Wednesday

বাংলা গল্প প্রফেসর - রাকিব হাসান

SHARE

                  বাংলা গল্প  প্রফেসর - রাকিব হাসান

বাংলা গল্প  প্রফেসর - রাকিব হাসান
বাংলা গল্প  প্রফেসর - রাকিব হাসান

.
রাত্রি নয়টার কিছু বেশি হবে হয়তো। হাতে ঘড়ি নেই তাই সঠিক সময়টা বলতে পারছি না। খাওয়া শেষ করে সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে।কিন্তু আমি এখনো তাঁবুর বাইরে বসে আছি। ঘুম আসছে না। মনটাও বিশেষ ভালো নেই। এশার কথা খুব মনে পড়ছে আজ। এশা, আমার স্ত্রী।বিয়ে করেছি মাস তিন হলো। উথাল পাথাল জোছনার আলোয় বসে তার কথাই ভাবছিলাম এতক্ষণ। আর দিন গুনছি কবে এই প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ থেকে লোকালয়ে ফিরে যেতে পারবো। বিয়ের আগে মিসরের সবচেয়ে প্রাচীন এই পিরামিডটাতে অনুসন্ধানকারী দলটার সাথী হওয়ার জন্য খুব আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। যার ফলে প্রফেসর এই অসময়ে একরকম জোড় করেই আমাকে নিয়ে এসেছেন। অবশ্য আমাদের সময় যে মন্দ কাটছে তা কিন্তু একেবারেই বলা যায় না। প্রতিদিনই নতুন নতুন কিছু না কিছু বের হচ্ছেই এই পিরামিডগুলো থেকে। কম হলেও প্রতিদিন অন্তত একটা করে মমি তো পাওয়া যাচ্ছেই। সাথে থাকছে স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সব ধাতু। তবে আমার আর প্রফেসরের অবশ্য এসবের চেয়ে পিরামিডের দেয়ালের গায়ের হায়ারোগ্লিফিকেই আগ্রহ বেশি।
বাংলা গল্প  প্রফেসর - রাকিব হাসান
.
আমরা ত্রিশ সদস্যের একটা দল এই প্রজেক্টে আছি। আমি আর প্রফেসর ছাড়া সবাই ইতিহাসের ছাত্র। আমি বাঙালি। আর প্রফেসর ইন্ডিয়ান হলেও এখন তাকে মিসরীয়ই বলা যায়। তাঁর এক সহকর্মীকে বিয়ে করে স্যটেল হয়ে গেছেন। পড়তে এসেছিলাম আমি কায়রো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ নিয়ে। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় খন্ডকালীন প্রফেসর হিসেবে নিয়োগও পেয়ে গেছি। সেই সুবাদেই প্রফেসরের সাথে পরিচয়। বাঙালি বলে বিশেষ স্নেহও করেন আমাকে।
.
প্রফেসরের তাঁবুতে আলো জ্বলছে সেই সন্ধ্যা। জেগেই আছেন এখনো। এ তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। প্রতিদিনের পাওয়া হায়ারোগ্লিফিকের নোট রাখেন। একবার ভাবলাম প্রফেসরের তাঁবুতে যাই। কিন্তু মন সায় দিলো না। এতো রাতে তিনি হয়তো বিরক্ত হতে পারেন। একটু পর দেখলাম প্রফেসর তাঁবু থেকে বের হয়ে আমার দিকেই আসছেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন-
অনেক্ষন বাইরে বসে যে?
আমি বললাম-তেমন কিছু নয়। এই ভরা পূর্ণিমার জলে স্নান করছি।
প্রফেসর হেসে উঠলেন। বললেন-
বুঝতে পেরেছি। নতুন বিয়ে তো। হাহা...
হাসি থামিয়ে বললেন- শুনেছি এই পূর্ণিমায় মমিদের আত্মা জেগে উঠে। যাবে নাকি দক্ষিণ দিকটায়?
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে একটু হেসে বললাম-আপনিও কি এসবে বিশ্বাস করেন?
আহা! তুমি তো জানোই অতিপ্রাকৃতে আমার একটুও বিশ্বাস নেই। কিন্তু মিসরীয়দের যাদুবিদ্যা তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কি বলো?
হ্যাঁ, তা অবশ্য।
চলো যাওয়া যাক এখন।



