Tuesday

Bangla Book Online বাংলা গল্প - ইচ্ছেপূরণ - মাহদী শেখ

SHARE

  Bangla Book Online  বাংলা গল্প - ইচ্ছেপূরণ - মাহদী শেখ

  ইচ্ছেপূরণ  
.
- আমার না একটা ইচ্ছা আছে!
- কী ইচ্ছা?
- একটা পেন্সিল দিয়ে কারো হার্ট ছিদ্র করা!
- এই ইচ্ছা মনে কখন কখন আসে?
- যখনই কোন পেন্সিল দেখতে পাই। এই যেমন আপনার টেবিলের রাখা এই পেন্সিলটা দেখে মনে হচ্ছে (এই বলে পেন্সিলটা হাতে নিলাম)।
- তুমি কি এই কথা বলার জন্যি এসেছিলে নাকি পেন্সিল দেখে বললে?
- এই কথা বলার জন্যই এসেছি। তবে আপনার পেন্সিলটা দেখে ইচ্ছাটা তীব্র হতে শুরু করেছে।
- এই ইচ্ছাটা কি শুধু পেন্সিল দেখলেই মনে আসে নাকি মাঝে মধ্যেই?
- শুধু পেন্সিল দেখলেই।
- পেন্সিল ছাড়া অন্যকিছু দেখলেও কি এমন ইচ্ছা জাগে?
- না।
- আচ্ছা, এই ইচ্ছা তোমার মনে কবে থেকে আসা শুরু হয়?
- দেখুন ডা. সাহেব! আমার হাতের লেখা ভালো না। আমি দীর্ঘদিন হস্তলিপি চর্চা করেছি। বিভিন্ন কলম দিয়ে লিখে দেখেছি কিন্তু কোনভাবেই তেমন পরিবর্তন আনতে পারি নি। তারপর একদিন পেন্সিল দিয়ে লিখি। বড় হওয়ার অনেকদিন পর পেন্সিল দিয়ে লিখলাম। আমার হাতের লেখা যেমনই থাকুক, পেন্সিল দিয়ে লিখলে কেন জানি লেখাটা সুন্দর দেখায়। এরপর থেকে পেন্সিলই আমার সঙ্গী। একান্ত নিরূপায় হওয়া ছাড়া আমি সাধারণত কলম দিয়ে লিখি না। 
- এর সাথে মানুষের হার্ট ছিদ্র করার সম্পর্ক কী?
- আসলে পেন্সিলের মাথা কিন্তু বারবার ধারালো করতে হয়। সেই ধারালো অংশটা দেখলে আমার মনে প্রশ্ন জাগে; এটা কি বুকের বাম পাশের হাড্ডিগুলোর মাঝ দিয়ে ঢুকে হার্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে? আর পারলেও পেন্সিল দিয়ে ছিদ্র করা একটা হার্ট দেখতে কেমন হবে?
- আচ্ছা, তুমি কী করো?
- লেখালেখি।
- তুমি কি এখনো পেন্সিল দিয়ে লিখো নাকি টাইপ করো?
- আগে পেন্সিল দিয়ে লিখতাম। এই সমস্যাটা দেখা দেওয়ার পর এখন টাইপ করে লিখি।
- হুম। তোমার সমস্যাটা বুঝলাম।
- কী বুঝলেন ডাক্তার? আমি কি কি দিন মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি?
- না। 


The Girl On The Train


- তাহলে এমন অদ্ভুত ইচ্ছা বারবার জাগে কেন?
- তোমার নামটা যেন কী?
- জ্বী, মাহদী শেখ।
- দেখো মাহদী, মানুষের ইচ্ছা জাগতেই পারে। সেটা বিচিত্ররকমের হতে পারে। মানুষ এই ইচ্ছাপূরণের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। তবে কিছু ইচ্ছা আছে যা সত্যিই অনেক ক্ষতিকর। সেগুলো পূরণ করতে নেই। 
- আপনার কি ধারনা আমি কারো বুকে পেন্সিল বসিয়ে দিতে পারি?
- না।
- কেন?
