Wednesday

ভয়ংকর পথ - আহসানুল হক শোভন | Bangla e book

SHARE

ভয়ংকর পথ - আহসানুল হক শোভন | Bangla e book

   


[এক]
রিনি আতিককে শুরুতেই বলেছিলো এভাবে আসার প্রয়োজন নেই। আতিক রিনির কোনো কথা শুনলে তো! চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথের দূরত্ব কি মুখের কথা? এতটা পথ ড্রাইভ করে আসার কি কোনো প্রয়োজন ছিলো? সারাক্ষণ খালি এ্যাডভেঞ্চার, আর এ্যাডভেঞ্চার। আতিক বলেছিলো, সন্ধ্যার আগে ওরা ঢাকায় পৌঁছে যাবে। এখন কি হলো? রাস্তায় কয়েক জায়গায় জ্যামে পড়ায় এখন চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। সামনে আবারও জ্যাম। আল্লাহ্ই জানেন, ঢাকায় কখন পৌঁছাবে!
আতিকের চাকরীর সুবাদে রিনি চট্টগ্রামে থাকে। বাবার বাড়ি ঢাকায়। আতিক একটা কাজে ঢাকায় যাবে, সেই সুযোগে রিনিও সাথে যাচ্ছে। দুটো দিন বাবার বাড়িতে কাটিয়ে দেয়া যাবে।
“এই শুনছো! অন্ধকার হয়ে এলো তো। আর কতক্ষণ?”
বুঝতে পারছি না! ঈদের সময় ছাড়া এত জ্যাম কখনও দেখিনি।
“তাহলে এখন কি করবে?”
সামনে একটা শর্টকাট আছে বলে জানি। বড় বাসগুলো ওই রাস্তায় ঢোকে না। দেখি ওই শর্টকাট দিয়ে ট্রাই করবো।
আরেকটু সামনে এগোতেই হেডলাইটের আলোয় বামে একটা সরু রাস্তা চোখে পড়লো আতিকের। পেছনে অনবরত অন্যান্য গাড়ির হর্ন পেয়ে সাত-পাঁচ না ভেবে সেই রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে দিলো আতিক। রাস্তাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারপাশে জঙ্গলা গাছ-গাছালি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।
“কি হলো! এই রাস্তায় তো একটা লাইট পোস্টও নেই। তুমি এই রাস্তা চিনো তো?”
হুম! অনেকদিন আগে একবার এই রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলাম! আমতা আমতা করে বলে উঠে আতিক।
আতিক নিজেও নিশ্চিত নয়, এটা সেই রাস্তাটাই কিনা! এর আগে একবার দিনের বেলায় গিয়েছে। তখন রাস্তাটা এমন জঙ্গলা প্রকৃতির ছিলো না।



Bangla e book


“এ্যাই! এ্যাই! সামনে তাকাও!”
তীব্র গলায় চিৎকার দিয়ে ওঠে রিনি।
হেডলাইটের আলোয় রাস্তার মাঝখানে কি যেন একটা দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেলো। ঘটনার আকস্মিকতায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা থেকে আরেকটু হলে জঙ্গলার ভেতর গাড়ি নিয়ে ঢুকে যেতো আতিক।
“স্টপ শাউটিং, রিনি! ইউ আর গেটিং অন মাই নার্ভস!” গাড়ি থামিয়ে রিনির দিকে ফিরে বলে ওঠে আতিক।
তুমি দেখে চালাবে না? উল্টাপাল্টা রাস্তায় গাড়ি নিয়ে আসবে, আর আমি শাউট করবো না? তুমি এখানে গাড়ি থামালে কেন?”
“দেখতে হবে না, ওটা কি ছিলো?”
না, না, কোনো দরকার নেই। এরকম অন্ধকার রাস্তাতেই তো গলা কেটে ডাকাতি করা হয়। তুমি ইঞ্জিন স্টার্ট দাও।
আতিক কথা না বাড়িয়ে চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন চালু করতেই ওদের গাড়ির পেছনে কিছু একটা এসে ধাক্কা দিলো। আতিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মনে হচ্ছে আরেকটা গাড়ি। হেডলাইট অফ করে রেখেছে। এই অন্ধকারে হেডলাইট অফ করে ড্রাইভ করছে কিভাবে?
“আমি বলেছিলাম না? এখন হলো তো। আজ ডাকাতের হাতে বুঝি জানটা খোয়াতে হবে।”
আহ! তুমি চুপ করো তো। আমি দেখছি।
“এই যে ভাই, আমাদের গাড়ির পেছনে ধাক্কা দিলেন কেন? আর এই অন্ধকারে হেডলাইট না জ্বালিয়ে ড্রাইভ করছেন কিভাবে?” জানালা দিয়ে মাথা বের করে পেছনে তাকিয়ে আতিক চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে।
পেছনের গাড়ি থেকে কোনো জবাব আসে না। তবে গাড়িটা একটু পিছিয়ে গিয়ে আবারও ফিরে এসে ধাক্কা মারে।
“এই যে! এই! এই! কি, হচ্ছে কি এসব?”
তুমি চলো তো। ওই গাড়িটা ভালো কোনো মানুষ ড্রাইভ করছে না। নিশ্চয়ই ডাকাত দলের গাড়ি। তুমি চলো তো।


