Friday

অপরাজিতা রিনির আর্তনাদ লেখা: রাফি আদনান আবির

SHARE

                           অপরাজিতা রিনির আর্তনাদ লেখা: রাফি আদনান আবির


এই তল্লাটের সবচেয়ে ভয়াবহ মাস্তানের নাম রাজন। এলাকায় যার নাম শুনলেই থরথর করে কাঁপে। রাজন তার গ্যাং সহ যেই দলটি পরিচালনা করে তার নাম ‘ রাজন অ্যান্ড ব্রাদার্স’। এই গ্রুপ ব্রেকফাস্ট হিসেবে প্রতি সকালে একটি বা দু’টি করে ছিনতাই, লাঞ্চে ইভটিজিং, চাপাতি দিয়ে কারো হাত কাটা, মাথা ফাটানো এবং ডিনার করে আরও ভয়াবহভাবে।

bangla golpo



রাজনের সাথে দেখা করতে আমার তিনবার চেকের হাতে পড়তে হলো। সফলতার সাথে চেকিং সম্পন্ন করে আমি রাজনের মুখোমুখি হতেই পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠেছে। এলোমেলো বড় বড় চুল, দাঁড়ি গোফে একাকার। খাচ্ছে ডার্বি সিগারেট কিন্তু গন্ধে আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছে। নিচ থেকে মাথা তুলে তাকিয়ে আমাকে একনজর আপাদমস্তক দেখে নিলো রাজন।
‘ ছবি আনছস?’
‘ জি ভাই। সব নিয়ে আসছি’।
‘ ডিলের কথা মনে আছে তো? ফিফটি ফিফটি’।
‘ একদম ভাই! অর্ধেক আপনার, অর্ধেক আমার’।
‘ ডিলের ব্যাপারে কোনো ঝামেলা করবি ডাইরেক খালাস কইরা দিমু, মনে রাখিস তুই ভাই বেরাদারের পরিচিত দেইখা তোরে ফ্রী সার্ভিস দিতাছি’।
' অবশ্যই ভাই!'
‘ টাইম ক, কখন অপারেশনে যাইতে হইবো?’
আমি রাজনকে সময় বলে দিয়ে সুবোধ বালকের মতো পালিয়ে এলাম। অপারেশন রিনি। এই অপারেশনের নাম রাজন দেয়নি, আমি নিজেই দিয়েছি। বুকে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। অপারেশন রিনি সেই আগুন কিছুটা হলেও কমিয়ে দিবে। আমি শুধু অপেক্ষা করছি বিকেল চারটার জন্য। সময় যেন ধীরে আগাচ্ছে, অপেক্ষা এত কষ্টের কেন?
প্রেমের ব্যাপারে আমি বরাবরই সিরিয়াস। বিপরীতে রিনি আমাকে নিয়ে খেলেছে। ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেটবল কোনো খেলাই বাদ রাখেনি। খেলতে খেলতে যখন আমি খেলার অযোগ্য হয়ে গেলাম, আমাকে ছেড়েই দিয়েছে। এই খেলাখেলির ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটু চিন্তিত। রিনির কোনো আত্মীয় যদি শামীম ওসমানের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে আমি তো শেষই, রাজনের নামও পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাবে চিরতরে।
কিন্তু আমি ওসবে একদমই ভাবছিনা এখন। বুকে চিতার আগুন জ্বলছে। আমার সাথে প্রতারণা করে সে সুখে থাকবে, এটা আমি কখনোই হতে দিবোনা। ভালোবেসে কেন আমি একা কাঁদবো? এমন অনিয়ম কোন সংবিধানে লেখা আছে? রিনির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম আর সে কিনা আমার সাথে মিথ্যে ছলছাতুরি করে দূরে চলে গেলো! অনেক কেঁদেছি, অনেক রাত একা একা বিষন্নতায় ভুগেছি। সে গল্প শুধু আমি জানি আর আমার অ্যাষ্ট্রে জানে।
