Wednesday

Bangla Golpo Book | দাবার ঘুঁটি - আহসানুল হক শোভন

SHARE

            দাবার ঘুঁটি - আহসানুল হক শোভন





[এক]
বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা ছুরিটা জায়গামত আছে কিনা, হাত দিয়ে স্পর্শ করে জুলেখা আরেকবার নিশ্চিত হলো। গত কয়েকদিন ধরে ওর শরীরের ওপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিশোধ নেবে আজ। জুলেখাকে পারতে হবে, যেমন করেই হোক।
জুলেখার বয়স ষোলো। গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলায়। দুই ভাই চার বোনের বড় সংসার। বাবা রিকশাচালক। মা বিভিন্ন বাসা বাড়িতে গৃহ পরিচারিকার কাজ করে বেড়ায়। ভাই দুটোকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলেও বোনগুলোকে বাসায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। ভাই বোনদের মধ্যে জুলেখা দ্বিতীয়। বড় বোন সালমার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। সালমা দেখতে খুব একটা ভালো নয়। তাই বিয়ের ব্যাপারটা এগুতে গিয়েও বার বার ভেস্তে যাচ্ছে। গরীবের মেয়ে সুন্দরী হলে সমস্যা। আর দেখতে খারাপ হলে মহা সমস্যা। এই যেমন জুলেখা বাহ্যিক দিক থেকে দেখতে শুনতে ভালো, এটা নিয়েও সালমার বিয়েতে সমস্যা হচ্ছে। সালমাকে দেখতে এসে পাত্রপক্ষ জুলেখাকে পাত্রী হিসেবে পেতে চাইছে। জুলেখাকে লুকিয়ে রেখেও লাভ হচ্ছে না। পাত্রপক্ষ কিভাবে যেন খবর পেয়ে যায়। আসলে গরীবের সমস্যা সব জায়গাতেই!
এই বাড়ির বেগম সাহেবার বাবার অনুরোধে জুলেখার দূরসম্পর্কের এক চাচা ওকে ঢাকায় দিয়ে গেছে। বেগম সাহেবা ওদের গ্রাম সম্পর্কের ফুফু হন। বছরখানেক হলো বিয়ে হয়েছে। এখনও বাচ্চা-কাচ্চার ঝামেলায় যাননি। চাচা বলেছিলেন, কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া বেগম সাহেবার পরিবার ওদের পূর্ব পরিচিত হওয়ায় জুলেখার বাবা আর না করেননি।
শুরুর বেশ ক’টা দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। আযাবটা যেদিন নেমে আসে, সেদিন ছিলো সাপ্তাহিক ছুটির দিন। শুক্রবার। বেগম সাহেবা তার বান্ধবীদের সঙ্গে শপিং করতে গিয়েছিলেন। বেগম সাহেবার অনুপস্থিতির সুযোগে..! সেদিনের সেই ঘটনার কথা আর মনে করতে চায় না জুলেখা। সম্পর্কে লোকটা নাকি ওর ফুফা! ফুফা? হুঁহ!
খুব ঘুম পাচ্ছে জুলেখার। আজ ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। জোর করে চোখ খোলা রেখে আগের কথাগুলো ভাবতে থাকে জুলেখা। 


