপথে, বক্রপথে, ভাঙা পথে সাঁকো বানাই।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ঠান্ডা পড়েছে বেশ। দিশা একটু উষ্ণতার আশায় বাহু ধরে হাঁটছে। কিছু বলছেনা। আমরা দু'জনেই হাঁটছি নিঃশব্দে, উদ্দেশ্যহীন। কিছু নিরবতা কথা বলে, অজানা যাত্রার শেষও থাকে। বেতার হৃদপিন্ড যোগাযোগ ব্যবস্থায় খবর পৌঁছায় দু'টো মনে। শুধু খবরও না, নির্ভরতা ফুলের ঘ্রাণও পাঠায় সে। দিশা বাহুতে হাত রাখতেই আমি নির্ভরতার ঘ্রাণ পাচ্ছি। দিশাকে প্রশ্ন করতে মন আনচান করছে, ' দিশা তুমি কি নির্ভরতার ঘ্রাণ পাচ্ছো?' কিন্তু এতে নিরবতা আর কথা বলবেনা। থাকুক! আপাতত নিরবতা কথা বলুক। আমার বিশ্বাস গাছ পাতা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলো, ' দিশাও পাচ্ছে, ভীষণ করে নির্ভরতার ঘ্রাণ!' আর অজানা যাত্রার স্টপেজ? সে না হয় অন্য কোনোদিন...
লেখা: রাফি আদনান আবির
----

চার মাসের একটা সেমিস্টার শেষে আমার রেজাল্ট দেখতে ইচ্ছে করেনা। আমি পরীক্ষা দিয়েই বুঝে যাই আমি কেমন রেজাল্ট করতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাতটি সেমিস্টার এভাবেই কাটিয়েছি। আমার কোনো ধরণের ফলাফলের প্রতিই কোনো আগ্রহ কখনো ছিলোনা।
.
তবে এবার একটা ভিন্ন সেমিস্টার কাটিয়েছি। ক্যালেন্ডারের পাতায় একশ বাইশ দিন গুণেছি। প্রতিটি দিন ছিলো আলাদা অ্যাসাইনমেন্ট, ভিন্ন ধাঁচের কুইজ, ভিন্ন ধারার ল্যাব রিপোর্ট। এটা গতানুগতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষা ছিলোনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চলতি সেমিস্টারগুলোতে তো দুই মাস পর মিড টার্ম, তারও দুই মাস পর ফাইনাল। এই ভিন্ন ধারার সেমিস্টারে আমাকে রোজ পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
.
কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক পরীক্ষার দিনের গল্প। পরীক্ষার খাতার শুরুতে নাম পরিচয় দিতে হয়। আমিও দিচ্ছি। আমি রূপক। পড়ছি প্রেমে, সেমিস্টার- এখনো শুরুই হয়নি। রোল নাম্বার- ১০১ আর শাখা: রিনি’র চোখ!Bangla Book Online 
.
এবার বিস্তারিত আসি। সংবাদ পাঠকের মতো বিরতি নিবোনা। সরাসরি চলে যাচ্ছি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আসা রিনি ইতোমধ্যেই ক্যাম্পাসে সবার মনে ঝড় তুলেছে। না, সে সভ্যতার বিবর্তনে গা এলিয়ে দেয়া আধুনিকমনা মেয়ে নয়। কলেজ পর্যন্ত মফস্বলে শেষ করে আসা অত্যন্ত সহজ সরল ধাঁচের মেয়ে, যার চুলে গতরাতের তেলের গন্ধ পেছন পেছন ঘুরলেই পাওয়া যায়। আমি তো পড়াশোনা সেই কব্বেই ছেড়ে দিয়েছি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে আমার মাথায় সফট কিছু না ঘুরে না। বরং ঘুরতে থাকে মেটাল গান, প্রেমের কিংবা খুনের গল্প সহ আরও কত কি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বলেই বোধহয় মাঝে মাঝে আফসোস হয়, কি করলাম এই জীবনে। কিন্তু তাও নিজেকে বদলাতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে লিখি, পত্রিকার পাতা, ইন্টারনেটের পাতা যখন যেটা খালি পাই লিখে ফেলি। আমার ভাল্লাগে।
.