- কারন প্রথমত যদি তোমার ইচ্ছা খুব বেশিই তীব্র হতো তাহলে এতোদিনে ঠিকই কারো বুকে পেন্সিল বসিয়ে দিতে। দ্বিতীয়ত মানুষ এধরনের কাজ করে তার অবচেতন মনের প্ররোচনায়। তোমার ক্ষেত্রে কিন্তু তুমি পেন্সিল না বসিয়ে মানসিক ডাক্তারের কাছে এসেছো তোমার এই ক্ষতিকর ইচ্ছা দমনে সহযোগিতা পেতে। সুতরাং তোমার অবচেতন মনও কিন্তু চাচ্ছে এমনটা না হোক। তাই সে এটা হতে দিবে না। আর সচেতন মনে তো খুন করার প্রশ্নই আসে না।
- তাহলে আমি এখন কী করব?
- তুমি আজ আসতে পারো।
- আমাকে কোন ঔষুধ বা কাউন্সিলিং কিছুই দিবেন না।
- না। তবে তুমি আমার সাথে একমাস পর দেখা করবে। এই একমাসে তুমি কোন পেন্সিল তোমার সাথে রাখবে না।
- এই একমাসে যদি আমার ইচ্ছাটা জাগে আর সেটা তীব্রতর হয় তাহলে কি আপনার সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে পারব?
- তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে যোগাযোগ করবে। সেই বলবে আমার সাথে কথা বলতে হবে কি হবে না।
- জ্বী, আচ্ছা। ডা. সাহেব! আমার একটা প্রশ্ন ছিল।
- বলো।
- আপনার কি কোন অদ্ভূত ইচ্ছা আছে যেটা পূরণ করতে চান?
- আছে।
- কী ইচ্ছা?
- দেখো মাহদী, আমার কাছে প্রতিদিনই মানসিক রোগী আসে। যাদের বেশিরভাগই বিনা দোষে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আমি তাদেরকে ভালো করার চেষ্টা করি। যদিও আমি মানসিকভাবে শক্ত। কিন্তু মাঝে মাঝে ইচ্ছা জাগে বিনা অপরাধে বড় কোন দুর্ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়লে আমি নিজেকে ঠিক করতে পারব তো?
- হুম। আপনার ইচ্ছা পূরণ তাহলে তো আর আপনার হাতে নেই। যদি আপনার সাথে এমন কোন দুর্ঘটনা ঘটে তাহলেই এই ইচ্ছা পূরণের সুযোগ পাবেন।
- ঠিক বলেছো।
- আচ্ছা, আমি আসি তাহলে।
- আসো।
.
অল্প কথায় ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে পরিচয় হয়ে গেল। ফাবিহা হক আনিকা। মেয়েটা ঢাবি সাইকোলজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী। পড়ালেখার পাশাপাশি তার স্যারের প্রাইভেট চেম্বারে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আছে। সে ছাড়া আরো অনেক শিক্ষার্থীও নাকি এখানে সময় দেয়।
- হ্যালো, কে?
- জ্বী, আমি মাহদী!
- কোন মেহেদী?
- মেহেদী না মাহদী। গতপরশু আপনার স্যারের কাছে না আমি আসলাম? তখনই তো আপনার নাম্বারটা নিয়েছিলাম। চিনতে পেরেছেন?
- হুম। চিনতে পেরেছি। স্যার আপনার বিষয়ে আমাদের সাথে কথা বলেছেন।
- কী বললেন।
- সেটা তো আপনাকে বলা যাবে না?
- বুঝেছি।
- কী বুঝলেন?
- তিনি বলেছেন, আমি সাইকো।
- আরে নাহ্! সাইকো বলেননি।
- পেন্সিল দিয়ে মানুষের হৃদয় ছিদ্র করার ইচ্ছা শুধু সাইকোদেরই তো থাকতে পারে!
- মানুষের অনেক ইচ্ছায় থাকে। তবে সব তো আর পূরণ করা সম্ভব হয় না। আর কারো ক্ষতিকর কোন ইচ্ছা থাকলেই সে খারাপ লোক হয়ে যায় না। সে চাইলে এই ইচ্ছা দমন করে ভালো হতে পারে।
- হুম।
- নিজেকে সাইকো ভাববেন না।
- ঠিক আছে। আচ্ছা, আপনার কি কোন ইচ্ছা আছে?
- অনেক ইচ্ছাই তো আছে!
- এমন কোন ইচ্ছার কথা বলেন যেটা আমার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
- আপনি লেখালেখি করেন না?
- হুম, করি।
- কী লিখেন?
- আগে প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করতাম এখন গল্প ।
- আমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখে দিতে পারবেন?
