Thursday

বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সি - 2 - Sohel Islam Bappy

SHARE

                         বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সি 2                                 দ্যা_সিরিয়াল_রেপিস্ট 

                                                     Sohel Islam Bappy
বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সি - 2 - Sohel Islam Bappy


শুনশান রাস্তা। রাত আড়াইটার সময় শুনশান থাকাটাই স্বাভাবিক। টিএসসি'র রাজপথ দিয়ে শোঁ শোঁ করে অনেকক্ষণ পরপর একটা দুইটা গাড়ি চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ গতিতে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছগুলো সারি বেঁধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে দানবাকৃতি ধারন করেছে। গাছগুলোর জন্য রাস্তাটা বেশি অন্ধকার লাগছে। এই নিকোশ কালো অাঁধারে ঢাকা টিএসসি'র ফুটপাত ধরে হাটছে একটা মেয়ে। পা টেনে টেনে হাটছে মেয়েটা। যেন হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বয়স ১৮-২০ হবে। সাদা থ্রি পিছ পরিহিত মেয়েটাকে দেখে এই মুহুর্তে কেউ যদি ডানা কাটা পরী ভেবে ভুল করে, তবে তা দোষের কারণ হবে বলে মনে হয় না। অসম্ভব সুন্দরী। তবে এই মুহুর্তে মেয়েটার সব সৌন্দর্য্যও কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তা মেয়েটার শারীরিক অসুস্থতাই বলে দিচ্ছে। শরীর অসুস্থ থাকলে কিসের রূপ, আর কিসের লাবন্য ? টিএসসি থেকে হাটতে হাটতে শাহবাগ বাসস্ট্যান্ডের একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে এসে দাঁড়ালো মেয়েটা। পেটের উপর হাত দিয়ে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো। বসে পড়লো ল্যাম্পপোস্টের নিচে। দু গাল বেয়ে চোখের পানি টপটপ করে পড়ছে মেয়েটার পায়ের আঙ্গুলের উপর।


গাড়ি নিয়ে ওসি মামুন টহল দিচ্ছিলেন তিনজন কন্সটেবল সহ। সপ্তাহে একদিন রাতে টহলে বের হন ওসি মামুন। এটা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। আজ তেমনই একটি রাত। গাড়িতে মৃদু শব্দে একটা গান বাজছে।
ও আমার রসিয়া বন্ধুরে............!!
গানটা বোধহয় খুব একটা পছন্দ হচ্ছেনা ওসি সাহেবের। জানালার বাইরে থেকে মুখটা ড্রাইভারের দিকে ঘুরিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন তিনি।



"ঐ ব্যাটা, আমার বা**র গান চালাও ? এই গানে প্রেমিকরে কি পরিমান অপমান করা হইছে তুই জানোস ? প্রেমিকরে কয় প্রেমিক ক্যান প্রেমিকার কোমরের বিছা হইলো না। হ্যা** আমার। কোমরের বিছা হইলে প্রেমিকার দেহের কোন জায়গায় প্রেমিকের মুখ পড়ে ? হুহ, নির্লজ্জ, বেহায়া মাইয়া। বন্ধ কর এইডা।"
ড্রাইভার গানটা বন্ধ করে বলল,
"সার, তাইলে কোন গানডা চালামু ?"
"এমন গান বাজা, যেই গানের সর্বনিম্ন যুক্তি আছে।"
বলেই জানালার বাইরে তাকালেন ওসি মামুন। শাহবাগ বাসস্ট্যান্ডে এসেই চোখ পড়লো ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। একটু ভাল করে দেখার চেষ্টা করে তিনি ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি থামাতে। গাড়ি থামাতেই গাড়ি থেকে নেমে মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাতের লোহার ডান্ডাটা দিয়ে ল্যাম্পপোস্টে দুবার শব্দ করলেন। মেয়েটার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। মেয়েটা হাটুতে মাথা চেপে হ্যাং হয়ে বসে আছে। এবার ওসি সাহেব মেয়েটাকে ডাকলেন।
"এই মেয়ে, এই ! শুনছো ? আরে, বয়রা নাকি ? এই মেয়ে তোমাকে বলছি। শুনতে পাচ্ছো না ?"
মেয়েটা এবার মুখ তুলে তাকালো ওসি মামুনের মুখের দিকে। মামুন সাহেব আবার বললেন,
"এত রাতে এখানে কি ? দেহ ব্যবসা ? তা কত কামাই হইলো আজকে ?"
"কি বলেন এসব ?"
অস্পষ্ট কন্ঠে বললো মেয়েটা। পাল্টা প্রশ্নে বিরক্ত হলেন ওসি। ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"দেখে তো মা** মনে হয়না। তা এত রাতে রাস্তায় কি ?"
"পুলিশ ভাই, ভদ্রভাবে কথা বলুন প্লিজ। আমি খুব অসুস্থ। একটু সাহায্য করবেন আমাকে ?"
আবেদনের সুরে কথাটা বলল মেয়েটা। ওসি কি যেন মনে করে একটু পিঁছিয়ে দাঁড়ালেন। আগাগোড়া দেখলেন মেয়েটাকে। তখনি তার চোখে পড়ল, মেয়েটার সেলোয়ার রক্তে ভিজে চপচপ করছে। রক্ত রাস্তায়ও গড়িয়েছে অনেকটা। ওসি মামুন কিছু একটা আন্দাজ করে আবার এগিয়ে এলেন মেয়েটার সামনে। তারপর বললেন,
"এই মেয়ে, কি হয়েছে তোমার ? এত রক্ত ?"
মেয়েটা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল,
"পুলিশ ভাই, আমি জানিনা। আমি কিছুই জানিনা। রাতে বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়েছিলাম এগারো টায়। ওয়ারী জগিনগর রোডে দাড়িয়েছিলাম রিকশার অপেক্ষায়। তারপর আর কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলাম আমি টিএসসি চত্বরে পড়ে আছি। তখন থেকেই থেমে থেমে ব্লিডিং হচ্ছে। কিছুই বুঝতে পারছিনা আমি পুলিশ ভাই, কিছুই বুঝতে পারছিনা।"
ওসি সাহেবের যা বোঝার তা বুঝে ফেললেন। দ্রুত ঢাকা মেডিকেল ফোন করে এ্যাম্বুলেন্স আনিয়ে মেয়েটাকে তুলে পাঠিয়ে দিলেন ঢাকা মেডিকেল।
দুই দিন পেরিয়ে গেছে। মেয়েটার সমস্ত টেস্টের রিপোর্ট চলে এসেছে। এখন মেয়েটা কিছুটা সুস্থও হয়ে উঠেছে। মেয়েটার বাবা-মাকে গতকালই খবর পাঠিয়ে হাসপাতালে আনা হয়েছে। মেয়ের অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েছে মেয়েটার বাবা-মা।
এই মুহুর্তে ওসি মামুন বসে আছেন ভিকটিম মেয়েটার ডাক্তারের সামনে। মেয়েটার রিপোর্টগুলোতে নজর বুলিয়ে ডাক্তার বললেন,
"ওসি সাহেব, মেয়েটাকে গ্যাংরেপ করা হয়েছে।"
ওসি সাহেব অবাক হলেন না। যেন এমনটাই ছিল তার এক্সপেক্টেশন। ওসি শুধু বললেন,
"কতজন হতে পারে ?"
"ধারনা করছি সর্বনিম্ন চারজন। তবে আরও বেশিও হতে পারে। রক্তক্ষরণের জন্য দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো মেয়েটা। আর হ্যা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারন হচ্ছে রেপের সময় মেয়েটার পিরিওড চলছিলো।"
এ কথা শুনে ওসি সাহেব রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন,
"জানোয়ারের বাচ্চাদের রুচিতে বাঁধলো না ? একবারও ভাবলো না, পিরিওডের সময় একটা মেয়ের সাথে সঙ্গম করলে মেয়েটার মৃত্যুও হতে পারে। ছিঃ। এরা মানষিক বিকারগ্রস্ত, প্রতিবন্ধি ছাড়া আর কিছুই না ডক্টর। ইয়ে, মেয়েটা ঐ সময়ের কথা মনে করতে পারছেনা কেন ?"
"মেয়েটার দেহে কোনো অতিমাত্রার মস্তিষ্ক নিষ্ক্রিয় করার ড্রাগ ইনজেক্ট করা হয়েছিলো।" ঐ ড্রাগের কারনে হয়ত মেয়েটা বেহুশ ছিল। তাই কিছুই মনে করতে পারছেনা মেয়েটা।"
"আই সি ! ধন্যবাদ ডক্টর। মেয়েটার সাথে একবার দেখা করা যাবে ?"
ওসি মামুনের প্রশ্নে ডাক্তার নিজের চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বললেন,
"অবশ্যই। চলুন, আমি আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি।"
"থ্যাংক ইউ ডক্টর। প্লিজ, চলুন।"
ডাক্তারের পিছু অনুসরণ করে ওসি মামুন এসে ঢুকলেন ধর্ষিত মেয়েটার কেভিনে। চার হাত পা একসাথে করে গুটিশুটি দিয়ে বসে আছে মেয়েটা। শারীরিক দিক দিয়ে সুস্থ হতে শুরু করলেও মানষিক দিক দিয়ে একদম ভেঙে পড়েছে। মেয়েটার পাশে বসে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ওসি মামুন বললেন,
"তোমার নাম কি ?"
মেয়েটা মুখ তুলে তাকালো মামুন সাহেবের দিকে। প্রচন্ড রকম আতঙ্ক বিরাজমান ঐ চাহুনিতে। মেয়েটা বলল,
"রোদেলা। আমার নাম রোদেলা।"
ওসি সাহেব একবার নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন,
"তোমাকে যারা তুলে নিয়ে গিয়েছিলো, তাদের কাউকে তুমি দেখেছো ?"
মেয়েটা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল,
"না। আমি কাউকে দেখিনি স্যার। এমনকি কারো কন্ঠস্বর শুনেছি বলেও মনে পড়ছেনা।"
ওসি সাহেব বিষন্ন হয়ে বললেন,
"কেসটা খুবই কম্প্লিকেটেড। আমার তো আরও অন্যান্য ব্যস্ততাও আছে। এক কাজ করি। তোমার এই কেসটা আমি বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সিকে দিয়ে দিচ্ছি। সেখান থেকে জেমস বন্ড আর হারকিউলিস এসে তোমার সাথে কথা বলবে।"
মেয়েটা কৌতুহল নিয়ে বলল,
"উনারা কারা ?"
ওসি মামুন মাথা উঁচু করে গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন,
"ওরা দুজন প্রফেশনাল ডিটেক্টিভ। যেমন সাহসী, তেমনি বুদ্ধিমান। তোমার এই কেস ওরাই সমাধান করতে পারবে। যতই কম্প্লিকেশন থাকুক, ওরা ঠিকই প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করবে।"
চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠলো ওসি মামুন সাহেবের। যে দৃষ্টিতে চ্যালেঞ্জের স্পষ্ট ছাপ।
রাজপথে বাইক চলছে। বাইকের সামনে এক বিঘাত সমান একটা সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সি। ছয় মাস হলো লাইসেন্সধারী গোয়েন্দা হয়েছি। তবে লাইসেন্স পাবার পরেও নিজেদের নামে কোনো পরিবর্তন ঘটাইনি। সুমন এখনো জেমস বন্ড, আর আমি তাহমিদ হরকিউলিসই রয়ে গেছি। সুমন এখন বাইক চালাচ্ছে। আমি পেছনে বসে আছি। আমাদের গন্তব্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ওসি মামুনের ফোন পাওয়া মাত্রই বেরিয়ে পড়েছি। একটা মেয়েকে গণধর্ষন করা হয়েছে। এবারের মিশন এটাই। দেখা যাক, কতদূর পালাতে পারে ধর্ষকরা। আর আমরাই বা কতদূর ধাওয়া করতে পারি ওদের।

বাইক যেমন চলছে, গল্পটাও চলবে।



সুমন আর আমাকে বসার জন্য চেয়ার দেয়া হয়েছে। আমি আর সুমন বসে আছি ধর্ষনের শিকার হওয়া মেয়েটির সামনে। মেয়েটার নাম ইতিপূর্বে ওসি মামুন সাহেবের মারফতে জেনেছি। রোদেলা। মেয়েটার নাম রোদেলা। এই মুহুর্তে রোদেলা, আমি আর সুমন ছাড়াও এই কেভিনে আছে রোদেলার মা-বাবা। সুমন রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলল,
"দেখো, তোমার সাথে যা হয়েছে তা ঠিক হয়নি। বরং যথেষ্ট খারাপ হয়েছে। আর এই কুকর্ম যারা করেছে, ঐ রেপিস্টরা শাস্তি পাবেই। তবে এজন্য তোমাকে সব বলতে হবে। বড় থেকে ছোট যা যা তোমার মনে আছে। তাহলেই আমরা ঐ রেপিস্ট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব। বলো। যা যা তোমার মনে পড়ে, সব বলো আমাদেরকে।"
"আমি............"
রোদেলা কিছু বলতে চাইছিল বটে তবে রোদেলার মা ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,
"দেখুন, আপনাদেরকে আমি চিনিনা। ওসি সাহেব আপনাদের দুজনের কি যেন ইংরেজী নাম বলেছিলো !"
আমি মৃদু হেসে বললাম,
"আমি হারকিউলিস আন্টি। আর ও জেমস বন্ড।"
সুমনও মৃদু হাসলো। তবে ভদ্রমহিলা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
"সে আপনারা জেমস বন্ড হন বা অনন্ত জলিল হন, তা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই। ইজ্জত তো গেছে আমার মেয়ের। আর কারা এই কাজ করেছে, তা আমার মেয়েও তো দেখেনি, জানেনা। তাই আমরা এ ব্যাপারে কোনো কেস করবো না। আমি চাইনা এ ব্যাপারে লোক জানাজানি হোক। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। গু যত ঘাটবেন, ততই গন্ধ বের হবে। আর তাই আমি চাইনা এ ব্যাপারে আর কোনোরকম চর্চা হোক। আমার মেয়ে আরেকটু সুস্থ হলেই ওকে আমরা বাসায় নিয়ে যাব।"
ভ্রু কুঁচকে তাকাতে বাধ্য হলাম, নাকি আমার ভ্রু ভদ্রমহিলার কথা শুনে অটোমেটিক কুঁচকে গেল নিশ্চিত নই। হতাশ হয়ে বললাম,
"এসব কি বলছেন আন্টি ? যারা রোদেলার সাথে এত জঘন্য আচরণ করলো, তারা মুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে ? ঐ মস্তিষ্ক বিকৃত জানোয়ারগুলোর শাস্তি হবেনা ? আজ যদি আপনার এই একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারনে ঐ পাপীগুলো শাস্তি না পায় তাহলে হয়ত কাল রোদেলার মত অন্য কোনো মেয়ে ওদের লালসার শিকার হবে। আপনি কি তাই চান ?"