একবার হঠাৎ মনে এলো এই রাজনের কথা। রিনিকে কিডন্যাপ করিয়ে ওর জীবনে নামিয়ে আনবো জাহান্নামের আগুন। যে আগুনে আমি পুড়ছি তার সত্তর গুণ আগুনের তাপ তাকে সহ্য করতে হবে। হাত পায়ের আঙুল কেটে দিতে হবে। নাক মুখ ফাটিয়ে রক্তাক্ত করতে হবে। আজ আমি তাই করবো। আজ সমস্ত প্রতিশোধের আগুনে পানি ঢেলে একটা প্রশান্তির ঘুম দিবো।
বিকেল পাঁচটা। ভাড়া করা ভাঙা মাইক্রোবাস নিয়ে রাজন অ্যান্ড ব্রাদার্স হাজির আমাদের পাড়ার ক্লাবের অন্ধকার ঘরে। রিনির মুখ বাঁধা। রাজনের দু’টো ছেলে রিনিকে টেনে একটা পিলারের সাথে বেঁধে দিলো। কিন্তু হায়! মুহুর্তেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত প্রতিশোধ নিভে গেলো। রিনি মেয়েটাই এমন। হাসুক, কাঁদুক যাই হউক তাকে দেখলেই কলিজা ঠান্ডা (!) করা একটা বাতাস আমাকে বারবার ভাসিয়ে দেয়। আমি যেন আবার প্রেমে পড়ে যাই।
রাজনের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে আমি হতবাক। এক্স গার্লফ্রেন্ডের সামনে আমাকে ছোটো করেনি সে। ওস্তাদ বলে সম্বোধন করছে!
‘ ওস্তাদ, নিয়া আইছি। এবার খালি বলেন কি কি করতে হইবো?’
আমি রাজনকে কোনো আদেশ করতে পারছিনা। গলায় আঁটকে যাচ্ছে বারবার। উত্তর না পেয়ে এবার রাজনের মাথায় আগুন ধরলো-
‘ ওই হালায় ওস্তাদ! কইবেন তো কি কি করতে হইবো?’
প্রেস্টিজের বারোটা বাজার আগেই নিজেকে সামলে নিলাম। গলায় কাশির আওয়াজ তুলে কমান্ডারের ভুমিকা পালন করা শুরু করি। তার আগেই রাজনের এক ছেলে বলে উঠে-
‘ হাতের আঙুল গুলা কাইট্যালান ওস্তাদ’
‘ না!’ , আমি ছেলেকে ধমকে থামিয়ে দিই।
‘ তাইলে এক কাম করেন, চোখ গুলা তুইল্যালান, চোখ দিয়া আমরা ডুগডুগি খেলি’, আরেকজন বললো।
‘ এটাও না!’ , হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিই ছেলেটাকে। রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমাকেই খেয়ে ফেলবে!
‘ এত আকাম করা লাগবো না। ডাইরেক অ্যাকশন। ওস্তাদের লগে রঙবাজি, হু? পিরিতি ছুডাইতেসি খাড়াও, ওই মেশিনডা দে’- এবার রাজন নিজেই বলে উঠলো।
আমি দৌড়ে গিয়ে রাজনকে থামিয়ে দিলাম। কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, ‘ প্রতিশোধের আগুন কি খুনে নিভে? নিভে না!’
রাজন হা করে তাকিয়ে জিগেস করে, ‘ ছাইড়া দিমু ওস্তাদ?’
‘ না!’, কাঁপা গলায় উত্তর দিই। ইশারায় তাকে রিনির কাছে যেতে বলি। রাজন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বোকাদের কেউ ভেবে বসেছে এতক্ষণে। যেই ব্যাগটা দেখিয়েছি, রাজন সেখানে খুঁজে আমার দেয়া একটা চিঠিও পেলোনা। ভিন্ন ভিন্ন ছেলেদের চিঠিতে তার ভ্যানেটি ব্যাগ পূর্ণতা পেয়েছে। হায় প্রেম! এভাবেই মারা খাওয়ালে বারবার!