- এটা কি আপনার কোন ইচ্ছা?
- হুম।
- অতি শীঘ্রই আপনার ইচ্ছা পূরণ হবে।
- জেনে খুশী হলাম!
- আচ্ছা, ভালো থাকবেন।
- আপনিও ভালো থাকবেন।
সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখিয়ে দুইটা লাভ হলো।
এক. আমি কাউকে পেন্সিল দিয়ে মারব এই সম্ভাবনা নেই।
দুই. আনিকার সাথে পরিচয়। প্রথমে মনে করেছিলাম আমি সাইকো এই কারনে মনে হয় আমার প্রতি সহমর্মী। পরে দেখলাম মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার এক অসাধরণ ক্ষমতা ওর আছে। আমার জীবনে এমন মানুষ আমি কমই দেখেছি। তাও আবার কোন মেয়ে মানুষ!
মানসিক ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর আনিকার সাথে আমার মাঝেমধ্যে কথা হতো। আমার রোগ নিয়ে নয় অবশ্য বরং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। সে জানে আমি তেমন কথা বলতে পারি না। তাই সে-ই সারাদিন কথা বলে। তার বফ আজ তাকে কী বলেছে, তার সাথে কোথায় ঘুরতে গিয়েছিল। মার সাথে সকালে কেন ঝগড়া হয়েছে, ছোট ভাইটা সারাদিন শুধু মোবাইল টিপে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে মজার বিষয় হলো, আমি ওর সম্পর্কে অনেক কিছু জানলেও আমার সম্পর্কে কিন্তু ওর তেমন জানাশোনা নেই।
- হ্যালো মাহদী, কই আছো তুমি?
- এই তো বাসায়।
- আমি তো আজ মিরপুরে আছি!
- ও!
- "ও" কী? জানতে চাইবা না কেন আসছি?
- বলো কেন আসছো।
- আমার এক আত্নীয়ের বাসায় দাওয়াত।
- ভালো।
- ভালো কী? তোমার এলাকায় আসছি এ কথা শুনে তুমি দাওয়াত দিতে পারো না?
- আচ্ছা, ফাহিমরে নিয়া আসো। আমার বাসায়ও তোমাদের দাওয়াত।
- কই আসতে হবে বলো। আর ফাহিম নাই,ওর একটা কাজ আছে তাই আমাকে দিয়ে চলে গেছে। বিকেলে নিতে আসবে।
- কমার্স কলেজের সামনে আসো।
- আচ্ছা আসছি। রিক্সাভাড়া কিন্তু তুমি দিবা।
- আচ্ছা, আসো।
- তোমার বাসায় কেউ নাই?
- আমি একাই থাকি।
- আগে তো বলো নাই।
- কখনো জানতে চাও নাই তাই বলিনি।
- হুম, আমার তো ঠ্যাকা আমি খালি জিগামু!
- ফাহিম জানে আমার এখানে আসছো?
- না তো!
- তোমার আত্নীয়কে বলেছো কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছো?
- বলেছি এক ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।
- ও!
- এই সারাদিন "ও!" "ও!" কী? চ্যাটেও "ও!" ফোনেও "ও!" এখন সামনে আইসাও "ও!" "ও!"
- কেন কী হইছে আবার?
- একটা মানুষ বাসায় আসলে একটু ঠান্ডা পানি খাওয়ানো যায় না?
- ঠান্ডা পানি না লেবুর শরবত?
- শরবত খাওয়াও।
লেবুর শরবতটা পান করে আনিকা ধীরে ধীরে জ্ঞান হারালো। প্রায় এক ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরে আসে।
- টানাটানি করে লাভ নেই। এই রশি তুমি ছিড়তে পারবে না।
- আমাকে এই চেয়ারে বেধে রেখেছো কেন?
- তোমার কী ধারনা?
- জানি না।
- জানি না বললে তো হবে না। তোমার ধারনা জানতে চাই আমি।
- আমার ধারনা যাই হোক, আমার বিশ্বাস তুমি আমার সাথে খারাপ কিছু করবে না। এতোদিনের কথা-বার্তায় তোমাকে যতোটুকু জেনেছি তোমাকে ভালোই মনে হয়েছে।
- ধুর! এই তোমাদের মেয়েদের মাথায় এই সব চিন্তা ছাড়া কি আর কোন চিন্তা আসে না? অন্তত তোমার কাছ থেকে এমন কোন উত্তর আসা করিনি।
- আর কী হতে পারি?