রিনি সাথে থাকায় আতিক কোনো রিস্ক নিতে মন থেকে সায় পায় না। আতিক ইঞ্জিন চালু করে সামনে এগোতে থাকে।
“আতিক! ওই গাড়িটা আমাদের পেছন পেছন ফলো করে..”
রিনি তার মুখের কথা শেষ করার আগেই ওরা তীব্র একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলো। এবার চলন্ত গাড়িতে ধাক্কা দেয়ায়, ধাক্কাটা আগের চাইতে অনেক জোরে অনুভূত হয়েছে।
“আতিক, তুমি স্পিড বাড়াও। ওরা যেন আমাদের ধরতে না পারে।”
আতিক গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দেয়। এ মুহূর্তে গাড়ির গতি প্রায় আশি কিলোমিটার। তবু খুব একটা লাভ হয় না। একটু পর আবার ঝাঁকি!
রিনি চিৎকার দিয়ে ওঠে। আতিক কোনো রকমে তাল সামলায়। গাড়িটা এবার ওদের বামে চলে এসেছে। রিনির দিকটায়। রিনি সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে।
আতিক ঘাড় ঘুরিয়ে বামে তাকায়। ওপাশের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তাহলে গাড়িটা চালাচ্ছে কে? ভাবতে ভাবতেই আবার পাশ থেকে প্রচন্ড জোরে আরেকটা ধাক্কা।
এবার আতিকের করার কিছুই ছিলো না। ধাক্কা খেয়ে ওদের গাড়িটা রাস্তা থেকে পড়ে উল্টে গেলো। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবার আগ মুহূর্তে আতিক অনুভব করলো ওর ভেতর কেমন যেন একটা তোলপাড় ঘটে যাচ্ছে। এরপর আর কিছু মনে নেই।
[দুই]
“স্যার! ও স্যার!”
আতিক চোখ মেলে তাকায়। নিজেকে রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করে যারপরনাই অবাক হয়। চোখের সামনে লুঙি পরিহিত হালকা পাতলা গড়নের একজন লোক বসে আছে। আতিক চোখ মেলতেই লোকটার পান খাওয়া দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ে।
“যাক! আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শোকর। দুইজনেই জানে বাঁইচ্যা গেছেন।”
রিনি! আমার স্ত্রী কোথায়?
“ওই যে! ম্যাডামও সুস্থ্য আছেন।” আঙুল তুলে একটা গাছের নিচে কয়েকজন গ্রাম্য মহিলার সঙ্গে বসে থাকা রিনিকে দেখিয়ে দেয় লোকটা।
আতিক উঠে দাঁড়ায়। শরীরে কোথাও কোনো ব্যথা অনুভব করছে না। তেমন কিছু হয়নি বলেই মনে হচ্ছে।
“স্যার, আপনেরা এই রাস্তা দিয়া আইতে গেলেন ক্যান? এই রাস্তাডা তো ভালো না। রাইতের বেলায় চোর ডাকাইতেরাও ডরে এই রাস্তায় আহে না।”
কেন? কাল রাতে তো আমাদের একটা গাড়ি..!
“হ, জানি। রাইতের বেলায় এই রাস্তায় কেউ আইলে এইডাই হয়। একটা গাড়ি আইসা ভয় দেখায়। ক্ষতি করে।”
ব্যাপারটা তাহলে আপনারা জানেন! এমন করে কেন বলুন তো? কার গাড়ি ওটা? পুলিশ ধরে না কেন?
“ভূতের গাড়ি পুলিশ ধরবো ক্যামনে?” পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে হেসে উঠে লোকটা।
ভূত?
“ঘটনাটা তাইলে খুইল্লা বলি। শুনেন স্যার। অনেকদিন আগে আপনের মত এক সায়েব হের বউরে মারনের লাইগা গাড়ি নিয়া এই রাস্তা দিয়া যাইতেছিলো। অনেক ইসপ্রিডে চালাইতেছিলো। হ্যায় চাইছিলো এ্যাক্সিডেন কইরা বউরে মাইরা ফালাইবো। আর এ্যাক্সিডেন হওনের আগে গাড়ি থাইক্যা লাফ দিয়া নিজের জান বাঁচাইবো। কিন্তু, খোদার কি লীলা দ্যাখেন। এ্যাক্সিডেনের আগে হ্যায় নামতে পারে নাই। গাড়ির দরজা জাম হইয়া গেছিলো। পরে এ্যাক্সিডেন হইছে ঠিকই, কিন্তু হের বউ না মইরা হ্যায় নিজেই মরছে। পাপীরে আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে শাস্তি দিছে।”
তাহলে এখন সমস্যা কোথায়?
“এ্যাক্সিডেনের কয়দিন পর থেইকা এই রাস্তায় রাইতের বেলা কেউ গেলে হেই গাড়িটা আইসা ধাওয়া করে। মাইনষে কয়, বউরে মারতে পারে নাই বইলা হের আত্মা মাইনষের বউয়ের ক্ষতি করোনের লাইগা ঘুইরা বেড়ায়। তাই এই রাস্তায় রাইতের বেলায় কেউ চলাচল করে না।”
আতিক কিছু বলে না।
“আপনের উল্টা গাড়ি আমরা সিধা কইরা রাস্তায় তুইলা দিছি। আপনে ইস্টাট দিয়া দ্যাখেন, চলে কিনা।”
আতিক গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। সব ঠিক আছে বলেই মনে হচ্ছে।