Bangla Golper Boi


বেগম সাহেবার বাইরে ঘোরার অভ্যাস। আর সেই সুযোগে ফুফা নামধারী পাষণ্ড লোকটা দিনের পর দিন ওর শরীরের ওপর নির্যাতন চালিয়ে গেছে। বেগম সাহেবাকে বেশ কয়েকবার বলার চেষ্টা করেও বলতে পারেনি। জুলেখা কথা শেষ করার আগেই তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। ওর কথা আমলেই নেননি। ঘটনা কানে যাবার পর লোকটার সাহস আগের চাইতে অনেক গুণ বেড়ে গেছে। স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়লে চুপিচুপি উঠে জুলেখার সার্ভেন্টস রুমে চলে আসে। সার্ভেন্টস রুম মানে কিচেনের পাশে প্যাসেজের মত সরু খানিকটা জায়গা। কোনো দরজা নেই। তাই জুলেখা চাইলেও দরজা আটকে ঘুমাতে পারে না। ইদানীং প্রায় প্রতি রাতেই ধর্ষণের শিকার হতে হয় ওকে।
টিভিতে এমন অনেক নাটক দেখেছে জুলেখা। ও জানে এই দেশে গরীবের ওপর অত্যাচারের কোনো বিচার নেই। থানা পুলিশ করেও লাভ হবে না। মানুষরূপী পশু লোকটা উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। মাঝে মধ্যেই বাসায় পুলিশ আসে। লোকটাকে সসম্মানে স্যালুট ঠোকে। এ্যাসকর্ট করে নিয়ে যায়। এই লোকের নামে পুলিশের কাছে বিচার দিয়েও কোনো লাভ হবে না। উল্টো সুযোগ পেয়ে পুলিশেরা ওর শরীর ব্যবহারের লাইসেন্স পেয়ে যাবে। এমনকি এই কথাগুলো জেনে গেলে ওর নিজের বাবা-মা’ও আর ওকে ফেরৎ নিতে চাইবে না।
গত কয়েকদিন ধরে অনেক চিন্তা ভাবনা করে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে জুলেখা। যা করার ওর নিজেকেই করতে হবে। রাতে লোকটা ওর শরীরের ওপর নির্যাতন চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে যখন গা এলিয়ে দেয়, ঠিক ওই সময়টাতেই ওকে কাজ সারতে হবে। কাজটা করতে পারলে লোকটা আর কখনও কোনো মেয়ের সর্বনাশ ঘটাতে পারবে না।
অসম্ভব ঘুমে চোখ দুটো কেন জানি জড়িয়ে আসছে। অন্যদিন এত তাড়াতাড়ি ঘুম পায় না ওর। বলতে গেলে সারারাত ঠিকমত ঘুমই হয় না। আজ কেন যে এত তাড়াতাড়ি..!
গ্রামে থাকাকালীন নিজ হাতে অনেকবার মুরগী জবাই করেছে জুলেখা। আজকের ব্যাপারটা যদিও মুরগী জবাই করার মত সহজ নয়। তাতে কি? ছুরিটাতে অনেক ধার। বাথরুমে গিয়ে উরুর একটা জায়গায় হালকা টান দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। অল্প একটু টানেই ঘ্যাঁচ করে অনেকখানি কেটে গিয়েছে। ছুরিটা লোকটার ধরে গায়ের জোরে একটা পোঁচ মারতে পারলেই জবাই করা মুরগীর মত তড়পাতে থাকবে।
আজ বেগম সাহেবা নিজ হাতে মাংস রান্না করেছেন। বেগম সাহেবার রান্নার হাত বেশ ভালো। অনেক মজা করে খেয়েছে জুলেখা। কে জানে, এই বাড়িতে এটাই ওর শেষ খাওয়া হয় কিনা!
অনেক চেষ্টা করেও চোখ দুটো খোলা রাখতে পারছে না জুলেখা। আজ এত তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসছে কেন বুঝতে পারছে না। আজ ওর জেগে থাকার রাত। ঘুমিয়ে পড়লে চলবে কিভাবে?
সার্ভেন্টস রুমে ঢোকার পথটায় কারও ছায়া চোখে পড়লো জুলেখার। নরপশুটা তাহলে চলে এসেছে। ঘুম ঘুম চোখেও বুঝতে পারছে, কেউ ওর সালোয়ারের ফিতা খুলে শরীরের ভর চাপিয়ে দিচ্ছে। জুলেখা কোনোভাবেই চোখ খোলা রাখতে পারছে না। ঘুমটাকে আজ খুব আপন বলে মনে হচ্ছে। জাহান্নামে যাক দুনিয়া। জুলেখা আজ একটু শান্তিতে ঘুমিয়ে নিবে।
[দুই]
গালে প্রচন্ড জোরে চড় খেয়ে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলো জুলেখা। চড়টা দিয়েছে জুলেখার সামনে দাঁড়ানো খাকি শাড়ি পড়া দশাসই এক মহিলা। চোখ গরম করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। জুলেখা এর আগে কখনও মহিলা পুলিশ দেখেনি। উনি যে একজন মহিলা পুলিশ, ঘুম ঘুম চোখে এটা ঠাহর করতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো। বিছানার ওদিকটায় দাঁড়িয়ে বেগম সাহেবা ফোঁৎ ফোঁৎ কাঁদছেন। কাঁদতে কাদতেই আরেকজন পুলিশ অফিসারের কাছে কি কি যেন সব বলছেন।
কি হয়েছে? জুলেখা কিছুই বুঝতে পারছে না। চারপাশে এত পুলিশ কেন? ওকেই বা চড় মারা হলো কেন? কি করেছে ও? কিছু তো চুরি করেনি। তাহলে? চড় তো মারা উচিৎ ফুফা নামধারী ওই পাষন্ডটাকে। ফুফার কথা মনে হতেই মেঝের দিকে চোখ গেলো জুলেখার। নিজের অজান্তে ভয়ে গলা দিয়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো। ফুফা নামধারী পাষন্ডটা রক্তমাখা শরীরে মেঝেতে পড়ে আছে। গলা দু’ফাঁক। গায়ে একটা সূতোও নেই। মেঝেতে চাপ চাপ জমাট বাঁধা রক্ত।
[তিন]