- আনিকা! ব্রেইন খাটাও। তুমি সাইক্রিয়াট্রিস্ট হতে যাচ্ছো। অন্যদের তুলানায় তোমার চিন্তা-ভাবনা তীক্ষ্ণ হওয়ার কথা! ভিন্নভাবে ট্রাই করো।
- মুক্তিপণ টাইপ কিছু? কিডনি-চোখ বা নারী পাচারকারী?
- আমাকে কি ফহিন্নি মনে হয় নাকি ক্রিমিনাল?
- উফফ, আমি পারছি না। আমার মাথা কাজ করছে না। তুমিই বলো কেন আটকে রেখেছো।
- আমার ইচ্ছে পূরণের জন্য!
কথাটা শুনে আনিকার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা মিলল। ওর হাতের পশমগুলো কেমন জানি দাড়িয়ে গেছে।
- আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি মিথ্যা বলছো। নিশ্চয় তুমি আমার সাথে দুষ্টামী করছো। হাতের রশিটা একটু ঢিল করে দেও না? ছিলে যাচ্ছে তো!
- বুঝি না। আমার হাসি-খুশি চেহারটায় আমি সিরায়াসনেস আনতে পারি না। কেন যে আমার কথা কেউ সিরিয়াস মনে করে না।
- আমাকে মেরে তোমার কী লাভ? মোটিভ কী বলো?
- আরে তোমাকে মরতে বলছে কে? আর ইচ্ছে পূরণের জন্য আবার কোন মোটিভ থাকার লাগে নাকি?
- তাহলে আমিই কেন তোমার ইচ্ছেপূরণের জন্য?
- তুমিই কেন নয় বলো? অন্য কেউ হলে তাকে সব কথা বলতে হতো। সে হয়তো আমার তীব্র ইচ্ছার কথা পুরোপুরি বুঝতেও না পারতো যেমনটা তোমাকে বোঝাতে পেরেছি।
ও, ভালো একটা বলেছো তো! তুমি ছাড়া অন্য কেউ নয় কেন? মানে তোমার পরেও কারো সাথে এই ইচ্ছেটা পূরণ করা যেতে পারে। যে তোমার মতো নয় অর্থাৎ সে আমার ইচ্ছেটা আগে থেকে জানতো না। তাকে নতুন করে জানাব। এরপর দেখব তার সাথে ইচ্ছে পূরণের অনুভুতিটা তোমার মতোই হয় কিনা?
- একটা কথা বলব?
- বলো।
- তুমি আমার পর আর কারো সাথে এমন করবে না।
- এটা কি তোমার জীবনের শেষ ইচ্ছা?
- হ্যাঁ।
- ঠিক আছে। তোমার শেষ ইচ্ছেটা তো রাখতে হয়! আর কিছু বলবা?
- তাহলে তুমি স্যারের কাছে গিয়েছিলে কেন?
- ধোঁকা দিতে। এই সাইকোলজিষ্ট-সাইক্রিয়াট্রিস্ট ব্যাটাদের একটা ভুল ধারনা আছে। তারা মনে করে তারাই দুনিয়ার সবকিছু বুঝে অন্যকেউ আর তাদের মতো বুঝে না। তাই তাদেরকে ধোঁকা দেওয়ার মজাই আলাদা।
আমি পকেট থেকে পেন্সিলটা বের করে আনিকার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভয়ে তার চেহারাটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। আরে ধুর, এতো ভয় পাওয়ার কী আছে? পেন্সিল দিয়ে হার্ট ফূটা করলে মানুষ মরে যায় নাকি? ও, আমিও তো জানি না! দেখি কী হয়!
.
- গল্পটা কেমন লাগল?
- ভালো। গল্পটা শেষ করলে না কেন?
- মানে?
- তুমি আমাকে মারলে নাকি ছেড়ে দিলে। অথবা মারার পর কী হলো কিছুই তো বললে না!
- অনেক গল্পে শেষ অংশের সমাপ্তি টানতে ইচ্ছে হয় না। পাঠকদের কল্পনার উপর ছেড়ে দেই। তারা নিজ নিজ কল্পনানুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সমাপ্তি টেনে নেয়।
- আমাকে কি তোমার কিপ্টা মনে হয়?
- না তো!