শেষতক রাজন পেলো। কাঙ্খিত সেই জিনিসগুলো পেয়ে ইউরেকা ইউরেকা বলে চিৎকার করছে। রিনি কিছু বলতে চাইছে তবে পারছেনা। সে বুঝতে পারছে আমরা যা পেয়েছি, রিনির জীবন মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ফোন করার সাথে সাথেই রাজনের ঠিক করা ছেলেটি হাজির।
ভদ্র ঢঙে বললো, ‘ কার কাছে যেতে হবে বড় ভাই?’
ছেলেটাকে থামিয়ে রাজন আমার কানের কাছে এসে শেষবার অনুমতি নিলো, ' ভাই দেহেন, আপনার কেইস, আপনি সামলানোটাই ভালো। খামাখা এই পোলায় আগাইলে পরে ঝামেলা হইতে পারে। ভাই আপনি নিজেই যান। প্রেমিকারে ছোঁয়া পাপ না, যান যান চান্সে একটু...'। রাজন চোখ মেরে মুচকি হাসি দেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, 'ওকে ছোঁয়ার অধিকার আমার নেই। যা করার তোমরা করো। ততক্ষণে আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। তোমাদের কাজ শেষ হলে আমাকে জানিও'।
রাজন মাথায় হাতের আঙুল বুলিয়ে কি কি চিন্তা করলো। আমাকে সাবধান করে দিলো, ' দেইখেন ভাই, ঝামেলা টামেলা হইলে পরে আমি নাই। জীবনে ম্যালা অপারেশন করছি কিন্তু এমন খারাপ অপারেশনে যাইনাই। তার উপরে ভিডিও টিডিও ভাইরাল হইলে তো মানসন্মান শেষ'।
'ওসব আমার উপর ছেড়ে দাও', রাজনকে আশ্বস্ত করলাম।
রাজন হাতের ইশারায় ছেলেটিকে রিনির কাছে পাঠালো। রিনি ভয়ে, আতংকে প্রায় দিশেহারা। আজ সেই প্রতিশোধের দিন। রিনির গাল থেকে ততক্ষণে কাপড়টি সরে গিয়েছে। শেষমুহূর্তে সে আমার কাছে বারবার ক্ষমা চাইছে, কিন্তু আমি এখন কোনোভাবেই ক্ষমা করবোনা। ক্ষমা করার কাজ সে করেনি।
ছেলেটির স্পর্শে রিনির আর্তনাদে যেন পৃথিবী কেঁপে গেলো। না না- কান্নার সাথে চিৎকার আরও বেড়ে গেলো রিনির। আমার মুখে তখন বিজয়ীর হাসি। প্রতিশোধের যে আগুন জ্বলছিলো এতদিন, সে আগুন নিভে গেলো মুহূর্তে। কিছু সময় পর ছেলেটি হাসিমুখে আমাদের সামনে এসে বললো, ‘ বড় ভাই কমপ্লিট। আফার বায়োমেট্রিক হইয়া গেছে। আপনারা এখন খালি দুই কপি ছবি আর ভোটার আইডি কার্ডটা দিলেই দুইটা অপরাজিতা সিম আপনাগোরে দিয়া দিমু’।
রাজন রিনির ব্যাগ থেকে বের করা ছবি ও আইডি কার্ড দিয়ে অপরাজিতা সিম বুঝে নিলো। সুন্দর দেখে একটা নাম্বার আমাকে দিয়ে আরেকটা নাম্বার নিজের পকেটে ঢুকিয়ে সফলভাবে অপারেশন শেষ করলো। রিনির বাঁধন খুলে আবার তাকে গাড়িতে উঠিয়ে আমাকে সালাম দিয়ে বিদায় নিলো গ্যাঙের ছেলেরা। যাবার পথে রিনি আমাকে ধিক্কার জানালো। ঘৃণা নিয়ে বললো, ‘ ছোটোলোক!’


রাজনরা চলে যাচ্ছে। প্রতিশোধের আগুন নিভে এখন শুধু প্রশান্তির হাওয়া বইছে বুকের ভেতর। আস্ত এক ঢেকুর তুলে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করি। অপরাজিতার প্যাকেটে তাকাই, আহ অপরাজিতা! বাহ অপরাজিতা!

লেখা: রাফি আদনান আবির
SHARE

Author: verified_user