“গত কয়েকদিন যাবৎ ওর কাজকর্মে একটু একটু সন্দেহ মনে দানা বেঁধেছিলো। তারপরও ওকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি আমি। ভেবেছি, যদি ধারণা ভুল হয় ভীষন লজ্জায় পড়ে যাবো।”
হুম! আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। উনি যে নিয়মিত রাতেরবেলা চুপি চুপি বিছানা ছেড়ে কাজের মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে যেতেন, তার কিছুই কি আপনি টের পেতেন না?
“আমার ঘুমের সমস্যা থাকায় ডাক্তার আমাকে ঘুমের বড়ি দিয়েছেন। ওষুধ খেয়ে ঘুমানোয় কিছু টের পেতাম না। ব্যাপারটা ও জানতো। তারপরও দু’একবার যে টের পাইনি, তা নয়। ভেবেছি, হয়তো টয়লেটে গিয়েছে। এক্ষুণি ফিরে আসবে। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছি।”
মেয়েটি কখনও আপনার স্বামীকে নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি?
“না, করলে তো আমি সাথে সাথেই ব্যবস্থা নিতাম।”
মাত্র এক বছর হলো নাকি আপনাদের বিয়ে হয়েছে। এই এক বছরেরই..!
স্বাতী ওর মুটিয়ে যাওয়া শরীরটার ওপর পুলিশ অফিসারের নোংরা দৃষ্টি অনুভব করলো। বোঝাই যায়, অফিসার আসলে কি বোঝাতে চাইছে। এক বছরেই কেন বউয়ের শরীর থেকে স্বামীর মন উঠে গিয়েছে। “কুত্তার বাচ্চা” মনে মনে অফিসারটিকে একটা গালি দিলো স্বাতী। নোংরা চরিত্রের মানুষদের এক বছর কেন, একদিনও লাগে না। যেমন তুই!
“তাহলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াচ্ছে যে, দিনের পর দিন আপনার স্বামীর শারীরিক নির্যাতন সইতে না পেরে আপনাদের গৃহকর্মী.. কি যেন নাম বললেন.. ‘জুলেখা’.. হ্যাঁ, জুলেখা তাকে সঙ্গমরত অবস্থায় অথবা সঙ্গমের ঠিক পর পরই গলা কেটে হত্যা করে। এরপর সে নিজেও অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এই তো?
আমি জানি না! আমি কিচ্ছু জানি না! কান্নার দমকে স্বাতীর পিঠ ফুলে ওঠে।
“ঘুমের ওষুধের পাতাগুলো মেয়েটার বিছানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আপনি বলছেন আপনার ড্রয়ার থেকে কয়েক পাতা ওষুধ খোয়া গিয়েছে। ঠিক কি কারণে আপনার কাছে এত ঘুমের ওষুধ ছিলো?”
আপনাকে একটু আগেই জানিয়েছি, আমার ঘুমের সমস্যা আছে। ডাক্তার প্রেসক্রাইব করেছেন। আমার কথা বিশ্বাস করতে না চাইলে আপনি ডাক্তার মবিনের সঙ্গে কথা বলে দেখতে পারেন।
“না, ঠিক আছে। অবিশ্বাস করার কিছু নেই। কিছু মনে করবেন না, আসলে আপনার ড্রয়ারে ঘুমের ওষুধের পরিমাণটা..!”
কাউকে ফার্মেসিতে পাঠিয়ে ঘুমের ওষুধ আনানোটা বেশ ঝামেলার। দোকানদার দিতে রাজী হয় না। তাই আমি নিজে বাইরে বেরোলে একসাথে বেশ কয়েক পাতা কিনে রেখে দিই।
“ওগুলো যে ঘুমের ওষুধ, মেয়েটা তা জানতো?”
একদিন জানতে চেয়েছিলো, আমি এসব কিসের ওষুধ খাই। তখন বলেছিলাম।
“হুম! গ্রামের মেয়েতো। বোধহয় বুঝতে পারেনি। এখন আর দু’তিন পাতা ঘুমের ওষুধ খেয়ে কেউ মরে না। নাটক সিনেমায় এসব ভুল জিনিস দেখে মগজে ঢুকে গেছে।”
স্বাতী কিছু না বলে চোখ মোছে।
“ওয়েল, আমাদের প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশনে কেসটা বেশ সিম্পল বলেই মনে হচ্ছে। ধর্ষণ করতে গিয়ে গৃহকর্মীর হাতে গৃহকর্তা খুন। অতঃপর ঘুমের ওষুধ সেবন করে গৃহকর্মীর আত্মহত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। আচ্ছা, মেয়েটার বয়স তো আঠারোর কম বলে মনে হচ্ছে! কত হতে পারে, বলতে পারবেন?”
আ-আমি জানি না। ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন।
“আপনাদের গ্রামের মেয়ে, পূর্ব পরিচিতা তাই জানতে চাইলাম। ঠিক আছে, থানায় নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করবো। পরে হয়তো আরেকটা ইনভেস্টিগেশন টিম আসতে পারে। চিন্তা করবেন না, রুটিন কোয়েশ্চেন। ওদের আমি বলে দেবো, খুব বেশী বিরক্ত করবে না। আপনি কি আজ এখানেই থাকবেন?”
না, আমার বাবা-মা আমাকে নিতে আসছেন। তারা এলে আমি বাবার বাসায় চলে যাবো।
“তা যান, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে ঢাকার বাইরে কোথাও যেতে পারবেন না। এরপর থেকে যে কোনো প্রয়োজনে আমরা তাহলে আপনার বাবার বাড়িতেই যোগাযোগ করবো?”
জ্বি, ওখানেই করবেন।
হাতকড়া পরিহিত জুলেখা এখনও তার বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দু’চোখে শূণ্য দৃষ্টি নিয়ে পুলিশের গাড়িতে উঠে বসলো।
স্বাতী দরজা বন্ধ করে মোবাইল হাতে নিয়ে ডাক্তার মবিনকে ফোন দেয়।
“হ্যালো! প্রাথমিক ধাপ বেশ ভালোভাবেই উৎরে গেছি!” স্বাতীর কন্ঠে উচ্ছ্বাস।
গুড জব! আশা করি, পরের ধাপগুলোও ভালোভাবে উৎরে যেতে সক্ষম হবে।
(সমাপ্ত)


