Friday

ঋতুরাজ। -মঞ্জুর চৌধুরী

SHARE
                  ঋতুরাজ।-মঞ্জুর চৌধুরী

১.
শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় দিনের বাতি পুরোপুরি নিভে আসার আগে বলে ফেলা যাক কিছু অব্যক্ত কথা। বুকের ভিতরের গহীন কুয়ায় যে গল্পটিকে এতদিন খুব যতনে অন্ধকারের ভারী পর্দার আড়ালে রেখেছি, এবারে তুলে এনে তাকে সূর্যস্নান করানো যাক।
বলছিলাম আমার জীবনের প্রথম প্রেয়সীর কথা। মনিকা আহমেদ ঋত্বিকা, সবার কাছে এই নামেই সে পরিচিতা। কিন্তু আমার কাছে স্রেফ ঋতু।
সেই স্কুল জীবনের ভালবাসা। কত যুগ পেরিয়ে গেছে! আমাদের শহরটাইতো চোখের সামনে কতবার পাল্টালো। পাড়ার শতবর্ষী বুড়ো মন্দিরটার দেয়ালে বলিরেখার মতন লতানো আগাছা জমতে জমতে একসময়ে ভেঙ্গে পড়লো। এলাকার আশেপাশের উঠোনওয়ালা ছিমছাম বাড়িগুলো দেখতে দেখতেই বদলে গেল কংক্রিটের বস্তিতে। সময় নদীর তীব্র ঘূর্ণিপাক টুপ্ করে গিলে খেল আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবন। এমনকি মাথার উপরের একসময়ের বিশাল নীলাকাশের ক্রমশ ছোট হয়ে আসাটাওতো ঠেকিয়ে রাখা গেল না।
অথচ যেন সেদিন! আমার বাড়ির ল্যান্ড ফোন রিসিভারের ওপাশ থেকে সে বলল, "ভালবাসি!"
বিশ্বাস করুন, একদম স্পষ্ট মনে আছে সবকিছু। তাঁর দ্বিধান্বিত কণ্ঠস্বর, দুজনের নিঃশ্বাসের মৃদু কম্পন, আমার হৃদপিণ্ডের এলোমেলো স্পন্দন; নাকের ডগায় মুক্তার দানা হয়ে জমে ওঠা ঘাম! সব! কোন এক অদ্ভুত কারনে সময় ঠিক সেই ক্ষনে থমকে আছে আমার জন্য। মন চাইলেই আমি ফিরে যেতে পারি। তৃতীয় পক্ষ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি সদ্য কৈশোরে পা দেয়া দুই তরুণ তরুণীর বিশুদ্ধ আবেগের বাড়াবাড়ি। জীবনে এরচেয়ে সুন্দর কোন দৃশ্য নেই - জানেন? জীবনে এরচেয়ে মধুর কোন সময়ও আসেনা।
সে ছিল আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে। পারিবারিক ভাবে খুবই ঘনিষ্ঠ। আমার জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরেই সে পৃথিবীতে এসেছিল। তাই আমি হিন্দি সিনেমার এক বিখ্যাত গানের কলি গেয়ে উঠতাম, যা বাংলা করলে হবে, "তোমায় পৃথিবীতে ডাকা হয়েছে আমারই জন্যে।"
শুনে সে খিলখিল করে হাসতো।
অাহ্ সেই হাসি!
এমন হাসির জন্যেই কেবল কবি হতে ইচ্ছে করে।
ইচ্ছে করে সেই ঝর্ণার জলের সাথে তুলনা করে কবিতা লিখতে যে জল ঠোঁটে ছোয়াতে কোন পথিক তৃষ্ণার্ত বুকে অযুত নিযুত ক্রোশ পথ হেঁটে পাড়ি দেয়।
কিংবা সেই ভোরের আলোর সাথে তুলনা করতে যার জন্য জেগে কাটানো যায় নক্ষত্রহীন হাজার খানেক রাত।
আমার সারা জীবনের আফসোস, আমার কোন কাব্য প্রতিভা ছিল না। থাকলে অনায়াসে তাঁকে নিয়ে বায়রনের মতন লিখে ফেলতাম "She Walks in Beauty" কিংবা জন ডনের "The Flea।" জীবনানন্দের বনলতা কিংবা সুনীলের নীরার মতোই অমরত্ব পেত আমার ঋত্বিকা।
শুধু কাব্য প্রতিভা কেন, আমার আসলে কোন প্রতিভাই ছিল না। কিছু মানুষ থাকেনা একদমই বিশেষত্বহীন? আমি ছিলাম ঠিক তাই। বড় বড় লেখক সাহিত্যিকদের মতোই গ্রন্থগত বিদ্যায় আগ্রহ ছিল না কখনই। অবশ্য খেলাধুলা কিংবা সংগীতেও যে খুব একটা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলাম তাও না। চেহারাখানাও ছিল নিতান্তই সাদামাটা। এমন ছেলে রাস্তাঘাটে বহুত মেলে। ব্যস্ত রাজপথে দাঁড়িয়ে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই এমন দশটা ছেলে অতিক্রম করে ভিড়ে হারিয়ে যায়।
স্বাভাবিকভাবেই আমার জীবনে কোন প্রেম আসেনি। স্কুলের সহপাঠিনী একটি মেয়েকে পছন্দ করতাম। এবং আমার এমনই কপাল, পুরো ক্লাসের সবকটা ছেলেই সেই একই মেয়ের পায়ের তলে নিজের কলিজা ফেলে দিতে প্রস্তুত ছিল।
মেয়েটির গায়ের রং ফর্সা ছিল, এবং দেখতে আর দশটা মেয়ে থেকে মোটামুটি ভাল - ব্যস, ঐ বয়সে আমাদের চোখে সেই বিশ্ব সুন্দরী! ওর জন্য মরাও যায়, মারাও যায়।
আগেই বলেছি, আমি ছিলাম খুবই সাধারণ দর্শন একটি ছেলে। না ছিল মেধা, না চেহারা - কাজেই আমি একদমই পাত্তা পেলাম না। চোখের সামনেই দেখতাম মেয়েটিকে ঘিরে অন্যান্য বন্ধুদের আহ্লাদীপনা। চোখের সামনে দেখতাম ওদের সাথে মেয়েটির হাসি মুখে কথা বলা। ইশ! তখন আমার বুকের ভিতরে যে কী ঝড় বইতো তা যদি মেয়েটা জানতো! প্রতিমুহূর্তে এইভাবে মরার চেয়ে ইচ্ছা করতো মেয়েটার সামনে একদিন সত্যি সত্যি নিজেকে শেষ করে দিতে। মরে গিয়ে যদি প্রমান করতে পারি, ভালবাসি!
ন্যাকামো শোনালেও আমি কিন্তু সত্যি বলছি। তখন বয়সটাই ছিল এমন যুক্তিহীন আবেগের। কোন বোধ শক্তি কাজ করতো না তখন।
তখন আমার তেমন বন্ধুও ছিল না। শৈশবে থাকতাম ঢাকা, বাবার চাকরির সুবাদে বদলি হয়ে এলাম সিলেট। নতুন শহরে তেমন ভাল বন্ধু বানাতে পারিনি। যার সাথেই মোটামুটি পরিচয় হয়, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে এক চক্কর দিতে না দিতেই সে অন্য সেকশনে নতুন ক্লাস শুরু করে দেয়। আমি আবারও একা হয়ে যাই। সেই সময়ের কথা বলছি যখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কোন কিছুই ছিল না। মানুষের বন্ধুত্ব হতো সামনাসামনি কথা বলে। ক্লাস শেষ তো যোগাযোগও শেষ। আবার পরেরদিন স্কুলে দেখা।
এইভাবেই তিনটা বছর কেটে গেল। আমার তেমন ভাল বন্ধু জুটলো না। এবং বন্ধু ছাড়া ব্যর্থ প্রেমের আবেগের কষ্ট কার সাথেই বা ভাগাভাগি করা যায়?
