Friday

গল্প: কনে - লিখেছেন: শিরীন সাবিহা তন্ব | Bangla Golpo Kone

SHARE

                                         গল্প: কনে - লিখেছেন: শিরীন সাবিহা






চাকরীর পরীক্ষার সময় দাদা বাড়ীর ঠিকানা আমি ইচ্ছে করেই দিয়েছি বাবাকে রাগাতে।আজ প্রায় নয় বছর ধরেই আমি বাবার সাথে এক অলিখিত যুদ্ধ করে যাচ্ছি।বাবা চাইল আমি সাইন্স ছেড়ে ডিইউ তে বিসনিস ফ্যাকাল্টি তে পড়াশুনা করি।আমি তাই বেশী বেশী খাঁটুনী করে মেডিকেল কোচিং করে ডাক্তারীতে চান্স নিয়েছি।
পাস করবার সাথে সাথেই বাবা চাইলেন আমি দেশের বাইরে চলে যাই।আমি চাইলাম সরকারী চাকরী করব।বাবা চায় আমি তার টাকায় লাক্সারী করি।গাড়ী করে ক্লিনিকে ডিউটি করি।আমি তাই বাসে ঝুলে ঝুলে ডিউটিতে যাই।আর এবার তো তার স্বপ্নে গড়া ঢাকার প্রাসাদ ছেড়ে আমার গ্রামে ই রওয়ানা করছি।
এখন আমি বাবার একমাত্র মেয়ে।আমার পরে তিনটে ভাই বোন হয়েছিল।কেউ এক বছরের বেশী বাঁচেনি।


See More :  Sad Photo Collection


আমার জন্মের সময় দাদা,বাবা খুব গরীব ছিলেন।বাবার গ্রামের পাশের বাড়ীর বন্ধু তার বোনদের বিয়ে দেয়,দোকান করে দেয় এমনকি বাবা - মায়ের বিয়ে দেয়।বাবার বন্ধুর ছোটবেলাতেই বিয়ে হয়েছিল।আমার জন্মের সময় তার তিন ছেলে।ছোট ছেলের সাথে দাদাজান আমার বিয়ে ঠিক করেন আমার জন্মের দিন।
দাদীর মুখে শুনে শুনে বুঝতে শেখা থেকে জন্মদিনে আমি বিয়ের দিন মেনে এসেছি।
আমার তিন বছর বয়সে আমরা ঢাকাতে আসি।বাবার এখন সাত আটটা ব্যবসা।আমরা অনেক বড়লোক।কিন্তু আমি যে মনে মনে সেই গ্রামের ই এক বালকের গৃহবধু সেই বালিকা বয়স থেকে।
বাবা তার বন্ধুকে দেয়া কথা ভাঙ্গতে পারেন।আমি নিজেকে দেয়া কথা ভাঙ্গি কিভাবে?
বরকে প্রথম দেখেছিলেম এইচ এস সি পরীক্ষার পরে।নৌকা চড়ে বেড়াতে গিয়েছিলাম।সে তো ভীষন মুখচোরা।সেদিন প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টিতে নৌকার ছৈ এর ভিতরে বসে প্রথম বউ ডেকেছিল।আমার মনের পর্দা তো সেদিন ই উন্মোচিত ছিল।সে আমাকে স্পর্শ করেনি।অপবিত্র ও না।হাতটা চেয়েছিল।বাড়িয়ে দিলাম।দুহাতে ধরে বসে ছিল অনেকক্ষন।বলল জীবনে প্রথম কোন মেয়ের হাত ধরলাম।এই হাত ধরব বলে সারাটা জীবন কোন মেয়ের আঙ্গুল ও ছুঁয়ে দেখিনি।
বাবার ধারনা ঐ রাতে ফারহান আমার শ্লীলতাহানি করেছে।যে মেয়ে জন্ম থেকে ঐ পুরুষের জন্যেই নিজেকে তৈরী করেছে তার শ্লীলতা কি আর ঐ রাতের ভাজে লুকায়িত থাকে?
আমার পোষ্টিং হয়েছে আমার গ্রামে।আমার শ্বশুড় মহাশয়ের খামার বাড়ীর পাশেই উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে।আমি কাউকে কিছু না জানিয়েই গ্রামে এসেছি।
আমার উনি বাবা মাকে ছাড়া থাকবেন না।গ্রাম এখন অন্য রকম।ব্রীজ হয়েছে।খামার বাড়ী থেকে আধ কিলোমিটার দূরে বিশ্ববিদ্যালয়।আমার বালিকা বেলার বরটি এখন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক।
আমি এসেছি তিন দিন।তিনি বাড়ীতে নেই।ট্যুরে গেছে।মা তাকে কিছু জানায়নি।
আমি এসে বাড়ীতে ঢোকার পর শ্বশুড় শ্বাশুড়ী এমন ভান করলেন যেন জানতেন,ঐ পুলিশি হামলার পর ও এমন একদিন বাক্স পেটরা হাতে আমি আসব।
তার ফিরতে বেশ রাত হলো।ঢিপঢিপ বুকে জেগে ছিলাম।বাবা মা ঘুমিয়েছে।দরজায় ঠক পরতেই দরজা খুললাম।আজ আমি শাড়ী পরেছি।লাল।একটা টিপ ও পরেছি।আর না চাইতেই পরেছি লজ্জা।
সেই মানুষটা একরাশ বিস্ময় আর লজ্জা চোখে নিয়ে দাঁড়িয়ে।হেংলা পাতলা ছোকড়া এখন একটু ভারী হয়েছে।হালকা মেদ জমেছে।
বাবা মাকে আর জাগালাম না।খাওয়া শেষে বারান্দায় বসলাম।আজ আমি ওর হাতটা চাইলাম।খুব শক্ত করে ধরলাম।
এই পৃথিবীতে বিয়ে নামক শব্দটা খুব অদ্ভুত।একটা নীল রঙ্গা দলিল আজন্মের অচেনা দুটো মানুষকে তাদের সব অধিকার হস্তান্তর করে দেয়।আর ঐ নীল দলিলের অভাবে আজ এতগুলি বছর এই হাতের বন্ধন পেয়েও বন্ধনহীন আমি।
আজ আমার এই বসে থাকা বড্ড ভালো লাগছে।ফারহানের চোখের জল টপটপ করে আমার হাতের তালুতে পরছে।মুখচোরা বরটি আমার চোখের জল লুকোতে ব্যস্ত!
সুদীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর শেষ প্রায়।বাবা মাকে বলবে একটা নীল দলিলে কালো অক্ষরে এই মানুষটাকে সারা জীবনের তরে আমাকে করে দিতে।
জন্ম থেকে যে জীবনের জমজ পথে একা চলেছি,কাল থেকে সেই পথে এই হাত দুটি ধরে দুজনেই চলতে চাই।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল অনেকক্ষন।
শেষ রাতে তুমুল বৃষ্টি।এতক্ষনে হাসল সে।নৌকা,বৃষ্টি,পুলিশ.......
বিদ্যুৎ নেই।হঠাৎ ই টের পেলাম দুটো তৃষ্ণার্ত উষ্ণ ঠোঁট খুঁজছে আমায়।
লিখেছেন: শিরীন সাবিহা তন্বী
SHARE

Author: verified_user