ভদ্রমহিলা নাছোড়বান্দা। তিনি একই ভাবে বললেন,
"অতশত ভেবে আমার কাজ নেই। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ইচ্ছে আমার নেই। আপনারা আসুন।"
রোদেলার বাবার মুখের দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক হসপিটাল বেডের লোহার দন্ডটা ধরে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছেন। বুঝতে আর বাকী রইলো না, এই লোক জরু কা গোলাম। স্ত্রীর সিদ্ধান্তই তার সিদ্ধান্ত। হতাশ হয়ে তাকালাম রোদেলার দিকে। গাল বেঁয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে মেয়েটার হাতের উপর। নরম কন্ঠে সুমন বললো,
"রোদেলা ? তোমার মতামত কি ?"
ভদ্রমহিলা এবারও রোদেলাকে কিছু বলতে না দিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন,
"ও কি বলবে, আমার কথাই ওর কথা। আপনারা দয়া করে আসুন প্লিজ। আমি ওসি সাহেবের সাথে কথা বলে নেব।"
অগত্যা চলে যাবার জন্য উঠে দাড়ালাম। তৎক্ষণাৎ একটা ২৫-২৬ বয়সী মেয়ে কেভিনে এসে এলোপাথাড়ি রোদেলার ছবি তুলতে শুরু করলো। রোদেলার মা-বাবা শঙ্কিত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করলেন। অগত্যা ডাক্তার চলে এলেন কেভিনে। মেয়েটা ছবি তোলা স্থগিত করে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে সাইড ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে দাড়ালো। ডাক্তার বললেন,
"কি হচ্ছে এসব ? এটা হাসপাতাল, আপনাদের শোয়ার ঘর না। চিল্লাচ্ছেন কেন ?"
রোদেলার মা বললেন,
"এই মেয়েটা হুট করে এসেই আমার মেয়ের ছবি তুলতে শুরু করেছে। এই মেয়ে, কে তুমি ?"
মেয়েটা মুচকি হেসে বলল,
"দুঃখিত। আসলে আমার পরিচয় দিলে আপনারা কেউ আমাকে ছবি তোলার পারমিশন দিতেন না। তাই এভাবে !"
ভদ্রমহিলা খেকশিয়ালের বংশধরের মতো আবার খেঁকিয়ে উঠলেন। বললেন,
"আশ্চর্য কথা ! কে আপনি ?"
"আমি ইশিতা। আমি সত্যের সন্ধানে সংবাদপত্রের একজন সাংবাদিক।"
রোদেলার মায়ের মাথায় বোধহয় ইশিতা মহাভারত চাপিয়ে দিলো। ভদ্রমহিলার এক্সপ্রেশন হয়েছে দেখার মত। মনে হয় ভুত দেখেছেন। সাংবাদিক শুনে সাংঘাতিক ভয়ে দু হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে বললেন,
"সাংবাদিক ?"
ডাক্তার বললেন,
"আপনারা সবাই এখন রোগীকে একা থাকতে দিন। রোগীর এখন ঘুমানোর সময় হয়েছে।"
ডাক্তার রোদেলার হাতে একটা ইনজেকশন পুষ করলেন। মনে হয় ঘুমানোর জন্য। সাংবাদিক মেয়েটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,
"ইশ্ ! দেরি করে ফেলেছি রে, আবার আসতে হবে। ধ্যাততিরিকি।"
বলেই মেয়েটা কেভিন থেকে বেরিয়ে গেল। ওর পিছু নিয়ে বের হলেন রোদেলার মা-বাবা। অগত্যা আমরাও বেরিয়ে এলাম।
করিডোরে এসে দেখি ভদ্রমহিলা ইশিতাকে ধরে খুব রিকোয়েস্ট করছে যেন সংবাদপত্রে খবরটা না ছাপে। ইশিতা তাকে তেমন পাত্তা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল। আমি সুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। সুমনও হাসলো। তারপর বললো,
"চলুন হারকিউলিস সাহেব, যাওয়া যাক।"
বাইকে চেপে চলে এলাম ধানমন্ডি ২৭ নং এর সেফজি নামক রেস্টুরেন্টে। একটা টেবিলে তিনজন বসে হাসছি। আমি, সুমন আর ইশিতা। ইশিতা সুমনের সহধর্মিনী। প্ল্যান করেই সুৃমন ইশিতাকে হাসপাতালে এনেছিলো সাংবাদিক সাজিয়ে। ইশ্ ! একবার যদি ওরা কেউ ইশিতার কাছে সাংবাদিকতার আইডি প্রুফ চাইতো, তাহলেই ধরা পড়ে যেত ইশিতা। ইশিতা আসলে এ্যাডভোকেট। তবে চমৎকার অভিনয় করেছে তা বলতেই হবে। হাসতে হাসতে বললাম,
"হাহাহাহা, লা জওয়াব ভাবী। জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছেন।"
ইশিতা ভয়ার্ত কন্ঠে বললো,
"ভেতরে ভেতরে আমারই ফেটে যাচ্ছিলো !"
আবার হাসলাম। বললাম,
"তবুও। কেউ ধরতেই পারলো না।"
সুমন বললো,
"হুম। তবে এই নাটকটা যে কারনে করা, প্ল্যানটা সাক্সেস হলেই হয়। ভাগ্যিস ওসি সাহেব রোদেলার মায়ের হাবভাব টের পেয়ে আমাদের জানিয়েছিলেন। তাহমিদ, ফোন কর উনাকে।"
পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করলাম। তারপর লাউড স্পিকার অন করে মোবাইলটা টেবিলের উপর রাখলাম। তিনবার রিং হয়ে চতুর্থ বারে ফোন রিসিভ করলেন রোদেলার মা।
"হ্যালো"
"আন্টি আমি বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সি থেকে হারকিউলিস বলছি।"
"আপনি ? আবার কেন ফোন করেছেন ?"
"আপনার জন্য একটা অফার আছে আন্টি।"
"অফার ? কি রকম ?"
"আপনি আমাদেরকে কেসটা তদন্ত করার অনুমতি দিন। আমরা কথা দিচ্ছি, বেশি লোক জানাজানি হবেনা। এবং তাহলে আমরা ঐ সাংবাদিককে রাজী করাবো, যেন ঘটনাটা পত্রিকার পাতায় না আসে। তাহলে এবার আপনি বলুন আপনি কোনটা চান ? আপনার হাতে অপশন দুইটা। এক, ঘটনাটা পত্রিকায় সারা দেশের মানুষ পড়বে। তাও আবার রোদেলার ছবিসহ। অথবা দুই, অল্পসংখ্যক লোক ব্যাপারটা জানবে হয়ত, আর রেপিস্টরাও সাজা পাবে।"
"ইম, আচ্ছা ঠিক আছে। আপনারাই তদন্ত করুন। কাল এসে রোদেলার স্টেটমেন্ট নিন। তবে মনে রাখবেন, খবরটা যেন সংবাদে পরিনত না হয়।"
"থ্যাংক ইউ আন্টি। ভয় পাবেন না। আমরা গুটিকয়েক লোক ছাড়া ঘটনাটা কেউ জানবে না।"
ফোন কেটেই একটা হাই ফাইভ করলাম সুমনের সাথে। যাক, প্ল্যানটা কাজ করেছে। ইতিমধ্যে খাবার চলে এসেছে। এবার উদরপূর্তীর পালা। তিনজনের খাবার ছাড়াও একটা খাবার পার্সেল নিয়েছি। আমার বউয়ের জন্য। যদিও এ খাবার প্রিয়ন্তির হাতের রান্নার কাছে কিছুই না, তবে বন্ধু বউকে নিয়ে খাচ্ছে দেখে নিজের বউকে খুব মিস করছি। দ্রুত খাওয়া শেষ করে সুমনের থেকে ওর বাইকের চাবিটা নিয়ে পার্সেলসহ নিচে এসে বাইক স্টার্ট দিলাম। ওরা দুই কপোত-কপোতী পরে একটা সিএনজি করে চলে যাবে। হালকা কেঁপে উঠে বাইক চলতে শুরু করলো।
বাইক যেমন চলছে, গল্পটাও চলবে।
রাতে ঘুমানোর আগে প্রিয়ন্তিকে রোদেলার ঘটনাটা খুলে বললাম। শুনে প্রিয়ন্তি চমকে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে পড়লো। অগত্যা আমিও উঠে বসলাম। প্রিয়ন্তি কিছু একটা চিন্তা করে আমার দিকে চেহারা ফিরিয়ে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"রোদেলা মেয়েটা কোন জায়গা থেকে কিডন্যাপ হয়েছিল বললে ?"
"ওয়ারী, জগিনগর রোড থেকে। কিন্তু তুমি এভাবে চমকে উঠলে কেন ?"
এবার কৌতহল নিজের মধ্যেও অনুভব করলাম। প্রিয়ন্তি অস্পষ্ট শব্দে "এক মিনিট" বলে বিছানা থেকে নেমে ওয়্যারড্রপের উপর থেকে চার্জে লাগানো মোবাইলটা খুলে কাকে যেন ডায়াল করে মোবাইলটা কানে লাগিয়ে আবার বিছানায় এসে বসলো। আমার কৌতুহল সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম,
"আহা প্রিয়ন্তি, এতরাতে কাকে ফোন করছো ? আরে এই, কি হয়েছে বলবে তো !"
প্রিয়ন্তি পাঁচ আঙুলের ইশারায় আমাকে অপেক্ষা করতে বলল। অতঃপর প্রিয়ন্তির কন্ঠ শুনে বুঝলাম ফোনকল রিসিভ হয়েছে। এরপর প্রিয়ন্তি থেমে থেমে ফোনে যা বলল,
"হ্যা মোহনা, আচ্ছা রিপার সাথে ঘটনাটা কোথায় ঘটেছিলো রে ? _________ আহা বল আগে। দরকার আছে বলেই তো জানতে চাইছি। _______ তুই কি কনফার্ম ? ----- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি কাল ফোন করে তোকে সব বলবো। _____ ওকে, ওকে। হ্যা রাখছি।"
ফোন কেটেই প্রিয়ন্তি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমাকে বলল,
"মোহনাকে ফোন করেছিলাম।"
আমি যথেষ্ট বিরক্ত হয়ে বললাম,
"মোহনাকে তো চিনি। তোমার বান্ধবী। কিন্তু রিপা কে ? প্রিয়ন্তি প্লিজ ঘটনাটা খুলে বলবে ?"
প্রিয়ন্তি চেহারায় কিছুটা শঙ্কার প্রলেপ টেনে বলল,
"তাহমিদ, রোদেলাকে যে বা যারা রেপ করেছে, সে বা তারা কোনো সাধারণ রেপিস্ট মনে হচ্ছেনা।"
কথাটা বোকা বোকা শোনালো। হাসি পেল কিছুটা। একটু চাপা হাসি হেসে বললাম,
"হাহা। রেপিস্ট আবার কখনো সাধারণ কিংবা অসাধারণ হয় নাকি ? ওদের একটাই পরিচয়। ওরা অপরাধী। মানুষ নামের জানোয়ার।"
প্রিয়ন্তি বলল,
"আমার ধারনা হি অর দে আর সিরিয়াল রেপিস্ট।"
কথাটা মাথার উপর দিয়ে গেল। সিরিয়াল কিলার শুনেছি। কিন্তু এই মেয়ে বলে কি ? অবাক হয়ে বললাম,
"কি বলছো তুমি ? সিরিয়াল রেপিস্ট মানে ?"
"এইমাত্র যে মোহনার সাথে কথা বললাম, রিপা ওর ছোট বোন। ১০-১২ দিন আগে রাত ১০ টার দিকে ওয়ারীর জগিনগর রোড থেকে রিপা নিখোঁজ হয়। এরপর ওকে টিএসসি থেকে ওকে ধর্ষনের শিকার হওয়া অবস্থায় খুঁজে পায় মোহনা আর ওর হাসব্যান্ড।"
এবার আমার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। নিজেকে সামলে বললাম,
"তুমি এ কথা আমাকে আগে বলনি কেন ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"মোহনা বলেছিল কাউকে না বলতে। ওরা তো লোকলজ্জার ভয়ে হাসপাতালে পর্যন্ত নেয়নি রিপাকে। পুলিশকেও কিছুই জানায়নি। আমি মোহনার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী বলেই আমাকে কথায় কথায় বলে ফেলেছিল। আজ তোমার মুখে রোদেলার কেসের ব্যাপারটা শুনে রিপার ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পেলাম।"
আমি বিছানা থেকে নেমে বালিশের কাছ থেকে মোবাইলটা তুলে একটা নম্বর ডায়াল করতে করতে বললাম,
"মিল তো আছেই। আর এই মিল কিছুতেই কাকতালীয় হতে পারেনা। ওয়ারীর জগিনগর রোড, টিএসসি, হুম ! যোগসূত্র তো আছেই। আচ্ছা তুমি ঘুমিয়ে পড়। আমি স্টাডি রুমে যাচ্ছি।"
"তুমি ঘুমাবে না ?"
প্রিয়ন্তির কন্ঠে অদ্ভুত এক ভাললাগা অনুভব করলাম। মৃদ্যু হেসে বললাম,
"ঘুমাব। সুমনের সাথে কেস টা নিয়ে একটু কথা বলে আসছি। তুমি ঘুমাও।"
প্রিয়ন্তি বাধ্য স্ত্রীর মতো শুয়ে পড়লো। বাতি নিভিয়ে বেডরুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।
সকাল হয়েছে। সুমনের বাইকটা নিয়েই বেরিয়েছি। রাতে ঘটনাটা শুনে সুমনও অনেক এক্সাইটেড হয়েছিল। সুমনকে ওর বাড়ির সামনে থেকে তুলে ঢাকা মেডিকেল গিয়ে রোদেলার স্টেটমেন্ট নিতে হবে। ওসি মামুনকে রিপার কেস টা ইনফর্ম করেছি। উনি বলেছেন যাবেন রিপাদের বাসায়। মনস্থির করে ফেলেছি, এই সিরিয়াল ধর্ষককের মুখোশ উন্মোচন করবোই। আর সেটাও নতুন কেউ ঐ রেপিস্টের পরবর্তী শিকার হবার আগেই।
রোদেলার সামনে বসে আছি আমি আর সুমন। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওর মা-বাবা। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েটা বলতে শুরু করলো,
"আমি আমার বান্ধবী ফারজানার বাসায় ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে ওর মাকে গোঁছগাছে সাহায্য করতে গিয়ে বেশ দেরী হয়ে যায়। ওরা খুব করে ওদের বাড়িতেই থাকতে বলে আমাকে। তবে জন্মদিনের খাবার আমার বাবা মায়ের জন্য প্যাক করে রেখেছিলো, তা নিয়ে আমি না গেলে খাবারগুলো নষ্ট হতো। তাই আনুমানিক সাড়ে এগারো টা নাগাদ আমি বাসায় ফেরার জন্য বের হই। ওয়ারীর জগিনগর রোডের মাথায় হেঁটে এসে রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এরপর....!
আমি কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম,
"তারপর ?"