ঋতু ছিল আমার ছোটবেলার খেলার সঙ্গিনী। একদম শৈশবের কথা বলছি। যখন কথাবার্তাও শিখিনি।
সেই ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড রূপসী ছিল সে। তাঁকে সবাই ডাকতো "পুতুল" নামে। টসটসে ফর্সা গাল ছিল, অল্পতেই যা লাল হয়ে যেত। ঋতুর বাবা মা দাদা দাদি সবাইই খুব ফর্সা ছিলেন দেখতে। আর তাঁর নাকটাও ছিল তলোয়ারের তীক্ষ্ণ ফলার মতন ধারালো। নীলচে চোখের মণির কারনে তাঁকে কেমন বিদেশী বিদেশী মনে হতো। মনে হতো যেন মেডিটেরেনিয়ান সাগরের ওপারের গ্রীস দেশের কোন প্রাচীন পুরানে তাঁর জন্ম। যার হালকা বাদামি চুলে জলপাই বাগানের গন্ধওয়ালা বাতাস ভূমধ্যসাগর ছুঁয়ে এসে খেলা করে। এবং এই কারণেই তাঁকে কেমন পর পর মনে হতো। সুন্দরী মেয়েদের সামনে কেন জানি সেই শৈশব থেকেই আমি সহজ হতে পারিনা। কথা এলোমেলো হয়ে যায়। জিহবা জড়িয়ে আসে। কখনো কখনোতো তোতলাতেও শুরু করি। তার উপর সে কথাও বলতো নির্দেশের সুরে। যেন কোন জমিদার গিন্নি হুকুম জারি করছেন। সেই সাথে ছিল তাঁর হাত পা চালানোর অভ্যাস। ছেলে মেয়ে কাউকেই পরোয়া করতো না। মা বাবার একমাত্র মেয়ে ছিলতো। বাড়িতে আদরে আহ্লাদে একদম বিগড়ে গিয়েছিল সে। জ্ঞান হবার পর ঋতুর সাথে তাই আমার বন্ধুত্ব কখনই জমেনি।
তাই একদিন যখন ও হঠাৎ করেই আমাকে ল্যান্ড লাইনে ফোন করে গলার স্বর নরম করে বলল আমার সাথে জরুরি কথা আছে, আমি তখন খুব অবাক হয়েছিলাম। প্রথম কথা, তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না। ঢাকা থেকে সিলেটে ল্যান্ড লাইনে কল করলে অনেক টাকা বিল আসতো। তাই কারও বিয়ে, জন্ম অথবা মৃত্যু সংবাদ বা এইরকম খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ লোকাল ছাড়া ফোন কল করতো না। আমাদের মধ্যবিত্তদের কথা বলছি আর কি। দ্বিতীয় কথা, আমার সাথে তার তেমন বন্ধুত্বও নেই। বছরে এক দুইবার দেখা হয় - যখন আমরা ঢাকা যাই তখন, আর নাহলে যখন ওরা সিলেটে আসে তখন। তাও কথাবার্তা বলতে, "তোমার ষান্মাসিক পরীক্ষার রেজাল্ট কী? অংকে কত পেয়েছো? বিজ্ঞানে?" - এই ছিল তাঁর প্রশ্ন। একটুও এদিক সেদিক নেই।
এবং আমার মার্ক্স্ শোনার পর তাঁর অবধারিত প্রশ্ন, "এত কম পেলে কেন? পড়াশোনা ঠিক মত করোনি?"
আমি খুবই অহিংসবাদী ছেলে। হিংসেবাদি হলে নিশ্চই ইচ্ছে করতো এই ফাজিল মেয়েটার গালে কষিয়ে একটা চটকানা দিতে। জানিসই যখন আমি পড়ালেখায় দুর্বল, তখন প্রতিবার আমার রেজাল্ট জানতে চাস কেন? আমার রেজাল্ট শুনে তুই কি এমন দুনিয়া উল্টে ফেলবি? এবং বেকুব মেয়েটা বুঝতেও পারেনা যে আমি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পছন্দ করি না।
কাজেই ঋতুর ফোনে আমি একটু অবাক হলাম। "পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছি" জানাটা নিশ্চই এমন কোন জরুরি বিষয় নয় যে ঢাকা থেকে ফোন দিয়ে জানতে হবে।
"কী করছো?"
"কিছু না।"
"খেলতে যাওনি?"
"আজকে যাব না।"
"কেন?"
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বলেই যেতে ইচ্ছা করছিল না। বৃষ্টির সময়ে পাড়ার ছেলেরা ফুটবল খেলে। ফুটবলতো আর খেলা হয়না, মাঝে দিয়ে কাঁদা মাখামাখি হয়। তারপর সবাই মিলে "ছরায়" (ছোট খাল বিশেষ, সিলেটিরা একে ছরা ডাকে) যায় গোসল করতে। কোন টালবাহানা নয়, যাওয়াটা বাধ্যতামূলক।
এখন আমি হচ্ছি ভীষণ শুচিবাই। এক, কাদা মাখামাখি আমার ভাল লাগেনা। দুই, যে ছড়ায় সবাই গোসল করে, সেই ছড়ায় পাড়ার সমস্ত ড্রেনের পানি গিয়ে পড়ে। এই চরম ঘিনঘিনে ব্যাপারটি কারও নজরে পড়েনা কেন আমি বুঝিনা।
কিন্তু এসব কথা বললে ঋতু হাসাহাসি করতে পারে। ফাজিল মেয়ে মানুষকে ফাজলামির উপাদান না দিতে বললাম, "আমার পায়ে ব্যথা, তাই বাসায় রেস্ট নিব।"
সে সত্যিকারের উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, "ব্যথা পেলে কিভাবে?"
আমি সেটা আর বানিয়ে বলতে পারলাম না।
"এমনিই, ওটা এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তোমার কিছু বলার আছে?"
সে একটু আমতা আমতা করলো। তারপর বলল, "আচ্ছা, তোমার কী পছন্দের কেউ আছে? মানে, কোন গার্লফ্রেন্ড?"
আমি একবার ভাবলাম ক্লাসের মেয়েটির কথা তাকে বলবো নাকি। বললে যদি বুকের উপরের চেপে বসা পাথরটা সরে!
তারপর মনে হলো থাক। ওতো আমার ইয়ার দোস্ত হয়না। ও এই উপলব্ধির গভীরতা বুঝবে না। উল্টা ফাজলামি করলে মেজাজ আরও খারাপ হবে।
"না, নেই।"
ও বিড়বিড় করে বলল, "তুমি মনে মনে কাউকে পছন্দও করোনা?"
আমি আবারও ভাবলাম বলবো। তারপর একটু অবাক হলাম, যেই মেয়ে আমার পড়াশোনার খোঁজ খবর নেয়া ছাড়া আর কোন কথাই বলে না - সে আজ হঠাৎ আমার গার্লফ্রেন্ডের খোঁজ নিচ্ছে কেন? ওর নিজের প্রেমের কথা বলবে নাতো?
আমি বললাম, "না করিনা। তুমি কাউকে পছন্দ করো?"
সে বলল, "হ্যা।"
আমি বললাম, "ও আচ্ছা।"
কিন্তু আগ্রহ দেখালাম না। নিজের জীবন প্রেমশূন্য হলে অন্যের প্রেম কাহিনী তখন গাত্রদাহের কারন হয়। লেজকাটা শেয়াল কারও লেজ দোলানো সহ্য করতে পারেনা।
সে বলল, "জানতে চাও না কে?"
অতি অনাগ্রহের সাথে বললাম, "আমি চিনি?"
"নামে পরিচিত কিন্তু আমি নিশ্চিত, তুমি তাঁকে ঠিকভাবে চেন না।"
"তাহলে নাম শুনেই বা কী করবো?"
"শুনে রাখো। তাহলে নিজে থেকেই চিনতে শুরু করবে।"
আমি ওর কথায় চমৎকৃত হলাম। ভাল ছাত্রী সে। দেশখ্যাত স্কুলে পড়ে এবং নিজের ক্লাসে প্রথম তিনজনের মধ্যে সবসময়ে থাকে। সেই মেয়ের সাধারণ কথাবার্তা আমার মতন গন্ডমূর্খের কাছে হেয়ালি মনে হবে সেটাইতো স্বাভাবিক।
"কী নাম তাঁর?"
ও ইতস্ততার সাথে খানিকটা দ্বিধা মেশানো কণ্ঠে বলল, "রাজীব।"
"বাহ্! আমার নামে নাম দেখি! কোন রাজীবের কথা বলছো?"
ও একটু বিরতি নিয়ে থেমে থেমে বলল, "আয়নার সামনে দাঁড়াও - তাহলেই জানবে কার কথা বলছি।"
ব্যস! খ্রীষ্টের জন্মের মুহূর্তে যেমন পৃথিবীর ইতিহাস দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, আমার জীবনটাও সেই মুহূর্তে, সেই বিশেষ ক্ষনে বিভক্ত হয়ে গেল। আমি সাথে সাথে উপলব্ধি করলাম আমি আর আমার মধ্যে নেই। শুঁয়োপোকার জীবন শেষ করে আমি খুব শীঘ্রই প্রজাপতি হতে চলেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে রূপসী মেয়েটি, যাকে পরিচিত মহলের সবাই আদর করে পুতুল ডাকে, যাকে স্রেফ তাঁর রূপের কারনেই মর্ত্যলোকের কোন মানবী বলে মনে হয়না - সে আমার জীবনে আসতে চলেছে। বলতে ইচ্ছে হলো "ও ঋত্বিকা, তুমি কী জানো তুমি সেই অপ্সরী যার সংস্পর্শ লোভে হাজার বছরের তপস্যা ভেঙ্গে দেয় কোন ঋষি মুনি! তুমি সেই নারী যে ঈশ্বর বিরোধীর মনেও ধারণা দেয় বেহেস্তের হুর পরীর! তোমায় পাশে পেলে গিলগামেশের মতন খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে অমরত্বের সরোবর!