বাংলা গল্প  

.
দক্ষিণে চলেছি আমরা। প্রফেসর তোতাপাখির মতো তাঁর নানা অভিজ্ঞতার কথা বলে যাচ্ছেন। আর আমি মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতার মতো তা শুনছি। অনেক্ষন ধরে হাঁটছি আমরা। চাঁদটা প্রায় মাথার উপরে চলে এসেছে। প্রফেসর আমাকে নিয়ে ছোট্ট এক পিরামিডের ভেতরে ঢুকলেন। সামান্য ভয় ভয় লাগছে আমার। কিন্তু তা আমলে নিচ্ছি না। পিরামিডের ভেতরের এক সুড়ঙ্গে ঢুঁকে পড়েছি আমরা। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে হলরুমের মতো বিশাল এক কামরা। প্রফেসরের নির্দেশে কামরার কোনার বড় বাক্সটা সরিয়ে দেয়ালের বিশেষ এক স্থানে স্পর্শ করতেই বেড়িয়ে পড়লো এক গুহামুখ। টর্চের আলো ফেলতেই শিউরে উঠলাম। সারি সারি নরকঙ্কাল পড়ে আছে ভেতরে। গুহার ভেতরে প্রবেশ করে টর্চের আলো ফেলে তা দেখতে লাগলাম। প্রফেসর সারি সারি বাক্স দেখিয়ে আমাকে বললেন-
এসব আমার চৌদ্দ পুরুষ ধরে সঞ্চিত সম্পদ। পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ রয়েছে এই গুপ্ত কুঠুরিতে। আমি তোমাকে এসবের উত্তরাধিকারী করে যাচ্ছি। তোমার প্রয়োজন মতো এসব খরচ করো। তবে সাবধান ভুলেও অপচয় করো না। আর তোমার মৃত্যুর পর অবশ্যই কাউকে এসব সম্পদের উত্তরাধিকারী করে যাবে। আর যদি তা না পারো তবে জেনে রেখো তোমার আত্মা চিরকালের মতো ছায়াবৃত্তে বন্দি হয়ে যাবে। এই বলে তিনি পূর্ব কোনের এক বিশাল বাক্স খুলে সেখান থেকে কিছু পাথর বের করলেন। টর্চের আলোয় সেগুলো ঝলমল করে উঠলো। আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন-
ফিরে যাও এবার।
.
সকালে প্রফেসরের ডাকে ঘুম ভাঙল। উঠে বসতেই দেখলাম কাল রাতে যেখানে বসেছিলাম সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তিনি বললেন-
তাঁবুতে না ঘুমিয়ে এভাবে বাইরে পড়ে থাকলে অসুখ করবে যে।
তাঁর কথায় আমার একটুও মনোযোগ নেই। গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে গেছে আমার। কিন্তু এই দিনের আলোয় সব কেমন যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। কে কবে এমন কথা শুনেছে? একবার ভাবলাম প্রফেসরকে বলি। কিন্তু মন সায় দিলো না।
.
সেই ঘটনার পরের দিনই আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি। প্রফেসর কেন যেনে আর মানা করলেন না। যেন তিনি সমস্ত কাজেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন।
.
সুটকেস ভর্তি এতদিনের ময়লা জামা-কাপড়। এশার জোরাজুরিতে সব ধুয়ে দিতে হচ্ছে। হটাত একটা কোর্টের পকেট থেকে কি যেন গড়িয়ে পড়লো। হাতে তুলে নিতেই আমার সাড়া শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। এ যে সেই রাতের পাথর! তবে কি তা সত্যি ছিল?
.
পরিশিষ্ট:
দিন দুই আগে আমার মৃত্যু হয়েছে। তবুও আমাকে এই ধুলো মাটির পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। নরক আমায় নিচ্ছে না, স্বর্গের দ্বার বন্ধ। আমার দায়িত্ব যে এখনো শেষ হয়নি। কোন এক প্রফেসর কে এই রত্নপুরীর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে পারলে তবেই আমার মুক্তি। দ্রুত আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। আমি ছায়াবৃত্তে বন্দি হতে চাই না। তাই হন্যে হয়ে এই মরুভূমির দেশে এক প্রফেসর খুঁজে বেড়াচ্ছি। যে নিতে পারবে এই দায়িত্ব। যে দিতে পারবে আমায় মুক্তি।
.
© রাকিব হাসান

SHARE

Author: verified_user