রোদেলা আবার বলল,
"এরপর একটা রিক্সা এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে রিক্সার প্যাসেঞ্জার সিটে একটা লোক বসে ছিল। রিক্সাওয়ালা আমাকে জিজ্ঞেস করে যে আমি কোথায় যাব। আমি বলেছিলাম। তারপর রিক্সাওয়ালা বলেছিলো যে এই প্যাসেঞ্জারকে সামনের গলিতে নামিয়ে দিয়েই সে ফিরে এসে আমাকে পৌঁছে দেবে। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকি। ততক্ষণে ঐ রিক্সাওয়ালা আর আসেনি। হঠাৎ কাঁধের উপর কিছু একটার স্পর্শ অনুভব করি। অনেকটা পিঁপড়ার কামড়ের মত। তারপর আর কিছুই বলতে পারবোনা। যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, কয়টা বাজে জানিনা। নিজেকে টিএসসি চত্বরে আবিষ্কার করলাম। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও পাচ্ছিলাম না। কি করবো তাও বুঝতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে, পা টেনে টেনে হেঁটে শাহবাগ আসি। সেখান থেকে ওসি সাহেব আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।"
এটুকু বলেই মেয়েটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। বলল,
"আই ওয়ান্ট জাস্টিস মি. বন্ডকিউলিস। আমি ওদের শাস্তি চাই।"
সুমনের ফোনটা বেজে উঠলো। এরপর সুমন ফোন রিসিভ করে বলল,
"হ্যা ওসি সাহেব। হ্যা আমরা হাসপাতালে। আচ্ছা ঠিক আছে। আসছি।"
ফোন রেখে সুমন উঠে দাঁড়ালো। অগত্যা আমিও। সুমন রোদেলার দিকে তাকিয়ে বলল,
"কেঁদোনা। তুমি বিচার পাবে। শাস্তি ওদের হবেই।"
সুমন আর আমি থানায় যাচ্ছি। ওসি সাহেব রিপার স্টেটমেন্ট নিয়ে এসেছেন। এখন আলোচনায় বসবো তিনজন।
আমি আর সুমন এই মুহুর্তে বসে আছি থানায়। মামুন সাহেবের রুমে। একজন কন্সটেবল এসে তিনকাপ চা টেবিলের উপর রেখে চলে গেল। চায়ের কাপ হাতে তুলে তাতে একটা চুমুক দিয়ে ওসি মামুন আহম্মেদ ফোন করলেন রোদেলার ডাক্তারকে। মানে রোদেলার চিকিৎসা যে ডক্টর করছেন, তাকে। ফোন রিসিভ হবার পর ওসি সাহেব লাউড স্পিকার অন করে কথা বলতে শুরু করলেন। ওসি সাহেব বললেন,
"হ্যা ডক্টর, আমি ওসি মামুন বলছি।"
"হ্যা ওসি সাহেব বলুন।"
"আচ্ছা ! রোদেলাকে ঠিক কোন ড্রাগ দিয়ে অচেতন করা হয়েছিলো বলতে পারেন ?"
বলে ওসি সাহেব আরেকবার চায়ে চুমুক দিলেন। আমরা দুজন তো ননস্টপ চুমুক দিয়েই যাচ্ছি। মানে, চায়ের কাপে আর কি !
ওপাশ থেকে ডাক্তার বললেন,
"হ্যা। এই ইনফরমেশন টা দিতে আমিই আপনাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। ড্রাগটার নাম ক্যাটামিন।"
আমি আর সুমন একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। ওসি সাহেব কৌতুহলী হয়ে বললেন,
"ক্যাটামিন, মানে এটা কি ধরনের ড্রাগ ?"
ডাক্তার বলতে শুরু করলেন,
"ক্যাটামিন এমন এক ধরনের ড্রাগ, যা সাধারণত হিংস্র প্রাণীদের অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত হয়। ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাটামিন ইনজেক্ট করলে একটা সুস্থ বাঘকে মুহুর্তেই অজ্ঞান করে ফেলা সম্ভব। ক্যাটামিন সেবন করার ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে মস্থিস্কের গ্লোটামিন কে ব্লক করে দেয় ( গ্লোটামিন হচ্ছে এক ধরণের এমাইনো এসিড যা নিউরোট্রান্সমিটারের খাদ্য যোগীয়ে থাকে ) তখন ডোপামিনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে সাময়িক ভাবে মস্থিস্ক তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা রিলাক্সে চলে যায় । এরপর সেবন কারী কিছু সময়ের জন্য সুখ বা আরাম অনুভব করে । যখন ক্যাটামিনের ক্রিয়া ক্ষমতা চলে যায় তখন সেবনকারী কোথায় কি করেছে বলতে পারেনা।"
ফোন রাখার পর ওসি সাহেবের জরুরী একটা কল আসায় আমাদের মিটিং পন্ড হলো। উনাকে বাইরে কোথাও যেতে হবে। বেরিয়ে গেলাম তিনজনই। পরদিন বসবো তিনজন। ওসি সাহেব উনার গাড়ি নিয়ে নিজের রাস্তায়, আর আমরাও বাইকে চেপে যাত্রা করলাম নিজেদের গন্তব্যে।
তিনজন বসে আছি ওসি সাহেবের অফিস রুমে। ওসি সাহেব একটা বেনসন সিগারেট জ্বালিয়ে উপরের দিকে ধোঁয়া ছেড়ে আমার আর সুমনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"তাহমিদ সাহেব, আপনার সন্দেহ সত্যি হবার সম্ভাবনা ৮০%। রোদেলার কেস টার সাথে রিপার কেসের মিল ১০০%। রিপাকেও জগীনগর রোড থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছিলো। রিপাও কিডন্যাপ হবার আগে শেষ দেখেছিলো একজন রিক্সাওয়ালা আর রিক্সায় একজন প্যাসেঞ্জারকে। যেমনটা রোদেলা দেখেছিলো। আর শেষে ওরা দুজনই জ্ঞান ফেরার পর নিজেদের টিএসসি চত্বরে আবিষ্কার করে। এতগুলো তো কোয়েন্সিডেন্স হতে পারেনা।"
সুমন বলল,
"এক্সেক্টলি। আমারও মনে হচ্ছে রেপিস্ট একজনই।"
সুমনকে শুধরে দিয়ে আমি বললাম,
"দুটো মেয়েই গ্যাং রেপ হয়েছে। সুতরাং একজন নয়, বল রেপিস্টরা একই।"
ওসি সাহেব সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে সেটা সুমনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সুমনও সেটা নিয়ে একটা হালকা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো। ওসি সাহেব বললেন,
"তাহলে, এখন কি ঐ জগীনগর রোড, ওয়ারী, এলাকাগুলোতে রেড দিবো ?"
আমি বললাম,
"ব্লাইন্ডলি না এগিয়ে আই থিঙ্ক ওদের হাতে নাতে ধরতে হবে।"
ওসি সাহেব ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"কীভাবে ?"
আমি বললাম,
"দেখি। ভাবতে হবে কিছু একটা।"
সুমন সিগারেটে শেষ টান দিয়ে তা এস্ট্রেতে চেপে রেখে আমাদের দুজনের উদ্দেশ্যে বলল,
"আপনারা কিন্তু একটা ব্যাপার মিস করে যাচ্ছেন।"
ওসি সাহেব বললেন,
"কোন ব্যাপারটা ?"
সুমন বললো,
"মেয়ে দুটোকে অজ্ঞান করতে ক্যাটামিন ব্যবহার করা হয়েছে। এই ক্যাটামিন কিন্তু খুব দামী একটা ড্রাগ। বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীদের অজ্ঞান করতে এই ক্যাটামিন ব্যাবহার করা হয়। মানুষের ক্ষেত্রে বড়সড় কোনো অপারেশনে রোগীকে বেহুশ করতে এই ড্রাগ ব্যবহার করে স্পেশালিষ্ট ডক্টররা। তবে যে কোনো ফার্মেসীতে গেলেই কিন্তু ক্যাটামিন পাওয়া যায় না। অর্থাৎ ক্যাটামিন কিন্তু মোটেও সহজলভ্য না।"
আমি বললাম,
"তুই ঠিক কি বলতে চাইছিস ?"
সুমন বলল,
"বলতে চাইছি আমরা যে একজন রিক্সাওয়ালাকে সন্দেহ করে অগ্রসর হচ্ছি, রিক্সাওয়ালা ক্যাটামিন পাবে কোথায় ? নিশ্চিত শিক্ষিত কোনো লোক এই গ্যাং এর লিডার। কোনো ডাক্তারও হতে পারে। যে রেপিস্টদেরকে ক্যাটামিনের যোগান দেয়।"
ওসি সাহেব বললেন,
"কেস কিন্তু ঘোলাটে হচ্ছে। তবে সুমন, আপনি ক্যাটামিন সম্পর্কে এত তথ্য পেলেন কোথায় ?"
সুমন মৃদ্যু হেসে বলল,
"গতরাতে রিসার্চ করেছিলাম।"
ওসি মামুন আহমেদের অফিস রুম কাঁপিয়ে স্বশব্দে বেজে উঠলো টেবেলের উপরের টেলিফোন। রিসিভ করেই বিষ্ফোরিত দৃষ্টি নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। টেলিফোনে বললেন,
"কি____আচ্ছা, আচ্ছা, আমি আসছি।"
টেলিফোন রেখে ওসি মামুন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"ভেবে কিছু করার আর সময় নেই। যা করার দ্রুত করতে হবে। উপর থেকে কোনো চাপ আসার আগেই।"
আমি আর সুমন অবাক হয়েছি, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমি বললাম,
"কি হয়েছে ওসি সাহেব ? এত অস্থির হচ্ছেন কেন ? কার ফোন ছিল ?"
ওসি সাহেব তড়িঘড়ি করে বললেন,
"আমাদের থানারই একটা গাড়ি। টিএসসি থেকে ফোন করেছে এক কন্সটেবল। বলল টিএসসি তে নাকি কোনো এক গাছের সাথে একটা মেয়ের লাশ ঝুলছে। আমি শিউর এটা ঐ রেপিস্টদেরই কাজ।"
"কি ?"
"কি ?"
টেলিপ্যাথি ঘটিয়ে একত্রে বলে উঠলাম আমি আর সুমন। আতঙ্ক ভর করেছে আমাদের তিনজনকেই। দ্রুত বেরিয়ে গেলাম। ওসি সাহেব গাড়িতে, সুমন আর আমি যথারীতি বাইকে। কিছুদূর যেতেই সুমন বলল,
"তাহমিদ, আমার পকেটে মোবাইটা ভাইব্রেট হচ্ছে। দেখ তো কার ফোন !"
অগত্যা ওর প্যান্টের বাম পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইলটা বের করে দেখি ওসি সাহেবের ফোন। আমাদের বাইকের সামনেই চলছে তার গাড়ি। রিসিভ করলাম।
"হ্যা ওসি সাহেব। কি ব্যাপার ?"
"তাহমিদ, গাছ থেকে মেয়েটার লাশ নামিয়ে ঢাকা মেডিকেল নিয়ে গেছে। এখন আমাদের সেখানেই যেতে হবে।"
"আচ্ছা ঠিক আছে। আমরা আপনার পিছনেই আছি।"
ফোন কেটে সুমনকে বললাম,
"মেয়েটার লাশ ঢাকা মেডিকেল নিয়ে গেছে। সেখানেই যেতে হবে।"
সুমন বলল,
"ও আচ্ছা।"
ঢাকা মেডিকেলের মর্গে দাঁড়িয়ে আছি আমি, সুমন, ওসি মামুন, একজন ডক্টর আর একজন ডোম। লাশটা একটা ট্রলির উপর রাখা হয়েছে। ঠিক তার উপর ১০০ ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বলছে। মেয়েটার দেহে তেমন কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছেনা। শুধু গলায় দড়ির ছাপ কালো রক্তবর্ণ হয়ে বসে গেছে। ডাক্তার ডোমকে লাশটা কাটার পারমিশন দিয়ে আমাদের নিয়ে বাইরে এলেন। বাইরে এসেই ওসি মামুন ডক্টরকে বললেন,
"কিছু বুঝতে পারছেন ?"
"গায়ে তেমন কোনো চিহ্ন নেই। তবে আপনারা আসার আগেই মেয়েটাকে একবার দেখেছিলাম আমি। সেক্সুয়াল এসোল্ট হয়েছে মনে হয়, কারণ মেয়েটার পাজামায় রক্তের দাগ ছিল। আর বাকীটা পোস্টমর্টেমের পরই বলতে পারবো।"
ডক্টর বোধহয় উনার কেভিনের দিকে চলে গেলেন। একজন কন্সটেবল এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো। তাকে দেখেই ওসি সাহেব বললেন,
"কি ব্যাপার রফিক ? তুমি তো গাছ থেকে লাশ নামানোর সময় সেখানেই ছিলে ? কোনো সূত্র বা কোনো প্রমান, কিছু পেয়েছো সেখানে ?"
রফিক হ্যা সূচক মাথা নেড়ে বলল,
"জ্বী স্যার। মেয়েটার জামার পকেটে এই চিঠিটা ছিল। এ ছাড়া আর কিছুই পাইনি।"
রফিক একটা ভাঁজ করা কাগজ এগিয়ে দিলো ওসি সাহেবের দিকে। কাগজটা হাতে নিয়ে খুললেন ওসি সাহেব। এরপর পড়তে লাগলেন,
"আমি জানিনা গত রাতে আমার সাথে কি হয়েছে। ওয়ারী জগীনগর রোডে রাত ১১ টা নাগাদ ঔষধ কিনতে বেরিয়েছিলাম। বাবার অসুস্থতার জন্যই অত রাতে বের হতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার বাসা জগীনগর রোডেই। হঠাৎ একটা খালি রিকশা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। রিকশাওয়ালা আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি কোথাও যাব কিনা। আমি যাব না বললে সে চলে যায়। তবে আর দু পা এগুতেই কাঁধে একটা আঘাত অনুভব করি। এরপর আর কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি আমি টিএসসি তে পড়ে আছি। উঠতে পারছিলাম না। খুব কষ্ট হচ্ছে। এখানে একটা পিলারের উপর একটা কলম পেয়েছি। আর যে কাগজটায় লিখছি, সেটাও কুড়িয়ে নেয়া। আমি অনুমান করতে পারছি আমার সাথে কি হয়েছে। ছোটবেলা থেকে খুব রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে উঠেছি। এখন এই কলঙ্কিত মুখ নিয়ে বাবার সামনে দাঁড়াতে পারবো না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আত্মহত্যা করবো। যদি কেউ আমার এই চিঠিটা পান, তাহলে আমার লাশটা আমার বাবাকে দিয়ে দেবেন। আমার বাবার নাম্বার - 017********। আই কুইট।"
এক নিঃশ্বাসে চিঠিটা পড়ে রাগে ফেটে যাবার উপক্রম ওসি সাহেবের। আমাদের অবস্থাও একই। ওসি সাহেব বললেন,
"জানোয়ারগুলিরে একবার পাই, এক এক কইরা সবগুলির সো** কাইটা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু।"
আমি বললাম,
"এরা একের পর এক মেয়েকে এভাবে ধর্ষণ কেন করছে ? উদ্দেশ্য কি এদের ?"