আমার অন্ধকার ভূবনে সূর্যের তরল আলো প্রবেশ করতে শুরু করেছে - আমি আমার মধ্যে থাকবো কী করে?
২.
আগেই বলেছি - ঋতুর বাবা ছিল আমার বাবার বন্ধু। শৈশব থেকেই প্রচুর যাওয়া আসা ছিল আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে। কিন্তু ওর স্বভাবের কারণেই আমি কখনও ওকে ভিন্নচোখে দেখার সাহস করিনি। যে মেয়ে আমার রেজাল্টের কথা জেনে বলে, "এত কম মার্ক্স্ পেলে কেন?" সেই মেয়েটি যতই রূপসী হোক না কেন, তাঁর সাথে প্রেমের স্বপ্ন দেখবে কোন বেকুব?
কিন্তু সে আমাকে কেন পছন্দ করেছিল, তাও নাকি সেই শৈশব থেকেই, সেটা আমার মাথায় কিছুতেই আসতো না। জানতে চাইলেই বলতো, "বলেছি না, তুমি তাঁকে চেন না। চেনার চেষ্টা করো।"
আমি তাঁর হেয়ালিপূর্ণ কথাবার্তায় হারিয়ে যেতাম। পৃথিবীতেইতো মিরাকেল ঘটে। মানুষের লাঠির আঘাতে সাগরের জল ভাগ হয়ে রাস্তা তৈরী হয়। মানুষেরই হাতের স্পর্ষে সেরে উঠে কুষ্ঠ রোগি, অন্ধ ব্যক্তি পায় চোখের জ্যোতি। ধরেই নিলাম এটিও তেমনই কোন মিরাকেল।
"আমার চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করো, তাহলেই বুঝবে।"
আমি বোকার মতন তাঁর চোখের প্রতিবিম্বে আমার মুখ খোঁজার চেষ্টা করতাম। ইশ! কী গভীর সে দৃষ্টি! যেন রূপকথার পৃষ্ঠা থেকে উঠে আসা রহস্যময় কুয়া। নিচে তাকালেই অশরীরী কণ্ঠে ডাকে, "আয়! আয়!! আয়!!!" এবং সেই শীতল জলে ডুবে মরতে মন চায়।
লং ডিস্টেন্স প্রেম ছিল। ফোনে কথাবার্তা ছিল ভীষণ ব্যয়বহুল। চিঠিই ছিল একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম। ইচ্ছে করতো তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে। ইচ্ছে করতো খুব গুছিয়ে প্রেমপত্র লিখতে। তাঁর ছবি চিঠির প্রতিটা পৃষ্ঠায় আঁকতে। ইচ্ছে করতো বুকের খাঁচা থেকে হৃদপিন্ড ছিড়ে এনে খামে ভরে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতে।
অথচ এসবের কিছুই হতোনা। আমার চিঠিতে স্থান পেত সারাদিনে ঘটে যাওয়া সবকিছু। ক্লাসে বন্ধুবান্ধবের গোপন কথা থেকে শুরু করে পাড়ার রতন পাগলার কান্ডকীর্তি পর্যন্ত কোন কিছুই বাদ যেত না। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্বেও একটাও রোমান্টিক কথা লেখা হতো না।
ভয়ও ছিল একটা বড় কারন। কোন কারনে যদি এই চিঠি ভিন্ন কারও হাতে পড়ে, তাহলে বেচারি কী বিপদেই না পড়বে! আমি তাই বলতাম আমার প্রতিটা চিঠি পড়া শেষে পুড়িয়ে ফেলতে।
সে তা করতো না। জমিয়ে রাখতো। বলতো এগুলোই নাকি আমি। বিয়ের রাতে সে নাকি আমার এবং তাঁর জমানো চিঠিগুলো পাশাপাশি রেখে ওজন করে দেখবে কারটা ভারী। তাতেই প্রমান হবে কে কারটা কত যত্নে আগলে রেখেছে। বললাম না, বয়সটাই ছিল আবেগের, ছেলেমানুষি প্রেমের।
তাঁর চিঠি আমিও তাই তুলে রাখতাম সযতনে, ছাদের উপর সিমেন্টের তৈরী পানির ট্যাংকির পাশে ইট পাথরের তৈরী আমার গোপন সিন্দুকে। আমার কাছেও সেই লেখাগুলোই ছিল ঋতু। স্পর্শে শিহরিত হতাম।
পারিবারিক অ্যালবাম থেকে তাঁর কিছু ছবি খুঁজে বের করে রাখলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে সেসব ছবিই দেখতাম। হাত বুলাতাম। ভালবাসতাম।
প্রথম প্রেমের অনুভূতি নিয়ে অনেক কবি, অনেক সাহিত্যিক অনেক কথা লিখেছেন। আমার কাছে প্রথম প্রেমের অনুভূতি জানতে চাইলে বলবো আমার জীবন ছিল সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়া একটা ডিঙ্গি নৌকার মতন। টালমাটাল ঢেউয়ে আমি কোন রকমে ভেসে থাকার চেষ্টা করছি। এমন সময়ে আমি যেন বাতিঘরের দেখা পেলাম। আমার পায়ের নিচে শক্ত মাটি এসে ঠেকলো। আমি তাই ঝড়ের চোখের উপর চোখ রেখে বললাম, "আমি তীরে ভিড়ে গেছি। তুমি আমার কিছুই করতে পারবে না।"
সে ছিল ঝড়ের রাতের অন্ধকারে আমার বাতিঘর। সে ছিল ভাঙ্গা নৌকার ডুবন্ত যাত্রী এই আমার কাছে সমুদ্র তট।
পাঁচ মাসের প্রেম যখন হামাগুড়ি খাচ্ছে, তাঁর সাথে আমার সামনাসামনি দেখা হলো। কোন নাটকীয় ঘটনা নয়, কোন সিনেমার দৃশ্য নয়। বার্ষিক ছুটিতে আমরা নিয়মমত ঢাকায় বেড়াতে গেলাম। এবং অবধারিতভাবে তাঁদের বাড়িতে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। কিন্তু এইবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আমার বুক কিছুতেই স্বাভাবিক হচ্ছিল না। ভয় পাচ্ছিলাম, লাফাতে লাফাতে না মুখ দিয়েই হৃদপিন্ডটা বেরিয়ে আসে। চেহারা নিশ্চই উদ্ভ্রান্তের মতন ছিল - কারন আমার বোন আমাকে সরাসরিই জিজ্ঞেস করলো, "তোর কী কিছু হয়েছে? তোকে দেখতে এমন লাগছে কেন?"
আমি বললাম, "কেমন লাগছে?"
"চোরের মতন। মনে হচ্ছে তুই কিছু একটা চুরি করে ধরা খাবার ভয় পাচ্ছিস।"
এমন গা জ্বালানো কথাবার্তা কেবল বড় বোনেরাই বলতে পারে। আমার বোনের কাছ থেকেতো এমন কথাবার্তা না শোনাটাই অস্বাভাবিক। এ আমার জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু এইবার ঘটনা সত্য। আমি প্রানপন চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকতে। কিন্তু যখন ও আমার সামনে এসে দাঁড়াবে, আমি কী পারবো আমার মধ্যে থাকতে? আততায়ী প্রেম আমাকে না মেরেই ফেলে!
আশ্চর্য্য! আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে ও যেদিন আমাকে টেলিফোনে ভালবাসার কথা বলেছিল। আমার এখনও মনে আছে আমাকে পাঠানো তাঁর প্রথম চিঠির শিরোনাম। অথচ আমি কিছুতেই সেই সময়টার কথা মনে করতে পারিনা যখন ও আমার সামনে প্রেয়সী হিসেবে প্রথম এসে দাঁড়ালো। যেন স্মৃতির ডায়রি থেকে সেদিনের পৃষ্ঠাগুলো কেউ ছিড়ে সরিয়ে ফেলেছে। চির রহস্যময় মানব মস্তিষ্কের এ এক বিচিত্র খেলা!