তো সমরেশ, সুকান্ত, রবীবাবু, শীর্ষেন্দুদের বই পড়তে যেয়ে অনেকদিন পর আমি পড়ে গেছি প্রেমে! তাও এই তেলের গন্ধে হেঁটে বেড়ানো রিনির প্রেমে। ছিমছাম, বেনি করা চুল এসবে আমার নজর কাড়েনি অতোটা। এক কথায় এগুলো আমার মেজর সাবজেক্ট নয়! ( ভার্সিটির ভাষায়)
.
আমার বিষয় হলো , রিনির চোখ। ম্যাথ কোর্সে দুইবার ফেইল করেছি বুঝতে না পেরে। ডিফারেন্সিয়েশন, ইন্টিগ্রেশনে আমার মাথা আউলে যায় এক্সাম হলে গেলেই। এই চোখ জোড়াও ম্যাথের মতো। ভাষা বোঝা যায়না। তবে অনেক বিশেষণ দেয়া যায়। প্রজাপতি, পদ্মপুকুর ইত্যাদি। আমাকে এ চোখ জোড়া পড়তেই হবে, পড়তেই হবে!
.
রোল নাম্বার এক হতে পারিনি। হয়েছি একশ এক! তাও এই সংখ্যা নিতান্ত অনুমান নির্ভর। হাজিরা ডাকার নিয়ম না থাকায় আমার প্রকৃত রোল জানা হয়নি। জানার চেষ্টাও করিনি, জানলে দেখা যেতো রোল নাম্বার দুইশ ছড়িয়ে গেছে।
.
যাই হউক, আমাকে তো পড়তে হবে। রিনির জন্য দিনভর অপেক্ষা করার পর জানতে পারি তার সেদিন ক্লাসই নেই। আবার অপেক্ষা করে সামনে পেলেও আমি কথা বলতে পারছিনা। খুব প্রিয় বই পড়তে হলে কাঠখড় পোড়াতে হবে এটা স্বাভাবিক। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমি ভর্তি হওয়ার সুযোগটা পাচ্ছিলাম। রিনির যে বন্ধুবৃত্ত তৈরী হয়েছিলো, সে বন্ধুবৃত্তে থাকা জুনিয়র ছেলেদের জম্পেশ খাইয়েছি। বুঝিয়ে দিতে হবে, আমি তাদের দুলাভাই হলে তাদেরই উপকার!
.
এভাবেই কয়েকদিনের মধ্যে রিনির সাথে কথা বলার সুযোগ পাই। দুঃখের ব্যাপার, সব কথার শেষে ভাইয়া।
‘ ভাইয়া, পরীক্ষার জন্য টেনশান হয়’
‘ পরীক্ষা কোনো টেনশানের বিষয় না। ভালো করে পড়বা আমার মতো’।
‘ ওহ ভাইয়া আপনি অনেক পড়েন?’
‘ শুরু করেছি’
‘ আপনার নিশ্চয়ই সিজিপিএ অনেক ভালো?’
চুপসে গেলাম। হতে পারে তার চালাকি। সুন্দরী মেয়েদের ছেলেদের ন্যাচার মুখস্থ থাকে। ধারণা করছিলো ভবিষ্যৎ কথাগুলোতে আমি ফ্লার্ট শুরু করবো, তাই সিজিপিএ জিগেস করে আমাকে শুধু বোবা করে দিলো।
.
বোবা হয়েছি, কানা হইনি। ওই চোখের রহস্য খুঁজে বের করতেই হবে। নতুন ঢাকায় আসা মেয়ে চোখের সামনেই ঢাকায় মানিয়ে নিলো। আমার মতো ছেলেকে মানিয়ে নিতে পারবে না? পারবে।
.
ঝোপ বুঝে কোপ মারতে কোনো ভুল করিনা আমি। দ্রুত ক্যাম্পাসের বাকি একশ ছাত্রকে কাটিয়ে একদিন আমি সরাসরি ভর্তির আবেদন করলাম।
‘ রিনি একটা লজ্জার কথা বলি?’