- তাহলে আমি তোমার কাছে রিক্সাভাড়া চাইতে যাবো কেন?
- আরে গল্প তো গল্পই! সবকিছু বাস্তব হয় নাকি?
- তোমারে বলছি কোনদিন আমার বফ আছে?
- আরে মাস্টার্স পড়ুয়া ঢাবির উচ্চ শিক্ষিতা-স্মার্ট মেয়ের কোন বয়ফ্রেন্ড নেই এটা পাঠকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না।
- গতকাল তোমার "এক কাপ কফি" গল্পটা পড়লাম।
- কেমন লাগল?
- ভালোই। অধরার হাতে কফি খাওয়ার অনেক ইচ্ছা নাকি?
- আরে অধরা তো নাম একটা! যে কোনো কারোর হাতের কফি হলেই চলবে।
- তাহলে আগামী কাল বিকেলে চলে আসো আমাদের বাসায় এক কাপ কফি খেতে।
- আচ্ছা, আসব।
- তোমার বাসার সবাই কই?
- আজ সকালে গ্রামের বাড়ি গিয়েছে।
- তুমি কেন গেলে না।
- ভার্সিটি আছে। তাছাড়া স্যারের চেম্বারে আমার ডিউটি।
- হুম, বুঝলাম।
- তোমার জন্য কি এখনি কফি নিয়ে আসব?
- নিয়ে আসো তবে এমন কিছু দিয়ো না যাতে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।
- মানে?
- আমার গল্পের সাথে কিন্তু এখানে সবকিছুই মিলে যাচ্ছে। বাসায় কেউ নেই, তুমি কফি খাওয়াতে চাচ্ছো! কেন জানি নিজেকে তোমার শিকার মনে হচ্ছে। না জানি আমার সাথে আবার কোন সাইকো এক্সপেরিমেন্ট করা হয়!
- তুমি নিশ্চিত থাকো আমি সাইকো না।
- আরে কোন পাগল-ই নিজেকে পাগল বলে না।
- কি, আমি পাগল?
- আরে আমি তোমারে পাগল বলছি? আমি তো একটা উদাহরণ দিলাম মাত্র। তুমি তো আর পাগল হতে পারো না, হলে পাাগলী হবে।
- এতোই যখন আমার সম্পর্কে ভালো ধারনা যাও নিজের কফি নিজে বানাইয়া খাও গিয়া।
- তুমি না ভালো মাইয়া! তুমি বানাও না। আমি তো দুষ্টামি করেছি।
- আচ্ছা, নিয়ে আসছি।
- এই নাও তোমার কফি।
- তোমার হাতের কফি খাচ্ছি, অধরা জানলে আমার খবর আছে!
- অধরা বলে কেউ আছে নাকি?
- আরে তুমি আমার সম্পর্কে কি সবই জানো নাকি? আর সবকিছুই কি বাস্তবে থাকতে হয়? মানুষ তো অনেক কিছুই কল্পনা করে থাকে।
- থাকো তুমি তোমার অধরা আর তোমার কল্পনা নিয়া, আমি গেলাম।
- তোমার বাসায় আমাকে রেখে কই যাও তুমি? আচ্ছা, আর রাগাবো না। বলো, কী বলার জন্য ডেকে এনেছো।
- তোমার কেন মনে হচ্ছে কিছু বলার জন্য তোমাকে ডেকেছি?
- মানুষের জীবনগল্প শুনতে অভ্যস্ত আমি। সবসময় জিজ্ঞেস করতে হয় না। সময় হলে একটা পর্যায়ে নিজের থেকেই মানুষ তার গল্প বলা শুরু করে। এটা আমি কথা বলার ধরন দেখেই বুঝতে পারি। কাল তোমার কথা শুনেই বুঝেছি তুমি কিছু একটা বলতে চাচ্ছো।
- কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না।
- যেভাবে ইচ্ছে বলো। গুছিয়ে বলার কোন প্রয়োজন নেই।
- মাহদী!....................................................
- আমি বুঝতে পেরেছি তোমার কথা।
- কথাগুলো তোমাকে বলে মনটা হালকা লাগছে।
- সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আজ তাহলে আসি।
- রাতের খাবার খেয়ে যাও। আমি রান্না করি তোমার পছন্দ অনুযায়ী কিছু।
- আংকেল-আন্টি আসুক, আরেকদিন সবাই মিলে খাবো।
- আচ্ছা, ঠিক আছে।
.