অবশ্য একটা নির্দিষ্ট তরঙ্গের বেশি মাত্রার শব্দ মানুষ শুনতে পায়না। আলোর মাত্রা নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়িয়ে গেলে চোখ অন্ধ হয়ে যায়। সুখের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে হৃদয় কেঁদে উঠে। অনুভূতির ক্ষেত্রেও তেমনই কিছু একটা হবে হয়তো। প্রেমিকার সাথে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি তাই মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারেনি।
তারপরে আমাদের প্রতিবছর একবার দুইবার করে দেখা হয়েছে, কিন্তু সবগুলোই পারিবারিক নিমন্ত্রনে। আমার বোন আমাদের সাথে থাকতো। তাঁরওতো উপায় নেই। মেয়ে বলতে ঐ বাড়িতেতো কেবল সেই। এদিকে আমার বোন ছিল শার্লক হোমসের হারিয়ে যাওয়া ভগিনী। চাহনি দেখলেই বুঝে ফেলতো সব! তাই তাঁর সামনে অতি সাবধান থাকতাম। ফলে "রেজাল্ট কী" ছাড়া আর কোন কথাই হতো না দুজনের মধ্যে।
কাজেই আমি বলতেই পারি, স্কুল জীবনে হৃদয় বিনিময়ের পালা চুকে বুকে গেলেও আমাদের "প্রেম" শুরু হয়েছিল এসএসসি পাশের পর। আমি কলেজে পড়ার জন্য ঢাকা চলে এলাম, তখন থেকেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এতদিন চিঠিতে মন খুলে কথা বললেও সামনা সামনি যখন দুজনে একান্তে মেলামেশা শুরু করলাম, তখন কেন যেন কোন কথাই খুঁজে পেতাম না। কথা জড়িয়ে যেত, শরীরের রক্ত ছুটতো দুরন্ত ঘোড়ার বেগে, এবং লজ্জা.....লজ্জায় একে অপরের দিকে তাকাতাম পর্যন্ত না।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে প্রথমবারের জন্য তাঁর হাত ধরতে আমাকে তিন থেকে চারমাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তাও সে ধরার পরেই কেবল আমি ধরেছিলাম।
সে সময়ের স্মৃতির বর্ণনা আমি কিই বা দিতে পারবো! সে এক ভিন্ন অনুভূতি। প্রথম প্রেমকে শব্দে ধারণ করার ক্ষমতা আমার মনে হয়না কোন লেখকের আছে।
প্রতিটা মুহূর্তে আমরা জীবন উপভোগ করতে লাগলাম। প্রতিটা মুহূর্তে বেঁচে থাকার সুখ নিতে লাগলাম।
বিকেলের আঁচলে লুকানো সূর্যের নরম আলোয় ভীত হরিণীর মতন তাঁর লজ্জাবনত দৃষ্টি, জলতরঙ্গের মতন সুরেলা হাসি, চুরির রিনিঝিনি শব্দ - সব যেন ঘোর সৃষ্টি করতো। মনে হতো কেউ যেন সুখকে তরল আকারে পেয়ালায় সাজিয়ে আমাদের সামনে হাজির করেছে - আমরা দুজনে প্রাণ ভরে সেই অমৃত সুধা পান করতে লাগলাম।
রাতের পর রাত জেগে দুজনে কথা বলতাম।
আমি থাকতাম মেসে। গভীর রাতে পালিয়ে চলে যেতাম তাঁর বাড়ির উল্টোদিকের বাড়ির ছাদে। ধরা পড়লে নির্ঘাত চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা পড়তাম। কিন্তু সেই বাঁধ ভাঙ্গা আবেগ কী আমাকে ওসব ভাববার সময় দিত?
ইশারায় কথা হতো দুজনের। ও তাঁর জানালার ওপার থেকে হাতের ইশারা ইঙ্গিত করতো - আমি এই বাড়ির ছাদ থেকে। ঘরের বাতি নিভিয়ে দিত। কোটি কোটি বছর আগে পুড়ে যাওয়া নীল নক্ষত্রের আলোয় আমি তাঁকে দেখতাম। মনে হতো তখন যদি হৃদস্পন্দন থেমেও যেত - কোন আফসোস হতো না।
আমাদের ভালবাসার সাক্ষী ছিল ঐ বাড়ির ছাদ, তাঁর ঘরের জানালা - সাক্ষী ছিল নীলিমার চাঁদ, শহুরে রাজপথ, রমনার বুনো বট, আর ছিল ধানমন্ডির নাগরিক ঝিল। সাক্ষী ছিল ঝুম বৃষ্টি, রাত নিশুতি, গাউছিয়া নিউমার্কেটের মানুষের ভিড় এবং ঢাকার প্রাণের নদী গঙ্গা বুড়ি। আমরা দুজনে স্রেফ ভালবেসে গেছি - কোন কিছুর পরোয়া ছেড়ে প্রেমের মালা গেঁথেছি। বলেছি না - বয়সটাই ছিল অমন বাঁধ ভাঙ্গা প্রেমের।
ফুল ফুটলে সুগন্ধে টের পাওয়া যায়। আগুন জ্বললে বোঝা যায় তার তাপে। আর আলো জ্বললেতো দেখাই যায়। আমাদের ভালবাসাও বেশিদিন গোপন রাখা গেল না। তাঁর পরিবার, আমার পরিবার দুই পরিবারের লোকজনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেল। সে ছিল আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে - কিন্তু আমাদের দুজনের মায়েরা বান্ধবী ছিলেন না। মেয়ে মানুষের অন্তর্কলহের জন্য কোন কারন লাগেনা। আমাদের দুই মায়ের মধ্যেও কোন এক অজানা কারনে বনিবনা হতোনা। কাজেই আমাদের সম্পর্কের ব্যপারটি তাঁরা ভাল চোখে নিলেন না।
এখানে ঋতুদের আর্থিক অবস্থার মোটামুটি ধারণা দেয়া যাক। সেই আশি-নব্বইয়ের দশক থেকেই তাঁদের বাড়িতে তিনটা গাড়ি। ঢাকায় নিজস্ব বাড়ির সংখ্যাও তিন। তাঁর বাবা দেশের অন্যতম বিখ্যাত ডাক্তার, এক নামেই লোকে তাঁকে চেনে। দৃশ্যমান দুই এবং অদৃশ্য আরও আট মিলিয়ে মোট দশহাতে টাকা উপার্জন করেছেন। যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। ঢাকা শহরের চারটা বড় বড় হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তিনি প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। এছাড়াও তাঁর আরও অনেক রকম ব্যবসা আছে।
এদিকে আমার বাবা একজন সাধারণ চাকুরে। তিনটা গাড়িতো দূর কি বাত, একটা থার্ড হ্যান্ড গাড়ি আছে যা আমাদের বাড়ির চাইতে গ্যারেজে থাকতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাতে আমাদের বাড়িতে আসে, এবং তারপর আবার মুড খারাপ হলে তিনি তাঁর প্রিয় স্থানে ফেরৎ যান। একটা ছোটখাট বাড়ি আছে, তাও কোনরকমে ইট সিমেন্ট দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া। কোন আধুনিক ডিজাইন ফিজাইন কিচ্ছু নয়। বাড়ি যে আছে, এই শান্তি এবং এই একমাত্র গর্ব।
এই গেল আর্থিক দিক দিয়ে দুই পরিবারের পার্থক্য।
এখন আসা যাক যোগ্যতায়। তা আপনারাতো জানেনই যে তখন পর্যন্ত আমি লেখাপড়ায় কিছুই করতে পারিনি। কোন রকমে সম্মান বাঁচিয়ে পাশ করে যাচ্ছি আর কি। এদিকে ঋতুর এসএসসি এইচএসসির রেজাল্ট ছিল ঈর্ষণীয়। পত্রিকায় তাঁর ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেলেও চান্স পেয়েছে। নিশ্চিৎভাবেই বাবার মতন ডাক্তার হতে চলেছে। এবং কোন স্বাভাবিক পিতাই তাঁর একমাত্র ডাক্তার কন্যার জন্য, যে কিনা চোখ ধাঁধানো রূপসীও বটে - কোন সাধারণ দর্শন, কেরানি হবার যোগ্য কোন ছেলেকে পাত্র হিসেবে চাইবেন না। তিনিও প্রমান করলেন তিনি অস্বাভাবিক ছিলেন না।
তবে ডাক্তার সাহেবের একটি স্বভাব আমার খুব ভাল লাগতো - তিনি আমাকে দুই চোখে দেখতে না পারলেও মুখে কখনও প্রকাশ হতে দেননি। গম্ভীর হয়ে থাকতেন, কিন্তু কখনই কিছু বলেননি। না আমাকে, না তাঁর কন্যাকে।
আমার মা এইদিকে কোন কালে তাঁর নাকি কোন এক আত্মীয়াকে কথা দিয়ে ফেলেছেন আমার সাথেই তাঁর মেয়ের বিয়ে দিবেন। না সেই মেয়েটিকে আমি জীবনেও দেখেছি, না তাঁর ব্যাপারে কোন কিছু শুনেছি। শুধু আমার মা কথা দিয়েছেন, তাই আমাকে বিসমিল্লাহ বলে সেই মেয়েটির গলায় মালা ঝুলিয়ে দিতে হবে। কোন মানে হয়? এটা কী রামায়ণের সত্যযুগ?