----------------------------------------------------------
                 রক্ততৃষ্ণা।। রাকিব হাসান।



একমনে গল্প লিখে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রথম সারির উপন্যাসিক রায়হান আহমেদ। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এই লেখকের প্রায় প্রতিটা বইই বেস্টসেলার। বাংলার পাঠক সমাজের কাছে তিনি দ্বিতীয় হুমায়ূন নামেই বেশি পরিচিত। রোম্যান্টিক থ্রিলার দিয়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করা রায়হান আহমেদ মূলত মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসই বেশি লেখেন।
.
ব্যাকস্পেস চেপে পুরো লেখাটাই আবার তিনি মুছে দিলেন। প্রচণ্ড রাগ উঠছে তাঁর। এই নিয়ে তিনবার এমন হলো। প্লট ঠিক করেই লিখতে বসছেন প্রতিবার, কিন্তু মাঝখানে যেয়ে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছেন।
.
আজ মনে হয় আর হবে না। ভাবলেন তিনি। এমন হচ্ছে কেন তিনি নিজেই বুঝতে পারছেন না। তাঁর তো কখনোই এমন হয় না। কিবোর্ড হাতে নিলেই সবসময় তাঁর লেখক সত্তা জ্যান্ত হয়ে ওঠে।
.
দেয়ালের টিকটিকিটা শব্দ করে ডেকে উঠলো। চমকে উঠে সেদিকে তাকালেন তিনি। টিকটিকিটার উপর কিছুটা বিরক্ত লাগছে তাঁর। ইচ্ছে করছে জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে।
.
ড্রয়িংরুমের গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা শব্দ করে ডেকে উঠলো। তিনটা বেজে গেছে-বুঝতে পারলেন তিনি। ঘুমে দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর। ঢুলুঢুলু চোখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। এমন সময় বইয়ের সেলফটার পাশে একটা ছায়া নড়ে উঠলো। চোখে এড়ালো না মধ্যবয়স্ক লেখকের। সচেতন হয়ে উঠেছেন তিনি। .
“কে ওখানে?”-গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন তিনি।
“নিতু?” আবার প্রশ্ন করলেন। স্ত্রীর নাম।