রাতে অনেক কষ্টে দু'চোখের পাতা এক করতে পারলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল। অভ্যাস অনুযায়ী হাত মুখ ধুয়ে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতে শুরু করলাম-
" টঙ্গীতে ঢাবি শিক্ষার্থী নিজ বাসায় খুন!"
'গতকাল রাতে ফাবিহা হক আনিকা (২৫) নামের এক ঢাবি শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় মৃত পাওয়া যায়। সে ঢাবির সাইকোলজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী ছিল। তার বুকে হার্ট বরাবর একটা পেন্সিল গেঁথে খুন করা হয়েছে।'
আনিকা মৃত। আমি জানি কে খুন করতে পারে। কারন মারা যাওয়ার আগে সে এমন কিছু কথা আমাকে বলেছে যা শুধুমাত্র একজন ছাড়া আর কেউই জানে না। আর সেই খুনি। আমি দ্রুত টঙ্গী থানায় যোগাযোগ করতে চলে এলাম।
- আমি আপনাদেরকে খুনি ধরতে সাহায্য করতে পারব।
- আপনি বলছেন, আপনি গতকাল সন্ধ্যায় আনিকার বাসায় ছিলেন?
- জ্বী, ছিলাম।
- তাহলে আপনাকে কেন খুনি হিসেবে ধরবো না?
- কারন আনিকা আমাকে বলে গিয়েছে কে তার ক্ষতি করতে পারে?
- আমরা আপনার কথা কেন বিশ্বাস করব?
- আমার কথা না, আপনাদেরকে আনিকার কথা বিশ্বাস করতে হবে।
- মি. মাহদী, মৃত মানুষ তো আর কথা বলতে পারে না!
- মৃত না, আপনাদেরকে আমি জীবিত আনিকার কথা শোনাব।
- জীবিত আনিকার কথা?
- আপনি এই রেকর্ডিংটা শুনেন।
"- মাহদী! তোমাকে আজ এমন একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি যেটা আর কাউকে জানাতে পারি নি। কাউকে বলতে না পেরে নিজের ভিতর এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করছি। তাই তোমাকে কথাগুলো বলছি।
তুমি তো আমাদের স্যারকে চিনো-ই। স্যারের সাথে আমার পরিচয় পাঁচ বছর যাবত। অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে তার। সবার কাছেই তিনি প্রিয় একজন মানুষ। আজ পর্যন্ত কাউকে তার বিরোধিতা করতে দেখি নি। তিনি আপন শত্রুকেও হাসিমুখে কাছে টেনে নেন। এক কথায় স্যার একজন আদর্শ মানুষ যার সবকিছুই তোমার ভালো লাগবে। আমাদের ব্যাচের সবার সাথে স্যারের সম্পর্ক ভালো থাকলেও আমার সাথে স্যারের সম্পর্কটা একটু বেশিই ভালো ছিল। আমি তার সাবজেক্টে সবসবময় বেশি নাম্বার উঠাতাম।
স্যারের চেম্বারে বসার পর থেকে উনার সাথে আমার সম্পর্কটা গভীর হতে থাকে। একপর্যায়েএকদিন আমরা একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই। তুমি সম্ভবত জানো না তিনি অবিবাহিত। কিভাবে যে কী হয়ে গেলো আমি কিছুই বলতে পারব না।
কয়েক মাস পর বুঝতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট! স্যারকে এ কথা জানালে তিনি অ্যাবরশন করাতে বলেন আর বলেন ঐ দিনের কথা ভুলে যেতে। এটা নাকি একটা নিছক দূর্ঘটনা মাত্র!
মাহদী! তুমি জানো না, মাতৃত্ববোধ কী জানিস? আমিও আগে জানতাম না এখন অনুভব করি আমার ভিতর আরেক সত্তার! আমি অ্যাবরশন করাবো না। আমি চাই আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে এবং তার পিতৃপরিচয় থাকবে। তাই আমি স্যারকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছি। এ নিয়ে তার সাথে আমার মনোমালিন্য চলছে। স্যার আমার সাথে এ বিষয়ে কোন কথাই বলতে চাচ্ছেন না কিন্তু যেভাবেই হোক আমি আমার অধিকার আদায় করব। ভাবছি আজ একটা বিহিত করেই ছাড়ব।"
- মি. মাহদী! আনিকা কিন্তু বলেনি তাকে খুন করা হতে পারে।
- সে বলেছে তার অধিকার আদায়ের জন্য সে যে কোন কিছু করতে পারি।
- যে কোন কিছু করতে পারে বলতে?