আমার বাবা না পারতে স্ত্রীকে খ্যাপান না। তিনিও এই অন্যায় সিদ্ধান্তের কোন প্রতিবাদ করলেন না।
ঋতুর সাথে আমার প্রেমের ঘটনায় তাই আমার মা সংহারিণী রূপ ধারণ করলেন। প্রথমে প্রচন্ড হুমকি ধামকি দিলেন। লাভ হলো না। শুরু হলো ফিল্মি কায়দায় ব্ল্যাকমেইল। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। নিজের মা না খেয়ে আছেন - কিভাবে সহ্য করা যায়? অনশনের চতুর্থ দিনে আমি গিয়ে তাঁর পা জড়িয়ে কেঁদে ফেলার পরেই তিনি অনশন ভঙ্গ করলেন। এবং আশ্চর্য্য! তিনি তাঁর জেদও পরিত্যাগ করলেন। সন্তানের অশ্রুর কাছে সেদিন তাঁর জেদ পরাজিত হয়েছিল।
ঝগড়াঝাটি হৈহুল্লোড়, খাওয়া বন্ধ ব্যাপারগুলো আমাদের মধ্যবিত্তদের বাড়িতেই চলে। বড়লোকের বাড়ির কাজ কারবারই আলাদা। তাই ঋতুর বাড়িতে ভিন্নরকম নাটক মঞ্চস্থ হলো।
ঋতুর মা একদিন একগাদা ছেলের ছবি এনে তাঁর হাতে ধরিয়ে হাসিমুখে বললেন, "এই যে নাও - এদের মধ্যে কাকে পছন্দ হয় বলো।"
ঋতু পড়ছিল। সে বিরক্ত স্বরে বলল, "এখনি এসব কী মা? আমার এখনও পড়াশোনা শেষ হতে অনেক বাকি আছে।"
তিনি মুখের হাসি ধরে রেখে বললেন, "তো কী হয়েছে? ছেলে দেখতেতো অসুবিধা নাই। এখনি তোমাকে বিয়ে করতে হবেনা। আমরা কথা এগিয়ে রাখবো - যদি দরকার হয়, এনগেজমেন্ট করে রাখবো।"
ঋতু বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে চোখ তুলে মায়ের দিকে সরাসরি তাকিয়ে তীক্ষ্ন গলায় বলল, "তুমি ভাল করেই জানো আমি এদের কাউকে বিয়ে করবো না।"
মা হাসি আরেকটু ছড়িয়ে বললেন, "অসুবিধা নেই। আরও ছেলের ছবি আছে আমার কাছে। তুমি দেখতে থাক। তারপর এদের মধ্যে যাকে পছন্দ হবে তাঁর সাথেই তোমার বিয়ে হবে। নো প্রেশার হানি!"
ঋতু কথা না বাড়িয়ে প্রতিটা ছেলের ছবিতে চোখ বুলিয়ে মাকে ফেরৎ দেয়। তিনি হাসিমুখে বিদায় নেন, এবং পরদিন আরও নতুন ছবি নিয়ে বলেন, "এদের মধ্যে কাকে পছন্দ হয় বলো।"
আমার পক্ষ্যে বিপক্ষে কোন কথা নয়। এমনভাবে আমার প্রসঙ্গ পাশ কাঁটাতেন যেন আমার কোন অস্তিত্বই নেই।
তবে কাজের কাজ করেছিলেন আমার বাবা।
একদিন আমাকে তাঁর অফিসে ডাকিয়ে এনে খুব গম্ভীর স্বরে বললেন, "তুমি কী ঋতু মেয়েটাকে পছন্দ করো?"
নিজের বাবার সাথে প্রেম ভালবাসার কথাবার্তা বলে আমি অভ্যস্ত নই। তাই অতি লজ্জিত স্বরে চিবুক বুকে ঠেকিয়ে বললাম, "জ্বি।"
তিনি গলার গাম্ভীর্য্য আরও বাড়িয়ে বললেন, "তুমি একটা ব্যাপার কী বুঝতে পারছো যে তোমরা সমবয়সী? এটাই তোমাদের সবচেয়ে বড় অসুবিধা?"
আমি অবুঝ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, "একটা ছেলের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক সময় লেগে যায়। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজে সেই চাকরিতে স্থায়ী হতে হতে যত সময় লাগে, সেই সময়টাতে তাঁর বয়সী কোন মেয়ে বিয়ে করে দুই তিন বাচ্চার মা হয়ে যায়। তুমি কী বুঝতে পারছো আমাদের প্রধান আপত্তিটা কোথায়?"
আমি আমতা আমতা করে বললাম, "আমরা মানিয়ে নিব। দুইজনের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ঠিক থাকলে...."
বাবা আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়ে বললেন, "ওর জন্য কেমন ছেলের প্রস্তাব আসছে তুমি জানো? বিদেশী এয়ারলাইন্সের পাইলট, পিএইচডি করে বিদেশে সেটেল্ড, বিদেশে পড়াশোনা শেষ করা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সবারই প্রচুর টাকা! তুমি আমাকে বল - তোমার ভবিষ্যৎ কী? একটা অখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে মোটামুটি বেতনের চাকরি। যা দিয়ে তোমার নিজের বেসিকটাই পূরণ হবে কিনা সন্দেহ। তুমি কী সেই মেয়েটাকে সুখী করতে পারবে যে সুখে সে অভ্যস্ত? একবার ঐসব ছেলের দিকে তাকাও, এবং তারপর নিজের দিকে। তোমার কী মনে হয়? সেই মেয়েটার সাথে বিয়ে করে তুমি কী তাঁর প্রতিই অন্যায় করবে না? সে কী আরও ভাল ছেলে ডিজার্ভ করেনা?"
ব্যস! সেদিনের সেই এক কথায় আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। আমি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। আসলেইতো। আমি কী? সেসব ছেলের তুলনায় কিছুই না। আমি কেন শুধু শুধু এই মেয়েটার জীবন নষ্ট করতে যাব? এখন তাঁকে ভালবাসি - সেও বাসে। কিন্তু অভাবের সংসার অতি দ্রুত ভালবাসার ব্ল্যাকবোর্ডে ডাস্টার চালায়। আমি কতবার কতজনকে সংসারের খরচাপাতি নিয়ে ঝগড়া করতে দেখেছি! কী কুৎসিত সেসব ঝগড়া! আমি কল্পনাও করতে পারিনা ঋতুর সাথে অমন ঘটনার।
কোমর বেঁধে পড়াশোনা শুরু করলাম। দাঁতে দাঁত চেপে সংকল্প নিলাম লেখাপড়ায় ভাল রেজাল্ট করে ঋতুর যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে।
ব্যাচেলর্স পাশ করে বুঝে নিলাম এদেশের পড়াশোনা আমাকে দ্রুত কিছু করতে দিবেনা। বিদেশ ছাড়া উপায় নাই। শুরু করলাম বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নিয়ে দেনদরবার। মিরাকেলতো মানুষের সাথেই ঘটে। আমার ক্ষেত্রেই একটা ঘটেছে। এইবার আরেকটা ঘটাতেই হবে।
জীবনের এই কঠিনতম সময়ে আমার পাশে পর্বতের মতন অটল দাঁড়িয়ে থাকলো ঋতু। কত ঝড়ের ঝাপ্টা যে সামলালো সে বেচারি। তাঁর মা, তাঁর বাবা, তাঁর ছোট মামা, নানু কেউই বোঝাতে পারলেন না যে আমি একটা অযোগ্য, অকর্মন্য, অপদার্থ ছেলে। আমার সাথে বিয়ে করার চেয়ে রাস্তায় চড়ে খাওয়া কোন গরুকে তিন কবুল বলে গ্রহণ করা অনেক ভাল।
লড়তে লড়তে আমি ক্লান্ত হয়ে যেতাম। সে আমাকে সাহস দিত। বলতো আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে। মিরাকেল ঘটবে। আমি মিরাকেলের আশায় আবার উঠে দাঁড়াতাম।
এবং মিরাকেল ঘটলো।
একদিন ডাকপিয়ন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের পত্র নিয়ে হাজির হলো। আমার সেখানে স্কলারশিপ হয়ে গেছে। সাথে অ্যাসিস্ট্যান্ট টিউটর হিসেবে চাকরি। মাসে বেতন বারোশো ডলার। পরে আরও বাড়বে। এরমাঝে আমি আমার মাস্টার্স পড়াশোনা শেষ করে পিএইচডি গবেষণা করতে পারবো। পড়াশোনা শেষে যদি চাই তাহলে ওদেশে থেকে চাকরিও করতে পারবো। অনেক কোম্পানিই আছে যারা নিজে থেকে এগিয়ে এসে আমার গ্রিন কার্ড পেতে সাহায্য করবে।
চাকরি বাকরির তথ্যগুলো অবশ্য ওখানকার বাঙ্গালি ছাত্রদের থেকে পাওয়া।
ব্যস! আর কী লাগে? আমি তাঁকে জাপ্টে ধরে বলেছিলাম, "এখন থেকে তুমি আমার ঋতু! এখন থেকে তুমি আমার!"