সুমন বলল,
"সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে গিনিজ বুকে নাম তুলতে চায় বোধহয়।"
ওসি সাহেব বললেন,
"একবার পাই শুধু, অগো এমন অবস্থা করমু, যা দেইখা গিনিজ বুকে আমার নামই আইসা পড়ব।"
কি একটা ভেবে বাসায় ফোন করে প্রিয়ন্তিকে স্টার রেস্টুরেন্টে আসতে বললাম। সুমনও ডাকলো ইশিতাকে। ওসি সাহেব গাড়িতে করে আর আমরা বাইকে করে যাচ্ছি স্টারে।
স্টারে বসে একটা গভীর আলোচনা চলছে পাঁচটা মানুষের মধ্যে। প্ল্যান করা হচ্ছে কিছু একটা। সিরিয়াল রেপিস্টরা আর কোনো মেয়েকে শিকার বানানোর আগে ওদেরকেই শিকার করার প্ল্যান চলছে। সবাই বেশ গম্ভীর। ওয়েটার অবশ্য দুবার এসে ফিরে গেছে। আমরা এখনও কোনো খাবার অর্ডার করিনি। তৃতীয় বার ওয়েটার এসে আমাদের কথার মাঝে বাম হাত ঢুকিয়ে বলল,
"স্যার, আপনারা কি কিছু খাবেন ?"
ওসি সাহেব ভীষন বিরক্ত হয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন,
"তোমার বউয়ের ** খামু। আছে ? ব্যাটা ফাজিল। তোরে কইছিনা জরুরী কথা বলতেছি ? খাওয়ার টাইম হইলে আমরাই তোরে ডাকুম। যা ভাই।"
ওয়েটার বেচারা ওসি সাহেবের অশ্লীল কথার কোনো প্রতিবাদ করলো না। মাথা নিচু করে চলে গেল। ওসি সাহেব প্রিয়ন্তি আর ইশিতার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"পারবে তোমরা ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"ওসি স্যার, আমার অভিনয় সম্পর্কে আপনার কোনো ধারনাই নেই। ইভেন, তাহমিদেরও নেই।"
ভ্রু কুঁচকে তাকালাম প্রিয়ন্তির দিকে। বললাম,
"এমনভাবে বলছ, মনে হয় অস্কার পেয়েছো বিয়াল্লিশ টা ?"
"জানো না বলেই বলছো। স্কুল কলেজে কত এওয়ার্ড পেয়েছি এক্টিংয়ের জন্য।"
বেশ গাম্ভীর্যের সাথে জবাব দিলো আমার বউ টা। ওসি সাহেব বললেন,
"তাহলে ডিসিশন ফাইনাল।"
বাসায় ফিরছি। ওসি সাহেবের সাথে ইশিতা আর সুমন উনার গাড়িতে চলে গেছে। আমি আর প্রিয়ন্তি যাচ্ছি সুমনের বাইকে। মাঝেমাঝে নিজেই কনফিউস হয়ে যাই। বাইকটা কি আদৌ সুমনের, নাকি আমারই ?
গল্পের নামটা যেহেতু দ্যা সিরিয়াল রেপিস্ট, তাই গল্পের স্বার্থে এমন অনেক আপত্তিকর শব্দ এ পর্যন্ত চলে এসেছে বা সামনে আসতে পারে, যেগুলো হয়ত আপনাদের কাছে গ্রহনযোগ্য নাও হতে পারে। এজন্য শব্দগুলো, নাহ, এড়িয়ে যেতে বলবো না। এড়িয়ে গেলে আমার লেখার স্বার্থকতা কি ? বরং বলব, শব্দগুলো নিজ দায়িত্বে পড়ে নেবেন।
আর একটা কথা। অশ্লীল শব্দের মাঝে আমি (**) চিহ্ন ব্যবহার করছি। শব্দগুলো একদম এড়িয়ে গেলে লেখার মান খারাপ হবে। আর একজন লেখক হিসেবে লেখার মান নিয়ে ১% ছাড় দিতেও আমি রাজী নই। ধন্যবাদ।
রাত ১:১৫। ওয়ারী জগীনগর রোড। প্রিয়ন্তি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। প্রিয়ন্তির গায়ে ফুটপাত থেকে দু'শ টাকা দিয়ে কেনা একটা কাপড়। হ্যা। কাপড়ই তো। এটাকে শাড়ি বলা যায় না। খুব গাঢ় করে মেকাপ করেছে প্রিয়ন্তি। দেখে মনে হচ্ছে যেন স্নো-পাউডার ডিব্বা উলটে ঢেলে দিয়েছে নিজের উপর। ঠোঁটে টকটকে লিপস্টিক দিয়ে রক্তবর্ণ বানিয়ে রেখেছে। চুলে বিনুনি করে যে ফিতা বেঁধেছে, ঐ ফিতার দাম, জোড়া ছয় টাকা। দামাদামি করলে পাঁচ টাকায়ও নেয়া যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান চিবাচ্ছে প্রিয়ন্তি। ডান হাতের মধ্যাঙ্গুলে চুন লাগানো। একটা আঙ্গুলটা দাঁতে লাগিয়ে একটু চুন মুখে নিলো প্রিয়ন্তি।
একটা খালি রিকশা এগিয়ে আসছে প্রিয়ন্তির দিকে। রিকশাওয়ালা হেড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে। রিকশাওয়ালা যে গানটা গাইছে, সেটা রিকশাওয়ালাদের বহুল জনপ্রিয় একটা গান। "ও সখিনা গেছোস কিনা ভুইল্যা আমারে, আমি অহন রিকশা চালাই ঢাকার শহরে।"
প্রিয়ন্তি একটু নড়েচড়ে দাঁড়ালো। বোধহয় প্রস্তুত হয়ে নিলো। রিকশা টা এগিয়ে আসতেই প্রিয়ন্তি বললো,
"ঐ খালি, যাইবা ?"
রিকশাওয়ালা না সূচক মাথা নেড়ে নিজের মত গান গাইতে গাইতে চলে গেল। প্রিয়ন্তি ভাবলো, এটা নিশ্চয়ই অন্য কোনো রিকশাওয়ালা। প্রিয়ন্তি আবার নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে পান চিবাচ্ছে। মিনিট পাঁচেক যেতেই প্রিয়ন্তি "এইযে" শব্দ শুনে চমকে পেছনে তাকিয়ে দেখলো ঐ রিকশাওয়ালা দাঁড়িয়ে। প্রিয়ন্তি নিজেকে তৎক্ষণাৎ সামলে নিয়ে বুকে থুরথুরি দিয়ে রিকশাওয়ালার দিকে তাকালো। রিকশাওয়ালা নিজের বত্রিশ পাটী দাঁত বের করে বলল,
"কিরে, ডরাইছোস ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"এহ, আইছে ডর দেহাইতে। তয় ইট্টু চমকাইছি।"
রিকশাওয়ালা মনে হয় টুথপেস্টের বিজ্ঞাপণ দেবার অফার পেয়েছে কোথায়ও। তাই এখানে দাঁত দেখানোর প্রাকটিস করছে। হাসতে হাসতে বলল,
"নাম কি রে তোর ?"
প্রিয়ন্তির রিকশাওয়ালার একটু আগে গাওয়া গানটাই মাথায় ভ্রমন করছিল। চেহারায় একটু লজ্জা পাবার ছাপ টেনে বলল,
"আমার নাম সখিনা। তয় সবাই আমারে সখি কইয়া ডাকে। আপনের নাম কি ?"
রিকশাওয়ালা বলল,
"আমার নাম জসিম। এত রাইতে এই আন্দার রাস্তায় খাড়াইয়া কি করোস ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"এহ, মনে হয় কিছ্ছু বোজেন না ? ফিডারে কইরা দুধ খাননি অহনও ?"
রিকশাওয়ালা একটু কামুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"দুধ তো খাই। তয় ফিডারে খাওয়া ছাইড়া দিছি হেই উদাম কালে। যাউগ্যা, কাস্টোমার পাস নাই অহনও ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"নাহ। ব্যাডারা সব মনে অয় ভালা অইয়া গেছে। দুই ঘন্টা ধইরা খাড়াইয়া আছি।"
রিকশাওয়ালা একপা এগিয়ে এসে বলল,
"আমার লগে যাবি ? দুইদিন ধইরা খরা চলতাছে। যাবি ? পোসায়া দিমুনে।"
প্রিয়ন্তি একপা পিঁছিয়ে পানের পিক ফেলল। তারপর বলল,
"যাইতে পারি। তয় পাশশো ট্যাকা লাগবো।"
রিকশাওয়ালা লুঙ্গির ভাঁজ থেকে একটা প্যাকেট বের করলো। প্যাকেট থেকে এমন ভাবে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করল, যেন কোনো বান্ডেল থেকে ছাড়িয়ে টাকাটা বের করলো। টাকাটা প্রিয়ন্তির দিকে এগিয়ে দিয়ে রিকশাওয়ালা বলল,
"এই ল। অগ্রীম দিলাম। অহন চল আমার লগে।"
প্রিয়ন্তি টাকাটা হাতে নিয়ে হাসিমুখে বলল,
"কই লইয়া যাইবেন আমারে ?"
রিকশাওয়ালা রিকশার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
"বেশি দূর না। এই সামনেই। ঠাডারি বাজারে আমার বাসা।"
প্রিয়ন্তি রিকশায় উঠলো। জসিম রিকশাওয়ালাও প্যাডেলে চাপ দিয়ে এগুতে লাগলো। প্রিয়ন্তি নিজের চুলে ঢাকা বাম কানে লাগানো ব্লুটুথ হেডসেটে আমার কন্ঠ শুনতে পেল। আমি বললাম,
"প্রিয়ন্তি ওখান থেকে ঠাটারী বাজার দশ মিনিটের পথ। দ্রুত ওর মুখ থেকে আসল কথা বের করো।"
প্রিয়ন্তি তৎক্ষণাৎ রিকশাওয়ালাকে বলল,
"আইচ্ছা, আপনে যে কইলেন দুইদিন ধইরা খরা চলতাছে। দুইদিন আগে কারে ভাড়া করছিলেন ? আসলে এইহানে আমার মতন সবগুলিরেই আমি চিনি। আপনে নাম কইলেই আমি চিনতে পারুম।"
রিকশাওয়ালা পা চালাতে চালাতে বলল,
"আরে ধুরো। কাউরে ভাড়া করি নাই। আর তোগো মত মা**গোরে আমরা **না। আমরা তো ভালা ঘরের আবিয়াইত্যা মাইয়াগোরে !
রিকশাওয়ালা শেষ করার আগেই প্রিয়ন্তি বলল,
"আমরা মানি ? আপনের লগে আরো কেউ থাকে ? আর ভালা ঘরের আবিয়াইত্যা মাইয়া আপনেরা কই পান ? ওরা আপনেগো লগে যায় ক্যান ?"
রিকশাওয়ালা বোধহয় কিছু একটা আন্দাজ করে ফেলল। তাই কথা ঘুরিয়ে বলল,
"এতকিছু জাইনা তুই কি করবি ? চুপ কইরা রিকশায় বইয়া থাক। ট্যাকা তো পাইছোস। অহন জায়গামত যাইয়া কাম সাইড়া চইলা যাবি।"
আমি প্রিয়ন্তিকে বললাম,
থাক। আর কিছু বলোনা। সন্দেহ হলে পরে পালিয়েও যেতে পারে। ওকে ঠাটারী বাজার পর্যন্ত আসতে দাও।"
প্রিয়ন্তি রিকশাওয়ালাকে বলল,
"চ্যাতেন ক্যান ? আমি তো গপ্পো করতে চাইছিলাম।"
রিকশাওয়ালা চুপচাপ রিকশা চালাচ্ছে। প্রিয়ন্তিও চুপচাপ বসে আছে রিকশায়। মিনিট সাতেক পর ঠাটারী বাজারের মুসলিম সুইটস শপের সামনে এসে রিকশা থামলো। রিকশাওয়ালা জসিম রিকশা থেকে নেমে প্রিয়ন্তির দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। প্রিয়ন্তিকে মুসলিম সুইটস শপের অপসিটে একটা দোতলা বাড়ি দেখিয়ে বলল,
"এইযে, এই বাড়ির দোতালায় আমগো আড্ডাখানা। নাম রিশকা থিকা। আয়।"
প্রিয়ন্তি হকচকিয়ে বলল,
"আপনেগো আড্ডাখানা মানি ? বিতরে আরও কোনো ব্যাডা আছে নি ? তাইলে কইলাম যামুনা।"
রিকশাওয়ালা বলল,
"আরে না। আর কেউ নাইগা। এল্লাইগাই তো তোরে এইহানে লইয়া আইলাম। আয়।"
প্রিয়ন্তি রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালার পিছু হাটতে লাগলো। জসিম রিকশাওয়ালা দোতলায় উঠার সিড়িতে পা দিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখলো প্রিয়ন্তি নয়। বরং ওসি মামুন আর তার চারজন কন্সটেবল দাঁড়িয়ে আছে ওর পেছনে। রিকশাওয়ালার ভিমরি খাওয়ার মত অবস্থা। কোনো মতে নিজেকে সামলে খেঁকিয়ে উঠলো।
"আপনেরা কারা ? এইহানে কি চান ?"
ওসি সাহেব এগিয়ে গিয়ে ওর শার্টের কলার চেপে ধরলেন। বললেন,
"পুলিশ।"
রিকশাওয়ালার চেহেরা দেখে মনে হলো ব্যাটার নির্ঘাত ফেস স্ট্রোক হয়েছে। পুলিশের নাম শুনে চেহারার সব হাওয়া এক নিমিষেই ফুস করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
"আমারে ধরলেন ক্যা সার ? আমি কি করছি ?"
ওসি মামুন আর সহ্য করতে পারলেন না। জায়গায় দাঁড়িয়েই ক ঘা লাগিয়ে দিলেন। বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে আমি, প্রিয়ন্তি আর সুমন কেবল "ওমা, ও বাবা, ওরে, মারে, সার কি করছি কইবেন তো" টাইপ চিৎকার শুনছিলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি জসিমকে ননস্টপ প্যাঁদাচ্ছেন ওসি সাহেব। নীচতলার দরজায় দেখলাম তালা ঝুলছে। ওসি সাহেব জসিমকে দোতলায় নিয়ে গেলেন। অগত্যা আমরাও পিছু পিছু গেলাম। জসিম লুঙ্গির ভাঁজ থেকে একটা প্যাকেট বের করে তার ভেতর থেকে দরজার চাবি বের করতেই ছোঁ মেরে প্যাকেটটা নিজের হাতে নিয়ে নিলেন ওসি সাহেব। দরজা ঠেঁলে ভেতরে ঢুকলাম সবাই।
তিনরুমের একটা ফ্ল্যাট। পরিষ্কার পরিছন্নতার কথা বললে শব্দগুলোকে জুতাপেটা করা হবে। যেখানে সেখানে চিপস, বিস্কিটসহ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুধু প্যাকেটই নয়। চিপস, বিস্কুট, চানাচুর, সিগারেটের প্যাকেট, সিগারেটের খাওয়া শেষাংশ, লাইটার, ফয়েল পেপার, পোঁড়া দুই টাকার নতুন নোটসহ অনেক উচ্ছিষ্ট পড়ে আছে ডাইনিং রুমের পুরোটা জুড়ে। ডাইনিং টেবিলের উপর কোকাকোলার বোতল কাঁত হয়ে আছে ছিপি খোলা অবস্থায়। কোক গড়িয়েছে টেবিলের নিচের ফ্লোর অবধি। বিশ্রী গন্ধে বমি হবার উপক্রম সবার। কন্সটেবলরা তন্নতন্ন করে প্রতিটা ঘরের এ কোনা সে কোনা সার্চ করতে লাগলো। ওসি সাহেব জসিমের প্যাকেট টা খুলে তাতে বিয়াল্লিশ হাজার টাকা পেলেন। আরো কতক চপেটাঘাত করে জসিমকে একটা চেয়ারে বসিয়ে বললেন,
"এতটাকা কই পাইছিস বল।"
জসিম আর্তনাদ করতে করতে বলল,
"আমগো লিডারে দিছে সার।"
ওসি সাহেব বললেন,
"তোর লিডারের নাম বল। এই বাড়িটা কার ?"