Bangla Golpo Book 
ছায়াটা আস্তে আস্তে সেলফের আড়াল থেকে বের হলো। চমকে উঠলেন রায়হান আহমেদ। লাইটের আলোয় ছায়াটা তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ছায়াটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
কার ছায়া এটা? ছায়ার মালিকটা কে? সে কি অদৃশ্য কেউ? তা কিভাবে সম্ভব? অদৃশ্য হলে ছায়া পরবে কিভাবে? কিন্তু তিনি তো ভুলও দেখছেন না।
স্বপ্ন দেখছেন না তো তিনি?-ভাবছেন। কিন্তু স্বপ্ন কিভাবে এতো জীবন্ত হয়? তাছাড়া স্বপ্নে তো মানুষ সব ধূসর দেখে। কিন্তু সে তো সব রঙই দেখতে পাচ্ছেন।
আস্তে আস্তে ছায়াটা এগিয়ে আসছে। হুট করেই অসম্ভব রকমের ভয় পাওয়া শুরু করলেন রায়হান আহমেদ। কি হতে পারে এটা?
.
“আসসালামু আলাইকুম”- স্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল ছায়াটা। রায়হান আহমেদের সামনে হুট করেই উদয় হলো অবয়বটা। সৌম্যমূর্তি। বয়স অনেকটা রায়হান আহমেদ কাছাকাছি। আবার কিছু বেশীও হতে পারে। মাথায় এলোমেলো কাঁচাপাকা চুল। মুখে হালকা দাড়ির রেখা।
“অ.আআ..লাইকুম আসসালাম।” তোতলাতে তোতলাতে সালামের উত্তর দিলেন তিনি। ভয় পেলেও সামলে নিয়েছেন নিজেকে। একেবারে ভীতু নন তিনি। লেখালেখি শুরুর প্রথমদিকে অনেক আজেবাজে জায়গায় ঘুরেছেন তিনি। কুচকুচে কালো অমাবস্যায় কিংবা ভরা পূর্ণিমায় একা একা শ্মশানঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন যে কত রাত তার কোন ইয়ত্তা নেই। তবে তার দুর্ভাগ্যই বলতে হবে কারন কখনোই তার চোখে কিছু পড়েনি। হতাশ হয়ে এসব তাই ছেড়ে দিয়েছেন আজ অনেকদিন হলো।
“গল্প শুনবেন? আমি আপনাকে গল্প শোনাতে এসেছি। অবশ্য আপনি যদি শুনতে আগ্রহী থাকেন। রাত তো কম হলো না!”
রায়হান আহমেদ বুঝতে পারলেন তাঁর প্রচণ্ড রাগ উঠছে। রাত দুপুরে এসব কি?
“আপনি কে?” হালকা গলায় প্রশ্ন করলেন তিনি। “আর গল্পই বা শোনাতে চান কেন আমাকে?”
খুক খুক করে একটু কাশলো ছায়ামানব। “আমার পরিচয়টা কি খুব জরুরী? না গল্প?”
রায়হান সাহেবের মাথায়ই আসছে না ইনি এখানে ঢুকলেন কিভাবে? লাইব্রেরীতে তাঁর স্ত্রীরই আসা নিষেধ আর ইনি! নিরিবিলি পরিবেশ ছাড়া লিখতে পারেননা তিনি।
“গল্পটা।” রায়হান আহমেদের ছোট্ট উত্তর। খানিকটা চিন্তিত তিনি।
“কিছু মনে করবেন না দয়া করে-অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পরায়। আপনি বারবার লেখার চেষ্টা করেও লিখতে পারছিলেননা এজন্য আমি আপনাকে একটু সাহায্য করার জন্য...এই আরকি।” কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল ছায়ামানব।
“গল্পটা শুরু করুন।” গম্ভীর কণ্ঠে বললেন রেহান আহমেদ। বিরক্ত বোধ করছেন তিনি। এই লোকটা কিভাবে জানলো সে বারবার চেষ্টা করেও আজ কিছু লিখতে পারছে না?
“আমার নাম ইবনে আবদুল্লাহ। বাসা নয়াপাড়া ব্রিজের কাছে। কর্পোরেটে চাকরি করতাম।”–ছায়ামানব তাঁর গল্প শুরু করেছেন ।
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন রায়হান আহমেদ। রাতদুপুরে কে কোথায় থাকলো, কি করলো এইসব আলোচনা কার ভালো লাগে?
“বউ আর দুই মেয়েকে নিয়ে আমার সুখের সংসার ছিলো। বলে যাচ্ছেন ইবনে আব্দুল্লাহ। “ছোট মেয়ের বয়স চার আর বড়োটার সাত। পরীর মতো সুন্দর আমার মেয়ে দুইটা। অবশ্য সব বাবার কাছেই তাঁর মেয়েরা পরীর মতো। সে যাই হোক আমাদের কপালে সুখ বেশীদিন সইলো না। শনির দৃষ্টি লাগলো আমাদের সংসারে। আমার বড়ো মেয়ে নিশি হুট করেই পাগলামি শুরু করলো। পাগলামি না বলে অদ্ভুত আচরণ বলাই ভালো।”
“বিড়াল খুব পছন্দ ছিলো ওর। ওর সপ্তম জন্মদিনে একটা বিড়াল এনে দেই আমি। আজিমপুরের এক দোকানীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকায় কিনেছিলাম আমি বিড়ালটা । বিড়ালের এত দাম হতে পারে কখনো কল্পনাই করতে পারিনি আমি।”
.
“বিড়াল পেয়ে মেয়ে তো যারপরনাই খুশি। সারাদিন প্রায় ওটার পেছনেই পরে থাকে। ঘটনাটা ঘটলো নিশির জন্মদিনের পরের সপ্তাহে। আমি নিত্যদিনের মতো অফিসে গেছি। স্ত্রী ছোট মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত। নিশি তার বিড়ালের সাথে খেলছিলো। এমন সময় কি মনে হলো তার জানিনা, রান্নাঘর থেকে সবজী কাটার বড় ছুড়িটা এনে বিড়ালটার গলায় চালিয়ে দিলো।