ও হাসতে হাসতে বলল, "আমি কবে তোমার ছিলাম না?"
আবারও সেই পুরানো হিন্দি গানের কলি গাইলাম যা বাংলা করলে দাঁড়ায়, "তোমায় পৃথিবীতে ডাকা হয়েছে কেবল আমারই জন্যে।"
এবং তা শুনে আবারও তাঁর খিলখিল হাসি।
আমি বিদেশে চলে এলাম। লং ডিস্টেন্স সম্পর্ক ধরে রাখার কাজে আমরা আগে থেকেই অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার এখানে দিন মানে ওর ওখানে রাত। আমার অবসর সময়ে ও থাকে ব্যস্ত। ওর অবসরে আমি হয়তো নাক ডেকে ঘুম। ইন্টারন্যাশনাল ফোন কলতো অনেক খরুচে ব্যাপার! মাসে একবার অথবা দুই তিন সপ্তাহে একবারের বেশি ফোন করার সামর্থ্য আমার একদমই নেই। এর মধ্যে গত কয়েক বছর প্রতিদিনের দেখা সাক্ষাৎ এবং কথাবার্তা আমাদের অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছিল। তাই প্রথম প্রথম খুব অসুবিধা হতো।
অবশ্য সেটাতেও আমরা মানিয়ে নিলাম। প্রতিদিন একটা করে ইমেইল লেখা বাধ্যতামূলক ছিল দুজনের জন্যই। কিন্তু হাতে লেখা চিঠির স্বাদ কী আর যান্ত্রিক ইমেইলে মেটে? চিঠিতো নয়, আমাদের কলিজা নিংড়ানো আবেগ জমা থাকতো তাতে।
আমাদের সম্পর্কের কথা ততদিনে চারিদিকে রটে গেছে। ওর পরিবারের লোকজন এখনও মেনে নিতে পারছে না - তবে আগের মতন একদম উড়িয়েও দিতে পারছে না। নামের শুরুতে "ডক্টর" বিশেষণ যুক্ত হলে ছেলে নিশ্চই তাঁদের মেয়েকে না খাইয়ে মারবে না।
ওর বান্ধবীগুলোও ছিল বদের হাড্ডি। একদম শুরু থেকেই আমার সামনে 'দুলাভাই' 'দুলাভাই' (তখনও হিন্দি সিনেমা স্টাইলে আহ্লাদী করে দুলাভাইকে "জিজু" ডাকার প্রচলন দেশে শুরু হয়নি) বলতে বলতে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলতো। আমার পকেট খসিয়ে কতবার যে ফাস্টফুড বা চাইনিজ খাবার চেষ্টা নিয়েছিল তারা! ঋতু বাঁধা না দিলে আমাকে সেই কবেই বনানী গোরস্তানের সামনে থালা হাতে বসতে হতো।
অথচ এই তারাই আমার আড়ালে ইশারা ইঙ্গিতে আবার কখনওবা সরাসরিই ওকে বলে বসতো, "দোস্ত, কিছু মনে করিস না। আমার মনে হয় তুই ওর চেয়ে অনেক ভাল ছেলে ডিজার্ভ করিস। তুই আরেকবার ভেবে দ্যাখ।"
ঋতু তখন খানিক ভেবে জবাব দিত, "উহু, ওই আমার জন্য ঠিক আছে।"
বিদেশে আসার পর আবার তারাই শুরু করলো তৈলমর্দন।
"দুলাভাই! অনেক ফাঁকিবাজি হয়েছে। এইবার দেশে আসলে কিন্তু আপনাকে ছাড়ছি না। গুলশানে চাইনিজ খেতে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু।"
"দুলাভাই! শুধু বোনের জন্য গিফ্ট পাঠালে হবে? আমরা শালিরা আছি না? আমাদেরকে খুশি করাটাওতো আপনার দায়িত্ব।"
"দুলাভাই! দ্যাখেন না, আমাদের জন্যও কোন হ্যান্ডসাম খুঁজে পান কিনা। বান্ধবীকে একা একা বিদেশে পাঠাতে মন চাইছে না।"
একদিন আমাদের দুই পরিবার বসে মোটামুটি সম্মত হলেন যে আমার মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ হলে আমাদের দুজনের বিয়ে পড়িয়ে দেয়া হবে। তারপর স্বামী স্ত্রী মিলে পিএইচডি করতে করতে সংসার করা যাবে।
আমার তখন আনন্দ ধরে রাখার জায়গা নেই। সেই স্কুল জীবন থেকে একে অন্যের হাত ধরে আছি। কত বন্ধুর পথই না পাড়ি দিতে হয়েছে। কখনও রক্তাক্ত পায়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে একজন হাঁটু গেড়ে পরে গিয়েছি। তারপরই দেখি অপরজন ঠিকই হাত বাড়িয়ে টেনে তুলেছে। পথ এখনও শেষ হয়নি। গন্তব্য ঐ যে উঁকি দিচ্ছে। আর মাত্র কয়েক কদম! তারপরই "they lived happily ever after!" একটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার ক্লান্তির অবসান।
শরীর তখন আরও উত্তেজিত বোধ করে। কিছুতেই সামান্য সময়টা অপেক্ষা করতে মন সায় দেয় না। প্রতিবার বলি সামনের সেমেস্টার ফাইনাল শেষে আমি দেশে আসছি। তিন কবুল বলার আনুষ্ঠানিকতা সেরে রাখি - লোক দেখানো অনুষ্ঠান না হয় পরে সারা যাবে।
আমার কথায় ও শুধু হাসে।
"এতদিন যখন ধৈর্য্য ধরেছো এবার নাহয় আরেকটু ধৈর্য্য ধরো। আমিতো আছিই।"
সেই হৃদস্পন্দন থমকে দেয়া হাসি! গজলের তালের মতন, কবির কবিতার মতন ছন্দময় হাসি! আমি কেবল সেই হাসিই শুনি, কথা কানে আসেনা।
এমন নয় যে আমাদের কখনো ঝগড়া হয়নি। আগেই বলেছি বোধয়, ও বাড়ির একমাত্র মেয়ে ছিল। জেদটা ছিল জন্মগত। একবার রেগে গেলেই হতো - মাসের পর মাস কথা না বলে কাটিয়ে দেবে - তবু হার মানবে না। তাঁর রাগ ভাঙ্গাতেই আমার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যেত।
অ্যামেরিকা আসার পর আমাদের ঝগড়া তাই বেড়ে গেল বহুগুন। আমি কেন প্রতিদিন ইমেইল করিনা, ইমেইলগুলো কেন মাঝে মাঝে দায় সারা বলে মনে হয়, কেন তাঁর সাথে চ্যাট করিনা, ফোন করি না, ইত্যাদি। ও বুঝতে চায়না আমি এখানে পড়াশোনা ছাড়াও দুই দুইটা চাকরিও করি। সময় আমার কাছে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু! আমিও বোঝাতে পারিনা।
একবার সে ইমেইল দেয়া বন্ধ করে দিল। আমি ধরে নিলাম আমার ইমেইল দিতে দেরি হওয়ায় বুঝিবা রাগ করেছে। আমারও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
তিন দিন গেল, সাত দিন গেল। এইভাবে দেখতে দেখতে চৌদ্দ দিন! তখনকার দিনে এইসব ফেসবুকটুক কিচ্ছু ছিল না। অনলাইন চ্যাটিং শুরু হয়েছে কেবল। তাতেও দেখি সে বহুদিন ধরে অফলাইন।
প্রথম প্রথম চিন্তিত ছিলাম, তারপরে হলো অভিমান। কেন যেন মনে হলো কাজটা ও ইচ্ছে করেই করছে। এবং যেহেতু তাঁর ইচ্ছেয় যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে, কাজেই যোগাযোগের শুরুটা না হয় আমার ইচ্ছেতেই হবে।
কিন্তু প্রেমিকের মন প্রেমিকার মনের মতন পাথুরে নয়। বেশিদিন কঠিন থাকতে পারেনা।
নিয়ম অনুযায়ী মাকে মাসিক ফোন কল করলাম। একথা সেকথার পর জিজ্ঞেস করলাম "ঋতু কেমন আছে?"