জসিম বলল,
বাড়ি লিডারের। তয় লিডারের নাম আমি জানিনা সার।"
আরো ক"ঘা খেল জসিম। ওসি সাহেব মারতে মারতেই বললেন,
"সোজা কথায় বলবিনা তাইনা ? তাইলে মেডিসিন খাইতে থাক। মাইরের উপর ঔষধ নাই।"
এলোপাথাড়ি মার খেতে থাকা জসিম বলল,
"সার, সত্য কথা কইতাছি। লিডার হের নাম কাউরে কয় নাই। আমরা খালি হের লাইগা কাম করি। আমার কথা বিশ্বাস করেন সার।"
ওসি সাহেব মার বন্ধ করে বললেন,
"বুঝছি। এখন বলবিনা। থানায় নিয়ে ইন্টারোগেশন সেলের মধ্যে যখন পু** দিয়ে সিদ্ধ ডিম ঢুকামু, তখন সব বলবি।"
কন্সটেবলরা সার্চ শেষ করে ফিরে এলো। একজনের হাতভর্তি মোবাইল। একজনের হাতভর্তি ইয়াবা ট্যাবলেট। একজনের হাতে বেশ কয়েক বান্ডেল টাকা। আর শেষজনের হাতে ব্যবহৃত ও নতুন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের একঝুড়ি কনডমের প্যাকেট।
ওসি সাহেব কন্সটেবলদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"তোমরা এইসমস্ত মালামালগুলো নিয়ে গাড়িতে তোলো। আর হ্যা। এসব রেখে দুজন উপরে এসো। ফ্ল্যাট টা সিল তালা করে দিয়ে যাবো। সরকারি অনুমতি ছাড়া যেন কেউ এই ফ্ল্যাটে ঢুকতে না পারে।"
কন্সটেবলরা মালামালগুলো নিয়ে বেড়িয়ে গেল। ওসি সাহেব আমাদের দিকে তাকিয়ে হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গু্ল দিয়ে ইশারা করলেন যে তাকে প্রকৃতির সাথে কণভারসেশনে যেতে হবে। তিনি বললেন,
"এই রিকশাওয়ালা ব্যাটাকে দেখবেন। ব্যাটা কিন্তু ধুরন্ধর। ফাঁক পেলেই পালাবে।"
সুমন অভয় দিয়ে বলল,
"আপনি যান স্যার, আমরা আছি।"
ওসি সাহেব বাথরুমে ঢুকেই তৎক্ষণাৎ বেড়িয়ে এলেন। আর এসেই জসিমকে বেধরক চড়-থাপ্পর-কিল-ঘুষি মারতে লাগলেন। কারনটা বুঝলাম না। বাথরুমে গিয়ে বাথরুম না করেই ফিরেই বা এলেন কেন ? আর জসিমকেই বা এভাবে মারছেন কেন ? আমাদের প্রশ্নটা জসিমই করল। মার খেতে খেতে বলল,
"ও সার, ওরে বাবা, এহন আবার মারতাছেন ক্যা ? এহন আমি আবার কি করলাম ?"
ওসি সাহেব মারের গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"কু**র বাচ্চা। হাইগা বাথরুমে পানি ঢালোস না ক্যান ? খাচ্চরের ঘরে খাচ্চর। গিদড় কোথাকার।"
জসিম বলল,
"ওরে মা, সার বিশ্বাস করেন, আমি গত তিন দিন এই বাসায় হাগি নাই। এইডা অন্য কারো কাম।"
দুজনের কথোপকথন শুনে আমি আর সুমন পরিস্থিতি বুঝে হাসিটা চেপে গেলেও প্রিয়ন্তি পারলো না। হো হো শব্দে হেসে উঠলো। শুনে প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে ওসি সাহেব বললেন,
"প্রিয়ন্তি হাইসো না বুঝছো ? বাথরুমে ঢুইকা দেখি এত বড় বড় গুয়ের দলা। (ওসি সাহেব হাতের পাঁচ আঙ্গুল গোলাকৃতি করে দলার সাইজ দেখাচ্ছেন) মেজাজটা কার না খারাপ হয় !"
হঠাৎ একজন আগন্তক দোতলার দরজা দিয়ে ঘরের ভেতর উঁকি মারলো। এক ঝলক দেখা গেল তাকে। হ্যাংলা-পাতলা, বয়স আন্দাজ করা কঠিন, তবে ত্রিশের বেশি হবেনা। পুলিশ দেখা মাত্রই ঘুরে দিলো নিচের দিকে দৌড়। আমি শুধু ওসি সাহেবকে বললাম,
"স্যার আপনি প্রিয়ন্তিকে নিয়ে থানায় যান। আমরা আসছি।"
দৌড়ে নিচে এসে দেখি ব্যাটা নিজের বাইকে উঠে বাইক স্টার্ট দিয়েছে। আমি আর সুমন আমাদের বাইকে উঠে ওর পিছু নিলাম। গভীর রাতের নির্জন রাস্তায় দুটো বাইক বাতাসের বেগে চলছে। সামনে আগন্তক আর পেছনে আমরা।
রাত ১ টা ৪৫ মিনিট। থানার ইন্টারোগেশন সেলে দুহাত পেছন থেকে বেঁধে একটা টেবিলের উপর উপুর করে ফেলে রাখা হয়েছে রিকশাওয়ালা জসিমকে। ওসি মামুন আহমেদ হাতে মোটা একটা রুল নিয়ে থেমে থেমে আঘাত করছেন জসিমের পায়ের পাতায়। জসিম প্রতিটা আঘাতেই থানা কাপিঁয়ে চিৎকার করছে। অসহ্য যন্ত্রণায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম ওর। তবে ওসি সাহেব ওকে জ্ঞানও হারাতে দিচ্ছেন না।
আগন্তক ব্যাটা বাইক ভালই চালায়। এলোপাথাড়ি ভাবে শোঁ শোঁ করে বাইক টেনে পালানোর চেষ্টা করছে। অগত্যা আমরাও ধাওয়া করছি। এখন খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। ব্যাটা আমাদের বাইক থেকে দুহাত দূরত্বে বাইক চালাচ্ছে। সুমন প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো আগন্তকের উদ্দেশ্যে।
"ঐ দাঁড়া। বাইক থামা, থামা বলছি। পালিয়ে কিন্তু বাঁচতে পারবি না।"
ঠাটারী বাজার থেকে ধাওয়া করে মতিঝিল শাপলাচত্বরে এসে বাধ্য হয়ে কোমরের পেছন দিকটা হাতরে নাইন এমএম টা বের করলাম। বন্ডকিউলিস ডিটেক্টিভ এজেন্সির লাইসেন্স পাওয়ার পরই ওসি মামুনের সহযোগিতায় আমি আর সুমন, দুজন লাইসেন্সসহ দুইটা নাইন এমএম নিয়েছি। হাতটা টাক করে দুবার শ্যুট করলাম ওর বাইকের চাকায়। গুলির শব্দে হকচকিয়ে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলল ব্যাটা আগন্তক। দিলো বাইকটা কাঁত করে। হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে চলন্ত বাইক নিয়ে সজোরে ধাক্কা খেলো আইল্যান্ডের সাথে। ব্যাটার সাত দুগুণে চৌদ্দ জেনারেশনের সৌভাগ্য যে ব্যাটা হেলমেট পড়েছিলো। অন্যথায় যে পরিমাণ গতিতে আইল্যান্ডের সাথে মাথায় আঘাত লেগেছে, থেতলে স্পটডেড হবার সম্ভাবনা ছিল ১০০%। বাইকটা ওর সামনে এনে ব্রেক করলো সুমন। নেমেই ব্যাটাকে টেনে তুললাম। তেমন কিছু হয়নি। পায়ের ছাল উঠে গেছে রাস্তার পিচের সাথেই। বুঝলাম দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে।
রাত ৩:৫০।
আগন্তককে বসানো হয়েছে ইন্টারোগেশন সেলে। ব্যাটার পা থেকে অনবিরত রক্ত ঝরছে দেখে ওকে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলাম আমরা। তবে ওসি সাহেব বললেন সোজা থানায় নিয়ে যেতে। অগত্যা আমাদেরও তাই করতে হলো। তবে আগন্তুককে হাসপাতালে নিতে বাঁধা প্রদানের পেছনে ওসি মামুনের উদ্দেশ্যটা আমার আর সুমনের কাছে পরিষ্কার নয়। আগন্তক বসে আছে চেয়ারে। পায়ের ক্ষতস্থানে হাত চেপে গোঙাচ্ছে। ওসি মানুন এসে ওর সামনের টেবিলে দুহাতে ভর দিয়ে ওর দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন,
"তুই তাহলে জসিম রিক্সাওয়ালার লিডার ?"
আগন্তক যেন নিজেই অবাক হলো। ব্যথিত দৃষ্টিতে বলল,
"কি কইবার লাগছেন ছার ? আমার বাপ-দাদা, পূর্বপুরুসের কেউ লিডার নাইক্কা। আমি অমু ক্যামতে ?
ওসি সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
"এভাবে বলবিনা ! থেরাপি দিতে হবে। হুম।"
ওসি সাহেব সেলের বাইরে তাকিয়ে "রফিক" বলে ডাকলেন। অগত্যা কন্সটেবল রফিক হাজির। কিন্তু একি ! রফিকের একহাতে বাটিভর্তি লবন, অন্যহাতে বাটিভর্তি গুড়া মরিচ। রফিক সেগুলো এনে টেবিলের উপর রাখলো। কৌতুহলী হয়ে জানতে চাইলাম,
"মামুন সাহেব, এগুলো দিয়ে কি হবে ?"
তিনি ঠোঁট বাঁকানো একটা হাসি দিয়ে বললেন,
"থেরাপি দেব। স্পাইসি থেরাপি।"
বলেই লবনের বাটিতে হাত দিয়ে একমুঠ লবন তুললেন। তারপর আগন্তকের একদম গা ঘেষে দাঁড়িয়ে বললেন,
"কিরে, সত্যিটা কি বলবিনা তো ?"
আগন্তকের চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দূর্বল হয়ে পড়েছে বোধহয়। চেয়ারে পুরো শরীর এলিয়ে দিয়ে ডানহাতে ক্ষতস্থান চেপে ধরে বসে আছে। অস্পষ্ট কন্ঠে আগন্তক বলল,
"আমি বুজা পারতাছিনা, আপনেরা আমারে ধরছেন কেলা ? আমি তো ঐ বাইত্তে গেছিলাম গুটি কিনবার।"
ওসি সাহেব মৃদু শব্দে বললেন,
"তুই আমাকে বাধ্য করলি।"
বলেই মুঠোভর্তি লবন ঘষে দিলেন আগন্তকের ক্ষতস্থানে। মুহুর্তেই এতজোরে চিৎকার দিলো আগন্তক, যেন শুধু ইন্টারোগেশন সেলই নয়, কেঁপে উঠেছে পুরো থানা। গলাকাটা মুরগীর মত গড়াগড়ি যাচ্ছে আগন্তক। যন্ত্রনা যেন ছাড়িয়েছে সমস্ত সহ্যের সীমা।
মিনিট দুয়েক পর ওসি সাহেবের নির্দেশে কন্সটেবল রফিক আগন্তককে তুলে পুনরায় চেয়ারে বসালো। ওসি সাহেব এগিয়ে গিয়ে বলল,
"এখনও সময় আছে, সব বলে দে। নয়ত মার খাবি, মাইরের দামও দিবি, আর কাঁদবি ফ্রি।"
আগন্তক বলল,
"ছার, বিসসাস করেন আমি কিছু করি নাইক্কা। আমি রিক্সা আলা জসিমের রেগুলার কাস্টোমার। ঐ হালার থিকা আমি ইয়াবা কিনবার গেছি।"
এবার ওসি সাহেবেরও রাগের মাত্রা আকাশ ছুলো। বাটিভর্তি টকটকে লাল গুড়া মরিচের সবটাই বাটিসুদ্ধ ছুঁড়ে মারলো আগন্তকের পায়ে। এবার একটা চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলো আগন্তক। পরক্ষণেই ধপ করে মাটিতে পড়ে জ্ঞান হারালো। ওসি সাহেবের নির্দেশে আবার ওকে তুলে চেয়ারে বসালো রফিক। জসিমকে নিয়ে আসা হলো। জসিমের অবস্থাও বেহাল। আগন্তককে দেখিয়ে ওসি সাহেব বললেন,
"সত্যি করে বল। এইটাকে চিনিস ?"
জসিম একনজর দেখেই বলল,
"আরে সার, এইডা তো বাচ্চু ভাই। আমার থিকা সবসময় ইয়াবা নেয়। ডেলি ১৫ ডা। হ্যারে ধরছেন ক্যান ?"
জসিমের কথাশুনে হতবম্ভের মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি, সুমন আর ওসি সাহেব। যেন একজন অন্যজনের চেহারা দেখা ছাড়া আর কোনো কিছুই আমাদের এই মুহুর্তে করার নেই। শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বাচ্চুর উপর এত অত্যাচার চালানো হলো ? দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলো বাচ্চুকে। ওসি সাহেবের রুম থেকে প্রিয়ন্তিকে ডেকে নিয়ে বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলাম। সুমনকে ওসি সাহেব গাড়িতে করে পৌঁছে দেবেন। আমি আর প্রিয়ন্তি যথারীতি সুমনের বাইকে। মন খারাপ। এত পরিশ্রম সব বৃথা হয়ে গেল ? জসিম ছাড়া কি আর কোনো ক্লু আছে আমাদের কাছে ? সারারাত ঘুম হয়নি। বাসায় গিয়ে ঘুম দিয়ে আবার থানায় ফিরতে হবে। কাল হয় এস্পার, নয়ত ওস্পার।
বাইক যেমন চলছ, গল্পটাও চলবে।
দুপুর ২:৪৫।
গোসল সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে টাওয়াল দিয়ে চুলগুলো আলতো করে ঘষতে ঘষতে ড্রইংরুমে এসে বসলাম। সদর দরজার নিচে চোখ পড়তেই দেখলাম, সকালে দিয়ে যাওয়া আজকের পত্রিকাটা এখনও সেখানেই পড়ে আছে। বুঝলাম, প্রিয়ন্তি এখনও দরজা অবধি আসেনি। গতরাতে মেয়েটার উপর দিয়েও তো কম ধকল যায়নি। তবুও ঘুম থেকে আমার আগে উঠে এখন রান্না করছে। টাওয়ালটা রেখে এগিয়ে গিয়ে পত্রিকাটা তুলে আবার এসে বসলাম ড্রইংরুমের সোফায়। প্রথম পাতা উল্টানো মাত্রই একটা খবরে আমার চোখ আটকে গেল। "চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে গতরাতে তিনটা মেয়েকে একত্রে ধর্ষন করে হত্যা করা হয়েছে।" যেহেতু আমরা একটা ধর্ষণের কেস তদন্ত করছি, তাই শিরোনাম পড়েই বিস্তারিত পড়ার আগ্রহ জাগলো। পুরো খবরটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম কিছুসময়ের জন্য। তিনটা মেয়ের দেহেই ক্যাটামিন নামক ড্রাগ পাওয়া গেছে। দ্রুত বেডরুমে এসে মোবাইলটা বিছানা থেকে হাতে নিয়ে দেখি ওসি মামুন আর সুমনের ১৩ টা মিসডকল।
বিকেল ৫ টা।
ওসি মামুনের রুমে বসে আছি আমি আর সুমন। ওসি সাহেব বললেন,
"ঘোড়া বেঁচে ঘুমাচ্ছিলেন ? তা কোন ব্র্যান্ডের সরিষার তেল দিয়েছিলেন নাকে ?"