‘ জি ভাইয়া অবশ্যই’
‘ আমি আসলে ভার্সিটির বাইরের একটা সাবজেক্টে পড়তে চাচ্ছিলাম, তো সেজন্য আমার একটা অ্যাপ্লিকেশন করতে হবে। করেছিও বটে স্মার্টনেস ঝাড়তে যেয়ে ইংলিশে লিখে ফেলেছি। কিন্তু আমি ইংলিশে প্রচন্ড কাঁচা। তুমি কি আমার অ্যাপ্লিকেশন পড়ে একবার দেখে দিবে কোনো ভুল আছে কিনা?’
রিনি অবলীলায় রাজি হলো। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে তাকে একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখে পাঠিয়েছি। তার বরাবরে, ঠিকানা দিয়েছি আমার হৃদপিন্ড। বিষয় লিখেছি চোখের ভাষা পড়তে চাই।
রিনি সেই মেসেজটার কোনো উত্তর করেনি। পরদিন ভার্সিটিতে দেখে এড়িয়ে গেছে, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু দু’দিন পর আমাকে ডেকে নিলো লাইব্রেরিতে।
‘ এর আগে কতজনকে এরকম মেসেজ দিয়েছেন?’
‘ একজনকেও না’
‘ অবিশ্বাস্য!’
‘ আমি কখনো একটা থিওরি দুই জায়গায় ব্যবহার করিনা। সবার তো চোখ পড়তে চাইনা। কারো আঙুল, গাল, ঠোঁট...’
‘ ছিঃ ! যাই হউক, কাজে দিয়েছে?’
‘ নাহ। তবে এটাই শেষ। আর না’।
‘ আমিও তাই ভাবছি’
‘ মানে তুমি রাজী?’
‘ আপনি তো পড়তে চেয়েছেন। পড়বেন, পরীক্ষা দিবেন। অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ সবই দিতে হবে। তারপর না রেজাল্ট!’
.
আমি একটু অবাক হই। গ্রাম থেকে আসা মেয়ে রীতিমতো আমাকে হাতের তালুয় রেখে নাচানোর ধান্ধা করছে! কিন্তু আমার মতো মানুষও কারো প্রেমে এভাবে হাবুডুবু খেতে পারে, ভাবলেই অবাক লাগে। এ ব্যাপারে এস্পার ওস্পার করা লাগবেই। রিনির সেমিস্টার ভিত্তিক প্রেমের পরীক্ষায় রাজী হয়ে গেলাম। জানিয়ে দিলো, প্রতিযোগী আমি একা নই।
প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট মারাত্মক রকমের বাজে হয়েছিলো। অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় ছিলো, ঠিক রাত তিনটায় তার হোস্টেলের সামনে দাঁড়ানো। ব্যালকনিতে সে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু আমি পারিনি, ঘুমের ঘোরে আমার সকাল হয়ে যায়।
.
হতাশা কাটাতে রিনি আমাকে উৎসাহ দেয়। একটা অ্যাসাইমেন্ট গেলে সমস্যা নেই। বি সিরিয়াস! আমি বি সি ডি সবই সিরিয়াসলি দেখা শুরু করি। এভাবে কোনোটা ভালো কোনোটা খারাপের মিলমিশে আমি মিড টার্ম পর্যন্ত যাই। রিনি ততদিনে আমাকে নাম ধরে ডাকে।
.
‘ রূপক, তোমার মিড টার্ম হলো আমার সাথে ফুচকা খাওয়া’
‘ বাহ! এটা তো খুব সহজ পরীক্ষা। ফুচকা আমার ভীষণ প্রিয়’
‘ শুধু একটাই শুনলে। বাকিগুলো শোনো’
‘ দিয়াবাড়ির মোড়ে আইসক্রিম দোকানটায় টানা আমি আইসক্রিম খাবো আর তুমি দেখবে’
‘ আরে এটা কোনো বিষয় হলো?’
‘ শেষটা কঠিন হবে। সেদিন সারাদিন তোমার কোনো সিগারেট খাওয়া চলবেনা’।
এবার আমি ফেঁসে গেলাম। তবে পরীক্ষাই তো। দিয়েই দেখিনা। দিলাম, অসংখ্য ফুচকা, আইস্ক্রিম খাওয়ার ফলে পেটের সাথে শান্তি নিকেতনের বেশ ভালো সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেলো। রিনি কে জিগেস করলাম, ‘ এখন পর্যন্ত আমার অবস্থান কেমন?’ রিনি বললো না। একসাথেই ফলাফল প্রকাশ করবে। মিড টার্মের শেষে ফাইনালের আগে শেষ ল্যাবরেটরির কাজ হলো রিনিকে সিগারেট খাওয়া শেখাতে হবে। এবং এটাতে আমি চরম ব্যর্থ হলাম। ব্যর্থতার জেদে নিজেই সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যদিও ছাড়তে পারিনি, চেইন স্মোকার থেকে চুড়ি স্মোকারে এসেছি।
.