মা বললেন, "ভাল।"
শুরু থেকেই মায়ের কণ্ঠস্বর কেমন কেমন যেন ঠেকছিল। এখন এই "ভাল" শব্দটিতে তাঁর ইতস্ততা একটু বেশিই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো।
আমি বললাম, "কোন সমস্যা হয়েছে?"
মা সাথে সাথে আমাকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, "কিসের সমস্যা হবে? সব ঠিকই আছে। সব ঠিক।"
আমার মা মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন। মায়ের এই স্বভাবটা আমরা তিন ভাইবোন পেয়েছি। বাড়িতে মিষ্টি এলে কাড়াকাড়ি পরে যেত কে কতবেশি মিষ্টি খেতে পারে তা নিয়ে। দেখা যেত প্যাকেটের শেষ মিষ্টিতে এসে আমরা তিন ভাইবোন মারামারি করছি। আমি বলতাম, "ওটা আমি খাব।" বোন বলতো "ওটা চারভাগ হবে। আমরা তিনজন এবং মা।"
মা তখন হেসে বলতেন, "আমার লাগবেনা। অতিরিক্ত মিষ্টি খেয়ে খেয়ে আমার পেট খারাপ হয়ে গেছে, ওটা তোমরা তিনজন মিলে খাও।"
মায়ের সেই কণ্ঠস্বরটা আমার মুখস্ত আছে। ভালোই বুঝি মা কখন মিথ্যা বলেন।
"সত্যি করে বল কী হয়েছে?"
মা তারপরেও কিছু বললেন না। এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই ছোট্ট বাহানায় ফোন রেখে দিলেন। আমার বুক কাঁপতে লাগলো দুরু দুরু করে। অমঙ্গলের আশঙ্কায় বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। নিশ্চই খারাপ কিছু ঘটেছে। নাহলে ঋতুতো যোগাযোগ বন্ধ করার মেয়ে না!
আমি তাঁর বাড়িতে ফোন দিলাম। রিং হয়, কেউ ফোন ধরেনা। নিজেকে তখন খুন করতে ইচ্ছে করছিল। কেন শুধু শুধু জেদ করে দুইসপ্তাহ ফোন করিনি। ওর যদি সত্যি সত্যিই খারাপ কিছু হয়ে থাকে, আমি কী নিজেকে কখনও মাফ করতে পারবো?
ওর বাবার মোবাইল ফোনে কল করবো কিনা ভাবছি। ডাক্তার সাহেবতো আমার সাথে স্বাভাবিক স্বরে কথা বলেননা।
তাঁর বান্ধবী লিনার বাসায় ফোন দিলাম।
এখন স্বাভাবিকভাবেই কোন তরুণী মেয়ের ল্যান্ডলাইনে কোন অপরিচিত যুবক ফোন দিলে সেই ফোন যদি মেয়েটির বাবা অথবা মা ধরেন, তাহলে যুবকটিকে একটা লম্বা জেরার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কে তুমি? কোথায় থাকো? লিনাকে কিভাবে চেন? কেন ফোন করেছো? ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরের পর লিনা এসে ফোন ধরলো।
"হ্যালো লিনা! রাজীব বলছি।"
"হ্যা বুঝতে পারছি। ভাল আছো?"
লিনার স্বর খুবই নিরস শোনালো।
"ঋতুর কী হয়েছে লিনা? অনেকদিন কোন খোঁজ নেই।"
ও বেশ অবাক স্বরে বলল, "তুমি জানোনা?"
"কেউ না জানালে আমি জানবো কিভাবে?"
বলেছিলাম না, সেই শৈশবের এক বিকেলে ঋতুর ফোন কল পাবার পর আমার জীবন বদলে গিয়েছিল? লিনার সাথে কথোপকথনের পর আমার জীবন আরও একভাগে ভাগ হয়ে গেল। মনে হলো কাছেই কোথাও বিকট শব্দে বজ্রপাত হয়েছে। মাথা ঝিম ধরে উঠলো। কানে কিচ্ছু শুনতে পারছি না। মনে হলো কেউ যেন তলোয়ারের এক কোপে আমার হাঁটুর নিচের অংশটা গায়েব করে দিয়েছে। বালির বস্তার মতন মাটিতে আছড়ে পড়লাম। চোখের সামনের পৃথিবী তীব্র আলোয় সাদা হয়ে গেল। আমি অন্ধ হয়ে চোখ বুজলাম। এবং চোখ মেলে দেখি আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। কপালের দিকটা ছড়ে গেছে। হাতের মধ্যে ফুটো করে পাইপ দিয়ে স্যালাইন জাতীয় কিছু একটা শরীরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।
স্বর্ণকেশী তরুণী নার্স জানতে চাইলো, "হ্যালো! হাউ আর ইউ ফিলিং?"
নিজেকে ফিরে পেতে যেটুকু সময় লাগলো কেবল - তারপরই তড়িৎ গতিতে লাফিয়ে উঠে স্পষ্ট বাংলায় বললাম, "আমাকে যেতে হবে। এখুনি দেশে যেতে হবে।"
মেয়েটি আমার ভাষা একদমই বুঝলো না, বোঝার কথাও নয়। কিন্তু আমাকে সে জড়িয়ে ধরে ইংরেজিতে বলল, "শান্ত হও! এখনও তোমার অবস্থা বেশ ভঙ্গুর। একটু সুস্থ হলেই আমরা তোমাকে ছেড়ে দেব। তখন তুমি যেখানে খুশি যেও।"
আমি তারপরেও জেদি ষাঁড়ের মতন গোয়ার্তুমি করছি। নার্সকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। টান দিয়ে খুলে ফেললাম আইভি সুঁই। ধমনীর ফুটো দিয়ে বেরিয়ে এলো একগাদা রক্ত। হাসপাতাল মাথায় তুলে চিৎকার করে বলছি, "আমি ঋতুর কাছে যাব! এখুনি ঋতুর কাছে যাব!! আমাকে এখুনি ওর কাছে যেতে হবে!!!"
নার্স আমাকে চেপে ধরে অসহায় গলায় ডাকছে, "সিকিউরিটি! সিকিউরিটি!
আমি বসে আছি ঋতুর পাশে। সে শুয়ে আছে বিছানায়। হাসপাতালের কেবিনের ছোট্ট বিছানায়। সংজ্ঞাহীন। গত পঁচিশ দিন সে চোখ খুলেনি। আধুনিক যন্ত্রপাতি বিপ বিপ করে জানান দিচ্ছে তাঁর হৃৎপিন্ড সচল আছে - কিন্তু শরীরে প্রাণের কোন অস্তিত্বই নেই। জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত ডাক্তার তাঁকে শংকামুক্ত ঘোষণা করতে পারছেনা। বরং সাবধান করে বলেছে যেকোন মুহূর্তেই তাঁর শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে পারে।
আমি তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে। তাঁর চোখ বোজা। আমার কতদিনের শখ, ঘুমন্ত ঋতুর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার। কোন কথা না, কোন স্পর্শ না - শুধু তাকিয়ে থাকা। কিন্তু এই ঘুমতো আমি কোনদিন চাইনি।
আমার পাশে ওর পরিবারের লোকজন। ওর মায়ের চোখ পাকা টমেটোর মতন ফুলে আছে। অবিরতধারায় কাঁদতে কাঁদতে এখন বিদ্রোহ করেছে বোধয়। তাঁর বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে কোন জম্বি। শরীর চলাফেরা করছে ঠিকই - কিন্তু প্রাণ নেই। কেবিনে ওর আরও কিছু আত্মীয় স্বজন আছেন। চিনতে পারছিনা। চেনার ইচ্ছেও আপাতত নেই।
হাসপাতালে আরও আছেন আমার মা, তিনিও শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এই মেয়েটিকে জন্মাতে দেখেছেন তিনি। এই মেয়েটি তাঁর চোখের সামনেই বেড়ে উঠেছে। হাঁটা শিখেছে। কতবার তাঁর কোলে বসে ভাত খেয়েছে! এই মেয়েটির সাথেই তাঁর ছেলের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়েছে। এর গর্ভ থেকেই জন্ম নেয়ার কথা তাঁর উত্তরাধিকারীর। অথচ এসবের আগে এখনই কিনা সে যাবার পায়তারা করছে!