- দেখুন, হয়তো আনিকা স্যারের সাথে কথা বলার জন্য তাকে নিজ বাসায় ডেকেছিলো। আর তিনি ভয় করতেন এ কথা জানাজানি হলে তার সারাজীবনের সব মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। তাই হতে পারে কথাবার্তার একপর্যায়ে রাগের মাথায় বুকে পেন্সিল মেরে দিয়েছেন। তাছাড়া আপনারা পেন্সিলের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে ডাক্তারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করেও তো দেখতে পারেন?
- আপনি কিভাবে নিশ্চিত তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট-ই পাওয়া যাবে?
- কারন তাকে ছাড়া আমি তো আর কারো ক্ষেত্রে খুন করার মোটিভ দেখি না।
- তিনি খুন করলে তো পেন্সিলটা লুকিয়ে ফেলতে পারতেন?
- উনি ডাক্তার, সিরিয়াল কিলার না! হয়তো তার মাথায় এসব কিছুই তখন আসেনি। কারন তার হাতে খুন হয়ে যাবে এটা হয়তো তিনি নিজেও চান নি।
- সবই মানলাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন; আপনি কেন আনিকার কথা রেকর্ড করতে গেলেন?
- আমি মানুষের জীবনগল্প লেখার চেষ্টা করি। অনেক সময় সব কথা মনে রাখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না তাই রেকর্ডিং করা আমার অভ্যাস। আনিকা কথা শুরু করতেই আমি বুঝে ছিলাম সে তার জীবনের কোন গল্প শোনাতে যাচ্ছে। তাই রেকর্ডিং করে রাখি।
.
পেন্সিলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডাক্তারের ডান হাতের ফ্রিঙ্গারপ্রিন্টের সাথে ম্যাচ করে। এমনকি তিনি এটা নিজের হারিয়ে যাওয়া পেন্সিল বলে স্বীকার করলেও খুনের কথা আদালতে অস্বীকার করেন।
ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী তার সাথে আনিকার সম্পর্ক ও প্রেগন্যান্টের সত্যতা পাওয়া যায়। আদালত ডাক্তারকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়।
বলা হয় মৃত মানুষের শেষ একটা ইচ্ছা পূরণ করতে হয়। আনিকার ইচ্ছে ছিল তাকে নিয়ে একটা গল্প লিখিত থাকার। ওকে নিয়ে লেখা গল্পটা আমার কাছে সারাজীবন থাকবে।
অপরদিকে ডাক্তারের ইচ্ছে ছিল বড় ধরনের মানসিক বিপর্যস্ততায় ভেঙ্গে না পড়ে নিজেকে গুছিয়ে তোলার, শক্ত করে মোকাবেলা করার।
বেঁচে থাকার বাকী সময়টুকু যে অপরাধ তিনি করেন নি তার জন্য নিজেকে দোষ না দিয়ে মানসিকভাবে সবল রাখার এই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ তিনি পাবেন।
আর আমার ইচ্ছাগুলো তো পূরণ হতে থাকবে। এই যে মাত্র দুইটা ইচ্ছে পূরণ হলো। ও, আপনারা তো আবার আমার দ্বিতীয় ইচ্ছেটার কথা জানেন না!
আমি না বিয়ের আগে ফিজিক্যাল রিলেশনে জড়ানো মেয়েদের একদম দেখতে পারি না। ছেলেদের প্রতি অতি বিশ্বাসকারী এই মেয়েরা পরবর্তীতে সব জায়গায় বিরক্তিকর। তাদের কাছে সব ছেলেরাই নাকি একই রকম! কে বলছিলো ছেলেদের এতো বিশ্বাস করে পরে সারাজীবন সবাইকে অবিশ্বাস করতে?
মাঝখান থেকে এসব কিছুর নির্মম বলি হয় অন্য সব সাধারণ ছেলেরা। যাদের বিনা অপরাধে একইরকম দোষী মনে করা হয়। তাই এ সমস্যার একটাই সমাধান, এমন বোকা মেয়েদের দুনিয়াতে বেঁচে থেকে পুরুষ জাতির অপমান করতে না দেওয়া!
SHARE

Author: verified_user