বললাম,
"লজ্জা দেবেন না ওসি সাহেব। আপনার ফোন দেখেছি অনেকগুলো। আসলে রাতে ধকলের জন্য মোবাইল সাইলেন্ট করে ঘুমিয়েছিলাম। পরে আপনার ৮ টা কল দেখলাম, আর সুমনের ৫ টা।"
ওসি সাহেব বললেন,
"সকালে থানায় এসে জসিম রিক্সাওয়ালাকে আরেক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আর তখন কিছু তথ্য পেলাম।"
কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুমন বলল,
"কি বলেছে জসিম ?"
ওসি সাহেব একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললেন,
"ওদের লিডার আর দলের বাকী ৩ জন চট্টগ্রাম গেছে একটা ইয়াবার চালান নিয়ে আসতে। দলের একমাত্র জসিমই এখন ঢাকায়। টিএসসি এর শেষ ঘটনাটা ঘটিয়েই ওরা চট্টগ্রাম চলে গেছে।"
চোখ ছানাবড়া হবার উপক্রম আমার। বললাম,
"আজকে নিউজপেপারে !"
আমাকে থামিয়ে ওসি সাহেব বললেন,
"পাহারতলীর ঘটনাটা তো ? পড়েছি। তবে আমরা ঠাটারী বাজারের ফ্ল্যাট থেকে আমরা মোট ৭ টা মোবাইল পেয়েছি। ঐ প্রতিটা মোবাইলই এক একটা মেয়ের। ভিকটিম ধর্ষিতা মেয়ের।"
অবাক হয়ে সুমন বলল,
"কি বলছেন ? ৭ টা মেয়েকেই রেপ করেছে ওরা ? কিন্তু এসব জানলেন কিভাবে ?"
"৩ টা মোবাইলে আমরা রিপা, রোদেলা আর টিএসসি তে সুইসাইড করা মেয়েটার ছবি পেয়েছি। তাও ওয়াল পেপারে।"
আমি মাথা চুলকে বললাম,
"আর বাকী ৪ টা মেয়ে ?"
ওসি সাহেব সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোয়া ছেড়ে বললেন,
"জানা যায়নি। জসিমকেও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।"
সুমন বলল,
"এখন আমাদের নেক্সট স্টেপ কি হবে ?"
ওসি সাহেব বললেন,
"আপনারা আজ রাতেই পাহাড়তলী যাবেন। আমার মনে হচ্ছে পাহাড়তলীর ঘটনাটা ঐ একই সিরিয়াল রেপিস্টদেরই কাজ।"
পরদিন সকাল ৮ টা।
আমি, সুমন, প্রিয়ন্তি, ইশিতা আর প্রিয়ন্তির বান্ধবী মোহনা এসে নামলাম চট্টগ্রাম পাহাড়তলীর মেজবান নামক হোটেলের সামনে। আমি আর সুমন বাইকে, মেয়েরা মোহনার গাড়িতে। ড্রাইভার আছে সাথে। মোহনা ভিকটিম রিপার বড় বোন। বোনের রেপিস্টকে ধরতে আমাদের সাহায্য করার জন্যই মোহনার আগমন। হোটেলে চেক ইন করে আমি আর সুমন গেলাম থানায়। সেখান থেকে তিনটা মেয়ের তথ্যগুলো নিয়ে বেরিয়ে আবার এলাম হোটেলে। মেয়েগুলো টুরিস্ট ছিল। ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছিলো।তথ্যগুলো জানালাম ওসি মামুনকে। তিনি বললেন,
প্ল্যান বি এক্সিকিউট করার সময় এসে গেছে।
রাত ৮:৩০।
গত পরশু যেই ডোবার কাছে মেয়ে তিনটার লাশ পাওয়া যায়, সেখানে এসে দাঁড়ালাম আমরা ৫ জন। সুমনের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"এখানেই তিনটা মেয়ের লাশ পেয়েছে পুলিশ। তার মানে আশেপাশে কোনো হোটেলে উঠেছে ওরা।"
সুমন বলল,
"হুম। তবে একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকছে না। আগের মেয়েগুলোকে জাস্ট রেপ করে ছেড়ে দিয়েছে। শেষ মেয়েটা নিজেই সুইসাইড করলো। এই মেয়ে তিনটাকে মেরে ফেললো কেন ?"
প্রিয়ন্তি বলল,
"যা করার দ্রুত করতে হবে। ওরা ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটা মেয়েই বিপদে।"
পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠলো। ওসি সাহেবের ফোন। রিসিভ করলাম।
"হ্যা ওসি সাহেব, বলুন।"
"তাহমিদ, হাসপাতাল থেকে বাচ্চু পালিয়ে গেছে।"
"কি বলছেন ?"
"হ্যা। জসিমকে পুলিশ গার্ড দিচ্ছিল। কিন্তু বাচ্চুর কেভিনের বাইরে কোনো গার্ড ছিল না।"
"যাকগে, ঐ বাবাখোরকে দিয়ে আমাদের কি হবে ?"
"আচ্ছা। আপনারা প্ল্যান অনুযায়ী আজ রাতেই কাজ টা করে ফেলুন। অল দ্যা বেস্ট।"
"থ্যাংক ইউ ওসি সাহেব।"
ফোন কেটে আশপাশ টা খুব ভাল করে দেখলাম। এই ডোবার কাছে আসতে প্রধান সড়ক ছাড়াও একটা সরু গলি আছে। টার্গেট করলাম ঐ গলিটাকেই। প্ল্যান ফাইনাল। এবার খেলা শুরু হওয়া বাকী।
রাত ১২:৩০।
সরু গলির এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করছে প্রিয়ন্তি। আর প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে আছে ইশিতা আর মোহনা। সবার পোশাক পরিচ্ছদ স্বাভাবিক। ইশিতা আর মোহনা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন কোনো রিকশা বা বাহনের জন্য অপেক্ষা করছে। আর প্রিয়ন্তির হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছে। সত্যি। চমৎকার অভিনয় করে আমার বউটা। আমার আর সুমনের নজর ওদের সাথে এই অন্ধকার রাতেও ছায়ার মতোই আছে।
হঠাৎ প্রিয়ন্তির একটা চিৎকার। ডোবার কাছের ঝোঁপের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে ছুটে এলাম আমি আর সুমন। ইশিতাও চলে এসেছে মেইন রোড থেকে। প্রিয়ন্তি হতবম্ভের মতো দাঁড়িয়ে সরু গলির শেষ মাথার দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রিয়ন্তির দু কাঁধে দু হাত রেখে একটা ঝাকি দিয়ে বললাম,
"প্রিয়ন্তি, কি হয়েছে তোমার ? প্রিয়ন্তি ?"
"তাহমিদ, হঠাৎ কেউ একজন এসে আমার ভ্যানিটি ব্যাগটা টান মেরে ঐ দিকে পালিয়ে গেছে। আমি ব্যাগটা শক্ত করে ধরে ছিলাম। তাই নিতে পারেনি।"
সরু গলিটার শেষ প্রান্তের দিকে আঙুল উঁচিয়ে আতংকিত কন্ঠে বলল প্রিয়ন্তি। সুমন বলল,
"ভাবী, ভয় পাবেন না। এটা নিশ্চয়ই কোনো ছ্যাঁচড়া চোর হবে।"
ইশিতা বলল,
"সে যেই হোক। চলে গেছে এটাই বড় কথা। তুমি ভয় পেও না প্রিয়ন্তি।"
ইশিতার কন্ঠ শুনে এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম মোহনা নেই আমাদের সাথে। প্রিয়ন্তি হকচকিয়ে বলল,
"ইশিতা, তুমি এখানে ? মোহনা কোথায় ?"
ইশিতাও অবাক হলো বেশ। বুঝলাম, সেও মাত্রই খেয়াল করেছে ব্যাপারটা। ইশিতা বলল,
"আরে তাইতো। তোমার চিৎকার শুনে তো আমি আর মোহনা একসাথেই এদিকে আসছিলাম। তাহলে ? মোহনা কোথায় ?
অজান্তেই নিজের কন্ঠে নিজেই একটা শব্দ শুনলাম।
"ওহ শিট।"
সবাই ছুটে এলাম মেইন রোডে, যেখানে ইশিতা আর মোহনা দাঁড়িয়ে ছিল। দেখলাম মোহনা রাস্তার উপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে। প্রিয়ন্তি দৌড়ে গেল মোহনার কাছে। অনেক ডাকাডাকি করেও ওর জ্ঞান ফেরাতে পারলো না। এরপর বাধ্য হয়েই মোহনাকে নিয়ে কাছের একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করলাম। মোহনাকে চেক করে ডক্টর বেরিয়ে এলেন। প্রিয়ন্তি এগিয়ে গিয়ে বলল,
"ডক্টর, মোহনা কেমন আছে ?"
"ভাল আছে। তবে রোগীর কাঁধে অতিমাত্রায় ক্যাটামিন নামক ড্রাগ ইনজেক্ট করা হয়েছে। যার কারনে রোগী ঘুমিয়ে পড়েছে। ৫-৬ ঘন্টা লাগতে পারে ঘুম ভাঙতে।"
ডাক্তার চলে গেলেন। প্রিয়ন্তি আর ইশিতাকে হাসপাতালেই রেখে আমি আর সুমন আবার ঐ ডোবার কাছে ফিরে এলাম। তীক্ষ্ণভাবে আশপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো ল্যাম্পপোস্টের সাথে বাঁধা সিসি টিভি ক্যামেরাটা। ল্যাম্পপোস্টের কাছে আসতেই সুমনের মোবাইলটা বেজে উঠলো। সুমন দেখলো অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করে লাউড দিল সুমন।
"হ্যালো !"
"হ্যালো মিস্টার জেমস বন্ড।"
"কে"
"আই এ্যাম দ্যাট সিরিয়াল রেপিস্ট, যাকে আপনি আর মিস্টার হারকিউলিস খুঁজছেন।"
সুমন বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকালো। আমিও হতবম্ভ। নিজেকে সামলে আবার সুমন বলল,
"কে তুই ? নিরপরাধ মেয়েগুলোকে কেন রেপ করছিস ? কেন মেরে ফেলছিস ?"
"হাহাহাহা। অনেক বেশি প্যারা আমার। সেক্সের প্যারা। এটা এমন এক প্যারা, যার কাছে দুনিয়ার সব মানুষ ধরা। কিন্তু তোদের মত শুধু বউতেই সন্তুষ্ট নই আমি। প্রতিদিন নতুন নতুন মেয়ে লাগে আমার।"
"তুই একটা সাইকো। তোর তো মেন্টাল হসপিটালে থাকার কথা।"
"ছিলাম তো, দীর্ঘ ৩ বছর। তাতে কি ? ওখানে না মেয়ে পাওয়া যায় না।"
"তোর মানসিকতার কথা ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে আমার। ছি।"
"হাহাহাহা। তোদের বন্ডকিউলিসের সাথে আমার খেলতে কিন্তু দারুণ লাগছে। আজ তোর বউয়ের বান্ধবীকেও ড্রাগ দিয়ে অজ্ঞান করেছি। তুলে আনিনি কেন জানিস ? তোদেরকে আমার ক্ষমতা দেখানোর জন্য। শুধুশুধু নিজেদের বউকে কেন ঝুকিতে ফেলছিস ?"
"খেলা তো সবে জমে উঠেছে মিস্টার সিরিয়াল রেপিস্ট। তোকে তো ক্ষমতা আমরা দেখাবো। একবার শুধু একটা ক্লু পাই। আর আমাদের স্ত্রীদের কথা তো স্বপ্নেও ভাবিস না। কবর দেয়ার জন্য তাহলে কেউ তোর ডেডবডি টাও খুঁজে পাবে না।"
"দ্যাটস দ্যা স্পিরিট। তবে এই কনফিডেন্সটা নিজেদের বউকে সামনে রেখে দেখালে ভাল হতো না ? বউ দুটোকে হাসপাতালে একা রেখে এভাবে তোদের ইয়ে খুঁজতে বের হওয়া একদম উচিত হয়নি রে। কি যেন, ও হ্যা। ক্লু।"
সুমন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। অজানা এক ভয় গ্রাস করেছে আমার চেহারাও। সুমন খেঁকিয়ে উঠলো,
"ইশিতা আর প্রিয়ন্তির যদি কিছু হয় !"
"হাহাহাহা, গুড লাক"
লাইন কেটে যেতেই আমি আর সুমন বাইকে চেপে দ্রুত রওনা হলাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। এখন প্রার্থনা একটাই। প্রিয়ন্তি আর ইশিতার যেন কোন বিপদ না হয়।
হাসপাতালে এসে ছুটে এলাম ওয়েটিং জোনে। সাথে সুমন। যা দেখলাম, দুজনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ইশিতা আর প্রিয়ন্তির দৃষ্টি আমাদের উপর পড়তেই ওরা উঠে এলো আমাদের সামনে। আমাদের ঘর্মাক্ত চেহারা দেখে প্রিয়ন্তি বলল,
"একি, তাহমিদ, কি হয়েছে ? তোমাদের দুজনকে এমন লাগছে কেন ?"
ওয়েটিং জোনের চেয়ারে বসতে বসতে বললাম,
"ভাবতে দাও প্রিয়ন্তি।"
সুমনও বসলো। সুমনের পাশে বসে ইশিতা বলল,
"কি হয়েছে বলবে তো !"
সুমন বলল,
"তোমাকে আর প্রিয়ন্তি ভাবীকে এখনি ঢাকা চলে যেতে হবে।"
আমি অবাক হয়ে সুমনের দিকে তাকালাম। ইশিতা অবাক হয়ে বলল,
"কেন ? আমরা চলে যাব আর তোমরা ?"
