Monday

ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে অপমান করে, একটা ঘটনাই বলি

SHARE

'লাঠি ও গাজর নীতি' মানে হচ্ছে, আপনাকে হয় গাজর বা মুলা ঝুলিয়ে বশ মানানো হবে, আর নয়তো পেছন থেকে লাঠির বাড়ি দিয়ে কথা মানতে বাধ্য করা হবে।
‘তেজস’ নির্মাণে ভারত ৩০ বছরের বেশি সময় ব্যয় করেছে-এ নিয়ে ছোট একটা লেখা দিয়েছিলাম। কোন সাহসে আমি ভারতের অভাব নিয়ে লিখলাম, আমাকে ধুয়ে ফেলা হচ্ছে। আর লিখব না কখনো। 

সাবমেরিন
সাবমেরিন

মহান ভারত কীভাবে বাংলাদেশকে অপমান করে, একটা ঘটনাই বলি...
আমাদের নৌ-বাহিনীর দু'টি সাবমেরিনের নাম ‘নবযাত্রা' এবং ‘জয়যাত্রা'৷ চীন থেকে আনা এই সাবমেরিন দু'টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিশনিং করেন চট্টগ্রামে। সাবমেরিন কেনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমরা কারো সঙ্গে কখনো কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হতে চাই না৷ কিন্তু কেউ যদি আক্রমণ করে, তাহলে যেন তার সমুচিত জবাব দিতে পারি, সে প্রস্তুতি আমাদের থাকবে৷ সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা যা যা করণীয় তা করে যাচ্ছি৷''
চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের এই সাবমেরিন কেনার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকগণ। তাদের মতে, বাংলাদেশের এ পদক্ষেপ উস্কানিমূলক।

 যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ডিফেন্স নিউজ ডটকম এ বিষয়ে তাদের দিল্লি সংবাদদাতার পাঠানো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো প্রভাবশালী ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত করা এবং তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর সম্পন্ন হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকর ঢাকা যাচ্ছেন। ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান এডমিরাল অরুণ প্রকাশ ডিফেন্স নিউজ ডটকমকে বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং তিন দিক থেকে ভারত বেষ্টিত থাকা বিবেচনায় দেশটির সাবমেরিন সংগ্রহ করা শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং ভারতের জন্য এটা প্রকৃতপক্ষে একটি উস্কানিমূলক কাজ। তার কথায়, সাবমেরিনকে একটি আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আর যা শুধুই ভারতের জন্য হুমকি বয়ে আনবে। তার সামুদ্রিক নিরাপত্তাজনিত সমীকরণকে জটিল করে তুলবে। ভারতের মেরিটাইম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন গুরপ্রীত খুরানা বলেন, কোনো ধরনের প্রথাগত সামুদ্রিক সামরিক হুমকিতে না থাকা বাংলাদেশের সাবমেরিন সংগ্রহের কারণ বোঝা দুষ্কর। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কূটনীতি ও নিরস্ত্রীকরণ বিভাগের অধ্যাপক স্মরণ সিং বলেছেন, এটা দক্ষিণ এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে তীব্র করবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে, সম্প্রতি বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটো সাবমেরিন কেনায় ভারত কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে।
ন্যূনতম বলতে গেলে এগুলো উদ্ভট ব্যাখ্যা। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করুন যে, এখানে বাংলাদেশ হচ্ছে ক্রেতা, কিন্তু গ্রাহক নয়; একইভাবে চীন হচ্ছে বিক্রেতা, দাতা নয়। সন্দেহ নেই, ৪০৬ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল কিছু; পক্ষান্তরে চীনের কাছে এটি দারুণ এক লাভজনক ব্যবসা। কোনো সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ অর্থ যদি বাংলাদেশ ব্যয় করতে চায়, তাহলে সুস্পষ্টভাবে এটি একটি সুচিন্তিত, বিবেচিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিন বছর আগে অর্থাৎ বিগত ২০১৩ সালেই বাংলাদেশ চীনকে সাবমেরিন ক্রয়ের এলপিও (Letter of Purchase Order) পাঠিয়েছিল এবং সাবমেরিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য বাংলাদেশের সেনা ও নৌ বাহিনীর একদল অফিসার প্রায় এক বছর ধরে চীনে ছিলেন। এসব খবরাদি কি ভারত জানতো না? অবশ্যই জানতো; কিন্তু আমরা মনে করি, চীন ইস্যুটি ভারতের একটি অজুহাত এবং এই অজুহাতকে ব্যবহার করে এবং চাপ প্রয়োগ করে হলেও বাংলাদেশের সাথে একটা ডিফেন্স প্যাক্ট করাই মূল দুরভিসন্ধি। বাংলাদেশের সাথে এরকম একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করার মতলব ভারতের অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু সুযোগ খুঁজে পাচ্ছিল না। এবার চীন থেকে সাবমেরিন কেনার ইস্যুতে সেই সুযোগ বানিয়ে নিচ্ছে ভারত। এখন কথা হচ্ছে, ভারত কী উদ্দেশ্যে এরকম একটি ডিফেন্স প্যাক্ট করতে চায়, আর এটা যে সম্পূর্ণ ভারতের স্বার্থেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্য যে ভারতের কাছে নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতের প্রস্তাবিত এই দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তিতে থাকতে পারে এমন কয়েকটি বিষয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে উভয় দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এগুলো নিয়েও চলছে জোর আলোচনা-সমালোচনা। এই চুক্তি অনুযায়ী লাইন অব ক্রেডিটে বাংলাদেশকে ভারত ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে-এই শর্তে যে ভারত থেকে সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি (military hardware) কিনতে হবে। এছাড়াও ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কাছে বাংলাদেশের বাহিনীরা প্রশিক্ষণ নিবে এবং বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সাথে ভারত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ গড়ে তুলবে। 

বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে ভারতের এহেন আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদীমূলক আচরণ দেখে আপনারা ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হন নি। যেচে এসে গায়ে পড়ে প্রতিরক্ষা চুক্তির নামে ভারতের এসব চাপিয়ে দেয়া আধিপত্যবাদী আবদারগুলো এদেশের জনগণ হয়ে মেনেছেন। যা মানতে বাধ্য নন আপনারা। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ভারত সরকারের জন্য অব্যাহত হুমকি হয়ে উঠেছে। সেখানে কোনো ধরনের বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান তীব্রতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্বাভাবিক যে, বাংলাদেশের সহজলভ্য ট্রানজিট করিডোরের মধ্যদিয়ে সৈন্যবাহিনী ও সমরাস্ত্র পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের জন্য এই প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির দরকার হবে। সন্দেহ নেই, এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করবে, কারণ বিদ্রোহীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনধিকার প্রবেশ করে হামলা করতে উত্তেজিত হয়ে উঠবে। আর যেহেতু সুলভ ও সহজ ট্রানজিট করিডোরের মধ্যদিয়ে সৈন্যবাহিনী ও সমরাস্ত্র পাঠানোর জন্য এরকম একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি ভারতের জন্য অতীব জরুরি, সেহেতু বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এমনকি ভারত তার উদ্দেশ্য হাসিলে খুব সম্ভবত ‘লাঠি ও গাজর নীতি’ প্রয়োগ করতে পারে।) এই লাঠি ও গাজর নীতি মানে হচ্ছে, আপনাকে হয় গাজর বা মুলা ঝুলিয়ে বশ মানানো হবে, আর নয়তো পেছন থেকে লাঠির বাড়ি দিয়ে কথা মানতে বাধ্য করা হবে। আশা করি আপনারা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেবেন।


SHARE

Author: verified_user