বিড়ালের দ্বিখণ্ডিত গলাটা দেখে তো আমার স্ত্রীর প্রায় মাথা খারাপ হওয়ার যোগার। আমাকে ফোন দিয়ে এসব বলছিলো সে। হুট করেই ফোনের কেটে যায়। অফিস বাসা থেকে বেশী দূরে ছিলো না। তড়িঘড়ি করে বাসায় ফিরে যেটা দেখি তার জন্য কোনভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি। নিশি বিড়ালের রক্ত খাচ্ছে। সোফার কাছে স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে এসব সহ্য করতে না পেরে।কিংকর্তব্যবিমুঠ হয়ে গেছি আমি এসব দেখে। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলামনা। এমন সময় নিশি বলে উঠলো-
পাপা, রক্ত খাবে?
চমকে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা তখন আমার। কি বলছে নিশি এসব? মাথা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে আমার এটা শুনে।তাড়াতাড়ি করে নিশির হাত থেকে বিড়ালটা সরালাম। খিলখিল করে হেসে উঠলো নিশি। ওর রক্তাক্ত দাঁতগুলো দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম।
মামনি এসব কি করছো তুমি?
রক্ত খেলাম পাপা।
রক্ত কি খাওয়ার জিনিস আম্মু?
অনেক মজা লাগে তো। খাবে তুমি, পাপা?
অনেক হইছে মামনি, ওয়াশরুমে চলো।
শেষ তো করতে দাও। এখনো অনেকটুকু রক্ত আছে। খেয়ে নিই, তারপর যাবো।
.
দেরি করিনি আমরা আর। ওইদিনই নিশিকে একজন সাকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাই। এছাড়া আর কিছু করার ছিলো না আমার। আজকে পোষা বেড়াল মেরেছে, কাল যে মানুষ মারবে না তার নিশ্চয়তা কি? রক্ত খাওয়ার মত অবুঝ তো এখন আর নয় সে।
ভদ্রলোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। আমার এক কলিগের আত্মীয়। সুতরাং তাঁর সাথে দেখা করতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। অবশ্য আমার কলিগকে মেয়ের ব্যাপারে কিছুই জানাইনি।
সব শুনে নিশির জন্য কিছু ঘুমের ওষুধ দিলেন তিনি। ঘুমের ট্যাবলেটের কি প্রয়োজন বুঝলাম না আমি। এমনিতেই তো যথেষ্ট ঘুমায় নিশি।
.
পরবর্তী একসপ্তাহ ভালোই কাটল। আবার নিশি স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি নিশির এই চুপথাকা বড় কোন ঘটনার অশনি সংকেত।
.
রবিবার ছিল ওইদিন। আমি অফিসের কাজে শহরের বাইরে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে যায়। কলিংবেল চাপ দিতেই নিশি এসে দরোজা খুলে দেয়। ওর মুখের দিকে চোখ পরতেই আমার অন্তরাত্মা চমকে উঠে। মুখে রক্ত লেগে ছিলো ওর। আজ আবার কার রক্ত?
নিশি, তোমার ঠোঁটে রক্ত কেন? ধমকে উঠি আমি। সারাদিনের ক্লান্তিতে এমনিতেই মনমেজাজ ভালো ছিল না তার উপর আবার নিশির এই ঝামেলা। আর কতো সহ্য হয় একটা মানুষের?
রক্ত খেয়েছি পাপা।
রক্ত? কিসের রক্ত? চিৎকার করে জিজ্ঞেস করি আমি।
মামনির রক্ত।
কি? দরজার কাছ থেকে নিশিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে রুমে ঢুকে দেখি সব শেষ। স্ত্রী আর ছোট মেয়ের গলাকাটা লাশ পরে আছে। রক্তশূন্য ফ্যাকাসে হয়ে আছে লাশ দুটো।
নিজেকে আমি আর কন্ট্রোল করতে পারিনি। নিশিকে আমি নিজ হাতে খুন করি। গলাটিপে।
*
রায়হান আহমেদ প্রতিদিনই বেশ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠেন। কিন্তু সাতসকালেই আজ তার ঘুম ভেঙে গেছে। নিজের লাইব্রেরীতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন গতকাল। ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা খান রায়হান আহমেদ। তারপর ফ্রেস হয়ে ব্রেকফাস্ট করেন। স্ত্রীকে ডাকলেন চা দেওয়ার জন্য। কিন্তু অনেকক্ষণ ডেকেও তার সাড়া পেলেন না। নিতু সাধারণত ফজরের নামাজের আগেই ঘুম থেকে ওঠে। স্ত্রী বাজারে গেছে ভেবে রায়হান আহমেদ নিজেই চা বানানোর জন্য রান্নাঘরে ঢুকলেন। চা বানিয়ে বেডরুমের দিকে গেলেন মেয়েদের ডাকতে। বেডরুমে ঢুকে ভেতরের দৃশ্যটা দেখে টলে উঠলেন রায়হান আহমেদ। হাত থেকে চায়ের কাপটা পরে গেছে তাঁর।
খাটের উপর দুইমেয়ে তাদের মমতাময়ী মাকে জড়িয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। সারাজীবন ডাকলেও তাদের এ শান্তির ঘুম আর কখনোই ভাংবে না। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রায়হান আহমেদ শুধু তাদের গলাকাটা লাশটাই দেখতে পেলেন, শান্তির ঘুমটা যেন অতি অবহেলে তাঁর চোখ এড়িয়ে গেল।
আচ্ছা, মধ্য বয়স্ক এই তুখোড় লেখক কি কখনো জানতে পারবে কি ভয়ঙ্কর রকমের সিজোফ্রেনিক সে? কখনো কি জানতে পারবে গল্পের অজুহাতে কয়টা খুন সে করেছে?
.