সুমন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
"তোমাদের দুজনের জীবন সংকটে। দেখ তাহমিদ, যে আমাদের উপর ছায়ার মত নজর রাখছে। আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপ অনুসরণ করছে, তার ভয়াবহতা নিয়ে কোনোরকম প্রশ্ন তোলাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় বোকামী হবে।"
সুমনের ফোন বেজে উঠলো। সেই অপরিচিত নাম্বার। নাহ, এখন অপরিচিত না। এটা সেই সিরিয়াল রেপিস্টের নাম্বার। রিসিভ করে লাউড স্পিকার মুড অন করল সুমন।
"হ্যালো"
"হাহাহাহা। তোদের মুখে ভয়ের ছাপ দেখে আমার শান্তি লাগলো রে। খুব শান্তি।"
"সাহস থাকলে এসব ফাইজলামি না করে সামনে এসে মোকাবিলা কর। দেখি তুই কেমন বাপের বেটা।"
"হাহাহাহা। যে বন্ডকিউলিসের জুটি আমার ভয়ে দৌড়ের উপর থাকে, তাদের মুখে আমি বাপের ছেলে না মায়ের, এ প্রশ্ন মানায় না। তোরা বাপের বেটা হয়ে থাকলে আমাকে ধরে দেখা।"
"ধরা তো তুই পড়বি। আর একবার তোকে ধরি, বন্ডকিউলিস কি পারে, তার প্রমানের একটা সিল মেরে দেব তোর কপালে। যেন বাকি জীবন জেলে বসে নিজের কপাল চাপড়াতে পারিস।"
"হাহাহাহা। সে গুড়ে বালি। আমার দশ কদমের মধ্যেও আসতে পারবিনা তোরা। কালকের নিউজ পেপারে দেখবি আরেকটা রেপের খবর। সে পর্যন্ত, অল দ্যা বেস্ট টু বোথ অফ ইউ।"
"হ্যালো, হ্যালো।"
সুমন কান থেকে ফোন নামিয়ে বলল,
"কেটে দিয়েছে হারামির বাচ্চা"
হাসপাতালের ওয়েটিং জোনে আমরা চারটা মানুষ নির্বাক হয়ে বসে রইলাম অনেকটা সময়। আশেপাশে আরও দু-চার-জন লোক যদিও আছে। তবুও নিজেদের খুব অসহায় মনে হচ্ছে। হঠাৎ কি একটা ভেবে সুমন উঠে দাঁড়ালো। মোবাইল তুলে কিছু লিখছে, নাহ, এবার কারো নাম্বার তুলছে। হয়ত ফোন করবে কাউকে। অবাক হয়ে বললাম,
"সুমন, কি করছিস ভাই ?"
সুমন মোবাইলটা কানে লাগিয়ে বলল,
"মামুন সাহেবকে ফোন করছি। একটা মুহুর্তও আর নষ্ট করা যাবেনা।"
সুমন একটু থামলো। ওপাশ থেকে কল রিসিভ করেছেন ওসি মামুন আহমেদ। সুমন পরক্ষণেই একটু থেমে থেমে বলল,
"হ্যা মামুন সাহেব !..... হ্যা আপনাকে একটা নাম্বার এসএমএস করেছি। পেয়েছেন ?....... হ্যা, এই নাম্বারটার লোকেশন ট্রেস করুন।....... এটা ঐ হারামীর বাচ্চা সিরিয়াল রেপিস্ট টার নাম্বার।..... হ্যা।..... ও নিজেই ফোন করেছিলো। আমাদের সাথে গেম খেলছে।...... অনেক ধুরন্ধর এই ব্যাটা। আমাদের প্রতি পদক্ষেপের খবর ওর কাছে আছে।..... আপনি ভাববেন না। আমরা সাবধানেই আছি। আপনি দ্রুত নাম্বারটার লোকেশন ট্রেস করুন। আমাদের আরও কিছু কাজ আছে এখানে।...... ঠিক আছে। রাখছি।"
সুমন লাইন কেটে চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার নজর বুলালো। মৃদু শব্দে বলল,
"তাহমিদ, আমি নিশ্চিত আমাদের আশেপাশেই ঐ রেপিস্টের কোনো খোঁচর ওৎ পেতে আছে। নয়ত আমাদের সব কথা ও জানতে পারছে কিভাবে ?"
আমিও একবার আশেপাশে নজর বুলিয়ে সুমনের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"ঐ রেপিস্ট নিজেও থাকতে পারে। শুনলি না, একটু আগে ফোনে ও বলল, আমাদের ভয় পাওয়া মুখ দেখে ও খুব শান্তি পেয়েছে !"
তাহমিদ বলল,
"হতে পারে। তবে, কথাটা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতেও বলতে পারে। খিলাড়ি কিন্তু চালু মাল, করতে চাইছে বেসামাল !"
হঠাৎ মনে পড়তেই আমি বললাম,
"ওহ হো ! একটা ব্যাপার কিন্তু আমরা মিস করে যাচ্ছি সুমন।"
সুমন আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
"কি ?"
আমি বললাম,
"ডোবার কাছে ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানো সিসি টিভি ক্যামেরা। ঐটার ফুটেজ থেকেও কিন্তু ক্লু পাওয়া যেতে পারে।"
সুমন জিভে কামড় দিয়ে বলল,
"ইশ। মাথা থেকে একদম বেরিয়ে গিয়েছিলো। ঐ শালা রেপিস্ট আমাদের কনফিউস করতেই প্রথম ফোনকলের হুমকিটা দিয়েছিলো।"
"দাঁড়া। আমি এখানকার ওসিকে ফোন করে সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ বের করতে বলছি।"
অতঃপর আমি পাহাড়তলী থানার ওসিকে ফোন করে সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চাইলাম। তিনি সময় চাইলেন। অগত্যা আমরাও রাজি হলাম। প্রিয়ন্তি আর ইশিতা চুপচাপ আমাদের কথা শুনছিল। এখনও মোহনা ঘটনার আতংকটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি ওরা। প্রিয়ন্তি মোহনাকে নিয়ে একটু বেশিই চিন্তিত।
সকাল ৮ টা।
সারারাত এই হাসপাতালের ওয়েটিং জোনে বসেই ঘুমিয়েছিলাম আমরা চারজন। ক্লান্তি এতটা হয়েছে যে, যেখানে রাত, সেখানেই কাত অবস্থা আমাদের। মোহনা ছিল ওর কেভিনে। ভুম ভাঙতেই লক্ষ্য করলাম আমাদের সামনে মোহনা বসে কাঁদছে। অবাক হয়ে প্রিয়ন্তি মোহনার পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে জানতে চাইলো,
"মোহনা, কাঁদছিস কেন ? কি হয়েছে ?"
মোহনা আমাদের দিকে একটা পত্রিকা এগিয়ে দিলো। হাতে নিয়ে চোখ ডলতে ডলতে তাকালাম পত্রিকার পাতায়। পত্রিকাটা আজকের। খবরে চোখ পড়তেই চোখে মনে হয় বিষ্ফোরণ হলো। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। পত্রিকায় মোহনার ছোট বোন রিপার মৃত্যুর সংবাদ।
"ভোর ৫ টা নাগাদ দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকে কতিপয় মুখোশধারী সন্ত্রাসী রিপাকে কুপিয়ে জখম করে। হাসপাতালে নেবার পথে রিপার মৃত্যু হয়। কারা ছিল সেই মুখোশধারী সন্ত্রাসী, রিপার মায়ের ভাষ্যমতে সন্ত্রাসীরা তিনজন ছিল। মুখোশের কারনে কাউকেই চিনতে পারেননি তিনি।"
সুমন মুখ তুলে তাকালো আমার দিকে। হতবম্ভের মতো একজন আরেকজনকে দেখছি, এমন সময় সুমনের মোবাইলটা আবার বেজে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল মুখের সামনে তুলে ধরলো সুমন। ভয়ে বা আতংকে হাত কাঁপছে না। এ কাঁপুনির কারন রাগ, ক্ষোভ, আক্রোশ। ছোঁ মেরে মোবাইলটা সুমনের হাত থেকে নিয়ে রিসিভ করে লাউড স্পিকার অন করে মুখের সামনে ধরেই খেঁকিয়ে উঠলাম।
"তুই আসলে কি ? মানবতা বলতে তোর মাঝে কিছু নেই ? একটা মেয়ে তোদের লালসার শিকার হবার পরেও একটু একটু করে নিজেকে সামলে নিচ্ছিলো। আর তোরা ? তোকে আমি একবার পাই, খোদার কসম !
"ওয়েইট মি. হারকিউলিস, ওয়েইট।"
আমাকে থামিয়ে দিলো জনৈক রেপিস্ট। ননস্টপ বলতে লাগলো,
"তোদেরকে বলেছিলাম আমার পিছু ছেড়ে দে। সেইসাথে এই কেস। কিন্তু তোরা বড্ড নাছোড়বান্দা। দেখলি তো, আমার ক্ষমতা ? চট্টগ্রামে বসে ঢাকায় খুন করে দিলাম ! এর পরেও যদি তোরা এই কেস না ছাড়িস, তাহলে পরবর্তী শিকার হবে রোদেলা।"
"তোর পাখা খুব গজিয়েছে। একবার শুধু একবার তোকে হাতের নাগালে পাই, তারপর তোকে বোঝাবো, পিঁপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তোরে।"
"কারেকশন, কারেকশন মি. হারকিউলিস, কারেকশন। মরিবার তরে নয়, ওটা উড়িবার তরে হবে। উড়তে যে কি মজা রেহ, আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে ! এই, শোন ব্যাটা হরলিক্স। পারলে এবার রোদেলাকে বাঁচা।"
"না। দেখ, সাবধান করছি তোকে। রোদেলাকে কিছু করবি না তুই। খবরদার বলছি।"
"দুধে হরলিক্স মেশাও, দুধের শক্তি বাড়াও। হাহাহাহা, হাহ, বেস্ট অফ লাক মি. হরলিক্স।"
"হ্যালো, হ্যালো, শিট। স্ক্রাউন্ডেল !"
সুমন আমার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে ফোন করল ওসি মামুনকে। ওসি মামুনের থেকে যে তথ্যগুলো পাওয়া গেল, তাতে আমরা নতুন করে কনফিউশনে পড়ে গেলাম। মানুন সাহেবের ভাষ্যমতে রেপিস্টের ফোন লোকেশন ঢাকা। সীম কার্ড কেনা হয়েছিলো রিকশাওয়ালা জসিমের আইডি দিয়ে। ওসি মামুনকে বললাম রোদেলাকে পুলিশ প্রোটেকশন দিতে।
পাহাড়তলী থানায় এসে সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করলাম। রাতের অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায়, দেখলাম দুজন মাঝবয়সী লোক একটা একটা করে তিনবারে তিনটা মেয়ের মৃতদেহ ডোবার কাছে এনে ফেলে রেখে গেছে। অন্ধকারে ঐ দুই লোকের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যায় না। তবে ফুটেজের একটা জায়গায় আমাদের চোখ আটকে গেল। দুজন লোকই একটা হাসপাতালের এপ্রোন পড়ে আছে। জুম করে দেখতেই স্পষ্ট দেখলাম হাসপাতালের লোগো। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, মিরপুর, ঢাকা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে এ দুজন ঢাকা মিরপুরের একটা নামকরা হাসপাতালের এপ্রোন গায়ে জড়িয়ে রেখেছে কেন ? তাহলে কি ঐ হাসপাতালেই লুকিয়ে আছে কোনো রহস্য ? আর ঐ সিরিয়াল রেপিস্ট ব্যাটা যদি ঢাকায়ই আছে, তাহলে আমাদের প্রতি পদক্ষেপ অনুসরণ করছে কিভাবে ?
সুমন আর আমি বাইকে বসে মেজবান হোটেলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। একটা সময় সুমন বাইক চালাতে চালাতে আমাকে বলল,
"তাহমিদ, লুকিং গ্লাসে দেখ !"
"কী ?"
"আরে দেখ না, তারপর বল কি বুঝছিস ?"
খুব ভাল করে তাকালাম লুকিং গ্লাসে। হ্যা, আবছা বোঝা যাচ্ছে। একটা বাইক। নির্দিষ্ট এবং যথেষ্ট দূরত্বে চলছে আমাদের বাইকের পেছনে। সুমনকে বললাম,
"আমাদের ফলো করছে নাকি ?"
"আমারও তেমনটাই মনে হলো। তাই তোকে বললাম।"
"কি করবি এখন ?"
"চুপচাপ বসে থাক। দেখা যাক, কোথাকার বাইক, কোথায় গিয়ে থামে !"
বাইকের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে সুমন। তাই আমাদের হোটেল 'মেজবান' এ পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগলো না। বাইকটা পার্কিংয়ে রেখে ভেতরে যাবার আগে একবার আড়চোখে তাকালাম গেটের বাইরে। দেখলাম, যে বাইকটা আমাদের ফলো করছিলো, সেটা ঠিক গেটের বাইরে দাঁড় করানো। বাইকে যে বসে আছে, নিজেকে লুকানোর যথেষ্ট চেষ্টা সে করেছে। মাথায় বড় গোল হ্যাট, চোখে বড় সাইজের সানগ্লাস। সানগ্লাসের জন্য গাল গুলোও ঢেকে গেছে। গলায় একটা সাদা রঙের রুমাল প্যাঁচানো। তবে এখন কিছু করা যাবেনা। সুমন আমার হাত ধরে টান দিতেই আমরা লিফটের কাছে চলে এলাম। সুমন আর আমি লিফটে উঠে চলে এলাম নিজেদের রুমে। দুটো রুম বুক করেছিলাম। একটা আমার আর সুমনের, আরেকটায় আমাদের দুজনের বউ আর মোহনা। রুমে ঢুকতেই প্রিয়ন্তি বলল,
"এসেছো তোমরা ? পেলে কোনো ক্লু ?
আমি মুখের কাছে আঙুল এনে "শিশশশশশ" টাইপ একটা শব্দ করলাম। এরপর ফিসফিস করে বললাম,
"চুপ। একটু অপেক্ষা করো।"
প্রিয়ন্তি আর ইশিতা ঘটনা কি ঘটছে বুঝতে না পেরে বেশ অবাক হলো। আমি আর সুমন নাইন এম এম পিস্তল হাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম রুমের দরজার খুব কাছে। সুমন ডানে আর আমি দরজার একদম সামনে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে একটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললাম দরজাটা। বাইরের ঐ ফলোয়ার ব্যাটা তাৎক্ষণিক বেগ সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ঘরের ভেতর। উপুড় হয়ে পড়েছিলো ব্যাটা। উপুড় থেকে চিৎ হয়ে নিজেকে সামলে কোমড় থেকে পিস্তল বের করতে যাবে, অমনি বেটার বুক বরাবর মারলাম এক লাথি। ব্যাটা দেখলাম ফ্লোরে বাউন্স করলো। একটানে ওর কোমড় থেকে ছোঁ মেরে পিস্তলটা নিয়ে নিলো সুমন। এরপর ব্যাটা উঠে দাঁড়ালো। এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো। পালাবার পথ নেই। কারণ দরজা বন্ধ করে তারই সামনে ব্যাটার দিকে পিস্তল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে সুমন। এগিয়ে গিয়ে ব্যাটার কলার চেঁপে ধরে বললাম,
"ইউর গেম ইজ ওভার মিস্টার ফলোয়ার। বল ব্যাটা, আমাদেরকে ফলো করছিলি কেন ?"
