Friday

গল্প: স্বপ্ন। লিখেছেন: মৃ ন্ম য়ী

SHARE
গল্প: স্বপ্ন। লিখেছেন: মৃ ন্ম য়ী।

                                                            গল্প: স্বপ্ন।
                                                     লিখেছেন: মৃ ন্ম য়ী।


অনামিকা বই হাতে নিয়ে বসেছে। আজ রবিবার। ব্যান্ডেজ করা ডান হাতে বই, বাম হাতে এক কাপ কড়া লিকারের চা। আজ সে কিছুতেই ঘুমাবে না। ইদানীং বিকালের ঘুমকে সে কিছুতেই এড়াতে পারছে না। অথচ তার কখনোই এ অভ্যাস ছিল না।
ছোটবেলায় মায়ের ধমক খেয়েও কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকত মায়ের ঘুমের অপেক্ষায়। মা ঘুমিয়ে গেলেই আস্তে আস্তে উঠে দৌড়। একটু বড় হওয়ার পর পড়াশোনা, টিউশন। ঘুমের জন্য সময়টাই পাওয়া যেত না। আর এখন তো সে নিজেই পড়ায়। একটা স্কুলে জয়েন করেছে বছরখানেক হল। বিকালে সময় কাটাবে বলে একটা টিউশন শুরু করেছে। ক্লাস ওয়ানে পড়া একটা মিষ্টি ছেলে। আয়ুষ। দুষ্ট না হলেও গল্প করতে পছন্দ করে খুব। বাসায় পড়াতে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার সারাদিনের গল্প আর অনেকরকম প্রশ্ন। অনামিকার ভালোই সময় কেটে যায়।
আয়ুষের ফাইনাল শেষ হয়েছে। তাই অনামিকার এখন পুরো বিকাল অবসর। সেই থেকে বাসায় থাকলেই তার ঘুম পেয়ে যায়। ঘুমটা সমস্যা নয়। সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
গত রবিবার বই হাতে নিয়ে বিকালে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। স্বপ্ন দেখাটা সেদিনই প্রথম। প্রচন্ড ঝুম বৃষ্টি, গাঢ় কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, অনামিকা দাঁড়িয়ে আছে একটা যাত্রী ছাউনির নিচে। বৃষ্টির কারণে কোন রিকসা নেই, ছাতাটাও সাথে আনা হয়নি। এক হাতে কিছু শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে পার্স। হঠাৎ প্রচন্ড স্পিডে মোটরবাইকে করে দুটো ছেলে এক টানে তার হাত থেকে পার্সটা নিয়ে চলে গেল। আচমকা এমন টানে নিজেকে সামলাতে না পেরে পড়ে গেল সে। হাতের উপর চাপ পড়ায় ডান হাত কেটে রক্ত পড়তে লাগল গলগল করে। অনামিকা রক্ত সহ্য করতে পারে না। রক্তের দিকে আতঙ্ক নিয়ে তাকাতেই তার ঘুমটা ভাঙল। শরীর ঘেমে গেছে। তখনও সন্ধ্যা হয় নি। হাতঘড়িটা পাশেই ছিল। মাত্র ৫ টা বাজে। অথচ তার মনে আছে সে বই পড়ার মাঝেই সময় দেখেছিল ৪:৪৮।
দুঃস্বপ্ন দেখাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অস্বাভাবিক সেটা সত্যি হয়ে যাওয়া। ঠিক পরদিন তাকে বের হতে হয়েছিল কিছু কেনাকাটা করার জন্য। নিতান্ত প্রয়োজনেই। শপিং তার পছন্দনীয় কিছু নয়। ফেরার পথে শুরু হল বৃষ্টি। অথচ যখন বাসা থেকে বের হয়েছিল, বৃষ্টির কোন আভাসও ছিল না। কাজেই ছাতা আনা হয় নি। কাছাকাছি যাত্রী ছাউনিটা দেখে ওখানেই দাঁড়িয়েছিল। আশেপাশে তেমন কেউ নেই। তারপর? আবার পুরোটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি না। স্বপ্নের এতটুকুও এদিকসেদিক হয় নি।