-----------------------------------------------------------

খুনি -  Abdullah Kafi (তিন ফোটা বৃষ্টি)
            

মধ্যরাতে একটি মেয়ের মেসেজ।
-ভাইয়া আসসালামুয়ালাইকুম,
=ওয়ালাইকুমআসসলাম।
-আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো।
=জী বলুন।
-মেসেজে বলা যাবে না,আপনার
মোবাইল নাম্বারটা পেতে পারি?
=নাম্বার......?
-ভয় নেই আমি বিবাহিতা।
=০১৯............
অতঃপর মেয়েটির ফোন আসলো।
=জী বলুন।
-আপনিতো গল্প লিখেন,আমার জীবনের
একটি গল্প লিখে দিবেন?
=ভাবলাম দাম্পত্য জীবনের রোমান্টিক
গল্প লিখতে বলবে ভালোই হবে।আচ্ছা
বলুন,আমি চেষ্টা করবো
-আমি খুন করছি,আমি খুনী।গল্পটা
খুনের। 



Bangla Golpo Book |  দাবার ঘুঁটি - আহসানুল হক শোভন 


=কি বলেন!গল্পটা পাবলিশ করলে তো
আপনাকে কারাগারে বন্দী করতে পারে।
-আমি কারাগারেই আছি,ভয় নেই।
=আচ্ছা বলুন।(একটু থমকে গিয়ে
মেয়েটি একনাগারে বলতে শুরু করলো।
বিয়ের আগে আমার একটি রিলেশন
ছিলো।আমাদের পরিচয় হয়েছিলো
ফেইসবুক নামক ভার্চুয়াল লাইফ থেকেই।
ছেলেটি বেশ মিশুক এবং হাসিখুশি
হওয়াতে সহজেই আমাদের সম্পর্ক টা
বন্ধুত্বে রুপ নেয়।
প্রতিটি ভার্চুয়াল লাইফের
ভালোবাসার গল্পের মতই আমাদের
রিলেশন শুরু হয়।চেটিং করতে করতে
একসময় নাম্বার বিনিময় হলো।তারপর
অনেক রাতের জ্যোৎস্না পোহানোর
সাথে সাথে মোবাইলে কণ্ঠস্বর বিনিময়
করতে করতে মনটাও বিনিমও হয়ে
গেছিলো একসময়তবে হ্যাঁ মন তো
ছেলেটি দিয়েছিলো।আমি শুধু সময়
দিয়েছিলাম।ইংরেজিতে যাকে বলে
টাইম পাস।
ওর সাথে করা কিছু চেটিং এমন ছিলো।
-কেমন আছো বাবু? (সে)
-ভালো।
-খেয়েছো?
-হুম।
-কি করছো?
-শুয়ে আছি বা যা করতাম তাই বলতাম।
কখনও সে কেমন আছে, কি করছে,খেয়েছে
কি না এসব জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন
মনে করতাম না।একটা সকালেও আমি ওর
ঘুম ভাঙিয়ে বলিনি শুভ সকাল।একটা
রাতেও মিষ্টি সুরে বলিনি অনেক রাত
হয়েছে ঘুমাও না হলে শরীর খারাপ
করবে।
কিন্তু ও আমার খুব কেয়ার করতো।সবসময়
আমার খোঁজ নিতো।ওর ভালোবাসার
মধ্যে ছিলো পবিত্রতা।কখনও আমাদের
কথোপকথনে অশ্লীলতা ছিলো না।
তারপর সচরাসচর সব রিলেশনে যা হয়
আমাদেরও তাই হলো।ওকে বললাম আমার
বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার সাথে
কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করবা
না।সেদিন ও ওপাশ থেকে খুব
কেঁদেছিলো।ও শব্দ করে অশ্রু ঝরাচ্ছিলো
না তবে আমি বুঝতে পারছিলাম ও
কাঁদছিলো।
অনেক রিকুয়েস্ট করেছিলো আমায়।প্লীজ
আমাকে ছেড়ে যেও না।আমি তোমায়
ছাড়া থাকতে পারবো না।একটু সময় দাও
কিছুদিন পরেই তো আমি পাশ করে
থেকে বের হবো।আমি তোমাকে অনেক
ভালোবাসি।আমার মতো করে কেউ
তোমায় ভালোবাসবে না,প্লীজ যেও
না।উত্তরে আমি একটা কথায়
বলেছিলাম,এসব সিনেমাটিক ডায়ালোগ
সেয়া বন্ধ করো,অসহ্য লাগে আমার।
বাই,আমাকে আর ডিস্টার্ব করবা না।
আমার কাছে সেদিন ওর কথাগুলোর
কোনো মুল্য ছিলো না।ওর বুক চাপা
কান্নায় বাঁধ ভাঙা চোখের জল আমার
হৃদয়ে একটুও রেখাপাত করছিলো না।
আজ বছর দুই আমার বিয়ে হয়েছে।আমার
বর একজন সরকারি চাকুরীজিবি।মোটা
মুটি বেশ ভালো বেতন পাই।আমার
পরিবার এমন সরকারি চাকরিওয়ালা
ভালো ছেলে হাতছারা করতে
চেয়েছিলো না।আমিও ভালো থাকার
আশায় রাজি হইয়েছিলাম।ভালোবাসা
নয় অর্থকে সুখের উৎস ভেবে আনান্দে
বৈবাহিক জীবনে পা বারালাম।
কিন্তু আমি সুখে নেই।আমার বর একজন
পারফেক্ট চাকুরীজীবী ঠিকি কিন্তু সে
পারফেক্ট জীবন সঙ্গী কখনও হতে
পারিনি।
ছেলেটি বলতো বিয়ের পর আমাদের
প্রতিটি সকাল হবে মিষ্টি সকাল।ঘুমের
আলসিমিতে খোলা জানালা দিয়ে
আসা মিষ্টি রোদ চোখের পাতায় এসে
ধরা দিলে চোখ খুলে দেখবো আমার
পীঠে তুমি।আমরা একসাথে ঘুম থেকে
উঠবো একসাথে সকালের নাস্তা
বানাবো,রান্না শেষে নাস্তার
টেবিলে বসে দুজন দুজনকে খাইয়ে
দিবো।ঝালে যখন তোমার মায়াবি মুখে
লাল লাভার মত রুপ নিয়ে ঠোঁট দুটি
কাঁপবে তখন তোমার গোলাপি ঠোঁটে
ভালোবাসার লাল চুম্বন একে দিবো।
নাস্তা শেষে কাজে বের হওয়ার আগে
তোমার কপালে উষ্ণ ছোঁয়া দিতে
একদিনও মিস হবে না।
আর আমার বর অফিসের তারায় "খেয়ে
নিও" এই কথা টা বলতেই ভুলে যাই।
ছেলেটি প্রতি ঘন্টাই আমার খোজ
নিতো।ও বলতো তুমি মিষ্টি হাতে
আমার জন্য দুপুরের খাবার বানিয়ে
দিবে।দুপুরে ফোন দিয়ে যখন জানবে
আমি বাইরে থেকে খেয়ে নিয়েছে ইচ্ছে
মত বকে দিও।আমি হেসে উড়িয়ে দিয়ে
বলতাম আমি তো রান্নায় করতে পারি
না।
এখন আমি রাঁধতে শিখে নিয়েছি।খুব
ইচ্ছে করে বর টার জন্য টিফিন করে
খাবার দিয়ে দিতে আর না খেলে বলতে
বাসায় এসো আজ খবর আছে।কিন্তু বর
মশাই তো অফিস টাইমে ফোন দিতে
নিষেধ করছে,অযথা ফোন দিয়ে খোজ
নিলেও বকা দেয়।দুপুরে বাইরে খেয়ে
অভ্যস্ত সে।আমার ইচ্ছে পুরোন থেকে
তার কাছে সামান্য অভ্যাস মূল্যবান।
ছেলেটি বলতো ছুটির দিনের প্রতিটি
পড়ন্ত বিকালে ভেজা ঘাস পিছনে
ফেলে হাঠবো আমরা।সুযোগ পেলেই
তোমাকে কাছে নিয়ে রোমাঞ্চিত
হবো।ওর কথাগুলো ফিল্মি টাইপ
লাগতো।
কিন্তু এখন ইচ্ছে হয় বর টার সাথে ছুটির
বিকালবেলা নিরিবিলি রাস্তাতে ওর
মাসল দু হাতে শক্ত করে ধরে কাঁধে
মাথা রেখে হাটতে,একটু ফিল্মি টাইপ
হতে।এই আশায় ছুটির বিকেলগুলিতে ওর
দেয়া নীল শাড়িটা পরে অপেক্ষা করি
এই বুঝি বর টা বলবে চলো দুজনে হাত ধরে