ফাইনাল এক্সাম। মৌখিক পরীক্ষা হবে পার্কের পাতানো সিমেন্টের চেয়ারে বসে। একজনকে ভালোবাসতো রিনি। গ্রামের ছেলে শহরে এসে বদলে যায়। বদলে যাওয়ার ধারা অব্যাহত রেখে দু’ বছরের সম্পর্কে বিচ্ছেদ এনে ছেলেটি তার জীবন জড়িয়ে নিয়েছে অন্য একটি মেয়ের সাথে। রিনির মনের কোথাও এখনো সে বেঁচে আছে। রিনির প্রশ্ন ছিলো-
‘ তুমি ওর সম্পর্কে আরও অনেক কিছু যখন জানবে, তখন তোমার কেমন মনে হবে?’
‘ অনেক ভালো। মানুষ তাকেই তার মনের সব ব্যথা বলে, যাকে সে মনের মানুষ ভাবে। তোমার জমানো সব ব্যথা আমাকে বলবে এটা তো আমার ভাগ্য!’
‘ যদি কখনো সে এসে ক্ষমা চায়, আমি ক্ষমা করে দিবো, তার কাছে চলে যেতে চাইবো’
‘ ভালোবাসা মানেই তোমাকে আমার পেতে হবে তা না। ভালোবাসা মানে তোমাকে ভালো দেখা। তুমি যখনই চাও তখনই যেতে পারো’।
‘ তাহলে কেমন ভালোবাসো? যাকে ধরেই রাখতে পারোনা?’
‘ ভালোবাসা পশু নয় যাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে। ভালোবাসা আকাশ সমুদ্রে ঢেউ তোলা মেঘের মতো। বৃষ্টি কিংবা রোদ ঝলমল। আমি যদি কখনো তোমার রোদ ঝলমল করা মেঘ হয়ে যাই, মাথার উপর প্রশান্তির ছায়া হয়ে থাকি, তখন তুমিই এ ছায়ার মায়ায় পড়ে যাবা’।
‘ হ্যাঁ! এখন এসব বলছো, চলে গেলে তখন তো অন্য ছেলেদের মতো বকাঝকা করবা’
‘ আরেকটা উক্তি দিই। ভালোবাসা হলো গাছ। একবার শিকড় ছড়িয়ে গেলে শুধু বাড়বেই। সার দিতে হয়, পানি দিতে হয়, যত্ন করতে হয়’।
‘ মেয়ে পটানোর জন্য ভালোই কথা রপ্ত করেছো!’
‘ আমার রেজাল্ট?’
‘ গাধা নাকি? সাতটা সেমিস্টারে আদৌ পাশ করেছো? জানোনা রেজাল্ট দিতে কিছুদিন দেরি হয়? আগামী এক সপ্তাহ তোমার ছুটি, আমার সাথে তোমার দেখা হবেনা। ঠিক সাত দিন পর দুপুর বারোটায় একটা সাদা কাগজে রেজাল্ট শীট দিবো তোমাদের সবার। যারা পরীক্ষা করেছে’।
.
আমি অবাক হলেও বুঝতে দিইনি। রিনি যদি বুঝে এই ব্যাপারটা নিয়ে মনে হিংসা কাজ করছে তবে হীতে বিপরীত হতে পারে। আমাকে ক্ষুদ্রমনা ভাবতে পারে। মেয়েদের সাইকোলোজি কখনোই হিংসুটে ছেলেকে প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করেনা। তাদের ধারণা, দুনিয়ার তাবৎ হিংসে শুধু তারাই করতে পারে।
সাত দিন পর ছাদখোলা রেস্টুরেন্টে একা বসে মাথার চুলে বিলি কাটছে। মাথাব্যথা জেঁকে ধরেছে। মাথার উপর তীব্র রোদ, চাইলেও কিছু করার নেই। এটাও আমার পরীক্ষার অংশ। দুপুর গড়ায়। বারোটা, একটা, দুইটা... বিকেল হয়। সূর্য চলে যাবে যাবে ভাব। রিনির ফোন বন্ধ। টেনশানে এক প্যাকেট সিগারেটের অর্ধেকটা হাওয়া! এগারো নম্বর সিগারেটে আগুন দিয়েই থতমত খাই। ধোঁয়া উড়ে যাওয়ার পর দেখি, একটা খাতার সাদা পাতা।
.
