Friday

Train Line By junayed

SHARE

রেলপথ
::যখন প্লাটফর্মে ট্রেন'টা থামলো, দুপুর তিন টা পার হয়েছে সবেমাত্র। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে খোলা প্লাটফর্ম অতিক্রম করছিলাম। চোখ আটকে গেল এক ব্যক্তির মুখের অয়বয় দেখে। সাদা দাড়িতে মুখ শুভ্রতায় ভরা। তার দুই চোখ এমন মায়াভরা! চোখ সরাতে পারছিলাম না। মাথার চুলও সফেদ সাদা। কেন যেন মনে হচ্ছিল তার সাথে আমার আলাপ করা উচিৎ।
কিছুটা এগিয়ে তার সামনে যেতেই হাত দিয়ে ইশারা করে পাশে বসতে বললেন। সুবোধ বালকের মতো বসেও পড়লাম। বললাম, "কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই আপনার সাথে, সময় হবে?"
ঘুরে বসলেন আমার দিকে। বললেন, "রোজ ষ্টেশনে বসে থাকি গল্প শোনার জন্য, বলার জন্য। কারো শোনার সময় নেই। আর আপনি নিজে থেকেই গল্প করতে আগ্রহী!"
জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি কি রিটায়ার্ড?"
--- নাহ, চাকরী করা হয়নি কোন দিন। করার চেষ্টাও করি নাই। কারণ তা আমার দরকার হয় নাই কোনকালে।
অহ স্যরি, "ছেলে মেয়েরা কি করেন?"
তিনি আকাশের দিকে দৃষ্টি রাখলেন। ঠোটের কোনে রহস্যের সামান্য হাসির রেখা। হঠাৎ বললেন, "ছেলে মেয়ে?"
বললাম, জি। সে কিছুক্ষণ নিরব থেকে ধরা গলায় উত্তর দিলেন, "সে সুখ বিধাতা সবার দেয় না বাছাধন।"
তাকে এই প্রশ্ন করে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তা বুঝতে পারলাম। তবে তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বুঝিয়ে দিলেন তিনি আমার উপর রেগে নেই।
পাশের চা দোকানী ছেলেটা চা দিয়ে গেল। লাল চা, লেবু আর আদা দিয়ে। চা খেতে খেতে যখন তার স্ত্রীর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো। তখন উঠে দাঁড়ালেন। চায়ের কাপ সেখানে রেখে আমার হাত ধরে প্লাটফর্ম ছেড়ে রেল লাইনে এসে দাঁড়ালেন। তখন বিকেল হয়ে গেছে। পুরনো এক রেলের বগি দেখিয়ে বললেন, "এই রেলের কামড়ায় আমার জন্মের পর মা আমাকে ফেলে রেখে গিয়েছেল। কেন তা বলতে পারবো না। হয়তো অবৈধ সন্তান ছিলাম মায়ের!"
তার চোখে দিকে তাকালাম, না সে চোখে জলের ছিটে ফোটাও নেই। পাথরের দৃষ্টি যেন।
হাত দিয়ে ইশারা করে একটা বস্তি মতো জায়গা দেখিয়ে বললেন, "এখানেই থাকতো দীপালী। তার বাবা ছিলেন রেল কুলিদের সর্দার। তার কয়েক বাড়ী পরের এক মায়ের হাতেই আমি বড় হই। যখন ছয় বছর বয়স তখন সেই মা মারা যাওয়াতে এক চায়ের দোকানে কাজ করতাম আর সেখানেই থাকতাম।"
বললাম, "দীপালীই কি আপনার স্ত্রী?"
বললেন, "নাহ, সে আমাকে প্রচণ্ড ভাল বাসতো। বাসতাম আমিও। তারপর যেদিন তার বাবা সব জানলেন, আমাকে রক্তাক্ত করলেন। তবুও দীপালী আমাকেই ভালবাসতো। তার বাবাও একসময় মেনে নিনেল। কিন্তু সে হিন্দু আর আমার কোন জাত? ঈশ্বর ছাড়া কেউ যানে না। আমাদের মিলনে এটাই ছিল বড় বাঁধা। যা এই বস্তির সমাজও মেনে নিতে পারে নাই। বাধ্য হয়েই তার বাবা তাকে অন্যত্র বিয়ের আয়োজন করে। আমার তেমন কষ্ট হতো না। কারণ আমার কপালে বাবা মায়ের ভালবাসাই জোটে নাই। আর স্ত্রী'র ভালবাসা! যার জাত নেই তার আবার স্ত্রী!"
তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, "বিয়ের পর দীপালীর সাথে আর দেখা হয়েছিল?"
--- "দীপালীর বিয়ে হয় নাই, বিয়ের লগ্ন ছিল রাত ১:৩০ মিনিটে। তার কিছুক্ষণ আগে যখন যমুনা ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছিল, দিপালী দৌড়ে এসে ঝাপিয়ে পড়েছিল রেল লাইনে। তার দেহ দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল রেলের চাকায় পিষ্ঠ হয়ে। রক্ত ছড়িয়ে পড়েছিল লাইনের দুই পাশে। বিশ্বাস করুন সে রক্তও ছিল এই জাত না জানা আমার গায়ের রক্তের মতোই লাল! তারপর থেকে প্রতিদিন এই রেল লাইনেই বসে থাকি। বিয়েও আর করা হয়ে ওঠেনি। কতোরাত ভোর হয় কতো ভোর আঁধারেও ঢেকে যায়। কতোজন কতো রকম কথাই বলে। আমি কোন জাতের! সে কথা কেউ বলে না! কতো জনের গায়ের সাথে ইচ্ছে করে গা ঘেঁষে গন্ধ নেই। আলাদা কোন জাতের গন্ধ আজও পেলাম না।
আমার পা কাঁপছে! কি নিদারুণ জীবনের গল্প বৃদ্ধ কতো স্বাভাবিক ভাবেই বলে গেলেন! তার হতে হাত মিলিয়ে বিদায় নিলাম। হাতটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেয়ার চেষ্টাও করলাম। আসলেও আলাদা কোন জাতের গন্ধ আমিও পেলাম নাহ।
অনেকটা দূরে এসে পেছন ফিরে তাকালাম তার দিকে। বৃদ্ধ সেখানেই স্থির দাঁড়িয়ে আছে। সাদা দাড়ি আর চুলে অসাধারণ এক ব্যক্তির দিকে অপলক তাকিয়ে আছি। কি মায়াময় এক মানুষ, অথচ তার কোন জাত নেই! জাত আমাদের কি ছিল কোন কালে?
রেজাউল রেজা
রাজবাড়ী

SHARE

Author: verified_user