প্রথম দেখা হওয়া সেই চিরোচেনা
জায়গাটাতে পদধূলি দিয়ে আসি।কিন্তু
বরটা ছুটির দিনের প্রতিটা বিকেল ওর
বন্ধুদের আড্ডায় কাটায়।
ছেলেটি বলতো রাতে লেটে যখন বাড়ি
ফিরে দেখবো খাবার বেরে তুমি রাগ
করে বসে আছো পিছন থেকে তোমায়
জরিয়ে ধরবো।তুমি মুখ ভার করে আমায়
দুরে ঠেলে দিবে।তখন তোমার প্রিয় রক্ত
গেলাপ দিয়ে রাগ ভাঙাবো।তুমি আদর
করে তখন আমায় বুকে জরিয়ে নিও।ফ্রেশ
হয়ে রাতের খবার শেষে দু কাফ কফি
হাতে বারান্দায় গিয়ে হিমেল হাওয়ায়
চুল উড়িয়ে রাত দেখবো আমরা। তারপর
মিষ্টি বউটিকে কোলে নিয়ে বিছানায়
গিয়ে রোমান্টিক ঘুম।আচ্ছা ঘুম কখনও
রোমান্টিক হয়!আমি ওর কথাগুলোকে
হেসেই উড়িয়ে দিতাম।
আমার বরটা রাতে লেটে ফিরলে আমি
যদি না খেয়ে খাবার টেবিলে বসে
থাকি বকা দেয় আমাকে।না খেয়ে ঢং
করাটা নাকি তার পছন্দ নয়।আচ্ছা কথা
না শুনিয়ে বরটা কি পারে না ফ্রেশ
হয়ে এসে আমাকে আদর করে খাইয়ে
দিতে,আমিও দু গাল খাইয়ে দিতাম।
হয়তো পারে,কিন্তু কখনও ওর হাতে
খাবার ভাগ্যা আমার হয়নি।
যেকোনো ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই
বরটার ঝাড়ি শুনতে হয়।আমি যেন তার
হাতে পরিচালিত একটা রোবটের ন্যায়।
যা বলবে তাই করতে হবে।বরটা ভারী
কণ্ঠস্বরে যখন কথা বলে ভয়ে বুক কেপে
ওঠে।ঐ ছেলেটি কিন্তু এমন ছিলো না
বি এফ হওয়া সত্ত্বেও যেন মনে হতো ঐ
আমাকে দেখে ভয় পেত।বকা দূরে থাক
আমার সাথে কখনও উচ্চস্বরে কথা বলতো
না।সে আমাকে হুকুম করতো না কখনও
রিকুয়েস্ট করতো সবসময়।ওর মন
মানসিকতা বেশ উন্নত ছিলো।ও বলতো
তুমি স্বাধীন তোমার কাছে যেটা
ভালো লাগবে করতে পারো তবে অন্যায়
করবে না কখনও।আপছস আমি ছেলেটির
কথা রাখতে পারি নি।অন্যায় করেই
ফেলছি।
ছেলেটি বলতো,আমরা নদীর ধারে ছোট্ট
একটা ঘর বাঁধবো।ভালোবাসার
ঘর,ভালোবসার রংতুলি দিয়ে রাঙিয়ে
আমরা সাজাবো সে ঘর।জ্যোৎস্না রাত
গুলোতে আমার নদীর পারে বসে পা
ভিজিয়ে রাত দেখবো।
আমি বলতাম ধুর পাগল নাকি তুমি।ছোট্ট
ঘরে থাকা যায় নাকি?বড় অট্টালিকায়
যে সুখ আছে তা সামান্য কুরেঘরে
কীভাবে পাবে।তুমিও নিম্নমানের
তোমার চিন্তাভাবনাগুলোও
নিম্নমানের।আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।
ছেলেটি আমার কথা গুলো নীরবে মেনে
নিতো।
আজ কিন্তু আমি বড় ঘরেই আছি।অর্থ কে
সুখ ভেবে আপন করে ভালোবাসাকে পর
করেছিলাম আমি।ভুল করেছিলাম আমি।
আমার বড় ঘরে দামি আসবাসপত্র ঠিকি
আছে তবে শুধু ভালোবাসা নেই।
ছেলেটির বন্ধু একদিন ফোন করে বলে,ও
টাকা বাঁচাতে মাঝে মাঝে কলেজ থকে
হেঁটে বাড়ি যেত,আমরা যখন খেতে
যেতাম সবাই ও যেতো না।বলতো ভালো
লাগছে না তোরা যা।ঐ টাকা দিয়ে ও
আপনার সাথে রাত জেগে ফোনে কথা
বলতো ঘন্টার পর ঘন্টা।যাতে আপনি রাগ
না করেন।ওর বন্ধুর কথা গুলো সত্য ছিলো
কারন আমি তো কখনও মিস ছাড়া কল
দিতাম না।ওর বন্ধু আরও বলে আপনার
বার্থডে তে আপনি আর আপনার
বান্ধবিদের ট্রিট এর টাকা ম্যানেজ
করতে গাধাটা সখের মোবাইল টা
বিক্রি করে দিয়েছিলো।আর আপনি
ওকেই ছেড়ে দিলেন।আমি উত্তরে
বলেছিলাম দালালি করতে কি ফোন
দিয়েছেন,একটি সুন্দরি মেয়ের সাথে
কথা বলতে ছেলেরা কতকিছু করে আপনার
বন্ধুও করছে,আমাকে আর বিরক্ত করবেন
না।
আজ আমার বর টার অবহেলাতে আমি
ছেলেটিকে খুব মিস করি।ইচ্ছে করে
ছেলেটির কাছে ফিরে যেতে।কিন্তু
বাঙালি মেয়েরা একবার যাকে স্বামী
হিসেবে মেনে নেয় সারাজীবন তার
পরিচয়ে তাকে আকরে ধরেই বাঁচে।আমার
দুঃখের কারন আমি নিজেই।
=আপনার তো সম্পূর্ণ দোষ না।আপনার
পরিবারের চাপেই তো আপনি বিয়েতে
রাজি হয়েছিলেন।(আমি)
-হ্যা,কিন্তু আমি ইচ্ছা করলে কিছু সময়
ওর জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম।
(মেয়েটি)
=আমি চুপ হয়ে গেলাম।
মেয়েটি আবার বলতে লাগলো।
ভুল ভুঝতে পারার পর ছেলেটির সাথে
দেখা করে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলাম।
ওর নাম্ব্র বন্ধ পাওয়াও ওর বন্ধুর মাধ্যমে
যোগাযোগ করে একবার দেখা করার জন্য
বলেছিলাম।সেদিন ও একটা কথা বলে
আমার সব চেষ্টা থামিয়ে দিয়েছিলো
"আমাকে খুজে আর লাভ নেই প্রিয়,আমি
তোমার অবহেলায় হারিয়ে গেছি"।
তারপরেও অনেক খুজেছিলাম কিন্তু
ছেলেটির কোনো খোঁজ পায় নি।
অবশেষে মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে
বললো_
আমার এই পরিস্থিতির জন্য আমিই
নিজেই দায়ি।
আমি সত্যিকারের ভালোবাসাকে খুন
করছি,
আমি খুন করছি একজন ছেলের সপ্নকে,
আমি খুন করছি আমার প্রাপ্য সুখ কে,
আমি খুনি,
তাইতো আজ প্রচুর অর্থে গড়া
কারাগারে বন্দী।
আমি লোভি,আমি পাপী,
আমি খুনি,
/
মেয়েটির শেষ কথাঃভালোবাসার
মানুষকে অবহেলা করবেন না।কখনও যদি
বুঝতে পারেন মানুষটি আপনার জন্য সব
করতে রাজি তাকে ছেড়ে দিয়েন না।দু
দিনের দুনিয়ায় কি হবে বড় দালানে
থেকে,দামি পোশাক পরে,ভালো খাবার
খেয়ে যদি সেখানে ভালোবাসা না
থাকে।সত্যিকারের ভালোবাসা
সিনেমাটিক ঈ হয়।তাই বলে
ভালোবাসার মানুষের আবেগ দিয়ে
তৈরি মিষ্ট কথাগুলোকে খ্যাত বলে
তাকে অবহেলা করেন না।
ভালোবাসাকে ভালোবাসেন সুখি
হবেন।সুখ ঈ সব।দুঃখ কেউ চাই না।আর
আমরা এতই বোকা যে যারা সুখের কারন
তাদেরকেই অবহেলা করি মাঝে মাঝে
টাকার লোভে মাঝে মাঝে সুন্দর
চেহারার লোভে।গল্পটার উদ্দেশ্য আমার
মতো করে নিজের প্রাপ্য সুখ কে কেউ খুন
কইরেন না।
SHARE

Author: verified_user