‘ এত্ত দেরী কেন?’
‘ এমনিই’
‘ এর কোনো মানে হয়না রিনি! চারটা মাস আমি এভাবে কোনো সেমিস্টারেও করিনি’
‘ রেগে যাচ্ছো?’
‘ রাগবো না? আমি তো মানুষ তাই না?’
‘ আমি তো তোমাকে বলিনি কিছু’।
‘ কিন্তু এভাবে টেনশানে কেন রেখেছো?’
‘ আর রাখবোনা’
‘ নিশ্চয়ই পরীক্ষায় ফেইল করেছি তাইতো? আমার কপালটাই এমন জানো? ভর্তি পরীক্ষা থেকেই কপালে ফাটা শুরু হয়েছে’।
‘ তার আগে?’
‘ সেসব বাদ দাও। তাহলে আমি যাই। আর হ্যাঁ এই ব্যাপারটা আমার ইগোতে আঘাত করেছে’।
‘ এতদিন বলোনি যে?’
‘ ভেবেছিলাম চান্স পাবো। প্রতিযোগীতার ভিড়ে আমার আবার চান্স!’
রিনির বাঁশের কঞ্চির মতো হাত আমার দিকে এগিয়ে দেয়। ‘ বারোটায় এসেছো, একটা থেকে ছয়টা, পাঁচ ঘন্টায় এগারোটা সিগারেট? চাকরিতে ঢুকলেই প্রভিডেন্ড ফান্ডের নোমিনি আমার নামে করবা’- শাসানো গলায় আমাকে বললো।
‘ তোমার নামে কেন করবো?’
‘ যে হারে খাও, ভেতরে তো কয়লা সব। মরে গেলে আমি চলবো কেমনে হ্যাঁ? বিয়ে তো জীবনে একবারই করতে হবে’
আমার চারপাশ ঘুরছিলো। দুপুর থেকে কিছুই পেটে যায়নি। ক্ষুধার জ্বালা নাকি নিজের কানকে নিজে অবিশ্বাসের কারণে এমন হচ্ছে বুঝলাম না। বোবা হয়ে গেলাম। কথা বলতে পারছিনা। রিনি কাগজটা এগিয়ে দিলো আমাকে।
‘ বিষয়: প্রেম , শাখা: চোখ । স্থান: প্রথম। মোট পরীক্ষার্থী: ০১’
.
কাগজটা দেখি আবার রিনিকে দেখি। রিনি ধীরে ধীরে নিচে তাকায়। লজ্জায় অথবা শংকায়। কাগজটার উল্টো পিঠে কিছু লেখা আছে। ‘ ভেবোনা প্রেম করতে চেয়েছো আর প্রেমের অনুমতি দিয়েছি। মেয়ে বলে কি প্রেমে পড়া যায়না? প্রেমে পড়ে ভীষণ চিন্তায় ছিলাম। তবে ব্যাটে বলে মিলে গেলো। তুমিও পড়েছিলে। কিন্তু সহজে পাওয়া জিনিস তো মূল্য দেয়না মানুষ। আমিও সে দলের বাইরে নয়, খুব সহজে পেয়ে গেলে তোমাকে ভালোবেসেও দূরে থাকার ব্যথাটা বুঝতে পারতাম না। হারিয়ে ফেলার ভয় তৈরী হতোনা। তাই আগেভাগেই বুঝে নিয়েছি তোমাকে ছাড়া সাত দিন কাটানো সাত কোটি বছরের সমান হয়ে গেছে! যদি অনুভুতিতে গরমিল না থাকে, হয়তো তোমারও এমন হয়েছে। সিগারেট খাওয়ানো শেখাওনি বলে ভেবে নিওনা সেটাতে ফেইল, সেটাতে ফুল মার্কস দিয়েছি আমি! আর প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেও ফুল মার্কস। রাত তিনটায় হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে পরদিন থেকেই ভুলে যেতাম। মধ্যরাতে বাসা থেকে বের হওয়া মানে তোমার ভেতর গন্ডোগোল আছে ধরে নিতাম। আর ফাইনাল এক্সাম? শুধুমাত্র চেখে দেখলাম মনের সাথে কতটুকুন মিল। যদি আমাদের অনেক কালের পরিচয় থাকতো, তবেই না আমরা একে অপরকে চিনতাম। চেয়েছিলাম তোমাকে জানতে। চেনা জানায় এত ব্যস্ত হয়েছিলাম কখন যে ডুবে গেছি বুঝতেই পারিনি। ভয় পেওনা, আমাকে অন্য কারোর দাবী করে কখনোই কেউ আসবেনা, সে সুযোগ নেই। আমি জীবনে সবকিছুই প্ল্যান করে করি। প্রেম বিদ্বেষী ছিলাম না, তবে একটাই প্রেম করতে চেয়েছি। আগে করলে ভাঙার সম্ভাবনা বেশি। পৃথিবীর নিয়মানুযায়ীই আমি একটু জাজমেন্টাল চলি’।
.