ভয়ংকর পথ  | Bangla e book



“স্যারে কি নিজে চালাইয়া যাইতে পারবেন?”
হ্যাঁ, পারবো। আমার তেমন কিছু হয়নি। কি বলে যে আপনাদের ধন্যবাদ দেবো। আতিক পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে।
“স্যার! স্যার! এই কাম ভুলেও কইরেন না। আমরা কেউ ট্যাকার জন্য আপনেগোরে সাহাইয্য করি নাই।”
আতিক বুঝতে পেরে টাকা বের না করে মানিব্যাগ থেকে নিজের একটা কার্ড বের করে দেয়।
“কখনও কোন প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় চলে আসবেন। রিনিকে একটু ডেকে দিন না।”
পুরোটা পথ আতিক আর রিনির মধ্যে কোনো কথা হলো না। রিনি এখনও গতরাতের ভয়ানক অভিজ্ঞতা সামলে উঠতে পারেনি।
[তিন]
বাবার বাড়িতে পৌঁছে রিনি দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিলো। কান্নার দমকে রিনির পিঠটা ফুলে ফুলে উঠছে। আতিক তার শ্বশুর-শাশুড়িকে কোনো সালাম না দিয়ে পাশ কাটিয়ে রিনির বেডরুমে গিয়ে ঢুকলো।
আতিক জানে না, ওর কি হয়েছে! ওর মাথায় বার বার শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হলো, রিনি নামের ওই হারামজাদীকে মেরে ফেলতে হবে। আতিক বাথরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা লাগিয়ে দেয়।
আতিকের শেভের জন্য বেসিনের ওপর চকচকে নতুন ব্লেড রাখা আছে। আতিক ব্লেডটা নিয়ে পকেটে পোরে। সুযোগমত রিনির গলায় ঠিকভাবে একটা পোঁচ দিতে পারলেই কেল্লাফতে। রক্তের তৃষ্ণায় আতিকের চোখ দুটো চক চক করে ওঠে।
(সমাপ্ত)







SHARE

Author: verified_user