সেই থেকে একটা ভয় ঢুকে গেছে। দু'রাত ভাল করে ঘুমাতে পারে নি সে। প্রথমত এমনটা হওয়া কিভাবে সম্ভব বুঝতে পারছিল না। আর দ্বিতীয়ত ঘটনাটা একটা ট্রমা তৈরী করেছিল। তারপর তৃতীয় রাতে ক্লান্তিতে খুব ভাল ঘুম হল। দুঃস্বপ্ন দূরে থাক, কোন স্বপ্নই আর বিরক্ত করতে আসে নি।
কিন্তু ঘটনাটা ভুলে যাওয়ার কোন উপায় ছিল না। এই বিপদের রেশ কেটে যাওয়ার পর থেকেই বিকালের ঘুমে কোন না কোন একটা স্বপ্ন সে দেখছেই। রাতে ঘুম ভাল হয়, কোনরকম সমস্যা হয় না। কিন্তু বিকালে ঘুমালেই কিছু একটা স্বপ্ন দেখবেই। তেমন ভয়ংকর কিছু না হলেও যা সে দেখে ঠিক পরপরই বা পরদিন সেটা ঘটে যায়। যেমন হঠাৎ কোন অতিথির বাসায় চলে আসা, কিংবা পরিচিত কারো অনেকদিন পর কল করা, বা কোন জিনিস পড়ে ভেঙে যাওয়ার মত ঘটনা।
এরপর থেকে বিকালে না ঘুমানোর চেষ্টা করে যায় সে। হয় বাইরে কোথাও বের হয়ে যায়, নয় ছাদে গিয়ে সময়টা কাটিয়ে দেয়। ঘরে থাকলে কোন না কোনভাবে ঘুমিয়ে পড়ে নিজের অজান্তেই। একটা আতঙ্ক ঘিরে থাকে সবসময়, যদি কোন বাজে স্বপ্ন আবার দেখে বসে! এর চেয়ে ভাল বিকালে না ঘুমানো। তাই এত প্রচেষ্টা। আর এ কারণেই কড়া চা। চা খেলে হয়ত ঘুম আসবে না।
একটা রিকসা। বসে আছে আয়ুষ। হাতে চিপসের প্যাকেট। সাথে কে বসে আছে বোঝা যাচ্ছে না। চিপসের প্যাকেট হাতে পাশে থাকা মানুষটার সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে ছেলেটা। তারপরই আঙুল তুলে সামনের দিকে কি যেন একটা দেখালো। দূর থেকে একটা বাস এগিয়ে আসছে খুব দ্রুত। অনামিকা ঘুমের মাঝেই বুঝতে পারল, এটা তার স্বপ্ন, এটা সে কিছুতেই দেখবে না। অন্য কিছু দেখতে হবে। বাসটা আরো কাছে চলে আসছে। রিকসাটা তাড়াতাড়ি সাইড করাতে হবে। চিৎকার করতে হবে। কিছু একটা করতেই হবে। সে চেষ্টা করল যা দেখছে তা বদলে ফেলার। চেষ্টা করল দেখতে বাসটা আসলে দ্রুত আসছে না। চেষ্টা করল রিকসাটা থামাতে। চেষ্টা করল বাসটাকে থামাতে। শুনতে পেল কে যেন ডাকছে, "অনু, ওঠ। এখানে বসে বসে ঘুমাচ্ছিস কেন? ওঠ? বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়।" রিকসাটা থেমে গেছে। কিন্তু বাসটা এখনও এগিয়ে আসছে। খুব কাছে। বাসটাকে থামাতে হবে।
ঘুমটা ভেঙে গেল। অনামিকা ঘেমে গেছে। দেয়ালে হেলান দিয়ে বারান্দায় বসে ছিল। পাশে চায়ের কাপ। এখনও ধোঁয়া উঠছে। বইটা হাত থেকে পড়ে গেছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। একটা সূক্ষ্ম ব্যথা। কিছুক্ষণ জোরে নিঃশ্বাস নিল সে। তারপর মোবাইলটা হাতে নিল। কাঁপা হাতে আয়ুষের বাসার নাম্বারটা বের করে ডায়াল বাটনে টাচ করল। রিং হচ্ছে। কেউ এখনও কলটা ধরছে না। অনামিকার গলা শুকিয়ে গেছে। একবার ঢোক গিলে কান পেতে আছে মোবাইলে।
একঘেয়ে শব্দটা একের পর এক বেজে চলেছে....
SHARE

Author: verified_user