এত্ত বড় লেখা পড়ার সময় রিনির দিকে তাকাইনি। পড়া শেষে তাকিয়েছি। আবেগী হওয়া উচিত কিন্তু হাসি পাচ্ছে ভীষণ। ফুচকা জীবনে প্রথম খেয়ে পেটের অবস্থা কি হয়েছিলো রিনিকে বলে দিলে রেগে যাবে? আমি আবার মিথ্যা বলতে পারিনা!
‘ তাহলে আমি পাশ?’
‘ ভর্তি পরীক্ষায় পাশ’।
‘ মানে? আরোও আছে?’
‘ কয়টা সেমিস্টার বাকি?’
‘ আর চারটা’
‘ সিজিপিএ কত?’
‘ তিন... উমম একটু কম বোধহয়!’
‘ হবেনা, বাবা বিয়ে দিবেনা। দিলেও করবোনা’।Bangla Book Online 
‘ আমার চোখ পড়তে হলে ক্লাসের লেকচার পড়তে হবে। থিসিস দিতে হবে, এক ধাক্কাতেই একটা চাকরি। খুব বড় লাগবেনা, মোটামুটি হলেই চলবে। আমিও করবো তো!’
‘ একবার তোমাকে দিয়ে দেখো, পৃথিবীর তাবৎ সিজিপিএ এর বন্যা বয়ে যাবে’
‘ বন্যা লাগবেনা। বন্যায় ভেসে হারিয়ে ফেলতে খুঁজে নিইনি। শেষ পর্যন্ত বেঁধে রাখতে চাই, যদিও তুমি গরু ছাগল নও। আস্ত গাধা’।
গাধা বলার কারণ ছিলো তখনও রিনির হাত ধরিনি। কাঁপা হাতে রিনির হাত ধরি। উঁচু দালানের ছাদে দাঁড়িয়ে হৃদপিন্ডের চিরস্থায়ী মালিকের সাথে শহুরে বিকেলের দূষিত বাতাসেও কেমন যেন সুখের ঘ্রাণ পাচ্ছি আমি। আমার ভালো লাগছে। বাতাসে রিনির চুল নাকে, চোখে লাগছে! আরেহ ! এই তেল দেয়া মেয়ে চুল স্ট্রেইট করে ফেলেছে। শ্যাম্পুর ঘ্রাণে ম ম করছে। আমার নেশা লাগছে, ঘোর লাগছে। সন্ধ্যে বেলায় রিকশাটাকে দ্বীপের মতো মনে হলো। যেখানের বাসিন্দা আমি আর রিনি। রিকশাওয়ালাকে বাদ দেয়া যাচ্ছেনা তবে মনে মনে বাদ দিই।
রিনি আমার দিকে তাকায়, চোখে চোখ পড়লেই সরিয়ে নেয়। আমি তাকালেও একই অবস্থা। সুনসান নিরবতা। হাতের কাঁপন বন্ধ হচ্ছে ধীরে ধীরে। রিকশাওয়ালা হাঁপিয়ে জিগেস করে, ‘ মামা কোনদিক যামু?’