আমি ঋতুর হাতে হাত রাখলাম। নিষ্প্রাণ, ঠান্ডা হাত। এই হাত ধরেই আমাদের একটা জীবন পার করে দেয়ার কথা। কতবার আমি পড়ে গেলে পরে এই হাত ধরে উঠে দাঁড়িয়েছি। আজকে আমি সেই হাতকেই টেনে তোলার চেষ্টা করছি।
সে পাল্টা আমার হাত ধরলো না। চোখ ঠিকরে আবারও পানি এলো। পুরুষ মানুষের নাকি প্রকাশ্যে কাঁদতে নেই। আমি পারছিনা নিজের কান্না চেপে রাখতে। বুকের ভিতরে কেউ যেন পাম্প বসিয়ে দিয়েছে। ভিতরকার সব কষ্ট নিংড়ে চোখের পথ ধরে অশ্রু হিসেবে বের করে দিচ্ছে। আমি কপাল ঠ্যাকালাম তাঁর হাতের উপর। গলা দিয়ে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। আমার মা, ওর মা দুইজন এসেই আমার কাঁধ চেপে ধরলেন।
"কেন এমন হলো? কেন?"
ঋতুকে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয়েছে। গুলি করেছে খালেদ নামের এক লোক। আমাদের চেয়ে বয়সে যে চার বছরের বড় - এবং সম্পর্কে ওর বাবার আরেক বন্ধুর ছেলে। পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে সেও নাকি শৈশব থেকেই ওকে ভালবাসতো। প্রেমে কখনও সাড়া পায়নি। এখন আরেক ছেলের সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলছে দেখে সে আর সহ্য করতে পারেনি। নিজের প্রেমকে অন্যের সংসার করতে দেখা কোন প্রেমিকের পক্ষে সম্ভব?
আমি অবাক হয়ে ভাবি, এ কেমন ধারা প্রেম? যতদূর জানতাম, ভালবাসা মানে কারোর ভালোতে বাস করা। স্রেফ প্রেমিকার মুখে হাসি ফোটাতে কেউ কেউ দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বাঁধতে চায় লাল কাপড় - কেউবা প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়ে পায়ের নিচে চাপা দেয় পৃথিবীর অহংকার এভারেস্ট শৃঙ্গ। আর এ কিনা সেই প্রেমিকারই মাথায় গুলি চালায়!
সেই ছেলেটাইতো প্রমান দিল কেন তাকে ফিরিয়ে দিয়ে ঋতু কোন ভুল করেনি।
আমি তাকিয়ে থাকি ঋতুর দিকে। আমার প্রেয়সী, আমার বাগিচার ফুল! যে ফুলকে বাগান থেকে তুলে এনে দুমড়ে মুচড়ে কচলে ফেলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সুবাসকে দমাতে পারেনি।
সবার উপস্থিতি উপেক্ষা করে আমি তাঁর কপালে চুমু খাই। এবং কানের পাশে ফিসফিস করে বলি, "তুমি হাসপাতালের বিছানাতেও ততটাই সুন্দর, যতটা লাল বেনারসিতে। তুমি ফিরে এসো। আমার অনুরোধ তুমি রাখো, ফিরে এসো।"
সেই ঘটনার দুই থেকে আড়াইমাস পরে সে চোখ মেলেছিল। সেই ঘটনারও আজ উনিশ বছর হয়ে গেছে। গত উনিশ বছর ধরেই ঋতু আমার সাথে আছে। আমার সাথে খায়, আমার সাথেই সে ঘুমুতে যায়, প্রতি বিকেলে আমরা একসাথে স্থানীয় পার্কে বেড়াতে যাই। আমি প্রচুর কথা বলি। আমার সারাদিন কী হলো, অফিসে কে কী করলো কিছুই বাদ দেই না। ঠিক যেমনটা আমার চিঠিগুলোতে লিখতাম। প্রচুর রোমান্টিক কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু একটাও রোমান্টিক কথা মনে আসেনা। এখনও আমি আফসোস করি, কেন কবি হতে পারলাম না। যদি খানিকটা হলেও কাব্য প্রতিভা থাকতো - তাহলে অন্তত কাজ চালাবার মতন রোমান্টিক কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারতাম।
ঋতু আমার কথা শোনে, কিন্তু কিছু বলে না। ও কথা বলতে পারেনা। তাঁর চেতনা ফিরেছে - কিন্তু জ্ঞান ফিরেনি। ডাক্তার বলেছেন, সে এখনো ঘুমন্ত। এই ঘুম কখনও ভাঙবে এমন কোন আশার বাণী কেউই শোনান না। বলেন, যদি সে আবার জেগে উঠে - তবে সেটা হবে একটি মিরাকেল।
আমি এতেই খুশি। মানুষের জীবনেইতো মিরাকেল ঘটে। আমার জীবনেওতো দুইটা মিরাকেল ঘটেছে। আরেকটা ঘটতে অসুবিধা কী?
আমি এখনও স্বপ্ন দেখি একদিন ঋতু আমার সস্তা রসিকতায় হেসে উঠবে খিলখিল করে। এবং আমি সেই হাসির শব্দে খুন হবো!
ওর সাথে আমার বিয়েটা কিন্তু এতটা সহজ ছিল না। আমার পরিবার, তাঁর পরিবার - সবাই বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে আমি আবেগের বশে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি যা ভুল। ভাগ্য চাইছে না আমাদের বিয়ে হোক, আমাদের ভাগ্যকেই মেনে নেয়া উচিত।
কিন্তু ভাগ্যের হাত থেকে প্রেমিকাকে ছিনিয়ে আনতে পারলাম না তো কিসের প্রেম করলাম?
ডাক্তার সাহেব মারা গেছেন দশ বছর হয়ে গেছে। মৃত্যুশয্যায় তিনি ফিসফিস করে আমাকে বলেছিলেন, "আমি এই দেখে সুখে মরছি যে আমার মেয়ের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল না।"
আমার বাবা মা চেয়েছিলেন আমি আরেকটা বিয়ে করি। অনিশ্চয়তায় কাটিয়ে দেয়ার জন্য একটি জীবন অনেক লম্বা সময়। একতরফা ভালবাসতে বাসতে এক সময়ে মানুষ অবশ্যই চায় বিপরীত দিক থেকেও ভালবাসা পেতে। জৈবিক প্রয়োজন উপেক্ষা করা সহজ নয়।
মিথ্যে বলবো না - অফিসের এক শ্বেতাঙ্গিনীর সাথে আমার সম্পর্ক সেদিকেই এগুচ্ছিল। ক্যারোলাইনেরও অবস্থা অনেকটা আমার মতন। স্বামী আফগানিস্তান যুদ্ধের শহীদ। সাত মাস সংসার করে বিধবা হয়ে যাওয়া ক্যারোলাইন বিরুদ্ধ স্রোতের টানে আমাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল। আমি নিজেওতো তখন ডুবে আছি। দুজন দুজনের হাত চেপে ধরলেই সব সমস্যার সমাধান।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই হাত গুটিয়ে নিলাম। বিদেশ ছেড়ে ফিরে এলাম জন্মভূমিতে। সেই শৈশব থেকে প্রতিটা ঝড় ঝাপটা যে মেয়েটা পর্বত হয়ে সামাল দিয়েছে - তাঁর প্রয়োজনের সময়ে আমি স্বার্থপর হলে চলবে? আমার কোন গুণে মুগ্ধ হয়ে সে আমার প্রেমে পড়েছিল - সেটা বলতে তাঁকে জেগে উঠতে হবে না?
সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমার কোন অসুবিধা হয়না। বলেছি না, সময় আমার জন্য কোন কোন বিন্দুতে থমকে আছে। এখনও ইচ্ছে করলেই আমি ফিরে যেতে পারি সেই দিনটিতে যখন আমার বাড়ির ল্যান্ড ফোনে ফোন করে ও বলেছিল "ভালবাসি!"
মুগ্ধ হয়ে দুই কিশোর কিশোরীর প্রেম দেখি। নিঃশ্বাসের সাথে বুক ভরে তুলি আমার কিশোরী প্রেমিকার চুলের মৃদু গন্ধে।
ঘুমাতে যাবার আগে তাঁকে দেখিয়ে দেখিয়ে আমাদের দুইজনের জমানো চিঠি ওজন করি। হাসতে হাসতে বলি, "দেখো - আমারটার ওজন বেশি! ভালবাসার দৌড়ে তুমি হেরে গেছো জান!"
আমার বিশ্বাস একদিন সে বলে উঠবে, "চিটিং! তুমি ইচ্ছা করেই কয়েকটা চিঠি সরিয়ে ওজন নিয়েছো। তুমি কী ভেবেছো - আমি দেখিনি?"

SHARE

Author: verified_user