ফলোয়ার ব্যাটা হঠাৎ রাগে ফুলে-ফেঁপে উঠলো। বলল,
"তোরা আমার কিচ্ছু করতে পারবিনা। তোরা আমার বিরুদ্ধে কি কেস দাঁড় করাবি ? তোদের ফলো করেছি ? হাহা ! এছাড়া তো কোনো প্রমানও নেই তোদের কাছে।"
হাতের আঙুল নাড়িয়ে কথাগুলো বলল সে। হঠাৎ চোখ আটকে গেল ব্যাটার হাতের কব্জিতে। ট্যাটু করিয়ে একটা বৃত্তের ভেতর হার্টের ছবি আঁকা। ট্যাটু টা খুব পরিচিত মনে হলো। কোথায় যেন দেখেছি। ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে খুব রিসেন্টলি কোথায়ও দেখেছি। ব্যাটা ফলোয়ার একই রকম অকুতভয় ভঙ্গীতে বলল,
"আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে তোদের কোনো ধারনা নেই। কেসটা ছেড়ে দে। বেঁচে যাবি।"
সুমন এক পা এগিয়ে এসে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"হুহ ! আগে নিজে বাঁচ। পরে আমাদের কথা ভাবিস।"
হুড়মুড় করে কয়েকজন কন্সটেবলসহ পাহাড়তলী থানার ওসি এসে ঘরে ঢুকলেন। লিফটে উঠেই আমি ওসি সাহেবকে ফোন করে ডেকে নিয়েছিলাম। ফলোয়ার ব্যাটাকে হ্যান্ডকাপ পড়ানো হলো। সুমন ওসি সাহেবকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। অগত্যা আমিও পিঁছু পিঁছু বের হলাম। সুমন আমাদেরকে নিয়ে সোজা চলে এলো মেজবান হোটেলের ছাদে। ধীর পায়ে ছাদের দরজা দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল, একজন লোক ছাদের রেলিংয়ে দুহাতে ভর দিয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে কিছু দেখছে। নাহ, ঠিক দেখছে না। কিছু বা কাউকে খুঁজছে। এর বেসভুশাও প্রথম ফলোয়ার ব্যাটার মতই। ওসি সাহেব ওর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন,
"হ্যান্ডস্ আপ"
হঠাৎ শব্দে লোকটা এমনভাবে হকচকিয়ে উঠলো, একটু হলেই ছাদ থেকে নিচে পড়ে সোজা উপরে চলে যেত। নিজেকে কোনরকম সামলে ঘুড়ে তাকিয়েই ব্যাটা দিল দৌড়। আরে ভাই এটা ছাদ। ফুটবল খেলার মাঠ না। তাই দৌড়ে সুবিধা করতে পারলো না। ব্যাটার হাত ধরা মাত্রই সেই একই ট্যাটু এর হাতের কব্জিতেও দেখতে পেলাম। খটকা টা কাটছে না। দুই ফলোয়ারকে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। দুজনের কাছে মানিব্যাগ, মোবাইল আর নগদ অর্থ পাওয়া গেল। ছাদের উপর একটা দূরবীন আর একটা টিপ ছুড়ি ছিলো। প্রথম ফলোয়ার ব্যাটার কাছ থেকে তো একটা পিস্তল আগেই জব্দ করেছি। দুজনের মোবাইলে শুধুমাত্র একটা নাম্বার ছাড়া আর কোনো নাম্বার নেই। নাম্বারটা, ঐ সিরিয়াল রেপিস্টের। বুঝতে আর বাকী রইলো না, এদের দুজনের মারফতেই ঐ সিরিয়াল রেপিস্ট আমাদের প্রতি পদক্ষেপ ফলো করছিলো। ওসি সাহেবের রুমে বসে সিসি টিভি ফুটেজটা আরেকবার দেখতেই আরেকটা প্রশ্নের উত্তর মিললো। ঐদিন রাতে যে দুজন তিনটা মেয়ের মৃতদেহ এনে ডোবার কাছে ফেলে গিয়েছিলো, তাদের দুজনের হাতের কব্জিতেই রয়েছে সেই ট্যাটু। বৃত্তের মাঝে হার্ট সাইন। ওসি সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন,
"এটা তো শিউর যে খুন তিনটা এরাই করেছে। তবে এই ট্যাটু !"
সুমন বলল,
"দুজনের হাতে এই সাইন আছে। হতে পারে এটা ওদের দলীয় চিহ্ন। সবার হাতেই থাকতে পারে। আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন ?"
ওসি সাহেব উৎসুক হয়ে বললেন,
"কী ?"
"খুনের রাতে ওরা ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের এপ্রোণ পড়া ছিল। আর ওদের হাতের ট্যাটুতে হার্টের সাইন। হার্ট ব্যাপারটা এখানে কমন।"
আমি বললাম,
"তার মানে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের সাথে এই কেসের নিশ্চয়ই কোনো সম্পর্ক আছে।"
সুমন চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে বলল,
"এক্সেক্টলি। ৮০% চান্স দেখছি এটা হবার।আচ্ছা, এই দুই ব্যাটাকে ধরে আচ্ছারকম একটা বাঁশডলা দিন ওসি সাহেব। দেখুন, কিছু উগ্লাতে পারেন কিনা !"
ওসি সাহেব বললেন,
"আচ্ছা সুমন সাহেব, এই দুজনের দ্বিতীয়জন যে ছাদের উপর ওৎ পেঁতে বসে আছে, এটা আপনি টের পেলেন কিভাবে ?"
আমিও জানতে উৎসুক হয়ে বললাম,
"আসলেই। আমিও কিন্তু কিছুই বুঝিনি।"
সুমন মৃদু হেসে বলল,
"বুঝতে হবে তো। বাইক পার্কিংয়ে রেখে হোটেলে ঢোকার আগে যে আড়চোখে গেটের বাইরে তাকিয়েছিলাম, তখন দেখি প্রথম ফলোয়ার ব্যাটা বাইকে বসে ছাদের দিকে তাকিয়ে কাউকে কিছু ইশারা করছে। ব্যস। বুঝে নিলাম ব্যাটার সঙ্গী ছাদেই আস্তানা পেঁতেছে।"
থানা থেকে বেড়িয়ে আসতেই রেপিস্টের ফোন। রিসিভ করা মাত্রই বলল,
"কি, মি. জেমস বন্ড অরুফে সুমন ! হোয়াটস গোয়িং অন ? আমার লোকেরা আজ ইয়াবার চালানটা কালেক্ট করে ঢাকায় ফিরে আসবে। কই তোরা তো আমার কিচ্ছু ছিঁড়তে পারলি না।"
বেশ শান্ত গলায় বললাম,
"প্রথমত আমি হারকিউলিস। আর তোকে ফ্রিতে একটা টিপস দিচ্ছি শোন। পালিয়ে তো আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবি না, তাই এখন যতটুকু সময় পাচ্ছিস, দেহের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সব লোম শেভ করে ফেল। কারণ তোকে ধরার পর আমরা তোর প্রতিটা লোম, একটা একটা করে ছিঁড়বো আর তুই যন্ত্রণায় চিৎকার করবি।"
"ওমা, আমি ভয় পেঁয়েচি ভাইয়া ! আমি ইতু ভয় পেঁয়েচি, ভয়ে আমার প্যান্ট ভিজিয়ে পেলতে মন হচ্চে ভাইয়া। হুহ। শোন। তোরা যেমন আমাকে খুঁজতে একটা, একটা জিনিস খতিয়ে দেখছিস, তেমনি আমিও তোদের নিয়ে স্টাডি করেছি। এক কথায় ননস্টপ স্টাডি। উফ, এত পড়াশুনা মানুষ করতে পারে ?"
কেমন একটা তাচ্ছিল্য মেশানো কন্ঠে বলল রেপিস্ট। আমি বললাম,
"শোন, আমাদের নিয়ে পড়াশুনা না করে কোনো ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বসে পড়। তোর হাতে সময় খুব কম।"
রেপিস্ট একই ভঙ্গিতে বলল,
হ্যাহ, তাহলে রোদেলাকে আজ মারবে কে ? তুই কি ভেবেছিস ? পুলিশ প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করলে ভয়ে আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলবো ? ইম্পসিবল। রোদেলার হায়াত শেষ।"
"তোর সময়ও শেষ। টাইম কাউন্টডাউন শুরু করে দে।"
"ধ্যাত। তোরা হচ্ছিস আমার কাছে রাস্তার কুত্তার মত। ঘেউ ঘেউ ঘেউউউ করা পর্যন্তই তোদের স্বামর্থ। শোন, এবার তোদেরকে ফ্রিতে আমি একটা এডভাইস দেই। এসব গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে আর্কিটেক্ট মানুষ, বাড়ি ঘর বানা। রোহিঙ্গাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা হবে। অসহায় মানুষগুলোর জন্য মায়া হয়না তোদের ? তোরা তো খুব পাষন্ড।"
"যতই হাকডাক দিস, তুই আজ রোদেলার কিছুই করতে পারবি না। ইটস আওয়ার চ্যালেঞ্জ।"
"এই ব্যাটা হরলিক্স, কথা কম বলে বসে বসে হরলিক্স খা। কাজে দেবে। আর কিছু না হোক, বুদ্ধিটা হাটুর উপরে উঠবে। আমি কি পারি, তা দেখার জন্য তৈরা থাক।"
লাইন কেটেই ফোন করলাম ওসি মামুনকে। ওসিকে বললাম জসিমের হাতটা চেক করতে কোনো ট্যাটু আছে কিনা, ফলাফল তাই এলো, যা ভেবেছিলাম। জসিমের হাতেও একই ট্যাটু আছে।
এদিকে সকালে যখন আমরা থানায় গিয়েছিলাম, সেই ফাঁকে ড্রাইভার আর গাড়িসহ বোনের মৃত্যুর খবর পেয়েই মোহনা ঢাকায় রওনা হয়ে গেছে। আর এ্যারেস্টকৃত দুইজন আহত হবার পর মুখ খুলেছে। ইয়াবার চালান ঢাকায় নিয়ে যেতে ওদের দুজনকে এই পাহাড়তলীতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওরা এসেই জানতে পারে চালান আসতে ৩ দিন দেরী হবে। তখনই ওদের অর্ডার দেয়া হয়, এখানেও যেন কয়েকটা মেয়েকে শিকার করে ওরা। উদ্দেশ্য ছিল, পুলিশ আর বন্ডকিউলিস মানে আমাদেরকে কনফিউস করা এবং নিজেদের ক্ষমতা দেখানো। তবে সিরিয়াল রেপিস্ট সম্পর্কে ওরা বলেছে, শুধুমাত্র দেখলেই চিন্তে পারবে ওকে। এছাড়া ঐ রেপিস্ট ওদের মাঝে 'লিডার' নামেই পরিচিত। এছাড়া ওরা যে ঠিকানা দিয়েছে, তা ঠাটারীবাজারের ঐ ফ্ল্যাট, যেটা ওসি মামুন আগেই সীল তালা করে দিয়েছে। আর সর্বশেষ তথ্য যা পেলাম, তাতে বুঝলাম, এই পাহাড়তলীতে আমাদের আর কোনো কাজ নেই। তাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম আমি আর সুমন, নিজেদের বউ তো সঙ্গেই আছে।
রাত ২ টা।
ঢাকায় এসেই সোজা থানায়। দেখলাম ওসি মামুন থানাতেই আছেন। তার রুমেই বসে আছে রোদেলা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
"ওসি সাহেব, রোদেলা ঠিকই আছে দেখছি।"
গলা শুনেই উঠে দাঁড়ালেন ওসি মামুন। হাসিমুখে বললেন,
"আরে বন্ডকিউলিস যে, ওয়েলকাম ব্যাক, বসুন।"
আমরা বসতেই ওসি মামুন বললেন,
"এর চেয়ে ভাল প্রোটেকশন আর কি হতে পারতো ?"
বললাম,
"তা একদম পার্ফেক্ট কাজ করেছেন। থানায় এসে খুন করার সাহস ঐ রেপিস্ট পাবেনা।"
প্রিয়ন্তির মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোহনার স্বামীর নাম্বার। রিসিভ করলো প্রিয়ন্তি।
"হ্যা জামশেদ ভাই বলুন, এতরাতে ?"
"প্রিয়ন্তি, মোহনা কোথায় ?"
প্রশ্ন শুনে প্রিয়ন্তি এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো। অগত্যা আমরাও। মোবাইলের লাউড স্পিকার অন করে প্রিয়ন্তি বলল,
"মোহনা কোথায় মানে ? ও তো গতকাল সকালেই গাড়ি নিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। ও বাসায় ফিরেনি এখনও ?"
"না। বিকেল থেকে ওর মোবাইলে, ড্রাইভারের মোবাইলে একটু পরপর কল দিচ্ছি। কিন্তু দুজনের নাম্বারই বন্ধ। অনেক খুঁজে তোমার নাম্বারটা পেলাম, আর এখন তোমাকে কল করলাম।"
"ওর তো সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় চলে যাবার কথা। তাহলে কোথায় হতে পারে ?"
"আমি জানিনা প্রিয়ন্তি, আমার খুব টেনশন হচ্ছে। কি করবো ? থানায় যাবো ?"
"আমরা এখন থানাতেই আছি জামশেদ ভাই। আচ্ছা, আমরা একটু খোঁজ নিয়ে দেখছি। আপনি চিন্তা করবেন না, হ্যা ? রাখছি।"
চুপচাপ কিছুটা সময় কাটলো আমাদের। হঠাৎ সুমনের মোবাইলে ঐ রেপিস্টের কল। রিসিভ করে লাউড স্পিকার অন করলো সুমন। শুনতে পেলাম সেই পরিচিত বিশ্রী পৈশাচিক হাসি।
"হাহাহাহা.............! হ্যালো মি. বন্ড, কি ভেবেছিলেন ? রোদেলাকে পুলিশ পাহাড়ায় বসিয়ে রাখবেন, আর আমি থানায় যাব ওকে মারতে ? হাহাহাহা...........!"
"মোহনা কোথায় ?"
"উপস্ ! নিখোঁজ সংবাদ পেয়েও গেছিস এরই মধ্যে ? ধুর, চেয়েছিলাম সারপ্রাইজ দিবো। তা বোধহয় আর হলোনা।"
"আমি জানতে চেয়েছি মোহনা কোথায় ?"
"তোরা আমার দুজন লোককে ধরে ফেলেছিস। তবে ওরা ধরা পরার আগেই আমাকে জানিয়ে দিয়েছিলো যে, মোহনা ঢাকায় ফেরত আসছে। ব্যস। সুযোগটা কাজে লাগালাম।"
"আমি আবার বলছি, মোহনা কোথায় ?"
"আরে ধ্যাত, চিল্লাচিল্লি করিস না তো, কানে লাগে। যা নিজের বাসায় গিয়ে খুঁজে দেখগে যা।"
বলেই ফোন কেটে দিলো রেপিস্ট। অজানা এক আতংক ভর করেছে আমাদের উপর। দ্রুত রওনা হলাম সুমনের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে। আমি আর সুমন বাইকে। বাকিরা ওসি মামুনের গাড়িতে। জানিনা, সুমনের ফ্ল্যাটে রেপিস্টের রেখে যাওয়া কোন সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য !
SHARE

Author: verified_user