আমার উদাস কন্ঠ রিকশাওয়ালাকে জানায়, ‘ নিয়ে যাও যেদিকে চোখ যায়। আজকের পৃথিবী সুন্দর। নাগরিক শহরে প্রেমিকের আজ বাঁধ ভেঙেছে, প্রেমিকার চোখের ভাষা পড়তে পড়তে পাগল হয়ে যাচ্ছে, মাতাল হচ্ছে, অতলে ডুবে যাচ্ছে’।
.
রিকশাওয়ালা আরেকবার আমাদের দিকে তাকালো। ‘ মামা কাজী অফিস আইয়া পড়ছি’- আমাদের দু’জনের এবার সত্যিই ঘোর ভাঙলো। ধুর ছাই! অতিরিক্ত চালাক রিকশাওয়ালার পাল্লায় পড়েছি। আমার রেগে যাওয়া উচিত। আমি রাগছিনা। শহরের নতুন অতিথী রিনি রাস্তা কম চেনায় কিছু বলছেনা।
রিকশাওয়ালাকে বললাম, ‘ কাজী অফিস লাগবেনা মামা। সে আরও বহুদূর পথের বাকি। আরও অনেক পরীক্ষা। রিনির কাছে পরীক্ষা, নিজের কাছে পরীক্ষা, ভাগ্যের কাছে পরীক্ষা। সব পরীক্ষায় পাশ করলে তবে কাজী নিজেই দৌড়ে যাবে আমাদের কাছে। তুমি ইন্দিরা রোড নিয়ে যাও। ওকে হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে ধানমন্ডি যাবো। আর রিকশা বদলাবোনা’।
আমি মোটেও রাগলাম না। বুকের ভেতর একটা হাহাকার তৈরী হলো। ভালোবাসলেই কি হারিয়ে ফেলার ভয় ফ্রীতে পাওয়া যায়? মাত্র অনুমতি প্রাপ্ত ভালোবাসা পেয়ে দিন না পেরুতেই হারানোর ভয়ে কেন দীর্ঘশ্বাস ফেললাম? রিকশা অন্ধকারে ফার্মগেট ইন্দিরা রোডের দিকে আগাচ্ছে। রিনি মাঝে মাঝে হাতের পিঠে হাত রাখে আবার সরিয়ে নেয়। এ স্পর্শ আমাকে কেমন শীতল করে দেয়। রিনিকেও দেয়? হারানোর ভয় তার কাজ করে? করছে। হোস্টেলের পথ এগিয়ে আসতেই রিনির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, আমার জন্য ভেতরটা জুড়ে বাতাস বইছে। আরও কিছুক্ষণ থাকতে চাইছে কিন্তু বলবেনা। অবশ্য কখনোই বলবেনা। কয়েক মাস কেটে গেলে বলবে, '‘এখন তো পুরানা হয়ে গেছি তাই আমার সাথে ভাল্লাগেনা'’। তারও কয়েকমাস পর এমনই কোনো সন্ধ্যায় বলবে, ‘ খুব ব্যস্ত তাই না?’
আমাকে এগুলো বুঝে শুনে উত্তর দিতে হবে। প্রেম পেয়ে হারিয়ে ফেললে সে ব্যথা মুছে ফেলা যায়না। আমি রিনির ব্যথা নিয়ে নয়, কথা নিয়ে, রাগ মাখা কন্ঠ শুনে কাটিয়ে দিতে চাই। পড়া: প্রেম, সেমিস্টার: চোখ’র মতোই মন, কান, নাক, ঠোঁট সব কিছু পড়বো রিনির। প্রতিটি চুল পড়বো। অনেক বৃদ্ধ বয়সে সাদা চুল পড়তে গিয়ে ছেলে- মেয়েরা মায়ের নামে বিচার দিলে কিংবা মায়ের নামে সুনাম করলে একটাই কথা বলবো, ‘ মায়ের কাছে মাসীর গপ্পো? তোদের মায়ের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ, সব ব্যাপারে পড়া আছে আমার! থিসিস করেছি, থিসিস! সিজিপিএ চারে চার! ভীষণ মনোযোগী ছাত্র ছিলাম প্রেমে’।
লেখা: রাফি আদনান আবির
SHARE

Author: verified_user